Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৯ (৩)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৯ (৩)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৯ (৩)
তোনিমা খান

রূপকথা কিয়ৎকাল নিঃসাড় দেহে চেয়ে রইল শুধু। ছোট্ট বেলা থেকে নিজের দুর্ভাগ্য মানিয়ে নিতে নিতে সে চলতি পথে একটা ত্রুটিযুক্ত মানুষ পেয়েছে। বয়স আর মানসিক দ্বন্দ্বে সে শুধু একটা কথাই ভেবেছিল, সেটা হলো এক জীবনে একাধিক পুরুষের সান্নিধ্যে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
তাই সে সব ভুলে বাস্তবতা মেনে নিয়ে মানুষটার খুঁত ভুলে গুণ খুঁজতে লাগল। এবং সে খুঁজেও পেল ভবনাতীত মহৎ গুণে গুণান্বিত এক ব্যক্তিত্ব। যেই ব্যক্তিত্ব তার সদ্য পরিস্ফুটিত মনে এক পশলা প্রেমময় দোলা দিয়ে যায়। এইতো বয়স, আর পরিস্থিতি ছাপিয়ে এভাবেই রূপকথা দূর্ভাগ্যের সাথে লড়াইয়ে জিতে গিয়েছিল।
তবে আজ মনে হলো, স্ত্রী হিসেবে চূড়ান্ত ভাবে জিতে গিয়েছে। কিন্তু মাতৃত্ব? তার মাতৃত্ব কী জিততে পেরেছে নাকি সে নতুন এক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে?
এই যে তার কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার ছোট্ট উদরে কেউ একজন আছে এই ভেবে। কীভাবে আছে? কতদিন ধরে আছে? সেও মা হবে? তার কোলেও একটা ছোট্ট প্রাণ থাকবে?
রূপকথার ওষ্ঠদ্বয় তিরতির করে কেঁপে উঠল। অস্ফুট স্বরে বলল,

– এমন করে কেন বলছেন তানশানের পাপা? আমি কী একা গর্ভবতী হচ্ছি? কত মানুষ গর্ভবতী হয়, সন্তান জন্ম দেয়। তাদের কী কিছু হয় নাকি? আমার কিছু হবে না। আপনি শুধু শুধু এই চিন্তা কেন করছেন?
তপোবন স্পষ্ট দেখল রূপকথার চোখেমুখে প্রসন্নতা, মাতৃত্বের দৃঢ়তা। সে থমকালো রূপকথার প্রসন্নতায়।
নিজের অস্থিরতা, ভয়, অভিব্যক্তি অবিলম্বে লুকিয়ে নিলো।
মেয়েটি জানে না তার গর্ভাবস্থায় জটিলতা রয়েছে।
ডঃ সুস্মিতা বলেছিল, রূপকথার সিস্ট যতদিনে না কমবে ততদিনে বাচ্চা না নিতে। এখনো রূপকথার ওষুধ চলছে। কিন্তু সিস্ট কমেনি।
তপোবনের মাঝে অদ্ভূত নীরবতা আর অসম্মতি দেখে রূপকথার বক্ষস্থল খামচে ধরলো। সে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,

– কিছু বলছেন না কেন তানশানের পাপা? আপনি এমন করছেন কেন? জরুরী নয় সবসময় সবটা আমাদের পরিকল্পনা মোতাবেক হবে। তাই বলে কী আমরা…
রূপকথার কণ্ঠনালী আঁটকে গেল। চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো কঠিন এক বাক্য উচ্চারণ করতে। সে বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে অসম্পূর্ণ কথাটি সম্পূর্ণ করে বলল,
– তাই বলে যে আসছে তাকে কী আমরা গ্রহণ করব না?
তপোবন অনিমেষ চেয়ে রইল মাত্র দশ মিনিট হয়েছে মেয়েটি নিজের মাতৃত্বের খবর জানতে পেরেছে অথচ এর মধ্যেই সে নিজের মাতৃত্বের জন্য আওয়াজ তুলছে। তপোবন আর এক মুহুর্ত বসে থাকতে পারল না। সরব উঠে দাঁড়ায় সে। ওই বিষয়ে কোনোরূপ বাক্যব্যয় না করে ক্ষীণ স্বরে বলল,
– তুমি থাকো, আমি একটু আসছি।
তপোবন এক প্রকার ছুটে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। আর রূপকথা! বিছানায় থমকে বসে আছে সদ্য নিজের মাতৃত্বের খবর শোনা এক ছোট্ট মেয়ে। মাতৃত্বকে কীভাবে বরণ করতে হয় সেইটুকু না জানা মেয়েটিকে, মাতৃত্বের প্রথম লহমাতেই থমকে দিল স্বামী নামক মানুষটা।
মনের গহীনে কেবল একটাই প্রশ্ন জাগল,
‘বাবা হওয়ার খবরে কি সব পুরুষই এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়?’
রূপকথা নিজেই সেই উত্তর খুঁজে নিল। এই মানুষটি হয়তো প্রথমবার বাবা হচ্ছে না, কিন্তু সে? সে তো প্রথমবার মা হচ্ছে! এই মুহূর্তে তার মাথায় একটু হাত রেখে ভরসাটুকু তো সে দিতেই পারত!
জীবন তাকে তিক্ত বাস্তবতা মানতে শিখিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই মুহূর্তে পারল না। রূপকথা ছোট্ট শিশুর মতো কেঁদে উঠল। সদ্য জেগে ওঠা মাতৃত্বের স্বপ্ন যেন অসহনীয় মানসিক দ্বন্দ্বে দুমড়েমুচড়ে যেতে লাগল।

রোজ খুলনা ইউনিভার্সিটিতে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। বাড়ির পরিবেশ খুব একটা ভালো না হওয়ায় কালেভেদ্রে কলেজে যায়। বড় ভাবির পরীক্ষা ছিল তাই এতদিন আসেনি। আজ বহুদিন বাদ ভার্সিটিতে এসে মনটা তার বেশ ফুরফুরে।
ভার্সিটির ফ্রেন্ডসদের সাথে বসে রঙ চা খাচ্ছিল। ভার্সিটির ভেতরে রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে টং এর দোকান সব রয়েছে। ভার্সিটিতে আসলে ফ্রেন্ডসদের সাথে এক কাপ চা খাওয়া তার বদ অভ্যাস।
সে যখন পুরোদস্তুর মগ্ন আড্ডায় তখনি তার ফুরফুরে মেজাজ উড়িয়ে দিয়ে একটা বাইক থামলো চায়ের দোকানের সামনে। রোজের আত্মা ধড়ফড়িয়ে উঠল তৃশানকে দেখে। এই লোক এখানে কী করছে? সে হন্তদন্ত হয়ে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে উঠে দাঁড়ালো। চা রেখে ব্যাগ নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে বের হতে হতে ফ্রেন্ডসদের বলল,

– তোরা থাক, আমি আসছি।
তৃশান এদিক ওদিক তাকিয়ে খোঁজার চেষ্টা করল কাঙ্ক্ষিত মানবীকে। পরিচিত ছোট ভাই তো বলেছিল, রোজ এখানেই আছে। দৃষ্টি ঘোরাতে ঘোরাতেই তার চোখ আটকায় ছুটতে থাকা লম্বাটে এক অবয়বের পানে।
মেয়েটা পালাচ্ছে তাকে দেখে! সে হাঁক ছেড়ে ডাকল,
– রোজ? রোজ? এই মেয়ে থামো বলছি। আমার কথা আছে তোমার সাথে।
তৃশানের ডাক শুনেও না শোনার ভান করে রোজ এক ছুট লাগায় গেটের দিকে। পথ অনেকটা। তার কদম হেরে গেল বাইকের দ্রুতগতির কাছে। সম্মুখে একটা দ্রুতগামী বাইক থামতেই রোজ কাঁদো কাঁদো নয়নে তাকাল। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,
– কী সমস্যা আপনার? আমায় ডাকছেন কেন? আপনি কী নিজেকে অনেক চালাক মনে করছেন? আমি সেদিন কোনো মিথ্যা বলিনি আপনাকে। সব সত্যি ছিল।
রোজের মৃদু তোতলানো, অপ্রস্তুত ব্যবহার দেখে তৃশান সিটে সোজা হয়ে বসে বলল,

– তোমার এই একটা জিনিস আমার ভালোলাগে। তুমি মেয়ে নাটক করতে জানো না। সিদেসাধা। মিথ্যা বলতে গেলে কণ্ঠ কাঁপে, অনুভূতি লুকাতে গেলে চোখ সব বলে দেয়।
– আপনি আমায় বিরক্ত করছেন কিন্তু! কী চাই আপনার?
– বাইকে ওঠো, বলছি।
– আমি আপনার বাইকে উঠব? মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে আপনার?
– না উঠলে বলব কী করে?
– এভাবেই বলুন। আমার কাজ আছে এক জায়গায় যেতে হবে।
রোজ আড়চোখে চেয়ে ভ্রুকুটি করে বলল। তৃশান পেছনের সিট দেখিয়ে বলল,
– এখানে বসো, আমি ড্রপ করে দেব যেখানে যেতে চাও।
– এত সুন্দর ব্যবহার কেন করছেন?
– তোমার সাথে আমি কখনো খারাপ ব্যবহার করেছি বলে তো আমার মনে পড়ছে না।
– না খারাপ ব্যবহার করেননি। কিন্তু এত ভালো ব্যবহার ও করেননি। আপনি ভার্সিটিতে কী করছেন?
– তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি।
– আশ্চর্য! আপনি কেন আমার সাথে কথা বলার জন্য এতদূর আসবেন?
তৃশান এবার বুকে হাত গুঁজে চোখে চোখ রাখল। নম্র স্বরে বলল,
– ভুলগুলো ভুলে যেতে চাই। আরেকবার চেষ্টা করতে চাই। হয়তো ভাগ্য আর জীবন আমায় আরো একবার ভুল প্রমাণিত করবে।
রোজ ফ্যালফ্যাল করে তাকালো। অপ্রস্তুত স্বীকারোক্তি হজম করে বলল,

– তো? চেষ্টা করুন, আমার কাছে কেন এসেছেন?
তৃশান উষ্ণ এক দম ফেলল। বলল,
– চেষ্টাটাই তুমি। আরেকবার চেষ্টা করতে চাই কিন্তু সেট তোমার সঙ্গে।
রোজের মুখশ্রী থমথমে হয়ে গেল। গম্ভীর গলায় বলল,
– একজনকে ভুলতে আরেকজনকে ব্যবহার করতে চাইছেন? একবার ও মনে হলো না, কারোর অনুপস্থিতিতে কাউকে ব্যবহার করা একটা মেয়েকে কতটা আঘাত দিতে পারে?
তৃশানের মুখশ্রীতে এক পশলা মেঘ ছুঁয়ে গেল।
তমসা ঘিরে ধরল শুভ্র মুখটিতে।
বলল,

– আমি তোমায় ব্যবহার করতে চাই না। শুধু ভুলগুলো ভুলে তোমায় নিয়ে আগাতে চাই। হেল্প মি রোজ,প্লিজ। আমি আমার ভুলগুলো ভুলতে চাই।
– আর তার জন্য আমায় কেন বেছে নিলেন?
– কারণ আমি জানি তুমি আমায় পছন্দ করো।
– এটা একদম মিথ্যা কথা।
– মুখের ওপর আর মিথ্যা কথা বলো না, মেয়ে। রাতে ঘুমাও কী করে এত মিথ্যা বলে? আমি তো এক ভুল করে আজ কতশত রাত নির্ঘুম কাটাচ্ছি।
রোজ লাল হয়ে উঠল লজ্জা আর অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে অস্ফুট স্বরে বলল,
– আমি কোনো মিথ্যা কথা বলছি না। আমি সত্যিই আপনাকে পছন্দ করি না। এটা আপনার ভুল ধারণা।
তৃশান মৃদু হাসল। অলস নেত্রে চেয়ে বলল,
-তোমার মুখ এক কথা বলে কিন্তু তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অন্য কথা বলে। আমি এতটাও বোকা নই যে এগুলো একদম বুঝব না রোজ। পাপার কলেজে থাকাকালীন, আমায় দেখলেই তোমার উচ্ছ্বাস, ছুটে আসা, কথা বলতে চাওয়া তখন আমি উপেক্ষা করলেও এখন সবটা পরিষ্কার আমার কাছে। আমি জানি, তোমার করা একটা মেসেজ ও মিথ্যা নয়। তবে তুমি হয়তো লজ্জা পাচ্ছো নিজের ছোটবেলার কাজে। কিন্তু আমি তোমায় একটুও লজ্জা দিচ্ছি না। বরং তোমার ওই অনুভূতিকে সম্মান করেই তোমায় বেছে নেয়া জীবনসঙ্গী হিসেবে।
জীবনসঙ্গী? রোজ হতবুদ্ধি হয়ে তাকাল।

– জীবনসঙ্গী মানে?
তৃশান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
– পড়াশুনা শেষ। প্রেম করার মতো বাজে ইনটেনশন এখন আর নেই। এখন একটা চাকরি খুঁজব, এরপর তোমায় বিয়ে করব আর বছর ঘুরতেই একটা বাচ্চা নিয়ে সুখী ফ্যামিলি ম্যান হয়ে যাব। এখন এটাই একমাত্র লক্ষ্য। লাইফের করা ভুলগুলোকে আর একটুও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করতে দেব না।বিয়ে করবে আমায়?
রোজ একের পর এক স্তব্ধতা সামাল দিতে ব্যর্থ হলো। হৃদপিণ্ডের স্পন্দন মনে হচ্ছে কানের কাছে এসে বাজছে। তৃশানের এমন সরাসরি, কোনো রাখঢাক ছাড়া বিয়ের প্রস্তাব তাকে পুরোপুরি অপ্রস্তুত করে দিলো। সে অপ্রস্তুত থতমত খেয়ে বলে উঠল,

— আপনি… আপনি একটা… পাগল। এমন দেদারসে এত বড় একটা কথা বলে দিলেন? বিয়ে কি এত সহজ? আমাদের সম্পর্কের কোনো ভিত্তিই নেই, আপনি একদম আগামাথা না ভেবেই আমাকে বিয়ের কথা বলে বসলেন! আপনার কি মনে হয়, আমি আপনার লাইফের ভুলগুলোর পেইন কিলার হিসেবে কাজ করব? সিনেমা মনে হয় আপনার কাছে? রসিকতা করার জায়গা পাননি? অসহ্য!
রোজ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলেই হন্তদন্ত হয়ে পা বাড়ালো। তৃশান উচ্চস্বরে বলল,
– তুমিই বলেছিলে চেষ্টা করতে। এখন তুমি আমায় ফিরিয়ে দিতে পারো না রোজ। হেল্প মি, প্লীজ।
রোজ ফিরে তাকায়। থমথমে মুখে বলল,
– সব ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করতে বলেছিলাম। আমায় বিয়ে করতে না।
– আমি সব ভুলে তোমায় নিয়েই জীবন শুরু করতে চাই। বিলিভ মি, আমি নিজেকে বদলাতে চাই। একটা স্বাভাবিক জীবন চাই যেমন আর পাঁচটা মানুষের রয়েছে। একটা জব, একটা সুন্দর পরিবার আর একটা ভালো জীবনসঙ্গী। যে কি-না প্রচন্ড বিষন্ন সময়ে এসে বলবে, “সব ভুলে আরো একবার শুরু করো” আর সেটা তুমিই বলেছ।
রোজ নির্বাক, নিস্তেজ। তৃশান বাইক থেকে নেমে আসে। একদম মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়ায়। নম্র স্বরে বললো,

– বাসায় সম্বন্ধ পাঠাব?
রোজ চোখ তুলে তাকালো। বলল,
– আমি বলেছি পাঠাতে?
– তাই তো জিজ্ঞাসা করছি।
– আপনার মনে হয়েছে আমি আপনার জীবনসঙ্গী হিসেবে যোগ্য। কিন্তু আমার? একবার ও জিজ্ঞাসা করেছেন, আমার কাছে আপনি জীবনসঙ্গী হিসেবে যোগ্য কি-না?
তৃশান অবিলম্বে না বোধক মাথা নাড়ল। বলল,
– আমি একদম তোমার যোগ্য নই। কিন্তু তুমি রাজি থাকলে আমি নিজেকে তোমার যোগ্য করে তুলব।
– আর তা কেন করবেন? আপনার কেন এত দ্বায় পড়েছে যে আপনি নিজেকে আমার যোগ্য করে তুলবেন?
– আমি রাতে ঘুমাতে পারি না রোজ। আমার করা ভুল আমায় প্রচুর যন্ত্রণা দেয়। আমি সত্যিই ভুলতে চাই সবটা। তাতে যদি নিজেকে পুরোটা পাল্টে ফেলতে হয় তবে আমি তাও পাল্টাতে রাজি।
রোজ কিয়ৎকাল অনিমেষ চেয়ে রইল উদগ্রীব নয়নপানে। বলল,

– ঝোঁকের বশে নেয়া কোনো সিদ্ধান্ত সুফল বয়ে আনে না।
– দীর্ঘ একমাস দুইদিন বসে আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঝোঁকের বশে বলো না রোজ। চাইলে তুমিও সময় নিতে পারো।
রোজ উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল। কোনোরূপ জবাব না দিয়ে এক পলক শান্ত দৃষ্টি ফেলে ব্যাগ আঁকড়ে ধরে উল্টোপথে হাঁটা ধরলো।
তৃশান পিছু ডেকে বলল,
– আমি কী অপেক্ষা করব তোমার জবাবের জন্য?
রোজ পা থামায়। রোদে কুঁচকে থাকা কপাল নিয়ে উঁচু গলায় বলল,
– যদি অপেক্ষা করতে বারণ করি, তবে কী অপেক্ষা করবেন না?
তৃশান চুলে হাত গলাতে গলাতে মৃদু হেসে বলল,
– উঁহু, করব না।
– তবে অপেক্ষা করার দরকার নেই। যাকে ইচ্ছা তাকে গিয়ে বিয়ে করুন আর জীবন শুরু করুন।
– সত্যি বলছ? পরে আবার কথা ঘোরাতে পারবে না কিন্তু।
রোজ কপাল কুঁচকে বলল,
– একদম তিন সত্যি। কোনো কথা ঘোরাবো না।
– ঠিক আছে। আমি আমার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে নেব। তাতে যদি তুলে নিয়ে গিয়েও করতে হয় তাও করব কিন্তু।
– যা ইচ্ছা তাই করুন। তাতে আমার কী?
রোজ আবার হাঁটা ধরল। তৃশান মৃদু হেসে বলল,
– আমার পছন্দের মেয়েটা কিন্তু রোজ সিকদার। এরপর থেকে সাবধানে ঘর থেকে বের হবে কিন্তু। নয়তো দেখবে একদিন কেউ তোমায় তুলে নিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে।
রোজ পিছু ফিরে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল,

– আমার ভাই আপনার হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেবে। অভদ্র লোক!
– রাত বারোটায় ফোন দেব। ভেবেচিন্তে জবাব দেবে। নয়তো আগামীকাল তুলে নিয়ে বিয়ে করব।
– আমার সাথে মোটেও গুন্ডামি করতে আসবেন না।
রোজ রেগে গিয়ে বলল। তৃশান হাসতে হাসতে বাইকে উঠে বসে। বাইকটা রোজের পাশে থামিয়ে বলল,
– উঠে বসো। আমি পৌঁছে দিচ্ছি। কথা দিচ্ছি, বাইকে ওঠার কারণে আমি তোমার জবাব ‘হ্যাঁ’ ভেবে নেব না। আমি তোমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকব। তুমি যেভাবে বলবে নিজেকে সেভাবে গড়ে তুলব। তবুও নাকচ করো না। কেউ তোমার কাছে একটা সুস্থ জীবন ভিক্ষা চাইছে। প্লীজ ফিরিয়ে দিও না।
অনুনয়ভরা ভীষণ নম্র কণ্ঠে রোজ দোলাচলে পড়ে গেল। অন্তঃস্থল অচিরেই ছেলেটির দখলে চলে যাচ্ছে কিন্তু বাইরের খোলস তখনো ছলনায় মত্ত। সে বাইকে উঠে বসল। তৃশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। আর একটুও বিরক্ত করল না, খুব ভদ্রতার সাথে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল।

রূপকথা নিঃসাড় দেহে কচ্ছপের গতিতে রান্নাঘরে ঢুকলো। ঢুকতেই মাজেদা চকিত চাহনি ফেলে প্রশ্ন করলো
– কই গেছিলা বড় বউ? মুখ এমন কইরা রাখছ কেন? পরীক্ষা টরিক্ষা করছ? জবা কইলো এহন নাকি সব ঘরে বইসাই বাইর করা যায়? করছ?
জবাও কাজ ফেলে উৎসুক নয়নে তাকালো রূপকথার কান্না চেপে রাখা শক্ত মুখপানে। উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– ভাবিজান কী হইছে? মুখের অমন অবস্থা কইরা রাখছেন ক্যাঁন? পরীক্ষা করছেন?
রূপকথা ঠোঁট চেপে ধরে উপর নিচ মাথা নাড়ল।
– কী আইছে?
রূপকথা ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলল,
– অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ আসছে আপা। যার আসার কথা একদমই ছিল না।
বলতে বলতেই রূপকথার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা পানি পড়ল। জবা মাজেজা বিচলিত হয়ে এগিয়ে গেল,
– কী হইছে? খুশি হওনি? এইডা তো খুশির খবর?
– তার এখন আসা ঠিক হয়নি, চাচি। ভুল সময়ে এসে পড়েছে।
– এমন কথা কইতে হয় না বোকা মাইয়্যা। আল্লাহ যারে যা যহন দেয় বুইঝাই দেয়। হাসিমুখে আগলে নিতে হয় নয়তো আল্লাহ বেজার হয়।
রূপকথা ছলছল নেত্রে তাকালো। নির্জনা বেগম তখনি ব্যস্ত কদমে ঢুকলেন রান্নাঘরে। ব্যস্ত হাতে স্টোভে চড়ানো তড়কারি দেখতে দেখতে রূপকথাকে জিজ্ঞেস করল,

– কী হলো তুমি নাকি অসুস্থ? মাজেদা বলল আমায়। কই আমায় তো কিছু বললে না।
রূপকথা অন্তঃস্থলের ঝড় সামলে ছোট্ট করে বলল,
– তেমন গুরুতর কিছু না আম্মা।
নির্জনা বেগম স্প্যাচুলা রেখে মেয়েটির পানে তাকায়। মুখশ্রী দেখে কপাল কুঁচকে নিলো। জিজ্ঞেস করলো,
– কেঁদেছো নাকি? কী হয়েছে মুখের এই দশা কেন?
রূপকথা নিজেকে আটকাতে পারে না। অদ্ভুত কঠিন এই মুহূর্তে কারোর ভরসা খুব প্রয়োজন। সে শব্দ করে কেঁদে উঠল। নির্জনা বেগম বিচলিত হলেন।
– আরে কাঁদছ কেন? কী হয়েছে মাকে খুলে বলবে তো? বেশি শরীর খারাপ করছে? তপোবনকে বলেছ?
এই কয় মাসে নির্জনা বেগমের একমাত্র সুখ দুঃখের সঙ্গী ছিল এই মেয়েটা। খুব ভাব হয়েছে। তিনি এগিয়ে আসেন। মাথায় হাত রেখে বলেন,

– খুলে বলো আমায়।
রূপকথা মাথা তুলে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকায়। ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল,
– আপনি দাদু হবেন আম্মা।
নির্জনা বেগম আশ্চর্য হলেন। অতিরিক্ত খুশিতে কথার জো হারালেন। কিয়ৎকাল অপ্রস্তুত তাকিয়ে থেকে আচমকা বলে ওঠেন,
– এ তো মহা খুশির খবর? এর জন্য এমন করছ তুমি? কাঁদছ কেন? আশ্চর্য তুমি আমায় বলবে না? হায় আল্লাহ! কত গুলো বছর পর আমার ঘরে আবার সুখ শান্তি আসছে। মাজেদা, শুনছ? আমার তপু, আমার ঘর আলো করে আবার এক টুকরো সুখ আসছে।
বলতে বলতেই নির্জনা বেগমের চোখ ভিজে উঠল। সে আলগোছে ক্রন্দনরত মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। মাথায় ঘন ঘন হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
– কী খুশির খবর দিলে, আমি তো কল্পনাই করিনি এত তাড়াতাড়ি আমায় এতবড় সুখ দেবে। অনেক অনেক ধন্যবাদ রূপকথা। সবকিছু পিছু ফেলে তুমি আমার ছেলে, নাতি, আর সংসারকে গুরুত্ব দিয়েছ। আমি খুব খুশি হয়েছি। কেঁদো না, এত সুখের খবরে কেউ কাঁদে? আল্লাহ নারাজ হবেন। আমি সবাইকে জানিয়ে আসছি। জাফরকে দিয়ে মিষ্টি আনাতে হবে। সবাইকে জানাতে হবে না, আমার ঘর আলো করে আবার সুখ আসছে। হে আল্লাহ! আপনার লাখ লাখ শুকরিয়া।
বলতে বলতেই খুশিতে আত্মহারা নির্জনা বেগম ছুটলেন সকলকে জানাতে। রূপকথা শ্রান্ত নয়নে তাকালো শাশুড়ির গমনের পানে।
তানশানের মিড টার্ম এক্সাম ও শেষ হয়েছে গতকাল।
এরপর থেকেই তাকে যখন তখন বড় মাঠে খেলতে যেতে দেখা যায়।
দুপুর বারোটা নাগাদ রোজ আর তানশান একসাথে বাড়ি ঢুকলো। ঢুকতেই নির্জনা বেগম উল্লাসে ভরা কণ্ঠে বলল,

– দাদুভাই? রোজ এসেছ? তাড়াতাড়ি আসো। আমায় সাহায্য করো, এত বছর পর আমার ঘরে আবার সুখ আসছে। সবাইকে মিষ্টি পাঠাতে হবে। লিস্ট করে দেবে।
তানশান ঘর্মাক্ত বদনে রূপকথার কাছে এগিয়ে গিয়ে হাতের ব্যাট আর ক্যাপ খুলে দিলো। খুশিতে আত্মহারা দাদুর দিকে তাকিয়ে কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস করলো,
– তোমার আবার কী হলো দাদুমনি? কিসের সুখ আসছে?
নির্জনা বেগমের উচ্ছ্বাসে খানিক ভাটা পড়ল তানশানের প্রশ্নে। সারাক্ষণ চঞ্চল পাখির ন্যায় মায়ের বেশে ঘুরতে থাকা রূপকথাও আজ আশঙ্কা আর জড়তায় নত শির গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো জীবনে এর থেকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি আর কিছুই হতে পারে না।
নির্জনা বেগম এগিয়ে এসে তানশানের মাথায় হাত রাখলেন। মৃদু হেসে আদুরে স্বরে বললেন,

– বড় ভাই হয়ে যাচ্ছো দাদুভাই। তোমার ছোট ভাইবোন আসছে। দায়িত্ব বাড়ছে। দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত তো?
রোজ চকিতে তাকালো নত শির দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথার পানে। মস্তিষ্কে একটাই কথা ঘুরপাক খেল, রূপকথার ভবিষ্যত কী তবে সংসারের এই টানাপোড়েনেই চিরতরে আঁটকে গেল? তবুও টু শব্দটি করল না রোজ। এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো রূপকথাকে। বলল,
– বড় ভাবিজান, আমি খুব খুশি তোমার জন্য। আমায় আবারো ফুপি বানানোর জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।
রূপকথা নিস্তেজ, নিরুত্তর তাকিয়ে আছে থমকানো তানশানের দিকে। চোখে চোখ পড়তেই তানশান অবিলম্বে চোখ সরিয়ে নিলো। নির্জনা বেগম সতর্ক দৃষ্টি ফেললেন নাতির দিকে। পুনরায় মাথায় হাত রেখে বললেন,
– কী হলো আমার দাদুভাইয়ের মুখে হাসি নেই কেন? দাদুভাই খুশি হওনি বড় ভাই হচ্ছো শুনে?
তানশান এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। আকস্মিক ছেলেটির প্রাণবন্ত সত্তা হারিয়ে গেল। টিশার্ট টানতে টানতে সকলের উৎসুক দৃষ্টি উপেক্ষা করে বলল,

– আমার গরম লাগছে। আমি উপরে যাই, গোসল করতে হবে। গা চুলকাচ্ছে খুব।
বলেই তানশান এক প্রকার ছুটে চলে গেল উপরে। রূপকথার মাঝে যেটুকু শক্তি, সাহস বজায় ছিল সেটুকু এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। কেননা তার জীবনের জটিল সময়ের সবচেয়ে মজবুত আর শক্তিশালী খুঁটি ছিল তপোবন আর তানশান। আজ যখন তাদের খুব প্রয়োজন ছিল তারাই তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। রূপকথার দেহ বলহীন দূর্বল হতে লাগল। হাত থেকে ব্যাট আর ক্যাপটা পড়ে গেল। মাথায় শুধু একটা জিনিস আসল—যে সব নারীর জন্য গর্ভাবস্থা সুখময় হয় না। সবার জন্য মাতৃত্ব সৌভাগ্যের নয়।
…এরপর সময় গড়ালো। রূপকথার নয়া মাতৃত্বের সময়টুকু ঠিক ততটাই জটিল হয়ে উঠল। দুপুর তিনটা তপোবন খেতে আসেনি। জবা দোতালা থেকে হাঁক ছেড়ে বলল,
– বড় চাচি, তানশান দরজা খুলতেছে না।
সোফার এক কিনারায় চুপটি করে নত শির বসে থাকা মেয়েটির দৃষ্টি ঝাঁপসা হলো সেই কণ্ঠে। একদৃষ্টিতে মেঝেতে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই একটাসময় নীরবে দুই ফোঁটা নোনাজল মেঝেতে পড়ল। নির্জনা বেগম আর রোজ চোখ তুলে তাকালো সোফার এক কিনারায় নত শির বসে থাকা রূপকথার পানে। কিয়ৎকাল পূর্বের সব উল্লাস এক নিমিষেই হারিয়ে ফেললেন নির্জনা বেগম। থমথমে মুখে বললেন,

– বড় বউমা চিন্তা করো না। তানশান ছোট মানুষ, সব মানতে একটু সময় লাগবে। ওর আচরণে কষ্ট নিও না। শুরু থেকে নিজেই তো ওর জড়তা দূর করেছ, সামনেও পারবা। এখন ওকে একটু সময় দাও। আমি দেখছি ওকে। তুমি বসে থেকো না। গোসল করে খাবার খেয়ে নাও। এই সময়ে এত দুশ্চিন্তা ভালো না।
নির্জনা বেগম উপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। কিন্তু বাধাপ্রাপ্ত হলেন রূপকথার ডাকে।
– আম্মা?
নির্জনা বেগম ফিরে তাকান রূপকথার পানে।
– কিছু বলবে?
রূপকথা চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। ফোলা ফোলা নেত্রে চেয়ে বলল,
– আপনি বসুন। আমি যাচ্ছি তানশানের কাছে।
– এই মুহূর্তে তুমি যাবে? যদি রাগের বশে খারাপ ব্যবহার করে ফেলে। এখন যাওয়ার প্রয়োজন নেই,পরে যেও। আগে আমি কথা বলি ওর সাথে।
রূপকথা ক্রন্দনরত মুখে স্মিত হাসল। বলল,
– ছেলেটা যেভাবেই হোক, আমার আম্মা। ওর রাগ, অভিমান, ঘৃণা, ভালোবাসা সবটা আমার। আমাকেই ওর সামনা করতে হবে জীবনের প্রতিটা পরিস্থিতিতে। তাই আমায় যেতে দিন।
নির্জনা বেগম দ্বিরুক্তি করলেন না। মাথা নেড়ে সায় জানালেন,

– যাও।
তানশানের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বুকভরা নিঃশ্বাস নিলো। দরজা চাপড়ে ডাকল,
– তানশান? আব্বু, দরজা খোলো।‌ মিমি এসেছি।
অপরপ্রান্ত থেকে বেদনাদায়ক নিস্তব্ধতা ফেরত পেয়ে রূপকথা ছলছল নেত্রে ফের ডাকল,
– রেগে আছো? খাবারের সাথে রাগ দেখাতে নেই। বাইরে এসো। কী হয়েছে বলো আমায়।
এই পর্যায়েও তানশানের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। রূপকথা ক্রমেই শক্তি হারায়। তানশান ছোট নয়। সে সব বোঝে। আর এতটুকুই রূপকথাকে ভেঙেচুরে চুরমার করে দিচ্ছে। তানশান তার মিমিকে চিনেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে কেন? রূপকথা যে এটা নিতেই পারছে না।
সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ভবিষ্যতের কারণে সে বর্তমান নষ্ট করতে পারবে না। তাই সে সেই মুহুর্তে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। যেই সিদ্ধান্ত ভাবতেই তার বুকের ভেতর উত্তাল ঝড় বয়ে গেল। আর্তনাদ করে উঠল অন্তঃস্থল। তবুও সে সিদ্ধান্ত নিতে একটুও বিলম্ব করল না।
সে আবার দরজায় চাপড় দিল। কাঁদতে কাঁদতে সোজাসাপ্টা বলল,
– আমার সাথে রেগে আছো, ভাই-বোন আসছে বলে? তুমি কী ভাই বোন চাও না? বাইরে এসো তানশান। মিমির সাথে কথা বলো। মিমিকে বলো, কী চাও তুমি। তুমি যা চাও তাই হবে। ভাই-বোন না চাইলে ভাই-বোন আসবে না। তবুও দরজা খোলো, প্লীজ।
কঠিন সেই কথাগুলো বলতে বলতেই রূপকথা কান্নায় ভেঙে পড়ল। হঠাৎ করেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। সে দূর্বল দেহে দরজার হাতল আঁকড়ে ধরল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

– তানশান প্লীজ দরজা খোলো। ভাই বোন আসবে না। তুমি যখন চাইছ না, তারা আসবে না। এখন বেরিয়ে এসো প্লীজ।
রূপকথার কথা শেষ হতে না হতেই খট করে একটা শব্দ হলো। রূপকথা চকিতে দরজার পানে তাকালো। দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। তার মুখে হাসি ফুটে উঠলেও, বক্ষস্থলে আঁছড়ে পড়ল দমকা হাওয়ার ন্যায় নতুন এক প্রাণ হারানোর ভয়।
রূপকথা বলহীন দেহে দাঁড়িয়ে চোখ তুলে তাকালো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির পানে। কান্নার তোপে লাল হয়ে থাকা চোখমুখ ফুলে আছে।
বুকে চলা ঝড় উপেক্ষা করল রূপকথা। জিজ্ঞেস করলো,
– কেঁদেছ কেন?
তানশান ঠোঁটে ঠোঁট চেপে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালো নারীটির পানে। থমথমে মুখে বলল,
– ভাই- বোন কেন আসবে না?
– তুমি চাইছ না বলে।
– কী করবেন?
রূপকথা চোখের পানি মুছে ফেলে হাসিমুখে বলল,
– আল্লাহর উপহার আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে দেব।
রূপকথাকে অবাক করে দিয়ে তানশান সহসা শব্দ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
– আপনি খুব খারাপ। পাষাণ, নির্দয়। আপনি কী করে এটা বলতে পারেন?
রূপকথা অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে বলল,

– তুমি এমন করছ কেন আমার সাথে? তুমি বাধ্য করেছ এটা বলতে। তুমি চাইছ না বলেই আমি এটা বলেছি।
তানশান ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে বালিশের নিচ থেকে একটা মেডিক্যাল রিপোর্ট বের করে আনলো। লম্বা লম্বা কদমে এগিয়ে এসে সেটি রূপকথার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
– ওভারিয়ান সিস্ট…যেটা মাম্মার ছিল। এটা ঝুঁকিপূর্ণ! এটা থাকলে ভাই বোন হওয়ার সময় রোগীর মৃত্যু ও হতে পারে। মাম্মাও ঠিক এই কারণেই ভাই বোন হওয়ার সময় মারা গিয়েছে। আর এই একই জটিলতা আপনার ও আছে।
বলতে বলতেই তানশান থামলো। অনর্গল গড়িয়ে পড়া চোখের পানি মুছে নিয়ে পুনরায় বলল,
– আপনার ও এই রোগ রয়েছে। ভাই বোন হতে গিয়ে আপনিও মাম্মার মতো অসুস্থ হয়ে যাবেন। মাম্মার মতো আপনিও আমায় ছেড়ে চলে যাবেন। আই হেইট ইউ! সবাই আমায় ছেড়ে চলে যেতে চায়। আমি আপনাকে ভালোবাসি না। আপনিও আমায় কষ্ট দিয়ে একা ফেলে চলে যাবেন। আই হেইট ইউ, চলে যান এখান থেকে।
রূপকথা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ছেলেটির দিকে। নিজের শারীরিক জটিলতা যতটা না মস্তিষ্কে আলোড়ন তুললো, তার থেকেও দ্বিগুণ আলোড়ন তুললো ছেলেটির বলা এক একটা স্নিগ্ধ বাক্য! সময়টা কিছুটা থমকে গেল মা ছেলের জটিল দ্বন্দ্বে। যেই দ্বন্দ্ব শুধুমাত্র একে অপরকে হারিয়ে ফেলার মিষ্টি ভয়ে।
রূপকথা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। অনুভব করল, সে আজ স্ত্রী ও মা দুই দিক থেকেই জিতে গিয়েছে। এবং সৃষ্টিকর্তা সত্যিকার অর্থেই আজ তাকে একজন মা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
রূপকথা আর একটুও ভাবনায় পড়ল না বরং আচমকাই সে ছুটে গিয়ে জাপ্টে ধরলো ছেলেটিকে। তানশান হতবাক হলো। কক্ষের নীরবতা ভঙ্গ করে রূপকথা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। অনুযোগ ভরা কণ্ঠে বলল,

– এর জন্য কেউ এমন করে? ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে তো! মিমি কখনো তোমায় ছেড়ে যাব না তানশান। আল্লাহ কখনোই কারোর সাথে অন্যায় করেন না। মিমির কিচ্ছু হবে না, তানশান। শুধু তুমি কখনো মিমিকে দূরে সরিয়ে দিও না। তুমি যদি মিমিকে ঘৃণা করো তবে মিমি কোথায় যাবে বলো? তুমি আর তোমার পাপা ছাড়া আমার কে আছে?
তানশান লালচে নেত্রে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল। বার কয়েক আওড়ালো, সৃষ্টিকর্তা কখনোই কারোর সাথে অন্যায় করেন না। অতঃপর সে ঠিক দ্বিতীয়বারের মতো আগলে নিলো মা নামক নারীটিকে। জিজ্ঞেস করলো,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৯ (২)

–আল্লাহ কখনোই আমার সাথে অন্যায় করবে না?
–উহু, কখনো না।
–আপনাকে আমার থেকে কেড়ে নেবে না?
–উহু।
–ভাইবোন কত বড় হয়েছে?
আচমকা ছেলেটার অদ্ভুত সেই প্রশ্নে রূপকথা কান্নারত চোখে হেসে উঠল। চোখে পানি অথচ ঠোঁটে হাসি।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here