অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬০
তোনিমা খান
নিজের জীবন না-কি সন্তানের জীবন?
জগতের সবচেয়ে কঠিন এই প্রশ্নের বড্ড সহজ এক জবাব পাওয়া যাবে নারী নামক ক্ষমতাধর সত্তার কাছে। কারণ নারী এমন এক সত্তা—যে তাদের একটুও ভাবতে হবে না, নিজের জীবনের বিনিময়ে সন্তানের জীবন বেছে নিতে।
বয়স দিয়ে কখনোই বোধহয় নারীর মাতৃত্বের পরিমাণ হিসাব করা সম্ভব নয়। রূপকথাও এমনি ক্ষমতাধর নারীর কাতারে পড়া ছোট্ট এক তরুণী। যার বয়সের তুলনায় মাতৃত্ব বলীয়ান। সে নিজেকে খুঁইয়ে দেবে কিন্তু নিজের ছোট্ট অংশটিকে হারাতে নারাজ।
মেডিক্যাল রিপোর্ট হাতে তপোবন স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। নির্জনা বেগমও মিইয়ে বসে ছিলেন। ডা. সুস্মিতা তাদের ভীত মুখশ্রী দেখে ম্লান হেসে বলল,
— টু ফিটাস। বয়স ছয় সপ্তাহ। বুঝতেই পারছেন হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি। রূপকথার বয়স কম, ওভারিয়ান সিস্ট, উপরন্তু টুইন বেবি। এই ধরণের প্রেগন্যান্সিতে শরীরে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে, যা পুরোনো সিস্টের আকার দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে সিস্টটি ফেটে যাওয়া, পেঁচিয়ে যাওয়া, অথবা জরায়ুর প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করার ঝুঁকি থাকে।
নির্জনা বেগম আকুতিভরা কণ্ঠে বললেন,
— কোনো কী উপায় নেই বাচ্চা রাখার?
— অবশ্যই আছে আন্টি। রূপকথা আগে থেকেই ওষুধের ওপর ছিল। এর জন্য ওর সিস্ট অনেকটা কমে এসেছে। এখন আমাদের সেই ওষুধের মাত্রা এবং ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে যা গর্ভাবস্থায় নিরাপদ। রূপকথা বাচ্চা জন্ম দিতে পারবে। এরকম অহরহ কেস আছে এবং তারা সুস্থ সবলভাবে বাচ্চাও জন্ম দিয়েছেন। তবে কিছুক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়, যেমনটা তানশানের মা। তার বিষয়টা যতটা ক্রিটিক্যাল ছিল, রূপকথার ততটা ক্রিটিক্যাল নয়।
ওর ফাংশনাল সিস্ট, যেটা অনেক ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার ষোলো সপ্তাহে নিজ থেকেই কমে যায়।
তবে আমাদের সবসময় ক্লোজ মনিটরিংয়ে রাখতে হবে। সিস্টের অবস্থান ও আকার পরিবর্তনের ওপর নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখতে হবে। যদি সিস্টের আকার খুব বেশি বাড়ে এবং সেটি ভ্রূণের বিকাশে বা রূপকথার শারীরিক সুস্থতায় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে আমাদের অস্ত্রোপচারের কথা ভাবতে হতে পারে। বাকি এখন কোনো চিন্তার বিষয় নেই। শুধু রূপকথাকে এখন থেকে কঠোর বেড রেস্ট এবং স্ট্রেস-মুক্ত পরিবেশে থাকতে হবে।
নির্জনা বেগম গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তপোবনের দিকে চাইলেন। নত শিরে বসে থাকতে দেখে বললেন,
— তপোবন, কিছু বলো। সুস্মিতা তো বলল, চিন্তার কিছু নেই। তুমি আর দ্বিধাগ্রস্ত থেকো না। রূপকথা একটা মেয়ে। প্রথমবার মা হচ্ছে, তুমি যদি ওর সামনে এভাবে থাকো, ওর ওপর দিয়ে কী যায় এটা বুঝতে পারছ?
তপোবন চোখ তুলে তাকালো। দৃষ্টিতে শঙ্কা। আরো একবার বিশ্বাস করে যদি তাকে সব হারাতে হয়? সে বিধুর নয়নে চেয়ে সুস্মিতাকে জিজ্ঞেস করল,
— রূপকথা সুস্থ থাকবে তো?
সুস্মিতা মৃদু হেসে বলল,
— আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে তার পর্যবেক্ষণ করেছি ভাইজান। ও সুস্থ সবল বাচ্চা জন্ম দিতে পারবে। তবে হাই রিস্কি প্রেগন্যান্সি হওয়ায় ওকে সবসময় ক্লোজ মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে।
— যা প্রয়োজন আমি সব করব, শুধু ও যেন সুস্থ থাকে।
— আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করব ভাইজান।
তপোবন মাথা নেড়ে সায় জানালো। নির্জনা বেগম হাঁফ ছেড়ে গাল ভরে হাসলেন রিপোর্টটি দেখে।
তার ঘরে দু’দুটো সুখ আসছে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপে ছেলের বাহুডোরেই জ্ঞান হারিয়েছিল রূপকথা। যখন চোখ খুলল, তখন ভেসে উঠল হাসপাতালের সাফেদ সামিয়ানার মাঝে একটি প্রিয় মুখ। দৃষ্টি সচকিত হয়।
তপোবন স্থির নয়নে চেয়ে রইল বেডে শুয়ে থাকা দুর্বল মুখপানে। অতি শ্রান্ত স্বরে শুধাল,
— কান্নাকাটি করেছ কেন?
রূপকথার দুর্বল নেত্র পুনশ্চ ছলছল করে উঠল বিগত মুহূর্তগুলো মনে পড়তেই। আলগোছে বালিশ থেকে সরে এসে আদুরে বিড়ালছানার ন্যায় তপোবনের কোলে মাথা রাখল। দু’হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে অনুযোগভরা কণ্ঠে বলল,
— ওভাবে ফেলে রেখে চলে গেলেন কেন?
বেডে অলস দেহে বসা তপোবন চুলের গোছায় হাত গলিয়ে দিল। দুশ্চিন্তায় চোখেমুখে ছেয়ে আছে বিদীর্ণ তমসা। বিমর্ষ মুখে জবাব দিল,
— অনাকাঙ্ক্ষিত কাউকে গ্রহণ করার কোনো উপায় আছে কি-না জানতে গিয়েছিলাম। তাই বলে নিজের ওপর এত চাপ সৃষ্টি করবে?
রূপকথা চমকাল। চোখেমুখে উল্লাস ছুঁয়ে গেল। মানুষটা তবে তার সন্তানকে গ্রহণ করতে চায়।
সে শুধাল,
— আপনি ওকে গ্রহণ করতে চান?
তপোবন ম্লান হাসল ‘ওকে’ শুনে। বলল,
— বাবা তার ছানাদেরকে গ্রহণ না করে কী করে হাসিমুখে বাঁচবে?
রূপকথার ঠোঁটের কোণে ঠিকরে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু ভ্রুযুগলে প্রশ্নের আনাগোনা।
— ছানাদেরকে?
তপোবন চোখে চোখ রেখে উপর-নিচ মাথা নাড়ল। আলগোছে মেয়েটির সমান্তরাল উদরে হাত রেখে বলল,
— আল্লাহ দু’দুটো উপহার পাঠিয়েছেন ছোট্ট এই উদরে।
রূপকথা অবাক পানে চাইল নিজের উদরের দিকে। দু’টো উপহার! সে চকিতে উঠে বসল। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
— দু’টো উপহার? এখানে কী দু’টো ছানা আছে?
তপোবন ছলছল চোখে স্মিত হাসল। মাথা নেড়ে বলল,
— হুঁ, এখানে দু’দুটো ছানা রয়েছে।
হতভম্ব রূপকথা কিছুক্ষণ সময় নিল বিস্ময়কর অনুভূতি হজম করতে। অবিলম্বে হাতটি গিয়ে ঠেকল নিজের উদরে। শুকনো ঢোক গিলে তাকাল তপোবনের মুখপানে। কিয়ৎকালের জন্য সুখ ভুলে গেল। চোখেমুখে শুধু সন্তানদের স্বীকৃতির দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা। নারীরা বোধহয় তাদের সন্তানদের নিয়ে কোনো ধরনের সংশয় মেনে নিতে পারে না।
সে তপোবনের চোখে চোখ রাখল। ক্ষীণ স্বরে শুধাল,
— বাবা কী চায় তার ছানাদের গ্রহণ করতে?
তপোবন টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,
— খুব করে চায়। কিন্তু ছানাদের মাকেও খুব করে চায়। তাকে কোনোভাবেই হারাতে পারবে না।
রূপকথার চোখ থেকে অশ্রু গড়াল ছোট্ট একটা স্বীকারোক্তিতে। তবে ঠোঁটের কোণে বৃহৎ প্রাপ্তির হাসি। সে চোখের পানি মুছে বলল,
— কেউ হারাবে না, তানশানের পাপা। সৃষ্টিকর্তা কখনোই কারোর সাথে অন্যায় করেন না। বাবা-মা তাদের তিন ছানাদের নিয়ে ঠিক বাঁচবে। আপনি একটুও ভয় পাবেন না।
তপোবন অসহায়ত্বভরা কণ্ঠে বলল,
— তোমার শরীর টুইন বেবি কেরি করার জন্য উপযুক্ত নয়, রূপকথা।
রূপকথা টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,
— জানেন, যখন থেকে জেনেছি এখানে কেউ একজন আছে, তখন থেকে মনে হচ্ছে তাকে শক্ত করে আগলে রাখতে হবে আমার কাছে। এক মুহূর্তের জন্য তাকে হারানোর চিন্তা করলেও নিজেকে পাগল পাগল লাগত। উপযুক্ত-অনুপযুক্ত জানি না, কিন্তু আমি তাদের পৃথিবীতে আনার জন্য সব কষ্ট সহ্য করে যাব, তানশানের পাপা। কিন্তু নিজের ভালোর জন্য আমি আমার সন্তানকে কোনোভাবেই হারাতে পারব না। ওভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে বরং আমি মরে যাব—সেটাই শ্রেয়।
ছোট্ট একটা মেয়ে অথচ কত দুঃসাহসিকতা তার মাঝে! তবে তপোবন কেন এত সাহস দেখাতে পারছে না? বহুবছর আগে ঠিক এমনি করুণ আর্তনাদের কাছে তপোবন একবার হার মেনেছিল। ফলশ্রুতিতে তাকে গুণতে হয়েছিল কঠিন মাশুল। এবং এতকিছুর পরে এবারেও তপোবন কিছু বলতে পারল না। বাবা হয়ে অনাগত সন্তানকে হারানোর কথা মাথায় আসলেই বুকফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। সেখানে একজন মা, যে তার গর্ভে লালন করে, সে কী করে সইবে?
তপোবন বুকভরা কষ্ট চেপে এবারেও হার মানলো। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় মেয়েটির মসৃণ গাল। দুগাল চেসে ললাট বরাবর একটা দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মৃদু হেসে বলল,
—তাদের নিজেদের বুকে আগলে রাখার কোনো উপায় বাদ রাখব না আমরা। দিনশেষে ঠিক তাকে আগলে নিয়ে বাঁচব আমরা।
রূপকথার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াল। নাক টেনে কেঁদে উঠে বলল,
—এতটুকু সাহস আর ভরসা সকালে দিলেন না কেন?
—আমি আকস্মিক তোমায় হারানোর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলাম। মানতেই পারছিলাম না এটা। স্যরি!
তপোবন মেয়েটির চোখের পানি মুছে নিল। রূপকথা বলল,
—আপনার ছেলে দরজা বন্ধ করে রেখেছিল রাগ করে।
তপোবন চমকায়। ছেলেই তাকে ফোন করে বাড়িতে ডাকে। সেই জানায় রূপকথা আকস্মিক জ্ঞান হারিয়েছে। কই তখন তো খুব স্বাভাবিক ছিল! কত দুশ্চিন্তা ছিল মায়ের জন্য। তপোবনের মনে সংশয় জাগল। ছেলেটা যে বড় হয়েছে! সে কি আদতে মানতে পেরেছে নাকি বাবার সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল? ছেলেটা যে অনুভূতি লুকাতে পটু! সে অস্ফুট স্বরে বলল,
—তানশান দরজা আটকে রেখেছিল? কিন্তু কেন? ও কি…
তপোবনের কথার মাঝেই রূপকথা ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
—বাবার মতো আরেকজন অভিভাবক হয়ে গিয়েছে সে। আমার অসুস্থতার কথা আমি জানি না, কিন্তু সে জানে। তার মাম্মার মতো তার মিমিও তাকে ছেড়ে চলে যাবে। সেই ভয়ে আর অভিমানে আমাদের কারোর সাথে কথা বলছিল না। কিন্তু যখন আমি বললাম ভাই-বোন আসবে না, তখন আমার ওপর ক্ষেপে গিয়েছে। বলে আমি নাকি খারাপ, পাষাণ, নির্দয়।
সব শুনে তপোবন শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—অবশেষে আমার ছেলেটার অভ্যাস হয়ে উঠতে পেরেছ তুমি। তানশান ঠিক বলে, তুমি নাছোড়বান্দা!
রূপকথা গালভরে হেসে বলল,
—বদ-অভ্যাস। যা সে চাইলেও কোনোদিন ত্যাগ করতে পারবে না।
বলেই সে খিলখিলিয়ে হাসল। এ যাত্রায় তপোবন মুগ্ধ হয়ে দেখল জটিল জীবনের সাথে লড়াইয়ে জিতে যাওয়া এক নারীর স্নিগ্ধ হাসি। বিমুগ্ধ চিত্তে দেখতে দেখতেই বলল,
—জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে তুমি এভাবেই জিতে যাও আর আমি এভাবেই তোমায় মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি।
চোখে জল, মুখে হাসি নিয়ে রূপকথা বলল,
—আমিন।
তপোবন স্মিত হাসল। এগিয়ে গিয়ে বাম গালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
—আমিন।
তপোবন কামরা থেকে বের হতেই দেখল করিডরে চুপটি করে বসে থাকা ছেলের মলিন মুখ। সে ধীর কদমে গিয়ে ছেলের পাশে গিয়ে বসল। মেঝেতে তাকিয়ে থাকা ছেলের পানে ঘাড় কাত করে চেয়ে ডাকল,
—আব্বু?
তানশানের মাঝে হেলদোল দেখা গেল না। তপোবন ম্লান হাসল। বলল,
—মিমিকে খুব ভালোবাসো?
তানশানের লালচে নেত্রবেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়াল। নতশিরে বলে উঠল,
—আমি যাকেই ভালোবাসি সেই আমায় ছেড়ে চলে যেতে চায় কেন? মাম্মা, মেজো মা, এখন মিমি। সবাই আমায় ছেড়ে দূরে চলে যেতে চায়।
তপোবন হাত বাড়িয়ে মলিন অবয়বটিকে বুকে টেনে নিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
—কিন্তু এবার পাপা আর কাউকে দূরে যেতে দেব না আমার তানশানের থেকে। মেজো মা আর মিমি দুজনেই সুস্থ-সবল তোমার কাছে থাকবে।
—হোপ সো।
তানশান ধিমি কণ্ঠে বলল। তপোবন ছেলেকে অবলোকন করতে করতেই সতর্ক কণ্ঠে বলল,
—তুমি কি জানো তোমার দায়িত্ব এখন কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে?
—হুম, জানি। বেবি আর মিমির খেয়াল রাখতে হবে আমায়। কখনো একা ছাড়া যাবে না মিমিকে।
তানশানের কথায় তপোবন স্মিত হেসে বলল,
—বেবি নয় বেবিরা। তোমার দু’টো ভাই-বোন আসছে।
তানশান সরব বাবার কাঁধ থেকে মুখ তুলল। বিস্ময় নিয়ে বলল,
—ভাই-বোন? দু’টো বেবি? আমার দু’টো ভাই-বোন হবে?
তপোবন হেসে মাথা নাড়লো।
—হুম, দু’টো ভাই-বোন আসবে।
তানশানের কাছে টুইন বেবি বিস্ময়কর এক বিষয়। সে বলল,
—পাপা, আমার টুইন ভাই-বোন হবে? ও মাই গড! এটা তো বিস্ময়কর বিষয় পাপা। আমি শুধু আগে মানুষের মুখে শুনতাম আর টিভিতে দেখতাম।
—এখন সবটা বাস্তব। দায়িত্ব কিন্তু অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছে আব্বু। পালন করবে তো?
—অবশ্যই করব। আমি ভাই-বোনকে সবসময় দেখে রাখব। ভাই-বোন কত বড় হয়েছে পাপা? কবে আসবে? আমি কবে টুইন বেবি দেখব?
তানশানের মাঝে বাঁধভাঙা উল্লাস আর কৌতূহল। তপোবনের বুকের ভার কমে আসে ছেলের উল্লাসে। সব প্রতিকূলতা ভুলেও সে প্রসন্নতার সাথে হাসল। বলল,
—ভাই-বোন তো এখনো অনেক ছোট্ট। উমম, আরও ছত্রিশ সপ্তাহ তোমায় অপেক্ষা করতে হবে ভাই-বোনকে দেখতে হলে।
—ছয়ত্রিশ সপ্তাহ নট আ বিগ ডিল। চোখের পলকে কেটে যাবে পাপা। ও মাই গড! আমার টুইন ভাই-বোন হবে। তারা দেখতে এক রকম হবে।
তানশান কতশত স্বপ্ন বুনতে লাগল। সমাজ আর মানুষ দৃষ্টিভঙ্গির দাস। যার দৃষ্টিভঙ্গি যত সহজ, তার জীবনও তত সহজ। তপোবন ছোটবেলা থেকে ছেলেকে এমনভাবে বড় করেছে যেন তার দ্বারা জগতের কোনো জীবন কষ্ট না পায়। সেখানে জ্যান্ত মানুষ কষ্ট পাবে, এমন কাজ কখনোই করেনি তানশান। তপোবন বেশ জানে, তানশান তার ভাই-বোনকেও হাসিমুখে গ্রহণ করবে এবং সারাজীবন আগলেও রাখবে।
পারমিতা বেগম কাঁদছেন। রূপকথা মৃদু হেসে দেখছে তার কান্না। পারমিতা তা দেখে রাগান্বিত স্বরে বলল,
—হাসছিস তুই? সবাইকে এত চিন্তায় রেখে তোর মুখে হাসি আসছে?
বালিশে হাত রেখে তাতে গাল দাবিয়ে শুয়ে থাকা রূপকথা হাসিমুখে বলল,
—তোমাদের মতো মানুষ যার জীবনে আছে তার মুখ থেকে কখনো হাসি সরতেই পারে না। তোমরা এত ভালো কেন? আমায় এত কেন ভালোবাসো? আমি তো তোমাদের এত ভালোবাসার প্রাপ্য নই।
পারমিতা কান্না থামিয়ে থমথমে মুখে তাকালেন।
—কেন? তুই কী করেছিস?
—মেয়ের সতীনকে কেউ এত ভালোবাসে? তার জন্য কাঁদে?
—বাজে কথা বলবি না। তুই কি আমার মেয়েকে সরিয়ে জোরপূর্বক তার সতীন হয়েছিস? আমার মেয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে দশ বছর আগে। তুই দশ বছর পর এসে তার রেখে যাওয়া সংসারটাকে গুছিয়েছিস, তার রেখে যাওয়া দুঃখী মানুষ দু’টোকে ভালোবাসা দিয়েছিস, আগলে রেখেছিস। আমার উচিৎ তোর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তোকে ভালোবাসব না তো কাকে বাসব?
রূপকথা টলটলে নেত্রে হাসল। বিলম্বহীন বেড ছেড়ে উঠে মমতাময়ী নারীটির বুকে লেপ্টে গেল।
—তুমি অনেক ভালো মামনি। তোমার মেয়েটাও খুব ভালো ছিল যার কারণে তোমার নাতিও খুব ভালো একজন মানুষ হয়েছে। আমায় খুব ভালোবাসে।
পারমিতা সাদরে তাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
—তুই যে নাছোড়বান্দার মতো ভালোবাসার জন্য লেগে থাকিস, ভালোবাসা না দিয়ে উপায় আছে? এখন আমার আর দু’জন নানুভাইকে সুস্থ-সবল আনতে পারলেই হলো, আমার আর কোনো চিন্তা থাকবে না। আমি তখন নিশ্চিন্তে মরতে পারব।
রূপকথা সরব বুক থেকে মাথা তুলল। কপাল কুঁচকে চাইলো বৃদ্ধার মুখপানে। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
—নানুভাইয়েরা আসলেই তোমার চিন্তা শেষ? তাদের বড় করবে কে? একটুও নিশ্চিন্তে মরতে পারবে না তুমি। ওদের তুমি বড় করবে আর আমি পড়াশুনা করব। আমায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে নয়তো তোমার তপু আমার মাথা খেয়ে ফেলবে।
পারমিতা হেসে উঠলেন। বললেন,
—আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। ওদের আমি বড় করব, তুই পড়াশুনা করিস।
—এইতো সঠিক পথে এসেছ।
—তুই আমায় এখন সঠিক পথ শেখাবি?
—শেখাচ্ছি তো।
—সকাল পেরিয়ে রাত হলো কিন্তু তোর মা এখনো আসল না। তার ওখানে কী এমন আছে? খুলনায় এসে থাকলে কী হয় তার?
—সে ওখানে থেকে শান্তি পায়। শহরে তার দম বন্ধ লাগে। তোমার তপু বলেছিল অনেকবার, রাজি হয়নি।
—তাই বলে আজ এত বড় সুখবর শুনেও আসবে না?
—শুকতারার পরীক্ষা চলছে তো। কথা হয়েছে, পরে আসবে।
—আচ্ছা। এখন বল কী খাবি? মামনি তোকে বানিয়ে খাওয়াব।
রূপকথাকে নিয়ে বাসায় আসা হয়েছে সন্ধ্যা নাগাদ। পারমিতা সোজা বাড়িতেই এসেছে। রূপকথা কিছু বলার আগেই রোজ হনহনিয়ে রুমে ঢুকে বলল,
—আমাকে তো কখনো এমন করে বলো না, মামনি।
পারমিতা এমন এক আদুরে, প্রাণবন্ত, মমতাময়ী মানুষ। যে কি না জগতের সকলের মামনি। পারমিতা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—তুইও আমায় নাতি-নাতনির মুখ দেখা, তোকেও রান্না করে খাওয়াব।
রোজ কোমরে হাত দিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,
—এত বড় অপমান? আগামী বছরের সূর্য ওঠার আগেই দেখবে আমি তোমার জন্য নাতি-নাতনি এনে ফেলেছি।
—ওরে নির্লজ্জ মেয়ে! মামনির সামনে কিছু বলতে এখন আর মুখে বাঁধে না তাই না? বিয়ের নাম শুনলেই কেঁদে ভাসায়, সে আবার আমায় নাতি-নাতনির মুখ দেখাবে। ফাজলামো হচ্ছে আমার সাথে?
রোজ গুরুগম্ভীর গলায় বলল,
—আমি সিরিয়াস মামনি। ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট মি!
পারমিতা এবার মেয়ের কান মুচড়ে দিলো।
—আয়, তোর সিরিয়াসনেস দেখাচ্ছি আমি। আগে বিয়ে কর।
রোজ ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে বলল,
—দেখে নিও হুট করে বিয়ে করে তোমায় চমকে দেব।
তাদের রসিকতার মাঝেই ভেসে আসল জলদগম্ভীর কণ্ঠ—
—এসব কেমন ধরণের কথা রোজ? বড়দের সাথে এভাবে কথা বলে?
মায়ের কণ্ঠে রোজ হতচকিত সোজা হয়ে দাঁড়াল। পারমিতা বেয়ানকে দেখে হাসিমুখে বলল,
—আমি মজা করছিলাম ওর সাথে। মামনির সাথে মজা করবে না তো কার সাথে করবে?
নির্জনা বেগম কক্ষে ঢুকলেন। পেছন পেছন জবা আর মাজেদা নানারকমের খাবার নিয়ে ঢুকলো। নির্জনা বেগম বললেন,
—এসেছেন থেকে কিছু খাননি বেয়ান। একটু কিছু মুখে নিন।
—আমি কি মেহমান নাকি আপনি এত আপ্যায়ন করছেন? এসব আমার প্রয়োজন নেই। আমি আমার ছেলে-মেয়েদের দেখতে এসেছি।
—দেখতে এলে কিছু খাওয়া যাবে না? এ কেমন কথা? চুপচাপ খাবার খান আর আপনার মেয়েকেও খাওয়ান। তাকে বলুন, নিজের যত্ন নিতে। এখন আর সংসারের পেছনে ছোটাছুটি করতে হবে না তাকে। আমি সংসার সামলে নেব। সে যেন শুধু নিজের আর আমার নাতি-নাতনিদের খেয়াল রাখে।
—তা ও রাখবেই। ওকে এসব বলে বোঝাতে হবে না। ও হচ্ছে পাকা বুড়ি। ও সব একাহাতে সামলে নিতে পারে।
পারমিতা রূপকথার হাতে ফলের বাটি তুলে দিয়ে বলল। রোজ পারমিতাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—ও মামনি, আজ থেকে যাও প্লীজ?
—তোর বুড়ো বাবা অসুস্থ তা কি ভুলে গিয়েছিস?
—বাবাকে তোমার ছেলেরা দেখে রাখবে নয়তো ভাইজানকে বলি এখানে নিয়ে আসতে। আমি দেখাশুনা করব। তবুও তুমি থাকো কিছুদিন।
—না না, সে কি হয় নাকি?
—কেন হয় না?
তপোবন ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলো। পারমিতা বলল,
—তা তোর থেকে ভালো কে জানে?
তপোবন বলল,
—আব্বুকে আমি নিয়ে আসব গিয়ে। তুমি ক’দিন থাকো না মা।
—এত ঝামেলার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি ক’দিন পরপর এসে ওকে দেখে যাব।
তপোবন এগিয়ে গেল বৃদ্ধার কাছে। হাত ধরে চাপা স্বরে বলল,
—তুমি তো জানো তুমি পাশে থাকলে আমার কোনো চিন্তা আর চিন্তা মনে হয় না। আর তুমি থাকলে ঘরটাও একটু প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। প্লীজ মা।
পারমিতা উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেললেন। বাড়িটা আগের মতো আর খুশিতে ঝলমল করে না তেমন। মৌনতা, নায়েলের হাঁকডাক নেই। চারিদিকে সব কেমন নিস্তব্ধতা। সে বলল,
—আচ্ছা থাকব।
—একটু বেশিদিন থাকবে কেমন? আব্বুর খেয়াল আমরা রাখব আর তুমি আমাদের খেয়াল রাখবে।
—আর তোর ফাজিল শ্যালকরা?
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
—আমার ছোট শ্যালক কাল সকালে ট্যুরে যাবে। আর বড় শ্যালক বলেছে সে ঠিক সময়ে এখানে চলে আসবে।
পারমিতা ঠোঁটে ঠোঁট চাপল। রাগান্বিত স্বরে বলল,
—তোর ছোট শ্যালককে আমি ট্যুরে যেতে বারণ করেছি না তপু? তুই আবার ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছিস?
—এখন জীবন উপভোগ করবে না তো কখন করবে, মা? আর যেখানে যাচ্ছে সেখানে আমার পরিচিত লোক আছে, তারা দেখে রাখবে। কিছু হবে না। আমি বাড়তি টাকাও দিয়ে দিয়েছি। চলতি পথেও কোনো সমস্যা হবে না।
পারমিতা ফোঁস ফোঁস করে বললেন,
—তুই ওদের বিগড়ে দিচ্ছিস, তপু।
তপোবন স্মিত হেসে বৃদ্ধার হাতে ঠোঁট ছোঁয়াল। বলল,
—তুমি, আব্বু আর আমি ছাড়া আর কে আছে ওদের? আমরা প্রশ্রয় না দিলে কোথায় যাবে ওরা?
—বড় হয়েছে ওরা। আর কত?
—যতদিন ওদের ভাইজান বেঁচে আছে।
তপোবন মৃদু হেসে বলল। সারাদিন পর মাত্র বাসায় ঢুকেছে। সে বলল,
—তোমরা থাকো এখানে। আমি তানশানের ঘর থেকে গোসল করে নেই।
—এখানেই কর।
—উঁহু, তোমরা আড্ডা দাও।
তপোবন পোশাক-আশাক নিয়ে ছেলের ঘরে চলে গেল। নির্জনা বেগম হাতের কুশিকাটা সরিয়ে রোজকে বলল,
—মৌনতাকে একটা ফোন দাও না। কী অবস্থা ওদের? আমার দাদুমনির সাথে সেই গতকাল কথা হলো। তাদের জানাও তাদের আরও দু’টো ভাই-বোন আসছে। খুব খুশি হবে।
এপ্রিল মাসকে কানাডায় ‘শীত ও বসন্তের লড়াইয়ের সময়’ বলা হয়। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের ঠিক পরের দিনই হয়তো ঝড়ো হাওয়া বা বৃষ্টির আনাগোনা দেখা যায়। অনেক জায়গায় এই সময়ে হালকা তুষারপাত বা বরফগলা বৃষ্টি হয়, যা শীতের আমেজকে বাঁচিয়ে রাখে।
মৌনতার পরনে শুধুমাত্র একটা সাদা নিট ক্রপ টপ আর ব্লু রঙা হাই-ওয়েস্টেড প্যান্ট, মাথায় টুপি। মাথায় টুপিটা এখন মৌনতার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। স্ক্রিনে ভেসে থাকা লাজুক মুখটি দেখে মৌনতা মৃদু হেসে বলল,
—পিচ্চি মেয়েটা আবার দু-দুটো পিচ্চি আনছে ভাবা যায়? আল্লাহ পৃথিবীর সকল সুখ তোমায় দিক বোনু। সুস্থ-সবল ভাবে বাবুরা পৃথিবীতে আসুক। নিজের প্রচুর খেয়াল রাখতে হবে কিন্তু। একটুও অনিয়ম করবে না খাওয়া-দাওয়া নিয়ে। তুমি তো খাওয়া-দাওয়া ঠিক করে করো না।
রোজ রূপকথার থেকে ল্যাপটপ নিজের দিকে ফিরিয়ে ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
—কোনো চিন্তা নেই মৌন। ভাবির পেছনে এখন আমি আঠার মতো লেগে থাকব। দেখবে দুই মাসের মধ্যে ভাবি আর আমাদের পিচ্চুরা হাট্টাগাট্টা হয়ে গিয়েছে।
রূপকথা ফিক করে হেসে উঠল। নায়েল পিটপিট করে চেয়ে বলল,
—বলো মাম্মার বেলিতে দু’টো বেবি আছে? আমাল দু’টো ভাই-বোন আসছে?
মৌনতা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
—হ্যাঁ, তুমি বিগ সিস্টার হয়ে যাচ্ছো।
—ওয়াও, বিগ সিস্টার?
পরপরই উৎসুক কণ্ঠে বলল,
—এই বলো মাম্মা, তোমাল বেলি দেখাও। কোথায় বেবিরা? দেখাও দেখাও।
রোজ খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
—বেবিদের এখনো দেখা যাচ্ছে না নায়েল। আর কিছুদিন পর দেখা যাবে।
নায়েলের উচ্ছ্বাস মিইয়ে গেল। মৌনতার দীর্ঘক্ষণ কথা হলো সকলের সাথে। কথোপকথনের এক পর্যায়ে মৌনতা জানতে পারল সিকদার পরিবারের সম্পত্তিতে আর কোম্পানিতে তারও একটা অংশ রয়েছে। সে অবাক হয়ে বলল,
—আম্মা, আমি আপনাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এখনো সুসম্পর্ক বজায় রেখেছি। কিন্তু আপনারা আমার নামে কেন সম্পত্তি লিখে দেবেন? ওই সম্পত্তির প্রতি আমার কোনো হক নেই।
নির্জনা বেগম গম্ভীর মুখে বললেন,
—“এটা তোমার জন্য নয়, নায়েলের ভবিষ্যতের জন্য করা হয়েছে মৌন। তুমি আর তোমার বাবা দুজনেই অসুস্থ। আর ইমরোজের ওপর আমাদের বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। আমাদের বয়স হয়েছে। নায়েলের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কী? আমার নাতনি যেন কখনো কোনো ধরনের সমস্যার না পড়ে, তাই এই অংশটা তোমার নামে করা হয়েছে। নায়েলের নামে করলে ইমরোজ তার ওপর আধিপত্য ফলাতে চাইত। বোঝার চেষ্টা করো মৌনতা। অন্তত নিজের মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য হলেও তোমায় এটা গ্রহণ করতে হবে।”
এই পর্যায়ে গিয়ে মৌনতা একটু স্থির হলো। আসলেই তো, সে মরে গেলে নায়েলের কী হবে? চাচারা যতই দেখে রাখুক না কেন তাদের তো নিজের সংসার রয়েছে। আর তার বাবারও অত সামর্থ্য নেই। ফের দুশ্চিন্তা আর ভয় আঁছড়ে পড়ে মৌনতার মাঝে। তার কিছু হয়ে গেলে যে নায়েলের পুরো দুনিয়াটা শেষ হয়ে যাবে। যেখানে আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের মাথার ওপর শক্ত আশ্রয় আছে, সেখানে তার মেয়েটার জীবন একটা অনিশ্চিত যাত্রার দিকে পা বাড়াচ্ছে।
—মেজো ভাইজান, নায়েলের কাস্টডির জন্য মামলা করেছে মৌন বউ।
আচানক রোজের এহেষ কথায় মৌনতা হকচকিয়ে গেল। ঢিলে হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল নায়েলকে। অস্ফুট স্বরে বলল,
—মানে?
রোজ ম্লান দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
—মেজো ভাইজান নায়েলের কাস্টডির জন্য মামলা করেছে। গতকাল নোটিশ এসেছে আব্বুর কাছে। কিন্তু দুশ্চিন্তার কোনো বিষয় নেই। নায়েল কানাডায় থাকায় কেসের গতিবিধি আগাবে না। আর কেস লড়ার জন্য যা করার প্রয়োজন তা আব্বু আর বড় ভাইজান করে নেবে।
কর্ণকুহরে আন্দোলিত হলো রোজের তিক্ত কথাগুলো। মৌনতা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। একটা মানুষ নাহয় তার স্ত্রীকে বুঝতে পারে না, কিন্তু নিজের সন্তান? একটা পুরুষ কী করে নিজের সন্তানের ভালোটুকুও বুঝতে চায় না? নায়েল নিজের মাকে ছেড়ে সৎ মায়ের কাছে থাকবে? ইমরোজের কি একটাবারের জন্যও বুক কাঁপেনি একটা বাচ্চাকে তার মায়ের বুক থেকে ছিনিয়ে নেয়ার চিন্তা করতে?
বাবা হিসেবে ইমরোজ কতটুকু ভালো তা তার থেকে কে-ই বা ভালো জানে! আর সৃজা?
মৌনতা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। তার যদি কোনোভাবে কিছু হয়ে যায়, ইমরোজ যেভাবেই হোক নায়েলের কাস্টডি পেয়ে যাবে। নায়েলের জীবন যে ধ্বংস হয়ে যাবে ওই দু’জনের সান্নিধ্যে! সহসা মৌনতা শক্ত করে নায়েলকে বুকে জড়িয়ে নিলো। অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল,
—“তোমার ভাই আমায় শেষ করার কোনো উপায় বাদ রাখছে না রোজ। আমার অপরাধটা কী ছিল? আমি সারাজীবন তার সংসার করতে চেয়েছি বলেই কি সে আমায় এত কঠিন শাস্তি দিচ্ছে? নায়েলের জীবন শেষ হয়ে যাবে তাদের মতো নিকৃষ্ট মানুষের কাছে থাকলে।”
রূপকথা ব্যথিত নয়নে দেখল একটা মায়ের আর্তনাদ। যে কি না একটা অসুস্থ বৈবাহিক সম্পর্ক বয়ে চলেছে শুধুমাত্র সন্তানের জন্য; এমনকি নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শুধু তার সন্তানের জন্য লড়ে যাচ্ছে। মায়েরা বোধহয় সন্তানদের কাছে এসেই অসহায়ত্ব অনুভব করে। সে আলগোছে নিজের উদরে হাত রাখল। অন্তঃস্থল আকুতির সুরে বলে উঠল,
—তোমরা সুস্থ-সবল মায়ের বুকে চলে এসো প্লীজ।
নির্জনা বেগম দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
—নায়েলকে কেউ তোমার থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না, এতটুকু নিশ্চিন্তে থাকো মৌনতা। তুমি শুধু নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নাও।
শাশুড়ির সাথে দীর্ঘ আলাপন শেষে মৌনতা ঘর থেকে বের হয় মেয়েকে নিয়ে। উদাসীন বদনে চলতে চলতে রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মাসুমা বেগম ওদের দেখতেই বলল,
—খিদে পেয়েছে? খাবি কিছু?
পরপরই চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
—তোর খাবার তো তৈরি করা হলো না। এরোজ গতকাল থেকে বাড়িতে আসেনি। কোথায় গেল ছেলেটা?
মৌনতা ভ্রুক্ষেপ করল না মায়ের কথায়। বললো,
—আমার চিকিৎসার খরচ দেয় কে আম্মা?
মাসুমা বেগমের ব্যস্ততা শিথিল হয়ে আসে।
—কেন? কী হয়েছে?
—এমনিই জানতে চাইছি বলো।
মাসুমা বেগম সংকোচ ছাড়াই বললেন,
—তপোবন তো বলে সে দিচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এগুলো সব এরোজ করছে।
—আর তাকে এত টাকা ফিরিয়ে দেব কী করে?
মেয়ের থমথমে মুখপানে চেয়ে মাসুমা বেগম শান্ত স্বরে বললেন,
—সেটা তোর আব্বু বুঝে নেবে। কোনোভাবে ম্যানেজ করে নেবে।
—আব্বুর নিজের ওষুধের খরচ জোগাড় করতে কষ্ট হয়ে যায় আম্মা। আমার গয়নাগুলো বিক্রি করে দাও না কেন?
—তোর গয়না বিক্রি করব কেন? ওগুলো তোর ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হবে।
—মরে গেলে গয়না দিয়ে কী করব আম্মা?
—খবরদার মৌন! আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিবি না। একটুও বাজে কথা বললে চড়িয়ে কান ফাটিয়ে দেব। বড় হয়ে গিয়েছিস বলে এখন শাসন করতে পারব না তা ভেবে একটুও ভুল করবি না।
মায়ের কঠোর কণ্ঠে মৌনতা শ্রান্ত নয়নে চেয়ে বলল,
—ইমরোজ মামলা করেছে নায়েলের কাস্টডির জন্য। তার কাছে গেলে নায়েলের জীবন শেষ হয়ে যাবে আম্মা।
মৌনতার চোখে অশ্রু জমালো। মাসুমা বেগম হকচকায়। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। বলল,
—তোর আব্বু এখনো জীবিত আছে। নায়েলকে কখনো ওই জালিমের কাছে যেতে দেবে না। কোনো চিন্তা করবি না।
চিন্তা করবি না বললেই কি হয়ে গেল? মায়ের চিন্তাই যে ওই একটিমাত্র শব্দ জুড়ে ’সন্তান’। তার কিছু হয়ে গেলে নায়েলের মাথার ওপর শক্ত আশ্রয় আর থাকবে না। বুকভরা যন্ত্রণা আর মানসিক দুশ্চিন্তায় মিইয়ে গেল নারীটি। তন্মধ্যেই কলিং বেল বাজলে সে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই নিশান্তের হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখে বলল,
—তুমি? তোমার ভাই কই?
—ব্রো তো অসুস্থ ভাবি। গতকাল থেকে হাড়কাঁপানো জ্বরে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এই নাও তোমার খাবার। দেরি হয়ে গেল আসতে। আসলে একটা জরুরী কাজ পড়ে গিয়েছিল।
মৌনতা কপাল কুঁচকে তাকায় খাবারের দিকে।
—এগুলো কোত্থেকে এনেছ?
—মাম্মা রান্না করে পাঠিয়েছে। ব্রো রেসিপি বলে দিয়েছে আর মাম্মা রান্না করেছে।
ডাক্তারের আদেশেই মৌনতাকে আলাদা খাবার দেয়া হয়। অসুস্থতার মাঝেও তার খাবারের খেয়ালটুকু রাখা লাগবে, এত দায় কেন? গতকাল থেকে অসুস্থ, তাকে তো একবারও জানায়নি! সেদিন সকালে হাঁটতে বের হওয়ার পর থেকে বাড়িতে আসেনি, তার সাথে কথা বলেনি।
মৌনতা থমথমে মুখে বলল,
—তোমার ভাই এখন কোথায়?
—বাড়িতে।
—এখানে কেন আসছে না?
—তোমার সংক্রমণ হয়ে যাবে না? এই টাইমে বাড়িতে আসা বিপদজনক তোমার জন্য।
—আমি তোমার সাথে যাব তোমাদের বাসায়।
নিশান্ত ব্যাগ খোলা রেখে বলল,
—তোমার সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তোমার আমাদের বাসায় যাওয়াই যাবে না।
—সংক্রমণ হবে না। আমি সেইফটি মেইনটেইন করে যাব।
বলেই মৌনতা দ্রুত খেয়ে নিলো। নায়েলকে প্রয়োজনীয় গরম কাপড় পরিয়ে নিজেও একটা কার্ডিগান পরে বেরিয়ে এলো নিশান্তের সাথে।
কক্ষটিতে তখনো ঘুটঘুটে তমসার আধিপত্য। মাস্ক, গ্লাভস পরিহিত মৌনতা ধীর কদমে ঢুকতেই বিছানায় শায়িত অর্ধনগ্ন একটি পৃষ্ঠদেশ দৃষ্টিসীমায় আটকালো। দরজা খুলতেই সূর্যের তেজি ময়ূখ দ্যুতি হুড়মুড়িয়ে ঢুকে তমসার আধিপত্যকে পরাস্ত করে দিল। শরীরের অসহনীয় তাপে কাতরাতে থাকা দেহটি হুঁশ ফিরে সেই আলোর তীব্রতায়। এরোজ কপাল কুঁচকে ফিরে তাকালো। অতি পরিচিত নারী অবয়ব দেখতেই চোখের পলক ঝাপটায়। কিয়ৎকাল বাদে ঠাহর করতে পেরেই চাপা স্বরে খেঁকিয়ে উঠল,
—আপনি এখানে কী করছেন?
মৌনতা থমথমে মুখে বলল,
—বাড়ি যাননি কেন?
—আপনার সংক্রমণ হবে। রুম থেকে বের হন তাড়াতাড়ি।
—আমার কথা চিন্তা করে অসুস্থ অবস্থায় নিজের বাড়িতে না গিয়ে খুব মহৎ সেজেছেন আপনি। আর আপনি সফল!
মৌনতা বাঁধা নিষেধ উপেক্ষা করে এগিয়ে যায় বিছানার কাছে। তৎক্ষণাৎ এরোজ মাথা জাগিয়ে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
—এক পাও এগোবেন না, মৌন। রুম থেকে বের হন, গেট আউট। আমায় যেন এক কথা বারবার বলা না লাগে।
মৌনতা পা থামায়। ভারী কণ্ঠে বলল,
—আপনার উপকার নিতে নিতে আমার কাঁধ ভারী হয়ে গিয়েছে খুব। আর নিতে পারছি না। এখন কাঁধ হালকা করতে হবে।
—তো দয়া করতে চাইছেন? আমার দয়া চাই না মৌন, আমার ভালোবাসা চাই। যেদিন ওটা দিতে পারবেন সেদিন কোনো বাঁধা দেব না। এখন রুম থেকে বের হন।
—বের হবো না। বাড়িতে চলুন।
—বাড়িতে গেলে কী হবে?
—এভাবে অসুস্থ অবস্থায় এখানে পড়ে থাকলে কী হবে? খালামনি সংসারের কাজ, তিন ছেলে-মেয়ে সামলাতেই ব্যস্ত। বাড়িতে গেলে অন্তত আপনার দেখাশোনা করা যাবে।
—দেখাশোনা করবে কে?
আবছা আঁধারে ধূসর চোখটি কেমন জ্বলজ্বল করছে। মৌনতা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—আমি করব। চলুন।
সহসা এরোজ হেসে উঠল আলসেমাখা দুর্বল কণ্ঠে। বালিশে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে জড়ানো কণ্ঠে বলল,
—নিজের সেবা করুন আগে। আপনি সুস্থ হলে আমি এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাব। তা না করে আপনি আমার সেবা করে নিজে সংক্রমিত হয়ে আমায় চিরতরে শেষ করার পরিকল্পনা করছেন। আপনি মেয়ে বড় বোকা নাকি নিষ্ঠুর? বুঝিনা।
—আপনি যাবেন না?
—নাহ।
—খেয়েছেন কিছু?
—কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।
—তাই বলে না খেয়ে থাকবেন?
—খেতে ইচ্ছে করলে খেয়ে নেব। আপনি এখন বের হন এখান থেকে।
বলেই এরোজ হাঁক ছেড়ে নিশান্তকে ডাকল। নিশান্ত আসতেই গনগনে স্বরে বলল,
—তোকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে দেব। ওনাকে এখানে এনেছিস কোন সাহসে? দিয়ে আয়।
—আমি আনিনি ভাই। ভাবি জোর করে এখানে এসেছে।
—এই মুহূর্তে দিয়ে আসবি।
মৌনতা এক পলক শ্রান্ত দৃষ্টি ফেলে বেরিয়ে আসে। এরোজ পুনরায় ধপ করে শুয়ে পড়ল। মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে ব্যথায়। চোখ খুলে রাখাই দায়। তার ঠিক বিশ মিনিট বাদে নিভা সতর্ক দৃষ্টি ফেলে ঢুকল,
—ভাই, আসি?
এরোজ নিভু নিভু চোখে চেয়ে বলল,
—আয়।
নিভা চঞ্চল কদমে ঢুকে প্রসন্ন কণ্ঠে বলল,
—ভাই দেখো, ভাবি তোমার জন্য রান্না করেছে। গরুর মগজ আর পরোটা বানিয়েছে তোমার জন্য। তুমি পছন্দ করো বলে। খেয়ে নাও।
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৯ (২)
নিভা খাবার রেখেই বেরিয়ে যায়। এরোজ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বেড সাইড টেবিলে রাখা খাবারটির দিকে। জীবন তাকে বারংবার সুখের ছোঁয়া দিয়ে সুখ ছিনিয়ে নিতে পটু হওয়ায় এই সুখটুকু আজ আর তাকে আনন্দিত করতে পারল না। বরং ভয় জেঁকে বসল। সৃষ্টিকর্তা তো তখনি তাকে সুখ দেয় যখন তার থেকে কিছু কেড়ে নেয়। সে একদৃষ্টিতে খাবারটি দেখতে দেখতেই ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
—আমি প্রতিনিয়ত যতটা বাজেভাবে আপনার মায়ায় পড়ি, জীবন প্রতিনিয়ত ঠিক ততটাই বাজেভাবে আপনাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে মত্ত হয়।
