অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫২
তোনিমা খান
লালসা বড্ড অভিশপ্ত এক শব্দ। এই শব্দের মধ্যে নিহিত অন্ধকারে যে অন্তঃস্থল নিমজ্জিত, তা যেন এক গন্তব্যহীন হিংস্র জলরাশি।
যেই জলরাশির স্রোত চলার পথে অজস্র প্রাণ আর স্বপ্নকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ধ্বংসস্তূপ গড়ে তোলে, তবু তার কোনো কিনারা মেলে না।
সৃজাও ঠিক তেমনি বিধ্বংসী এক লোভী সত্তা। একটি সাজানো ঘর, একটি সুন্দর সংসার, একটি সুখী দাম্পত্য জীবন এমনকি একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন তছনছন করে দিয়েও তার লালসা মেটেনি।
দিনশেষে সে অদ্ভুত এক অতৃপ্তির দহনে পুড়ছে। অজস্র অর্জনের ভিড়েও সে কেবল নিজের অপূর্ণ লোভগুলোকেই দেখতে পায়। সে যত পায়, তার চেয়েও বেশি পাওয়ার নেশায় ক্রমেই এক অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে যায়।
সে চাপা আক্রোশে পুনরায় বলে ওঠে,
–“তোমায় ভালোবেসে আমি আসলে পেয়েছিটা কী, ইমরোজ? না পেয়েছি সিকদার বাড়ির পুত্রবধূর সম্মান, না পেয়েছি ইমরোজ সিকদারের বউ হিসেবে আমার প্রাপ্য। লাঞ্ছনা আর ঘৃণা ছাড়া আমি কিছুই পাইনি।”
ইমরোজ কপাল কুঁচকে নিল।
–“তুমি কী বলতে চাইছো সৃজা?”
সৃজা অস্থির কণ্ঠে বলল,
–“আমার এই জীবন ভালো লাগছে না, ইমরোজ। মৌনতা যখন তোমার স্ত্রী ছিল, সে তখন সিকদার বাড়িতে রানীর হালে থেকেছে। গা ভরতি গহনা, সম্মান, আভিজাত্যে কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু আমি? আমায় একটা কানাকড়িও কেউ দেয়নি। বিয়ের পরদিন থেকে তোমার সাথে শুধু লাঞ্ছিত হচ্ছি আর এই ঘরে পড়ে আছি।”
–“সিরিয়াসলি? তুমি এইসবকিছু আশা করেছিলে সৃজা? আমাদের বিয়েটা কীভাবে হলো তা কি তোমার মনে নেই? তুমি কি ভেবেছিলে আব্বু-আম্মা আমায় ক্ষমা করে দিয়ে তোমায় ওই বাড়ির পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেবে?”
–“কেন নেবে না? তুমি ওই বাড়ির ছেলে না? তোমার কি কোনো অধিকার নেই ওই বাড়ি আর ওই বাড়ির মানুষগুলোর প্রতি? তোমায় কি কোনোদিন তারা ভালোবাসেনি? একটা অন্য মেয়ের জন্য তারা তোমায় ঘর থেকে বের করে দিয়েছে, সম্পত্তি থেকেও আলাদা করে দেবে? এই তোমায় ভালোবেসে তারা?”
বিছানায় শায়িত ইমরোজ হাতের ম্যাগাজিনটা ছুঁড়ে মারে। অসন্তোষের সাথে বলে,
–“এসব কথা আর বাড়িও না সৃজা। আমার ভালো লাগে না তাদের কথা শুনতে। আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমায় যেকোনো মূল্যে পেয়েছি। তাতেই আমি খুশি। কে আমায় ভালোবাসল কী বাসল না এতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমার শুধু আমার প্রাপ্য অধিকার চাই।”
–“কিন্তু আমার যায় আসে, ইমরোজ। আমার সিকদার বাড়ির পুত্রবধূর সম্মান চাই। মৌনতা যেই হালে ছিল আমারও অধিকার রয়েছে সেই হালে থাকার।” সৃজার জেদি কণ্ঠ।
–“মৌনতার সাথে নিজের তুলনা কোন আক্কেলে করছ তুমি? আমাদের সম্পর্কটা কি স্বাভাবিকভাবে হয়েছে? যেখানে আম্মার মত না থাকে সেই সম্পর্ককে কোনোদিন আব্বু মেনে নেবে না। আব্বু-আম্মা বেঁচে থাকতে এই আশা কখনো কোরো না।”
সৃজা রেগেমেগে সোফায় ধপ করে বসে পড়ে। রাগান্বিত স্বরে বলে,
–“আমার এই ঘরে ঝিমিয়ে বসে থাকার জীবন ভালো লাগছে না ইমরোজ। আমি অফিসে যাব, কাজ করব, ঘুরব-ফিরব জীবন উপভোগ করব।”
ইমরোজ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আমায় অন্তত সুস্থ হওয়ার সময়টুকু দাও। এরপর অফিসেও যেতে পারবে, সব করতে পারবে। ওদের থেকে কোনো আশা রেখো না। আমিই তোমার জন্য যথেষ্ট।”
সৃজা অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে বলল,
–“কোথায় যথেষ্ট? মৌনতা যেমন গা ভরতি গহনা পরে রানীর মতো ঘুরত তা কি আমার আছে? আমি কোন দিক থেকে ওর চেয়ে কম? তবে আমি কেন অবহেলিত হব?”
–“সারাক্ষণ মৌনতা মৌনতা করো কেন? আমি কি তোমায় কম দিয়েছি? বিয়েতেই তো কত বড় ডায়মন্ডের নেকলেস দিলাম।”
–“আমার ওই একটাই নেকলেস আছে, আর নেই ইমরোজ।”
–“এর আগেও তোমায় কতবার সোনার জুয়েলারি দিয়েছি? কতগুলো ডায়মন্ডের আংটি আছে তোমার?”
সৃজা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“মৌনতার কাছে ওগুলো কিছুই না, ইমরোজ।”
ফের মৌনতা! ইমরোজ ত্যক্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আচ্ছা, এখন কী চাও সেটা বলো। সন্ধ্যায় মার্কেটে যাব, তখন যা ইচ্ছা তাই কিনো। তবুও প্লিজ, নিজেকে মৌনতার সাথে তুলনা কোরো না।”
সৃজার চোখমুখ চকচক করে উঠল,
–“আমার মৌনতার মতো অমন অনেক গহনা চাই। যা পরলে আমায়ও রানীর মতো লাগবে।”
সৃজার কথায় ইমরোজকে খানিক চিন্তিত দেখা গেল। আয়ের উৎস একদম বন্ধ। জমানো টাকা যদি এখন দেদারসে খরচ করে তবে ঝামেলায় পড়তে হতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই বাবার বিশাল পরিধির সম্পদ ভেসে উঠল চোখের সামনে। ওগুলো পেলে তার আর পিছু ফিরে তাকাতে হবে না। সে রাজি হয়ে গেল। মৃদু হেসে বলল,
–“যত চাও তত গহনা কিনবে। কিন্তু চোখমুখ থেকে এই হতাশা দূর করতে হবে। ইমরোজ সিকদারের স্ত্রী তুমি। তোমায় রানী বানিয়ে রাখার জন্য তোমার স্বামীই যথেষ্ট।”
সৃজার হতাশায় নিমজ্জিত মুখশ্রীতে হাসি ফুটে উঠল। তবুও তার রাগ পুরোপুরি গলল না। সে বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
–“রাজপ্রাসাদ ছাড়া রানী, হাউ ফানি!”
–“কে বলল রাজপ্রাসাদ নেই? সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা হোক এরপর রাজ্য আর নিজের রাজত্ব আমি একাই গড়ব। আর সেখানকার রানী হবে তুমি!”
–“তুমি সত্যি বলছ ইমরোজ?”
–“একদম। আগে সম্পত্তি হাতে পাই। আমি নিজেই অমন একটা বাড়ি করব আর নিজের অফিসও দাঁড় করাব। কারোর আন্ডারে আর থাকব না।”
খুশিতে আত্মহারা সৃজা এবার সোফা ছেড়ে ছুটে এসে ইমরোজের বুকে শুয়ে পড়ল। হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
–“থ্যাংক ইউ, জান।”
ইমরোজ মেয়েটির ওষ্ঠদ্বয়ে আলতো চুম্বন করে বলে,
–“তোমাকেও ধন্যবাদ, এত কিছুর পরেও আমায় এভাবে ভালোবাসার জন্য। সবটা একটু গুছিয়ে উঠলে আমরা নায়েলকে আনার ব্যবস্থা করব। এরপর দেখবে আমাদের সুখের কমতি হবে না। যেই মানুষগুলো আজ আমাদের অপমান করেছে তারা হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে আমাদের সুখ দেখে।”
সৃজা প্রগাঢ় হাসল ইমরোজের কথায়। বহু পরিকল্পনা বাদে সে নাচতে নাচতে বের হয় কামরা থেকে। লিভিং রুমে বসা সুপ্তিকে গিয়ে খোঁচা মেরে বলল,
–“একটু আগে কী যেন বলছিলি? মৌনতার মতো রাজরানী হয়ে থাকার সৌভাগ্য আমার নেই? সন্ধ্যার পর দেখাব তোকে। আমি সৃজা ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না। আমার রাজ্য আর রাজত্ব দুটোই হবে। সেটাও সিকদার বাড়ির লোকদের কাছে হাত পেতে নয় বরং নিজের দমে।”
সুপ্তি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
–“যতই নিজের দমে করো না কেন, সিকদার বাড়ির বউ হিসেবে সম্মান তো আর তুমি অর্জন করতে পারলে না। আর এইসব ভেটো দেওয়ার আগে বাস্তবতা ঘাটো। তোমার যতদিনে রাজ্য আর রাজত্ব হবে ততদিনে জীবনের আমেজ শেষ হয়ে যাবে।”
বলেই সুপ্তি উঠে দাঁড়ায়। ব্যাগ কাঁধে তুলে নিয়ে বলল,
–“আমি যাচ্ছি। আবার পরে আসব।”
ভাবুক সৃজা থমথমে মুখে বলল,
–“কোথায় যাচ্ছিস? কিছুক্ষণ আগেই তো এলি।”
–“তো বসে কী করব? তোমার মতো ল্যাংড়া স্বামীর পা ধরে বসে থাকব? জীবনের কোনো মানে নেই নাকি? জীবনটা এখন উপভোগ করার বুঝলে! টাকা ইনকাম করব, দেশ-বিদেশ ঘুরব, দামি দামি ব্র্যান্ডের জিনিসপত্র ব্যবহার করব। এই ড্রিম লাইফ ছেড়ে কে এই ফ্ল্যাটে মুখ লুকিয়ে বসে থাকে? আমি প্রথম থেকে তোমায় বলেছি, তোমার জীবনের বড় একটা ভুল ইমরোজ ভাইকে বিয়ে করা। এখন এই চার দেয়ালের মধ্যে বসে সংসার করো, আমি চললাম।”
সৃজার গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়ে সুপ্তি চলে গেল। সৃজা গভীর চিন্তায় ডুবে যায়, সে কি সত্যিই ভুল করেছে বিয়ে করে? সুপ্তি যেই ড্রিম লাইফের কথা বলল, সেটা তারও ড্রিম লাইফ।
ইমরোজ কি তাকে এই জীবন দিতে পারবে না? অতিরিক্ত চিন্তা করতে গিয়েও সৃজা হঠাৎ থেমে গেল। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
–“এত কিসের চিন্তা। আমায় কোনোদিন কেউ কোনো বেরিবাঁধে আটকে রাখতে পারেনি আর না পারবে।”
বলেই সে হেসে উঠল। চোখেমুখে ঘৃণ্য পরিকল্পনা।
–“সৃজা, রুমে এসো তো।”
ইমরোজের অস্পষ্ট ডাক কানে আসতেই সৃজা অলসতা ভেঙে রুমে যায়। এখন সে আগের মতো কানে শোনে না। এক কানে একটু-আধটু যা শোনে! ইমরোজের রণমূর্তি চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
রুমে যেতেই দেখল ইমরোজ নিজের ব্যান্ডেজ করা পা নাড়ানোর চেষ্টা করছে। বলল,
–“আমায় একটু ওয়াশরুমে দিয়ে আসো তো।”
সৃজা কপাল কুঁচকে নিল। দ্বিরুক্তি করে বলল,
–“তোমায় জাগানোর শক্তি আমার আছে? একটা কাজের লোক খুঁজতে বলেছিলাম না তোমায়?”
ইমরোজ চোখ তুলে তাকায়।
–“কাজের লোক আমি খুঁজব কী করে? আমি কি বের হতে পারছি? তোমার মাকে বলো একজন খুঁজতে। কিন্তু কাজের লোক থাকলেও বা কী? আমায় কাজের লোক ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে যাবে? কী সব কথা বলছ সৃজা। নাও, তাড়াতাড়ি আসো।”
সৃজা দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গিয়ে ইমরোজকে ধরে ওয়াশরুমে দিয়ে আসে। চোখমুখ কাঁদো কাঁদো হয়ে আছে। সুপ্তি ঠিক বলেছে, সে ওই টিপিক্যাল মৌনতার মতো জীবন বেছে নিয়েছে। এইসব কি তার মতো মেয়ের সাথে যায়?
তবে সৃজার সব রাগে খানিক ভাটা পড়ে যখন সন্ধ্যায় মার্কেটে গিয়ে ইমরোজ তাকে গা ভরতি গহনা কিনে দিল। তার খুশির অন্ত রইল না।
তবে ইমরোজের খুশিরা খানিক বিষণ্নতায় মোড়া থাকে। আগে তো মনে এতটুকু শান্তি থাকত, নায়েল ঘরে আছে, ছোটাছুটি করছে, বাড়ি ফিরলেই দেখতে পাবে। কিন্তু এখন? ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাউকে ফোন দিলেও পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই ব্লক করে রেখেছে।
রাগে-দুঃখে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে ইমরোজের। রক্ত খলবলিয়ে ওঠে, তার সন্তানকে তার থেকেই দূরে করছে। এত দুঃসাহস যদি না গুড়িয়েছে, তবে তার নাম ইমরোজ সিকদার না।
মনে মনে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সে পরিচিত এক উকিলের সাথে যোগাযোগ করল। তারপর নিশাতকে ফোন দিল। সবাই ব্লক করলেও নিশাত এখনো করেনি। নিমিষেই মনটা প্রসন্ন হয়ে ওঠে।
নিশাত গৃহিণী। সন্তান না থাকা অবস্থায় চাকরি করলেও সন্তান হওয়ার পর আর চাকরি করেনি। তার স্বামী পড়াশোনা করার জন্য কানাডায় আসে। একজন ইঞ্জিনিয়ার। সে কানাডার একটা নামকরা কোম্পানিতে চাকরি করছে এবং ভালো ইনকাম করে। তাতেই তাদের সংসার চলে যায়।
গার্ডেনে তখন নিভা আর তার ছোট মেয়ে নাবিলার সাথে নায়েল খেলছে। নিশাত আর মাসুমা বসে আছে চেয়ারে। তন্মধ্যেই ইমরোজের ফোন দেখতেই নিশাতের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। মাসুমা বেগমের দিকে এক পলক সতর্ক দৃষ্টি ফেলে ফোন নিয়ে অন্য পাশে চলে যায়।
ইমরোজের অজস্র মেসেজ।
–“খালামণি প্লিজ নায়েলকে একটু দেখার ব্যবস্থা করে দাও। আমায় আমার নিজের সন্তানকে দেখার জন্য অনুরোধ করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি যারা তৈরি করেছে তাদের একজনকেও আমি ছাড়ব না।”
ইমরোজের মেসেজ দেখে নিশাত দাঁতে দাঁত চেপে ফোন রিসিভ করে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা মুখটি দেখে ঘৃণায় অন্তঃস্থল বিষিয়ে আসে। কঠিন চোখে চেয়ে বলেন,
–“তোর লজ্জা করে না ইমরোজ? তুই এখনো এত তেজ নিয়ে কথা বলছিস? এই পরিস্থিতি কে করেছে? তুই আর তোর কৃতকর্ম এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কোন মেয়ের প্রতি তুই ভালোবাসা দেখাচ্ছিস? সেই মেয়ের প্রতি, যার মাকে কি-না তুই মারতে চেয়েছিলি?”
ইমরোজ থমথমে মুখে বলল,
–“আমি তোমার সাথে এই বিষয়ে বাড়তি কোনো কথা বলতে চাই না খালামণি। আমি শুধু তোমাদের প্রত্যেকের রূপ দেখছি। যারা কি-না আমার একটু দোষ পেতেই সব ভালোবাসা নিমিষেই ভুলে গিয়েছে। আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে আমার পরিবার আদৌ আমায় ভালোবাসত তো?”
নিশাত অবাক হয়ে শুধাল,
–“একটু ভুল, ইমরোজ? এটা তোর কাছে একটু ভুল মনে হয়। তুই দুইটা জীবন ছারখার করে দিয়েছিস। আমাদের সুন্দর সুখী পরিবারটা ভেঙে দিয়েছিস।”
–“আমি ভাঙিনি, তোমরা ভেঙেছ। আমি এখনো বলছি, আমরা সব ভুলে সবাই মিলেমিশে থাকতে পারি। মৌনতার চিকিৎসা তো করাচ্ছই তোমরা। দরকার পড়লে ভুলের মাশুল গুনতে আমিও খরচ দেব। কিন্তু তবুও আমার পরিবার আমি ফিরে পেতে চাই।”
ইমরোজ নির্লজ্জের মতো কথাগুলো বলল।
নিশাত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। টাকা? টাকা দিয়ে কি অমন গভীর ক্ষতের মাশুল গোনা যায়? সে ঘৃণাভরা কণ্ঠে বলে উঠল,
–“তুই একটা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ ইমরোজ। দুলাভাই উচিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তোকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে। অপরাধ করেও যার অনুতাপ হয় না সে আদতে সহানুভূতির যোগ্যই না।”
ইমরোজ চোয়াল শক্ত করে বলল,
–“আমার তোমাদের সহানুভূতি চাই না, খালামণি। আমি শুধু আমার সন্তানকে চাই। প্লিজ, নায়েলকে দেখাও। ও কোথায় আছে? কীভাবে আছে? ওর যত্ন হচ্ছে তো? দেখো আমার মেয়ে যেভাবে গিয়েছে সেভাবে যদি আমি না পেয়েছি…”
ইমরোজের কণ্ঠ থেমে যায় নিশাতের ক্ষিপ্ত ব্যগ্র কণ্ঠে,
–“তোর মেয়েটা বাবা-মায়ের ছায়াতল ছাড়া একটা বিধ্বস্ত মেয়ে হয়ে এসেছে। সারাক্ষণ মন খারাপ করে শুধু বাবা-মায়ের পথ চেয়ে থাকে। এই বুঝি বাবা এল, এই বুঝি মা এল। কিন্তু কেউ আসে না। তুই একটা কুলাঙ্গার! যে কি-না নিজের হাতে নিজের মেয়েটার জীবন আর শৈশব শেষ করে দিয়েছিস। আজ বারো দিন নায়েল মাকে দেখে না।”
ইমরোজ অশান্ত হয়ে পড়ল মেয়ের কথা শুনে।
–“এর জন্যই আমি ওকে যেতে দিতে চাইনি। ও আমার কাছে ভালো থাকত। মৌনতা নিজেই তো আধমরা ও কী নায়েলকে দেখে রাখবে?”
নিশাত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল পাষণ্ড ছেলেটির পানে। ইমরোজ তাড়া দিয়ে বলল,
–“নায়েলকে দেখাও, আমার মেয়েটা কেমন আছে? ওকে তুমি নিজের কাছে রাখবে সবসময় এরোজের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেবে না। ওটা একটা গুন্ডা!”
–“তোর মেয়েটা এরোজের কারণেই একটু হাসে। ওকে আর কষ্ট দিস না। যেভাবে আছে থাকতে দে। তোর মতো কুলাঙ্গার বাবার কাছে থাকলে ওর জীবনটা নরক হয়ে যাবে।”
পরপরই বলেন,
–“দোয়া কর যেন মৌনতা সুস্থ হয়ে যায়। যদি ওই মেয়েটার কিছু হয়ে যায় না? তুই আর কখনো ওর মুখ থেকে বাবা ডাক শুনতে পারবি না।”
বলেই নিশাত ফোনটা নিয়ে নায়েলের কাছে যায়। আদুরে স্বরে বলে,
–“নায়েল দাদুমণি, এখানে এসো। দেখো পাপা ফোন দিয়েছে।”
পাপার নাম শুনতেই নায়েলের সকল মনোযোগ কেটে গেল খেলা থেকে। সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
–“পাপা ফোন কলেছে? দাও দাও আমি কথা বলব।”
নায়েল ছুটে এসে ফোনটা হাতে নেয়। প্রবল উৎসাহে বলে,
–“হাই পাপা! তুমি কোথায়? আমাদেল নিতে আসছ না কেন? তালাতালি এখানে আসো। আমি দাদুল কাছে যাব, ফুফি যাব। মাম্মা অসুত্ত, সালাদিন হাসপাতালে থাকে। আমাল ভালো লাগে না।”
কথায় আছে দূরত্বে গুরুত্ব বাড়ে। ইমরোজের চোখ ছলছল করে উঠল এতদিন বাদে মেয়েকে দেখে, তার কণ্ঠ শুনে। সে আদুরে গলায় বলল,
–“আমি তো জানি আমার নায়েলের মন খারাপ হচ্ছে পাপাকে ছাড়া। পাপা শীঘ্রই তোমায় নিয়ে আসব মা।”
বাবার আদুরে কণ্ঠে নায়েল প্রাণোচ্ছ্বল হেসে বলল,
–“আমি বসে আছি তোমাল জন্য। তালাতালি এসো। জানো, এখানে আমাল চালটা বন্ধু হয়েছে। কিন্তু তালা সালাদিন শুধু হাই, হ্যালো কলে। তাদেল কথা আমি বুঝিনা কিছু।”
–“আমার নায়েলের খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না। পাপা দ্রুত তোমায় আমার কাছে আনার ব্যবস্থা করব মা। তারপর আর কোনো কষ্ট থাকবে না।”
নিশাত মলিন হাসল ইমরোজের কথায়। ইমরোজ চোখ ভরে দেখে মেয়েকে। আলতো হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় ফোনের স্ক্রিন। একটু ছোঁয়ার জন্য বুকটা কেমন করছে। সে মেয়ের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলল। মাসুমা শুধু শুনল ইমরোজের বিদঘুটে কণ্ঠ। অভিযোগ-ঘৃণায় বুকটা খামচে ওঠে। ওই মানুষটা তার মেয়েটাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে।
আশ্চর্যজনকভাবে রূপকথার জটিল জীবনটা ধীরে ধীরে সহজ হয়ে আসছে। নির্জনা বেগম এখন আর আগের মতো তার ওপর খবরদারি করেন না; পড়াশোনার ক্ষেত্রেও নেই কোনো কড়া নিষেধাজ্ঞা। রোজ কলেজে যেতে বলে।
খুব বেশি প্রয়োজন না হলে রূপকথার কাঁধে সংসারের ভারও চাপিয়ে দেন না তিনি। এমনকি এখন তিনি গৃহকর্মীর হাতের রান্নাও খাচ্ছেন।
যদিও রূপকথা জানে এটা তার স্রেফ বাধ্য হওয়া, মন থেকে নয়। তাই নির্জনা বেগমের পুরোনো অভ্যাস আর রুচির কথা মাথায় রেখেই সে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করে, যাতে খুব ঠেকায় না পড়লে তাকে কাজের লোকের হাতের খাবার খেতে না হয়।
বই খাতার টেবিল গুছিয়ে নিতে নিতেই রূপকথার দৃষ্টি আটকায় সাফেদ পৃষ্ঠার ঠিক শেষাংশে লেখাটুকুতে।
রূপকথা খাতাটি হাতে নিতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল। এতটুকু বুঝল, তার ছেলেটা তার থেকেও বুদ্ধিমান। সে মৃদু হেসে আবার খাতাটা জায়গায় রেখে দেয়। সন্তান যেমন বাবা-মায়ের কথা চিন্তা করে নিজেকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে আটকাতে পারে, তেমন বাবা-মাও সন্তানের চাওয়াকে যেকোনো মূল্যে পূরণ করতে পারে।
অন্তঃস্থলে একটা দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে রূপকথা টেবিল গুছিয়ে ল্যাম্প নিভিয়ে দেয়। তানশান হাত-মুখ ধুয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সারাদিন পর এই রাত বারোটাতেই তার ছুটি মেলে একটু বিশ্রামের। যদিও এতে তার কোনো কষ্ট হয় না, সেই ছোট থেকে এই অভ্যাস গড়ে তুলেছে বাবা।
চুলের গোছায় কেউ হাত গলিয়ে দিতেই তানশান চোখ খুলে তাকায়। রূপকথা হাত বুলাতে বুলাতে শুধায়,
–“অনেক ক্লান্ত লাগছে?”
–“ইটস ওকে!”, তানশান ছোট্ট করে বলল।
রূপকথা বিছানা ঘেঁষে ওয়াম লাইটের পাশে মেঝে ঘেঁষে বসে। বলে,
–“তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছ, তোমার মাথা থেকে সব চুল পড়ে গেলে তোমায় কেমন দেখাবে?”
তানশান না বোধক মাথা নাড়ল।
–“তবে ভাবো। তোমার কাছে ত্রিশ সেকেন্ড সময়।”
তানশান চোখ বন্ধ করে ভাবল। ভাবতেই তার চোখমুখ বিকৃত হয়ে গেল। সে বিকৃত কণ্ঠে বলল,
–“ইউউউ বাজে দেখতে লাগছে। ইয়া আল্লাহ!”
তানশানের অভিব্যক্তিতে রূপকথা চমৎকার হেসে বলল,
–“তুমি যে এই মাসেও তেল দাও না। এতে তোমার এই পরিণতি হতে খুব বেশি দেরি হবে না।”
তানশান কপাল কুঁচকে বলল,
–“নাহ, এমন কেন হবে?”
–“তোমার চুলের খাবার তেল। তুমি তো তাই দাও না। এসো তেল দিয়ে দিই। নয়তো তোমায় টাকলু তানশান ডাকবে মানুষ।”
তানশান বিকৃত কণ্ঠে বলল,
–“ইউউউ মিমি! এগুলো বলবেন না, প্লিজ।”
–“আমি নাহয় বলব না, কিন্তু যখন দেখবে তোমার চুল পড়ে যাচ্ছে তখন আমায় দোষ দিও না। ভাবো তো রাস্তাঘাটে তোমায় দেখলে মানুষ হাসছে।”
তানশান চিন্তিত হয়। রূপকথা মৃদু হেসে তেলের বোতল থেকে তেল নিয়ে দ্রুত তার মাথায় দিতে লাগল। এমনি সময় রেগে গেলেও আজ তানশান কিছু বলল না। চুপচাপ তেল দিল।
জমিজমার মাপামাপি শেষে তপোবনের বাড়ি ফিরতে রাত বারোটা বেজে গেল। ছেলের ঘরে উঁকি দিতেই দেখল মনোরম এক দৃশ্য। মা-ছেলে বিছানার কোল ঘেঁষে খুসুরফুসুর করছে।
বিছানায় থুতনি ঠেকিয়ে রূপকথা মনোযোগ সহকারে ছেলের দেখানো দিকনির্দেশনা বুঝছে। তানশান হাতের সুডোকুটা মিনিটের মাঝে মিলিয়ে দেখিয়ে বলল,
–“এখন বুঝেছেন?”
রূপকথা মলিন মুখে না বোধক মাথা নাড়ল। তানশান ডানে-বামে মাথা নাড়ল। অন্তত বিশ বার দেখিয়েছে এটার কালার কী করে মেলাতে হয়। সে তবুও ধৈর্য না হারিয়ে মিলিয়ে দেখাল আর বুঝিয়ে দিল এভাবে এভাবে মেলাতে হবে।
সে এবার রূপকথাকে সুডোকুটা দিয়ে বলল,
–“নিন আপনি ট্রাই করুন, আমি বলে দিচ্ছি।”
রূপকথা ট্রাই করল, তানশান বলে দেওয়ায় সে বহুকষ্টে মেলাতে পারল। তানশান এবার বলল,
–“এখন নিজে ট্রাই করুন।”
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এবার আর পারল না রূপকথা। তানশান কপাল চাপড়ে বলল,
–“আমার বোকা মা! মাথা খাটান, রান্নাঘরে তো খুব চটরপটর করেন। অথচ এতটুকু আপনার মাথায় ঢুকছে না।”
তপোবন মৃদু হাসল ছেলের কথায়। রূপকথা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আবার দেখাও।”
তানশান আবারও দেখাল। কিন্তু এবারও রূপকথা পারল না। তপোবন দুইজনের ব্যর্থ প্রচেষ্টায় বিঘ্ন ঘটিয়ে বলে ওঠে,
–“কী করছ তোমরা?”
মা-ছেলে নিজেদের মনোযোগী দুনিয়া থেকে বেরিয়ে আসে। তপোবনকে দেখে তানশান চমৎকার হেসে বলল,
–“সুডোকু মেলানো শেখাচ্ছি মিমিকে। কিন্তু পারছে না।”
–“আচ্ছা শেখাও, পাপা কাপড় বদলে আসছি।”
রূপকথা পিছু ডেকে শুধাল,
–“খেয়েছেন? আমি কি ভাত বাড়ব?”
তপোবন পা থামিয়ে বলল,
–“উঁহু, খেয়ে এসেছি।”
রূপকথা আশ্বস্ত হয়ে ফের মনোযোগী হয় ছেলের দিকে। তানশান এবার লিখে লিখে বোঝাল কিন্তু মাথামোটা রূপকথা তবুও পারল না। তানশান এবার হতাশ হয়ে গেল। তপোবন কক্ষে ঢুকে ছেলের হতাশাভরা মুখ দেখে বলল,
–“কী হলো, এত হতাশা কেন চোখেমুখে?”
–“মিমি কালার মেলাতে পারছে না, পাপা।”
–“কেন পারবে না? আমরা আছি না? শিখিয়েই ছাড়ব।”
এবার তপোবন তাকে শেখাতে লাগল। রূপকথা ঝিমাতে ঝিমাতে শিখতে লাগল। দীর্ঘ পনেরো মিনিট বোঝানোর পর যখন রূপকথাকে মেলাতে দিল সুডোকু, তখনও রূপকথা পারল না।
তানশান এবার অন্য বুদ্ধি বের করল। সে হড়বড়িয়ে বলল,
–“চেষ্টা করুন মিমি। এটা যদি আপনি আজ রাতের মধ্যে মেলাতে পারেন তবে আমি আপনাকে উপহার দেব।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে বলল,
–“আগেরবারের মতো চিটিং করবে না তো?”
তানশান তৎক্ষণাৎ অ্যাডামস অ্যাপেল চেপে ধরে বলল,
–“গড প্রমিজ! এবার উপহার দেবই।”
–“কী দেবে?”
–“আপনি যা চান তাই দেব।”
–“শাড়ি দিও।”
তানশান চোখ বড় বড় করে বলল,
–“এই রাতে ডাকাতি করতে নেমেছেন?”
–“দেবে কি দেবে না, বলো? নাহলে এটা মেলাচ্ছি না।”
তানশান প্যাঁচ বোঝে না। সহজ-সরল মানুষ! তাই মেনে যায়। বলল,
–“আচ্ছা দেব।”
রূপকথার এতক্ষণ যত মনোযোগ ছিল তা বেড়ে তিনগুণ হয়ে গেল। তপোবন ডানে-বামে মাথা নেড়ে বলল,
–“তবে কথায় কথায় এই উপহার চাওয়ার সূচনা আপনি করেছেন আব্বু, তাই না?”
তানশান আড়চোখে তাকায় বাবার দিকে। তপোবন ফের বলল,
–“আপনার মিমি কথায় কথায় এখন উপহার চায়, আব্বু। ম্যাথ করতে দিলেও উপহার, রিডিং পড়তে দিলেও উপহার, পরীক্ষা নিলেও উপহার চাই তার। আর এই অভ্যাস আপনি গড়েছেন।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকাল কিপটে লোকটির দিকে। মাত্র তিন দিন এইগুলো করে সে উপহার নিয়েছে। অথচ তাতেই নাকি তার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে! সে থমথমে মুখে ছেলেকে বলল,
–“তোমার বাবা এত কিপটে আর তুমি এত উদার মনের হলে কীভাবে তানশান?”
তপোবন ভ্রু কুঁচকে নিল। অবাক কণ্ঠে শুধাল,
–“আমি কিপটে?”
–“তা নয়তো কী? আমি আপনার থেকে কদিন উপহার নিয়েছি? মাত্র তিন দিন, তাতেই আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে?” রূপকথা মুখ ঝামটা মেরে বলল।
–“তো সবসময় এখন তোমায় উপহার দিয়ে পড়াতে হবে?”
বাবার প্রশ্নের জবাবে তানশান উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“পাপা, উপহারের কথা শুনলেই তার কাজের গতি দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এটা একটা ভালো দিক।”
বলতে না বলতেই তানশান দেখল, রূপকথা সুডোকু মিলিয়ে ফেলেছে। রূপকথা উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল। তানশান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বাবাকে বলল,
–“দেখেছ? আমি কেন তাকে উপহার দিই?”
তপোবন না চাইতেও গা দুলিয়ে হেসে উঠল তার ঢংগী বউয়ের কাণ্ডে।
তানশান হতাশা ভুলে মিটিমিটি হেসে বলল,
–“আপনি তো উপহার খুব পছন্দ করেন তাই না? যান, আপনি যদি এইবার মিড টার্মে এক থেকে দশের মধ্যে থাকতে পারেন তবে আপনি যা চাইবেন তাই দেব।”
তপোবনকে বেশ উৎসাহী দেখা গেল ছেলের প্রস্তাবে। নিজেও সায় জানিয়ে বলল,
–“হ্যাঁ তানশান ঠিক বলেছে। আমিও দেব তুমি যা চাও।”
রূপকথা সতর্ক দৃষ্টি ফেলল বাবা-ছেলের দিকে। সতর্ক কণ্ঠে শুধায়,
–“যা চাইব তাই দেবেন আপনারা?”
–“হুম, হুম।” তানশান ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল।
–“আচ্ছা ঠিক আছে।” রূপকথা রাজি হয়ে গেল।
পরদিন সকালে উঠতেই ঘরময় খানিক ব্যস্ততা অনুভব হলো। তপোবন নিচে নামতে নামতে দেখল মা ঘরে তোড়জোড় চালাচ্ছেন। সে কৌতুহলী গলায় শুধায়,
–“কী হয়েছে আম্মা? এত তোড়জোড় কেন?”
নির্জনা বেগম ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন,
–“বাড়িতে তেমন ভালো কিছু বাজার নেই, তপোবন। এদিকে মাত্র নিঝাম জানাল ওয়াহেদ আর ওরা আসছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে একটু বাজার করে আনো তো। বাড়িতে মাত্র এক কেজি গরুর মাংস আছে, জবা এগুলো আগে বলবে না? আমার ঘরটা কেমন ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে।”
তপোবনের ললাটে ভাঁজ পড়ল। চোখেমুখে ফুটে ওঠে চাপা ক্রোধ! সে থমথমে মুখে শুধায়,
–“হঠাৎ তারা আসবে কেন, আম্মা?”
–“এটা কেমন কথা তপোবন? আসবে না আমাদের বাড়িতে? যাও তাড়াতাড়ি বাজার নিয়ে আসো। নিজে হাতে করো কিন্তু, ড্রাইভার দিয়ে করিও না।”
–“জি আম্মা।” তপোবন চোয়াল শক্ত করে বলল।
ওয়াহেদ খালুকে বহুবার বারণ করেছে রূপকথার কাছাকাছি আসতে। রূপকথা সহ্যই করতে পারে না তাকে। অদ্ভুত আচরণ করে, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। জানা সত্ত্বেও মানুষটা আরেক দফা ওদের ভাঙার জন্য মুখিয়ে আছে। সে থমথমে মুখে দ্রুত কদমে উপরে গেল। স্কুল-কলেজের জন্য তৈরি হতে থাকা স্ত্রী-সন্তানকে বলল,
–“আজ স্কুল-কলেজে যাওয়ার প্রয়োজন নেই তোমাদের। চলো আজ বেড়াতে যাই।”
বাবার হঠাৎ এমন কথায় তানশান ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“হঠাৎ এমন কথা বলছ কেন? কোথায় বেড়াতে যাব?”
–“সারপ্রাইজ, তোমরা রেডি হয়ে থাকো। পাপা আধা ঘণ্টার মধ্যে আসছি।”
তপোবন রূপকথাকেও একই কথা বলে রোজের কাছে গেল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোন টিপতে থাকা বোনকে বলল,
–“রোজ চলো, আজ ভাইজানের সাথে বেড়াতে যাবে।”
–“কোথায় যাব ভাইজান?”
–“সারপ্রাইজ। রেডি হয়ে থাকো। ভাইজান একটু পরে এসে নিয়ে যাব।”
বলেই সে বাজার করতে চলে যায়। আধা ঘণ্টার মাঝে বাজার করে নিয়ে আসে। নির্জনা বেগম বাজার পেতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তপোবন চাপা স্বরে তাকে বলল,
–“আম্মা, আমি রূপকথা, তানশান আর রোজকে নিয়ে জরুরি একটু বাগেরহাট যাচ্ছি।”
–“সে কী! এ কেমন কথা তপোবন? ঘরে অতিথি আসছে আর তোমরা এখন বাগেরহাটে যাবে কেন?”
–“রূপকথার আম্মার শরীরটা ভালো না আম্মা। তাকেই দেখতে যাব। খালুজানরা তো আসতেই পারবে যখন-তখন। দরকার পড়লে আমরা গিয়ে দেখা করে আসব। এখন আসছি, হ্যাঁ!”
শত ব্যস্ততার মাঝেও তপোবন তড়িঘড়ি করে বউ-বাচ্চা আর বোনকে নিয়ে বেরিয়ে গেল ওয়াহেদরা আসার আগেই।
নিঝাম আসতেই চটে গেল এহেন কথা শুনে। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“আপা আমি তোমায় সেদিনই বলেছিলাম যে তপোবন ওয়াহেদকে অসম্মান করছে। নয়তো আজকেই ওর শাশুড়ি অসুস্থ হলো?”
ওয়াহেদ ধমকে উঠল নিঝামকে।
–“আহ্ নিঝাম, হচ্ছে কী? একটা মানুষ অসুস্থ হতেই পারে। অসুস্থতা কি বলে-কয়ে আসে?”
পরপরই নির্জনা বেগমের উদ্দেশ্যে চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“রূপকথার মায়ের কী হয়েছে, আপা?”
–“তা তো কিছু বলেনি। দাঁড়াও, তপোবনকে ফোন দিয়ে শুনে নেব।”
নিঝাম কপাল কুঁচকে অবলোকন করে স্বামীর উদ্বিগ্নতা। আগে তো কখনো এই বাড়িতে আসতে চাইত না। অথচ হঠাৎ করেই রোজ রোজ তার মাথা খাচ্ছে এই বাড়িতে আসার জন্য। আবার রূপকথার প্রতি প্রবল আগ্রহও দেখা যাচ্ছে। সে থমথমে মুখে বলল,
–“রূপকথা আর ওর পরিবারের যা ইচ্ছা তাই হোক। তুমি এত আগ্রহ দেখাবে কেন?”
–“আগ্রহ কোথায় দেখালাম? এটা তো সামাজিকতা নিঝাম। একটা মানুষ অসুস্থ, কেন অসুস্থ জিজ্ঞাসা করব না?”
–“না করবে না, চুপ করে বসে থাকো।”
নির্জনা বিতৃষ্ণাভরা দৃষ্টিতে তাকায় বোনের দিকে। তার বংশের মাঝে এই নিঝাম একটু উগ্র, হিংসাত্মক মনের মানুষ!
দিনের পর দিন হাসপাতালের করিডোরে ওই একটা মুখ দেখতে দেখতে ত্যক্ত-বিরক্ত নার্সরা উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে নিজের কাজে চলে গেলেন। লিরা কেবিন থেকে বেরিয়েই এরোজকে বেঞ্চিতে বসে থাকতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এগিয়ে এসে নিজ ভাষায় বলল,
–“সারাক্ষণ এখানে বসে থাকো কেন? দেখা করতে পারবে না জেনেও চব্বিশ ঘণ্টার আঠারো ঘণ্টা এখানেই পড়ে থাকো? রাতে ঘুমাও না পর্যন্ত!”
এরোজ লালচে ক্লান্তিভরা নেত্র তুলে তাকায়। আইসোলেশন রুমের দিকে এক পলক চেয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আই জাস্ট কান্ট স্লিপ, লি… লিরা। ইট ফিলস লাইক, এভরি সিঙ্গেল মোমেন্ট আ’ম লুজিং মাই লাইফ।”
লিরা বলহীন দেহে শুধু চেয়ে রইল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“এখনো লম্বা একটা লড়াই বাকি আছে এরোজ। আর তার জন্য হলেও তোমায় নিজের যত্ন নিতে হবে। বাসায় যাও, আমরা মৌনতার খেয়াল রাখছি তো। সে কেমোর প্রতিক্রিয়া থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে।”
এরোজ বাচ্চাদের মতো মাথা নাড়ল। বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫১
–“না না, কেউ না থাকলে তার একা একা ভয় লাগবে। আমি আছি সমস্যা নেই। সে উঠলে তুমি তাকে বলো, আমি বাইরেই বসে আছি। তাকে ভয় পেতে বারণ করবে।”
লিরা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেল।
