Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬
তোনিমা খান

টরন্টোর বুকে যখন ক্লান্তি ছুঁয়ে নিদ্রা নেমে আসে, তখন দেশে এক ক্লান্তিময় প্রহরের অবসান ঘটে। পাখিরা গগনে কলরব তোলে, জনজীবন ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিত্যদিনের তাগিদে।
‘বিবাহ’ শব্দটির মাঝে যেমন পবিত্রতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে অঢেল শক্তি ও ধৈর্য। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত রহমত অসীম শক্তিশালী হয়। কিন্তু আমরা মানুষ কতই না মূর্খ যে সৃষ্টিকর্তার রহমত পায়ে ঠেলে দিই! ইমরোজ নামক পাপাচারী পুরুষটিকেও সৃষ্টিকর্তা দু-দুটো রহমত দিয়েছিলেন। পাপাচার থেকে সরে আসার সুযোগ হিসেবে দিয়েছিলেন একটি পবিত্র, পরিপূর্ণ ও সুখময় জীবন। কিন্তু আফসোস, সে সেই সুযোগ আর সুখময় জীবন আঁকড়ে ধরতে পারেনি।
স্ত্রী আর শয্যাসঙ্গিনীর মধ্যে সৃষ্টিকর্তা যোজন যোজন ফারাক রেখেছেন। স্ত্রী হয় ধৈর্য, ত্যাগ, পবিত্রতা, পরিশ্রম, মায়া ও মাতৃত্বের গুণে বলীয়ান। অন্যদিকে, শয্যাসঙ্গিনী কেবল স্বার্থের অনুকূলে বিচরণ করা এক নিকৃষ্ট অপবিত্র সত্তা; স্বার্থ ফুরালেই যার সঙ্গ ফুরিয়ে যায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, কারো কারো অন্তরে নফসের পর্দা এতটাই পুরু যে, তারা পবিত্রতা এবং পঙ্কিলতার মধ্যকার সূক্ষ্ম বিভেদটুকুও বুঝতে পারে না।
হাসপাতালের বেডে আধশোয়া হয়ে বসা ইমরোজ ব্যথাতুর আর্তনাদ করে উঠল ডাক্তার পায়ে হাত দিতেই। ডাক্তার হাত সরিয়ে নিয়ে বললেন,

–“আমার কাজ শেষ। তবে তোমাকে আরও পনেরো দিন বিশ্রামে থাকতে হবে। আর যে ওষুধগুলো দিয়েছি, সেগুলো যথাসময়ে খেতে হবে; একটাও বাদ দেওয়া যাবে না।”
ইমরোজ থমথমে মুখে বলল,
–“ওকে।”
–“আর খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করবে। তোমার শরীরে অনেক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। পুষ্টিকর খাবার খাও, অল্প বিরতিতে বারবার খাও। খাবারে শাকসবজি অবশ্যই থাকতে হবে। নিজের যত্ন নাও। মাঝেমধ্যে পায়ে একটু গরম তেল মালিশ করতে পারো, এতে আরাম পাবে।”
–“জি।”
ভোর পাঁচটা নাগাদ ওয়াশরুমে যেতে গিয়ে ইমরোজ পা পিছলে পড়ে যায়। অসুস্থতার কারণে তার শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসছিল, আর যথাযথ যত্নের অভাবে আজ তা আরও ভেঙে পড়ে। সৃজা ডাক্তারের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে বলল,
–“চলো।”
ইমরোজ নড়েচড়ে বসল। নার্সকে বলল,

–“আমায় একটু হুইলচেয়ারে বসতে সাহায্য করুন।”
সৃজা এক হাত বাড়িয়ে তাকে সাহায্য করতে চাইল। সে বলল,
–“আরে আমি আছি তো, নার্সের প্রয়োজন নেই।”
ইমরোজ তার কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ না করেই নার্সকে পুনরায় বলল,
–“একটু সাহায্য করুন।”
নার্স তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিলে সে নিজেই চাকা ঘোরাতে লাগল। সৃজা কপাল কুঁচকে নিজেই হুইলচেয়ারটা টেনে নিয়ে গেল। পুরোটা রাস্তা ইমরোজ অস্বাভাবিক থমথমে মুখে বসে ছিল। বাড়ি ফিরেও সে সৃজাকে তেমন একটা পাত্তা দিল না।
সৃজা এবার তার আচরণে বিরক্ত হয়ে বলল,
–“হয়েছেটা কী ইমরোজ? এমন করছ কেন?”
ইমরোজ শাণিত দৃষ্টিতে তাকাল। অবহেলার সুরে শুধাল,
–“কেমন করছি?”
–“তুমি আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করছ কেন? আমি কি তোমাকে ইচ্ছে করে ফেলে দিয়েছি?”
–“আপাতদৃষ্টিতে সেটাই মনে হচ্ছে, সৃজা।”
–“আমি তোমাকে ইচ্ছে করে ফেলে দিয়েছি?”

–“দাওনি বলছ? পরোক্ষভাবে তুমিই আমার পড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। আজ দুই মাস আমি গুরুতর অসুস্থ। ডাক্তার বলেছেন প্রচুর যত্ন নিতে হবে, পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। সেখানে আজ দুই মাস যাবৎ আমি রেস্টুরেন্টের খাবার খাচ্ছি। আমার চেহারার দিকে কখনো তাকিয়ে দেখেছ? প্রতিদিন রেস্টুরেন্টের খাবার আমি খেতে পারি না। আমার শরীর ভেঙে পড়ছে, অথচ সেদিকে তোমার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।”
–“তুমি কি বলতে চাইছ আমি রান্না করব? ইমরোজ, তুমি কি জানতে না আমি রান্নাবান্না বা ঘরের কাজ পারি না? তবে কোন যুক্তিতে তুমি এগুলোর জন্য আমার ওপর রাগ দেখাচ্ছ?”
–“করতে পারো না, তাই বলে কি শিখতে হবে না? তোমার স্বামী অসুস্থ, তুমি তাকে নিজ হাতে পুষ্টিকর খাবার রান্না করে খাওয়াবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তুমি আমার ওষুধগুলোও সময়মতো খাইয়ে দাও না। গতকাল আমি তোমায় কতবার ডেকেছিলাম ওয়াশরুমে যাওয়ার সময়, কিন্তু তুমি ওঠোনি।”

–“আমি ঘুমিয়ে ছিলাম ইমরোজ। এখন কি ঘুম বাদ দিয়ে আমি বসে থাকব যে কখন তুমি ওয়াশরুমে যাবে আর আমি তোমাকে দিয়ে আসব? আর তোমার ওষুধের সময় কখন, তা আমি কী করে জানব?”
ইমরোজ অবাক হয়ে সৃজার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেখানে তার সামান্য ঠান্ডা লাগলে মৌনতা আর মা দশ মিনিট অন্তর অন্তর এই চা, ঐ চা নিয়ে হাজির হতো, সেখানে আজ সে এত বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়েও তার স্ত্রীর কাছ থেকে মানবিকতার বদলে কেবল তর্ক-বিতর্ক পাচ্ছে। সে রাগান্বিত সৃজার দিকে তাকিয়ে বলল,
–“আমার সামান্য জ্বর হলেও পরিবারের সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ত, সৃজা। এক মুহূর্তের জন্যও আমায় একা রাখত না; মুখের সামনে হরেক রকম খাবার সাজিয়ে রাখত। মৌনতা সারারাত না ঘুমিয়ে আমার সেবা করত। আর তুমি কি না সামান্য রান্না করে খাওয়ানো তো দূর, একটু ওয়াশরুম পর্যন্ত দিয়ে আসতে পারছ না?”
সৃজা কপাল কুঁচকে ইমরোজের কথা লুফে নিল।
—”কী বললে আবার বলো তো? তোমার পরিবার তোমাকে মাথায় তুলে রাখত? তো কোথায় তোমার সেই পরিবার, ইমরোজ? তারা যে তোমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে, সেটা কি ভুলে গেছ?”
পরক্ষণেই তীব্র তাচ্ছিল্যের সাথে বলল,

—”আর তুমি কি এখন আমার মাঝে মৌনতাকে খুঁজছ? তবে তুমি চরম বোকামি করছ। কারণ মৌনতার মতো এসব করার সময় আমার নেই। আমি একজন স্মার্ট, ওয়েল এডুকেটেড মেয়ে; ঘরে বসে হাঁড়ি-পাতিল ঘষামাজা করার জন্য নিজেকে গড়ে তুলিনি। এটা তুমিও ভালো করে জানো। আর ভুলে যেয়ো না, এ কারণেই তুমি আমায় পছন্দ করেছিলে, মৌনতাকে নয়। এখন কি তোমার ঘরে মৌনতা আর বাইরে সৃজা চাই? দুটো একসাথে কখনো পাবে না। আমার সাথে বুঝে কথা বলবে। এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমার সাথে আর রাগারাগি করতে আসবে না।”
ইমরোজ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সৃজা যেন আঙুল দিয়ে তার ভুলটা দেখিয়ে দিচ্ছে, আর সেই ভুলের জীবন্ত প্রমাণ হলো খোদ ‘সৃজা’। সৃজা রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
–“আমার সাথে ওই মৌনতার তুলনা! ও কি আমার নখের যোগ্য? পড়াশোনা করে নিজেকে মেইনটেইন করে এখন আমি নাকি মৌনতার মতো ঘরে বসে হাঁড়ি-পাতিল মাজব!”
বলতে বলতেই সৃজা ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। এমন সময় সৃজার মা দ্রুতপদে এগিয়ে এলেন। মেয়ের মাথায় একটি চাটি মেরে ধমকের সুরে বললেন,

–“এ কী করলি? এটা কেমন ব্যবহার ছিল, সৃজা?”
–“তবে কী করব? দেখছ না ও কেমন আচরণ করছে আমার সাথে?”
–“পুরুষ মানুষ স্ত্রীর কাছে এই যত্নটুকুই তো চাইবে!”
–“মানে? পুরুষ মানুষ যদি স্ত্রীর কাছে এটাই চাইত, তবে ও মৌনতাকে ছেড়ে আমার কাছে আসত কেন, আম্মা? ওসব কিচ্ছু না। পুরুষ মানুষের ঘরে মৌনতা আর বাইরে সৃজা চাই! মা*** কোথাকার!”
–“এত রাগ করতে নেই সৃজা। ঘর-সংসার করতে হবে না? এমন করলে চলে?”
–“সংসারই তো করছি। চাকরি-বাকরি ছেড়ে ঘরেই তো পড়ে আছি। এটা কোনো জীবন? আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে আম্মা। না আছে আনন্দ-স্ফূর্তি, না আছে বিলাসিতা। যা ভেবেছিলাম তার কিছুই হয়নি। এখন মনে হচ্ছে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছি।”
সৃজার মা মেয়ের হাত চেপে ধরে শাসিয়ে বললেন,
–“আস্তে কথা বল। কোনো কুড়াল মারিসনি। কিন্তু এখন এমন আচরণ করলে সত্যিই নিজের পায়ে কুড়াল মারবি।”
সৃজা কপাল কুঁচকে বলল,

–“কী বলছ?”
ভদ্রমহিলা সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ দেখে নিয়ে বললেন,
–“আগামীকাল সম্পত্তির চূড়ান্ত ভাগবাটোয়ারার শেষ বৈঠক।”
–“কী বলছ! ইমরোজ তো আমায় এ ব্যাপারে কিছু বলেনি!”
–“সারাদিন রাগে গজগজ করলে শুনবি কী করে? গতকাল রাতে ও যখন ফোনে কথা বলছিল, আমি তখন শুনেছি।”
সৃজার দৃষ্টি সরু হয়ে এল। তার মা পুনরায় বোঝাতে লাগলেন,
–“এমন করে ওর মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করিস না। অসুস্থ মানুষ, এই সময়ের খারাপ ব্যবহার মনে গেঁথে থাকে। বিয়ে তো করেই ফেলেছিস, এখন কি আর করার আছে? সংসার করবি না?”
–“এই বিয়ে-সংসার আমার জন্য না, আম্মা। ওর সাথে সংসার করা মানে ঘরের কাজ করা, রান্না করা, স্বামীর সেবা করা। আবার বাইরে টিপটপ হয়ে চলা। গতকাল পার্লার থেকে সব সার্ভিস নিয়ে এসেছি। এত সুন্দর নেল এক্সটেনশন করিয়েছি কি রান্না করার জন্য?”

–“তবে বিয়ে করলি কেন?”
–“ভেবেছিলাম যাই হয়ে যাক না কেন! সিকদার পরিবার কখনোই তাদের ছেলেকে হাতছাড়া করবে না। কিন্তু কে জানত, তারা একটা বাইরের মেয়ের জন্য নিজের ছেলেকে ঘর থেকে বের করে দেবে! একবার সিকদার বাড়িতে ঢুকতে পারলে আর পিছু ফিরে তাকাতে হতো না। কোম্পানি, বাড়ি—সবকিছুর ওপর রাজত্ব করতে পারতাম।”
ভদ্রমহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–“যা লোকসান হওয়ার হয়েছে। এখন লোকসান পোষাতে হবে সৃজা। নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে হবে। এই মুহূর্তে রাগের বশে বোকামি করিস না, নাহলে যেটুকু আছে সেটুকুও হারাবি। এখন ও যেমন চায় তেমন চল, আগে নিজের জায়গাটা শক্ত কর।”
সৃজা রাগ দমিয়ে লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল। মায়ের কথা বোঝে সে! এই মুহূর্তে রাগের বশে কোনো ভুল করা যাবে না। সে রাগ ঝেহে রান্নাঘরে গিয়ে হ্যান্ড গ্লাভস পরে ইউটিউব দেখে দেখে রান্না করার চেষ্টা করতে লাগল।
পায়ের ব্যথায় ইমরোজের শরীর অসাড় হয়ে আসছিল। সে শুয়ে শুয়ে অলস সময় কাটাতে ফোনটা হাতে নিল। ফেসবুকে স্ক্রল করতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি থমকে গেল। নিউজফিডে জ্বলজ্বল করছে প্রিন্সেস ড্রেস পরিহিত তার পরীর মতো নিজের মেয়ের হাস্যোজ্জ্বল ছবি। অবাক ইমরোজ আইডিটা দেখল। নিশান্তের আইডি থেকে পরিবারের সবাইকে ট্যাগ করে পোস্ট করা হয়েছে। ক্যাপশনে লেখা ‘আমাদের বার্থডে গার্ল’। ইমরোজ হতভম্ব হয়ে ফোনের তারিখ দেখল। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

–“পঁচিশে মার্চ, গতকাল নায়েলের জন্মদিন ছিল। ওহ্ শিট! নায়েলের জন্মদিন আমি কী করে এটা ভুলে গেলাম!”
রাগে দুঃখে নিজের চুল খামচে ধরলো ইমরোজ। হাতের কাছের বালিশটা ছুঁড়ে মেরে পুনরায় খুঁটে খুঁটে মেয়ের প্রত্যেকটা ছবি দেখতে লাগল। দৃষ্টিতে অজস্র কৌতুহল! নিশান্ত তো তাকে ব্লক করে দিয়েছিল। তারমানে ব্লক ছেড়েছে। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল মেয়েকে দেখতে পেরে। নিশাত খালামনি সেদিনকার পর থেকে আর ফোন রিসিভ করেনি।
ছবিগুলো দেখতে দেখতেই আচমকা লাস্টের ছবিটাতে ইমরোজের চোখ আঁটকে গেল। সে স্থবিরতা ভেঙে নড়েচড়ে ওঠে। ললাটে অজস্র ভাঁজ পড়ল, চোখেমুখে সন্দেহের আভাস দৃঢ় হয়। কেননা বিশাল একটা বার্থডে কেকের সামনে একসাথে দাঁড়িয়ে আছে মৌনতা আর এরোজ। আর এরোজের কোলে তার গলা জড়িয়ে ধরে আছে হাস্যোজ্জ্বল মুখের নায়েল। যেন একটা সুখী পরিবার।
–“ওরা দু’জন এভাবে একসাথে দাঁড়িয়ে আছে কেন?”, ইমরোজ অস্ফুট স্বরে বলে উঠল।
মেয়ের জন্মদিনের কথা মুহূর্তেই তার মস্তিষ্ক থেকে উধাও হয়ে গেল। তার ঈর্ষান্বিত মন ছবির দৃশ্যপট নিয়ে তোলপাড় শুরু করল। সে এই দৃশ্য মেনে নিতে পারছে না। ইমরোজ একদৃষ্টিতে ছবির দিকে তাকিয়ে ফের আওড়ায়,

–“কই মৌনতা তো এরোজের চারিধারেও যেতে ভয় পেতো। নায়েল ও তো এরোজকে ভয় পেতো, কাছে যেতে চাইতো না। তবে কীভাবে ওরা একে অপরের সাথে এত হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে?”
মুহূর্তেই ইমরোজ অস্থির হয়ে পড়ল। সে নিশান্তকে ফোন দিল, কিন্তু বারবার দিলেও কেউ রিসিভ করল না। এরপর নিশাতকে ফোন দিল, সেও ধরল না। রাগে-দুঃখে ইমরোজ হাতের গ্লাসটা মেঝেতে ছুড়ে আছাড় মারল। চিৎকার করে বলল,
–“ওরা আমার মেয়েকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে, আমার ই সন্তানকে নিয়ে উল্লাস করছে! ওদের সবাইকে আমি দেখে নেব। তিন মাসের মধ্যে যদি নায়েলকে আমার কাছে না আনি, তবে আমার নাম ইমরোজ সিকদার নয়।”
ইমরোজের চিৎকারে সৃজার মা ছুটে এলেন। ভাঙা কাঁচ দেখে শঙ্কিত কণ্ঠে বললেন,
–“কী হয়েছে বাবা? এমন করছ কেন?”
ইমরোজ কোনো জবাব না দিয়ে ভেতরে ভেতরে জ্বলতে লাগল। সৃজার মা সৃজাকে ডেকে আনলেন। সৃজা দ্রুত এসে শুধাল,

–“কী হয়েছে ইমরোজ? এমন করছ কেন?”
ইমরোজ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,
–“গতকাল নায়েলের জন্মদিন ছিল আর আমি ভুলে গেছি! আর ওরা সবাই আমার মেয়েকে নিয়ে ফূর্তি করছে, আমায় একবার জানায়নি পর্যন্ত! নায়েলকে আমার সাথে কথাও বলতে দিচ্ছে না। আমি ওদের প্রত্যেককে দেখে নেব। আজই আমি উকিলের কাছে যাব।”
সৃজা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে নম্র স্বরে বলল,
–“গতকাল নায়েলের জন্মদিন ছিল?”
–“হ্যাঁ, তোমার মনে নেই? তুমি তো গতবার না বলতেই ওর জন্য সারপ্রাইজ গিফট পাঠিয়েছিলে, এবার ভুলে গেলে কী করে? তোমার কি আমাকে জানানো উচিত ছিল না?”
সৃজা অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে বলল,
—”বাবা হয়ে তোমারই মনে নেই মেয়ের জন্মদিনের কথা। আমায় দোষ দিচ্ছ কেন? আমি কয়েক দিন ধরে খুব ডিস্টার্ব আছি, তাই মনে ছিল না। বাদ দাও, রাগ করো না। তুমি অসুস্থ ছিলে বলেই হয়তো ভুলে গেছ।”
ইমরোজ নিরুত্তর রইল। সৃজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে একটি প্লেট হাতে আবার ঘরে ঢুকল। দরজা আটকে বিছানায় ইমরোজের পাশে বসে তার হাত আঁকড়ে ধরে নম্র স্বরে বলল,

–“যারা তোমার কথা ভাবে না, তাদের জন্য কেন নিজের শান্তি নষ্ট করছ? ওদের যা করার করতে দাও। আমরা যখন নায়েলকে নিয়ে আসব এবং ও আমাদের সাথে খুব সুখে থাকবে, তখনই ওদের ভুল ভাঙবে।”
ইমরোজ থমথমে মুখে বলল,
–“হুম, আমি শীঘ্রই নায়েলের কাস্টডির জন্য পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করব।”
সৃজা সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–“শুনলাম আগামীকাল নাকি সম্পত্তির চূড়ান্ত ভাগবাটোয়ারা হবে?”
–“হুঁ।”
–“বললে না তো।”
–“কী বলব! পেলে তো দেখেবেই।”
–“আমি আরো কতকিছু পরিকল্পনা করে রেখেছি, আমরা সম্পত্তি পাওয়ার পর নিজস্ব একটা বাড়ি করব। আর সেটা আমাদের নায়েলের সব পছন্দনীয় জিনিস দিয়ে সাজানো হবে। নায়েল যেন তার বাড়িতে ঢুকে সব ভুলে যায়। আমরা ওকে স্কুলে ভর্তি করাব, এক সাথে স্কুলে দিয়ে আসব। কত মজা হবে তাই না?”
ইদানিং মেয়েই ইমরোজের সকল অশান্তির কারণ। নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অন্যের কাছে—এটাই সে মানতে পারে না। সৃজার কথায় তার চোখেমুখে নম্রতা ভর করে। মাথা নেড়ে বলল,

–“হুম, আমার নায়েলের স্বর্গরাজ্য হবে সেটা। এত সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যে রাখব ও ভুলে যাবে ঝি বাড়ির সকলের কথা।”
–“এইতো, তবে এত রাগ করছো কেন? তুমি বাবা, তোমার অধিকার কেউ খন্ডাতে পারবে না। এখন হাসো তো, এই দেখো আমি তোমার জন্য কী বানিয়েছি। ব্রকলি, ডিম দিয়ে অমলেট আর রুটি‌। খেয়ে বলো কেমন হয়েছে।”
ইমরোজ মৃদু অবাক হলো,
–“তুমি বানিয়েছো?”
–“হুম, খেয়ে দেখো।”
–“তুমি না কিছুক্ষণ আগে বললে, তুমি রান্না করতে পারবে না।”
–“তোমার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি, ইমরোজ। এত লাঞ্ছনার পরেও যখন তোমার হাত ছাড়িনি, তখন এই সামান্য রান্না কী এমন বড় ব্যপার! আমি শুধু মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়ে যাই ইমরোজ, কারণ তুমি আমার মাঝে মৌনতার কর্মকান্ড খোঁজও। যেটা আমার জন্য কষ্টদায়ক!”
সৃজার মলিন কণ্ঠে ইমরোজের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করল। সে তৎক্ষণাৎ নারীটিকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে নেয়‌। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,

–“আমি মৌনতার কর্মকান্ড তোমার মাঝে কেন খুঁজব সৃজা? কোথায় মৌনতা আর কোথায় তুমি? আমি শুধু চাই প্রতিটা মুহুর্তে তুমি আমার পাশে থাকবে। হোক সেটা সুখ কিংবা দুঃখ। তাহলেই আমি সবটা সামলে নিতে পারব। অসুস্থতার মাঝেও আমি তোমায় চাই যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে পারি।”
সৃজা গাল ভরে হাসল তার কথায়। ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল,
–“আমি সবসময় আছি তোমার পাশে। তুমি এত দুশ্চিন্তা করো না। আগামীকালকের জন্য দৃঢ়তার সাথে প্রস্তুতি নাও যেন কেউ তোমায় একচুল ও ঠকাতে না পারে।”
ইমরোজ মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনলো। ওষ্ঠকোনে শব্দ করে চুমু দিয়ে বলল,
–“আমায় কেউ ঠকাতে পারবে না। এখন থেকে সব দুশ্চিন্তা বাদ। এখন শুধু আমরা আমাদের নিজের অবস্থান মজবুত করব।”
–“আমরা ওদের সুখী হয়ে দেখিয়ে দেব।”
–“হুম।”, নারীটির মাঝে ডুবতে ডুবতে ইমরোজ জড়ানো কণ্ঠে বলল।
তারা মত্ত হয় একটা নতুন অধ্যায়ের প্রারম্ভে—অথচ দু’জনের মনের মাঝেই অসহ্য দোলাচল, অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা। তবুও তাদের মধ্যে লোকদেখানো সুখী হওয়ার এক অদম্য জেদ! জানা নেই, এই জেদের পরিণতি কী হবে। সুখ কি সত্যিই আসবে, নাকি প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তিতেই সুখও বিদায় নিয়েছে?

তপোবনের ভাষ্যমতে কেউ কারোর জায়গা নিতে পারে না বরং নতুন করে নিজের একটা জায়গা তৈরি করে মানুষের মনে। কথাটা রূপকথার জন্য যারপরনাই সত্য। সে কারোর জীবনের দ্বিতীয় নারী হলেও ওই মানুষটার মনে সে একান্তই নিজস্ব একটা জায়গা করে নিয়েছে। যাতে নেই অন্য কারোর হস্তক্ষেপ কিংবা রূপকথার ও নেই অন্য কারোর জায়গায় বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ।
মানুষটার কোনো অভ্যাসে সে বিঘ্ন ঘটায়নি বরং নিজেই নতুন এক অভ্যাস হয়ে উঠেছে।
গভীর রাতের একটা ছমছমে প্রহর রূপকথার একান্তই নিজস্ব একটা প্রহর হয়। যেখানে থাকে না কোনো দায়িত্ব, থাকে না কোনো ইতস্ততা। ওই প্রহরটুকু তাদের টোনা টুনির সংসার হয়ে ওঠে।
স্বভাবতই তপোবনের চুলগুলো একটু লম্বা। কিন্তু সেট করে বের হলে বোঝার উপায় নেই যে চুলগুলো এতটা লম্বা। রূপকথা তখন মনোযোগ সহকারে তার চুলগুলো নিয়ে কিছু করছে। স্বাভাবিকভাবেই চুলে হাত দিলে বেশ আরাম লাগে। তপোবন ও ব্যতিক্রম নয়।
রাত সাড়ে বারোটা। কালো ফ্রেমের চশমাটা আরেকটু ঠেলে দিল তপোবন। মনোযোগ সহকারে খাতা দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই সে বিতৃষ্ণা ভরা এক শব্দ করল।
অসন্তোষের সাথে বলল,

–“শর্টকাট মেরে দিয়েছো মেয়ে?”
মাথার দুই পাশে দু’টো তালগাছ বাঁধতে থাকা রূপকথা বাঁকা চোখে চেয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“বিস্তারিত তো আমি পারি। পরীক্ষার সময় বিস্তারিত করব। এখন মূল অংকটুকু করলেই হবে।”
–“এসব ফাঁকিবাজি শিখেছো কার থেকে?”
–“আপনার ছেলের থেকে।”
–“অথচ তানশান আজ পর্যন্ত এগুলো আমার সামনে করার সাহস পায়নি।”
–“হুঁ, ওর সাহস হয়নি বলে কী আমার সাহস হবে না? আমার ভরপুর সাহস রয়েছে।”
তপোবন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির পানে। সরু চোখে চেয়ে শুধায়,
–“তো এত দুঃসাহস আসল কোত্থেকে?”
রূপকথা গাল ভরে হেসে বলল,
–“তানশান তো বাচ্চা আর আমি বাচ্চার মা? তাই এত দুঃসাহস রয়েছে আমার। আমি গিন্নি। আর গিন্নির উপর কোনো চোটপাট চলবে না বুঝলেন। পরীক্ষার খাতায় পরিপূর্ণ ম্যথ করতে পারলেই তো হলো।”
তপোবন ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
–“আপনি বিগড়ে যাচ্ছেন, মুরুব্বি! আপনাকে শায়েস্তা করতে হবে।”
রূপকথা মুখ বাঁকালো। তপোবন পুনরায় খাতা দেখতে মনোযোগ হয়। আনমনে বলে,
–“সব তো পেরেছো। এখন কী একটুও কনফিডেন্স পাচ্ছো?”
–“পাচ্ছি, পাচ্ছি।”
–“পেলে আলহামদুলিল্লাহ। মিড টার্মে কিন্তু ভালো করতেই হবে।”
–“আলবত করব।”, রূপকথা নিজ কর্মে মনোযোগী থেকেই দৃঢ় কণ্ঠে বলল। তপোবন পুনরায় অসন্তোষের সাথে বলল,

–“করছো কী? দশ মিনিটের ব্রেক দিয়েছি একটু হেঁটে আসবে নয়তো কিছু খেয়ে আসবে। তা না আমার চুলগুলোকে কী করছো?”
রূপকথার চুল বাঁধা ততক্ষণে শেষ। সে নিজের চেয়ারে বসে পিটপিট করে তাকালো তপোবনের দিকে। তাকাতেই সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল স্বামীর অদ্ভুত বেশভূষা দেখে। তপোবন ভ্রু নাচায়,
–“হাসছ কেন?”
রূপকথা হাসতে হাসতে বলল,
–“আয়না দেখুন।”
তপোবন চেয়ার থেকে পা বের করে ঘুরে তাকায় আয়নার দিকে। তাকাতেই তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। মাথার দুই পাশে দু’টো তালগাছ দাঁড়িয়ে আছে। আর মেয়েটা তা দেখে হেসেই যাচ্ছে। সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে একটা চাটি দিল মেয়েটির মাথা বরাবর। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,
–“মাথায় এত ফাজলামি বুদ্ধি নিয়ে ঘুরলে পড়াশুনা ঢুকবে কী করে?”
–“এগুলোর কারণেই পড়াশুনা আরো ভালোকরে ঢোকে।”
তপোবন ঝুটি খুলতে খুলতে বলল,

–“পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে গিয়ে কিছু খেয়ে আসো।”
–“না না কিছু খাবো না এখন। কিছুক্ষণ আগেই তো ভাত খেয়েছি।”
–“কিছু ড্রাই ফ্রুটস তো ঘরে রাখতে পারো।”
–“খাবে কে? তানশানের ঘরে রাখা আছে।”
–“তুমি খাবে। পড়বে আর খাবে।”
–“ইচ্ছে করে না।”, রূপকথার উদাসীন কণ্ঠে তপোবন চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিয়ে বলল,
–“ইচ্ছে করতে হবে। এখন বয়সটা উদ্দামতার। পড়তে হবে, চর্চা করতে হবে, পেটভরে খাওয়া দাওয়া করতে হবে, লাইফে শাইন করতে হবে।”
–“আমি অলরেডি লাইফে শাইন করে ফেলেছি।”, রূপকথা টেবিলে থুতনি ঠেকিয়ে বলল।
তপোবন কপাল কুঁচকে বলল,
–“কী শাইন করেছেন মুরুব্বি?”
–“আরে যার এমন স্বামী সন্তান আছে তার আর কিছু লাগে না-কি জীবনে?”, রূপকথার রিল্যাক্স কণ্ঠে তপোবন টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে মৃদু নুইয়ে গেল। ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
–“কেমন স্বামী?”
রূপকথা সরব কপাল কুঁচকে নেয়। মুখ ঝামটা মেরে বলল,

–“বুড়ো!”
তপোবন হেসে উঠল। হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
–“ঠিক বলেছো। এর জন্যই বেশি বেশি পড়াশুনা করে নিজেকে দাঁড় করাতে হবে, যেন বুড়ো স্বামী মরে গেলে নিজের ভার নিজেই বহন করতে পারো।”
বড্ড স্বাভাবিক একটা কথা—অথচ রূপকথার হাসিমুখ হারিয়ে গিয়েছে। চোখদুটো অনতিবিলম্বে চিকচিক করে উঠল। ফিজিক্স সাপ্লিমেন্ট দেখতে ব্যস্ত তপোবন হঠাৎ ব্যস্ত দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকালে, ব্যস্ততা মিলিয়ে গেল। ওষ্ঠকোনে ম্লান হাসি ফুটে উঠল সম্মুখের কান্না চেপে রাখা মুখটি দেখে। শুধায়,
–“কী?”
রূপকথা সরব নাক টেনে কেঁদে উঠল। তপোবন গা দুলিয়ে হেসে উঠল। হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,

–“আরে পিচ্চি মেয়ে, মজা করেছি।”
রূপকথা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার পৃষ্ঠদেশ। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
–“আপনি আর আম্মা ছাড়া আমায় আর কেউ এভাবে পুরো পৃথিবী থেকে আগলে রাখেনি। আমায় একা ছেড়ে কোথাও যাবেন না।”
তপোবন মৃদু হেসে চুলের গোছায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। মিহি স্বরে বলল,
–“কোথাও যাব না। এভাবেই বুকের মাঝে আগলে রাখব।”
রূপকথা শান্ত হয়। তপোবন তার চোখের পানি মুছে দিয়ে আদুরে গলায় শুধাল,
–“আর পড়বে?”
রূপকথা সুযোগের একদম সৎ ব্যবহার করল। সে না বোধক মাথা নাড়লো। তপোবন বিনা বিবাদে মেনে গেল। বলল,
–“আচ্ছা পড়তে হবে না। ঘুমাবে চলো, সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে বসবে।”
রূপকথা গাল ভরে হেসে সায় জানালো। পরপরই চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“আপনার সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে তো‌।”
–“বলো।”
–“দাঁড়ান, দাঁড়ান।”
বলেই মেয়েটি ছুটলো কাবার্ডের কাছে। নিজের পার্স বের করে মেঝেতে পা গুটিয়ে বসতেই তপোবন কপাল কুঁচকে এগিয়ে এলো। হাঁটু গেড়ে বসে শুধাল,

–“একি নিচে বসেছো কেন? আর এগুলো কী?”
–“টাকা‌। এই ধরুন, এখানে এগারো হাজার টাকা আছে। তানশানের জন্মদিনে অতিথি এসেছিল না? তারা আমায় দেখে দিয়েছিল। আর এখানে পাঁচ হাজার টাকা আছে। এটা আব্বুজান দিয়েছিল। আর এই যে সাত হাজার টাকা, আপনি আমায় কলেজে যাওয়ার সময় দিতেন। সেগুলো জমিয়ে এই টাকা হয়েছে।”
রূপকথা সব টাকাগুলো তপোবনের হাতে দিয়ে বলল। তপোবন ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“তো এগুলো আমায় দিচ্ছো কেন?”
রূপকথা চোখ তুলে তাকায়। খানিক অনুনয়ের সুরে বলল,
–“এগুলো আমার কোনো কাজে লাগে না। আপনিও তো নেন না। শুধু শুধু পড়ে থাকবে তার চেয়ে এগুলো দিয়ে আম্মাকে একটা ফ্রিজ কিনে দেই?”
রূপকথার কৈফিয়ত শুনে তপোবন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। সেও মেয়েটির মতো মেঝেতে পা গুটিয়ে বসল। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,

–“কিন্তু এই টাকায় তো ফ্রিজ হবে না।”
–“হবে না?”, রূপকথা অনাহুত’র ন্যায় শুধাল। তপোবন না বোধক মাথা নাড়ল। রূপকথার সব আনন্দ গায়েব হয়ে গেল।
–“এখন কী হবে?”
–“আমার কাছে একটা উপায় আছে।”
–“কী উপায়?”
–“বলছি তার আগে দু’টো চুমু দাও তো!”, তপোবন গাল এগিয়ে দিয়ে বলল। রূপকথা কপাল কুঁচকে নিলো,
–“এ কেমন উপায়?”
–“আরে দাও, তারপর উপায় বলছি।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে দুই গালে দু’টো শুকনো চুমু দিয়ে সরে এলো। থমথমে মুখে বলল,
–“এখন বলুন।”
–“উপায়টা হলো আমি ফ্রিজ কিনে দিতে পারি কিন্তু বদলে…”
–“বদলে কী?”
তপোবন বিগলিত হেসে বলল,

–“বদলে দু’টো চুমু দিতে হবে।”
রূপকথা মুখশ্রী গম্ভীর করে নেয়। থমথমে মুখে বলে,
–“আপনি কী চুমুর ব্যবসা করতে নেমেছেন?”
–“তুমি শাড়ির ব্যবসা করতে পারলে আমি চুমুর ব্যবসা করতে পারব না? এ কেমন অবিচার?”
–“আমি শাড়ির ব্যবসা করি?”
–“কথায় কথায় শাড়ি চুড়ি চায় কে?”
রূপকথা থমথমে মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
–“লাগবে না আমার ফ্রিজ।”
–“দু’টো চুমুর জন্য এত কিপটামো? ছিঃ! তুমি দুটো চুমু দিলেই কিন্তু আমি এর সাথে কিছু মিলিয়ে ফ্রিজ কিনে দিতে পারতাম।”
তপোবনের কথায় রূপকথা ফিরে তাকায়। কী দরকার ত্যাড়ামো করার। মায়ের ফ্রিজ হয়ে যাবে তো। সে এগিয়ে এসে ঝপাঝপ দু’টো চুমু দিয়ে বলল,

–“দিয়েছি। কাল কিনে দেবেন?”
তপোবন বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। হাতের টাকাগুলো রূপকথার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
–“নাও, তোমার ফ্রিজ পৌঁছে গিয়েছে।”
–“কী বলছেন? টাকা দিয়ে দিলেন কেন?”
তপোবন হেসে তার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
–“এতক্ষণ মজা করছিলাম তোমার সাথে। ফ্রিজ কিনতে তোমার টাকা দেয়া লাগবে কেন? আমার বুঝ নেই? ফ্রিজ, ব্লেন্ডার মেশিন, চপার, প্রেশার কুকার সব বিকালেই পাঠিয়ে দিয়েছি আমি। জমিজমার কাজে এই কদিন ব্যস্ত ছিলাম, তাই এতদিন পাঠানোর সময় পাইনি। আজ পাঠিয়েছি, আম্মা বলেনি তোমায়? ”
হতবাক রূপকথা অস্ফুট স্বরে বলল,
–“ব্যস্ততার কারণে আম্মার সাথে কথা হয়নি তো।”
–“জেগে থাকলে কথা বলে নাও এখন। আমি লোকদের বলেছি সব সেট করে দিতে। তবুও কোথাও কোনো ঝামেলা হলো কি-না কিছু তো বলল না।”
রূপকথা ছলছল নেত্রে তাকায়। ক্ষীণ স্বরে বলে,

–“ধন্যবাদ।”
তপোবন ফিরে তাকায়। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“এসব স্যরি, থ্যাংক ইউ ভুলে যাও। আর একটু আগে যেভাবে অনুরোধ করলে আর কোনোদিন করবে না। আমার উপর হুকুম করার, নিজের চাওয়া পাওয়া পূরণ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে তোমার। নিজের অধিকার বুঝে নিতে হয় বুঝলেন মুরুব্বি?”
রূপকথা হাসিমুখে মাথা নাড়লো। বলল,
–“কাল দুই প্লেট ফুচকা খাওয়াবেন তবে।”
সরব তপোবন কপাল কুঁচকে শুধাল,
–“কেন কেন?”
রূপকথা দাঁত কেলিয়ে বলল,
–“আমার অধিকার।”
তপোবন থমথমে মুখে বলল,
–“এটাকে ক্ষমতার অপব্যবহার বলে।”
রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলল,
–“এটা আমার অধিকার আর আপনি খাওয়াতে বাধ্য।”
তপোবন ডানে বামে মাথা নেড়ে আওড়ায়,
–“পাজি মেয়ে!”

সে বেরিয়ে যায় একটা টহল দিতে। ছেলের ঘর, বাবা মায়ের ঘর আর বোনের ঘর সবটা একবার দেখে এসে রান্নাঘর থেকে এক হালি কলা নিয়ে উপরে আসে। জোরপূর্বক একটা কলা রূপকথাকে খাইয়ে তারপর ঘুমাতে দেয়।
পরদিন সকাল হতেই বাবা আর তপোবন সহ পরিবারের আরো সকল আত্মীয় স্বজন জমায়েত হয় বৈঠকে। ইমরোজ, সৃজা ও সেথায় হাজির হয়।
দীর্ঘ আলাপচারিতা আর নিয়ম নীতি মেনে যখন ইমরোজের হাতে দলিল দেয়া হলো। তখন ইমরোজ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল দলিলের লেখা পড়ে।
সে বাবা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে অবাক কণ্ঠে শুধাল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৫ (২)

–“ভাইজান আর এরোজের সাথে আমার ভাগ মিলছে না কেন, আব্বু?”
তকদির সিকদার থমথমে মুখে বললেন,
–“দলিলে সব লেখাই আছে। পড়ে দেখো।”
ইমরোজ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“সেটাই জিজ্ঞাসা করছি আমি তোমার কাছে। এখানে লেখা আছে আমার অর্ধেক সম্পত্তি মৌনতা আর নায়েলের নামে করা হয়েছে। কিন্তু কেন?”
–“এতকিছুর পর এইটুকু ওদের প্রাপ্য।”, তকদির সিকদারের কথায় ইমরোজ আর সৃজা হতভম্ব হয়ে গেল। তপোবন নির্বাক থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে নত শির বসে আছে। যেখানে বাবা থাকে, সেখানে সে টু শব্দ ও করে না।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৬ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here