Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪১

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪১

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪১
তোনিমা খান

একটু ভালোবাসা আর ভরসা কতটা ক্ষমতাধর হলে বিভৎস গভীর দুঃখগুলোকে ফিকে করে দিতে পারে! অথচ এই ভালোবাসা আর ভরসাটাই কারোর জীবনে বহুল আকাঙ্ক্ষিত এক দুঃস্বপ্ন হয়।
নিলীমার জন্য ভালোবাসা আর ভরসা দুঃস্বপ্ন হলেও, সে তার মেয়ের জন্য এগুলোকে সে দুঃস্বপ্ন হতে দেয়নি। যা রূপকথার মায়ের জন্য দুঃস্বপ্ন, তা রূপকথার জন্য স্নিগ্ধ এক বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার স্নিগ্ধ রূপ তপোবন সিকদার।
কানে ফোন ঠেকিয়ে রূপকথা আলতো স্বরে ডেকে ওঠে,
–“আম্মা?”
নিলীমার দেহ ম্লান হয়ে আসে মেয়ের ক্ষীণ কণ্ঠে। তবুও এতকিছুর পরেও সাহস হারায় না সে। সবকিছু ভুলে সামনে আগানোর নাম-ই জীবন। হাসিমুখে শক্ত কণ্ঠে বলে,
–“এইতো মা। শরীর ঠিক আছে?”
রূপকথার চোখ আবারো টলটল করে উঠলো বিদঘুটে সেই সত্যিটা মনে পড়তেই! সে কোনমতে কান্না আঁটকে জবাব দেয়,

–“হুঁ।”
–“সন্ধ্যায় কিছু খেয়েছিস? তানশান নানুভাই কি করছে?”, নিলীমার অত্যাধিক স্বাভাবিক কণ্ঠে রূপকথা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। সে তো জানে তার মা ভালো নেই, তবুও মানুষটা স্বাভাবিক ভাবেই তার সাথে কথা বলছে।
–“আম্মা, তুমি কেমন আছো?”
হঠাৎ করেই মেয়ের প্রশ্নে একটু গতিশ্লথ হলো নিলীমার। কৃত্রিম হেসে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
–“আমার আবার কি হবে? তোরা ভালো আছিস মানেই আমি ভালো আছি। তোর বোন আজকে কি করেছে জানিস? এক বোতল হরলিক্সের আধা বোতল শুধু শুধু খেয়ে ফেলেছে। বজ্জাত মেয়ে!”
রূপকথা নীরব অশ্রু মুছতে মুছতে বলে,
–“খাক, কিছু বলো না। উনি আবার পাঠিয়ে দেবে।”
–“তোর উনি, আমার কোনো কথা শোনেনা। ছোট বোন বলে বলে আমার ঘর ভরিয়ে দেয়। আমি কিছু বলতে গেলে বলবে, আমি তাদের ভাই-বোনের মাঝে যেন না আসি!”
মায়ের ক্ষিপ্ত কণ্ঠে রূপকথা হাসল। বিয়ের পর থেকে আজ প্রথমবারের মতো হঠাৎ করেই সে বলল,

–“আম্মা ধন্যবাদ!”
নিলীমা কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“ধন্যবাদ কেন?”
রূপকথা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। বলে,
–“তোমার জন্য এমন একজন মানুষ জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি যে সুপুরুষ; কাপুরুষ নয়। যত্নবান, একজন ভালো বাবা, একজন ভালো স্বামী।”
পরপরই অনুতাপের সুরে বলল,
–“তোমার সাথে কত রাগ দেখিয়েছি, দুঃখিত আম্মা! তুমি একদম ঠিক। আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। জীবনে চলতে হলে একটু ভালোবাসা, ভরসা, আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়।”
নিলীমা স্নেহের সাথে হাসল। নিজের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়ে যেতেই আজকে আর বুকের ভেতরে কোনো যন্ত্রণা অনুভব হয় না। তার কথা সুখে আছে। ব্যস্! নিলীমার সব দুঃখ শেষ।
সে ছলছল নেত্রে বলল,

–“আমার কথা মা সুখে আছে। এটা আমার জীবনের একমাত্র চাওয়া ছিল কথা। আজ আমার জীবনের উপর থেকে সব অভিযোগ শেষ, এখন আমি নিশ্চিন্তে মরতে পারব।”
রূপকথার বক্ষস্থল দৈবাৎ ছটফট করে উঠল।
–“এমন কথা বলছ কেন, আম্মা? তোমায় তোমার কথার সুখের শেষ‌ মুহূর্ত পর্যন্ত তার সাথে থাকতে হবে। শুকতারাকে বড় হতে দেখতে হবে। এইসব অলুক্ষণে কথা আর বলবে না। আম্মা, জীবন যত দুঃখ দিয়েছে সবটা সুখে পরিণত করতে হবে। হার মানা যাবে না।”
নিলীমা টলটলে নেত্রে মেয়ের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ শোনে। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“জীবন কাকে কতটুকু মহলত দেয় তা তো জানি না রে মা। কিন্তু আল্লাহ যেন মৃত্যুর আগে ঐ মানুষটার একটু খোঁজ দেয়। অন্তত বুকটাতে কোনো আফসোস, অপেক্ষা নামক যন্ত্রনা অনুভব হবে না।”
মায়ের কথার রূপকথা চোয়াল শক্ত করে বলল,
–“আম্মা, তোমার কি মনে হয় কোনো মানুষ এভাবে নিখোঁজ হয়ে যেতে পারে? যে ইচ্ছাকৃত ভাবে নিখোঁজ হয় তার ই কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না আম্মা। দয়াকরে অপেক্ষা করা ছেড়ে দাও, আম্মা।”
–“এমন কঠিন কথা বলিস না, কথা। আমার কি অপরাধ ছিল যে মানুষটা আমায় ফেলে চলে যাবে? তার সাথে কোনো কিছু হয়েছে আমি নিশ্চিত।”
বাবার প্রতি মায়ের দৃঢ় বিশ্বাসে রূপকথার চোখমুখ উপচে কান্না বেরিয়ে আসল। মানুষটাকে কি করে বলবে, সে যেই স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছে, সে এখন কত সুখে সংসার করছে অন্য এক নারী সাথে।
সে শুধু শেষবারের মতো বলে,

–“আম্মা, দয়াকরে ভুলে যাও তাকে। অপেক্ষা করো না, সে কখনো আসবে না।”
নিলীমা বিশ্বাস করে না। সে ফোনটা বুকে চেপে ধরে সৃষ্টিকর্তার কাছে আর্জি জানিয়ে বলল,
–“অন্তত মৃত্যুর আগে তার একটা খোঁজ দিয়েন যেন আমি শান্তিতে মরতে পারি।”
ফোন রেখেই বিছানার কিনার মেঝে ঘেঁষে বসা রূপকথা ডুকরে কেঁদে উঠল।
এতদিন তো তাও মনে একটা আশা ছিল কিন্তু এখন? কেন এলো ঘৃণ্য এই সত্য সামনে? বাবা নামক মানুষটার উপর যে সে ঘৃণা করতে চায় না। বাল্যকালের সেই মুহুর্তগুলো খুব তরপায়! মায়ের এই দৃঢ় বিশ্বাস তাকে খুব তরপায়। পৃথিবীটা কেন এতো ছোট? বাবাকে খুঁজে তো পেল, তাও তপোবনের আপন খালার স্বামী রূপে?
সত্য এত বিদঘুটে হয় কেন?
দরজায় খট খট আওয়াজ হতেই রূপকথা হাঁটু থেকে মুখ তুলে তাকায়। চোখের পানি মুছে বলল,
–“দরজা খোলা।”
তানশান চাপিয়ে রাখা দরজা খুলে উঁকি দিলো। ঘরের এক কোনায় রূপকথাকে বসে থাকতে দেখে সে ধীরস্থির ঘরে ঢুকলো। রূপকথার লালচে মুখশ্রী দেখে শুধায়,

–“কাঁদছিলেন?”
রূপকথা ঘন ঘন না বোধক মাথা নাড়লো। তানশান ম্লান হেসে বলল,
–“কিন্তু আমি তো দেখছি আপনি কাঁদছেন।”
–“ভুল দেখছো।”, রূপকথা চঞ্চল দৃষ্টি ফেলে বলল।
তানশান বাধ্যগত ছেলের মতো বলল,
–“আচ্ছা, কিন্তু আপনি কি জানেন আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহ খুব রাগ হয়?”
–“জানি। আমার একটা ছোট বাপ আছে সে বলেছিল।”, রূপকথার থমথমে কণ্ঠে তানশান স্মিত হাসল। বলল,
–“তবে কান্নাকাটি না করে আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে হাসিমুখে থাকুন। আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই অপরাধীদের শাস্তি দেবে। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।”
রূপকথার কান্নারত মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। সে ভারী গলায় বলে,
–“হু, আল্লাহর উত্তম পরিকল্পনাকারী। আর সেই পরিকল্পনার জোরেই তো আমি আজ একটা ছোট্ট দায়িত্ববান বাবা পেয়েছি। আমার ছোট শিক্ষক!”
তানশান বোঝে মিমি কার কথা বলছে। তার মুখে এবার চাপা লাজুক হাসি দেখাগেল। বলল,

–“চাইল্ডিশ কথাবার্তা!”
রূপকথা কান্নারত মুখে পুনশ্চঃ হাসলো তানশানের লজ্জা পাওয়া দেখে। এই যে হঠাৎ পাওয়া দুইজন শক্ত ঢাল, তার খুব প্রিয়।
তানশান বলল,
–“এখন পড়তে আসুন, পাপা ডাকছে। নয়তো পরীক্ষার সময় আপনার অন্যের খাতার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।”
–“চলো।”
ভালোবাসাবাসির পর্ব খানিক চুকে গেল। তপোবন ফের কঠোর শিক্ষকের রূপে ফিরে আসতেই রূপকথা চোখমুখ বিকৃত করে নিলো। বিকৃত মুখে চেয়ার টেনে বসল।
টেবিলের মাঝ বরাবর গম্ভীর মুখে বসে আছে তপোবন। টেবিলের দুই প্রান্তে বসা মা-ছেলের সামনে হায়ারম্যাথের বই দু’টো রেখে আদেশের সুরে বলল,
–“এই যে ম্যাথগুলো দাগিয়ে দিয়েছি, সেগুলো আমি আসার আগে সব শেষ করবে। আমি আসব রাত সাড়ে দশটা নাগাদ। আমি এসে এগুলো দিয়ে পরীক্ষা নেবো।”
তপোবনের কথায় তানশানের মাঝে কোনো উদ্বেগ দেখা গেল না, তবে রূপকথার চোখ চড়কগাছ! সে হন্তদন্ত হয়ে বইয়ের পাতা উল্টে দেখল, পুরো দুটো অধ্যায়! সে আর্তনাদ করে বলল,
–“এখন বাজে সন্ধ্যা সাতটা। এতগুলো ম্যাথ এত অল্প সময়ের মধ্যে কি করে করব?”
তপোবন নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“সেটা তোমার ব্যাপার। আমি এগুলো সব ধরে ধরে করিয়েছি। এখন না করতে পারলে তোমাদের পড়াশুনা ছেড়ে দেয়া উচিৎ।”

রূপকথা করুণ চোখে তাকায়। মিমির অসন্তোষ মাখা মুখ দেখে তানশান মৃদু হাসল। নীরবে ম্যাথ করতে শুরু করে।‌ বাবা পড়াশুনার বিষয়ে কোনো আপোষ করে না। এমন করে সে একদিন জেদ দেখিয়েছিল, যার ফলে তাকে সারারাত বাবা শাস্তি হিসেবে বায়োলজি পড়িয়েছে। কী বাজে রাত! সে আজও ভোলেনি।
রূপকথা একবুক হাহাকার নিয়ে ম্যাথ করতে শুরু করল। তপোবন শাল জড়িয়ে নিতে নিতে গুরুগম্ভীর গলায় বলল,
–“দু’জন পড়াশুনায় এবার সিরিয়াস হও। বছর যাবে চোখের পলকে। এরপরেই দু’জনের পরীক্ষা!
খারাপ রেজাল্ট করলে কিন্তু…”
তপোবনের কথার মাঝেই রূপকথা থমথমে ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–“খারাপ রেজাল্ট করলে কি করবেন?”
কথার মাঝে কথায় তপোবন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তোমায় একটা পিঠার দোকান দিয়ে দেবো আর তানশানকে একটা রিকশা কিনে দেবো। দু’জনে পড়াশুনা করে যদি সাবলম্বী না হতে পারো তবে এভাবে সাবলম্বী হবে।”
মা-ছেলে আকাশ থেকে পড়ল। তানশান হতভম্ব হয়ে শুধাল,

–“রিকশা? পাপা, আমি রিকশা চালাব? কিন্তু আমি তো রিকশা চালাতে পারি না।”
রূপকথা ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে হড়বড়িয়ে বলল,
–“আমিও তো পিঠা বানাতে পারি না।”
সে কি ভয়ঙ্কর দুশ্চিন্তা! তপোবন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বউ বাচ্চার দিকে। তার ইচ্ছে হলো দেয়ালে মাথা ঠুকতে। সে দাঁত খিচে বলল,
–“বাহ্ কত দুশ্চিন্তা তোমাদের! তারমানে তোমরা ঠিক করেই নিয়েছো— যে তোমরা পড়াশুনা করবে না?”
–“নাহ, তা কেন হবে?”, মা ছেলে সমস্বরে বিরোধ করে বলল। চোখেমুখ কুঁচকে আছে তাদের।
তপোবন এবার রাগান্বিত স্বরে ধমকে উঠে বলল,
–“তবে পড়াশুনা করো, পাজির দল। পিঠা বানাতে না পারা আর রিকশা চালাতে না পারা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।”
তানশান আর রূপকথা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে বোকাসোকা হাসল। তানশান বোকাসোকা কণ্ঠে বলল,
–“ওহ্, স্যরি পাপা।”
–“স্যরি পাপা”, তপোবন চাপা রাগে বিড়বিড় করতে করতে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। লম্বা লম্বা কদম ফেলে সোজা এরোজের ঘরে গিয়ে দেখলো ঘর খালি।

চোখেমুখে একরাশ দুশ্চিন্তা আর সন্দেহের ঘনীভূত ছায়া নিয়ে সে বাড়ি থেকে বের হয়। এরোজের সাথে কথা বলতে হবে। সে কি করতে চাইছে? হঠাৎ বিয়ের জন্য এত উদগ্রীবতা কেন? তার জানামতে, এরোজের সাদামাটা, প্রাণবন্ত, বাঙালি ছোঁয়ায় বড় হওয়া মেয়ে পছন্দ। তবে ও কেন সৃজার মতো একটা মেয়েকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে?
তপোবন অফিসে যাওয়ার পথে নিউ মার্কেট এড়িয়া সহ সব জায়গায় খুঁজল ছেলেটিকে, কিন্তু পেল না। বিকালে ঐ ঝামেলা ঘটিয়ে কোথায় চলে গেল কে জানে! অন্যদিকে ইমরোজ রীতিমতো তার মাথা খেয়ে ফেলছে।
রাত নয়টা ত্রিশ। একতলা বাড়িটির সামনে দ্রুত গতিসম্পন্ন অডি কারটি থামে। গাড়ি থেকে বের হ ওয়া ইমরোজ ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে বের হয়। সদর দরজা খোলাই ছিল, সে গটগট করে ঢুকে গেল।
সুজানা বেগম বসার ঘরেই বসে ছিল। ইমরোজকে এভাবে ঢুকতে দেখে সে দাঁড়িয়ে যায়। ভয়ে কাঠ হয়ে যায়। ইমরোজ তার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, বিনা অনুমতিতে সৃজার ঘরে ঢুকে গেল।
বিছানায় শুয়ে ছিল সৃজা। এরোজের সাথে কথা হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে হিরের আংটির ছবি পাঠিয়েছে, সিলেক্ট করতে বলেছে। সেগুলোই হাঁ করে দেখছিল। বেছে বেছে পাঁচ হিরের একটা আংটি পছন্দ করেছে। এর চেয়ে বেশি নেই নয়তো সেটাই করত।
কিন্তু হঠাৎ করেই তার অলসতা ভঙ্গ হয় কেউ ক্ষিপ্র গতিতে এসে তাকে এক ঝটকায় দাঁড় করাতেই। সে হকচকাতে গিয়েও হকচকালো না। কেননা সে তো জানত এমন কিছু হবে। ইমরোজ ক্ষিপ্ত হাতে সৃজার চোয়াল চেপে ধরল। হিসহিসিয়ে শুধায়,

–“এগুলো কি ছিল?”
সৃজা চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–“কাপুরুষ আর সুপুরুষের সাক্ষাৎ ফারাক ছিল”
ইমরোজ রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
–“তুমি এরোজকে বিয়ে করার জন্য রাজি হয়েছো কোন সাহসে? তুমি কি ভুলে গিয়েছ, তুমি আমার সাথে কমিটেড?”
–“ছিলাম কিন্তু এখন আর নেই। কারণ একজন কাপুরুষের পরকিয়ার প্রেমিক হয়ে বাঁচার থেকে , একজন সুপুরুষের স্ত্রী হয়ে বাঁচা আমার কাছে অনেক সম্মানের মনে হয়েছে।
তুমি একটা কাপুরুষ! যে কি-না আজ পর্যন্ত আমায় আমার সম্মান দিতে পারেনি। দুনিয়ার সামনে স্ত্রী হিসাবে প্রকাশ করতে পারেনি। তাই আজ থেকে তুমি তোমার পথ দেখো। থাকো ঐ গেঁয়ো, আনস্মার্ট, ন্যাকা, কঙ্কাল দেখতে মৌনতার সাথে। ও—ই তোমার মতো কাপুরুষের জন্য ঠিক আছে।
আমার জন্য তো এরোজের মতো সুপুরুষ-ই যোগ্য। যে কি-না ঘর ভরতি মানুষের সামনে গলা উঁচু করে আমায় ভালোবাসার প্রস্তাব দিয়েছে। বের হও এখান থেকে! তোমার এই রাগ অন্য কোথাও গিয়ে দেখাবে। রাগ দেখাতে হলে সুপুরুষ হয়ে আসবে।‌
এখনো বলছি, আমাকে স্ত্রীর সম্মান দিতে পারলে সামনে আসবে, নয়তো নিজের ছোট ভাইয়ের বউ হতে দেখার জন্য তৈরি হও।”
বলেই সৃজা ইমরোজের হাত থেকে নিজের গাল ছাড়িয়ে নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। আর ইমরোজ! যে কাপুরুষের তকমা সহ্য না করতে পেরে, রাগে রীতিমতো হুঁশ হারিয়ে বিছানার চাদর সহ বালিশ সব টেনে ছুঁড়ে মারলো মেঝেতে। সে কোনোভাবেই সৃজাকে নিজের চোখের সামনে এরোজের বউ হতে দেখতে পারবে না।
মুহুর্তেই ইমরোজ দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়ল। কি করবে? কিভাবে করবে? কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।

পড়াশুনায় নিদারুণ একঘেয়েমিতে সমস্বরে এক দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল কক্ষ জুড়ে। টেবিলের দুই পাশে সম্মুখ বরাবর বসা তানশান আর রূপকথা বই থেকে মুখ তুলে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেললো। সেই সন্ধ্যা থেকে তারা এক নাগারে পড়ছে।
তানশান একঘেয়েমি দূর করার জন্য চমৎকার পদ্ধতি হিসেবে নেটফ্লিক্স বেছে নিল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলে,
–“ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন নিশ্চয়ই? একটু হেঁটে আসুন, নয়তো টিভি দেখুন ভালো লাগবে। আবার কিছুক্ষণ পর পড়লে পড়ায় আগ্রহ পাবেন।”
রূপকথা বিমর্ষ কণ্ঠে শুধায়,
–“তুমি কি করবে? খিদে পেয়েছে, কিছু আনব?”
রূপকথার প্রশ্নে তানশানকে ভাবুক দেখাগেল। খিদে না পেলেও কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। সে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে সাগ্রহে বলল,

–“মাথা হ্যাং হয়ে গিয়েছে, আমি এখন একটু সিরিজ দেখব। আপনি কি দেখবেন আমার সাথে? তাহলে চলুন একসাথে দেখি আর পপকর্ন খাই।”
রূপকথা বুক ভরা প্রাশান্তির নিঃশ্বাস ফেলল তানশানের প্রস্তাবে। জীবন থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তিটা যখন অপ্রাপ্তির খাতায় উঠল, তখন সৃষ্টিকর্তা তার থেকে দ্বিগুন ফিরিয়ে দিচ্ছে।
একটানা পড়তে তার ও ভালো লাগছে না। সে বলল,
–“আচ্ছা। কিন্তু পপকর্ন কোথায় পাবো?”
–“পপকর্ন ভাঁজতে হবে। বাসায় আছে। চলুন আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”
–“আমি কিন্তু ভাঁজতে পারি না।”, রূপকথা উঠতে উঠতে বলল।
–“আমি শিখিয়ে দেবো। এটা সহজ, যদিও আমি কখনো করিনি। পাপা রাগ করে রান্নাঘরে ঢুকলে।”
পরিকল্পনা মোতাবেক রান্নাঘরে দু’জন হাজির হয়। তানশান চিরুনি অভিযান চালিয়ে পপকর্নের প্যাকেট বের করল। মাইক্রোওয়েভের কাছেও তার যাওয়া মানা বলে সে চুলোয় প্যান দিল। রূপকথাকে বলল,

–“নিন, এখন এই প্যাকেটটা খুলে কড়াইয়ে ঢেলে দিলেই পপকর্ন হয়ে যাবে।”
রূপকথা তানশানের কথামতো কড়াইয়ে তেল আর ফ্লেভার এর য়িশ্রণে থাকা ভুট্টা গুলো ঢেলে দিল। তানশান পপকর্ন নেয়ার জন্য পাত্র খুঁজতে গেল। তবে দুই মিনিট যেতেই রূপকথা বিকট চিৎকার দিয়ে উঠল। তানশান চমকে পেছনে তাকায়।
পপকর্ন গুলো উগ্রভাবে এদিক সেদিক ছিটে যাচ্ছে। আর তার বোকা মা লাফাচ্ছে আর হুঁশ হুঁশ করছে। সে কপাল তাপড়ে হন্তদন্ত হয়ে গেল ঢাকনা খুঁজতে। ঢাকনা খুঁজে তা দিয়ে প্যানটা ঢেকে দিতেই পরিস্থিতি একদম শান্ত হয়ে গেল।
লাফাতে থাকা রূপকথা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল তানশানের কাজে। তানশান মুখ বিকৃত করে বিদ্রুপ করে বলল,
–“বোকা মা আমার! সারাদিন মায়ের বেশে টো টো করে বেড়ানো। বুদ্ধি তো একদম নেই! যখন দেখলেন এগুলো ছিটে আসছে ঢেকে দিবেন না? তা না করে আপনি “হুঁশ হুঁশ” করে লাফিয়ে যাচ্ছেন!”
ধুকপুক করতে থাকা অন্তঃস্থল সামলে রূপকথা বোকাসোকা চাহনি ফেলল। থমথমে মুখে বলল,

–“আমি কি এগুলো আগে কখনো ভেজেছি? পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলে বুঝতাম।”
–“এটা পূর্ব অভিজ্ঞতা নয় উপস্থিত বুদ্ধির বিষয়। আজ যদি এভাবে তেল ছিটে আসতো, তবে আপনি কি সমাধান না খুঁজে এমনভাবে লাফাতেন? কি অদ্ভুত!”
ততক্ষণে পপকর্ন হয়ে গিয়েছে। নিচ থেকে দু একটা পুড়েও গিয়েছে। তারা হাঁফ ছেড়ে পপকর্ন নিয়ে রুমে যায়। তানশানের বিছানা বরাবর বিশাল এক এলইডি স্ক্রিন। দুই কিনারায় হেডবোর্ডে পিঠ এলিয়ে, পা ছড়িয়ে আয়েশ করে বসল মা-ছেলে।
তাদের দু’জনের মাঝে পপকর্নের বাটি রাখা। তানশান বেশ কিছুক্ষণ নেটফ্লিক্সের হোম পেইজ ঘুরলো। কোনো ভালো সিরিজ খুঁজছে।
তপোবন তাই জলদি বাড়িতে চলে আসে। অভ্যাস অনুযায়ী ছেলের ঘরে উঁকি দিতেই তার ভ্রু উঁচু হয়ে গেল। লাইট নিভিয়ে মাঝে পপকর্ন রেখে স্ত্রী সন্তান যে পড়ার ঘরটাকে থিয়েটার বানিয়ে ফেলেছে। অন্তঃস্থল প্রশান্তি অনুভব করে। দৃশ্যটার স্নিগ্ধতা আর প্রাশান্তির কাছে নেটফ্লিক্স নামক অসন্তোষের কারণটি খানিক ফিকে পড়ল।
পড়াশুনার সময় টিভি দেখায় অসন্তোষ হলেও কিছু বলল না। মাঝেমধ্যে একটু ব্রেক নিলে পড়ার গতি দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
সে নীরবে চলে যায় নিজের ঘরে। পোশাক বদলে টিশার্ট ট্রাউজার পড়ে প্রফুল্ল চিত্তে ছেলের ঘরে ঢুকলো। প্রফুল্ল কণ্ঠে শুধায়,
–“তোমরা কি করছো?”
মা-ছেলের মগ্নতা তখন তুঙ্গে। সদ্য শুরু হওয়া সিরিজের সূচনা-দৃশ্যে চোখ নিবদ্ধ রেখেই সমস্বরে জবাব দিল,
–” সিরিজ দেখছি।”
কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ না পেয়ে তপোবন কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হলো‌। তবুও মুহুর্তটির স্নিগ্ধতা অনুভব করার লোভে বলল,
–“আমি কি তোমাদের সাথে জয়েন করতে পারি?”
–“অবশ্যই।”

এবারও জবাব এল যান্ত্রিকভাবে। তপোবন সানন্দের সাথে বিছানায় উঠে পপকর্নের বাটিটা নিজের কোলে রেখে, দু’জনের মাঝে পা লম্বা করে ছড়িয়ে বসে পড়ল। কি সুন্দর মুহুর্ত! জীবন কত সুন্দর!
ভাবতেই তপোবনের মুখে হাসি প্রগাঢ় হয়। সে বিমোহিত নয়নে তাকায় স্ত্রী সন্তানের পানে।
তারা দু’জনে টিভির দিকে হা কে তাকিয়ে আছে। আগ্রহ হুটোপুটি খাচ্ছে তাদের চেহারায়। তাই সেও মগ্ন হয় সিরিজ দেখতে। হলিউড সিরিজ!
এগুলোতে সাফসাফ নাকোচ থালকেও আজ এই সুন্দর মুহুর্ত নষ্ট করতে চাইলো না।
সে নির্বিকার পা দোলাতে দোলাতে দেখতে লাগলো। গল্প এগোচ্ছে। মাঝেমধ্যে সাবটাইটেলের জটিল মারপ্যাঁচে রূপকথা ও তানশান খেই হারিয়ে ফেললে তপোবনই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎই তপোবনের দৃষ্টি সরু হয়ে এল। পর্দার দৃশ্যপট দ্রুত বদলাচ্ছে।
দৃশ্যপটের পরিস্থিতি দেখে পুরোনো সেই বিব্রতকর অভিজ্ঞতা জেঁকে বসল! এখনো কি সেই সিন ক্রিয়েট হবে না-কি?
কিন্তু তপোবন কিছু বুঝে ওঠার আগেই আচমকা নর-নারীর দু’টো ওষ্ঠ মিলে গেল সবেগে।
তপোবন চমকে উঠলো। চোখ বৃহৎ আকারের ধারণ করলো। সে তড়িৎ গতিতে দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে রূপকথা আর তানশানের চোখ চেপে ধরল। দাঁত কিড়মিড় করে রাগান্বিত স্বরে গর্জে উঠে বলল,

—”তোমাদের নেটফ্লিক্সের পাসওয়ার্ড কে দিয়েছে?”
তানশান কাঁচুমাচু করে উঠল। বাবার হাত ছাড়িয়ে দ্রুত বিছানা ছেঁড়ে নেমে বই খাতা গোছাতে লাগল। চরম অস্বস্তিভরা বিব্রতকর এই পরিবেশে রূপকথাকেও নত মস্তকে দেখাগেল! ছেলের সামনে এমন পরিস্থিতি ছিঃ ছিঃ!
তপোবন গলা খাঁকারি দিয়ে পরিস্থিতি শিথিল করে। সাথে সাথেই টিভির রিমোট নিয়ে পাসওয়ার্ড বদলে দিল। চোয়াল শক্ত করে ছেলের উদ্দেশ্যে বলল,
–“তোমায় যেন আমি আর নেটফ্লিক্সের আশেপাশে ও না দেখি, তানশান।”
তানশান আনত মুখে শুধু মাথা নাড়লো। তপোবন ফের গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
–“এখন নিচে চলো, রাতের খাবার খেয়ে তারপর একবারে পড়তে বসবে।”
বাবার বলতে দেরি আছে তানশানের ছুটতে দেরি নেই। তানশান পালাতেই তপোবনের চোখ পড়ে বিছানায় বসে কাঁচুমাচু করা স্ত্রীর পানে। গম্ভীর গলায় বলে,
–“আপনাকে কি আলাদা করে বলা লাগবে? খেতে চলুন।”
রূপকথা বোকাসোকা হাসল। মিনমিনে স্বরে বলল,
–“আমার চোখ ঢাকার কোনো প্রয়োজন ছিল না।”
তপোবন সরু চোখে তাকায়।
–“কেন?”
রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকায়। খেপে বলে,

–“তো আমি কি বাচ্চা না-কি? আমি তো জানি এগুলো।”
তপোবন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“সেটাই, আপনাকে জানানোর জন্য আমি আছি। এগুলো দেখতে হবে না, চলুন।”
সরব রূপকথার কান গরম হয়ে উঠল।
–“রিডিকিউলাস! এই তানশানের কাছে নেটফ্লিক্সের পাসওয়ার্ড এসেছে কি করে?”
তপোবন বের হতে হতে রাগান্বিত স্বরে বিড়বিড় করে।
নিচে নামতে নামতে সে মৌনতা রোজ সবাইকে ডেকে নিয়ে একসাথে নামে।
নির্জনা বেগম স্থুল দেহ টেনে এগিয়ে আসে। গম্ভীর গলায় শুধায়,
–“তপোবন, তোমার আব্বু কখন আসবে?”
–“আব্বু ক্লাবে আছে আম্মা। আমি দেখা করে এসেছি আসার সময়। আধা ঘন্টার মধ্যে চলে আসবে।”
–“তবে আমি তার সাথেই খাবো, তোমরা এখন খাও।”
–“আব্বুর ওখানে খাওয়া দাওয়া অলরেডি হয়ে গিয়েছে, আম্মা। সিটি মেয়র দেখা করতে এসেছিলেন কোনো কারণে। তার সাথেই খেয়েছে। আপনি আমাদের সাথে বসুন।”

তপোবন মাকে পাশে বসায়। মায়ের কিছু কাজে ঘোর বিরোধ থাকলেও মানুষটা যথেষ্ট শ্রদ্ধেয় তার কাছে। কেমন করে নিজের সব শখ আহ্লাদ ছেড়ে তাদের আগলে বাঁচছে।
মৌনতাকে আজ ভীষণ চঞ্চল দেখালো। সে বিশ্বাস করে নিজের উপর। শুনেছে,
কেউ যদি মন থেকে কোনোকিছু পেতে চায় তবে নাকি পুরো পৃথিবী তাকে সেটা পাইয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। অবচেতনেও এরোজ মেরুদন্ডহীন একটা সংসার টিকিয়ে রাখার নীরব লড়াইয়ে সাহায্য করছে। সে আশাবাদী হয়তো তার সংসারটা এই পর্যায়ে টিকে যাবে।
মৌনতা রোজের সাথে ঝগড়া করছিল। তপোবন খুশি হয় অত্যাধিক চঞ্চল মৌনতাকে দেখে। বিগত বেশ কয়েকদিন যাবৎ মৌনতাকে ভীষণ ভঙ্গুর লাগছিল। সে খেতে খেতে শুধায়,
–“মৌন, শরীর ভালো লাগছে?”
ভাসুরের প্রশ্নে মৌনতা প্রাণোচ্ছ্বল মুখে হাসল। বলল,
–“আমি একদম ঠিক আছি, ভাইজান।”
–“সেটা তো দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”
পরপরই শুধায়,

–“তোমরা কি জানো বাসায় নেটফ্লিক্স কিনেছে কে?”
রোজ পিটপিট করে চেয়ে আর্তনাদ করে উঠল,,
–“নেটফ্লিক্স কিনেছে কেউ? কবে? কই আমায় তো কেউ বলল না। আমি আরও ভাবলাম কিনব।”
তপোবন গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“যে কিনেছে তাকে খুঁজে বের করে কতক্ষণ শাসানো হবে। কিনেছে কিনেছে তা আবার তানশানকে দিয়েছে কেন?”
মৌনতা বলল,
–“আমি তো অনেকদিন দেখি না ভাইজান। আর আপনার মেজো ভাই ও কেনেনি।”
–“তবে এটা নিশ্চিত এরোজ। ওর খবর আছে!”, তপোবন থমথমে মুখে বলল। রূপকথা আর তানশান বেড়াল ছানার ন্যায় গুটিসুটি হয়ে বসে আছে।
খাওয়া-দাওয়া শেষে বা ছেলে উপরে চলে আসে। রূপকথা আবার মৌনতার থেকে দায়িত্ব গুলো নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে। মৌনতার পায়ের ব্যথা ক্রমশই বাড়ছে। সে পুরো ডাইনিং রুম ক্লিন করে, শ্বশুড়ের জন্য খাবার বেড়ে উপরে আসে। আর এই পুরোটা সময় রোজ আর জবা তাকে সাহায্য করে। তবুও সবার প্রচেষ্টা —তাদের মৌন বউ একটু ভালো থাকুক।
রূপকথা টেবিলে বসেই হাঁফ ছাড়ল। তপোবন দেখল ক্লান্ত মেয়েটিকে। বাবা ছেলের বদ অভ্যাস খাওয়ার শেষে মিষ্টি কিছু খাওয়ার। তাই তারা চকলেট খাচ্ছিল।
তপোবন নিজের চকলেটটা থেকে অর্ধেকটা ভেঙে অর্ধাঙ্গিনীকে দিয়ে বলল,

–“নাও, চকলেট খাও।”
বাবার দেখাদেখি তানশান ও নিজের চকলেটের অর্ধেকটা ভেঙে তার মিমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–“নিন, এটাও খান।”
রূপকথার ক্লান্ত মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে দ্বিরুক্তি করে না। চুপচাপ চকলেট মুখে পুরে নেয়। তানশান আর রূপকথা চকলেট শেষ করতেই তপোবনের প্রশ্ন করা শেষ।
সে প্রশ্ন দুটো দু’জনের হাতে দিয়ে বলল,
–“দু’জন যদি পঞ্চাশের মধ্যে পঁয়তাল্লিশের উপরে পেতে পারো —তবে দু’জনের জন্য উপহার রয়েছে।”
রূপকথা আর তানশানের মাঝে আনন্দ দেখাগেল। সে প্রচন্ড আগ্রহের সাথে লিখতে শুরু করলো। সে তো জানে সে পঞ্চাশে পঞ্চাশ পাবে। তপোবন তাদের লিখতে দিয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে হাঁটাহাঁটি করে।
ঠিক সময়েই দু’জনের পরীক্ষা শেষ হয়। তপোবন তাদের অন্য বিষয় পড়তে দিয়ে পেপার দেখল। অবাক হলো রূপকথার মার্কস দেখে। পাঞ্চাশের মধ্যে আটচল্লিশ পেয়েছে। সে কোনাচোখে তাকায় স্ত্রীর পানে। সন্দিগ্ধ গলায় শুধায়,

–“দেখাদেখি করেছো?”
রূপকথার কপাল কুঁচকে গেল মিথ্যা অপবাদে। সে নিজের চেষ্টায় অংক করেছে। সে রাগন্বিত স্বরে বলল,
–“আমি নিজের চেষ্টায় করেছি।”
তপোবন স্ত্রীর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছেলের দিকে তাকায়। শুধায়,
–“সত্যি বলছে?”
তানশানের ও ব্যাক্তিত্বে আঘাত হানলো। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“আমরা কখনোই দেখাদেখি করি না। তুমি মিথ্যা অপবাদ দেয়া বন্ধ করো!
তপোবন চুপসে গেল। দু’জনের পেপার দু’জনের হাতে দিয়ে বলে,
–“তোমরা তো দেখছি উপহার নিয়েই ছাড়বে!”
তানশান রূপকথার দিকে তাকিয়ে শুধায়,
–“কত পেয়েছেন আপনি?”
রূপকথা হাসিমুখে পেপার তুলে দেখালো। তানশানের মুখেও হাসি ফুটে উঠল মায়ের সাফল্য দেখে। মিহি স্বরে বলল,
–“গুড!”

তপোবন ততক্ষণে চারটা চিরকুট বানিয়ে তাতে কিছু লিখলো। দু’টো দু’টো করে দুই হাতের তালুতে নিয়ে ছেলে আর স্ত্রীর দিকে বাড়িয়ে দিল। বলল,
–“যেকোনো একটা পিক করো!”
তানশান রূপকথা বেছে বেছে একটা করে তুললো। রূপকথা চিরকুট খুললে সেখানে লেখা আম্মা আর শুকতারার সাথে দেখা করতে যাবে সে। রূপকথার দৃষ্টি চকচক করে উঠল।
তানশানকে ও খুলতে বলে তপোবন। চিরকুকে লেখা পুরো একদিন নানু বাড়িতে থকবে তারা। তানশান হতাশ হলো এমন উপহারে। সে বলে,
–“আমি তো সেদিন মামার সাথে ঘুরে আসলাম নানুর বাসা থেকে। এটা কোনো উপহার হলো?”
তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–“এটা তোমার নতুন নানুর বাসা, আব্বু। এখানে তুমি কখনো তেমন ভাবে যাওনি সেখানে, যাবে?”
তানশান পিটপিট করে তাকালো বাবার দিকে। বুঝতে পারল বাবা কাদের কথা বলছে। সে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সায় জানায়। রূপকথা চঞ্চল কণ্ঠে শুধায়,
–“আমরা সবাই একসাথে বেড়াতে যাব?”
তপোবন হেসে মাথা নাড়লো। রূপকথা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। সে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“তানশান তোমায় আম্মার হাতে পায়েশ খাওয়াবো। আম্মার রান্না অনেক মজা হয়, তুমি খেয়ে ফিদা হয়ে যাবে।”
তানশান স্মিত হেসে বলল,
–“আচ্ছা।”
তপোবন চোখভরে দেখে ছোট্ট মেয়েটির আনন্দ।

বিগত কয়দিনের তুলনায় আজ এরোজ আরও বিধ্বস্ত অবস্থায় বাড়িতে ফিরল। তার বন্ধুরা তাকে বাড়িতে দিয়ে গিয়েছে বারোটার দিকে। ভাইয়ের সাথে কথা বলার জন্য উদগ্রীব তপোবন আর কথা বলার অবকাশ পেল না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ভাইকে ঘরে শুইয়ে দিয়ে চলে আসে।
লাগাতার দরজা ধাক্কাধাক্কিতে বেহুঁশ এরোজের ঘুম ভাঙে। সে নিভু নিভু দৃষ্টি মেলে এলোমেলো পায়ে দরজার কাছে যায়। বহুকষ্টে জোর খাটিয়ে দরজা খুলতেই আবছা এক হাসিমুখ ভেসে উঠল। মাদকের কারণে অচল মস্তিষ্কটাও সাথে সাথে চিনে ফেলে আবছা মুখটি। সে সাথে সাথে দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল।
নাকে কাপড় চেপে ধরা মৌনতা কাপড় নামিয়ে হাসিমুখে নিজের হাতের ট্রেটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–”ছোট ভাইজান লেবুর শরবত। মাথা ব্যথা কমে যাবে। ঐসব খেয়েছেন মাথা ব্যথা করছে নিশ্চয়ই! এই নিন। আর কিছু ভারী খাবার আছে এখানে। রাতে আপনার খিদে পায় না? এগুলো খাবেন।”
দাঁড়িয়ে থাকতে না পারা এরোজ কোনমতে ট্রেটি দূর্বল হাতে নিলো।
মৌনতা যেতে যেতে আবার উঁকি দিলো। দরজা লাগাতে আসা এরোজ বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,

–“আবার কি চাই?”
মৌনতা বুঝেগেল আজ মাদকের নেশা বড্ডো তীব্র। তবুও যে খারাপ ব্যবহার করছে না এটাই শুকরিয়া।
কিন্তু সে অন্তঃস্থলের লোভ সামলাতে না পেরে ইতস্তত কণ্ঠে শুধায়,
–”ভাইজান আপনার কাছে চকলেট গুলো কি আছে? যেগুলো নায়েলকে দেন। না মানে ও খুব কান্নাকাটি করছে চকলেট খাওয়ার জন্য, তাই বলছিলাম আরকি।”
মৌনতা বোকাসোকা হেসে বলল। এরোজ চোখ তুলে তাকায় মৌনতার দিকে। অস্ফুট স্বরে বলে,
–”চকলেট শেষ হয়ে গিয়েছে। আনলে দেবো।”
–”ওহ্।”, মৌনতা মুখ ছোট করে বলল। এরোজ স্বশব্দে দরজা লাগিয়ে দেয়। অচল মস্তিষ্কে তার ঘুরছে, কই আগে তো কেউ কখনো তার এত খেয়াল নেয়নি! তবে হঠাৎ এত খেয়ালের কারণ কি?
এরোজ দরজা আটকে দিতেই মৌনতা হাঁফ ছেড়ে পা বাড়ায়। সহসা তার গতিরোধ হলো জবার কোলে থাকা নায়েলের সূচালো দৃষ্টি দেখে। সে আলাভোলা হেসে শুধায়,
–”কি হলো মা? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
নায়েল গম্ভীর গলায় বলল,

–“তুমি তো ভালী পঁচা মেয়ে! ছোট পাপাকে মিথ্যা কথা বললে কেন? আমি কখন কান্নাকাঠি কলেছি চকলেটের‌ জন্য? তুমি ব্যাড গার্ল!”
মৌনতা বোকাসোকা চেহারায় লাজুক হাসলো ধরা পড়ে যাওয়ায়। বলল,
–“কতদিন হলো একটা চকলেট খাইনা। আর খেতে পারবে না চকলেট। ছোট পাপার চকলেট শেষ।”
নায়েল হাসিমুখে বলল,
–“তিন্তু আমাল কাছে অনেকগুলো চকলেট আছে। আমি তোমায় একটা দেবো। এসো আমাল সাতে।”
নায়েল জবার কোল থেকে নেমে রোজের ঘরে ছুটলো। সেখানেই লুকিয়ে রেখেছে এরোজের দেয়া এক বক্স চকলেট। চালাকি করে মাকে দেয়নি।
মৌনতা কপাল কুঁচকে মেয়ের পিছু পিছু গেলে অবাক হলো এক বক্স চকলেট দেখে।

–“এগুলো পেলে কোথায় তুমি?”
–“ছোট পাপা দিয়েছে।” নায়েল হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল।
জবাও তাদের পিছু পিছু গিয়ে বলল,
–“আমারে একটা দেবা না নায়েল?”
নায়েল মাকেও দিল, জবাকেও দিল আর নিজেও একটা নিলো। অতঃপর তিনজনে চকলেট খেতে খেতে নায়েল হাসিমুখে গান গাইতে শুরু করল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪০

–“Sharing is caring
Oh, sharing is fun
We can all share together
Be kind to everyone“
মৌনতা মুগ্ধ হয় মেয়ের আচরণে। আলগোছে মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে চোখেমুখে অজস্র চুমু দিয়ে বলে,
–“আমার সোনা মা।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪২