৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৫
রুপান্জলি
ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখে এমপির নির্বাচন,, আজ ১৭ তারিখ । দুদিনের মাথায় রমজান মাস শুরু,, সব মিলিয়ে বড্ড বিপাকে আছে দ্বীপ। অন্যান্য দল যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নিয়ে চিন্তায় থাকে সেখানে দ্বীপ জনগনের চিন্তায় মসগুল। জনগন এই রোজা রমজানের দিনে কিভাবে কি হেন্ডেল করবে,, রোজা রেখে কেন্দ্রে গিয়ে জনগন কতোটা কম্ফোর্ট ফিল করবে,, সিরিয়াল ধরে যেনো দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়,, সেই সাথে তাদের রোজা রেখে পোস্টার বিলি,, জনগণের কাছে বার্তা পৌছানো,, এসব নিয়েই দলের লোকেদের সাথে গভীর আলোচনায় ব্যাস্ত দ্বীপ। গভীর রাত হওয়ায় আলোচনায় খুব একটা ত্রুটি হচ্ছে না। সবাই যে যার কতো মতামত দিচ্ছে, আর দ্বীপ শুনছে। পরবর্তীতে তার যেটা ঠিক মনে হবে সেটাই ফাইনাল করা হবে। আলোচনার মাধ্যে তাদের দলের সভাপতি রাফিদ মন্তব্য রাখলো– ভাই!! আমার মনে হয় কেন্দ্রে ভোট আদান রুম সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া উচিৎ যেনো কাউকে সিরিয়াল ধরতে না হয়। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের মাঠে যেনো রোদ না পরে তাই ছাওনি কিংবা পেন্ডেল বেধে দিলে ভালো হয়। আর একান্ত ভাবে করতে চাইলে আমরা নাহয় ভোট দেওয়া শেষে সবার হাতে হাতে ইফতারের প্যাকেট দিলাম। এতে করে ভোট দিতে গিয়ে জনগনের মনে যতটা ক্লান্তি জমা হবে সবটা ইফতার পেয়ে মিটে যাবে।
,, রাফিদের কথাটা দ্বীপের মনে ধরলো বোধয় তাই নিরব রইলো তবে ফাহিম আপত্তি করে বললো —
,,, ভাই!! আমরা সবাইকে ইফতার দিবো কোনো? সবাই তো আর আমাদের ভোট দিবেনা। যদি দেয় ও তাহলে আমরা বুঝবো কি করে? তারা যে আমাদের ভোট দিয়েছে?
,,, বিহান বললো –: ছোট লোকের মতো কথা বলোনা না ফাহিম,, আমরা তো ভোটের বিনিময়ে ইফতার দিবো না,, আমরা দিবো আল্লাহ এর সন্তুষ্টি আর ভোটারদের মনের ক্লান্তি দূর করার জন্য। এখানে কে ভোট দিলো না দিলো তাতে কি এসে যায়?
জাহিদ বললো — সেটা নাহয় ঠিক আছে কিন্তু পোস্টার বিলি কখন করবো?আর স্লোগান দেওয়ার ব্যাপারটা? রোজা রেখে স্লোগান দিলে সবার গলা শুকিয়ে যাবে না?
,,, অন্তিক বললো — হুম!! স্লোগান দেওয়ার ব্যাপারটা খুবি টাফ,, এতে দলের ছেলেরা সাথে আরও যারা থাকবে সবাই অসুস্থ হয়ে পরবে। আবার কোনো মতে যে রোজা ভেঙে স্লোগান দিবে সেটাও সম্ভব না,, মুসলিম হয়ে অন্তত এতো বড়ো পাপ করা সাজে না।
,,, অন্তিকে কথাটা সবার মনে ধরলো,, সত্যি ই এভাবে সম্ভব না৷ বিহান কিছু একটা ভাবলো। সে বলতে নিবে তখনি রাফিদ বললো — বলছিলাম যে,, রোজা তো পরশু থেকে শুরু। তো, আমরা যদি আগামীকাল সবাই মিলে স্লোগান দেই,, আর সেটা রেকর্ড করে রাখি। আর রোজার সময় সেটা এলাকায় এলাকায় মাইকিং করি,, তাহলেই তো প্রচারনাটা মিটে যাবে।
,,, বিহানের পছন্দ হলো কথাটা,, সে যোগ করে বললো — রাইট!! আর জনগণের কাছে পোস্টার বিলিটা নাহয় বিকালের শেষের দিকে শুরু করবো। পোস্টার বিলি করে ক্লান্ত হতে হতে মাগরিবের আজান পরে যাবে মেবি,, তারপর সবাই মিলে ইফতার করে নিবো। এর মধ্যে কেউ বেশি উইক হলে সে রেস্ট নিবে,, প্রবলেম সল্ভ ।
,, দ্বীপ সবার কথা শুনতে শুনতে একবার বিছানার দিকে তাকালো,,, বিছানার এক কোনায় গুটি শুটি মেরে শুয়ে আছে অর্পনা। কোমর ছাড়ানো ভেজা চুলগুলো বালিশের উপর এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে, যার ফলে বালিশের অনাকাংশই ভিজে গিয়েছে। বাড়ি ফিরার পর থেকে ১১ বার গোসল করেছে মেয়েটা তারপরেও ক্ষান্ত হওয়ায় নাম নেই,, একটু পরপর উসখুস করছে। তার শুধু মনে হচ্ছে তার শরীরে র*ক্ত লেগে আছে। সে খু*নি,, নিজ হাতে খু*ন করেছে । তাও একটা দুটো নয় মোট পাঁচটা খু*ন করেছে সে। আর সেই বিশ্রী দৃশ্যগুলো,, ঠোট ছাড়া মানুষ,, নিচে পরে থাকা জ্বীহ্বা, দন্ত, নখ আর দ্বীপের সেই কলি*জা বের করার দৃশ্য চোখে ভাসতেই অর্পনার বমি পায়।
এই কারনে এখনো পর্যন্ত এক লোকমা ভাত পেটে দিতে পারেনি,, যতোবার খেয়েছে ততোবার ঝর ঝর করে বমি করে দিয়েছে। দ্বীপ পোড়াবাড়িতে ওকে খাওয়াতে চাইলে অর্পনা সেখানেও বমি করে দিয়েছিলো। দ্বীপ ভেবেছে বাড়িতে আনার পর হয়তো সবটা ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু না,, দ্বীপকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমান করে দিয়ে আবারও বমি করেছে অর্পনা। এই বিষয়টা নিয়ে বড্ড চিন্তিত দ্বীপ,, মেয়েটার তো খুব খিদে পেয়েছিলো তাহলে খেতে পারছেনা কেনো? আসার পর থেকে তার সাথে অর্পনা একটা টু শব্দ পর্যন্ত করেনি। কেনো করেনি? ভিতরটা কেমন হাসফাস করছে। বুকে জ্বালা করছে,, মনে হচ্ছে এখোনি ওকে ডেকে দুটো কথা বলতে না পারলে মরে যাবে সে। দ্বীপ ভিডিও কলে থাকা সবার দিকে একবার তাকিয়ে পরপর অর্পনার দিকে তাকালো। ওর দিকে তাকিয়ে থেকেই সবার উদ্দেশ্যে বললো — তোমরা আপাতত বিহানের সাথে আলোচনা করো,, আগামীকাল ক্লাবে দেখা হচ্ছে।
,, ওপাশ থেকে উত্তরের আশা করলো না দ্বীপ, কল কেটে কোল থেকে ল্যাপটপ টা সোফায় রেখে দ্রুত কদমে অর্পনার কাছে এগিয়ে গেলো। কাছে যেতেই দেখলো অর্পনা কাঁদছে,, এটাকে পুরোপুরি কান্না বলে না। ছাদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর চোখ থেকে টুপ টাপ পানি গড়াচ্ছে। দ্বীপের বুকটা মুচরে উঠলো,, সে তো দেখেছিলো অর্পনা ঘুমাচ্ছে। তাহলে কখন উঠলো মেয়েটা? আর উঠেছেই যখন নিরবে কান্না করছে কেনো? ওর চোখের পানি মুছবে বলে দ্বীপ এতো কিছু করলো তাও কেনো কাঁদবে সে? মেয়েটা কি জানে? ওর চোখে মুখে কষ্টের ছাপ দ্বীপকে কতোটা ব্যাথা দেয়? কলিঁজাতে গিয়ে সরাসরি আঘাত করে। বুঝে না বোধয়,, আর বুঝেনা বলেই মেয়েটা অবুঝের মতো কষ্ট পায়। দ্বীপ অর্পনার হাত ধরে টেনে তুললো,, পাশাপাশি বসে খরখরা হাতে চোখ মুখ মুছে দিতে দিতে বললো —
,,, কি হয়েছে সোনা? কাঁদছো কেনো? শরীর খুব খারাপ লাগছে? খিদা পেয়েছে? খাবার আনাবো?
,,, অর্পনা কিছু বললো না,, মাথা নিচু করে বিছানার দিকে তাকিয়ে রইলো। দ্বীপ অর্পনার মুখটা তুলে চোখ মুখ থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বললো — আচ্ছা ভাত খেতে হবে না,, অন্য কিছু খাবে? কি খাবে সোনা? খাবার অর্ডার দিবো? ওয়েট!!
,,, বলতে বলতে ফোন ঘেটে ফুডপান্ডা অ্যাপে গেলো। অর্পনার সামনে ধরে ওকে খাবার চুজ করতে বললো কিন্তু অর্পনা করলো না,, সে নিজের মতো বিছানার দিকে তাকিয়ে আছে। দ্বীপ আরও কয়েকবার ডাকলো কিন্তু অর্পনা নিরুত্তাপ। এবার অধৈর্য হয়ে গেলো দ্বীপ। তার কেমন যেনো লাগছে,, সে অর্পনার বাহু ঝাকিয়ে বললো — ভেলোরা, হোয়াটস হ্যাপেন্ড? ডাকছি না তোমায়? উত্তর দিচ্ছো না কেনো?
,,, তবুও অর্পনা কথা বললো না। সে একই ভাবে নীচের দিকে তাকিয়ে রইলো। দ্বীপের রাগ যেনো মাথা ছাড়া দিয়ে উঠলো, কপালের মাঝখানটা ধপ ধপ করছে,, বুকের ভিতর কেমন যেনো লাগছে। মনে হচ্ছে এখনি অর্পনার কন্ঠ স্বর শুনতে না পেলে সে মরে যাবে,, আত্মাটা হাড়িয়ে যাবে চিরতরে। সহসা অর্পনার চোয়াল চেপে ধরলো দ্বীপ, হিসহিসিয়ে বললো — কু*ত্তার বাচ্চা, তর মুখে ঠাডা পরছে? কথা বলিস না কেন? কখন থেকে ডাকছি? ( দ্রুত দম নিতে নিতে) আমাকে তর মানুষ মনে হয়না? বুঝিস না তর জন্য তরপাচ্ছি আমি? কথা বল,, ( দাঁত চেপে) কথা বল নয়তো একদম মুখ ভেঙে ফেলবো।
,,, বলতে বলতে হাতের চাপ বৃদ্ধি করলো সাথে সাথে অর্পনার চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা পানি গড়ালো। ওর কাঁন্নায় মিয়িয়ে গেলো দ্বীপ । সকল রাগ ঢাগ দূরে সরিয়ে গালে হাত রেখে নরম স্বরে বললো — ভেলোরা,, দেখ আমার মাথায় কষ্ট হচ্ছে। তুই একটু কথা বল,, কি হয়েছে তর? বল,, ওফফ আল্লাহ!! ভেলোরা কিছু বল। আমার মনে হচ্ছে তুই কথা না বললে আমি মরে যাবো। এখুনি নিশ্বাসটা আটকে যাবে,, কিছু বল না,, বেশি কিছু বলতে হবেনা। শুধু একবার আমার নাম ধরে ডাক। সোনা!! প্লিজ, ওফফ বলনা!! ( মাথা চেপে ধরে)
,,, দ্বীপের এতো পাগলামির বিপরীতে অর্পনা শান্ত কন্ঠে বললো — দ্বীপ!! আমায় একটু পাপ্পার কাছে দিয়ে আসবেন? ভালো লাগছেনা।
,,, অর্পনার কন্ঠ শুনতে পেরে দ্বীপের দেহে যেনো প্রান ফিরে এলো,, কিন্তু পরোক্ষনে ওর কথাটা বোধগম্য হতেই ধমকে উঠলো– হোয়াট? আর ইউ ক্রেজি?
,,,এমনি সারাদিন আতঙ্কে ছিলো,, এখন আবার ধমক শুনে কেঁপে উঠলো অর্পনা। দ্বীপ নিজেকে সুধরে নিতে চাইলো,, এই মেয়ের জন্য এখন তাকে কতো কি করতে হয়। মন রাখার জন্য, প্রচন্ড রাগের মাথায় ও ভালো করে কথা বলতে হয়। অথচ সে এসব এর আগে কারোর জন্যই করেনি। সর্বদা নিজের ক্ষমতা জাহির করে এসেছে। বলতেই হবে,, “” যা ক্ষমতা আর টাকা দিয়ে জয় করা যায়না,, সেটা রিয়্যাল্লি এক্সপেন্সিভ। মোর এন্ড মোর এক্সপেন্সিভ “” আর সেই এক্সপেন্সিভ জিনিসটাই অর্পনা। তাকে জয় করতে হলে প্রয়োজনের চেয়েও অধীক যত্ন দিতে হবে,, প্রয়োজনে নিজেকে ভেঙে চুরে নরম করতে হবে। তবে যদি পাষান মানবীর মন কিছুটা গলে। সহসা দ্বীপ নিজেকে দমিয়ে নরম স্বরে বললো— সরি!! সরি জান!! আর ধমকাবো না। তুমি হঠাৎ বাবার বাড়িতে যেতে চাচ্ছো কেনো? ইউ নো না? আ’ম সু বিজি। ব্যাস্ততা একটু কমুক তারপর নিয়ে যাবো কেমন?
,,,অর্পনা মানলো না,, অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো — আমার এখানে দম বন্ধ লাগছে,, ভালো লাগছেনা। একটু দিয়ে আসুননা প্লিজ,, আপনার ব্যাস্ততা কমলে নাহয় আবার নিয়ে আসবেন।
,,, দ্বীপ বুঝলো কাল থেকে ঘটা ঘটনাগুলোর জন্য অর্পনা ডিস্টার্ভ,, তাই অর্পনাকে কাছে টানতে টানতে বললো — কেমন লাগছে সোনা? বলো আমায়, আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। কাছে আসো,, কাম!!
,,,এতোক্ষণ ঠান্ডা মাথায় কথা বললেও এবার নিজেকে আটকাতে পারলো না অর্পনা,, দ্বীপের বুকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে নিয়ে চিৎকার করে বললো — আপনাকে বললাম না আমার ভালো লাগছেনা? আপনাকে আমার ঘৃনা লাগছে,, সহ্য হচ্ছেনা। আপনি আমাকে দিয়ে খু*ন করিয়েছেন,, আমি তো খু*ন করতে চাইনি। আপনি আমার ব্রেইন ম্যানুপুলেট করেছেন। খু*নি, অমানুষ, ডাকাত আপনি। এভাবে কেউ কারোর কলিঁজা বের করতে পারে? আমার মনে হচ্ছে আপনি অস্বাভাবিক,, কোনো স্বাভাবিক মানুষ, মানুষের কলিঁজা এভাবে,,
,,, বলতে বলতে আবারও বমি করতে চাইলো কিন্তু পেটে কিছু না থাকায় বমি এলো না। তার যে কি পরিমান খিদা লেগেছে,, মনে হচ্ছে এখোনি খাবার না পেলে খিদায় মারা পরবে। অর্পনাকে এমন করতে দেখে দূরত্ব গুচাতে চাইলো দ্বীপ,, অর্পনা সাথে সাথে অগ্নি দৃষ্টি তাক করে তর্জনী আঙুল তুলে করলো–
,,,, আপনি, আপনি আমার কাছে আসবেন না। তিক্ত হলেও সত্যি,, এই মুহুর্তে আপনাকে আমার ঘৃণা লাগছে। দূরে সরুন,, আপনি জোর করে আমার কাছে এলে আপনি আমার মরা মুখ দেখবেন। জাস্ট লিভ মি,, অসহ্য লাগছে!!
,,, বলতে বলতে পাশে থাকা কুসন গুলো থেকে একটা তুলে দ্বীপের বুকে ছুড়ে মারলো, দ্বীপ ক্যাচ নিয়ে নিলো সেটা। সাথে অর্পনার কথায় দমে গেলো কিছুটা,, এগুনোর সাহস পেলো না। যদিও এসব কসম টসমে বিশ্বাস করেনা সে,, তবুও পারুকে হাড়িয়ে অর্পনাকে নিয়ে রিস্ক নিতে চাইলো না। কিন্তু তার মন যখন একবার অর্পনাকে কাছে পেতে চেয়েছে সুতরাং দ্বীপ তার মনের ইচ্ছা পূরন করবেই। অগত্যা এক চুল পরিমান ও না এগিয়ে অর্পনার হাত ধরে জোরে টান মারলো। হঠাৎ এমন করায় দ্বীপের বুকে হুমরি খেয়ে পরলো অর্পনা। ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো দ্বীপ,, মেয়েটা নিজেকে বড্ড চালাক মনে করে অথচ সে বার বার ভুলে যায় তার সামনে যে লোকটা উপস্থিত আছে সেই লোকটা আর পাঁচ জনের মতো সাধারণ কেউ নয়। সে দ্বীপ মির্জা, যার সাথে বুদ্ধি কিংবা কুটিলতায় পেরে উঠতে এই মেয়েকে কয়েক শত বছর সাধনা করতে হবে। দ্বীপ ওর কোমর জড়িয়ে শক্ত করে বুকে টানতে নিলেই অর্পনা সরে যেতে চাইলো। দ্বীপ বাধা দিতে বললো — তুই যদি আমার থেকে দূরে সরে যাস তাহলে তুই আমার মৃত শরীরের গোস্ত খাস। এবার যাবি? যা তাহলে। যাহ!!
,,, বলেই ছেড়ে দিলো দ্বীপ অথচ অর্পনা সরে না গিয়ে দুহাতে ঝাপটে ধরলো দ্বীপের প্রসস্থ বুক,, গলার ভাজে মুখ গুজে দিয়ে মিশে যেতে চাইলো। দ্বীপ ও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অর্পনাকে। এই পর্যায়ে বুকের দহনটা কমে এলো বোধহয় ,, ভিতর থেকে শীতল অনুভূতিরা উকি দিলো। মনে হচ্ছে এখোনি ভালোবাসার এক পসলা শীতল শ্রোত ছুয়ে গেলো দুজনার শরীর। দ্বীপ অর্পনার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো,, অর্পনা মাথা তুলে দ্বীপের কন্ঠনালীতে চুমু খেলো পরপর নিজ ইচ্ছায় দ্বীপের গাল আকরে ধরে ওর দুই গালে, কপালে, চোখের পাতায়, নাকে, থুতনিতে চুমু খেয়ে আবার গলায় মুখ গুজে নরম স্বরে বললো —
,,, দ্বীপ!! আমায় কটাদিনের জন্য একা ছেড়ে দিবেন? আমার ভালো লাগছে না। আপনাকে ভয় হচ্ছে, আপনাকে দেখলেই ওইসব বাজে দৃশ্য গুলো মনে পরে যাছে। বমি পাচ্ছে,, খেতে পারছি না,, নিজেকে খু*নি মনে হচ্ছে। আমি বলছিনা আপনি যা করেছেন ভুল করেছেন। শুধু ব্যাপার গুলো মানতে পারছি না। আমরা কটাদিন আলাদা থাকি? প্লিজ!! আমার যখন মনে হবে যা হয়েছে সবটা স্বাভাবিক,, মেনে নিতে পারবো তখন আবার এখানে ফিরে আসবো প্রমিজ!! ( দ্বীপের বুকে চুমু খেয়ে)
,,, আসবো ?
,,, হঠাৎ মাহিদ মির্জার কন্ঠ শুনে থমকে গেলো দুজন।
অর্পনা তখোনো দ্বীপকে ছাড়লো না,, আটকে রইলো সেভাবেই। দূরে সরে গেলে যদি দ্বীপের বলা কথাটা সত্যি হয়ে যায়? দ্বীপ কিছু বললো না,, বাবার প্রশ্নের উত্তর ও দিলো না। অর্পনাকে দূরে সরিয়ে অনুভূতি হীনের মতো তাকিয়ে রইলো ওর মুখদ্বয়ে। মাথা নামিয়ে নিলো অর্পনা,, এর মানে সে সত্যি ই ক্ষনিকের বিচ্ছেদ চাইছে। দ্বীপের বলতে ইচ্ছা করলো “” আমায় মেরে দে তবুও দূরে যাস না। তুই দূরে গেলে আমি বাঁচতে পারবো না,, নিঃশ্বাস আটকে মরে যাবো। “” কিন্তু পারলো না, ভুল সময়ে ভুল কারোর এন্ট্রিতে মস্তিষ্কে ফুলে উঠা বার্তাটা মস্তিষ্কেই রয়ে গেলো। দ্বীপ চোখ মুখ শক্ত করে বাবার দিকে না তাকিয়েই বেলকনিতে চলে গেলো৷ দ্বীপ চলে যেতেই অর্পনা দুহাতে চোখ মুছে মাহিদ মির্জার দিকে তাকিয়ে বললো — আসুন আব্বু!! এভাবে অনুমতি নিচ্ছেন কেনো?
,,, অর্পনার মুখে আব্বু ডাকটা বড্ড পছন্দ করেন মাহিদ মির্জা। উনার তো মেয়ে নেই,, যদিও বাড়ির বাকি মেয়েরাও উনার মেয়েই তবে কেউ তো সরাসরি আব্বু ডাকে না। সবাই বড়ো আব্বু বলে ডাকে,, তাই অর্পনার রিনরিনে কন্ঠে আব্বু ডাকটা উনার বড্ড পছন্দ। মাহিদ মির্জা ক্রাচে ভর দিয়ে খোরাতে খোরাতে এগিয়ে এলেন। রেগুলার থেরাপি নেওয়ার ফলে ইদানীং কিছুটা হাঁটাহাঁটি করতে পারেন তিনি তবে খুব বেশি সময় নয়। এই সারাদিনে আধা ঘণ্টা কিংবা বিশ মিনিট। এর বেশি সময় দাড়িয়ে থাকতে পারেনা, পা দুটো অসার হয়ে আসে। উনাকে পায়ে হেঁটে আসতে দেখে অর্পনা তাড়াহুড়ো করে উঠে গিয়ে উনাকে ধরে ধরে বিছানায় এনে বসালো। ছেলের বউয়ের যত্নে মাহিদ মির্জা ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলেন। অর্পনাকে পাশে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন — আমার আম্মাজানের নাকি শরীর খারাপ? খেতে পারছেন না? বমি হচ্ছে?
,,, অর্পনা তার শুষ্ক ঠোঁট জোড়া বাকিয়ে অল্প হাসলো, দেখানোর মতো হাসি,, যেই হাসিতে কোনো উচ্ছাস নেই, কোনো প্রান নেই। ঠোঁট ফুরে বেড়িয়ে এলো — তেমন কিছু না আব্বু,, ঐ একটু বমি হচ্ছিলো। প্রবলেম নেই,, নাউ অল ইজ ওকে।
,,, অল ওকে বললেই তো হবেনা আম্মু,, রাতে তো কিছু খেতে হবে। তোমার পাপ্পার থেকো জেনে কিছু খাবার অর্ডার করেছি। তুমি একটু একটু টেস্ট করে দেখো তো কোনটা খেতে পারো।
,,, উনার কথার মাঝেই এক গাদা খাবার নিয়ে হাজির হলো পরশী। দু’হাত ভর্তি ফুড পান্ডার প্যাকেট। না চাইতেও অর্পনার চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে এলো। পরশী হেলতে দুলতে রুমের এক কোনায় গিয়ে খাবার গুলো টি টেবিলে রাখলো তারপর টি টেবিলটা টানতে টানতে অর্পনা আর মাহিদ মির্জার সামনে নিয়ে এলো। তারপর কোমরে দুহাত রেখে একটা বড়ো দম নিলো যেনো পৃথিবীর সকল কাজ সে একাই কবার করে এসেছে। পরপর ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বললো — বড়ো আব্বু টাকা দাও।
,,, কিসের টাকা আম্মু?
,,, এইযে আমি তোমার এতোগুলা কাজ করে দিলাম না? সিঁড়ি বেয়ে নিচে গেলাম তারপর ডেলিভারি ম্যানের থেকে খাবার নিলাম,, কষ্ট করে সাইন করলাম তারপর আবার রুম পর্যন্ত খাবার বয়ে এনে টি টেবিলে রাখলাম,, এরপর টি টেবিল ও টেনে দিলাম। কত্ত কত্ত কাজ করেছি,, তার বিনিময়ে আমি তো দুই তিন কোটি টাকা এমনি ই পাওনা। তবে আমি তোমায় মাফ করে দিলাম,, তুমি নাহয় আমাকে দুইটা সবুজ নোট দিয়ে দাও। আমি এতেই হেপি।
,,, পরশীর কথায় ভ্রু গুটালো অর্পনা,, এই সবুজ নোট টা আবার কি? এরকম নামে পরিচিত কোনো টাকা বাংলাদেশে লঞ্চ হয়েছে নাকি? কই সে তো জানেনা। অর্পনার প্রশ্নের অবসান ঘটাতে মাহিদ মির্জা পান্জাবীর পকেট থেকে ওয়্যালেট বের করে তিনটে পাচশো টাকার চকচকা নোট বের করে পারশীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো — খাবার সাজাতে সাহায্য করলে তিনটে পাবে।
,,, পরশী মাথা দুলিয়ে তিনটে নোট নিয়ে খাবারের প্যাকেট খোলার কাজে লেগে পরলো। এতোক্ষণে অর্পনার গোটানো ভ্রু শিথিল হলো। এই পরশী নামক মেয়েটার সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পর থেকে কতো ইউনিক ইউনিক ধারনা হচ্ছে তার,, যা কল্পনারো বাহিরে। আগে তার জীবনে একটা আহ্লাদী রাত্রি ছিলো আর এখন আরেকটা পরশী যুক্ত হয়েছে। এদের আবদার আর কথা বার্তার ধরন তাকে বড্ড শান্তি দেয়। দেখে মনে হয়,, এখনো পৃথিবীতে এমন কিছু প্রান আছে যারা বাঁচতে জানে,, বাঁচতে চায়। পরশীকে একা একা খাবার খুলতে দেখে অর্পনা সাহায্য করতে চাইলো কিন্তু মেয়েটা দিলো না। তার ফেভারিট ভাবিটার শরীর খারাপ আর সে কিনা তার ভাবিকে কাজ করতে দিবে? ওহুম!! একদমি দিবেনা। প্রয়োজনে ভাবির ভাগের কাজ করার বিনিময়ে ভাবির থেকে কিছু একটা চেয়ে নিবে। তাও ভাবি রেস্ট নিক। পরশী ধীরে ধীরে সব খাবার সাজাতেই অর্পনার চোখ শিথিল হয়ে এলো। সবগুলোই তার পছন্দের,, পিজ্জা, বার্গার, দোজা, পাস্তা, চিজ পাস্তা, স্পিড, চকলেট ফ্লেভার আইসক্রিম, সফ্ট কেইক। এতো খাবার দেখে অর্পনা অবাকতা নিয়ে প্রশ্ন করলো — এতো খাবার কেনো এনেছেন আব্বু? আমি তো খেতে পারছি না। অকারনেই টাকা নষ্ট হলো। ( পরশীর উদ্দেশ্য) পরশী যাও তো মেধাপুকে ডেকে আনো।
,,, মাহিদ মির্জা বাধ সেধে বললেন — ওদের জন্য ও আনিয়েছি তুমি এগুলো একা খাবে। একটা একটা টেস্ট করো।
,,, বলতে বলতে এক পিস পিজ্জা নিয়ে অর্পনার সামনে ধরলো। সত্যি বলতে গতকাল থেকে না খাওয়ার দরুন সত্যি ই তার প্রচন্ড খিদে পেয়েছে সেই সাথে শ্বশুরকে অমান্য করা তার পক্ষে সম্ভব না। অগত্যা এক টুকরো মুখে তুললো,, নাহ!! বমি পাচ্ছে না অথচ দ্বীপ কে সামনে দেখলেই তার বমি পায়। দ্বীপের এগিয়ে দেওয়া খাবার মুখে নিলেই মনে হয় সে মানুষের কলি*জা খাচ্ছে। সে হয়তো ব্যাক্তিত্বের দিক দিয়ে নিজেকে শক্ত রাখতে পারে কিন্তু এসব বিষয় গুলো খুবি মারাত্মক। সে জীবনে অনেক লোককে মেরেছে,, রক্তাক্ত করেছে আবার চিকিৎসা করার টাকাও দিয়েছে। কিন্তু কখনো খুন তো করেনি আর না সামনাসামনি কাউকে খুন হতে দেখেছে। নাহ!! কয়েকবার হয়তো দেখেছিলো,, নিজেকে নিজের সামনে খুন হতে দেখেছিলো তবে অন্য কাউকে নয়। লোকটা ভালো করতে গিয়ে নিজেকে তার সামনে অদ্ভুত বানিয়ে ফেলেছে ।
তখন রাগের মাথায় বললেও দ্বীপকে ঘৃণা করার সাধ্যি তার নেই আবার এভাবে একসাথে থাকাটাও কঠিন হয়ে দাড়াচ্ছে। দ্বীপ এগুলো কেনো করলো? মারার হলে লোক দিয়ে মেরে ফেলতো। এতে কোনো সমস্যা ছিলো না অর্পনার,, কিছু কিছু সময় খুন খারাপি জায়েজ, কিন্তু দ্বীপের সেই ভয়ঙ্কর রুপ আর তাকে দিয়ে খুন করানোটা অর্পনা কিছুতেই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছেনা। তাই চেয়েছিলো কটাদিন পাপ্পার কাছে থেকে নিজেকে স্বাভাবিক করতে,, পাপ্পাকে সবটা বলতে পারলে হয়তো তার ও মনটা হালকা হতো কিন্তু দ্বীপ দিলো না। অর্পনার ভাবনার মাঝেই মাহিদ মির্জা এক টুকরো পিজ্জা এগিয়ে দিলেন। এবারে হালকা বমি পেলো অর্পনার তবুও নিজেকে সামলে খেয়ে নিলো। পারশী এক পিস পিজ্জা নিয়ে অর্ধেকটা মুখে পুরে অর্পনার পাশাপাশি বসে দুহাতে গলা জড়িয়ে আবদার করে বললো — বআো ভাবআ, তোয়ামা ওফওন টা একয়ু দিবে?
,,, মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে কথাটা বলায় অর্পনা কিছুই বুঝলো না, তাই ভ্রু কুচকে বললো — কি বললে? বুঝলাম নাতো।
,,, পরশী জোর পূর্বক পুরো খাবারটা গিলে নিয়ে বললো — বলছিলাম যে ভাবি তোমার ফোনটা একটু দিবে? প্লিজ প্লিজ!! একটু দাওনা,,
,,,, যদিও অর্পনা নিজের ফোন কাউকে দেওয়া পছন্দ করেনা এমনকি বন্ধু বান্ধব কিংবা দ্বীপকেও না। তবুও পরশীকে দিলো,, সে চায়না হাসি খুশি মেয়েটার মন খারাপ হয়ে যাক। যার একটা স্বাভাবিক জীবনের বড্ড অভাব একমাত্র সেই জানে স্বাভাবিক জীবন কতোটা গুরুত্বপূর্ণ । অর্পনা সহাস্যে ফোনটা এগিয়ে দিলো।পরশী ফোনটা নিয়ে সংকোচ ভরা কন্ঠে বললো — লক?
,,, অর্পনা নির্মল স্বরে বললো — বন মানুষ !!
,,,এরুপ নাম শুনে ভরকালো মেয়েটা,, এটা আবার কেমন নাম হলো? তবে প্রশ্ন করার সাহস পেলো না। বড়ো ভাবিকে সে যতটা ভালোবাসে তার থেকে এক মিটার বেশি ভয় পায়। সেই ভয়ের তোপেই ফিরতি প্রশ্ন করা হলো না। আবার যদি ভাইয়াদের মধ্যে কেউ পাশে থাকতো তাহলে হয়তো সাহস করে দুটো কথা বলতে পারতো কিন্তু এখন তো ভাইয়ারা নেই। তাই আর ঘাটালো না,, সে ফোন নিয়ে ঘরের কোনায় থাকা সোফায় ধপাস করে শুয়ে পরলো।
,,, দ্বীপ বেলকনিতে দাড়িয়ে দেখলো সবটা। কিছু একটা ভাবলো,, গভীর ভাবনা,, কিছু সময় ভেবে চোখ মুখ শক্ত রেখেই হনহন করে রুমে এলো,, শব্দ করে ড্রয়ার খুলে সেখান থেকে কিসের যেনো চাবি নিলো,, তারপর আবার শব্দ করে ড্রায়ার অফ করে,, ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ওয়্যালেট নিয়ে ঘর থেকে বেড়োনোর জন্য উদ্ধত হলো। দরজার কাছে যেতেই মাহিদ মির্জা প্রশ্ন ছুড়লেন —
,,, এতো রাতে কোথায় যাচ্ছো?
,,, দ্বীপের শক্ত পা যুগল থেমে গেলো,, পিছনে না তাকিয়েই কাট কাট গলায় বললো — যেখানে খুশি,, কাউকে কইফিয়ত দিতে বাধ্য নই আমি।
,,,, পরপরই গট গট পায়ে রুম ত্যাগ করলো। দ্বীপের ব্যাবহারে বড্ড অবাক হলেন মাহিদ মির্জা। ছেলেটা তো সুস্থ হওয়ার পর কোনোদিন এতো রুড বিহেব করেনি। যা করেছিলো সেসব আগে,, এখন তো ছেলেটা তেমন বেখেয়ালিপনাও করেনা,, যথেষ্ট যত্নশীল,, দায়িত্ব নিতে শিখছে,, হঠাৎ এমন করছে কেনো,? মাহিদ মির্জা কিছু একটা আশঙ্কা করলেন,, সন্দেহি দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকাতেই অর্পনা মাথা নিচু করে বললো—
— আসলে,, আমি একটু বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম তাই আরকি,,
,,, উনি যা আশঙ্কা করেছিলেন তাই হলো,, মাহিদ মির্জা আরেক পিস পিজ্জা এগিয়ে দিয়ে বললো — এখন কেনো আম্মু? সামনেই তো ইলেকশন। যদিও আমি তোমার মতোই রাজনীতি অপছন্দ করি কিন্তু ছেলেটাতো আমার, চিন্তা হয়। তুমি বাপের বাড়ি চলে গেলে দ্বীপ কখনোই কাজে ফোকাস করতে পারবেনা। সব এলোমেলো করে ফেলবে,, তোমার ওকে এভাবে রাগিয়ে দেওয়া উচিৎ হয়নি। ফোন দিয়ে বাসায় আসতে বলবে কেমন? তুমি কল করলেই দেখবে, ও বাধ্যের মতো চলে এসেছে।
,,, অর্পনা মাথা ঝাকালো মানে বলবে,, মাহিদ মির্জা কিছুটা স্বস্তি পেলেন। অর্পনা কল করলে নিশ্চয়ই দ্বীপ বাহিরে থাকতে পারবে না? উনি যতোটা আশঙ্কা করেছেন সেই অনুযায়ী দ্বীপ তখন ফ্লাটের চাবি নিয়েছে। এখন নিশ্চয়ই ফ্লাটে যাবে? সবসময় তো এটাই করে এসেছে,, বাড়িতে কোনোরুপ মন মালিন্য হলে কিংবা কেউ তার ইচ্ছার বিরোদ্ধে কিছু করাতে চাইলে এভাবে বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে যেতো। তারপর যতোদিন না তার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করতো ততোদিন ফ্লাটেই পরে থাকতো। ঠিক মতো খেতো না, স্কুল, কলেজে যেতো না। মোট কথা ছন্যছাড়া দ্বীপ আরও ছন্যছাড়া হয়ে যেতো। বিহানটা দ্বীপের সমবয়সী না হলে বোধহয় দ্বীপকে সামলাতে পারতেন না তিনি। এইযে দ্বীপ বেড়িয়ে গেলো,, খোঁজ নিলে দেখা যাবে বিহান ও তার পিছু নিয়েছে। এদের ভাইয়ে ভাইয়ে বন্ডিং দেখলে তিনি বড্ড হিংসা বোধ করেন। তারা চাচাতো ভাই হয়েও যতটা একে অপরের প্রতি দূর্বল, উনারা আপন তিন ভাই ও বোধহয় ততোটা নয়। পরোক্ষনে আবার ভালোও লাগে। এই বাড়িতে তো আমার তোমার বলতে কিছুই হয়না,, সবটাই আমাদের নয়তো তার মা মরা ছেলেটাকে রোমানা আগলে নিতেন না। বিহানের থেকেও বেশি ভালোবাসা দিতেন না,, এই বাড়ির প্রতিটি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ মাহিদ মির্জা আর সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ সামনে বসা মেয়েটার প্রতি। এই মেয়েটা না থাকলে তার ছেলেটা আজো জয়পুরহাট কবরস্থানেই পাগল বেশে পরে থাকতো। মাহিদ মির্জা অর্পনার চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। অর্পনার ফোনে মেসেজ আসতেই পরশী তাড়াহুড়ো করে অর্পনার ফোনটা তার কাছে ফিরিয়ে দিলো। অর্পনা মেসেজ অপশনে ঢুকতেই দেখলো সেখানে গোটা অক্ষরে লেখা — “” তর অপেক্ষায়,, যেদিন ফিরবি আমার হয়েই ফিরিস। ভালোবাসা দিতে পারবো না,, শুধু আমায় চাইলে নিখোঁজের শহরে একবার খোজ নিস!!””
,,, রুমে এসে শক্ত করে দরজা লাগালো পরশী,, ভাব খানা এমন সে শক্ত করে দরজা না লাগালে এখোনি আম্মু ঝাটা নিয়ে তেড়ে আসবে আর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কাবার্ডে তালা মেরে রাখবে। সে বুঝে না, আম্মু কি তাকে কুট্টি বাবু মনে করে? এই তো সেদিন ফাস্ট ইয়ারের লাস্ট এক্সাম গেলো এবার সে সেকেন্ড ইয়্যারে উঠবে। এটা কি কম হলো? সে কি বড়ো হলো না? বিয়ের বয়স না হোক,, টুক টাক প্রেম করার বয়স টা তো হয়েছেই। এবার কি তাকে একটু স্পেস দেওয়া উচিৎ না? অবশ্যই উচিৎ!! পরশী দরজা আটকে বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে পরলো। পা দুটো উপরে তুলে ঝুলাতে ঝুলাতে ভাবির ফোন থেকে চুরি করে আনা আইডির নামটা ফেইসবুকের সার্চ লিস্টে সার্চ করলো “” ওয়াসিম জায়িন পল্লব “” নাম খানা সার্চ করতে করতে আরও একবার প্রেমে পরে গেলো পরশী। ইসস!! নামটা এতো সুন্দর কেনো? অন্য কারোর কাছে হয়তো এটা একটা সাদামাটা নাম হতে পারে কিন্তু পারশীর মনে হচ্ছে এর থেকে সুন্দর নাম বোধহয় এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। সার্চ করতে নিয়েও তার বুকটা কেমন ঢিপ ঢিপ করছে। ভিতরটা কেমন তোলপাড়ে ছেয়ে যাচ্ছে।
পরশী মনের তোলপাড় দমিয়ে সার্চ অপশনে ক্লিক করলো। সাথে সাথে স্ক্রিনে ভাসলো একই নামের অনেক গুলো আইডি,, বিষয়টাতে একটু ও খুশি হলো না পরশী। এটা কি হলো? সে ভেবেছিলো এরকম নাম বোধয় পৃথিবীতে আর নেই,, অথচ একই নামের এতো এতো মানুষ রয়েছে পৃথিবীতে? কেনো থাকবে? রাগ হলো পরশীর,, আচ্ছা!! তার শ্বশুড় শাশুড়ি কেনো পল্লবের একটা ইউনিক নাম রাখলো না? রাখলে তো তাকে আজ এতো রাগ টাগ করতে হতো না। পরশী খুজে খুজে পল্লবের আইডিতে ঢুকলো,, ঢুকতেই মেজাজ খারাপ হলো,, লোকটা ফেইসবুক প্রাইভেট করে রেখেছে। কেনো রাখলো? উনি তো ছেলে মানুষ,, ছেলেদের আবার এতো প্রাইভেসির কি আছে? পরশী মন খারাপ করে পল্লবকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালো। পরপর আল্লাহের নিকট আবদার করলো যেনো লোকটা তাকে এক্সেপ্ট করে। দোয়া করা শেষে পল্লবের প্রোফাইল পিকটা ক্লিক করলো পরশী,, সাথে সাথে কিছুটা দৃশ্যমান হলো পাঁচ জনের দুষ্টমি ভরা ছবি।
পল্লবকে এটুকু দেখেই হার্ট মিস হয়ে গেলো পরশীর। লোকটা এতো সুন্দর কেনো? একটা মানুষকে এতো সুন্দর হতে হবে কেনো? এইযে স্ক্রিনে ভাসা ছবিটা,, ব্রিজের পাড়ে দাঁড়িয়ে লোকটা অরুন ভাইয়ের গলা পেচিয়ে ধরে মারছে,, ইরাদ আপু ওনাদের দুজনকে ছাড়ানোর জন্য লোকটার শার্ট ধরে টানছে,, বড়ো ভাবি বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তিনজনার দিকে তাকিয়ে,, রাত আপু হাসতে হাসতে সেলফি নিচ্ছে। কতোটা নিশ্পাপ লাগছে পাঁচ জনকে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লাগছে লোকটাকে। ফর্সা গড়নে সাদা নীল রং মিশ্রিত চেক শার্ট, হাতা গোটানো, দুষ্টমি করার দরুন মাঝারি লম্বা চুলগুলো চোখে এসে পরেছে। পারশীর ইচ্ছা করলো চুল গুলো ছুয়ে দিতে,, ঠিক করে দিতে। এটা কি তার কিশোরী জীবনের আবেগ?
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৪ (৩)
নাকি সত্যি ফেসে গিয়েছে এই মানবের প্রতি? আচ্ছ সবাই যে বলে,, এসব আবেগ,, আবেগে গা ভাসিও না,, আবেগ বেশিদিন থাকবে না। তাহলে ভালোবাসায় কি থাকে? আবেগ ছাড়া ভালোবাসা হয়? এই পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ আছে যে আবেগ ছাড়া ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারবে? ভালোবাসা তো দেখা যায়না, ছোয়া যায়না, শুধু অনুভব করা যায়। আর সেই অনুভূতিটাই তো তৈরি হয় আবেগ থেকে। তাহলে কি বলা যায়না? ভালোবাসা আর আবেগ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভালোবাসতে হলে তোমাকে আবেগে পরতে হবে। আবেগে গা ভাসাতেই হবে,, এটাই সত্যি,, হুম!! এটাই ফ্যাক্ট।
