Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (৩)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (৩)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (৩)
তোনিমা খান

বিভূঁইয়ের আকাশে তমসার আধিপত্য। তবে বিভূঁইয়ে থাকা দু’টো শুষ্ক মরুর ন্যায় তড়পাতে থাকা প্রাণ সুখের উজ্জ্বলতায় জ্বলজ্বল করছে।
তাসবিহ পড়তে পড়তে মৌনতা ধীর কদমে দরজা ঠেলে প্রবেশ করে কাঙ্খিত কামরাটিতে। ধীর কদমে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে ঘরের ঠিক পশ্চিম কোনায় গিয়ে বসল। হাঁটু আঁকড়ে ধরে বসে তাতে মাথা ঠেকিয়ে দিয়ে অনিমেষ তাকিয়ে থাকলো মখমলের মোলায়েম জায়নামাজে একে অপরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা দুই অবয়বের পানে।
ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায়, চোখদুটো তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় চেয়ে থাকে অপার সৌন্দর্যে মোড়া মুখদুটির পানে। আতরের তীব্র গন্ধের বদলে নাসারন্ধ্রে ল্যাভেন্ডারের সুবাস ফুরফুরিয়ে প্রবেশ করতেই ধূসর নেত্রদ্বয় আধো আধো মেলে তাকালো।
অক্ষিপটে রুগ্ন মুখটি ভেসে উঠতেই স্মিত হাসল। জড়ানো কণ্ঠে বলল,

– হাই!
হাঁটুতে মাথা রেখে শুয়ে থাকা মৌনতাও স্মিত হাসল। অতি ক্ষীণ স্বরে বলল,
– হ্যালো!
– ঘুম হচ্ছে না?
– উঁহু।
– বোর হচ্ছেন?
– উঁহু।
মৌনতা না বোধক মাথা নাড়ল। এরোজ ফের চোখ বুজে মুখ গুঁজল নায়েলের কাঁধে। চোখেমুখে ভরপুর ঘুমের আধিপত্য। মৌনতা একদৃষ্টিতে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল,
– ডু ইউ লাভ হার?
এরোজ বদ্ধ নেত্রে মৃদু হাসল। ফিসফিসিয়ে বলল,
– সো মাচ।
– হোয়াই?
এরোজ আঁকড়ে ধরা দেহটিকে আরো আঁকড়ে ধরে জড়ানো কণ্ঠে বলল,

– তাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম সেদিন তারপ্রতি আমার খুব লোভ জন্মেছিল মৌন। তাকে নিজের করে পাওয়ার খুব লোভ হতো। সে আমার বুকে ঘুমাবে, আমার কাছে আবদার করবে, আমি জুড়ে তার দুনিয়া থাকবে। খুব লোভ হতো… কিন্তু কখনোই ভাবিনি সে কোনোদিন আমার হবে। আজ সে আমার মৌন।
মৌনতা ম্লান হাসল তার আনন্দভরা স্বগতোক্তিতে। শুধাল,
– আর তার প্রতি কেন এত লোভ আপনার?
– কারণ সে আপনার অংশ। আর আপনি জড়িত সবকিছুর প্রতি আমার অদ্ভুত নেশা আর লোভ কাজ করে মৌন।
এরোজ চোখ মেলে তাকালো। ওয়ার্ম লাইটের আলোয় স্পষ্ট নারীটির মায়াভরা মুখটি। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল। তবে এই দৃষ্টিতে আজ আর কোনো জড়তা নেই, সমাজের তৈরি বিদঘুটে নিয়মের ভয় নেই।

– বাইরে যাবেন?
মৌনতা নীরবে মাথা নাড়লো। এরোজ জায়নামাজ ছেড়ে উঠে নায়েলকে বিছানায় শুইয়ে দিল। নামাজ পড়াকালীন সময়ে নায়েল উঠে গিয়েছিল। তাকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে নিজেও জায়নামাজে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
ভোরের আলো তখন বিভূঁইয়ের আকাশে ছেয়ে গিয়েছে। বার্লিংটন আর হ্যামিলটন শহরদুটি ছাড়িয়ে তখন কালো গাড়িটি ওয়াইন কান্ট্রিতে প্রবেশ করে। চারিপাশে অজস্র ফলের বাগান দেখতেই নায়েল জানালা থেকে চেঁচিয়ে উঠল,
– এই ছোট পাপা দেখো কত ফ্রুটস! চলো ফ্রটস তুলতে যাই।
এরোজ ড্রাইভ করতে করতে বলল,
– ফোরার পথে ঢুকব। তখন যত ইচ্ছা ফল নিও।
– ওকে, ওকে।
নায়েল চঞ্চল কণ্ঠে বলেই মায়ের কোলে চুপটি করে বসল। মৌনতা ডুবে আছে কানাডার ভোরের সৌন্দর্য দেখতে। কিয়ৎকালের মাঝেই তারা নায়াগ্রা জলপ্রপাতে পৌঁছে গেল।
মেইড অফ দ্য মিস্ট বোট রাইডে জলপ্রপাতের কাছে যেতেই রেইনকোট পরিহিত মৌনতার লোমকূপ জেগে গেল পানির ক্ষিপ্র গর্জনে। শীতল ক্ষিপ্র স্রোতের হর্সশু ফলসের পানির বেগ এতটাই তীব্র যে রেইনকোট ভেদ করে তারা ভিজে যাচ্ছে।

এরোজ দোদুল্যমান দেহটি লক্ষ্য করে হাত বাড়িয়ে দিল। মৌনতা জলপ্রপাত থেকে দৃষ্টি সরিয়ে হাতের পানে তাকালো। তার প্রতিটি ভয়ার্ত অনুভূতিতে এভাবেই অযথাই এই হাতটি তাকে অভয় দেয়ার জন্য অপেক্ষা করে।
তবে এখন আর এই হাতটিকে ফিরিয়ে দেয়না সে। বরং আঁকড়ে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সুখ পেয়েও হারানোর অনুভূতি আজকাল তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
মৌনতা আঁকড়ে ধরল পুরুষালী হাতটি। এরোজের মুখে হাসি ফুটে উঠল। শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে রুগ্ন দেহটিকে নিজের অবয়বের আড়ালে নিয়ে আসল। স্রোতের ভয়ঙ্কর গর্জনের ভয়টা নিমিষেই হারিয়ে গেল।
জলপ্রপাতের শীতল গর্জনে অন্তরের উত্তপ্ততা কমলো। ফেরার পথে তারা সেন্ট ক্যাথরিনস এলাকার রসালো ফলের বাগানে ঢুকল।
আঙুরের বাগানে ঢুকতেই নায়েল উন্মাদ হয়ে পড়ল। গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়ার স্বাদ আর আনন্দ কতটা সুখময় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এরোজের কাঁখে চড়ে চড়ে সে টেনে টেনে ফল পেড়ে ঝুড়ি ভড়ল। এরপর একে একে রাস্পবেরি, ব্লু বেরি, চেরি, এপ্রিকট সব বাগানে ঢুকে এক ঝুড়ি করে ফল নিয়ে বাড়ি ফিরল।
আর সময় যতই গড়ায় একটু ভালোবাসা আর সম্মানের জন্য কাতর মা-মেয়ে ডুবে যেতে লাগল এক উন্মাদ পুরুষের মোহে। তারা বাঁচতে চায় ওই মানুষটার সান্নিধ্যে। প্রতিটা প্রভাত এভাবেই যেন অজস্র সতেজতার সাথে তাদের জীবনে সুপ্রভাত হয়ে আসে তার প্রার্থণা।

পুরুষ হতে গিয়ে পিতা হতে ভুলে যাওয়া পুরুষরা জানেই না তাদের পুরুষত্ব পরিপূর্ণ-ই হয় ‘পিতা’ নামক এই শব্দটির দ্বারা।
পুরুষালী চাহিদার কাছে যেমন সন্তানের ভালোবাসা হেরে যায়, ঠিক তেমনি জগতের সকল রহমত হেরে যায় ওই অকৃতজ্ঞ হৃদয়ের কাছে—যে ভুলে যায় তার রক্তবিন্দু অন্য একটি জলজ্যান্ত প্রাণ হয়ে তাকেই ‘বাবা’ বলে ডাকছে। সৃষ্টিকর্তার কী বিস্ময়কর মহিমা!
কিন্তু মানুষ কতই না বোকা—যে তারা পায়ে ঠেলে দেয় সৃষ্টিকর্তার এই রহমতকে। ইমরোজ ও ঠিক এমনি এক বোকা মানুষ! যে কি-না সৃষ্টিকর্তার দেয়া জলজ্যান্ত এক রহমতকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে বাবার সুখ, একটা স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিয়েছে।
হতাশার অতলে তলিয়ে যেতে যেতেই যেন হঠাৎ তীর খুঁজে পেল ইমরোজ। একটা সন্তান কতটা রহমতের হয় সেটা তখন বুঝেছিল যখন নায়েল একটু একটু করে তার থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল। তার কলুষিত পুরুষ সত্তার কাছে তার পিতৃত্ব হেরে গিয়েছিল।

আজ চিরতরে নায়েল তার থেকে হারিয়ে গিয়েছে। আর একটামাত্র শুনানি বাকি আছে কোর্টের। যেখানে এটা বলা হবে সে কখন, কী উপলক্ষ্যে নায়েলের সাথে দেখা করতে পারবে এবং তার খরচ বহন করতে পারবে।
তার জন্ম দেয়া সন্তানটির উপর-ই তার সকল অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে দুনিয়া। সেইদিন থেকে অদ্ভুত ব্যথা অনুভব করতে পারছিল ইমরোজ। সব থেকেও কিছু নেই এই শূন্যতা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। কিন্তু আজ সেই ব্যথা আবার কেউ প্রশমিত করে দিচ্ছে। তার বুকের হাহাকার নেভাতে আসছে কেউ। এবার পুরো দুনিয়া এনে দেবে তার পায়ে। কখনো একটুও অবহেলা করবে না, কখনোই তার বুক থেকে হারাতে দেবে না।
এই দৃঢ় সংকল্প আর উল্লাস নিয়ে ইমরোজ নতুন উদ্যমে আবারো কোম্পানি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার সন্তান আসছে—এতটুকুই তার মাঝে আধ্যাত্মিক শক্তির সঞ্চার করছে।
তার তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। তাকে কখনো কষ্ট পেতে দেয়া যাবে না।
বাড়ি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে লোন নিচ্ছে ইমরোজ।
রেস্তোরাঁয় বসে আছে তিনজন ব্যাংক কর্মকর্তা আর ইমরোজ। ইমরোজ বাড়ির দলিলপত্র দিলে তারা পেশাগত গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

– পেপারে কোনো সমস্যা নেই তো?
ইমরোজ বলল,
– নাহ, একদম ঝামেলাহীন আমার সকল কাগজপত্র।
– ওকে, আমরা আজ একটু কাগজগুলো যাচাই করব। সমস্যা থাকলে তো আমরা জানাব আর না থাকলে তো ভালো‌। আপনি কাল দশটার সময় ব্যাংকে যাবেন সকল কাগজপত্র নিয়ে।
ইমরোজ মাথা নেড়ে সায় জানালো। তারা কিছু খাওয়া-দাওয়া করল। মিটিং শেষে ইমরোজ রিসিপশনে বিল মেটাতে গিয়ে গিয়ে মৃদু চমকে গেল। রেস্তোরাঁর অপরপাশে দরজা সংলগ্ন একটি সোফায় সৃজাকে বসে থাকতে দেখে। সে আশ্চর্য হয়ে গেল তার সাথে সানাফকে দেখে। বাড়ি থেকে আসার সময় তো সৃজা বাসায় ছিল। তবে ও এখানে সানাফের সাথে কী করছে?
ইমরোজ সন্দিহান হয়ে পড়ল আবারো। সামান্য একটা সারপ্রাইজ তার ব্রেইন এমনভাবে ওয়াশ করে ফেলেছে—যে সে সৃজাকে করা সন্দেহের জন্য গিল্টি ফিল করছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে অন্ধ বিশ্বাস করে ফেলছে। সে আড়ালে লুকিয়ে গেল। ফোন দিল সৃজাকে।
ইমরোজের ফোন দেখে সৃজা দাঁতে দাঁত চাপল। সানাফ কৌতুহলী হলো,

– কী হলো?
– ইমরোজ ফোন দিচ্ছে।
– রিসিভ করো। আর তো মাত্র দু’টো দিন ওকে সহ্য করতে হবে।
– হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। শেষ মুহূর্তে এসে সমস্যা করা যাবে না।
সে ফোন রিসিভ করল। অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসল নম্র স্বরে এক প্রশ্ন,
– সৃজা তুমি কোথায়?
সৃজা ভড়কে গেল ইমরোজের সরাসরি এমন প্রশ্নে। সন্দিহান হলো অন্তঃস্থল!
– কেন ইমরোজ?
– বলো না কোথায় আছো?
– আমার কোথায় থাকার কথা?
– বাড়িতে।
– আমি বাড়িতেই আছি ইমরোজ।
– ওহ্ আচ্ছা।
– কিছু বলবে?
– নাহ।
ফোন কেটে গেল। সৃজা ভাবুক হলো। সানাফকে বলল,

– ইমরোজ কী আবার সন্দেহ করছে নাকি?
সানাফ আড়মোড়া ভেঙে অলস কণ্ঠে বলল,
– এখন আর সন্দেহ করেও লাভ নেই, জান। যা হওয়ার হয়ে গেছে এবার শুধু ফয়সালার বাকি।
সৃজা হকচকালো।
– কীসের ফয়সালা?
সানাফ স্মিত হেসে বলল,
– তোমার সাথে করা ইমরোজের অপরাধের ফয়সালা। এবার তুমি সুখী হবে আর আমরা করব ওর অপরাধের ফয়সালা।
সৃজা হাসল।
– ইয়াহ। আমরা ওর কথা বাদ দেই। আমার কী ধরণের পোশাক নিতে হবে তাই বলো। ওখানে কী এখন শীত?
– নাহ, ওখানে এখন সামার।
সৃজা খুশি হয়ে গেল।

– ওহ্, তারমানে আমি এখন যেমন ইচ্ছা তেমন ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরতে পারব তাই না?
– একদম। কী খাবে বলো?
– খাবো পড়ে। আগে তুমি দূতাবাসে ফোন দাও। জিজ্ঞেস করো যে কখন আমাদের ভিসা দেবে।
– কাল বিকাল পাঁচটায় ভিসা দেবে।
– আমাদের ফ্লাইট পরশুর পরেরদিন দুপুর বারোটায়।
সৃজার চোখেমুখে মুক্তির উল্লাস। দুনিয়া দেখার উল্লাস। কোনো সম্পর্কের বেড়িবাঁধে সে থাকতে রাজি না। আর সানাফ তাকে এই জায়গা থেকেই স্বাধীনতা দিচ্ছে। সানাফ বাচ্চা কাচ্চাও পছন্দ করে না। সে শুধু একটা চিল, চিন্তামুক্ত, দায়িত্বমুক্ত জীবন পছন্দ করে যেমনটা সে চায়।
সৃজা খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল,
– আই লাভ ইউ জান। আমরা কানাডায় গিয়ে আরো অনেক দেশ ঘুরতে যাব ওকে?
– ওকে। কিন্তু আগে কানডায় সেই পরিমাণে টাকা আমায় ইনকাম ও তো করতে হবে।
সৃজা বাঁকা হেসে বলল,
– চিল, আমার কাছে যত আছে তা দিয়েই আমরা তিনটা দেশ ঘুরতে পারব। তারপরের টা নাহয় পরেই দেখব।
সানাফ অবক হলো।

– সত্যি?
– হুম।
– আচ্ছা, সত্যি করে বলোতো এক সপ্তাহের মধ্যে ভিসার পঞ্চাশ লক্ষ টাকা তুমি কোথায় পেলে?
সৃজা সরব গম্ভীর মুখে বলল,
– আমার জীবনের দীর্ঘ দুই বছর ইমরোজের পেছনে নষ্ট করার জন্য এটা আমার প্রাপ্য ছিল—যেটা আমি ইমরোজের থেকে বুঝে নিয়েছি।
বৈবাহিক সম্পর্কে কোনো অর্থের লেনাদেনা থাকে না। সেখানে থাকে শুধু অনুভূতির লেনাদেনা। অর্থের লেনাদেনা থাকে নিষিদ্ধ গলিতে। সৃজা অচিরেই নিজেকে এমনি এক কলঙ্কিত নারীতে পরিণত করেছে। এবং সে এটাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তার জীবনের এটাই মানে।
কিন্তু সৃজা এবং ইমরোজ দু’জনেই নিজেদের স্বার্থ খুঁজতে গিয়ে আজ বৈবাহিক সম্পর্কটিকে কলুষিত করে দিল। একটা সংসারকে ধ্বংস করে দিল, একটা বাচ্চার জীবন এলোমেলো করে দিল। দু’জনেই সুখের সন্ধানী কিন্তু পথটা ভুল ছিল।
এই ভুলের শাস্তি কী? আমরা ঠুনকো মাটির তৈরি মানুষ কখনোই কাউকে তার প্রাপ্য শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখি না। শাস্তি দেয়ার মালিক আল্লাহ তায়ালা। তার শাস্তির প্রক্রিয়া ভিন্ন, তার দেয়া অনুতাপের তীব্রতা ভিন্ন।
সানাফ দৃষ্টি লুকিয়ে একটা ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলল।
ইমরোজ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে স্ত্রীর প্রতারণা। এত মিথ্যা কেন?

– স্যার, আপনার রিসিটটা!
রিসিপশনিস্টের কথায় ইমরোজ ধ্যানচ্যূত হলো। রিসিটটা নিয়ে খুচরা টাকাগুলো গুনে পকেটে ঢুকিয়ে পুনরায় সৃজার টেবিলের দিকে তাকালে বিচলিত হলো। সোফাটি খালি। সৃজা আর সানাফ কোথায় গেল?
সে ছুটে বের হলো রেস্তোরাঁ থেকে। চারিদিকে খুঁজল কিন্তু কোথাও সৃজা নেই। রাত নয়টা বেজে গেল তখনো সৃজার কোনো খবর নেই। ইমরোজ ঘরময় পায়চারী করছে অস্থির চিত্তে। তন্মধ্যেই তার অস্থিরতাকে নিদারুণ মাত্রা দিল সদ্য বেজে ওঠা কলিং বেলের শব্দ।
সে দরজা খুলে দিল। সৃজা মৃদু হাসল তাকে দেখে।
– তুমি কখন এসেছ?
ইমরোজ তাকে গভীরভাবে অবলোকন করল। একটা মানুষ কিছুক্ষণ পূর্বে মিথ্যা কথা বলেই এত সুন্দর স্বাভাবিকভাবে নির্ভয়ে কীভাবে কথা বলতে পারে?
সে বলল,

– অনেকক্ষণ হয়েছে। কিন্তু তুমি না কি ঘরে ছিলে তবে বাইরে থেকে আসলে যে?
সৃজা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে নির্বিকার বলল,
– হাসপাতালে গিয়েছিলাম। আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে।
তুমি কী জানো বেবির বয়স কত?
ইমরোজ পুনরায় আবেগে বশিভূত হতে লাগল। চোখেমুখে ফুটে উঠল অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতা‌।
– তুমি আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে গিয়েছিলে? বেবির বয়স কত? রিপোর্ট কোথায়?
সৃজা ভীষণ আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যাগ থেকে রিপোর্ট আর আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট বের করে দিল। বেবির বয়স সাত সপ্তাহ। আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টটি চোখের সামনে ধরতেই ইমরোজ মিইয়ে গেল। ওখানেই থমকায় তার সকল সন্দেহ। সে অস্ফুট স্বরে বলল,

– কিছু বোঝা যাচ্ছে না কেন সৃজা?
– এখন কিছুই বোঝা যাবে না। আর কিছু মাস পর বোঝা যাবে। আমায় এক গ্লাস পানি এনে দাও না ইমরোজ। খুব টায়ার্ড লাগছে।
– হ্যাঁ হ্যাঁ দিচ্ছি।
ইমরোজ ছুটে গেল পানি আনতে। সৃজা আরাম করে সোফায় বসে হেসে উঠল তার দৌড় দেখে। বাচ্চার জন্য কতটা উদগ্রীব ইমরোজ। ভাবতেই তার ভেতরে পৈশাচিক আনন্দ বয়ে গেল। সে ঠিক জায়গায় আঘাতটা করছে।
ইমরোজ পানি,শরবত আর সাথে ফল ও কেটে আনলো। উদগ্রীব হয়ে বলল,
– নাও খেয়ে নাও। অনেক হাঁটাহাঁটি পড়েছে ক্লান্ত লাগছে নিশ্চয়ই।
সৃজা হাসিমুখে খেতে খেতে বলল,
– রাতের খাবার কী এনেছ?
– হ্যাঁ, নিয়ে এসেছি।

এখন ইমরোজ বাইরের খাবার ও খুব স্বাচ্ছন্দ্যে খেয়ে নিচ্ছে। তবুও সৃজার উপর কোনো চাপসৃষ্টি করছে না। সৃজা দাঁতে দাঁত চাপল বাচ্চার আগমনে ইমরোজের রূপ বদলাতে দেখে।
সৃজা খেতে ব্যস্ত। ইমরোজ সরু নেত্রে তাকে অবলোকন করতে করতে অন্তঃস্থলের প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজল। বলল,
– তুমি ডাক্তারের কাছে গিয়েছ, আমায় জানাতে পারতে। আমিও সাথে যেতাম।
– তুমি ততক্ষণে বেরিয়ে গিয়েছিলে। আমি আচমকা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
– তবে সানাফের সাথে রেস্তোরাঁয় কী করছিলে?
আচমকাই ইমরোজের প্রশ্নে সৃজা বিষম খেল। অপ্রস্তুত জিজ্ঞাসা করে,
– তুমি কীভাবে জানলে?
– কেন জানাটা উচিৎ হয়নি?
ইমরোজ ম্লান হেসে বলল। সৃজা থতমত খেয়ে বলল,
– তেমনকিছু না আসলে। বের হওয়ার পরে খিদে পেয়েছিল তাই রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলাম। তখনি সানাফের সাথে দেখা হয়ে গেল।
ইমরোজ অন্তর্ভেদি চোখে পরখ করল। শানিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

– তুমি সত্যি বলছ তো সৃজা? সবটা কাকতালীয়?
– তুমি আমার উপর একের পর এক অবিশ্বাস করে যাচ্ছো ইমরোজ। যেখানে আমি আমাদের সন্তান আর তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় আছি। আমাদের কোনো আয়ের উৎস নেই। তুমি সেদিকে খেয়াল না করে আমায় সন্দেহ করছ।
– সন্দেহটা এসে যাচ্ছে সৃজা। কারণ আমি যখন ফোন দিয়েছিলাম তখন আমি রেস্তোরাঁয় ছিলাম। অথচ তুমি আমার চোখের সামনে বসে মিথ্যা কথা বলেছ।
ইমরোজ চোয়াল শক্ত করে বলল। সৃজা ঘেমে উঠল। মনে হচ্ছে এখানে না আসলেই ভালো হতো। একেবারে আজকেই এই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলে ভালো হতো। অন্তত এই নর্দমার কীটের কাছে কৈফিয়ত তো দিতে হতো না।
সে কৃত্রিম হেসে বলল,

– তুমি তো আমায় বাইরে বের হতে বারণ করেছিলে। ভেবেছিলাম তুমি আমায় বকবে তাই মিথ্যা বলেছিলাম ইমরোজ। কিন্তু আমি আমার সন্তানের অস্তিত্ব দেখার জন্য উদগ্রীব ছিলাম। তাই না বলেই চলে গিয়েছি‌। নিজের সন্তানকে দেখতে চাওয়া কী আমার অপরাধ হয়ে গিয়েছে?
ইমরোজ উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল। আর তর্ক করার যুক্তি পেল না। বলল,
– না ঠিক করেছ। কিন্তু আমায় মিথ্যা বলে ঠিক করোনি। এইটুকু সময়ের মাঝে আমি কত বাজে বাজে চিন্তা করে ফেলেছি তা তোমার ধারণা নেই সৃজা। প্লীজ আমার বিশ্বাস ভেঙো না।
ইমরোজের অনুনয়ভরা কাতর চোখে চোখে চোখ রাখল সৃজা। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
– আমাকে নিজের মতো মনে করেছ ইমরোজ?
– মানে?
– কিছু না।
বলেই সৃজা উঠে দাঁড়ালো। উপরে যেতে যেতে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
– আমায় নিজের মতো বোকা ভেবো না ইমরোজ। কারণ আমি তোমার থেকে কয়ধাপ এগিয়ে। আজ থেকে এই কাজ করছি না!
বলেই সে নিজের ঘরে ঢুকল। ইমরোজ ঘুমালে রাতে প্যাকিং করে কাল বেরিয়ে যেতে হবে। রাতের খাবার খেয়েদেয়ে ঘুমাতে গেলে রোজকার ন্যায় ইমরোজ তাকে কাছে টানতে চাইল। এবং রোজকার ন্যায় সৃজা বাঁধা দিল। সে থমথমে মুখে বলল,

– ডাক্তার বলেছে এখন দূরত্ব বজায় রাখতে ইমরোজ। বেবির ক্ষতি হবে।
ইমরোজ অসন্তুষ্ট হলো। বেশ কিছুদিন যাবৎ সৃজা তার থেকে এভাবেই দূরে দূরে থাকছে। কিন্তু আজ বাচ্চার কথা ভেবেই আর তর্কে জড়াল না। এমনিতেই চোখ অস্বাভাবিক ঘুমে ভার হয়ে আসছে। সে মেজাজ খারাপ করে শুয়ে পড়ল। মিনিটের মাঝে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। দশ মিনিট বাদে সৃজা হাঁফ ছেড়ে বিছানা থেকে নামল। তড়িঘড়ি করে সকল দামী দামী জিনিসপত্র আর গহনা গুছিয়ে নিয়ে ব্যাগ অন্য ঘরে তালা মেরে রাখল।
এরপর পুরো ঘরময় চোখ বুলিয়ে হাঁফ ছাড়ল। আর কিছু নেই নেয়ার মতো। এবার তার ছুটি এই কারাবন্দী জীবন থেকে।
সকাল দশটা নাগাদ ঘুম ভাঙতেই ইমরোজ এক প্রকার ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তার ব্যাংকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এত ঘুমালো কী করে জানা নেই।
ইমরোজ বেরিয়ে যেতেই সৃজা বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। পরিস্থিতি যতক্ষণে হাতের নাগালের বাইরে যাবে ততক্ষণে সে এই মুলুক ছেড়ে চলে যাবে।

ইমরোজ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে ব্যাংকে পা রাখল। কিন্তু আজ পরিবেশটা একদম ভিন্ন। গতকাল যে কর্মকর্তারা তাকে হাসিমুখে আপ্যায়ন করেছিল, আজ তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি ও অবজ্ঞা। কেউ তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না, উল্টো অহেতুক ফাইল এদিক-সেদিক করে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে।
অপমানে ফুঁসতে থাকা ইমরোজ শেষ পর্যন্ত কোনোমতে ম্যানেজারের কক্ষে ঢোকার সুযোগ পেল। ভেতরে ঢুকেই সে ক্ষোভ মেশানো কণ্ঠে বলল,
– স্যার, সমস্যাটা আসলে কোথায়? বাইরে কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিলেন আমাকে লোন দেওয়া হবে না। ঠিক আছে, ব্যাংকের নিয়ম থাকলে লোন না-ও দিতে পারেন, সেটা আমি মেনে নিলাম। কিন্তু একজন গ্রাহকের সঙ্গে তারা এমন অসভ্য আচরণ করার দুঃসাহস পায় কী করে?
ম্যানেজার চশমার ওপর দিয়ে ক্রুব্ধ চোখে ইমরোজের দিকে তাকালেন। হাতের কলমটা সশব্দে টেবিলে রেখে কড়া গলায় বললেন,
– তারা যেটা করেছে, একদম ঠিক করেছে। বরং তারা যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। আপনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আমাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করেছেন। ভালো পোশাক পরলেই যে মানুষ ভদ্রলোক হয় না—আজ তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। আপনার মতো শিক্ষিত এবং সচ্ছল পরিবারের একজনের থেকে আমরা এমন প্রতারণা আশা করিনি, মিস্টার ইমরোজ। জালিয়াতির দায়ে আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে না দিয়ে যে শুধু বের করে দিচ্ছি, এটাই আপনার ভাগ্য।”
ইমরোজ হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল। বলল,

– কিন্তু স্যার, আমি করেছিটা কী? আমার অপরাধ কী?
ইমরোজের ‘নিষ্পাপ’ ভঙ্গি দেখে ম্যানেজারের রাগ যেন সপ্তমে চড়ল। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন,
– “নাটক বন্ধ করুন! যে সম্পত্তি আপনি সপ্তাহ খানেক আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন, সেই সম্পত্তির মূল দলিল গোপন করে আপনি ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ব্যাংক থেকে লোন নিতে চেয়েছেন। এটাকে সরাসরি ফিন্যান্সিয়াল ফ্রড বলা হয়। আপনার সাহস তো কম নয়!”
ইমরোজের পায়ের তলার জমিন যেন মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
– স্যার, এটা অসম্ভব! আপনাকে কেউ ভুল তথ্য দিয়েছে। আমি আমার কষ্টের কেনা একমাত্র সম্বল বিক্রি করব কেন? আর ওই কাগজগুলো শতভাগ জেনুইন। আমি কোনো জালিয়াতি করিনি।”
ম্যানেজার এবার একটি ফাইল তার দিকে ঠেলে দিলেন।
– “আমাদের ইনভেস্টিগেশন টিম অলরেডি ল্যান্ড অফিস থেকে ভেরিফিকেশন রিপোর্ট নিয়ে এসেছে। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে সম্পত্তিটি হস্তান্তরিত হয়ে গেছে। এমনকি সেই দালালের স্বীকারোক্তিও আমাদের কাছে আছে, যার মাধ্যমে আপনি দেড় কোটি টাকায় ডিলটি ক্লোজ করেছেন।”
ইমরোজ স্তব্ধ হয়ে গেল। তার প্রায় দুই কোটি টাকার বিলাসবহুল বাড়ি সে দেড় কোটি টাকায় বিক্রি করে দেবে কেন? আর দিলেও সেটা সে নিজেও জানে না? সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বলল,

– স্যার, আমি লোন নিতে এসেছি বাড়ি রক্ষার জন্য, বিক্রির জন্য নয়! দয়া করে ওই লোকটিকে ডাকুন। কার কথা বলছেন আপনি? আমি তার মুখোমুখি হতে চাই। এই সব মিথ্যা।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ম্যানেজার নিজেই সেই দালালকে তলব করলেন। আধঘণ্টার মাথায় কক্ষে প্রবেশ করল মধ্যবয়সী এক লোক। ইমরোজকে দেখতেই তার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। লোকটিকে দেখেই ইমরোজের রক্ত মাথায় চড়ে গেল।
– এই যে মিস্টার! আপনি কে? জীবনে কোনোদিন আপনার মুখ দেখিনি আমি। আপনি কোন সাহসে বলছেন আমি আপনার কাছে বাড়ি বিক্রি করেছি?”
লোকটি প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও সামলে নিলো। ভয় না পেয়ে সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্কশ গলায় বলল,
– “স্যার, আপনি আমার সাথে রাগ দেখাচ্ছেন কেন? আপনার স্ত্রী নিজেই তো আমার অফিসে গিয়ে বারবার অনুরোধ করেছেন যেন এক সপ্তাহের মধ্যে বাড়িটা বিক্রি করে দেই। তিনি বলেছিলেন, আপনি ব্যবসায়িক বড় বিপদে পড়েছেন, আপনার ইমিডিয়েট নগদ টাকার দরকার।”
ইমরোজের মস্তিষ্কে যেন একের পর এক বজ্রপাত হচ্ছিল। সে ক্ষিপ্র বেগে লোকটির কলার চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল,

– মিথ্যে কথা! আমার স্ত্রী আমায় না জানিয়ে কেন এত বড় কাজ করবে?
দালালটি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
– “সত্যিটাই বলছি। আপনি তখন অসুস্থ ছিলেন, বাসায় রেস্টে ছিলেন। তাই তো আপনার স্ত্রী স্বাক্ষর করা পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি আর মূল দলিলে আপনার সাক্ষর নিয়ে এসেছিলেন। আমি তো নিয়ম মেনেই কাজ করেছি। দেড় কোটি টাকা আমি নগদ বুঝিয়ে দিয়েছি আপনার স্ত্রীকে। বিশ্বাস না হলে বাড়িতে গিয়ে আপনার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেই পারেন!
ইমরোজের হাত শিথিল হয়ে এল। ম্যানেজারের ঘরের এসি রুমেও সে দরদর করে ঘামতে লাগল। সে এক মুহুর্ত বিলম্ব না করে ছুটে বেরিয়ে গেল ব্যাংক থেকে।
উদ্ভ্রান্তের মতো বাড়ি ফিরতেই সারা বাড়ি শূন্য পেল। ইমরোজ পাগলা ঘোড়ার ন্যায় দোতালায় নিজের ঘরে গেল। সব খালি। কাবার্ড সহ রুমে সৃজার একটা জিনিসপত্র ও নেই।
ইমরোজ ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। চোখের সামনে থেকে একটু একটু করে যেন সামিয়ানা সরতে লাগল। একের পর এক লুকোচুরি , এডাল্ট বার্থডে পার্টি, আকস্মিক প্রেগনেন্সিরর সারপ্রাইজ, গত এক সপ্তাহ ধরে তাকে অতিরিক্ত যত্ন করে খাবার খাওয়ানো, খাওয়ার সাথে সাথেই ঘুমে চোখ ভারী হয়ে যাওয়া যেন একটু একটু করে পরিষ্কার হতে লাগল।

সেই মায়াবী হাসি আর সেবার আড়ালে যে এমন এক বিষাক্ত বিশ্বাসঘাতকতা লুকিয়ে ছিল—তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। বাড়ির দলিলে তার স্বাক্ষরগুলো তাহলে নেশার ঘোরে নেওয়া হয়েছিল? ইমরোজের সামনে এখন কেবল অন্ধকার, আর একরাশ অনিশ্চয়তা।
সে অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করে উঠল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (২)

– না না, এসব কিছু মিথ্যা। এটা হতেই পারে না। সৃজা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না।
সে পুনরায় উঠে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়। কিন্তু পুনরায় তার হাঁটু ভাঁজ হয়ে গেল বলহীনতায়। বিছানার উপর রাখা পেপারটি হাতে নিতেই তার দেহ ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল। সে আঁকড়ে ধরল খাটের কোনা।
ডিভোর্স পেপার! যেখানে জ্বলজ্বল করছে সৃজার সাক্ষর।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here