Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৮

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৮

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৮
রুপান্জলি

ঝড় বাদলার সকালে পায়ে হেটে আটতলার ভবনের সামনে এসে দাড়ালো ইরা। অর্ধেকটা রাস্তা রিকশা করে এলেও গতকাল ঝড়ের তোপে রাস্তার মাঝখানে গাছ পরে থাকায় বাকিটা পায়ে হেটেই আসতে হয়েছে। কারেন্ট না থাকায় ফ্লাটটির লিফ্ট ও বন্ধ তাই সিরি বেয়ে চারতলার পথ অতিক্রম করে পাচ তলায় পৌছালো। ৫০৩ নং ফ্লাটে কলিং বেল চাপতেই ওপাশ থেকে দরজা খুলে দিলো কেউ। ইরা ধীরে ধীরে দরজা খুলে ভিতরে উকি দিতেই একজন অচেনা ছেলেকে দেখতে পেলো। বয়স আনুমানিক ২৪-২৫ হবে। ছেলেটা ভ্রু কুচকে ইরার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো — হু আর ইউ? এন্ড হু ইজ ওয়ান্টেড হেয়ার?

,,,ইরা কিছুটা ইতস্তত বোধ করলো।সামনে দারানো ছেলেটার চেহারায় বিদেশি ছাপ স্পষ্ট,, দেখে মনে হচ্ছে আদ্রিয়ানের ভাই হতে পারে। বয়সে বড়ো হওয়ায় ইরা কিছুটা মিনমিনে স্বরে বললো– আমি ইরাদ,, রুমজাহিন ইরাদ। আদ্রিয়ান স্যার বাসায় আছে?
,,,, ছেলেটা বুঝলো সামনে দাড়ানো মেয়েটা বাঙালি তাই অপরিপক্ক বাংলা ভাষায় বললো– হুম!! ভাইয়া রুমেই আছে,, খুবি সিক। আপনি ভাইয়ার স্টুডেন্ট?
,,, হুম!! উনি আমাদের প্রোফেসর,, আমি কি ভিতরে আসতে পারি?
,,, ছেলেটি পথ থেকে সরে দাড়িয়ে ভিতরে আসার জন্য ইশারা করলো। বিদেশি কালচারে বড়ো হওয়ায় বাড়িতে মেয়ে আসা,, রুমে একান্তে দেখা করা কিংবা সর্বোচ্চ রুম ডেইট করা এসব তাদের কাছে স্বাভাবিক তাই এই সময় ইরার আসা নিয়ে কোনোরূপ প্রশ্ন করলো না ছেলেটি। সে নিজের মতো রুমে গিয়ে ডোর লক করে দিলো। ইরা জানে আদ্রিয়ানের রুম কোনটা তাই নিজ উদ্দমে এগিয়ে গিয়ে দরজায় নক করলো। ওপাশ থেকে ঘুম ঘুম কন্ঠে আদ্রিয়ান বললো — ভালো লাগছেনা সিদ্ধার্থ, পরে আয়।

,,, ইরা বুঝলো দরজা খুলে দেওয়া ছেলেটার নাম সিদ্ধার্থ। আদ্রিয়ান হয়তো ভাবছে তার ভাই এসেছে তাই আদ্রিয়ানের ভুল ভাঙাতে ইরা নরম স্বরে বললো — আমি ইরাদ, আসবো?
,,, ইরার কন্ঠ শুনে ল্যাম্প জ্বালালো আদ্রিয়ান,, রুমের দরজা জানালা বন্ধ থাকায় বাহিরের আলো এখনো পৌছাতে পারেনি। পরনের টিশার্ট টা টেনে টুনে ঠিক করে ইরাকে ভিতরে আসার অনুমতি দিলো। অনুমতি পেয়ে ভিতরে এলো ইরাদ,, রুম অন্ধকার দেখে নিজ উদ্দমে ঝানালার পর্দা, থাই খুলে দিলো সাথে সাথে ফুরফুরা শীতল বাতাস এসে দুজনের মুখো বিবরে ছেয়ে গেলো। উঠে বসলো আদ্রিয়ান, ঝানালার পাশে দাড়িয়ে থাকা সেই চিরোচারিত সাদা জামা পরিহিত রমনির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো — এতো সকাল সকাল এখানে কি করছো ইরাদ? কোনো প্রয়োজন?

,,, আদ্রিয়ানের কথায় ফিরে তাকালো ইরা,, সুষ্ঠব মানবের মুখ খানি শুকনো। রাতে জেগে থাকা, কান্নাকাটির ফলে চোখে ডার্ক সার্ক্যালের বসবাস। এতো মলিনতার মাঝেও লোকটার সৌন্দর্য একটুখানিও কমেনি বরং তাকে অন্য রকম সুন্দর লাগছে। ইরাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচালো আদ্রিয়ান,, ইরা ঠোঁটে মৃধু হাসি টেনে বললো— কেনো আসতে পারিনা?
,,, আদ্রিয়ান বিনিময়ে হালকা হেসে বললো — তা পারবেনা কেনো? তেমায় আমি বোন মানি,, ভাইয়ার বাসায় অলটাইম আসতে পারো।
,,, ব্যাথিত হাসলো ইরা, ইসস লোকটা কতো অবলীলায় তাকে বোন মেনে নিলো। এমনটা হওয়া কি খুব দরকার ছিলো? বোন ব্যাতিত অন্য কিছু ভাবাটা কি পাপ? পাপ ই তো,, ইরা তো খ্রিস্টান। অন্য ধর্মের বলেই হয়তো ওকে নিয়ে কিছু ভাবতে পারেনা আদি। ইরা এগিয়ে এসে আদ্রিয়ানের পাশে দাড়াতেই আদ্রিয়ান কিছুটা সরে গিয়ে ইরাকে বসার জন্য ইশারা করে প্রশ্ন করলো– অর্পনার সাথে কথা হয়েছে তোমার? কেমন আছে ও? দ্বীপ মির্জা ওকে কিছু করেছে?

,,, ইরা মাথা ঝাকিয়ে নাকোচ করে বললো — ওর ফোন বন্ধ,, মির্জা বাড়িতে যাওয়া ব্যাতিত ওর খোজ পাওয়ার কোনো ওয়ে নেই। আপনি আঙ্কেলের সাথে কথা বলে দেখতে পারেন, তিনি হয়তো কিছু জানলেও জানতে পারেন।
,,, আদ্রিয়ান ঠোঁট বাকিয়ে ব্যাথিত হাসলো,, চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠলো নিমিষেই। জানালার ফাক গলিয়ে কারেন্টের খাম্বায় বসে থাকা ভেজা কাকটার দিকে নজর স্থির করে বললো — কথা হয়েছে,, আঙ্কেল নিজেও জানেনা অর্পনা কেমন আছে। তবে শাহিন মির্জা নাকি আঙ্কেলকে মির্জা বাড়িতে যেতে বলেছেন সব মনমালিন্যতা দূর করার আশায়। আঙ্কেলের মনোভাব আমি ধরতে পারিনি,, হয়তো মেনে নিবেন। তারপর আমার জানেম একটা সুন্দর সংসার সাজাবে,, তার বাচ্চাকাচ্চা হবে,, আমার জানেমের বাচ্চারা অন্য এক পুরুষকে পাপ্পা বলে ডাকবে। বলতে বলতে আদ্রিয়ানের কি যেনো হয়ে গেলো,, সে দেখতে পেলো অর্পনা দ্বীপের হাটুর উপর বসে আছে আর দ্বীপ অর্পনার চুলের ভাজে মুখ ডুবিয়ে রেখেছে,, তাদের মধ্যে চলছে এক ভালোবাসাময় মুহূর্ত। তখনি মাম্মা!! পাপ্পা!! বলে ডাকতে ডাকতে ছুটে এলো একটা বাচ্চা মেয়ে।

মেয়েটার পরনে পিংক কালারের প্রিন্সেস গাউন,, ছোট ছোট পায়ে রিনঝিন করা নুপুর যা ছুটার তালে তালে বাজছে। মেয়েটা অসম্ভব সুন্দরী একদম অর্পনার মতো। নাদুস নুদুস কিউট মেয়েটা দৌড়াতে দৌড়াতে দ্বীপ আর অর্পনার কাছে এলো। মেয়েটা কাছে আসা সত্তেও অর্পনাকে কোল ছাড়া করলোনা দ্বীপ। খুব সন্তর্পণে অর্পনাকে এক হাটুতে নিয়ে মেয়েটাকে অন্য হাটুতে বসিয়ে দিলো। পরপর চুমু খেলো মা আর মেয়ের গালে। আদ্রিয়ান অসহায়ের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে সবটা,, তার বুক ভেঙে আসছে,, বুকের বাম পাশটা যেনো ছিড়ে যাচ্ছে,, কেউ খামচে ধরেছে হৃদপিণ্ডটা। গলা কাটা মুরগী যেমন মরন যন্ত্রনায় ছটফট করে আদ্রিয়ানের তেমন যন্ত্রণা হচ্ছে। সহসা বিছানার চাদর খামচে ধরলো,,চোখ ফেটে জল গড়ালো। ফোপাঁতে ফোপাঁতে কাতর স্বরে বললো — জানেম!! ও জানেম,, দয়া করোগো। দয়া করে আমায় মেরে ফেলো,, আমি আর পারছিনা,, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে,, বুকে ব্যাথা হচ্ছে আমার। দেখতে পারবোনা এমন দৃশ্য,, মরতে চাই আমি,, একটু নিস্তার চাই। আমায় মুক্তি দাও তুমি,, প্লিজ নিজের হাতে মেরে ফেলো আমায়। জান, জানরে!! তর পায়ে ধরি ফিরে আয়,, আমার ভালোবাসা চাইনারে। তুই শুধু অন্য কাউকে ভালোবাসিস না। অন্য কারোর ভালোবাসা গ্রহণ করিসনা। তকে অন্য কারোর সাথে দেখার যন্ত্রণা সহ্য করার চেয়ে মৃত্যু যন্ত্রণা কবুল করে নিলাম। আমি মরতে চাই আল্লাহ!! ওহ আল্লাহ!! আমার জীবনে করা একটুকরো সওয়াবের বিনিময়ে হলেও আমায় নিয়ে নাও। আমি মানতে পারছিনা জান, জানরে! জানেম!!

,,, শুনলোনা অর্পনা, সে নিজের মতো করে সময় কাটাতে লাগলো তার প্রান প্রিয় স্বামি আর সন্তানের সাথে। আদ্রিয়ান ওদের দেখতে দেখতে চোখ উল্টে এলো, দাতে দাতে খিলি লেগে হাতে পায়ে খিচুনি উঠে গেলো। আদ্রিয়ানের অবস্থা দেখে শব্দ করে কেদে দিলো ইরা। খিচে যাওয়া হাত-পা মাসাজ করতে করতে ফোপাঁতে ফোপাঁতে বললো — আদি!! ও আদি!! কি হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেনো? আদি?
,,, আদির পক্ষ থেকে কোনো উত্তর এলোনা, সে শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে জানেম জানেম করে যাচ্ছে। ইরা একবার আদির হাত তো একবার পা মাসাজ করছে। আবার দৌড়ে গিয়ে দাতের খিলি ছুটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু লাভ হলোনা। দৌড়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো ইরা, সিদ্ধার্থের রুমের দরজায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে বললো — সিদ্ধার্থ!! সিদ্ধার্থ!! প্লিজ ওপেন দ্যা ডোর। তোমার ভাইয়ার অবস্থা ভালোনা,, দ্রুত হসপিটালে কল করো। সিদ্ধার্থ!!
,,, সিদ্ধার্থের উত্তরের আশা করলোনা ইরা, আবার ছুটে গেলো আদ্রিয়ানের কাছে,, যেতে গিয়ে দরজার শক্ত কোনায় ধাম করে বারি খেলো,, বাহুর ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা। কিন্তু সেই ব্যাথাকে পাত্তা দিলোনা। দৌড়ে গিয়ে আদ্রিয়ানের পাশে বসলো। হাত দুটো হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘষতে ঘষতে বললো — আপনার আল্লাহ এর দোহাই লাগে এসব বন্ধ করুন,, অর্পনাকে নিয়ে আর ভাববেন না। ও ঠিক আছে,, ও ভালো আছে,, আমি এখোনি অর্পনার খোজ এনে দিবো। সব আপডেট জানাবো আপনাকে। ও খেয়েছে কিনা, ঘুমিয়েছে কিনা সব জানাবো আদি। একটু ক্ষান্ত হোন না, আদি!!

,, আদির থেকে কোনো রেসপন্স এলোনা,, তার হাত পা বেকিয়ে আসছে,, মুখোভঙ্গি ভয়াঙ্কর, চোখ উল্টে আসছে। ইরার আত্মাটা ছলকে উঠলো। লোকটার কিছু হয়ে যাবে নাতো? হয়ে গেলে সে কি করে বাচবে?
ইরা ফোপাঁতে ফোপাঁতে বললো — আপনার মতো উন্মাদ প্রেমিক আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি আদি,, আর কতো ভালোবাসবেন? আর কত কষ্ট করে ক্ষান্ত হবেন? এ কোন যন্ত্রণায় এসে ফেসে গেলাম আমি? এই শহর ভালোনা, এই শহর দূষিত ,, চার পাশে অপূর্ণতা আর অপূর্ণতা। আর আমি এক অবোধ নারী সেই অপূর্ণতার বেড়াজালে ফেসে গিয়েছি। দম আটকে আসছে আমার,, আদি!” আদি! ”

,, হেলিকপ্টারে গড় গড় শব্দ চমকে উঠলো ইরা।দৌড়ে রুমে এলো সিদ্ধার্থ,, তার কানে ইয়্যার বাড, কার সাথে যেনো কলে আছে,, কাউকে উপরে আসার নির্দেশ দিচ্ছে। এক প্রকার সেকেন্ডের গতিতে রুমে এসে পৌছালো তিনটে লোক। দ্রুততার সাথে আদ্রিয়ানকে তুলে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। ইরাও গেলো পিছু পিছু ,, বারান্দার পাশেই উড়ন্ত হেলিকপ্টার। লোক গুলো সন্তর্পণে আদিকে নিয়ে হেলিকপ্টারে তুলে দিলো। সিদ্ধার্থ বারান্দার রেলিঙে উঠে দাড়িয়ে এক প্রকার লাফিয়ে হেলিকপ্টারে উঠে বসলো,, যেনো সে এই বিষয়টাতে বরাবরি অভ্যস্ত। সিদ্ধার্থ উঠে ইরাকেও যেতে নির্দেশ করলো,, ইরা কি করবে ভেবে পেলোনা। তার ভয় করছে, তার পক্ষে এভাবে লাফিয়ে উঠা সম্ভব না। সময় নষ্ট করলো না সিদ্ধার্থ,, এক পা হেলিকপ্টার আর অন্য পা বারান্দার রেলিঙে রেখে ইরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। আদ্রিয়ানের কথা মাথায় আসতেই কি যেনো হলো ইরার,, কোনোকিছু না ভেবেই সিদ্ধার্থের হাতে হাত রাখলো। এক প্রকার হাওয়ার বেগে ইরাকে টেনে নিলো সিদ্ধার্থ,, ইরা ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে তাকাতেই নিজেকে হেলিকপ্টারের ভিতরে আবিষ্কার করলো। সিটে বসে আদ্রিয়ানের মাথাটা কোলে নিয়ে নিলো। এই মুহুর্তে ইশ্বর ই ভরসা,, ইশ্বর ব্যাতিত কেউ রক্ষা করতে পারবেনা এই বিপদ থেকে।

,,, ঘুমের মাঝেই ফুপিয়ে উঠলো অর্পনা,, চোখ দিয়ে অবাদ্ধ জল গড়াচ্ছে,, বুকের একাংশে খুব ব্যাথ করছে। এমন একটা বাস্তব সপ্ন সে দেখতে চায়নি। এমন কিছু কখনোই আশা করেনি অর্পনা। আদ্রিয়ানের কিছু হবেনা,, হতেই পারেনা। অপমান অবজ্ঞা করেছে তাতে কি? উনি তো মানুষ হিসেবে খারাপ নয়। তার খাটিয়া দেখার মতো সাহস অর্পনার নেই। সে ঘোরের মাঝে থেকেই বালিশ খামচে ধরে সমানে ফুপিয়ে যাচ্ছে। দ্বীপ নামাজ থেকে ফিরে বিছানায় আদ সোয়া হয়ে অফিসের কিছু প্যান্ডিং প্রযেক্ট নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিলো। হঠাৎ অর্পনার ফোপানোর শব্দ কানে আসতেই কোল থেকে লেপটপ সরিয়ে অর্পনার দিকে ঝুকে গেলো। কাধে হালকা করে টান দিয়ে নরম স্বরে বললো — ভেলোরা!!সোনা আমার। কি হয়েছে? কাদছো কেনো? খারাপ সপ্ন দেখেছো? আসো, আমার কাছে আসো।
,,, বলতে বলতে অর্পনাকে কাছে টেনে নিলো দ্বীপ,, অর্পনাও অতশত না ভেবে দ্বীপের কাছে গিয়ে ঠোঁট ভেঙিয়ে ফুপিয়ে উঠলো। দ্বীপ চেয়ে দেখলো সেই কান্না, একদম বাচ্চাদের মতো কাদে মেয়েটা। কান্নার ফলে নাক, গাল, ঠোঁট লাল হয়ে গিয়েছে। দ্বীপ এক হাতে অর্পনার চুলের ভাজে হাত ভুলিয়ে বুকে টেনে নিলো। চুলের ভাজে হাত চালাতে চালাতে বললো — বাহ!! ডিটেকটিব কন্যারা আবার কাদতেও পারে নাকি? এরকম বাচ্চাদের মতো ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাদতে পারে ? এটাতো এক বিরল দৃশ্য বউ,, এরকম দৃশ্য সচারাচর দেখা যায়না। তোমার বাপের জোর দেখাবেনা? আমার পরিবর্তে চোখের পানিগুলোকে শাসিয়ে বলো “” তরা জানিস আমি কার মেয়ে? ডিটেকটিভ আরশাদ জামানের মেয়ে আমি। আমার পাপ্পাকে তো চিনিস না,, আমার চোখে ভির করার অপরাধে আমার পাপ্পা তদের জেল হাজতে নিয়ে ছাড়বে “” বলো, বলে দাও বউ।

,,, কথার মাঝে শুক্ষ খোচা ছিলো যেটা দ্বীপ ইচ্ছে করেই দিয়েছে যেনো বউটা জেদ করে কান্না থামিয়ে দেয় কিন্তু মনমাফিক কিছুই হলোনা। অর্পনার কান্নার তোপ আরও বাড়লো, এবার সিরিয়াস হলো দ্বীপ। বুক থেকে অর্পনার মাথাটা তুলে চোখ মুছে দিতে দিতে বললো — ভেলোরা!! কি হয়েছে তোমার? খারাপ স্বপ্ন দেখেছো? শরীর খারাপ করছে? পেট ব্যাথা করছে? বলনা জান,,এভাবে কাদিসনা। আমার খুব লাগে,, এইযে বুকের বাম পাশে খুব আঘাত করছে তর কান্না গুলো। একটু শান্ত হো,, আমায় বল, কি হয়েছে তর?
,,, অর্পনা ঢোক গিলে নাক টেনে বললো — খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।
,,, বলতে গিয়ে আবারো ফুপিয়ে উঠলো অর্পনা।ওর এহেন অবস্থা দেখে দ্বীপ কিছুটা মজার ছলেই বললো — কি দেখেছো? আমি মরে গিয়েছি?

,,, ভিতরটা কেপে উঠলো অর্পনার, দ্বীপকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো — চুপ চুপ!! কারোর কিছু হবেনা। সবাই ভালো থাকবে। ভালো থাকার তাড়া নেই,, খারাপ থেকে হলেও সবাই বেচে থাকবে। সবাই বাচবে, সবাই!!
,,, কারোর, সবার এই দুটো কথা দ্বীপের কপালে ভাজ ফেললো,, সে অর্পনার দিকে তিখ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো — কি হয়েছে? কি দেখেছিস তুই? তর স্বপ্নে আমি বাধে অন্য কেউ এসেছিলো? অর্পন!! সে সামথিং!! কে এসেছিলো? আদ্রিয়ান? বে*য়াদবের বাচ্চা কথা বল। কে ছিলো তর স্বপ্নে? আমি ছাড়া কাকে জায়গা দিয়েছিস তুই?
,,,দ্বীপের ধমকে সম্ভিত ফিরলো অর্পনার, সহসা দূরে সরে যেতে চাইলো। ওকে দূরে যেতে দেখে আরও রেগে গেলো দ্বীপ। বিছানার সাথে অর্পনাকে চেপে ধরে ওর উপর ঝুকে হিসহিসিয়ে বললো — তর বাস্তবতা থেকে শুরু করে কল্পনা পর্যন্ত সবটা আমাকে ঘিরে হবে। তুই মরতে দেখলেও আমাকে দেখবি,, মারতে দেখলেও আমাকেই মারবি। বিপদ আপদ, ভালো স্বপ্ন- খারাপ স্বপ্ন, আদর- যত্ন সব আমার মাধ্যমে হবে। এমনকি তর মৃত্যুর পর তর ব্রেইন যেই সাত মিনিট জীবিত থাকবে সেই সাত মিনিটেও আমার বিচরন থাকবে। শুধুই আমার,, গট ইট?
,,,দ্বীপের হিসহিসানো কথায় চোখ বন্ধ করে নিলো অর্পনা। লোকটার তীব্র অধিকার বোধ তাকে ভিতর থেকে কাপিয়ে তোলে। ভালোবাসা ছাড়া এতোটা অধিকার দেখানো কি আদেও সম্ভব? হয়তো সম্ভব নয়তো দ্বীপ কেনো এমন করে? এতোটা পসেসিভ কেনো তার প্রতি? অর্পনা বুঝলো এখন সত্যি বললে দ্বীপ আরও রেগে যাবে,, অনার্থক ঝামেলা হবে। এই মুহুর্তে ঝামেলা করার মতো মনোভাব নেই অর্পনার। তাই ঝামেলা মিটাতে কিছুটা মিথ্যা বললো — আমার ফ্রেন্ড সারক্যালের সবাইকে দেখেছি। আমরা কোথাও একটা ঘুরতে যাচ্ছিলাম হঠসৎ গাড়ির মধ্যে আমাদের সবার এক্সি,,

,,, অর্পনার ঠোটে আঙুল চেপে ধরলো দ্বীপ, কিছুটা শাসানো, কিছুটা আতঙ্কিত স্বরে বললো — চুপ!! এসব বাজে কথা আর কোনোদিন বলবেনা। তুমি আজীবন সুস্থ থাকবে,, ভালো থাকবে আর আমাকে ভালোবেসে যাবে। আমি বেচে থাকতে কোনো বিপদ তোমায় ছুতে পারবেনা বউ,, সারাক্ষণ আমার বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখবো তোমায়। কেউ দেখতেও পাবেনা আর ছুতেও পারবেনা, ক্ষতি করা তো দূর।
,,, অর্পনার বলতে ইচ্ছে করলো — বালোবাসা ছাড়া বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখা যায়না দ্বীপ। যেদিন থেকে আমি আপনার হৃদয়ে রাজ করতে শুরু করবো সেদিন থেকে আপনাকে বুঝতে হবে আপনিও আমাকে ভালোবেসে ফেলেছেন। কিন্তু বললো না,, বললে নিজেকে ছেচড়া মনে হবে। কাউকে জোর করে ভালোবাসা বুঝিয়ে তার মুখে ভালোবাসি শুনাটা খুব অপমান জনক। কেউ ভালোবাসলে নিজে থেকেই বাসবে,, স্বীকার করবে সবার সামনে। কোনো ভনিতা ছাড়াই পুরো পৃথিবীর সামনে বলতে পারবে “আমি তোমায় ভালোবাসি ”

,,,,দ্বীপ অর্পনাকে ছেড়ে আবার আদশোয়া হয়ে ওকে টেনে নিজের বুকের উপরে তুলে দিলো। দ্বীপের কান্ডে হকচকিয়ে গেলো অর্পনা, কিছু বলতে নিলে সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না দ্বীপ। এক হাতে কোমর আর অন্য হাতে মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে চুলের ভাজে হাত ভুলাতে ভুলাতে বললো — তোমার রেস্টের প্রয়োজন, আরো ঘন্টাখানিক ঘুমাও,, সময় হলে আমি ডেকে দিবো।

,,,সারা রাত পেট ব্যাথায় ঘুম হয়নি অর্পনার তবে নিজের তৈরি শক্ত আবরনের কারনে প্রকাশ করাটাও হয়ে উঠেনি।সে খুব সহজে নিজের দূর্বলতা সবার কাছে উন্মুক্ত করেনা। হয়তো অন্যদের তুলনায় তার ধৈর্য বেশি তবে সেও দিনশেষে রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। তার উপর কান্না করার ফলে মাথায় ব্যাথা করছে,, এখন মাথায় একটু আদর পেতেই চোখ জুড়ে ঘুমেরা হানা দিলো। মিনিট খানিকের মাঝেই দ্বীপের উন্মুক্ত গলদেশে গরম নিশ্বাস আছড়ে পরলো। দ্বীপ আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তার বউকে। বউটার থেকে দূরে থাকা অসম্ভব,, এমন মায়া মায়া একটা বউ থাকলে কেই বা দূরে সরে থাকতে পারে? এমন পুরুষ আদেও আছে নাকি পৃথিবীতে? আর যদি থেকেও থাকে তাহলে নির্ঘাৎ সে পুরুষ স্বামীর কাতারে পরেনা। এক হাতে অর্পনাকে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে, অন্য হাতে অর্পনার পিঠের ওপর ল্যাপটপটা রেখে, কাজে মনোযোগ দিলো দ্বীপ। এই সারে ছয় বছরে তাদের প্রোফিট যতটা পিছিয়েছে তা এই এক বছরের মধ্যে পূর্ন করবে সে।

তার বাবাকে সুস্থ করে আবারও টপ বিজনেসম্যান হিসেবে দাড় করাবে সমাজের সামনে। যারা যারা তাদের সুখ সাচ্ছন্দ্য কেড়ে নেওয়ার পিছনে ছিলো তারা তো কর্মফল পেলোই। এবার নিজেদের গুছিয়ে নেবার পালা। আর পিছনের দিকে ফিরে তাকানো হবেনা। শুধু পারুটা বাদে,, যদিও পারু কখনোই দ্বীপের অতিত নয়,, অতিত তো তারা হয় যাদের আমরা ভুলে যেতে চেয়েও ভুলতে পারিনা। কিন্তু দ্বীপ তো তার পারুকে ভুলতে চায়না। পারু হচ্ছে দ্বীপের জীবনের এক মিষ্টি অধ্যায়,, যেখানে ছিলো পাঁচটা মাসের অফুরন্ত ভালোবাসা। আর তার বুকে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটা হচ্ছে তার জীবনের সম্পূর্ণ একখানা বই। বই ছাড়া যেমন কোনো অধ্যায় পূর্ণতা পায় না, তেমনি অধ্যায় ছাড়া বইও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।সুতরাং, অর্পনা আর পারু একে অপরের পরিপূরক, একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুজনার ভুমিকা আলাদা আলাদা হলেও গুরুত্ব একই।কেউ কারোর আগে কিংবা পিছে নয়। একজন স্মৃতির মিষ্টতা, আরেকজন জীবনের পূর্ণতা। দুজনের গুরুত্ব মিলিয়ে একজন দ্বীপ মির্জা নামক আখ্যান সম্পূর্ণ হয়েছে। ভালোবাসা দ্বিতীয়বার হয় কিনা জানা নেই তবে অর্পনা দ্বীপের সেই অংশ যেই অংশের জন্য দ্বীপ উন্মাদ হতেও রাজি। শত শত খু*ন, অপরাধ, পাপ করার প্রয়োজন পরলেও নির্দ্বিধায় করে নিবে সে। একটা জীবন ধ্বংস করে হলেও অর্পনাকে নিজের সাথে রাখবে,, নিজের মাঝে আবদ্ধ করবে সারা জীবনের মতো।

,,, কি বেপার সাহেব, এতো দ্রুত ফিরে এলেন যে? অফিসের কাজ বাজ সব চুলোয় দিয়ে বাড়ি চলে এলে হবে? কাজ করতে হবেনা?
,,, মেধার হাস্যরন্জ কথায় মৃধু হাসলো বিহান,, হাতের ফাইল গুলো বিছানায় রেখে কাপর ভাজ করতে থাকা মেধাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। কাটা ছেড়া গালটাতে ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে মোহনীয় কন্ঠে বললো — তোমার কথা খুব মনে পরছিলো তাই জোহানের কাধে সব দায়িত্ব ছুড়ে দিয়ে তোমার কাছে ছুটে এসেছি।
,,, বলতে বলতে ভাজ করা কাপর গুলো অগোছালো করতে চাইলো বিহান, মেধা সহসা হাত ধরে আটকে দিয়ে চোখ রাঙিয়ে বললো — তাই বলে এই দুপুর বেলায়? বিকালে ফিরলেও তো হতো।
,,, বিহান ঠোঁট কামরে হাসলো,, মেধার চুলের ভাজে মুখ ডুবিয়ে বললো– ওহুম!” তোমায় মনে পরেছে এখন,, দেখবো এখন,, ভালোবাসবো এখন,, আদর ও করবো এখন। বিকাল হতে হতে আদর- ভালোবাসা গুলো বাসি হয়ে যাবেনা? তখন বাসি ভালোবাসা পেয়ে তুমি আবার রাগ করবে আর আমি বিহান বউয়ের রাগকে খুব ভয় পাই। তাই নো রিস্ক, অনলি লাভ এন্ড লাভ মাই রানী।

,,,স্বামীর আদুরে স্পর্শে কেপে উঠলো মেধা, আবেশে চোখ বুঝে নিলো। ওরা যখন আবেশের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলো তখনি শুনা গেলো একটা মিষ্টি স্বর,,
,,, মেধাপু!!।
,,, গায়ে উড়নার বার্তি শুতোটা ছিড়তে ছিড়তে মেধার রুমে এসেছে অর্পনা,, এসেই এরকম সিচুয়েশন দেখতে পেয়ে বিরক্তিকর কন্ঠে বললো —দিন দুপুরে এসব কি ঢং হচ্ছে?
,, অর্পনাকে আসতে দেখে মেধা কিছুটা দূরে সরে গেলো। বিহানের সেটা পছন্দ হলোনা। সে সহসা মেধার কাধে হাত রেখে কাছে টেনে বললো– এটাকে প্রেম -মহাব্বত বলে। তুমি বুঝবেনা,, সারাদিন হাসবেন্ডের সাথে ঝগড়া করলে বুঝবে কি করে?

,,, অর্পনা নাক ছিটকে বললো– এটা পেয়ার মোহাব্বতের সময়? আর পেয়ার মোহাব্বত যখন করবেন ই তখন দরজা আটকে নিতে পারতে। ফালতু সব!!
,,, বিহান ঠোট টিপে হেসে মেধার উদ্দেশ্যে বললো — হিংসা , হিংসা!! বুঝলে বউ,, তোমার জায়ের পেট টা ভরা শুধু হিংসা আর হিংসা। তার হাসবেন্ডকে কাজের সাগরে ডুবিয়ে চলে এসেছি তো!! তাই এমন হিংসা করছে। সমস্যা নেই ভাবিজি,, তুমি বললে এখোনি জোহানকে কল করে বলছি চলে আসতে। তারপর নাহয় তোমরাও,,
,,, অর্পনা তর্জনী আঙুল তুলে শাসিয়ে বললো– এইযে দেবর, আপনার ভাইকে আমার রুচিতে ধরেনা। তাই উনার কথা আমার সামনে তুলতে আসবেন না। বেইমান সব,, এই জীবনে সব বেইমানের রুপ আগে থেকে ধরতে পারলেও আপনার বেলায় বড্ড আশ্চর্য হয়েছিলাম। আপনার মতো বেইমানকে কিনা ভাই মেনেছি আমি,, সেইম অন মি।
,,, বিহান মনে মনে ব্যাথিত হলো, তিনদিন ধরে মেয়েটা তার সাথে কথা বলেনা। সামনে দেখলে এড়িয়ে যায়, হয়তো ভাইয়ার উপর খুব অভিমান জমেছে কিন্তু বিহান ওদের ভালোই চেয়েছে। সেদিন যদি দ্বীপকে শায় না দিতো তাহলে দুজন দুদিকে পরে থাকতো। তাই ভালো চাইতে গিয়ে নাহয় সে একটু খারাপ হলো। অর্পনার কথায় পাত্তা না দিয়ে উল্টো পিন্চ করে বললো– রুচি আছে নাকি নেই, দেখলাম তো সকালে।

,,, কি দেখেছেন? ( ভ্রু কুচকে)
,,, কি আবার? ঘুমাচ্ছিলে যে ওটাই দেখলাম।
,,, আপনি কি করে জানলেন?
,,, তুমি এখন যেভাবে আমাদেরটা জেনেছো।
,,, কারোর রুমে ঢুকার আগে নক করতে হয় সেই ম্যানার্স টাও শিখেননি।
,,, এটা তো তোমাকেও বলা যায়, তুমিও তো নক না করেই এসেছো।
,, আমি জানতামনা আপনি এই সময় বাড়িতে পেয়ার মোহাব্বত করতে আসবেন।
,,,আমিও জানতামনা তুমি এতো বেলা করে আমার বড়ো ভাইয়ের বুকে,,
,,, শেষ করতে দিলোনা অর্পনা, দাতে দাত চেপে বললো — আপনারা সবকয়টা বংশগত বে*য়াদব। সামনের সপ্তাহে মসজিদে দশ কেজি মিষ্টি বিলাবো,, বিনিময়ে যদি আপনাদের দু ভাইয়ের মুখের হাল ঠিক হয়।
,,,, বলতে বলতে এগিয়ে গিয়ে বিছানার উপরে রাখা মেধার ফোনটা নিয়ে বাহিরে যেতে যেতে বললো — এটা আবার আপনার ভাইয়ের কানে তোলতে যাবেন না,, আমি আমার পাপ্পার সাথে কথা বলিনা তিনদিন,, পাপ্পার সাথে কথা বলবো।
,,, অর্পনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুখ বাকালো বিহান, ভাইয়ের বউ বোনটার রগে রগে ত্যারামি। একটা কথাও ঠিক করে বলতে পারেনা। পরপরি মেধাকে কাছে টেনে নিলো,, এটা তাদের ভসলোবাসাবাসির সময়, এখন একটু ভালোবাসা যাক।

,,,, একটা জীবন কয়েকটা অধ্যায় নিয়ে পরিপূর্ণ,, একেকটা অধ্যায় একেক সময় তৈরি হয়,, কোনো কোনো অধ্যায় সম্পূর্ণ হয় আবার কখনো মাঝ পথে থেমে যায়। এমনি এক অজানা শঙ্কাজনিত অধ্যায়ের টানাপোড়ে কাহিল রাত্রি। বর্তমানে রাত ১০ টা বেজে ৩৫ মিনিট হতে পারে। বারান্দায় ছোট্ট চেয়ারটায় বসে আছে রাত্রি,, তার দৃষ্টি অদুরে দাড়িয়ে থাকা স্ট্রিট লাইটে স্থির। আজকে আকাশে কোনো চাদ নেই। সকালে বেশ ঝড়-বাদলা হয়েছিলো যার ফলে আজ সারাটাদিন ধরনী মন মরা হয়েই কাটিয়ে দিয়েছে। এখনো সেই মনমরা ভাবটা কেটে উঠতে পারেনি,, হয়তো আকাশে বহমান মেঘ গুলো বৃষ্টি হওয়ার পায়তারা করছে,, ক্ষনে ক্ষনে মৃধু স্বরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অন্য সময় হলে রাত্রি ভয় পেতো,, ভয়ে কাথা মুরি দিয়ে মাম্মার রুমে গিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকতো অথচ আজ তার ভয় হচ্ছেনা। মন চাচ্ছে একটা ভয়ানক বাজ এসে তার মাথার উপর পরুক আর সে চিরো জীবনের জন্য ঘুমিয়ে যাক। এই টানাপোড়েনের জীবন চালাতে ইচ্ছা করছেনা। ইচ্ছা করে নিজের মনে জমে থাকা সকল প্রশ্ন খোলা বইয়ের মতো মেলে দিতে কিন্তু তারও উপায় নেই।

রাত্রি পারবেনা এতো বড়ো বেইমানি করতে,, যে তাকে লালন পালন করলো,, ভালোবেসে এতোটা বড়ো করে তুললো তাকে এমন প্রশ্ন করা যায়না। এতো বড়ো কষ্টটা দিতে পারবেনা সে,, আর এখানে প্রশ্নের ও কোনো মানে হয়না। তার কাছে তো উত্তর আছেই,, শত খুজেও পজেটিভ কিছু পেলোনা। যা পেলো তাতে তার অস্তিত্ব মিথ্যা বলে প্রকাশ পায়। রাত্রির ভাবনার মাঝে ঝমঝম করে বৃষ্টি ঝড়া শুরু হলো। বৃষ্টির আচ্ছাদনেও থমকালোনা রাত্রি,, সে নিজের মতো ভিজতে লাগলো। ধীরে ধীরে বৃষ্টির তোপ বাড়লো,, বৃষ্টির গর্জন যখন আকাশ ছুলো শব্দ করে ফুপিয়ে উঠলো রাত্রি। বারান্দার রেলিঙে মাথা ঠেকিয়ে ফোপাঁতে ফোপাঁতে বললো — সরিরে অরুন, সরি!! তর সাথে বড্ড অন্যায় করেছি আমি। আমার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে খেয়াল রাখা উচিৎ ছিলো,, ভালোবাসা-সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা উচিৎ ছিলো। কিন্তু আমি সেই উচিৎ গুলোকে পাত্তা দেইনি অরুণ। অবেলায় ই ভালোবেসে ফেললাম তকে। আজ বড্ড আফসোস হচ্ছে,, কেনো ঢাবিতে ভর্তি হলাম আমি? কেনো তদের সাথে পরিচিত হলাম? কেনো বন্ধুত্ব হলো? ভালো ছিলাম তো,, একা ছিলাম বেশ ছিলাম। ছোট থেকে একা বড়ো হতে হতে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো তাহলে এবেলায় কেনো এমন হলো? তরা কেনো আসলি আমার জীবনে? আমি একটা পাপ,, আমার আগা গোড়া পুরোটাই পাপ। আর এই পাপ কেউ মেনে নিবেনা,, কোনো সুস্থ ফ্যামিলি কিংবা সুস্থ সমাজ আমায় মানবেনারে,, কেউ মানবেনা,, কোনো মতেই না।

,,, সময় পেরুলো অনেকটা, কাদতে কাদতে ক্লান্ত রাত্রি রেলিং থেকে মাথা তুলতেই নজর আটকালো স্ট্রিট লাইট থেকে কিছুটা দূরত্বে দাড়ানো একটা অবয়বের উপর। সহসা কান্না থেমে গেলো তার,, বৃষ্টিতে ভেজা মুখদ্বয়েই হাত চালিয়ে চোখের পানি মুছার চেষ্টা করলো। রাত্রির চোখ পরতেই সেই অভয়বটি পিছন ঘুরে চলে যেতে লাগলো,, রাত্রির ইচ্ছা করলো দৌড়ে গিয়ে সেই অভয়বটির সামনে গিয়ে দাড়াতে। কে এই স্টকার তাকে চিন্হিত করতে। এমন নয় যে এই অবয়বটা সে আজ দেখেছে। প্রায়সই রাতে বারান্দায় এলে এই পুরুষালি অবয়বের দেখা পায় রাত্রি। গত দের বছর ধরে এমনটা হয়ে আসছে, তবে ইদানীং একটু বেশি ই হয়। সে যখন রাত করে অরুনের সাথে কথা বলায় মগ্ন থাকতো তখন এই অবয়বটিকে দেখা যেতো।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৭

সেই সময়টাতে অভয়বটির হাতে সি*গারেট দেখা যেতো,, সি*গারের আগায় আগুনের লেলিহান ভাব থাকায় সহজেই বুঝতে পারতো রাত্রি। কিন্তু লোকটা কে? কেনো এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে এখানে? কি দেখে তার বারান্দার দিকে তাকিয়ে? রাত্রির তাকিয়ে থাকার মাঝেই ধীরে ধীটে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো অবয়বটি। মিলিয়ে যেতে দেখে তপ্ত নিশ্বাস ফেললো রাত্রি,, তার ধারনা মতে অভয়বধারি তার খোজেই এখানে আসে। হয়তো ভালো টালো বাসে। ভেবেই তাচ্ছিল্য হাসলো রাত্রি,, সে তো নিজের ভালোবাসার মানুষটার ভালোবাসার ই মুল্যায়ন করতে পারেনা,, সেখানে এই অবয়বের কি মুল্য দিবে? রাত্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ,, আর নিষিদ্ধ জিনিসে এতো জোক থাকতে নেই, পস্তাতে হয়।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৯