অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫
তোনিমা খান
জীবন বড়োই অদ্ভুত। আমি কি চাই, না চাই সেটা মূল বিবেচ্য বিষয় না হলেও ভাগ্য কি চায় এটা মূল বিবেচ্য বিষয়। সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা বুঝতে পারবে এমন ক’জন আছে? আপনি, আমি আগামী দশ বছরের চিন্তা করে রাখলে, উপর ওয়ালা গোটা জীবনটার হিসেব নিকেশ করে রাখে। তাই ভাগ্য যেতে চায় বামে, আপনি যেতে চান ডানে— এক্ষেত্রে আপনার অভিপ্রায়কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য হতে দেখা যাবে। তবে নিশ্চয়ই সেটা আপনার জন্য ভালো কিছু বহন করবে। সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস আছে না?
আছে, সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস আছে বলেই তো রূপকথা নিজের জীবনের সকল যুদ্ধকে সাদরে গ্রহন করেছিল। লড়াই করতে চেয়েছিল তবে ময়দানে নামার আগেই তাকে পরাজিত ঘোষনা করে দিল। আসলেই কি রূপকথা পরাজিত নাকি সৃষ্টিকর্তা তাকে সফলতার এক অন্য পথে ধাবিত করেছে?
গাড়ি দু’টো থামে আরেকটি আলিশান দালানের সামনে। দানবাকৃতির গেটের পাশে গোটা গোটা অক্ষরে খোদাই করে লেখা একটি নাম “সরোবর।” এটি বাড়িটির নাম। দানবাকৃতির গেইটটি পেরিয়ে গাড়িটি ভেতরে ঢুকে গেলে একে একে সকলে বেরিয়ে পরে। নিঃসাড় অনুভূতি শূন্য দেহ নিয়ে ঝিমুনি দিয়ে বসে থাকা রূপকথার ধ্যান ভাঙল নিজের পাশের দরজাটি খুলে যেতেই। একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিল সাদা পাঞ্জাবি আবৃত বিশালদেহী মানুষটির দিকে। একহাতে দরজা খুলে পিঠ দেখিয়ে উল্টোদিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। পৃষ্ঠদেশের অবয়ব ক্ষণ পরিচিত লাগলেও এই মুহূর্তে রূপকথার মস্তিষ্ক শূন্য। সে নিরবে ভারী আভুষন সামলে ধীরস্থির পা রাখে বাইরে। দুই পা বাইরে রেখে দাঁড়াতে গেলেই মেয়েটি শাড়ির ভাঁজে পা আঁটকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে গেল। সরব মেয়েটি ভয়ার্ত কন্ঠে মৃদু আর্তনাদ করে উঠল,
–“আল্লাহ!”
রূপকথা ভেবেছিল এযাত্রায় বিবর্ণ মুখটি আরো বিকৃত হয়ে যাবে মাটির সাথে তীব্র সংঘর্ষে। তবে রূপকথা বোধহয় এখনো বুঝতে পারেনি সৃষ্টিকর্তার মনমর্জি। রূপকথা মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল না বরং দু’টো হাত তাকে আঁকড়ে ধরে পড়ে যাওয়া থেকে আটকায়। রূপকথা আ’ত’ঙ্কিত চোখ দুটি তুলে নিজের বাম পাশে তাকাতেই দু’টো বিড়াল চোখে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। সর্বদা বিলবোর্ডে দেখা লোকটিকে এতোক্ষণে এই প্রথম স্পষ্টভাবে সামনাসামনি দেখল রূপকথা। রাতের অন্ধকারেও কেমন অদ্ভুত দেখালো লোকটিকে। তবে তার দৃষ্টিতে মৃদু আশ্চর্য ভর করল যখন সে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের ডান পাশের হাতের অধিকারীর দিকে তাকায়। এখানেও একজোড়া বিড়াল চোখে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। রূপকথা বিরতিহীন একবার তপোবন আরেকবার তানশানের দিকে তাকালো। হড়বড়িয়ে সে সোজা হয়ে কিছুটা দূরে সরে যায় বাবা ছেলের থেকে। তানশান এক পলক তাকায় সরে যাওয়া মানুষটির দিকে। অতঃপর বাবার দিকে তাকিয়ে ধিমি কন্ঠে বলল,,
–“আমি উপরে যাচ্ছি, পাপা।”
বলেই তানশান পা বাড়ায় বাড়ির দিকে। তপোবন পেছন থেকে ডেকে বলল,
–“ফ্রেশ হতে গেলে হাতে পানি লাগাবে না, তানশান।”
–“জি পাপা।”, তানশান পিছু না ফিরেই জবাব দিল। তপোবন নিরবে দেখলো ছেলের দৃষ্টি চুরি ও পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে যাওয়া। ম্লান হয়ে আসে দেহাবয়ব। আজ পরিস্থিতি তাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, যেখানে তার সন্তানটিকে বাবার থেকে দৃষ্টি লুকানোর প্রয়োজনীয়তা পড়ছে। ঠিক এই ভয়েই তো সে আজ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিয়ের কথা কল্পনাতেও আনেনি। সাথে কারোর হুমকি তো সবসময় তার অন্তঃস্থলে মাদলের মতো বাজতেই থাকে।
তপোবন একপলক তাকায় এক হাত দূরত্বে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথার দিকে। এর মধ্যেই মৌনতা ছুটতে ছুটতে আসে রূপকথার কাছে। রূপকথাকে একহাতে আগলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–“কোন সমস্যা হয়েছে? ঠিক আছো?”
রূপকথা চোখ তুলে তাকায় মৌনতার দিকে। সাজানোর সময় এই মেয়েটি নিজের সম্পর্কে অনেককিছুই বলেছে তাকে। এটাও বলেছে উনি সম্পর্কে তার জা হয়। সে নিরবে মাথা নাড়ল তবে কিছু বলল না। মৌনতা দেখলো মেয়েটির নির্জীবতা। সে মলিন হেসে বলল,
–“চলো ঘরে চলো ক্লান্ত লাগছে নিশ্চয়ই? সন্ধ্যা থেকে কিছু খাওনি মনে হয়। চলো চলো।”
–“বড় ভাবি, চলো তোমায় আমি ভেতরে নিয়ে যাই।”, রোজ দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে বলল। মৌনতা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
–“এই রোজ, তোমার থেকে আমি আগে এসেছি ওর কাছে। আমি নিয়ে যাব। আমরা দুই জা একসাথে প্রবেশ করব ঘরে। আমারা এই ঘরের সবকিছু এখন আর তুমি হলে এই ঘরের অল্পদিনের অতিথি। তোমার গৃহ প্রবেশ এখানে নয় অন্য কোথাও, যাও ভাগো। তোমাকে শিঘ্রই বিদায় করব।”
–“ওরে মেজো বউ, আমার বাড়িতে থেকে আমায় তাড়ানো হচ্ছে? দাঁড়াও আমি কালকেই মেজো ভাইজান আর আম্মার কান ভাঙিয়ে তোমায় বাপের বাড়ি পাঠানোর ব্যাবস্থা করছি। ননদের সাথে লাগতে আসার ফল দেখাব আমি।”, রোজ কোমড়ে হাত দিয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল। মৌনতা গায়ে মাখলো না। সে একগাল হেসে বলল,
–“তুমি যদি ঘরের সব কাজ একা হাতে সামলাতে পার ননদিনী, তবে আমার সমস্যা নেই। আমি নাহয় কয়দিন ঘুরে আসলাম বাবার বাড়ি থেকে।”
রোজ বোকাসোকা হাসলো মৌনতার বাহুতে চাপড় মেরে বলল,
–“আরে মৌন বউ, দিল পে মাত লো, আমি তো এমনিই মজা করছিলাম তোমার সাথে। তুমি ছাড়া আমাদের ঘরটা ঘর লাগে না-কি? তোমার হাতের মশলা মালাই চা না খেলে আমার দিনের শুরু হয়না। তুমি মজাও বোঝ না, মৌন বউ।”
–“হুহ, এরপর থেকে বুঝেশুনে মজা করবে বুঝলে ননদিনী?”, মৌনতা মুখ বাঁকিয়ে বলল।
–“বাইরে বসেই তোমরা আড্ডা দেবে না-কি হাতের কাজ গুলো সারবে?”, মায়ের গম্ভীর কন্ঠে রোজ, মৌনতা জিভ কেটে তাড়াতাড়ি করে রূপকথাকে বলল,
–“চলো কথা, ভেতরে চলো।”
শ্রবনপথে শুধুই উষ্মা স্বরূপ বানীর আনাগোনা। মস্তিষ্কে বিভ্রাট, চরম বিভ্রাট। জীবনসঙ্গী হারিয়ে শান্ত, ধীরস্থির, আড়ম্বরহীন নিরবধি চলতে থাকা জীবনটাতে হঠাৎ আগমন ঘটা এই বিড়ম্বনা তপোবনের জন্য সহনশীল নয়। ছেলে নিয়ে জীবনটা তো সুন্দর-ই চলছিল। ছিল না কোন জড়তা, সম্পর্কের বিবাদ, অনুশোচনা, আফসোস। জীবনে প্রথমবার কোনকিছু অগ্রাহ্যের সাথে করেছে এবং প্রথমবারই আফসোস ও হচ্ছে। কেনো সে ভালোকরে খোঁজ খবর নেয়নি। কারোর অসহায়ত্ব’র সুযোগ নিয়ে তার মা যে একটি নব পরিস্ফুটিত ফুলের রঙ সুবাস সব কেড়ে নিয়েছে। একটি মেয়ের জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ই মেরে দিয়েছে। সাথে তৈরি করেছে বাবা ছেলের মাঝে অদৃশ্য এক জড়তা। কিভাবে চোখ মেলাবে ছেলের সাথে, কিভাবে চোখ মেলাবে জীবনে নব্য পরিস্ফুটিত ঐ মূর্ছা যাওয়া ফুলের মতো মেয়েটির সাথে। তার মতো জীবনসঙ্গী নিশ্চয়ই মেয়েটির কামনীয় নয়।
–“আর্থিক সাহায্যের কথা বললে, আপনি বললেন তাদের আর্থিক সাহায্য নয়, তাদের মেয়ের জন্য একজন শক্ত ভরসার হাত প্রয়োজন। নয়তো ঐ লোকগুলো মেয়েটিকে বাঁচতে দেবে না। জেনেশুনে একজন বিপত্নীক সন্তান সমেত বয়স্ক লোকের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছে, তারমানে নিশ্চয়ই আমার বয়সের সাথে সামঞ্জস্য রয়েছে। ঠিক এই ভাবনাটা আঁকড়েই আমি রাজি হয়েছিলাম। আর আপনি কি সন্তপর্নে এড়িয়ে গিয়েছেন তার বয়স আমার থেকে! আম্মা আপনি আমার জীবন গুছিয়ে দেননি বরং লোকমুখে আমায় হাস্যকর একটি চরিত্র বানিয়েছেন। আমার ছেলে আর আমার মাঝে জড়তা, দূরত্ব, সংকোচের সৃষ্টি করেছেন। আপনি ও তো একটা মেয়ে— তবে কিভাবে পারলেন একটা মেয়ের জীবনের সব চাওয়া পাওয়া পায়ে পিষে ফেলতে?”, তপোবনের চাপা রোষানলে দগ্ধ কন্ঠে তকদির সিকদার ক্রুব্ধ চোখে তাকায় স্ত্রীর দিকে।
–“তুমি এটা মোটেই ঠিক কাজ করোনি নির্জনা। একজনকে সাহায্য না করতে পারো কিন্তু তার অসহায়ত্বের সুযোগ ও তুমি নিতে পারো না।” ,তকদির সাহেব মৃদু গর্জে উঠল। নির্জনা বেগম তীক্ষ্ণ চাহনিতে তাকায় ছেলে আর স্বামীর দিকে। পাল্টা রাগান্বিত স্বরে বলেন,
–“অসহায়ত্বের সুযোগ কোথায় নিয়েছি? তারা কুলকিনারা হীন, যাওয়ার জায়গা নেই দু’টো মেয়ে নিয়ে কোথায় কি করত? জংলি পশুরা ছিঁড়ে খেতো তিনজনকে। কিছু একটা হয়ে গেলে তো সকলে ঠিকই সমবেদনা জানাতে পারত। কিন্তু দুঃসময়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। তিনটা মেয়ে মানুষ কিভাবে লড়তো ঐ প”শুগুলোর সাথে? সেখানে আমার একটু উপকারের বিনিময়ে যদি তাদের জীবন সুরক্ষিত হয়ে যায় তবে অপরাধটা কোথায়? তাদের তো ভাগ্য ভালো আমাদের মতো মানুষ তাদের সাহায্য করেছে। বস্তির একটা মেয়েকে আমাদের মতো বংশীয় পরিবারের বউ করেছি। বরং তুমি যেটা করোনি আমি সেটা করেছি। আমি তিনজনকে সুরক্ষিত করেছি আর তাতে যদি আমার নিজের একটু উপকার হয় তবে কেনো করব না? আমার ছেলের জীবন গুছিয়ে দেয়ার অধিকার কি আমার নেই? আমি মা হয়ে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে জীবনযাপন করছি, সেখানে আমার ছেলে এভাবে একাকী জীবন কাটায়; এটা দেখতে পারে কোন মা?”
–“আমাকে কখনো এই বিষয়ে জানানোই তো হয়নি, তবে আমি সাহায্য করবো কি করে নির্জনা?”
–“মিথ্যা কথা বলবে না, মেজো আমায় বলেছে, ও তোমাকে অনেকবার জানিয়েছে। কিন্তু তোমার হাতে সময় নেই প্রতিবার এটাই তো বলেছ তুমি।”
–“তারিফের বউ? ও কখন বলেছে আমার কাছে এসব? ও আমায় কখনো বলেনি এসবকিছু। বললে আমি অবশ্যই কিছু করতাম।”, তকদির সিকদার অবাক কন্ঠে বলল।
নির্জনা বেগম এপর্যায়ে চুপসে গেলেন। ভাবনায় পড়তে হলো তাকে। তারমানে মেজো জা মিথ্যা বলেছে তার কাছে। রাগে দাঁতে দাঁত চাপলো নির্জনা বেগম। তপোবন এক পলক ম্লান দৃষ্টিতে তাকলো মায়ের দিকে অতঃপর গটগট করে বেরিয়ে যায় মায়ের কক্ষ থেকে। তকদির সিকদার হতাশার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নির্জনা বেগমের দিকে। হতাশার কন্ঠেই বললেন,,
–“সন্তানদের ভালো চাইতে চাইতে তুমি সন্তানদের ভালোথাকা কেড়ে নিচ্ছো। ঐটুকুন মেয়ে, দু’জনে মানিয়ে কিভাবে নেবে বলতে পারো? তোমার যদি এতোই ইচ্ছা ছিল তাদের সাহায্য করার—তবে তোমার ছোট বেয়ারা ছেলের জন্য আনতে মেয়েটাকে। বউ এনে দিলে ঐ উচ্ছ্বন্নে যাওয়া ছেলেটা হয়তো একটু ঘরমুখে হতো, জীবন নিয়ে সিরিয়াস হতো।”
–“আর এমনটা করলে, তোমার ছোট ছেলে কাউকে আস্ত রাখবে তাই না? এমনিতে যেটুকু যা শান্ত থাকে, বিয়ের নাম শুনলে সে উন্মাদের মতো আচরন করে। এই বিষয়ে তা কি তোমায় নতুন করে বলতে হবে? নিজে তো কম চেষ্টা করলে না। এতো বছরেও কি পারলে একটা বিয়ে দিতে নাকি পারলে সঠিক পথে আনতে? ইদানিং তো তার সাথে কথা বলতেও ভয় পায় সকলে। আমার হয়েছে এক জ্বালা, দু’টো ছেলের জীবন এমন এলোমেলো গোছাতে গেলে হতে হয় দোষী। বয়স হয়েছে আমার, সকলের একটা গোছানো জীবন দেখতে চাওয়া কি অপরাধের? ”, উচ্চস্বরে বলতে বলতেই নির্জনা বেগম বিছানায় পা উঠিয়ে বসলেন।
–“ওটাকে বেয়াদব তো তুমি আর তোমার বড়ো ছেলেই বানিয়েছ। প্রথম থেকেই যদি শাসনে রাখতে তবে তো আর এতোটা উচ্ছ্বন্নে যেতে পারতো না। কিন্তু না তার দুঃখের সাগরে গা ভাসিয়েছো তোমরাও। ভালো ছেলেটা হঠাৎ কোন দুঃখে এমন হয়ে গিয়েছে কে জানে? মুখ ফুটে একটা কথাও বলবে না। বাগেরহাট থেকে খুলনা এই পুরোটা জায়গায় ঐ তোমার একটা ছেলের জন্য আমার নাম খারাপ। টাকা দিয়ে একটা উগ্র মাতাল লালন পালন করছি আমি। তারা তো আর জানে না অন্দরের কথা। একটা ষাঁড় গরু! ক্ষেপলে কাউকে খু*ন করতেও দুবার ভাববে না এমন হয়েছে। একদিন দেখবে ভিনদেশে কোথাও মদ খেয়েটেয়ে ম”রে পড়ে আছে। সেদিন বুঝবে ঐ ছেলেকে এখনো সংসারমুখী না করার ফল।”, তকদির সিকদার রাগান্বিত গলায় বললেন। নির্জনা বেগম আর্তনাদ করে উঠলেন এহেন অসংলগ্ন কথায়। সে তড়াক ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো স্বামীর দিকে। আ’ত’ঙ্কে জর্জরিত নাদের সুরে বললেন,
–“তুমি এমনটা বলতে পারলে? ছেলে আমার, আজ নাহোক কাল আমি ঠিক তাকে ঘরমুখো, সংসারমুখো করবো। তাই বলে তুমি বাবা হয়ে এমন কথা কিভাবে বলতে পারো?”
–“যেভাবে আমি বাবা হয়ে তিলে তিলে আমার ছেলেকে বিগড়ে যেতে দেখেছি? তার থেকে ওটা তো কষ্টদায়ক নয়। আর সত্যি কথা কি জানো নির্জনা? তোমার ছোট ছেলের ভবিষ্যতে এমনি কিছু লেখা আছে। যেভাবে জীবনযাপন করছে এর পরিনতি খুব একটা ভালো হবে না।”, তকদির সিকদার চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন।
নির্জনা বেগম জবাব দিলেন না ফোঁস ফোঁস করতে করতে চুপ করে বসে রইল। ছোট ছেলের নাম শুনলেই তকদির সিকদারের মেজাজ বিগড়ে যায়। সিকদার বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ শান্তশিষ্ট নম্রতার প্রতীক হলেও, এই একটা ছেলেই বাড়িটির সকল শান্তি, নম্রতা বিনষ্ট করে রেখেছে। আর সে হলো এরোজ সিকদার। বত্রিশ বছর বয়সী এক সুঠামদেহী পুরুষ বাহ্যিক রূপ তার যতোটাই আকর্ষনীয়, অভ্যন্তরীণ রূপ তার ঠিক ততোটাই বিকর্ষন করে সকলকে। উগ্র মেজাজ, মাদকাসক্ত, মারামারি, গুন্ডামি এসবি তার নিত্যদিনের সঙ্গী। বছর পঁচিশ পর্যন্ত ঠিকঠাক থাকলেও এরপর পরই কেমন বিগড়ে যেতে থাকে। মেধাবী, সৃজনশীল, দায়িত্বপরায়ন ছেলেটি অচিরেই হারিয়ে যায়। শিক্ষাগত যোগ্যতায় একজন অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হলেও। সেই পেশায় নিয়োজিত না হয়ে হয়েছিল পাইলট। দুই বছর সেই চাকরি করলেও তা আর স্থায়ী হলো না। হঠাৎ করেই একদিন চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। এবং তখন থেকেই প্রকাশ পায় তার এইসকল আচরন। মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে, সাথেই ধারন করে উগ্র মেজাজ, উশৃঙ্খল আচরন, মারামারি, গুন্ডামি ও করে মাঝেমধ্যে এলাকায় বেশ নামডাক তার এর জন্য।
এছাড়াও তার আরো একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো সে বিয়ের নাম ই শুনতে পারে না। কেউ বিয়ের নাম উঠালে হলো বাড়িতে ছোটখাটো একটা ঘূর্নিঝড় বয়ে যায় এরোজের উগ্র আচরনে। আর ঠিক এই কারনেই তকদির সিকদারের চক্ষুশূল তার ছোট ছেলে। সঠিক পথে তো আনতেই পারে না বরং তার গলায় পা চেপে টাকা আদায় করে নিয়ে উড়ায়।
ছোট ভাইকে নিয়ে নিত্যদিনের এই কোলাহল থেকে মুক্ত হতে তপোবন সিদ্ধান্ত নেয় তাকে দেশের বাইরে সেটেল করার। নির্জনা বেগম এবং তপোবন কিছুটা জোরপূর্বক চার বছর পূর্বে তাকে কানাডায় সেটেল করে। এখন সেখানেই কর্মরত একজন অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। তবুও জীবনব্যবস্থায় নেই কোন পরিবর্তন! এখনো তেমনি উগ্র মেজাজের, উশৃঙ্খল, উচ্ছ্বন্নে যাওয়া এক উদাসীন মানুষ!
লাল রঙা একটি জামদানী শাড়ি সাথে ঢিলেঢালা লাল ব্লাউজ। হাতে মোটা মোটা বালা, গলায় একটি চিকন নেকলেস, নাকে জ্বলজ্বল করছে সোনার নোলক—রূকথাকে দেখে মুগ্ধ হয় মৌনতা। কাপড় বদলেই আগে খাইয়ে নিয়েছে মেয়েটিকে। ঘরের সকল সদস্য দেশের বাড়িতে গেলেও যায়নি শুধু ইমরোজ। ইমরোজ ঢাকাতে গিয়েছে কাজের সুবাদে।
ঘরে থাকা দুইজন ভিন্ন বয়সী কাজের মহিলা হা করে তাকিয়ে আছে রূপকথা আর মৌনতার দিকে। তাদের এই অবাক দৃষ্টির অর্থ জানে মৌনতা, তবে কিচ্ছুটি বলল না সে। নিরব, নিশ্চুপ রূপকথাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে তাকায় ঘরে থাকা বাকি দুইজন কাজের মহিলার দিকে। একজন বয়স্ক মহিলা মাজেদা এবং একজন আঠাশ বছরের এক নারী জবা। যারা এই বাড়িতে কাজ করে। মৌনতা তাদের বললো,
–”এখানে হা করে তাকিয়ে না থেকে আপনারা এখন বাকিদের জন্য খাবার বাড়ুন গিয়ে। আব্বুজান, আম্মার ওষুধ আছে; এমনিতেই শীতের রাত তাড়াতাড়ি যান।”
মৌনতার কথায় তারা মুখের হা সমেত ধীরপায়ে বেরিয়ে গেল কামড়া থেকে। তারা যেতেই মৌনতা আলতো হাতে রূপকথার থুতনি ধরে মুখটা একটু তুলে মৃদু হেসে বলল
–“মাশাআল্লাহ কথা! তোমায় দেখতে পরীর মতো লাগছে। লাল টুকটুকে পরী।”
রূপকথা নির্বাক শ্রোতা হয়ে তাকিয়ে রইল মৌনতার দিকে। মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রূপকথার মাথায় এক হাত রেখে বলল,
–“কথা, তোমায় আমি স্বান্তনা দেবো না কোনকিছুর জন্য। কেননা তোমার মনের অবস্থা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। প্রতিটা মেয়ের একটা নিজস্ব চাওয়া পাওয়া আছে, যেটা তোমার জীবনের পরিস্থিতির কাছে হেরে গিয়েছে। তবে আমি একটা কথা বলব এটাকে ভাগ্য বলে মেনে নাও। এটা ছাড়া আমার কাছে বলার মতো আর কিছু নেই। জীবনে এমন অনেক কিছু আছে যা আমাদের চাহিদার সাথে সরাসরি মিলে যায় না; তবে না চাইতেও আমরা মানিয়ে নেই, নিতে হয়। তুমি দেখবে একটু মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে তোমার কাছে তোমার জীবনটা সহজ মনে হবে। বড়ো ভাইজান নম্র, দায়িত্ববান, হাসিখুশি একজন বিচক্ষণ মানুষ। তুমি যদি তার সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা কর— তবে দেখবে একদিন তোমার কাছে মানুষটা সবচেয়ে প্রিয় হবে। আর ভালোবাসা সেটা তো আল্লাহ প্রদত্ত! হলে একপলকেও হতে পারে কিংবা বছরের পর বছর একসাথে থাকলেও হয় না। ভাইজানকে উপর থেকে গম্ভীর মনে হলেও মানুষটা আবেগ অনুভূতিতে জর্জরিত। তবে তার সব অনুভূতি আবেগ গিয়ে থমকায় তার ছেলের কাছে। তানশান ঠিক তার বাবার প্রতিরূপ। বাবার মতো বুঝদার, নম্র, বিনয়ী। বাবা ছেলের থেকে তুমি কখনো কষ্ট পাবে না, এতোটুকু আমি বলতে পারি। তুমি একজন ভালো স্বামী পাবে কথা, কিন্তু মানুষটা বয়স্ক, একজন বিপত্নীক, একজন সন্তানের বাবা এটাই তার খুঁত।”
মৌনতা নিরবতায় আচ্ছন্ন হয় কিয়ৎকাল। পুনরায় বলল,,
–“তানশানের হাতে ব্যাথা, ভাইজান বাইরে গিয়েছে ওর খিদে পেয়েছে মনে হয়। আমায় যেতে হবে। ওকে এখন ভাত খাইয়ে না দিলে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বে। তুমি থাকো, আরাম করো। আমি রোজ আর নায়েলকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
রূপকথা মাথা নেড়ে সায় জানায়। মৌনতা মৃদু হেসে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে যায় কামড়া থেকে।
কামড়া থেকে বের হতেই দেখা মিলল জবা আর মাজেদা’র। তাকে দেখতেই হামলে পড়ল তারা।
–“মাইজ্জা বউ এ কি? তপোবন বাপজানের জন্য এত কচি মাইয়া নিয়া আইছো ক্যান?”, মাজেদা নানা আঙ্গিভঙ্গি করে বলল।
মৌনতা বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টিতে তাকায় তাদের দিকে। গম্ভীর গলায় বলল,,
–“কথা পেলে হলো আপনাদের তাই না? কাজ রেখে কথার ফুলঝুড়ি নিয়ে বসে পড়েছেন। টেবিল সেট করতে বলেছিলাম, করেছেন? আপনাদের এইসব কাজের জন্যই আপনারা বকা খান আম্মার। তাড়াতাড়ি চলুন, তানশানের ওষুধ আছে। কথা বললে আপনারা গুরুত্ব দেননা চাচি, এর জন্যই মেজাজ খারাপ হয়।”
আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মৌনতা পা বাড়াল নিচের দিকে। জবা আর মাজেদা চাচি মুখ ছোট করে তাকে অনুসরন করে। এই বিয়ের কাহিনী যতক্ষণে না তারা জানতে পারছে শান্তি নেই তাদের।
শীতের রাত। এগারোটা বাজলেই শুনশান নীরবতায় আচ্ছন্ন হয় ধরনী। সিকদার বাড়িতে কিছুটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সকলে খাওয়া দাওয়া করে যার যার ঘরে গিয়েছে বোধহয়। তপোবন ধীরপায়ে দোতালায় উঠলো। নিজের ঘরের দিকে আজ আর পা আগাতে চাইলো না। কয়েক পা চলতেই পাঞ্জাবীর পকেটে থাকা ফোনটি ভাইব্রেট করতে লাগলো। ফোনটি বের করতেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভিনদেশী নাম্বার দেখে ম্লান হাসলো। রিসিভ করে কানে ঠেকালে পিনপতন নীরবতা ছাড়া কিছুই শোনাগেল না। সেও নীরব রইল। অলস পায়ে রেলিং ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। তখনি ভেসে আসলো ভারী গম্ভীর এক কণ্ঠ।
–“শুনেছি বিয়ে করেছ!”
তপোবনের ম্লান হাসি আরো গভীর হয়। আক্ষেপের সাথে বলে,
–“কারণ ব্যতীত তো কখনো ভাইজানকে একটাবার ফোন দেয়া যায়, এরোজ?”
–“আমি যোগাযোগ না রাখলেই তো তোমাদের দুনিয়াটা সুখের হয়, ভাইজান।”
–“সবসময় ভাইজানকে ভুল বুঝেই যাবি?”
–“আমার কারোর সাথে কোন ভুলবোঝাবুঝি নেই ভাইজান। তোমারা যা বোঝাও আমি তাই বুঝি! আর আমি এটাই বুঝি—যে আমার থেকে দূরত্ব তোমাদের সবার সুখের কারণ!”
তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নরম সুরে বলল,
–“এটা জীবনের মানে কখনোই হতে পারে না, এরোজ! ছোট্ট একটা ভুলের জন্য গোটা জীবনটাকে উদাসীনতার সাথে জীবনযাপন করা অনুচিত। নিজের সাথে সাথে নিজের পরিবারের ও স্বাভাবিক জীবন ব্যহত করছিস। দেশে আয়, সবার সাথে কিছুদিন কাটিয়ে যা দেখবি ভালোলাগবে।”
–“একদিন তো ভালোথাকার জন্যই নিজেদের থেকে দূরে পাঠিয়েছিলে।”
–“সেটা তোর ভালোর জন্য!”
হাতে তখনো উদাসীনতার সাথে পরে আছে নিষিদ্ধ পানীয় যুক্ত একটি গ্লাস! এরোজ সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মৃদু হেসে বলল,
–“সেটাই, আমি আমি ভালো আছি ভাইজান। ভীষণ ভালো আছি।”
–“তুই শুধু নিজের ভালোথাকাই দেখছিস, এরোজ। নায়েল, তানশানের তাদের চাচার ভালোবাসা প্রয়োজন। আগামী মাসে তানশানের জন্মদিন, পরের মাসে নায়েলের জন্মদিন। ওদের কেন ওদের হক থেকে বঞ্চিত করছিস? অন্তত ঐ দু’জনের জন্য একবার দেশে আয়। নায়েল জন্মের পর থেকে জানেনা তার চাচা কে!”
অপরপ্রান্ত পুনরায় স্রোতহীন নদীর ন্যায় নিরব, ম্লান হয়ে গেল। তপোবন ডাকলো,
–“এরোজ?”
ভাইয়ের কথায় নিজের জীবনের পাতা ঘেঁটে একফোঁটা সুখ আর ভালোথাকা হন্য হয়ে খুঁজছিল এরোজ। কিন্তু শূন্য, নিরর্থক, একাকী জীবনের হাহাকার ব্যতীত আর কিছুই পেল না খুঁজে। তার ধ্যান ভাঙল ভাইয়ের ডাকে। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে গ্লাসের দেয়াল ভেদ করে নিজ তাগিদে ছুটতে থাকা মানুষগুলোর দিকে দৃষ্টি রাখে। মৃদু চঞ্চলতার সাথে নিজের জীবন বৃত্তান্ত এড়িয়ে গিয়ে বলল,
–“বিয়ে করেছো শুনলাম, অভিনন্দন ভাইজান। এতদিনে একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছো, আমি অনেক খুশি হয়েছি। ভালো থেকো!”
তপোবনকে পাল্টা প্রত্যুত্তর না করতে দিয়েই ফোনটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তপোবন ডিসকানেক্টেড ফোনটির দিকে তাকিয়ে থাকে নিরবে।
সেখানে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে অলস পা বাড়ায়। হাঁটতে হাঁটতেই নিজের ঘরের ঠিক আগের ঘরটির সামনে গতিশ্লথ করে। রোজকার অভ্যাসের ন্যায় চাপিয়ে রাখা দরজাটি খুলে উঁকি দিলে ল্যাম্পের আলোয় ছেলের ঘুমন্ত মুখটি ভেসে উঠল। তপোবন ঘরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দিল। হাতের শপিং ব্যাগটা স্টাডি টেবিলের উপর রেখে এগিয়ে যায় বিছানার কাছে। দু’হাতে একটি ডায়রি জড়িয়ে ধরে ল্যাম্পের দিকে মুখ করে ঘুমাচ্ছে তানশান। তপোবন ছেলের পাশ ঘেষে বসে ধীরে ধীরে ডায়রিটা নিতে যায়। খুলেরাখা ডায়রিটার কভার পেইজটির দিকে চোখ যেতেই মৃদু হাসলো তপোবন। কভার পেইজের শীর্ষের দিকে বোল্ড করে লেখা একটি সাবধানি বার্তা,
—“তপু, ভুলেও হাত দিবি না ডায়রিতে। এখানে আমার আর আমার ছেলের গোপন কথা রয়েছে।”
এটা যখন পূর্বা লিখতো তখনো এভাবে বলত আর তপোবন প্রত্যুত্তরে বলত,
–“তুই আর তোর ছেলে দুটোই আমার, তাই তোদের গোপন কথাও আমার।”
পাঞ্জাবির হাত গুটিয়ে ডায়রিটা নিয়ে নেয় তপোবন। দুই হাঁটুতে কনুই ঠেকিয়ে খুলে রাখা পৃষ্ঠা উল্টাতেই তপোবনের মুখটি বিবর্ন হয়ে গেল। বাহ্যিক দৃষ্টিতে ছেলেকে স্বাভাবিক দেখালেও, ছেলে যে এই বিয়েটিকে সহজভাবে নেয়নি তা সে আগেই বুঝতে পেরেছিল। এখন নিশ্চিত হলো। খুলে রাখা পৃষ্ঠার হেডলাইন হলো বাসর রাত। যার প্রথম লাইন হলো,
“তানশান আব্বু তোমার পাপা আমায় বাসর রাতে থাপ্পড় দিয়েছিল। এর পরেও তুমি পাপা ভক্ত থাকবে?”
এরপরে ছোট্ট একটি বর্ননা লেখা থাপ্পড়ের কারণ স্বরূপ। বর্ণনা টুকু পরে ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি ভর করে তপোবনের। তবে ফাজিল মেয়ে ছেলের কাছে নিজের দোষ এড়িয়ে গিয়েছে। তার থাপ্পড়ের পরিপ্রেক্ষিতে সেও যে তাকে একটা চড় মেরেছিল সেটা আর উল্লেখ করেনি ছেলের কাছে।
তার মনে পড়ে বাসর রাতের সেই পুরোনো কথা। দীর্ঘ চার বছরের প্রেমের সমাপ্তি ঘটিয়ে একদিন হুট করেই বিয়ে ছিলো তাদের। চার বছর প্রেম করার পর বিয়ে করে পূর্বা নামক মেয়েটি বিদায়ের সময় এমন মরা কান্না জুড়ে দিয়েছিলো—যা দেখে তার তপোবনের রাগ হয়ে গিয়েছিলো। যার ফলে বাসর ঘরে ঢুকতেই সর্বপ্রথম সেই রাগের প্রতিফলন হিসেবে সপাটে এক চড় মেরে বসে। রাগান্বিত গলায় বলেছিলো,
–“চার বছর প্রেম করে বিয়ের পর বিদায়ের সময় মরা কান্না জুড়ে, তুই কি প্রমাণ করতে চাইছিস? আমি তোকে জোর করে নিয়ে এসেছি? না-কি পরিবারের প্রতি ভালোবাসা দেখাচ্ছিস? তা এতো ভালোবাসা সেটা প্রেম করার সময় মনে ছিলো না তোকে অন্যের বাড়ি চলে যেতে হবে?”
এই কথার পরিবর্তে পূর্বাও একটা চড় মেরে দেয় তপোবনকে। ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে,,
–“প্রেম করেছি বলে কি পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ভুলে গিয়েছি, গর্ধব?”
ডায়রিতে ঝগড়া পর্যন্ত ই সমাপ্ত টানা বাসর রাতের গল্পের। তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়রিটা বন্ধ করে। বাসর রাতের সেই প্রথম প্রহর ঝগড়া করে কাটালেও, রাতের দ্বিতীয় প্রহর পর্যন্ত সেই ঝগড়া টেকেনি। দুজনেই ঝগড়া ভুলে মত্ত হয়েছিলো এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাতে।
ডায়রিটা বেডসাইড কাবার্ডের ড্রয়ারে রেখে দিয়ে তপোবন ছেলের ব্যান্ডেজরত হাত দু’টো ছুঁয়ে দেখে। আলতো হাতে ব্যন্ডেজ খুলে হাতে অয়েনমেন্ট লাগিয়ে দিয়ে আবার ধীরে ধীরে ব্যান্ডেজ করে দিল। অতঃপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে, ঘড়িতে এলার্ম সেট করে ল্যাম্প নিভিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। নিজের ঘরে যেতে যেতেই আরো একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাসের আওয়াজ পাওয়া গেল। কামড়ার নব ঘুরাতেই দরজাটি খুলে যায়, সাথে সাথেই তন্দ্রাগ্রস্থ রূপকথা লাফিয়ে উঠল। তপোবন নির্লিপ্ততা বজায় রেখেই ঘরে ঢুকে দরজা আঁটকে হাতের ঘড়ি, ফোন সেন্টার টেবিলে খুলে রাখে। কাবার্ড থেকে একটা ফতুয়া আর পায়জামা নিয়ে নিরবে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। এতোটাই স্বাভাবিক আচরন যেন ঘরে দ্বিতীয় কোন মানুষ-ই নেই। পাঁচ মিনিটের মাথায় পরিবর্তন অরে বের হলেই বিছানায় বসা মেয়েটির টলমলে দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে যায়। তপোবন দৃষ্টি সরিয়ে তোয়ালে বারান্দায় মেলে দিয়ে স্লাইডিং দরজাটা আঁটকে দিয়ে ঘরে আসে। রূপকথা তখনো গুটিয়ে বসে আছে বিছানার এক কিনারায়। তপোবন সেদিকে একবার দৃষ্টি ফেলে লন্ড্রি বাস্কেটের ঢাকনাটা তুলতে তুলতে শুধায়,
–“নাম কি তোমার?”
পুরুষালী ভারী, গম্ভীর কন্ঠে রূপকথা হকচকিয়ে তাকায় তপোবনের দিকে। কিয়ৎকাল সময় নিয়ে মিহি স্বরে বলল,,
–“রূপকথা।”
তপোবন লন্ড্রি বাস্কেটের পোশাকগুলো বের করে ভাঁজ করে সোফায় রাখতে লাগলো। মৃদু কন্ঠে আওড়ায়,
–“ফেইরি টেইল? সুন্দর নাম।”
রূপকথা চুপ করে শোনে। আর আড়চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে লোকটির কার্যকলাপ। বিলবোর্ডে দেখা ঐ বিড়ালচোখের লোকটিকে তার কেমন দাপটে অহংকারী মাফিয়াদের মত লাগত। এখনো তার ব্যাতিক্রম না। বিশাল দেহ, ঘোলাটে বিড়াল চোখ, তুলনামূলক লম্বা ফ্লাফি চুল এমনটাই নির্দেশ করছে। চুলগুলো ঘাড় ছুইছুই না। নাহ্, ঝুঁটি করা যাবে না। তন্মধ্যে উঁকি দিচ্ছে মাঝেমধ্যে একটা দুটো পাক ধরা চুল। ঠিক যেন কোন ক্ষমতাধর ক্রুঢ় রাজনীতিবিদ। তবে মস্তিষ্কে শুধুই ঘুরপাক খাচ্ছে বাসর রাত নামক এক বিদঘুটে রাতের সমাপ্তির চিন্তা। কেমন হবে এই রাত? তার ভাবনার থেকে ভয়ঙ্কর?
–“তোমায় জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে?”, ভাবনায় বিভোর রূপকথার দৃষ্টি পুনশ্চঃ সচকিত হলো। সচকিত হলো কর্নদ্বয় ও। প্রশ্নটির অর্থ বুঝতে পেরে নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চার করল রূপকথা। সাহসী কন্ঠেই বলল,
–“জোর করে বিয়ে দিলেও বা কি হবে? বিয়ে তো হয়ে গিয়েছে, তাই না? আপনি তো আর আমায় মুক্ত করে দেবেন না।”
তপোবন চোখ তুলে তাকালো। এবার তার দৃষ্টিতে বেশ উজ্জ্বলতা দেখা মিলছে। সে স্মিত হেসে বলল,,
–“চাইলে অবশ্যই দেবো। কাউকে জোর করে তো আর সংসার করানো যায় না।”
সহসা রূপকথা চুপসে গেল। কারোর বোঝা কমাতেই তো তার এই বিয়ে, আবার একজন ডিভোর্সি নিয়ে বোঝার ভার আরো বাড়িয়ে দিলে মা যে গলায় দ*ড়ি দিয়ে ম*র*বে। সে জবাব দিল না। তপোবন সব কাপড়গুলো গুছিয়ে ফেললো ততক্ষণে। পুনরায় শুধায়,
–“বয়স কত তোমার?”
–“বিশ, বিশ বছর চার মাস।”
–“আমার বয়স জানো?”, তপোবন রূপকথার দিকে তাকিয়ে শুধায়। রূপকথা উপরনিচ মাথা নাড়লো। তপোবন উৎসুক চেয়ে শুধায়,,
–“বলোতো।”
–“ছয়ত্রিশ, সাইত…”, রূপকথার কথা অসম্পূর্ণ থেকে গেল তপোবনের ব্যগ্র কণ্ঠে।
–“চল্লিশ, আমার বয়স চল্লিশ বছর দুই মাস।”
রূপকথা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তপোবনের দিকে। তপোবন শুধায়,,
–“এখানেও ধোঁকার স্বীকার হয়েছো নিশ্চয়ই? এন আইডি কার্ড অনুযায়ী বয়স ঊনচল্লিশ। আর ঘটকের শৈল্পিক মুখের কারুকার্যে বয়স গিয়ে দাঁড়িয়েছে ছয়ত্রিশ, সাইত্রিশে বুঝেছো? সবসময় মনে রাখবে বিয়ের সময় ঘটকের বলা পাত্র-পাত্রীর বয়স আর পাত্রের বেতন আশিভাগ সত্য আর বিশভাগ ঘটকের কারুকাজ মিশ্রিত থাকে। ভবিষ্যতে কাজে দেবে।”
গম্ভীর কন্ঠে রসিকতা তো ছিল না, তবে কি বাস্তবিকতা? বাস্তবিকতার কাছে রূপকথা যে চরম ভাবে ঠকেছে তার-ই বহিঃপ্রকাশ ছিল কথাটিতে। তপোবন কাজ সেরে লাইট নিভিয়ে দেয়। রূপকথা হকচকায়। তপোবন হাতে করে আনা কম্ফোর্টারটি রূপকথার দিকে এগিয়ে দিয়ে বিছানার একপাশে বসতে বসতে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪
–“অনেক বড় বিছানা, আমার নড়াচড়া করার একদম অভ্যাস নেই। যেই কাতে ঘুমাই, সেই কাতেই উঠতে পারি। তোমার ঘুমাতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যদি সমস্যা হয় তবে ঐখানে সোফা আছে ওখানে শুতে পারো। এর থেকে বেটার অপশন আমার কাছে নেই। বাড়ির পরিবেশ নষ্ট হবে, আম্মা বিরূপ আচরণ করবে।”
বলেই তপোবন বিছানার কিনারায় শুয়ে পড়ে। তাদের মাঝে অবস্থান করছে একটি কোলবালিশ। রূপকথা নিরুত্তর আবছা আলোয় আড়চোখ একপলক তপোবনের পৃষ্ঠদেশ দেখে সেভাবেই হাঁটু আঁকড়ে বসে রইল। ঘুম আর আসল না।
