অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫১
তোনিমা খান
ক্লাসরুম তখন মৃদু গুঞ্জনে মুখরিত। কোলাহলে বিরক্ত তানশান নিজের বেঞ্চে বসেই বই খুলে বসল। বাইরের জগতের সব হট্টগোল যেন বইয়ের পৃষ্ঠার সান্নিধ্যে এসে মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল। তানশানের প্রবল মনোযোগ তখন বইয়ের পাতায় নিবদ্ধ। কিন্তু আচমকাই সেই একাগ্রতা ছিন্ন হলো। কর্ণকুহরে বিঁধল এক অতি পরিচিত নাম। সহপাঠীর উচ্চস্বরে বলল,
–“সুনেহরা! কতদিন পর এলি?”
তানশানের চোখদুটো অবাধ্য হয়ে পড়ে। দৃষ্টি ছুটে যাচ্ছে কারোর দিকে। কিন্তু সে তবুও অনড়! দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল বইয়ের দিকে।
সুনেহরা কোনো উত্তর দিল না। ধীর পায়ে গিয়ে মাঝের সারির একটি বেঞ্চে বসে পড়ল। ক্লাসের সবাই খানিক অবাক। বিগত এক মাসে হাতেগোনা কয়েকদিন তাকে স্কুলে দেখা গেছে, তা-ও কেবল জরুরি ক্লাস টেস্টের জন্য। তবে বিস্ময়টা সেখানে নয়; বিস্ময় সুনেহরার বদলে যাওয়া রূপে।
মেয়েটিকে আগের মতো হাসতে দেখা যায় না, গুন্ডামি করতে দেখা যায় না, তানশানের জন্য পাগলামী করতে দেখা যায় না।
তাদের ক্লাসের সবচেয়ে গম্ভীর চুপচাপ স্টুডেন্ট তানশান হলেও, বিগত এক মাসে এই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে সুনেহরার গাম্ভীর্যতা।
তানশান নত শির পুনরায় মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করে বইয়ে। চোখেমুখে অদম্য দৃঢ়তা। সে জানে, সুনেহরার এই পরিবর্তনের কারণ তার দেয়া আঘাত। কিন্তু এতে তার কোনো আফসোস নেই। তার জীবনের পরিধি অনেক দীর্ঘ, তাকে সেই দীর্ঘ পরিধি পর্যন্ত পৌঁছাতেই হবে। মায়ের কথামতো, বাবার প্রতিরূপ নিজেকে দাঁড় করাতে হবে। এই পথটাতে সে কখনোই কাউকে নিজের পিছুটান কিংবা দূর্বলতা বানাতে পারে না।
শিক্ষক ক্লাসে আসতেই পিনপতন নীরবতা নেমে এল। হায়ার ম্যাথ টিচার বোর্ডে একটি অঙ্ক দিলেন। বহুদিন পর সুনেহরাকে দেখে তিনি গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,
–“সুনেহরা, এত স্কুল বন্ধ দিচ্ছো কেন? তোমার পড়াশুনার গতি তো এমনিতেও ভালো না। তোমার বাবা জানে এগুলো?”
সুনেহরা দাঁড়িয়ে যায়। থমথমে মুখে বলল,
–“পাপা জানে, স্যার। তার অনুমতিতেই ক্লাসে আসা হয়নি। পাপা, হেড টিচারের সাথে কথা বলেছে।”
শিক্ষকের চোখেমুখে বিরক্তি। বড়লোক বাপের বিগড়ে যাওয়া মেয়ে, উপরন্তু বাবা স্কুলের কমিটি। নিজ মর্জিমাফিক জীবনযাপন করে। আর শিক্ষকরা কিছু বলতেও পারে না।
সে থমথমে মুখে বলল,
–“বাবা মায়ের প্রশ্রয়েই তোমাদের মতো ছেলে মেয়েদের জীবন শেষ হয়ে যায়। তোমার বাবা কি জানে না, তুমি পড়াশুনায় কত খারাপ? একটা সূত্র ও তো মুখস্থ থাকে না, ম্যাথ তো দূরের কথা। সেখানে স্কুল বন্ধ দেয়ার মতো কাজে সায় দেয় কি করে?”
টিচারের কথার প্রেক্ষিতে সুনেহরা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
–“ম্যাথটা করা হয়ে গেছে, স্যার।”
–“কী বললে?”
–“যেটা করতে দিয়েছেন, সেটা শেষ। পাপা আমায় বাড়িতে পড়ান। অসুস্থ ছিলাম বলে স্কুলে আসা হয়নি, এখন থেকে নিয়মিত আসব।”
শিক্ষক কিছুটা দমে গেলেন। কিন্তু গোটা ক্লাস তখন বিস্ময়ে বিমূঢ়! সুনেহরা, যে একটা সূত্র বলতে খাবি খেত, সে সবার আগে অঙ্ক শেষ করে ফেলেছে? এমনকি মেধাবী তানশানেরও আগে?
সদ্য এন্সার লেখা তানশানের কলম থেমে গেল। সে ঘড়ির দিকে তাকাল, মাত্র চার মিনিট! ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী স্টুডেন্ট হয়েও সে এর মধ্যে শেষ করতে পারেনি অথচ সুনেহরা! সে বিস্ময় নিয়ে সে সুনেহরার দিকে তাকাল। মেয়েটি ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষক খাতা দেখে হতবাক হয়ে বললেন,
–“ম্যাথ তো একদম নির্ভুল! তা কী হয়েছিল তোমার? এখন সুস্থ তো?”
–“তেমন কিছু না স্যার, এখন ঠিক আছি।”
–“আচ্ছা বসো। আর বন্ধ দিও না। আর এই পড়াশুনার গতি ধরে রেখো।”
শিক্ষক অন্য সবার খাতা দেখতে এগিয়ে গেলেন।
সুনেহরা উদাসীন দেহে বসে পড়ে। নত শির তাকায় নিজের খাতাটির দিকে। শিক্ষক ভেরি গুড লিখেছে। টানা টানা ঘন পল্লবে আবৃত চোখদুটো অযথাই ছলছল করে উঠল। সে তো এগুলো কখনো চায়নি কিন্তু যা চেয়েছে তা পায়নি। তাই ধরে রাখার মতো এইটুকুই আছে, সেটুকু সে ধরে রাখবে। নিজের সবটুকু দিয়ে ধরে রাখবে।
সাদা পাতায় টুপ করে এক ফোঁটা নোনা জল পড়তেই সে দ্রুত মুছে ফেলল।
তানশানের স্থির দৃষ্টি নড়েচড়ে উঠল। সে ম্লান হেসে ফিরে তাকায় নিজের খাতার দিকে।
অলস হাতে কলম চালায় সাফেদ পৃষ্ঠার ঠিক শেষ অংশে।
–“আমার দেয়া একটু আঘাত যদি তোমায় এতটা পরিবর্তন করতে পারে, তবে এমন আঘাত আমি বারবার দেবো। তবুও তুমি নিজের ক্ষমতা গুলোর সাথে পরিচিত হও, অনেক বড় হও।”
শিক্ষক আসতেই তানশান পৃষ্ঠা উল্টে ফেলল। শিক্ষক খাতা দেখে বললেন,
–“আজ তুমি দ্বিতীয় হয়ে গিয়েছো, তানশান।”
তানশান মৃদু হেসে বলল,
–“নো প্রবলেম, স্যার। আমার ভালোলাগে প্রতিযোগিতা।”
শিক্ষক মৃদু হেসে তাকে সাব্বাশি জানালেন। তানশান প্রতিটা শিক্ষকের কাছেই খুব প্রিয়।
সুনেহরা তখনো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে খাতার দিকে। কনে বাজছে তানশানের কথাটি। সে ম্লান হাসল। সে তো প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চায়নি, হতে চেয়েছে সঙ্গী।
তপোবন তকদির সিকদার দু’দিন ধরেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তকদির সিকদারের মোট সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা শুরু হয়েছে। সে টাকা ইনকাম করতে শিখেছে থেকে তার নেশা ছিল জমিজমা কেনার। খুলনা এবং বাগেরহাট দুই জায়গাতেই তকদির সিকদারের অঢেল সম্পদ রয়েছে। সেই জমিজমা সংক্রান্ত কাজেই কখনো বাগেরহাট, কখনো খুলনা যাতায়াত করতে করতে তাদের দম ফেলার ফুরসৎ নেই।
তপোবন আর তকদির সিকদারের ফিরতে রাত এগারোটা বাজলো। কোনোমতে কাপড় ছেড়ে দু’টো খেয়েই স্ত্রী সন্তানকে পড়াতে বসেছে।
রূপকথার কলেজ থেকে জানানো হয়েছে, সে ভালো পার্ফরম্যান্স করছে। আরেকটু চেষ্টা করলে একটা ভালো ফলাফল পাবে।
এই আরেকটু চেষ্টা করতে তপোবন একটুও কার্পণ্য করছে না। সকল ব্যস্ততা সামলে হলেও দু’জনকে সময় দেয়। অন্তভাগে রূপকথাকে জিততে দেখা তার একটা স্বপ্ন।
তানশান কখনো বাবাকে আশাহত করে না। তার পেছনে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয় না তপোবনের। কিন্তু রূপকথার বিষয়টা ভিন্ন! না চাইতেও এই গোটা সংসার, স্বামী আর সন্তানের ভার তার কাঁধে থাকে।
এর জন্য তপোবন নিজের সবটা পরিশ্রম স্ত্রীকে দেয়।
শহরতলী তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন। তবে শহরের মাঝে একটা বাড়ির কক্ষে তখনো আলো জ্বলছে। তপোবন খাতা দেখতে দেখতে এক পলক তাকায় গড়িমসি করতে থাকা স্ত্রীর পানে।
মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“যতক্ষণ ধরে গড়িমসি করছ, ততক্ষণ একটা পৃষ্ঠা পড়া হয়ে যেত।”
রূপকথা অভিমানী চোখে চেয়ে বলল,
–“রোজ রাতে এই সূত্রের শিট কেন পড়তে হবে? আমার সব মুখস্থ!”
–“মুখস্থ থাকলেও পড়বে। চর্চায় মেধা শাণিত হয়।”
তপোবনের একরোখা কণ্ঠ। রূপকথা অভিমানী দৃষ্টিতে তাকালো। সারাদিন সংসারের পেছনে ছোটাছুটি করে কি এত ধকল শরীরে সহ্য হয়? আবার রোজ রাতে এমন কঠোর টিচারের পাল্লায় পড়তে হয়।
আজ সে কোনোভাবেই আর পড়বে না। আর এই টিচারের বেশে থাকা স্বামীকেও জব্দ করবে।
সে ধপ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে জেদি কণ্ঠে বলল,
–“আমি এখন ঘুমাবো আর পড়ব না। আমার শরীরে আর জোর নেই।”
বলেই সে গটগট করে চেঞ্জিং রুমে চলে গেল। তপোবন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। বিড়বিড় করে বলে,
–“জেদি মেয়ে!”
সে আবার খাতা দেখায় মনোযোগী হয়। সব পেরেছে। সে হাঁফ ছাড়ল। এখন আর রূপকথা ম্যাথকে ভয় পায় না।
সে বই খাতা গুছিয়ে রাখতে রাখতে খানিক পরিকল্পনা আটল। সূত্র না পড়িয়ে তো সে রূপকথাকে ঘুমাতেই দেবে না।
তবে তার পরিকল্পনার চেয়েও যেন প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা অধিক অপ্রীতিকর। প্রতিপক্ষ যে ইতিমধ্যেই তার দূর্বলতা জেনে গিয়েছে।
তপোবন চেয়ার ছেড়ে উঠতেই ছোটখাটো একটা ধাক্কা খেল। সদ্য ওয়াশরুম থেকে বের হওয়া রূপকথার আপাদমস্তক চেয়ে হতবাক হয়ে শুধাল,
–“এগুলো কি পড়েছো? শাড়ি কোথায়?”
একটা সাদা ফ্রক আর সাদা ঢিলেঢালা সেলোয়ার পরিহিত রূপকথা থমথমে মুখে ওড়না গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল,
–“কি পড়েছি মানে? আপনি দেখতে পাচ্ছেন না?”
তপোবন তৎক্ষণাৎ অসন্তোষের সাথে বলল,
–“সেটাই তো, এগুলো কেন পড়েছো?”
–“এখন থেকে এগুলো পড়েই ঘুমাবো।”
–“মোটেই না। এগুলোতে তোমায় ভালো লাগে না। খোলো।”
–“কে বলেছে ভালো লাগে না? ওই দেখুন আয়নায়, সাদা পরীর মতো লাগছে আমায়।”
তপোবন অসন্তোষের সাথে বলল,
–“হ্যাঁ সাদা পরী লাগছে কিন্তু আমার আমার লাগছে না। যাও শাড়ি পড়ে এসো। এতদিন আমায় জ্বালিয়ে এখন এগুলো পড়তে পারবে না।”
–“আমি এতদিন আপনাকে জ্বালিয়েছি?”, রূপকথা কোমরে হাত দিয়ে শুধায়।
–“বিয়ের পরদিন থেকে। শাড়ি কোথায় থাকে তাই খুঁজে পাইনি। এখন এসেছো আমাকে আবার এভাবে জ্বালাতে?”, তপোবনের কণ্ঠ বেশ ক্ষুব্ধ!
–“আর জ্বালাবো না আপনাকে। তার বন্দোবস্ত করছি।”, রূপকথা থমথমে মুখে বলেই বিছানা থেকে কম্ফোর্টার নিয়ে সোফায় সটান হয়ে শুয়ে পড়ল।
তপোবন হতবাক!
–“একি ওখানে ঘুমাচ্ছো কেন?”
–“আমি তো আপনাকে জ্বালাই। তাই আজ থেকে আমি এখানে ঘুমাবো।”
রূপকথার জেদি কণ্ঠে তপোবন বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“এই মাঝরাতে কি শুরু করেছো?”
–“আমি কি করলাম? আপনি তর্ক করছেন। গিয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ুন।”
তপোবন কোমরে হাত দিয়ে দেখে জেদি মেয়েটাকে। মেয়েটা এতদিনে তার বদ অভ্যাসটুকু ভালোকরে বুঝে গিয়েছে। যার জন্য ঠিক উচিৎ জায়গা বরাবরই আঘাত করছে।
সে থমথমে মুখে এগিয়ে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিতে নিতে বলল,
–“একটু কোলে উঠবেন বললেই পারেন। এত অভিনয় করার কোনো প্রয়োজন ছিল না মুরুব্বি।”
রূপকথা তড়িঘড়ি করে সোফার হাত আঁকড়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল,
–“আমি আপনার সাথে এক বিছানায় ঘুমাবোই না।”
–“হচ্ছে কি রূপকথা?”, তপোবন রেগে গেল। রূপকথাও দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“শিক্ষক পিতা সমতুল্য হয়। খবরদার ছাত্রীর সাথে অসভ্যতা করবেন না।”
তপোবন এতক্ষণে বুঝলো ক্ষোভটা কোথায়। সে রাগান্বিত মুখপানে চেয়ে গনগনে স্বরে বলল,
–“পড়ার সময় টিচার, এমনিসময় হাজব্যান্ড। এইসব ফালতু কথা বলা বন্ধ করো।”
–“এগুলো ফালতু কথা না। বাস্তব কথা। যেদিন কঠোর টিচারের রূপ ছেড়ে ফুলটাইম স্বামী হতে পারবেন সেদিন আসবেন।”
বলেই রূপকথা কম্ফোর্টার মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। তপোবন কোমরে হাত দিয়ে কিয়ৎকাল মেয়েটিকে দেখে ওয়াশরুমে চলে যায়।
দরজা লাগানোর শব্দে রূপকথা বিশ্বজয়ের হাসি হাসল। হাসতে হাসতে কাত ফিরে আরামে চোখ বুজলো। কিন্তু দুই মিনিট বাদেই তার ঘুমন্ত দেহের উপর থেকে ঝট করে একটা ঝড় বয়ে গেল। কেউ এক ঝটকায় কোলে নিতেই রূপকথা ফের চেঁচিয়ে উঠল।
–“কি হলো, বলেছি না যেদিন আদর্শ স্বামী হতে পারবেন সেদিন আসবেন?”
–“আমি অলটাইম আদর্শ হাজব্যান্ড।”
তপোবন দৃঢ় কণ্ঠে বলেই ছোট্ট দেহটিকে বিছানায় চেপে ধরলো। রূপকথা রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“সবসময় আপনি এমন জোর খাটাতে পারেন না।”
তপোবন তার কথা অগ্রাহ্য করে। স্মিত হেসে রাগান্বিত মুখটি থেকে সব রাগ শুষে নেয়ার প্রয়াসে অজস্র ছোট্ট ছোট্ট চুম্বন এঁকে দিল পুরো মুখশ্রী জুড়ে।
একের পর এক চুম্বনে রূপকথার রাগ মোমের ন্যায় গলতে লাগল। চোখেমুখে ভর করে লাজ। বদ্ধ নেত্রে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“সরুন বলছি।”
একের পর এক চুমুর ঝড় থামতেই রূপকথা হাঁফ ছাড়ে। চোখ খুলতেই মুখের উপর থাকা মুখটি দেখেই সে কঠিন চোখে তাকালো। তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“ফুল টাইম হাজব্যান্ড হলে আপনি টিকতে পারবেন না, মুরুব্বি। আর এমন জেদ করবেন না। শাড়ি ছাড়া আপনাকে একটুও আমার আমার লাগে না।”
অন্তঃস্থলে হাজারো রঙিন প্রজাপতির আনাগোনা। তবুও রূপকথা রাগান্বিত মুখটি ধরে রাখে। বাঁকা চোখে চেয়ে চেয়ে সরে যেতে চায় কিন্তু পারে না।
তপোবন তাকে শক্ত হাতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ল্যাম্পটা নিভিয়ে দেয়। বুকভরা প্রশান্তি নিয়ে রূপকথা যখনি প্রিয় বুকটিতে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বোজে তখনি ফের তার মস্তিষ্কে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তপোবন শুধাল,
–“পরাবৃত্তের আদর্শ সমীকরণটা কী যেন?”
রূপকথা সরব বুক থেকে মাথা তুলে কঠিন চোখে তাকালো। তপোবন হেসে জোরপূর্বক ফের তার মাথা বুকে চেপে ধরে বলল,
–“তাড়াতাড়ি বলো, একবার সব সূত্র রিভাইস দিয়ে ঘুমিয়ে যাব।
অগত্যা রূপকথা রাগে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে শুয়ে তপোবনের সব প্রশ্নগুলোর জবাব দিল। সব প্রশ্নের জবাব দিতেই তপোবন প্রসন্ন মনে হাসল। অতি আদরে ছোট্ট দেহটিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ললাট বরাবর আলতো চুম্বন করে বলল,
–“আমি জানি তোমার কষ্ট হয়। কিন্তু দিনশেষে যখন সংসার, স্বামী সন্তান সব দায়িত্ব পালন করার পরেও নিজেকে আর পাঁচটা মেয়ের মতো সফল দেখবে, তখন এই সব কষ্ট মিলিয়ে যাবে। নিজেই যখন নিজের পরিবারের শক্তি হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে তখন এগুলোকে আর কষ্ট মনে হবে না আর দেড় বছর একটু বেশি কষ্ট হবে। একটা ভালো জায়গায় চান্স পেয়ে গেলে এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হবে না।”
রূপকথা বোঝে সব। কিন্তু প্রায়শই ধৈর্য্য হারা হয়ে যায়, আর ঠিক তখনি এমন একটা শক্তপোক্ত আশ্রয় পায়। সে বদ্ধ নেত্রে শক্ত করে ধরে পুরুষালী পৃষ্ঠদেশ। ফিসফিসিয়ে বলে,
–“আমি বুঝি।”
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“এর জন্যই তো আপনি আমার মুরুব্বি। একবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেলে আমি মরে গেলেও আর তোমাদের নিয়ে আমার টেনশন থাকবে না।”
ভীষণ আদুরে এক মুহুর্ত! অথচ সেই মুহুর্তে এমন কথা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল রূপকথার। সরব আঁধারের মাঝে এক জোড়া আঁখি চিকচিক করে উঠতেই তপোবন স্মিত হাসল। ছোট্ট মুখটিকে সামনে এনে নীরব অশ্রু গুলো মুছে দিতে দিতে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“কি মুশকিল বলোতো, এই বয়সে এসে এত ভালোবাসার ঋণ কি করে শোধ করব? শুধু শুধু অপরাহ্নের শেষ সময়ে কেন এলে? মৃত্যু যেদিন স্পর্শ করবে সেদিন ভীষণ যন্ত্রণা হবে।”
রূপকথা নাক টেনে কেঁদে উঠল। ক্রন্দনরত গলায় শুধায়,
–“এমন কথা কেন বলছেন?”
তপোবন ম্লান হেসে বলল,
–“মৃত্যু যে ধ্রুব সত্য। তবে সেই সত্য মানতে এতদিন একটুও ভয় হতো না কিন্তু ইদানিং…মনে হয় জীবনের লহমা আরেকটু লম্বা হোক। যেন আমার জীবনের শেষ আলোকচ্ছটায় আমি নিজেকে আরেকটু প্রজ্বলিত করতে পারি।”
ছোট্ট রূপকথার জীবনে ভালোবাসা, প্রেম, দায়িত্ব, ভরসা, আশ্রয় সবটা এই মানুষটা জুড়ে। তার কল্পনার চেয়ে অতীব সুন্দর এই মানুষটাকে হারাতে সে ভীষণ ভয় পায়। সে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
–“অলুক্ষণে কথা বলবেন না। আমি রোজ আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেটুকু সময় বাঁচবো একসাথে বাঁচবো। যতদিন আপনি নামক ছায়া থাকবেন ততদিন আমি থাকব। আমায় মোটেই একা একা সার্ভাইভ করার জন্য প্রস্তুত করতে হবে না। আমি আপনার ছায়াতলে বাঁচতে ভালোবাসি।”
তপোবন বিমুগ্ধ নয়নে চেয়ে শোনে মায়াবী মেয়েটির অশ্রুভেজা কণ্ঠ। সাদরে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
–“আর আমি আপনাকে আমার এই ছায়াতলে আগলে রাখতে ভালোবাসি, মুরুব্বি।”
রাতটুকু নিবিড় আলিঙ্গনে একে অপরের উষ্ণতায় কেটে যায়। ধীরস্থির তপোবন অনুভব করে সৃষ্টিকর্তা তার পৃথিবীটা একটু একটু করে আবার সুখময় করে তুলছে।
পরদিন শুক্রবার। রূপকথা নাস্তা বানানোর জন্য রান্নাঘরে ঢুকতেই দেখলো পিছু পিছু বাবা ছেলেও রান্নাঘরে ঢুকেছে। সে কৌতুহলী গলায় শুধাল,
–“আপনারা দু’জন এখানে কি করছেন? কিছু লাগবে? নাস্তা বানাতে একটু সময় লাগবে।”
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“উহু, আজ আমরাও তোমার সাথে নাস্তা বানাবো।”
রূপকথা বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“কোনো প্রয়োজন নেই। আপনারা কাজ আরো এলোমেলো করে দেবেন। জবা আপা আর মাজেদা চাচি আছে আমায় সাহায্য করার জন্য।”
তপোবন তার কথা শোনেনা। আটার কৌটা নামাতে নামাতে বলল,
–“আজ তোমাদের ছুটি। আজ আমরা বাবা ছেলে সবার জন্য নাস্তা বানাবো।”
তানশান রান্নাবান্নায় মোটেই আগ্রহ পায় না। কিন্তু সকাল সকাল বাবা নিয়ে এসেছে এখানে। বলল সব শিখতে হয়।
রূপকথা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে তাদের হাতে রান্নাঘর সপে দিয়ে চেয়ারে বসে রইল। জবা আর রোজ এসে আনন্দ পেল বাবা ছেলেকে রুটি গোল বানাতে গিয়ে যুদ্ধ করতে দেখে। রোজ ফরমায়েশ দিয়ে বলল,
–“ভাইজান, তোমার রোবোটের বাচ্চাকে বলো আমায় দু’টো পরোটা বানিয়ে দিতে।”
তপোবন গম্ভীর গলায় বোনকে শাসায়,
–“রোজ, ডোন্ট বোদার মাই সান।”
–“তোমার ছেলে একটা রোবোট ভাইজান।”
তানশান ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় রোজের দিকে। রোজ জিভ বের করে তাকে ব্যঙ্গ করে। ইদানিং দু’জনের পায়ে পায়ে ঝগড়া বাঁধে।
বরাবরের মতোই তপোবন সবকিছু খুব দক্ষতার সাথে সামলায়। বাবা ছেলে সবার আবদার পূরণ করল যথাযথভাবে। নাস্তা শেষ করে তপোবন বাবার সাথে দ্রুত বাজারে গেল।
আজ জমিজমা সংক্রান্ত আলোচনা সিকদার বাড়িতেই বসবে। কয়েকজন মানুষ বাড়িতে খাবে। এলাহী বাজার করা হয় সকাল সকাল। রূপকথা, জবা আর মাজেদা চাচি মিলে রান্নার জন্য সব কুটে বেছে নিচ্ছে।
বিশাল বিশাল মাছ এনেছে। তন্মধ্যে একটা ডিম ওয়ালা রুই মাছ দেখতেই নির্জনা বেগম নাক সিঁটকালো,
–“এগুলো কি এনেছে তোমার শশুর? এই মাছে কোনো স্বাদ আছে? ডিম ওয়ালা মাছ একদম স্বাদ লাগে না। ঐ মাছ আর ডিম সব চিত্রার মাকে ডেকে দিয়ে দাও, মাজেদা।”
চিত্রার মা পাশের বস্তিতে থাকে। প্রয়োজনে তাদের কাজে সাহায্য করে। নির্জনা বেগমের বেশ সহানুভূতি কাজ করে তার প্রতি। অন্যদিকে ডিম ওয়ালা মাছ দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাওয়া রূপকথার মুখশ্রী সরব কালো হয়ে গেল শাশুড়ির কথায়। তবুও কিছু বলতে পারল না। সে মাথা নেড়ে মাছগুলো আলাদা করে রাখল।
তানশান আর রোজের মাঝে ইদানিং তুমুল ঝগড়া বাঁধছে তাও কিছুক্ষণ পর পর। এটা মূলত রোজের চিরচিরে মেজাজের করণে। নয়তো তানশানের মতো শান্ত ছেলের সাথে ঝগড়া তার বাঁধে না। রূপকথা সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতেই তানশান আর রোজের চিৎকার ভেসে আসল।
–“গম্ভীর ছেলে! সবসময় আমার বাপ সাজতে আসবে না। নিজে তো মারলেও একটু হাসো না আর আমাকেও হাসিখুশি দেখতে পারো না।”, রোজের ক্ষিপ্ত কণ্ঠ।
তানশান রাগে নাক ফুলায়। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
–“তুমি বুড়ি একটা মেয়ে হয়ে যদি অবুঝের মতো কাজ করো তবে আমায় বাপ সাজতে হবে না? কি করেছো ওগুলো আমার বারান্দায়? আমাজনের জঙ্গল বানিয়ে রেখেছো! আমি ফ্রেশ বারান্দা পছন্দ করি তুমি জানো না? বাড়িতে বারান্দার অভাব রয়েছে? সেখানে যাও!”
রোজ পাল্টা চেঁচিয়ে বলল,
–“বাড়ির সব বারান্দাতেই গাছ রয়েছে শুধু তোমার বারান্দাতেই গাছ নেই বদমেজাজি, গোমড়া মুখো, একঘেয়ে ছেলে। আমি লাগাবো ঐ বারান্দায় গাছ।”
রোজের জেদি কণ্ঠে তানশান ক্ষিপ্ত স্বরে বাবাকে ডাকতে লাগল,
–“পাপাআআ? পাপাআআ?”
তপোবন নিচে সোফায় বসা ছিল। ছেলের কণ্ঠে সে উঠে দাঁড়ায়। ঘাড় উঁচু করে ছেলের পানে তাকিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হয়েছে তানশান? চিৎকার করছো কেন? রেগে আছো কেন?”
তানশান রেলিং আঁকড়ে ধরে নিচে তাকায় রোজকে উদ্দেশ্য করে বলে,
–“ফুপি, আমার বারান্দা কাঁদা কাঁদা, পানি পানি করে ফেলেছে পাপা। আর যতসব ফুলের গাছ, ক্যাকটাস গাছ পেরেছে সেখানে ভরিয়ে ফেলেছে। বাজে লাগছে, আমি একটু বসতেও পারব না সেখানে। কিছু বলো, আমি বারণ করলে আমার ওপর রাগ দেখাচ্ছে। উগ্র হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।”
তপোবন হাঁক ছেড়ে রোজকে ডাকল। ছেলের পছন্দ সম্পর্কে অবগত সে। খোলামেলা সাদাসিধে সব পছন্দ। সে হাঁক ছেড়ে বলল,
–“রোজ? কি হচ্ছে? ওর বারান্দায় কি করো তুমি?
এর মধ্যেই রোজ হৈ হৈ করে উঠল।
–“ভাইজান, তোমার এই যান্ত্রিক ছেলেকে মোটেও সাপোর্ট করবে না। দিনে দিনে যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। রোবট একটা! গাছ পছন্দ করে না এমন মানুষ পাওয়া যায়? গাছ না থাকলে তোমার ছেলে বাঁচতো?”
–“আমি বলেছি আমি গাছ পছন্দ করি না? আমি বলেছি আমার রুমে ঝঞ্ঝাট পছন্দ করি না!”, তানশানের ক্ষিপ্ত কণ্ঠ। রূপকথা হতাশ হয়ে তানশানকে টানতে লাগল। তানশান মেজাজ দেখিয়ে বলল,
–“আরে মিমি ছাড়ুন! দেখছেন কি উগ্র হয়েছে আজকাল? সব কথায় এমন রাগ দেখায়। দাদুকে বলব বিয়ে দিয়ে দিতে। একদম ঠিক কাজ হবে। জামাইয়ের পেটান খেলে তুমি একদম ঠিক হয়ে যাবে, রাগচটা মেয়ে!”
তানশান শেষের কথা চেঁচিয়ে বলল রোজের উদ্দেশ্যে। রোজ রাগে হিসহিসিয়ে বলে,
–“এটা আমার বাবার ঘর, বদ ছেলে! নিজের ইচ্ছা ব্যতীত কেউ আমায় এই ঘর থেকে বের করতে পারবে না।”
–“এটা আমারও বাবার ঘর!”, তানশান চেঁচিয়ে বলল।
তপোবন আর তকদির সিকদার ঠিক শুনলো দু’জনের কলহ। তপোবন ডানে বামে মাথা নাড়ে।
রূপকথা তানশানকে টেনে নিয়ে এনে ঘরে বসায়। পানি এনে দিয়ে বলে,
–“শান্ত হও এত রাগছো কেন? সে তোমার বড়! রাগতেই পারে, তাই বলে তুমি রাগতে পারো না।”
–“তাই বলে আমি তার অনৈতিক কাজকর্ম মেনে নেব?”
–“অনেক সময় মানতে হবে।”
–“আই কান্ট!”
তানশানের রাগান্বিত স্বরে রূপকথা তাকে চোখে শাসায়। থমথমে মুখে বলে,
–“এটা খারাপ আচরণ, তানশান। তোমায় মাথায় রাখা উচিৎ কেউ একজন সর্বদা তোমায় লক্ষ্য করছে। তোমার আচরণে সে ব্যথিত হবে। সে কষ্ট পাক এটা তুমি চাও?”
সহসা তানশানের মুখশ্রী থেকে রাগ বিলীন হয়ে গেল। সে চোখ তুলে অপ্রস্তুত চোখে তাকায়। রূপকথার মুখশ্রী একদম স্বাভাবিক, কঠোর!
রূপকথাকে স্বাভাবিক দেখে তানশানের মনেও কোন দ্বিধার দোলাচল দেখাগেল না। সেও স্বাভাবিক ভাবে বলে,
–“মাম্মাকে আমি কষ্ট দিয়েছি?”
–“হুঁ, আর তুমি যখন খারাপ আচরণ করো, রাগ দেখাও তখন সে কষ্ট পায়। তোমায় যখন কেউ খারাপ বলবে তখন তার থেকে বেশি কষ্ট কারোর হবে না।”, রূপকথা নরম কণ্ঠে বলল।
তানশান জবাব দিল না চুপ করে রইলো। তবে ছেলেটা হঠাৎ কেমন মিইয়ে গেল। মাথা নুইয়ে থুতনি ঠেকেছে বুকে। রূপকথা নিচু হয়ে দেখে ছেলের মুখাবয়ব। ওমনি সে চমকে উঠল চোখে পানি দেখে।
রূপকথা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে বড় একটা ছেলেকে এমন ছোট একটা বিষয় নিয়ে কাঁদতে দেখে। কিন্তু মা নামক অনুভূতি কি সন্তানের বয়সের ফারাক দেখে? দেখে না!
সে তড়িঘড়ি করে ছেলের মাথাটা আগলে নেয় নিজের সাথে। আদুরে গলায় বলে,
–“কি হলো কাঁদছো কেন? আমার কথায় কষ্ট পেয়েছো?”
তানশান লালচে নেত্র তুলে তাকায়। অবুঝের মতো শুধায়,
–“আমি কি মাম্মাকে কষ্ট দিয়েছি? সে নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছে আমি ফুপির সাথে ঝগড়া করেছি তাই। আমি তাকে স্যরি বলব কি করে? মাম্মা তো খুব কষ্ট পেয়েছে, মিমি। আমি কি করব?”
মা হয় অসীম ক্ষমতাধর। দেখো না দূর থেকেই কিভাবে ছেলেকে সঠিক পথ দেখাচ্ছে! রূপকথা হেসে ফেলল। বলল,
–“বোকা ছেলে এর জন্য কাঁদতে হয়? একটু পর আজান দেবে। তাড়াতাড়ি গোসল করে আসো। জুম্মার নামাজ পড়ে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে স্যরি বলবে। সে তোমার মায়ের কাছে স্যরি টা পাঠিয়ে দেবে।”
–“তুমি কি সত্যি বলছো?”
তুমি? রূপকথার অন্তঃস্থল ধড়াস করে উঠল। আন্দোলিত হয় সম্বোধনটি শুনে। অপ্রস্তুত মাথা নেড়ে সায় জানায়। তানশান তৎক্ষণাৎ চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। গোসলে যাবে। রূপকথা পিছু ডেকে বলে,
–“তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।”
–“বলুন।”, তানশান তোয়ালে হাতে নিয়ে বলল। ফের আপনি রূপকথা হতাশ হতে গিয়েও হলো না। এগিয়ে এসে ইতস্তত কণ্ঠে বলে,
–“তোমার দাদুভাই একটা বড় ডিম ওয়ালা মাছ এনেছে। মাছের পেটে অনেক অনেক ডিম রয়েছে। খুবই সুস্বাদু খেতে। কিন্তু তোমার দাদুমনি সেগুলো মানুষকে দিয়ে দিতে বলছে। আমার খুব পছন্দ মাছের ডিম। আমি খুব ছোটবেলায় একবার খেয়েছিলাম আর খাওয়া হয়নি। অতবড় মাছ কখনো কেনা হয় নি তো! তুমি কি একটু তোমার দাদুকে বলবে মাছটা কাউকে দিয়ে দিক কিন্তু ডিমগুলো যেন না দেয়!”
রূপকথা বাচ্চাদের মতো করে বলল। তানশান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তাদের বাড়িতে ইলিশ মাছের ডিম ব্যতীত কোনো মাছের ডিম খাওয়া হয় না। সেও কখনো খায়নি। সে বলে,
–” আপনি বলুন।”
–“তোমার দাদু একটু রাগী! আমার ভয় করে!”, রূপকথা কাঁচুমাচু করে বলল।
–“তাহলে পাপাকে বলুন। দাদু আমার কথা শুনবে?”
–“তোমার পাপা অনেক মানুষের মাঝে, আমি কিভাবে বলব?”
রূপকথার কণ্ঠে অসহায়ত্ব। তানশান তোয়ালে রেখে ঘর থেকে বের হয়। রেলিং ধরে নিচু তাকালে বাবার সাথে কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ লোকের দেখা পায়। সে গলা উঁচিয়ে ডাকল বাবাকে।
–“পাপা?”
ছেলের ডাকে তপোবন কথা থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–“কি আব্বু? ডাকছো?
–“পাপা, পাঁচ মিনিটের জন্য একটু উপরে আসবে?”
–“জরুরী?”
–“অনেক!”
–“আসছি, যাও।”
তানশান ঘরে চলে আসে। রূপকথাকে বলে,
–“নিন আমি ডেকে দিয়েছি। এখন পাপাকে বলুন।”
বলেই তানশান বাথরুমে ঢুকে যায়। রূপকথা বাইরে বের হতেই দেখল তপোবন এগিয়ে আসছে। তপোবন রূপকথাকে দেখে শুধায়,
–”তানশানের কি হয়েছে? রাগ এখনো কমেনি?”
–“উহু, আমি ডেকেছি আপনাকে।”
–“তুমি?”
–“হু।”, রূপকথা মিনমিনে স্বরে বলল।
–“হু বলো, কি বলবে?”
রূপকথা ইতস্ততা নিয়ে বলে,
–“আমার মাছের ডিম খুব ভালো লাগে! অনেক বছর হয়েছে খাইনি। ছোট বেলায় খেয়েছিলাম।”
এতটুকু বলে থামে। তপোবনের মুখশ্রী কৌতুহলী। কথার আগামাথা যে সে বোঝেনি তা স্পষ্ট। রূপকথা আবার বলে,
–“বলছিলাম যে, আব্বু একটা ডিম ওয়ালা মাছ এনেছে। আম্মা সেটা দেখে রাগারাগী করেছে। একজনকে দিয়ে দিতে বলেছে। আপনি যদি একটু আম্মাকে বলতেন, মাছটা দিয়ে দিক কিন্তু ডিমগুলো না দিতে।”
তপোবন কিয়ৎকাল তাকিয়ে রইল। অতঃপর মিহি স্বরে বলে,
–“তুমি গিয়ে মাছের ডিম রান্না করো। বাকিটা আমি দেখে নেবো।”
রূপকথার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
রূপকথা তখন পুরোদস্তুর দুপুরের রান্নায় মনোযোগী হয়। তন্মধ্যেই তাকে খানিক অবাক করে দিয়ে নির্জনা বেগম রান্নাঘরে ঢুকলেন। রূপকথা শাশুড়িকে দেখতেই তড়িৎ গতিতে মাথায় কাপড় টানলো। শাশুড়ি তো পারতে সই রান্নাঘরে ঢোকে না। সে ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে শুধায়,
–“কিছু লাগবে আম্মা?”
নির্জনা বেগম শান্ত দৃষ্টি ফেলল। রূপকথার কথা উপেক্ষা করে নম্র কণ্ঠে শুধায়,
–“তোমার কলেজ থাকে না?”
–“জি, থাকে আম্মা।”, রূপকথা আঁচলে হাত মুছে বলল।
–“তো, যাও না?”
শাশুড়ির অস্বাভাবিক অনাকাঙ্ক্ষিত কথায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল রূপকথা। ইতস্তত কণ্ঠে বলে,
–“জি, না মানে… ঘরে তো অনেক কাজ থাকে। কলেজে গেলে এগুলো..”
তার কথার মাঝেই নির্জনা বেগম ব্যগ্র কণ্ঠে বললেন,
–“তুমি কলেজে যেতে পারো। রান্না আমি করে নেব।”
অভাবনীয় কথায় রূপকথা অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
–“হ্যাঁ?”
নির্জনা বেগম তার হাত থেকে খুন্তিটা নিতে নিতে বললেন,
–“তোমার কলেজে যেতে পারো। ঘরের কাজের কথা চিন্তা করতে হবে না।
রূপকথা হতভম্ব! শাশুড়ির মাঝে পুরোনো সেই চোখের আর কথার তেজ যেন অচিরেই হারিয়ে গিয়েছে। সে হতভম্ব ভাব সামলে কিয়ৎকাল বাদ বলল,
–“আমায় দিন, আম্মা। আপনার পায়ে ব্যথা। আমার কলেজের পড়া আপনার ছেলে ঘরে বসেই পড়ায়। যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
–” বেশি কথা বাড়িও না। আমার শরীর এখন বেশ ভালো আমি রান্না করে নিতে পারব। আর জবা, মাজেদা তো আছে, চিন্তা করো না।”
রূপকথা বিস্ময় আঁকড়ে পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। নির্জনা বেগম তরকারি দেখতে দেখতে শুধায়,
–” তপোবনের সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন যাচ্ছে?”
রূপকথা দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলে,
–“জি, ভালো।”
–“স্বাভাবিক?”
ফের শাশুড়ির প্রশ্নে রূপকথা ইতস্তত কণ্ঠে বলল,
–“জি আম্মা।”
–“দাম্পত্য জীবনে কারোর প্রতি কোনো অভিযোগ নেই?”
–“না আম্মা।”
–“তপোবন কি চায় তুমি পড়াশুনা করে চাকরি করো?”
–“হুঁ।”
নির্জনা বেগম উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
–“তাহলে তার কথামতো পড়াশুনায় মনোযোগ দাও। ঘরের কাজের জন্য চাপ নেয়ার প্রয়োজন নেই। আমার শরীর ভালো যাচ্ছে। না পারলে জবা রান্না করবে। তুমি শুধু তপোবন আর তানশানের দেখাশোনায় কমতি রেখো না।”
রূপকথা হা করে তাকিয়ে আছে। বিস্ময়ে বাঁক হারা হয়ে যায়।
পরপরই নির্জনা বেগম আবারো বলে,
–“তপোবন যেভাবে চায় সেভাবে চলো। ও যদি শাড়ি পড়া পছন্দ না করে, ঐসব কি যেন বলে মডার্ন জামাটামা যদি পছন্দ করে তাহলে তাই পড়ো। তবুও ওর চাহিদা মোতাবেক চলবে।”
রূপকথা এতক্ষণে বুঝলো শাশুড়ির বদলে যাওয়া এই কথার ধরণের কারণ। সে মৃদু হেসে বলল,
–“আপনার বড় ছেলে মাটির মানুষ আম্মা। তার থেকেও সুন্দর বিষয় হলো, তার চোখে তার পরিবার আর স্ত্রী সন্তান ব্যতীত অন্য কেউ কোনো দৃষ্টি মুগ্ধতা সৃষ্টি করে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
নির্জনা বেগম নিরুত্তর। বড় ছেলেকে সে চেনে তবুও মানুষ বদলে যেতে কতক্ষণ। নিজের ভাগ্য আর সংসারটা দেখলে তার রুহ কেঁপে ওঠে। সে ছলছল নেত্রে ইলিশ মাছটা কাটতে কাটতে হঠাৎ করেই বলতে শুরু করল,
–“আমরা চার বোন। আমি বড়, আমার পরে নিম্রিত, তার পরে নিশাত আর সবার ছোট নিঝাম। আমি তখন কেবল ইন্টার পাশ করেছি। আর নিম্রিত মেট্রিক পাশ। আমরা চার বোন রুপে ছিলাম অনন্য। যে দেখতো সেই চাইতো আমাদের মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের একটা সুন্দরী মেয়েকে পুত্রবধূ করতে।
প্রতিদিন অনেক সম্বন্ধ আসতো কিন্তু বাবা না করে দিতেন। এমনি একদিন তোমার শশুরের বাবা আমার জন্য তোমার শশুরের সম্বন্ধে নিয়ে যায়। আমার বাবা গ্রহণ করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো তোমার শশুর আমায় না বরং আমার ছোট বোন নিম্রিতকে পছন্দ করে। তোমার শ্বশুরের পরিবার ছিল বিত্তশালী আর প্রভাবশালী। আমার বাবা কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চায়নি সম্বন্ধটা। নিম্রিত রাজি থাকায় সেও রাজি হয়ে যায়। এরপর তোমার শ্বশুরের সাথে নিম্রিতের বিয়ে হলো।”
রূপকথা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তখনো সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সে অস্ফুট স্বরে শুধায়,
–“আব্বুর সাথে আপনার ছোট বোনের বিয়ে হলে সে কোথায় আর আপনি এখানে কেন?”
রূপকথার প্রশ্নে নির্জনা বেগম ম্লান হাসলেন। রূপকথার চোখে চোখ রেখে বললেন,
–“ওই যে নির্মম ভাগ্য! তোমার আসল শাশুড়ি নিম্রিত। আমি তো কেবল সম্পর্কের মারপ্যাঁচে আঁটকে যাওয়া একটা গলা কাঁটা মুরগি। যে কি-না আজীবন শুধু ছটফট-ই করে গিয়েছি।”
রূপকথা অবাক কণ্ঠে শুধায়,
–“এগুলো কি বলছেন আম্মা? আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”
–“বলছি।”
সে পুনরায় বলতে শুরু করলেন,
–“নিম্রিতের বিয়েতে আর কেউ খুশি হোক বা না হোক, আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম। কারণ আমি তখন সদ্য কারোর প্রেমে পড়া এক পাগল প্রেমিকা ছিলাম। এতটাই পাগল ছিলাম—যে আমি তার প্রতীক্ষায় পরিবারের সাথে লড়তে লড়তে দীর্ঘ বত্রিশ বছরেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইনি। কারণ আমার প্রিয় মানুষটার চাকরি ছিল না। বাবা চাকরি ছাড়া কারোর হাতে আমায় দেবে না।
আর আমিও আমার প্রিয় মানুষটাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না।
কিন্তু একটাসময় আমার এই জেদ টলে গেল।
আমার তখন বত্রিশ বছর বয়স ছিল। তোমার শশুর নিম্রিতকে খুব ভালোবেসে পড়াশুনা করান। তখন নিম্রিত তিন সন্তানের মা। একটা স্কুলে চাকরি করত। আর তোমার শশুর রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। ঠিক তখনই একদিন হঠাৎ করেই আমাদের জীবনটা ওলোটপালোট করে দিয়ে নিম্রিত তার সহকর্মীর সাথে পালিয়ে যায় তিন সন্তান ফেলে।
মা হীনা সেই তিন সন্তানের নির্মম চেহারা মায়ের মন টলাতে না পারলেও, আমার জীবনটা ওখানেই থমকে যায়। প্রিয় মানুষটির জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা ফুরিয়ে যায়। বাবার অনুরোধ আর অনুশোচনার ফলশ্রুতিতে আমার ভাগ্য হয়ে ওঠে নিম্রিতের ফেলে যাওয়া তিন সন্তান।
বোনের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমি করেছিলাম তিন সন্তানকে আগলে নিয়ে। পরিবর্তে অবশ্য একটাসময় তোমার শশুর আমায় সম্মান, ভালোবাসা, মাতৃত্বের সুখ সব দেয়।
কিন্তু আজ ও বুকের ভেতর ভীষণ ব্যথা করে জানো? ভয় জমতে জমতে আমি আজ ভীতু হয়ে গিয়েছি।
আজ ও আমার চোখের সামনে ভাসে ত্রিশ বছর আগে ফেলে আসা আমার প্রিয় মানুষটার অসহায় মুখটি। আমি ভেঙে পড়ি, আবার গড়ি নিজেকে। যতবার ভাঙি ততবার গড়ি, ঠিক তপোবনের মতো। তপোবন তখন বুঝদ্বার ছিল, সে সব বুঝতো। সৃষ্টিকর্তা তাকেও বারংবার ভাঙে আর সে নিজেকে গড়ে তোলে।”
নির্জনা বেগম অঝোরে কাঁদছেন। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা রূপকথার চোখ বেয়ে কখন দুই ফোঁটা অশ্রু গড়ালো টের পেল না মেয়েটি।
নির্জনা বেগম চোখের পানি মুছে নেয়। রূপকথার পানে চেয়ে বলেন,
–“সেই থেকে আমি পরকিয়া, সংসার ভাঙনকে খুব ভয় পাই, রূপকথা। উন্মাদ হয়ে যাই আমি নিজের জীবনের নির্মমতা মনে করে। তাই তোমায় পড়াশুনা করাতে আমি ভয় পেতাম, সেদিন তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি। আমায় ভুল বুঝো না। আমি জানি না আমার জায়গায় থাকলে তোমরা কি করতে! কিন্তু আমি ভীষণ ভয় পাই। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সবসময় আমার সাথে এমন কেন করে বলোতো? আমার মৌন! আমার মৌনকে আমার চোখের সামনে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছে আরা মি কিছুই করতে পারিনি। বুঝেও বারবার মৌনতাকে ধৈর্য্য ধরতে বলেছি। আমায় ক্ষমা করে দিও তোমরা। আমি ভয়ে এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে তোমাদের উপর চাপ প্রয়োগ করেছি।”
নির্জনা বেগম ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। রূপকথা কালবিলম্ব করে না একটা শক্তিশালী নারীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ফিসফিসিয়ে বলল,
–“আপনি ক্ষমা চাইবেন না, আম্মা। আমি দুঃখিত, আমরা কখনো আপনাকে বুঝতে চাইনি। আপনার জীবন যে এত কঠিন তা বুঝতেই পারিনি। আমি দুঃখিত আম্মা। আপনার ভয় একদম সঠিক, একদম সঠিক।”
নির্জনা বেগম কম্পিত হাতে তাকে প্রথমবারের মতো জড়িয়ে ধরে। অনুনয় করে বলে,
–“তোমার বয়স অনেক কম তপোবনের থেকে। আমি জানি তোমার জীবন ও অনেক কঠিন। কিন্তু বিয়েটা তো হয়ে গিয়েছে তাই না? তুমি আমার তপোবন, তানশান আর এই পরিবারটাকে একটু আগলে রেখো, রূপকথা। আমি অনুরোধ করছি, কখনো হাল ছেড়ে চলে যেও না। তবে আমার সব লড়াই ফিকে পড়ে যাবে রূপকথা।”
রূপকথা অশ্রুসিক্ত নয়নে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“এই সংসার ছেড়ে কখনো কোথাও যাব না। এই সংসার যে আমার ভিত্তি। আমি সবসময় এই সংসারকে, আপনার ছেলে আর নাতনিকে আগলে রাখব আম্মা। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।”
নির্জনা বেগম ম্লান হেসে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। ফিসফিসিয়ে বললেন,
–“অনেক অনেক সুখী হও। আর এই বুড়ো মাকে ক্ষমা করে দিও।”
একটু মন খুলে কথা বলা—এক নিমিষেই একটা জটিল সম্পর্ক সহজ হয়ে গেল। রূপকথা আর নির্জনা বেগম চোখ মুছে বললেন,
–“এসো আজ একসাথে রান্না করি। কাল থেকে রোজ কলেজে যেও।”
–“আচ্ছা আম্মা।”, রূপকথা হাসিমুখে বলল।
পরপরই ডেকে উঠল শাশুড়িকে।
–“আম্মা?”
নির্জনা বেগম ফিরে তাকায় রূপকথার দিকে। রূপকথা ছলছল নেত্রে হাসিমুখে স্বগৌরবের সাথে বলল,
–“আপনি-ই আমার একমাত্র আর বেস্ট শাশুড়ি।”
নির্জনা বেগম ম্লান হাসলেন। বললেন,
–“তোমার মতো তপোবন ও আমায় একদিন বলেছিল, আমি তার একমাত্র এবং বেস্ট মা।”
রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
–“সে সত্যি বলে। আপনি বেস্ট মা।”
তপোবন জুম্মার নামাজের জন্য গোসল করে বের হতেই কক্ষে রূপকথা ঢুকলো। ঘর্মাক্ত মুখশ্রী দেখে তপোবন এগিয়ে আসে। শীতল হাতে নাকের ডগার ঘামগুলো মুছে দিয়ে বলে,
–“আজ অনেক কষ্ট হয়ে গিয়েছে তাই না? এতগুলো মানুষ বাসায় খাচ্ছে? আমি আব্বুকে বলেছিলাম রেস্তোরাঁয় খাইয়ে দেই কিন্তু সে বলল ঘরের খাওয়ার বিষয়টা অন্যরকম।”
রূপকথা তার কথার ভ্রুক্ষেপ করে না বরং হুট করেই শক্ত করে বুকে লেপ্টে গেল। তপোবন কিছুটা অবাক হলো। রূপকথা হুটহাট এমন আচরণ করে না। সে তাকে আগলে নিয়ে শুধাল,
–“কিছু হয়েছে? আম্মা কি ডিমের জন্য কিছু বলেছে?”
রূপকথা টলটলে নেত্রে না বোধক মাথা নাড়লো। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আগে ভাবতাম আমি একাই শুধু দুঃখী। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আশেপাশের সব মানুষগুলোর ভেতরে অনেক কষ্ট। কিন্তু আমি কাউকে বুঝতে পারি না।”
–“কে বলেছে বুঝতে পারো না? এইটুকু মেয়ে এত জটিল সম্পর্ক আর পরিস্থিতি এত স্মুথলি পার করে এসেছে এটা কোন অংশে কম?”
রূপকথা বুক থেকে মুখ তুললো। ছলছল নেত্রে বলল,
–“আমি আপনাকে, আম্মাকে, মৌনতা ভাবিকে কাউকে বুঝতে পারিনি। আমার চোখের সামনে সব মানুষগুলো অনেক কষ্টে ছিল, আছে।”
তপোবন মৃদু হেসে তার দুগাল আঁকড়ে ধরে ললাটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। বলল,
–“তুমি যে না বুঝেও আমাদের দুঃখের উপশম হয়েছো তা কি জানো? এই যে বুঝতে চাওয়াটা এটা বুঝতে পারার থেকেও অনেক বেশি মহত্ত্বপূর্ণ। সবার এই মন থাকে না। তুমি একদম ঠিক আছো। তুমি এমন একটা মেয়ে যার দেহ মন সবটা পবিত্রতায় মোড়া।”
রূপকথা ছলছল নেত্রে স্মিত হাসল। চোখের পানি মুছে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“কিন্তু এখন আমি সবাইকে বুঝতে পারছি। আর কাউকে কষ্ট পেতে দেব না সবাইকে ভালোবেসে আগলে রাখব।”
তপোবন মুগ্ধ চিত্তে তার মাথায় হাত রেখে বলল,
–“তোমার সব ইচ্ছে পূরণ হোক।”
অতঃপর বাবা-ছেলে নামাযে যায়। শাশুড়ি গোসলে গিয়েছে। রূপকথা সেই ফাঁকে বড় সাধ করে মাছের ডিম গুলো রান্না করে।
তপোবন,তানশান আর তকদির সিকদার আজ নামায শেষে চমৎকার উপহার নিয়ে এসেছে রূপকথা আর রোজের জন্য।
তারা তিনজন হাত ভরতি জিলাপি এনে দু’জনের হাতে দিয়ে বলল,
–“নাও তোমাদের জন্য মিলাদের জিলাপি এনেছি। খেয়ে বলবে, যার জন্য দোয়া করিয়েছে তা যেন আল্লাহ কবুল করে।”
রূপকথা বিমুগ্ধ হয়ে নিজের পরিবারটাকে দেখে। এতটুকুতেই সে বেজায় খুশি।
মেহমানদের খাওয়া শেষ হতেই যখন পরিবারের সবাই খেতে বসল তখন বাঁধলো বিপত্তি। নির্জনা বেগম নাক সিঁটকাতে শুরু করল মাছের ডিম টেবিলে দেখে। সে রেগে গিয়ে বলল,
–“জবা? মাজেদা? তোমাদের কি মতিভ্রষ্ট হয়েছে? মাছের ডিম কেন রেঁধেছো? কে খায় আমাদের ঘরের এগুলো? জীবনে দেখেছো এগুলো আমরা কেউ মুখে তুলেছি।”
তার কথা শেষ হতে না হতেই সরব তপোবন আর তানশান গম্ভীর গলায় একই সাথে বলে উঠল,,
–“দাদুমনি আমি রান্না করতে বলেছি, আমি খাবো।”
তপোবন ও তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,
–“আম্মা, আমি রান্না করতে বলেছি।”
বাবা ছেলে দু’জনে একই সাথে বলেই দু’জনে ই থমকালো। তানশান- তপোবন একে অপরের দিকে অপ্রস্তুত চোখে তাকায়। অতঃপর দু’জনে ই হেসে ফেলল।
তপোবনের হাসি প্রগাঢ় হয় ছেলের চাপা হাসি দেখে। স্নেহের সাথে বাম হাতটি আপনাআপনি ছেলের মাথায় চলে গেল। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মায়ের দিকে তাকায়। মৃদু হেসে বলল,
–“মাছের ডিম খেতে অনেক মজা, আম্মা। এখন থেকে মাছ না খেলেও মাছের ডিম খাবো। রূপকথা আমার আর তানশানের প্লেটে দাও।”
বিড়ালের মতো চুপটি করে বসে থাকা রূপকথা হঠাৎ মুক্ত নিঃশ্বাস ফেলল বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে। প্রফুল্ল হেসে তাদের পাতে মাছের ডিম দিলে তানশান বাবার দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকালো। সে আগে কখনো খায়নি। তপোবন তাকে আশ্বস্ত করলো না বরং নিজের পাত থেকে সুন্দর করে এক গাল মেখে ছেলের মুখে তুলে দেয়।
তানশান দ্বিরুক্তি করলো না চুপচাপ খেয়ে নিলো। খারাপ নয় বরং ভারী মজা। অতঃপর সবাই একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল। নির্জনা বেগম চোখ ভরে দেখল তিনজনের মিল মহব্বত! ভেতরের ব্যথা একটু হলেও কমতে লাগল।
বিদেশের মাটিতে পা দিয়েও কখনো চোখ ভরে আকাশ দেখতে না পারা মেয়েটির দিনগুলো মন্থরগতিতে নারকীয় হয়ে উঠছে। দৈহিক অবনতি ইদানীং পরিচিত মুখগুলোকেও একটু একটু করে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
চার দেয়ালের মাঝে কেমোর বিদঘুটে রাসায়নিক গন্ধ, বাতাস জীবাণুমুক্তকরণ যন্ত্রের গড়গড় শব্দ, নড়াচড়া করার বিন্দুমাত্র শক্তি না থাকা—এমনি এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করে যাচ্ছে মৌনতা। এমনকি একটা ল্যাভেন্ডার ফুলও কক্ষে তাকে সঙ্গ দিতে পারছে না।
ইনডাকশন থেরাপি দেওয়ার চব্বিশ ঘণ্টার মাঝেই পরিবর্তন আসতে শুরু করে। আজ পাঁচ দিন ধরে মৌনতাকে পুরো চব্বিশ ঘণ্টা ইনডাকশন থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। এটা এতটাই শক্তিশালী যে ক্যানসার কোষ ছাড়াও শরীরের সুস্থ রক্তকণিকাগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।
মৌনতার দেহ সাময়িকভাবে নিজের সক্ষমতা হারাচ্ছে। শ্বেত রক্তকণিকার পরিমাণ শূন্যের কোঠায় চলে আসছে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কমে যাচ্ছে; যেখানে সামান্য একটু বাতাসেও জ্বর চলে আসে।
বিগত পাঁচ দিন প্রতিদিন রাত দশটা নাগাদ মাসুমা বেগম বাড়িতে যান, আর এরপরের সময়টুকু এরোজ মৌনতার সাথে থাকে। রোজকার নিয়মানুযায়ী আজকেও ঠিক রাত দশটায় এরোজ কক্ষে ঢুকল। তবে আজ শুধু স্যানিটাইজ নয়, বরং তার পুরো দেহ হসপিটাল পোশাক দিয়ে ঢাকা; শুধু চোখ দুটো ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কোনোভাবে যদি মৌনতা সংক্রমিত হয়, তবে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটবে।
এরোজ ধীর কদমে এগিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসল। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল একটা রুগ্ন মুখের দিকে। এরোজ শুকনো ঢোক গিলল; মসৃণ চামড়াগুলো ক্রমে হাড়ের সাথে মিশে যাচ্ছে। যেন এক কঙ্কাল! মানুষটার যন্ত্রণা অনুভব করে চোখ ভরে ওঠে, তবুও সে অটল থাকে। এই সময়টা ভেঙে পড়ার নয়, বরং শক্তভাবে লড়াইয়ের।
অক্সিজেন মাস্কের সাহায্যে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে থাকা মৌনতা নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে দেখে। এরোজের ধূসর চোখ দুটো ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
এরোজ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর রোজকার মতো বলে,
– “হাই!”
মৌনতা দুর্বল হেসে কিছু ইশারা করল। এরোজ ইশারাটা বুঝল। হাত বাড়িয়ে মাস্কটা খুলে দিল। মৌনতা ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেলল। এরোজ ফের শুধাল,
– “হাউ আর ইউ?”
তবে আজ আর রোজকার মতো উত্তর পেল না। শরীর আর পরিস্থিতি সেই ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। অথচ এরোজ তৃষ্ণার্ত ছিল রোজকার সেই সামান্য কথোপকথনের জন্য। মৌনতা ম্লান মুখে মৃদু হেসে ফিসফিস করে কিছু বলল, কিন্তু এরোজ তা শুনতে পেল না। মৌনতা গলার স্বর বাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু শরীর সেই শক্তির জোগান দিতে পারল না। বিগত কিছুদিন ওষুধের তীব্র প্রভাবে সে কিছুই খেতে পারছে না।
মানুষটা কথা বলতে চায়। এরোজ নিজের মুখ এগিয়ে নিল। মিহি স্বরে বলল,
– “এখন বলুন। আমি সব শুনছি।”
মৌনতা ফিসফিসিয়ে বলল,
– “নায়েল?”
এরোজ প্রফুল্ল কণ্ঠে বলল,
– “নায়েল এখন এখানকার সবার সাথে মিশতে শিখে গিয়েছে। আমার কলিগের ছেলের সাথেও তার বন্ধুত্ব হয়েছে। একটু আধটু ইংলিশ বোঝে আর বলার চেষ্টাও করে।”
মেয়ের কথা শুনেই মৌনতা ছলছল চোখে হাসল। এরোজ ক্ষীণ স্বরে শুধাল,
– “আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না?”
মৌনতা অতি নিকটে থাকা মুখপানে তাকাল। কণ্ঠে জোর না দিয়েই ফিসফিসিয়ে বলল,
– “ভালো আছি, খুব ভালো আছি। আর মাত্র দুদিন, তারপর এক সপ্তাহ শেষ। আমি ছুটি পাব। নায়েলের সাথে দেখা করতে পারব।”
একজন মায়ের দৃঢ় কণ্ঠ আর প্রতীক্ষার হাহাকার শুনে এরোজের শির নত হয়ে আসে। তার চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়ায়। মৌনতার মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা থাকলেও, ইদানীং সে নায়েলের ‘মাম্মা’র মুখোমুখি হওয়ার সাহস পায় না। এরোজ আজও নীরবে এড়িয়ে গেল মৌনতার সেই আনন্দকে। কী করে বলবে—মানুষটা যে আশায় এত যন্ত্রণা হাসিমুখে সহ্য করছে, তার সবটাই মিথ্যা?
এরোজের স্থবিরতা ভাঙল মৌনতার শিশুসুলভ কণ্ঠে। মৌনতা ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
– “শুনছেন? নার্সকে একটু বলবেন তিনি যেন আমার চুল না আঁচড়ান। ইদানীং আমার অনেক চুল পড়ছে। বালিশেও গোছা গোছা চুল লেগে থাকে। আঁচড়ালে আরও বেশি পড়বে। আপনি একটু বারণ করবেন তো?”
এরোজ আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। কোনোমতে ‘হুঁ’ বলে একছুটে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল। করিডরের বেঞ্চিতে বসতেই ভেতর থেকে কান্না উপচে বেরিয়ে এল। এরোজ শব্দ করে কেঁদে উঠল। ক্রন্দনরত গলায় অস্ফুট স্বরে আওড়াল,
– “সরি, মৌন সরি! আ’ম রিয়্যেলি ভেরি সরি। আমি একদম মিথ্যা বলতে চাই না।”
মৌনতা বন্ধ দরজার দিকে চেয়ে অপেক্ষা করল। কিন্তু আর কেউ এল না। এভাবেই একসময় মৌনতার অপেক্ষার প্রহর ফুরাল। কিন্তু ফুরাল না তার মাতৃত্বের অপেক্ষা আর হাহাকার।
সাত দিন শেষ। কিন্তু যখন মৌনতা নিজের দিকে তাকাল, তখন তার চোখেমুখে একটাই প্রশ্ন—মানুষগুলো তার সাথে মিথ্যা বলল কেন? মানুষগুলো কি জানে না, যন্ত্রণাদায়ক সত্যের চেয়েও মিথ্যা কতটা বেশি যন্ত্রণার?
সাত দিন পর মৌনতার কেমো শেষ হয়। কিন্তু তখন সে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। এমনকি একটি কথা বলার ক্ষমতাও তার মাঝে নেই। তাকে ছুটিও দেওয়া হলো না; বরং আগামী আটাশ দিনের জন্য তাকে ইমিডিয়েট আইসোলেশনে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলো। যেখানে কেউ তার সাথে কোনোভাবেই দেখা করতে পারবে না, বাইরে থেকে ওই রুমে কোনো বাতাসও ঢুকবে না। কৃত্রিম বায়ুর মধ্যে রাখা হবে তাকে।
মৌনতার দেহের শ্বেত রক্তকণিকা পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে। তার দেহে এখন বিন্দুমাত্র রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। সামান্য দূষিত বাতাসের সংস্পর্শও তার জন্য এখন যমদূতস্বরূপ।
ডাক্তারের এই কথা শুনে মৌনতা অর্ধমৃত মানুষের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। কথা বলার বিন্দুমাত্র শক্তি না থাকলেও সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বহু কষ্টে শুধাল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫০
– “সবটা মিথ্যা ছিল?”
এরোজ অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে শুধু ছোট্ট করে বলল,
– “সরি!”
মৌনতা নিঃসাড় দেহে চেয়ে রইল। আর কিছু বলার শক্তি তার অবশিষ্ট নেই। তার ছুটি হলো না, দেখা হলো না তার ছোট্ট মেয়েটির সাথেও।
