অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪
তোনিমা খান
তানশানের স্বপ্ন সে ইঞ্জিনিয়ার হবে বাবা-মায়ের মত। তপোবন এবং পূর্বা দু’জনেই আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশুনা করেছে। তাদের মত সেও আর্কিটেক্ট ইন্জিনিয়ার হবে, বিদেশে পড়বে। দাদুমনি বরাবরের জন্যই তানশানের কাছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার একটি মানুষ। নির্জনা বেগম তাকে কাছে নিয়ে আদর করে বুঝিয়ে বলেছেন। তার কি ইচ্ছে হয় না কেউ তার বাবার অসুস্থতায় পাশে থাকুক? তার কি ইচ্ছে হয় না তার বাবা যেমন তার দেখাশোনা করে, খেয়াল রাখে— তেমন খেয়াল তার বাবার ও কেউ রাখুক? তাকে খেয়াল রাখার জন্য তপোবন আছে কিন্তু তপোবনের জন্য কে আছে? সুদীর্ঘ সময়ের বোঝাবুঝিতে তানশান বেশ বুঝলো, দিনশেষে তার বাবার খেয়াল রাখার জন্য কেউ নেই। তবে খুব ইচ্ছে করছিল দাদুমনিকে জোরগলায় এটা বলতে যে, সে আছে তো তার বাবার পাশে।
বাবার খেয়াল রাখার জন্য আজীবন আছে। তবে সেটি আর বলা হয়ে ওঠে না। বরাবরই তানশান অনুভূতি প্রকাশ করতে অপরিপক্ক! বাবার মতো স্বল্পভাষী! মুখাভঙ্গি সর্বদার ন্যায় গম্ভীর-ই হয়ে থাকে। আর সেই গাম্ভীর্যতার আড়ালেই ভার হয়ে আসা অন্তঃস্থলের খবর কাউকে বুঝতে দিল না। বুঝতে দিল না, বাবার পাশে কোন সন্তান তার মা ব্যতীত অন্য কোন নারীকে দেখার চিন্তাও তার মস্তিষ্ককে বিকৃত করে দেয়। বাবার ভাগ কাউকে দিতে চায় না। তপোবন ঠিক বলে তানশানকে সে রূপকথার কাহিনী শুনিয়ে বড় করেনি, বাস্তবতা শিখিয়ে বড়ো করেছে। আর তানশান বাস্তবতা বোঝে। আবেগ দিয়ে জীবন চলে না, একা থাকাও যায় না। তাই বাস্তবতাকে আঁকড়েই তানশান মৃদু হেসে রাজি হয়ে যায়। তবে সেই জোরপূর্বক হাসির মাঝে লুকিয়ে থাকা ক্লেশ মোটেও দৃষ্টিগোচর হয়নি নির্জনা বেগমের। দিনশেষে তপোবন যেমন চায় তানশান ভালো থাকুক, তেমনি তানশান ও চায় বাবা ভালো থাকুক। কেন সে স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যই দেখে যাবে? আসুক না বাবার সাদামাটা একাকী দুনিয়াতে একটু পরিবর্তন!
মায়ের সাথে দীর্ঘ এক দ্বন্দ্বে এবার হেরে গেল তপোবন। মায়ের শেষ কথা ছিলোষ তপোবন সিকদার স্বার্থপর হতে পারে না। চ্যারিটির বিয়েতে রাজী হয়েছে সে। এখানে যখন কারো ভালো লুকিয়ে আছে তবে কেন নয়! তার জন্য কারোর জীবন সহজ হয়ে গেলে তার কোন আপত্তি নেই। ক্ষণিকের মাঝেই পুরো বাগেরহাট ছড়িয়ে গিয়েছে তার বিয়ের খবর।
তখন বিকাল চারটা। এক বিতৃষ্ণা ভরা অস্থিরতা আঁকড়ে তপোবন দ্রুতকদমে নিজের ঘরের দিকে যায়। কামড়ায় ঢুকতেই ব্যাগ ঘাঁটতে লাগল, প্রবল আকাঙ্খিত মুখটি যে না দেখলে এই অস্থিরতা কমবে না।
–“পাপা আসবো?” ,তানশানের কন্ঠে তপোবন অনুপলের মাঝে নিজের মুখের দশা পরিবর্তন করে গম্ভীর মুখ ধারণ করে। পেছনে না ফিরেই বের করা পোশাক গুলো আবার ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে অনুমতি প্রদানে বলে,,
–“এসো।”
তানশান এগায়ে আসে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে হাতের রাফ খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“তুমি যেই ম্যাথগুলো করতে দিয়েছিলে সেগুলো অর্ধেক করতে পেরেছি, বাকি অর্ধেক পারিনি। বাকিগুলো তোমার শেখানো নিয়মের ব্যতিক্রম।”
তপোবন খাতাটা হাতে নিয়ে দেখলো না। গম্ভীর গলায় বললো,
–“বাকিগুলো কাল করিয়ে দিচ্ছি। এখন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব আমার হাতের কাছে এনে দাও, ব্যাগ গোছতে হবে; সন্ধ্যার পরপরই আমরা বেরিয়ে পড়ব খুলনার উদ্দেশ্যে।”
তানশান কিছুটা অবাক হলো বাবাকে নিরুদ্বেগ দেখে। বাবাকে কি এখনো দাদুমনি কিছু বলেনি যে সন্ধায় বিয়ে। তার কৌতুহল জাগে।
–“কেন, নতুন মাকে আনতে যাবে না?”
সরব অন্তঃস্থলে কাঁপন ধরলো তপোবনের। এ কি বিদঘুটে পরিস্থিতি। দৃষ্টিদ্বয় কেমন নির্জীব ফ্যাকাশে বেরঙ ধারণ করল। কর্নদ্বয়ে ভাসতে লাগলো কারোর চঞ্চল চটপটে হুমকিস্বরূপ কন্ঠ –“তপু তোকে যদি কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতে দেখি না—তবে তোর চোখ দুটো উঠিয়ে গাঙ্গের জলে ভাসিয়ে দেবো।”,
তপোবন তখন গা দুলিয়ে হেসে বলতো
–“পূর্বার থেকে দৃষ্টি সরানোর ক্ষমতা আগে আয়ত্ত করে নেই, তারপর নাহয় অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকাবো।”
কোথায় গেল সেই মধুর মুহূর্ত গুলো! আজ কেন নিজের সন্তানের সম্মুখে এই বিদঘুটে পরিস্থিতিতে সে? সে কখনো ক্ষমা করবে না পূর্বাকে। তাকে আর তার ছেলেটাকে এভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বিদঘুটে পরিস্থিতির সম্মুখীন কেন করাচ্ছে? চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। ছেলের দিকে চোখ তুলে তাকায় তপোবন। বরাবরের মতোই গম্ভীর নিরুদ্বেগ কন্ঠে এক চরম বাস্তবিকতা তুলে ধরে বলে,
–“সম্মোধনের শেষে মা ডাক যুক্ত করেছ ঠিক আছে, কিন্তু তাই বলে তাকে মায়ের জায়গায় বসিয়ে মাতৃত্ব খুঁজতে যেও না তানশান। জন্মদাত্রী ব্যতীত কেউ কখনো মা হয় না। তোমার মা পূর্বা সিকদার। অন্য কারোর থেকে মায়ের ভালোবাসা আশা করতে যেও না। আমি চাই না তোমার আশা, চাওয়া দুমড়েমুচড়ে যাক, তুমি কখনো কষ্ট পাও। আশা করি বোঝাতে পেরেছি। ”
তানশানের দৃষ্টি নত হয়ে আসে। এই সম্মোধন সে নিজে যেচে করেনি। দাদুমনি তাকে এই সম্মোধনে ডাকতে বলেছে। বাস্তবতাকে আঁকড়ে যখন বাবাকে ভাগ করতে পারছে, তবে মা ডাকতে কি সমস্যা? তাই সে প্রতিক্রিয়া হীন এই ডাকটিকেও গলধঃকরন করে নেয়। নয়তো কোন সন্তান চায় নিজের মায়ের জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে। তানশানকে নত মস্তকে নম্র কন্ঠে বলল,,
–“সরি পাপা।”
তপোবন সেই দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে গম্ভীর গলায় বলল,,
–“নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমার কাছে এনে দাও।”
তানশান নিরবে ঘরের এদিক ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাবার কাছে এনে দিতে লাগল। আর তপোবন সেগুলো ব্যস্ত হাতে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিচ্ছে।
বিকাল পাঁচটা গড়াতেই সিকদার বাড়ি মৃদু আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে উঠল। নির্জনা বেগম স্বল্প সময়ের ব্যবধানে যতটুকু পেরেছে বিয়ের জন্য কেনাকাটা করেছে। রোজ, মৌনতা, নায়েলের আনন্দের শেষ নেই। মৌনতা খুব খুশি, বড় ভাইজানকে জীবনটা গুছিয়ে নিতে দেখা তার সুপ্ত এক চাওয়া ছিল। নির্জনা বেগম এবং মেজো গিন্নি, তাদের কথা তারা কোনরকম বিয়ে পড়িয়ে বউ নিয়ে চলে যবে। সেখানে যেনো এক কাপ চায়ের ও ব্যাবস্থা না করা হয়। পরিপ্রেক্ষিতে নিলীমাকেও প্রতিক্রিয়া হীন দেখা গিয়েছে। অন্তঃস্থলে দীর্ঘশ্বাস তাদের মতো নিচু জাতের মানুষের বাড়িতে এক কাপ চাও বোধহয় সিকদার বাড়ির লোকদের মুখে রুচবে না। নিচু জাতের মেয়েকে বাড়ির বউ করে নিতে পারবে কিন্তু একটু খাবার মুখে নিতে পারবে না? এমনি কিছু দ্বন্দ্ব চলছিলষ তার অন্তরালে যেটা নিছকই তার মনের ভ্রান্তি বলে মনে হলো।
তকদির সিকদার ও মহাখুশি ছেলে বিয়ের জন্য রাজি হয়েছে শুনে। এতোবছরে এসে ছেলে জীবনকে দ্বিতীয় বার সুযোগ দিতে রাজি হয়েছে ,বাবা হিসেবে তার জন্য এর থেকে খুশির সংবাদ আর কিছু হতে পারে না। সন্ধ্যায় সিকদার বাড়ির সকলে পৌঁছায় বস্তির শেষ প্রান্তে শুনশান জায়গায় মৃদু কূপির আলোয় আলোকিত ভাঙাচোরা ঘরটিতে। সকলে বেশ অপ্রস্তুত হয় এমন পরিবেশে। রোজ আর মৌনতা’র এসব অর্থবিত্ত, সামাজিক অবস্থান নিয়ে কোন উদ্বেগ নেই। তারা সবকিছুতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। তারা প্রফুল্ল চিত্তে হুড়মুড়িয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে যায়।
বড় ঘরের এক কিনারায় জানালার ধারে নিরবে বসে ছিল রূপকথা। পড়নে একটা সোয়েটার। এতো দিন রাতের আঁধার নামলেই যে ভয় জেঁকে বসতো, তা আজ আর বসলো না। বরং আজ নির্বিঘ্নে অন্ধকার দেখছে সে। তার জীবনটাও কিছুক্ষণ পর থেকে এমনি রঙ ধারণ করবে।
–“রূপকথা কোথায়? তুমি কি ওর ছোট বোন? তোমার বড়ো বোন কোথায়?” ,কারোর চঞ্চল আনন্দমুখর কন্ঠে রূপকথা ম্লান দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মৌনতার হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে। গতরে দামী শাড়ি এবং অলংকারে আবৃত এক সুন্দরী রমনী। চোখেমুখে সুখ আভিজাত্যের ছোঁয়া। আসলেই কি তাই? মানুষের এই চাকচিক্যের আড়ালে কি সবসময় সুখ ই থাকে? জবাব পেলো না রূপকথা। অবিচলিত থেকেই মিহি স্বরে বললো,
–“আমি। আমিই রূপকথা।”
–“হ্যাঁ?” ,রোজ আচমকা চেঁচিয়ে উঠল। সহসা মৌনতার হাসিমুখটি নিভে গেল। রোজ আর মৌনতা হতভম্ব দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকায়। কেননা তার ধারণামতে রূপকথা যে রোজের থেকেও ছোট। রোজ এখন অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে। তারা দু’জনে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায় বাইরে চেয়ার পেতে বসে থাকা নির্জনা বেগমের দিকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই নির্জনা বেগম সন্তপর্নে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে গাম্ভীর্যতা আঁকড়ে বসে রইল। মৌনতা পারলো না চুপ করে থাকতে। সে নিজেও তো একটা মেয়ে। সে তড়িৎ গতিতে ছুটে যায় শাশুড়ির কাছে। শাশুড়ির কাছে গিয়ে চাপা স্বরে মৃদু আবাক কন্ঠে শুধায়,,
–“আম্মা এসব কি? রূপকথা তো ছোট একটা মেয়ে! কোথায় বড়ো ভাইজান আর কোথায় বাচ্চা একটা মেয়ে? আপনি সব জেনেশুনে এই মেয়ে কি করে ঠিক করতে পারেন ভাইজানের জন্য?”
নির্জনা বেগম গম্ভীর, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মেজো বউমার দিকে। রুক্ষ কন্ঠেই তেজ দেখিয়ে বললেন,,
–“আমি কাউকে জোর করে রাজি করাইনি এই বিয়েতে। তারা নিজেরা রাজি হয়েছে। তারা জীবন মরনের সংগ্রামে রয়েছে। আর এই যেই পরিবেশ দেখছো, এই পরিবেশে কোন ভালো চাকরি ওয়ালা বংশীয় পরিবারে তো মেয়ে বিদায় করতে পারবে না তারা। সেটা জেনেই তো তারা হাসতে হাসতে রাজি হয়ে গিয়েছে। তুমি আর এর মধ্যে নাক গলাতে যেও না, চুপচাপ গিয়ে সাজাও আর সিকদার বাড়ির জন্য উপযুক্ত এক রূপ দাও।”
–“তবুও আম্মা, কারোর অসহায়ত্ব’র সুযোগ এভাবে একটা জীবন নষ্ট করে নেয়া কি উচিৎ? আমরা চাইলেই তো তাদের অন্যভাবে সাহায্য করতে পারি। আব্বুজান তাদের জন্য কিছু করতে পারে।”, মৌনতা জোরালো কন্ঠে বলল। সে আগেই থেকেই শুনেছে রূপকথাদের দূরাবস্থার কথা। তবে এখন যা দেখছে তাতে এতোটাও নয় —যে তার শশুর তাদের সাহায্য করতে পারবে না।
নির্জনা বেগম চুপসে গেল। মেজো গিন্নি মৃদু তেতে উঠল। সব ঠিকঠাক চলছিল এই মেজো বউ যদি এখন ঝামেলা সৃষ্টি করে? সে ব্যাগ্র কন্ঠে বললেন,
–“মেজো বউ তুমি কি একটু বেশি নাক গলাচ্ছো না? তপোবন এতো কষ্টে এইবার রাজি হইছে শুধু এই দূরাবস্থার কথা চিন্তা কইরা, তুমি চুপ কইরা নিজের কাজ করো গিয়ে। এইসব বিষয়ে নাক গলানোর জন্য তোমারে এইখানে আনা হয়নাই।”
–“কিন্তু আম্মা আপনি…”
–“তুমি আমার উপর থেকে কথা বলার চেষ্টা করছো, মেজো বউ!”, নির্জনা বেগম চাপা গর্জে উঠল। মৌনতা নিরব হয়ে যায়। সে হতবাক হয়ে গেল শাশুড়ির এহেন আচরনে। শাশুড়ি নামক এই মানুষটাকে সে চেনে, খুব ভালো করেই চেনে। মানুষটা অনেক কঠোর তবে নিষ্ঠুর নয়। এতোদিন কি তবে ভুল জানতো সে?
তাদের বারন করা সত্ত্বেও নিলীমা নিজের মনের প্রশান্তির জন্যই কিছু সরবত আর মিষ্টান্ন’র আয়োজন করেছিল। সামনে পরিবেশন করলেও কেউ ছুঁয়ে ও দেখল না। নিলীমা ফ্যাকাশে মুখটি নিয়ে দেখে অদূরে কাজীর এবং তকদির সিকদারের পাশে বসা তানশান এবং তপোবন সিকদারের দিকে। সে ধীরপায়ে তানশানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তানশান চোখ তুলে তাকায়। নিলীমা মৃদু হেসে মিষ্টির প্লেটটা এগিয়ে দিলে তানশান একপলক তাকায় বাবার গম্ভীর মুখটির দিকে। বড়দের অসম্মান করা বাবা বরদাস্ত করে না, আর না সে অসম্মান করে। বাবা সবসময় বলে সে যদি কোন খারাপ কাজ করে তবে তার শাস্তি তার বাবা মায়ের পেতে হবে। অপ্রস্তুত সে সৌজন্য হেসে এক টুকরো মিষ্টি হাতে তুলে নিয়ে নম্র কন্ঠে বলল,,
–“ধন্যবাদ।”
নিলীমা মৃদু হেসে মিহি কন্ঠে বললো,
–“অনেক বড় হও।”
তানশান সৌজন্য হাসি দিল। নিলীমা এক পলক তপোবনের দিকে তাকিয়ে চলে আসে। সে এক ধোঁয়াশাময় মুহুর্ত কাটিয়ে, অন্দর এবং বাহিরে বসা দ্বিমুখী দু’জন মানুষ কবুল বলে যখন দ্রুত বিদায়ের তাগিদে গাড়িতে উঠতে গেলো তখন, তপোবন সহ তকদির সিকদার হতবাক হয়ে গেলো— যখন গাড়ির কাছে বধূসাজে নিতান্তই অল্পবয়সী একটি মেয়েকে আনা হয়। তপোবন অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো মায়ের দিকে। মনে পড়ে মায়ের সাথে দুপুরের কথোপকথন। পাত্রীর বয়স জিজ্ঞাসা করলে নির্জনা বেগম দৃঢ় কন্ঠে বলেছিলো,
–“তোমার অযোগ্য নয়, চিন্তা করো না। ”
তকদির সিকদার ও ঠিক একই কথা জানে। সে যখন জিজ্ঞেস করেছিল পাত্রী কি তপোবনের সম্পর্কে সব জানে? পাত্রীর বয়স তপোবনের বয়সের সাথে সামঞ্জস্য আছে তো? নির্জনা বেগম তখনো বলেছিল, সামঞ্জস্য না থাকলে তো আর সব জেনেও তারা এতোবড় সিদ্ধান্ত নেয়নি। নির্জনা বেগম স্বামী এবং ছেলে উভয়ের হতভম্ব দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে গম্ভীর গলায় সকলকে তাড়া দিলো।
–“সকলে এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে গাড়িতে ওঠো। শীতের রাত বাড়িতে পৌঁছাতে হবে তাড়াতাড়ি।”
তপোবন আকস্মিকতা হজম করতে পারল না। সে অস্থির কন্ঠে মৃদু গর্জে উঠল,
–“আম্মা?“
–“যা কথা বলার বাড়িতে গিয়ে বলব, তপোবন।”, ছেলের গর্জন উপেক্ষা করে নির্জনা বেগম গম্ভীর গলায় এতোটুকু বলে গাড়িতে উঠে বসে। নিলীমা, শুকতারা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছে মেয়ের প্রতিক্রিয়াহীন কঠোর মুখটির দিকে। মেয়ের গায়ে শোভা পাচ্ছে দামী শাড়ি ও অনেকগুলো অলংকার। বড়ো গিন্নি অহংকার নিয়ে বলেছে এগুলো বিনাপ্রস্তুতিতে দেয়া হয়েছে বাড়িতে গেলে আরো গহনা দেয়া হবে। সিকদার বাড়ির বড় বউ বলে কথা! নিলীমা ম্লান হাসলো মেয়ের চোখদুটোতে এক ফোঁটা অশ্রুর আনাগোনা নেই দেখে। সে চুপচাপ কাঠের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এই পুরোটা সময় একটাবারও মায়ের মুখটির দিকে তাকায় নি সে। নিলীমা ধীরপায়ে এগিয়ে আসে রূপকথার কাছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ম্লান হেসে বলল,
–“জানি মায়ের ওপর তোর অনেক অভিমান। কিন্তু আমার কোন দুঃখ নেই জানিস? তুই অভিমান আঁকড়ে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও আমার দুঃখ লাগবে না। কারণ আমি তো মা! আমি এতোটুকু জানি আজ থেকে আমার মেয়ের ওপর কোন বিপদ থাকবে না, আমার কথা ভালো থাকবে, তিনবেলা পেটভরে খাবার খেতে পারবে, এটা ভালো পরিবেশে নির্ভয়ে থাকবে; এটাই আমার সুখ। সকলের কথা শুনে চলিস দেখবি সকলে তোকে ভালোবাসবে।”
রূপকথা চোখ তুলে তাকায় মায়ের দিকে। নিরুত্তর মৃদু হাসল সে। মিহি স্বরে বলল,
–“আজ থেকে তোমার বোঝা কমে গিয়েছে আম্মা, তুমি ভলো থেকো। শুকতারাকে তিন বেলা পেটভরে খেতে দিও, এখন তো আর আমি থাকবো না। এখন তো আর আমি তোমার হাতের মজাদার ডাল লেবু চিপে খেতে পারব না। তোমার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবো না। এটাই তো তুমি চাইছিলে তাই না? তোমার কাছে যেটা ভালো থাকা আমার কাছে সেটা আজাব। আর আমার কাছে যেটা আমার ভালো থাকা, সেটা তোমার জন্য বোঝা। কি অদ্ভুত দুনিয়া তাই না? যাও যাও তোমরা ঘরে যাও, বোঝাকে এতো কেঁদেকেটে বিদায় দিতে নেই।”
বলেই রূপকথা কয় কদম সরে আসে মায়ের থেকে। বোনের সমনে এসে একটু নুইয়ে তারার গালদুটো আঁকড়ে ধরলো রূপকথা। বোনের দুইগালে চুমু দিয়ে বললো,
–“মা আমায় ভুলে গেলেও তুই আমায় ভুলে যাস না, তারা। ভালোকরে পড়াশুনা করিস। একা একা কোথাও বের হবি না বুঝেছিস? আপা থাকব না, তোকে দেখে রাখতে আম্মার কষ্ট হয়ে যাবে।”
শুকতারা কথা বলতে পরলো না। সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো বোনের কোমড় জড়িয়ে ধরে।
–“আপা যাসনা, আমি একা একা থাকবো কি করে? তোকে জড়িয়ে ধরে না ঘুমালে যে ঘুম আসে না।”
তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে ধরে রূপকথা বোনের থেকে সরে আসে। সকলে যে যার গাড়িতে উঠে বসেছে। দুটো গাড়িতে একে একে সকলে উঠে বসল, বাকি রইল তপোবনের গাড়ি। যেখানে পরিবারের অন্য কোন সদস্য ঢোকেনি। তপোবন নির্বাক স্তব্ধ হয়ে একবার তাকিয়েছিলো রূপকথার পানে এরপর আর তাকাতে পারেনি। নিলীমা তপোবনের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালে তপোবন মৃদু নড়েচড়ে উঠল। চরম এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির থেকে পালাতে চাইল সে। সে কোনরকম কম্পিত কন্ঠে বলল,
–“ছোট চাচাজান আপনাদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাবে। ”
–“আমার মেয়েটার খেয়াল রাখবেন। ও যদি কোন ভুল অরে তবে ক্ষমা করে দেবেন।” , নিলীমার কথার প্রেক্ষিতে তপোবন বহুকষ্টে হু উচ্চারণ করে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দেয়। রূপকথা সেদিকে উদাসীন বেখেয়ালি দৃষ্টিপাত করে নিরবে উঠে বসলো। তপোবন ও গাড়ির ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে। তানশান অনেক আগেই ফ্রন্ট সিটে বসেছে। তপোবনের ছোট চাচা, মেজো চাচা ,মেজো চাচি হাসিমুখে সকলকে বিদায় দেয়। মেজো গিন্নি তো বিজয়ের উল্লাসে বিদায়ের সময় সকলকে বারবার বলছিলো সকলে জিতছে তার কারণে।
ক্ষীণ সময়ের ব্যাবধানেই নিলীমার দৃষ্টি সীমানায় রূপকথা অপম্রিয়মান হয়ে গেল। একটা সময় রূপকথার আর দেখা পাওয়া গেল না। রূপকথা চলে যেতেই নিলীমা এবং শুকতারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। থেকে যাওয়া সিকদার বাড়ির সকলের সাথে তারাও রওনা হয় এক অনিশ্চিত জীবন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। নির্জনা বেগম সকলকে বলে গিয়েছে তাদের মা মেয়ের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। নিলীমার মনে প্রশ্ন জাগল, না করতে পারা এক প্রশ্ন! আচ্ছা তারা কি পারতো না রূপকথার বিয়ে ব্যতীত তাদের সাহায্য করতে? তবে গল্পটা অন্যরকম হতো। অন্যরকম হতো তাদের জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার সংগ্রামটা। তারা তিন মা মেয়ে একসাথে লড়তো। নিলীমার জীবনটা তার কাছে দীর্ঘশ্বাস হয়ে থেকে গেল কেন? হাসিমুখে কারোর হাত ধরেছিল সে, যে তাকে মাঝপথে একা ফেলে নির্জন রাত্রির অন্ধকারের ন্যায় মিলিয়ে গিয়েছে। কষ্ট করে মেয়ে দুটোকে বড়ো করল অথচ দেখো আজ রূপকথা তার কথাও কেমন জীবনের টানাপড়েনে অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে তো জীবন সহজ মনে হলেও, তার অবস্থানে যদি কেউ থাকতো—তবে বলতে পারতো না, মা হয়ে নিজের মেয়েকে আধবুড়ো এই লোকটির সাথে বিয়ে কিভাবে দিতে পারলো? দূরে বসে তো কত কথাই বলা যায় কিন্তু যে এই পরিস্থিতিটা অতিবাহিত করে, সে জানে কতোটা দুঃসহ এই পরিস্থিতি।
বাগেরহাট থেকে খুলনা যেতে প্রাইভেট কারে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের অধিক সময়ের প্রয়োজন হয় না। শীতল হাওয়া থেকে বাঁচতে গাড়ির কাঁচ তুলে দেওয়া। গাড়ির পরিবেশ জুড়ে কেমন উষ্ণ নিঃশ্বাস, অস্থিরতার আভাস। ভ্যাঁপসা নিস্তব্ধ পরিবেশ কেমন অস্বস্তিকর ঠেকলো তানশান এবং তপোবনের কাছে। বাবা ছেলে স্বল্পভাষী গম্ভীর হলেও, যাত্রাকালে বাবা ছেলে কথার ফুলঝুরি নিয়ে বসে। তবে আজ ঠিক তার উল্টো। কেউ কারোর দিকে একবার তাকালো না পর্যন্ত। তানশান ও অস্বাভাবিক ভাবে নিরব হয়ে গিয়েছে এবং তপোবন ও। বাবা ছেলের অস্বস্তি আরো বাড়িয়ে দিয়ে গাড়ির মধ্যকার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হয় দৈবাৎ কারোর ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার শব্দে। বাবা ছেলে দু’জনেই সচকিত হয়; তবে কারোর মধ্যে কোন উদ্বেগ দেখাগেল না। বরং এই কান্নার আওয়াজ তানশানের মাঝে একটি কথার উদ্ভব করে, তার বাবা আর তার মাঝে এখন তৃতীয় ব্যাক্তির স্থান রয়েছে আর থাকবে। তেমনি তপোবনের মনে উদ্ভব ঘটে অনুশোচনা, রাগ, অস্বস্তির। তার মা চাচি মিলে যে একজনের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছে এবং একটা যুবতী মেয়েকে ঝুলিয়ে দিয়েছে তার মতো বুড়ো এই মানুষটার সাথে। যেখানে তার ছোট ভাই এখনো অবিবাহিত সেখানে সে কিভাবে? মা কি করে পারল? তার উচিৎ ছিল আগে খোঁজখবর নেওয়া কিন্তু সে তো আশাকরে নি মা এমনকিছু করতে পারে! মেয়েটি তো তার ছোট ভাইয়ের যোগ্য। রাগে বিষিয়ে আসলো তপোবনের অন্তঃস্থল। কান্নার ঐ শব্দ ও তার মধ্যে তিরস্করের সৃষ্টি করছে। তবে তপোবন হয়তো বুঝতে পারল না— তার মতো তানশান ও নিতে পারছে না এই কান্নার শব্দ। তাই তো বাবা ছেলে দু’জনেই প্রবল বেগে গাড়ির সামনে রাখা এয়ার ফোনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তানশান, তপোবন হকচকালো একে অপরের হাতের উপর হাত দেখে। তপোবন সন্তপর্নে নিজের হাতটি সরিয়ে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩
–“নাও।”
তানশান মাথা নেড়ে এয়ার ফোনটি বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“না না আমার প্রয়োজন নেই, তুমি নাও। তোমার মাথা ব্যাথা করবে।”
–“করবে না তানশান, তুমি নাও। পাপার প্রয়োজন নেই।”
তানশান আর দ্বিমত করলো না। নিজেই এয়ার ফোনটি কানে গুজলো।
রূপকথা প্রাণপনে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে। মা, বোনকে নিয়ে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এর আশা ভরসা সে ছেড়ে দিয়েছে। এখন শুধু একটাই চাওয়া তার মা বোন সুস্থ সবল থাকুকু। তাকে তো পাঠিয়ে দিয়েছে নিরাপদ স্থানে, তারা কিভাবে থাকবে? কিভাবে বাঁচবে এই কঠিন পৃথিবীতে।
