Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৩
তোনিমা খান

– পিক আপ দ্য ফোন সৃজা, পিক আপ দ্য ফোন। কিছুক্ষণ পূর্বেও আমরা একসাথে ছিলাম। মুহুর্তেই সবটা শেষ হয়ে যেতে পারে না। আমরা একসাথে পথচলার জন্য হাত ধরেছিলাম।
আজ বাতাবরণে কেবল যন্ত্রণা, হাহাকার, আর্তনাদ, অবিশ্বাসের ছড়াছড়ি। পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য অনুভূতি হলো প্রিয়জনের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার স্বীকার হওয়া। আমরা যাকে অন্ধের মতো ভালোবাসি তারা আমাদের খুব যত্ন সহকারে অন্ধই প্রমাণ করে দেয়। ফারাক শুধু সময়ের।
আট মাস পূর্বে মৌনতা তার অন্ধত্বের সাজা পেয়েছিল আর আজ ইমরোজ পাচ্ছে! দু’জনেই অপরাধী! অতিরিক্ত বিশ্বাস, ভক্তি, ভালোবাসা কখনোই সুফল বয়ে আনে না।
মৌনতা একদিন ভীষণ আক্ষেপ নিয়ে বলেছিল,

– দেহে জ্বলন্ত রড রাখলে যতটা যন্ত্রণা হয় তার থেকেও বেশি যন্ত্রণা হয় যখন প্রিয়জন বিশ্বাসঘাতকতা করে।
সেদিন মৌনতার কথার মানে বোঝেনি ইমরোজ কিন্তু আজ মনে হচ্ছে মৌনতা মিথ্যা বলেছিল। কেননা জ্বলন্ত রড যদি তার গায়ে কেউ স্পর্শ করত তবুও তার এতটা কষ্ট হতো না, যতটা কষ্ট এখন তার হচ্ছে‌। ডিভোর্স পেপারটির অন্য পাশে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইমরোজ। যেখানে জ্বলজ্বল করছে তার নিজের করা স্বাক্ষর। তার স্ত্রী! যাকে ভালোবেসে সে পুরো জগত ছেড়েছে, পরিবারের সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে—সেই স্ত্রী নিদারুণ নিখুঁত অভিনয় করে তার সব কেড়ে নিতে পারে না‌। এটা অসম্ভব !
ফোন ঢুকছেই না। অথচ ইমরোজ এক হাতে ডিভোর্স পেপার নিয়ে আরেকহাতে অস্থিরচিত্তে বিকারগ্রস্ত এক মানুষের ন্যায় ফোন দিয়েই যাচ্ছে। ব্যর্থ হতে হতে একটা সময় ইমরোজ রাগে ফোনটা সজোরে আছাড় মারল মেঝেতে। শব্দ করে কেঁদে উঠে আর্তনাদের সুরে বলল,

– এটা হতেই পারে না। সৃজা আমার সাথে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা কী করে করতে পারে? আমি ওর জন্য কী না করেছি? নিজের স্ত্রী সন্তানের জন্য আমার আয়ের সবচেয়ে বেশি অংশ আমি ওর উপর খরচ করেছি। তবে ও কেন আমায় ছেড়ে যাবে? কেন আমার শেষ সম্বলটুকু ও ছিনিয়ে নিলো?
ইমরোজের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সৃজাকে নিজের পাওয়ার অফ এটর্নি করা। তার অবর্তমানে তার সকল সম্পত্তি, বিজনেসের উপর সৃজার অগ্রাধিকার থাকবে। আর এটাই তাকে আজ নিঃস্ব করে দিয়েছে।
কিন্তু ব্যথাটা সেখানেও নয়। ব্যথাটা হলো তার সন্তান।
তার বাচ্চাকে তার থেকে কেড়ে নিতে পারে না সৃজা। সে তার শেষ সম্বলটুকু হারিয়েও যতটা না উন্মাদ হয়ে পড়েছে তার থেকেও বেশি উন্মাদ হয়ে পড়েছে তার বাচ্চার জন্য। তার কৈফিয়ত চাই সবকিছুর।
বিকট শব্দে একটি কাবার্ড ঘরের বাইরে রাখতেই ইমরোজ নড়েচড়ে উঠল। কিয়ৎকাল পূর্বেই আগত বাড়ির নতুন মালিক এবার রেগে গিয়ে বলল,

– আজ বাড়ি সম্পূর্ণটা হস্তান্তর করার কথা ছিল মিঃ ইমরোজ। আপনি কী আপনার জিনিসপত্র নিয়ে বের হবেন নাকি আমি সব নিজ দায়িত্বে বের করব? আমি বের করলে বিষয়টা কিন্তু ভালো হবে না।
ইমরোজ লোকটির কথার কোনোরূপ ভ্রুক্ষেপ করল না। যার সব শেষ তাকে সামান্য ফার্নিচারের দোহাই দিয়ে তাকে বিচলিত করা সম্ভব নয়। বিধ্বস্ত, বলহীন দেহে ইমরোজ দুলতে দুলতে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। সোজা এসে হাজির হলো সৃজার বাড়িতে। ঘরে তালা।
প্রতিবেশী তাকে দেখে বলল,
– আপনার শাশুড়ি আর তার মেয়ে তো গতকালকে বলেছিল তারা বিদেশে যাচ্ছে চিরতরে। গতকাল রাতেই তো আপনার শাশুড়ি ঘরের সব মালামাল বিক্রি করে দিয়ে ব্যাগপত্র নিয়ে কোথায় যেন চলে গেল। আপনি এখানে কেন? আপনি কিছু জানেন না?
নিঃস্ব ইমরোজ জবাব দেয়ার পরিস্থিতিতে নেই। সে সোজা দরজা ভাঙার চেষ্টা করল। বহুকষ্টে দরজা ভেঙে ঢুকে পুরো ঘর এলোমেলো করতে লাগল। কিন্তু তাকে সাহায্য করতে পারবে এমন কিছুই ছিল না সেখানে। তবে যা ছিল সেটা তার দ্বিতীয়বার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি কেড়ে নিয়েছিল। দরজার বাইরে ময়লাওয়ালার জন্য রেখে যাওয়া একটি বক্সের ভেতর অনেক অপ্রয়োজনীয় পুরোনো ফাইল কাগজ দেখতে পেল ইমরোজ। সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সেগুলো হাতাতে লাগল। হাতে হাতেই বেরিয়ে আসে এক একটা লুকানো ঘৃণ্য খেলার প্রমাণ।
কখনো সৃজা, কখনো জেবা, কখনো নিশা নামে একাধিক বিয়ের কাবিননামা, ডিভোর্স পেপার, ফেইক প্রেগনেন্সি রিপোর্ট, ফেইক পাসপোর্ট সহ আরো কত কী! নাম ভিন্ন হলেও প্রতিটাতে ছবি ছিল সৃজার। ইমরোজ স্তব্ধ চিত্তে সবটা দেখতে লাগল। অনুভব হতে লাগল, সে একজন পাক্কা খেলোয়াড়ের হাতে ব্যবহৃত হয়েছে। একজন সুপরিকল্পিত অপরাধীর নতুন অপরাধের বস্তু মাত্র!
ইমরোজের চোখের সামনে ধোঁয়াশা হয়ে আসল যখন সে পাঁচ বছর আগের একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট হাতে পেল। তাতে স্পষ্ট লেখা সৃজা কখনোই মা হতে পারবে না। ইমরোজের স্নায়ু আর এই অসহ্য চাপ নিতে পারল না। শেষ পর্যন্ত তার সন্তানের প্রতি তীব্র বাসনাকেও সৃজা তার ঘৃণ্য কর্মের অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে?

– সবটা নাটক ছিল? প্রায় আড়াই বছর যাবৎ সৃজা এতটা নিখুঁতভাবে অভিনয় করে গিয়েছে আমার সাথে? আমাদের ভালোবাসা, বিয়ে, বাচ্চা সবটা নাটক ছিল? আমার বাচ্চা হবে না? আমি সব হারিয়ে ফেলেছি। আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে স..সৃ..জা।
অচিরেই সর্বহারা ঘেমে ওঠা পুরুষালী দেহটি বিড়বিড় করতে করতে চেতনা হারালো। ইমরোজের বিধ্বস্ত দেহটি ধপ করে মেঝেতে ঢলে পড়ল। বদ্ধ চেখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা যন্ত্রণাদায়ক অশ্রু। তার বেঁচে থাকার সব কারণ ছিনিয়ে নিলো সৃজা। এখন সে বাঁচবে কী করে? চেতনা হারাতে হারাতে ইমরোজের মস্তিষ্কে উল্টেপাল্টে গেল অজস্র স্মৃতি। এবং যেখানে মাত্রই অনুভব করল তার জীবনের আফসোসের পাল্লায় মৌনতা আর নায়েল বহু আগেই স্মৃতি হয়ে এঁটে গিয়েছে। সে একটি ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত নারীর মোহে পুরো জগত হারিয়ে ফেলেছে।
এই আফসোস কাকে বলবে? কোন মুখে বলবে? এতটুকু ভাবতেই ইমরোজের মস্তিষ্কের প্রতিটা স্নায়ু মুহুর্তেই নিঃসাড় হয়ে গেল। অতঃপর টাইলসের মেঝেতে অনাদরে পড়ে রইল একটি অমানুষ, দুশ্চরিত্র, বিশ্বাসঘাতক, নিকৃষ্ট পিতৃত্বের অধিকারী বিধ্বস্ত, নিঃস্ব একটি দেহ। এগুলো ছাড়া তার আর কোনো পরিচয় নেই। কে বলেছে কর্মফল প্রত্যাবর্তন করে না? কর্মের ফল সর্বদা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে। ভালো কাজ করলে ভালো ফল আসে, খারাপ কাজ করলে খারাপ ফল আসে।

কিন্তু ইমরোজ? ইমরোজ তো দু’টো জীবনকে মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটা শিশুর স্বাভাবিক শৈশব কেড়ে নিয়েছে। তার শাস্তির পরিমাপ কতটুকু যথার্থ? এগুলো খুব ক্ষুদ্র ফলাফল ছিল তার কৃতকর্মের। ইমরোজকে দেয়া কোনো শাস্তিই মৌনতাকে কখনোই একটা স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেবে না, কোনোকিছুই নায়েলের বাবা আর তার সুন্দর স্বাভাবিক শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারবে না। জন্মদাতা তো জন্মদাতাই হয়। কিন্তু জন্মদাতা বেঁচে থাকতে অন্য কারোর থেকে বাবার আদর পাওয়া আদোতে কতটা কষ্টকর সেটা কী কেউ বোঝে? বোঝে নাহ।
আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ ব্যস্ত জীবনে একবার হলেও নিজের কর্মের দিকে ফিরে তাকানো। আমি কী করছি? কেন করছি? এতে কী কারোর ক্ষতি আছে কি-না?
এগুলো একবার হলেও ভাবা উচিৎ। কেননা যখন খারাপ ভালো ভাবার সময় ফুরিয়ে যাবে তখন বিদঘুটে ফল গ্রহণ করা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। তখন ঠিক এমনি ইমরোজের মতো আফসোসে জর্জরিত একটি বিধ্বস্ত নিঃস্ব পথিকের ন্যায় আর্তনাদ করতে হবে।

সৃজার রুজিরোজগারের একমাত্র উপায়ই হলো তার নিখুঁত অভিনয়। সে যত ভালো অভিনয় করতে পারবে তার জীবন তত সহজ আর আভিজাত্যময় হবে। নয়তো এই যুগে এসে বাপ মরা একটা মেয়ের জন্য এমন লাক্সারি লাইফ কাটানো দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকত। সৃজা কোনোভাবেই বস্তির মেয়েদের মতো জীবনযাপন করতে রাজী নয়। তার জন্য তাকে যা করতে হয় সে করবে।
ঠিক এমনি এক জেদের বশে আজ বারো বছর যাবৎ সে হাই সোসাইটির মানুষদের মতো চলাফেরা করে আসছে। চাওয়া মাত্র নিজের চাহিদা পূরণ করে আসছে‌। কিন্তু আর কত? সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সময় দেয় সঠিক পথে ফিরে আসার জন্য। কিন্তু সেই সময়টুকুর সৎ ব্যবহার ক’জন মানুষই বা করতে জানে! নির্বোধ মানুষ!
বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন বুনতে বুনতে দু’দিন স্বপ্নের মতো করেই এক নিমিষে কেটে গেল। হোটেল রুম থেকে বের হওয়ার আগ মুহূর্তে উল্লাসে মত্ত সৃজা আবেদনময়ী বদনে এগিয়ে যায় সানাফের কাছে। আলগোছে সানাফের পায়ের উপর পা রেখে গলা জড়িয়ে ধরতেই সানাফ হকচকিয়ে দূরে সরতে গেল, কিন্তু সৃজা আঁটকে দিল। হুট করে বিমর্ষ মুখে বলল,

– সবসময় আমার থেকে দূরে সরে যাও কেন, সানাফ?
সানাফ অপ্রস্তুত হেসে বলল,
– আমি তোমায় আর তোমার ভালোবাসা দুটোই হালালভাবে পেতে চাই, সৃজা। আর তো কিছু ঘন্টা! তারপর আমরা একসাথে নতুন জীবনে পা দেব। তখন আর কোনো বাঁধা থাকবে না।
সৃজা বিমুগ্ধ চিত্তে শুধু চেয়ে রইল। একটা মানুষ প্রায় চারমাস যাবৎ তাকে নিরলসভাবে ভালোবেসে গিয়েছে। তার সকল দুঃখ দূর করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট হয়ে থাকে। অথচ পরিবর্তে কখনো কিচ্ছু চায়নি। সৃজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেক তো হলো রোজগার। এবার যত টাকা সে জমিয়েছে তাতে অনায়াসে দুই তিন বছর কাটিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এই মানুষটাকে সে আর হারাতে চায় না। জীবনে একজন বিশ্বস্ত, সরল, সাপোর্টিভ জীবনসঙ্গী থাকা খুব প্রয়োজন। সে ঠিক করল আর কোনো অপরাধ নয়। সানাফের সাথেই সে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে।‌
সে আরো দৃঢ়ভাবে গলা জড়িয়ে ধরল। মৃদু হেসে ক্ষীণ স্বরে বলল,

– তুমি অনেক ভালো সানাফ। আর কিছু ঘন্টা! এরপর আমরা হালালভাবে একে অপরের হবো এবং যত ঝড় ঝাপটাই আসুক না কেন আমরা তা একসাথে মোকাবেলা করব। আর একসাথে একটা দীর্ঘ জীবন কাটাব।
সানাফ জবাব দিল না শুধু মৃদু হাসল। সৃজা ফের বলল,
– কী হলো কিছু বলছ না কেন? আগামী প্রতিটা মুহুর্ত তুমি আমার দোষত্রুটি উপেক্ষা করে আমার সাথে থাকবে তো?
– থাকব।
সানাফ মাথা নেড়ে বলল। সৃজা গাল ভরে হেসে বলল,
– চলো তবে। আগে আগে এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে। নয়তো দেরি হয়ে যাবে।
– হ্যাঁ, চলো।
বলেই সানাফ নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে বের হলো। সৃজা আর তার মাও বের হলো অন্য রুম থেকে। তারা গত পোরশু দিন ঢাকায় চলে এসেছিল সকল প্রকার যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট করে। আর কিছুক্ষণ এরপর চাইলেও কেউ তাকে হাতের নাগালে পাবে না। সৃজা বাঁকা হেসে সানাফের হাত আঁকড়ে ধরল। সানাফ এক ঝলক তার বিজয়ী হাসি দেখে নিজেও হাসল। তবে সেই হাসিতে ছিল বিদ্রূপ! তা খেয়াল করল না সৃজা।
সকাল সাড়ে নয়টা নাগাদ সানাফ, সৃজা আর তার ইমিগ্রেশনের জন্য ঢুকলো। পড়নে সাদা জ্যাকেট, কালো টুপি, মাস্ক আর কালো চশমার আড়ালে সানাফকে কেমন চেনাই যাচ্ছেনা।
সৃজা কপাল কুঁচকে বলল,

– তুমি এমন ডাকাতের মতো নিজেকে হাইড করছ কেন?
সানাফ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
– আমি সবসময় এভাবেই ট্রাভেল করি। অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।
ভীড় কম ছিল তখন। সৃজা আর সৃজার মাকে ইমিগ্রেশনে দাঁড় করিয়ে দিল সানাফ। তখুনি সানাফের একটা ফোন আসল।
সানাফ ব্যস্ত ভঙ্গিতে সৃজাকে বলল,
– সৃজা, আমার একটা জরুরী কল এসেছে। আমি একটু কথা বলে আসি।
– কিন্তু তোমার ইমিগ্রেশন?
সৃজা বিচলিত কণ্ঠে বলল। সানাফ চলতে চলতে পিছু ফিরে বলল,
– মাত্র পাঁচ মিনিট, আমি আসছি।‌ তোমরা এগিয়ে যাও।

সৃজা এর আগে একবার ইন্ডিয়াতে গিয়েছিল। কিন্তু তখনো তার কাগজের সমস্যা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল যদিও তখন তার সঙ্গী ছিল একজন ক্ষমতাধর লোক। যে সেটা সমাধান করে দিয়েছিল। এরপরে আর কখনোই দেশের বাইরে কোথাও যায়নি। সে দুরুদুরু বুকে পাসপোর্ট এগিয়ে দিল। সানাফ তো বলেছে তার কাগজপত্রে এখন আর কোনো সমস্যা নেই। ইমিগ্রেশনে দায়িত্বরত লোকটি পাসপোর্টি দেখে খানিক ভ্রু কুচকালো। অফিসারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পাসপোর্টের পাতায় আঁটকে আছে দেখে সৃজার বুকের ভেতরটা হঠাৎ হিম হয়ে এল। অফিসার একবার পাসপোর্টের দিকে তাকাচ্ছেন, আরেকবার কম্পিউটারের স্ক্রিনে কিছু একটা মিলিয়ে নিচ্ছেন। সৃজা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে সানাফকে খুঁজল, কিন্তু সানাফকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ভিড়ের মধ্যে যেন সে কর্পূরের মতো মিলিয়ে গিয়েছে।
অফিসার পাশে বসা আরেকজন সহকর্মীকে ইশারায় ডাকলেন। তারা নিচু স্বরে কিছু একটা আলোচনা করে সৃজাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– “আপনার এই ভিসাটি কোন সোর্স থেকে করা?”
সৃজা আমতা আমতা করে বলল,
– “কেন স্যার? কোনো সমস্যা? আমার হবু স্বামী একটা প্রসিদ্ধ এজেন্ট দ্বারা ভিসাটি করিয়েছে।
অফিসার কোনো জবাব দিলেন না। তিনি সৃজার মায়ের ভিসা আর পাসপোর্ট ও চেক করলেন। অতঃপর নীরবে ডেস্কের নিচের একটি বিশেষ বাটন চাপলেন। মুহূর্তের মধ্যেই চারজন ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্য সেখানে এসে দাঁড়ালেন। সৃজা ঘাবড়ে গেল। ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে থাকা অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন,
– আপনার এই ভিসাটি ভুয়া। আমাদের ডিজিটাল ভেরিফিকেশন সিস্টেমে এই বারকোড এবং সিকিউরিটি ফিচারের কোনো অস্তিত্ব নেই। এছাড়া আপনার পাসপোর্টটি একটি বিশেষ ব্ল্যাকলিস্টেড ডাটাবেসের সাথে ম্যাচ করছে। দয়া করে আমাদের সাথে ইনভেস্টিগেশন রুমে চলুন।
সৃজার মা পাশ থেকে চিৎকার করে উঠলেন,

– এগুলো কী বলছেন আপনারা? আমরা তো প্রয়োজনের অধিক টাকা দিয়ে আমাদের ভিসা করিয়েছি!
পুলিশ অফিসার রুক্ষ স্বরে বলল,
– কীভাবে হয়েছে, কেন হয়েছে সেটা তো আমরা বের করেই ফেলব। আপনারা আগে চলুন।
সৃজার হাত পা কাঁপতে শুরু করল। চোখমুখ শুকিয়ে কালো বর্ণ ধারণ করছে আতঙ্কে। সানাফ কোথায়? সে অস্থির চিত্তে এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগল সানাফকে। সে আতঙ্কিত কণ্ঠে পুলিশ অফিসারদের অনুনয় করে বলল,
– স্যার, আমার হবু হাজব্যান্ড আমাদের সাথেই যাচ্ছে। আপনি ওর সাথে কথা বলুন। আমরা কোনোরকম জালিয়াতি করে যাওয়ার চেষ্টা করছি না।
সহসা পুলিশ অফিসার গর্জে উঠল,
– চুপ করুন। সবার একই বয়ান থাকে। কেউই ধরা পড়ার পর স্বীকার করে না যে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে জালিয়াতি করেছে।
তন্মধ্যে দু’জন লেডি কনস্টেবল এসে হাজির হলো। অফিসার তাদের আদেশ করল,

– দু’জনকে নিয়ে চলুন।
– স্যার, প্লীজ আমার কথা শুনুন। আমরা কোনো অপরাধী নই। এখানে হয়তো কোনো ভুল হচ্ছে।
সৃজার অজস্র অনুনয় বিনয় কোনো কাজেই আসল না। দু’জন কনস্টেবল তাদের টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল।
ইনভেস্টিগেশন রুমে নিয়ে যাওয়ার সময় সৃজার ভয়ার্ত দৃষ্টি হঠাৎ করেই আঁটকে যায় কাঁচের দেয়ালে অপরপ্রান্তে। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে সানাফ সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে কোনো ফোন নেই। সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে খুব শান্ত ভঙ্গিতে সৃজার দিকে তাকিয়ে আছে। সৃজা থমকে গিয়ে দেখল, সানাফের মুখে সেই চেনা সরল ভালোবাসা নেই, বরং সেখানে এক ভয়াবহ বিদ্রূপাত্মক হাসি। সানাফ ঠোঁট নেড়ে নিঃশব্দে শুধু উচ্চারণ করল “চেকমেট”।
সৃজা দূর থেকেই তার ঠোঁটের কারুকার্যে স্পষ্টত সেই বিশ্বাসঘাতকতার শব্দটি অনুধাবন করতে পারল। তার পায়ের তলার জমিন খিঁচে গেল। অনুভব করল, জীবনে প্রথমবার স্বার্থপরতা ভুলে কাউকে বিশ্বাস করাটা ছিল তার সবচেয়ে বড় ভুল।
কিন্তু সৃজা তখনো যেন বিশ্বাসই করতে চাইছে না চোখের পলকে নিজের এমন ধ্বংস! এটা ভ্রম! সে ছটফট করে উঠল। কনস্টেবলের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে করতে অদূরে বসে চেঁচিয়ে বলল,

– সানাফ! সানাফ তুমি এটা করতে পারো না। আমি তোমায় ভালোবেসে ছিলাম সানাফ। আমি তোমায় নিজের সবটা দিয়ে বিশ্বাস করেছি। তুমি আমায় ধোঁকা দিতে পারো না। প্লীজ সানাফ আমায় বাঁচাও। তুমি কেন আমার সাথে এমনটা করছ? আমি কী ক্ষতি করেছি তোমার?
সানাফ নির্বাক ইস্পাতের ন্যায় কঠিন অবয়বে দাঁড়িয়ে আছে। সৃজার শেষ বারের অশ্রুসিক্ত চোখে ফিরে তাকালো। কিন্তু সানাফের কোনো দয়া হলো না তার উপর।
দীর্ঘ এক ঘন্টার ইনভেস্টিগেশনেও যখন কোনো সুরাহা মিলল না তখন সপাটে একটা চড় পড়ল সৃজার গালে। পুলিশ অফিসার চেয়ারের হাতলে সশব্দে হাত চাপড়ে হিসহিসিয়ে বলল,
– সত্যি কথা বলুন। আপনার পরিকল্পনা কী ছিল?
সৃজা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

– আমার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আমার ফিয়ন্সে আমায় ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁসিয়েছে স্যার। ও আমার থেকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা নিয়েছে আমার ভিসা করানোর জন্য। যেন ভিসায় কোনো সমস্যা না হয়। কিন্তু ও আমার থেকে বেশি টাকা নিয়ে ভুয়া একটি ভিসা বানিয়ে দিয়েছে। যাতে আমায় পুলিশ গ্রেফতার করে। আপনি ওকে খুঁজে বের করুন। ও এই এয়ারপোর্টেই আছে। প্লীজ স্যার, বিলিভ মি। ওকে খুঁজে পেলেই আপনি সব প্রশ্নের জবাব পাবেন।
সৃজা অনুনয় করে বলল। পুলিশ অফিসার মৃদু হেসে বলল,
– কে আপনার হবু হাজব্যান্ড? সানাফ মৃধা? দেখুন তো চিনেন কি-না!
কনস্টেবল দরজা খুলে দিতেই সানাফ দরজা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে উঁকি দিল। চমৎকার হেসে বলল,
– হাই সৃজা। ওপস স্যরি! সৃজা নাকি জেবা? নাকি নিশা? কোনটা বলে ডাকি তোমায় বলোতো?
বলতে বলতেই সানাফ রুমের ভেতরে ঢুকল। অফিসারের সাথে হ্যান্ডশেক করে সৃজার সামনে এসে দাঁড়ালো। সৃজা অনুনয় করা ভুলে গেল। সে বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে আছে সানাফের দিকে। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
– ত…তুমি এ..এই নামগুলো জানো কীভাবে?
বোকা প্রশ্নে সানাফ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। বলল,

– তোমার কী মনে হয় সৃজা? সবাই ইমরোজের মতো বলদ আর অন্ধ? অবশ্য চরিত্রহীন মানুষদের জন্য তোমাদের মতো মেয়েরা সোনার হরিণ। তাদের কথা বাদ দিলাম। কিন্তু তুমি জগতের সব পুরুষকে অমন ভাবো কেন বলোতো? আমি হুট করে একটা মেয়ের সাথে এতটা গভীরভাবে মিশে যাব যে তার দুঃখ কষ্ট নিজের ঘাড়ে তুলে নেব? এটা তুমি একবার ও গভীরভাবে ভেবে দেখলে না। ইশ! আমার আফসোস হচ্ছে তোমার জন্য।
পরপরই চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
– আমার কাছে তোমার জীবনের বিগত বারো বছরের সব ডিটেইলস রয়েছে সৃজা। কত মেয়ের ঘর ভেঙেছ, কত বাচ্চাকে পিতৃহারা, মা হারা করেছ, কত ধনী ব্যক্তির ব্যাংক একাউন্ট লুট করেছ তার সব ডিটেইলস আছে। অবশ্য সেগুলো এখন অফিসার সাঈদ এর কাছে জমা রয়েছে।
সৃজা আর সৃজার মা থমকে গেল। চোখের সামনে শুধুই ধ্বংসলীলা দেখে সৃজা উদ্ভ্রান্তের মতো বলল,
– আমি চিনি না এদের। আমি সৃজা। আমি কিছু করিনি। আমি অপরাধী নই, ইউ বাস্টার্ড! ভালো থাকতে চাওয়া অপরাধ নয়। আমায় ছেড়ে দিন আপনারা।
সৃজা চেঁচিয়ে বলল। সহসা আরো একটা চড় পড়ল তার গালে। উত্তেজিত বদন নেতিয়ে পড়ল সেই আঘাতে। অফিসার সাঈদ তার চোয়াল চেপে ধরল। সেই চাপে রক্ত জমলো আঙুলের ডগায় কুঁচকে থাকা নরম চর্মে। বলল,
– ভালো থাকতে চাওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু ভালো থাকার জন্য অপরাধকে বেছে নেয়া অপরাধ। বিগত বারো বছর যাবৎ একাধিক পরিচয়ে একাধিক ধনী বিবাহিত পুরুষকে ফাঁসানো, তাদের থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া

— এগুলো ক্রাইম মিস সৃজা।
– এছাড়াও আপনার নামে একাধিক মামলা রয়েছে। আপনার শেষ মুরগীর নাম ছিল ইমরোজ সিকদার তাই তো? তিনি গতকাল খুলনায় আপনার নামে প্রতারণা আর চুরির দায়ে মামলা করেছেন।
স্বামীকে নেশা করিয়ে তার থেকে দলিলে স্বাক্ষর করিয়ে তার অগোচরে বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে সব টাকা নিয়ে আপনি ভুয়া ভিসার মাধ্যমে দেশ থেকে পালাতে চেয়েছিলেন, তাই তো? আপনার পরিকল্পনা খুব সুন্দর হলেও প্রক্রিয়া খুবই বাজে ছিল মিস সৃজা। অনেক অপরাধ করেছেন এখন একটু কারাগারে গিয়ে বিশ্রাম নিন। আপনার মতো জঘন্য মেয়েমানুষ সমাজে খোলামেলা ঘুরলে নোংরামিতে ভরে যাবে সমাজ।
বলেই অফিসার সাঈদ একদলা থুতু ফেলে বেরিয়ে গেলেন কক্ষ থেকে। তার ঘৃণা হয় এমন নারীদের। বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা সানাফ এবার নুঁইয়ে গেল সৃজার দিকে। চেয়ারের দুই হাতলে হাত রেখে চোখ রাখল সৃজার ক্রুব্ধ লালচে নেত্রপানে। ফিসফিসিয়ে বলল,

– জান, তোমায় একটা সিক্রেট বলি হ্যাঁ? তুমি মন খারাপ করো না। কারাগারে তোমায় উত্তেজিত শরীরকে ঠান্ডা করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। এমন ব্যবস্থা করা হবে তুমি তোমার শরীরের দিকে আর তাকাতে পারবে না। আর এটা নিশ্চিত করব আমি আর এরোজ।
সৃজা আরেকদফা চমকালো। সে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
– এরোজ?
– ইয়াহ্ এরোজ! ভুলে গিয়েছ বুঝি? কথা বলবে? ওয়েট আমি তোমার সাথে তার কথা বলিয়ে দিচ্ছি। সে উদগ্রীব হয়ে আছে তোমার সাথে কথা বলার জন্য। খুব খুশি হবে।
সানাফ তৎক্ষণাৎ কাউকে ফোন দিয়ে ফোনটা সৃজার মুখের সামনে ধরতেই সৃজা শুকনো ঢোক গিলল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি শান্ত মুখশ্রী অথচ দুই চোখে জ্বলজ্বল করছে ক্রুরতা আর হিংস্রতা।
ল্যাপটপে এঁটে থাকা বিবর্ণ মুখটি দেখে এরোজ বাঁকা হেসে চোখ মারল। ফিসফিসিয়ে বলল,
– হাই সুইটহার্ট! ওয়েলকাম টু দ্য হেল। তুমি প্রতিবার আমায় ভুলে যাও কেন সুইটহার্ট? প্রতিবার তুমি আমায় ভুলে যাও আর প্রতিবার আমায় এমনি বিশ্রী কোনো কান্ড করে মনে করাতে হয়—যে তুমি আমার দু’টো কলিজার জীবন নষ্ট করে দিয়েছ।
পরপরই হিংস্র পশুর ন্যায় হিসহিসিয়ে বলল,

– আমার কলিজা ঝাঁঝড়া করে দিয়ে তুই কীভাবে শান্তিতে থাকতে পারিস বলতো? সেখানে তুই আজ আটমাস পাখির মতো উড়ে বেরিয়েছিস। কিন্তু অনেক হয়েছে। আমি সুখে থাকব না, তুই ও সুখে থাকবি না। হিসাব বরাবর। এবার তুই অন্ধকার কারাগারে পঁচে মরবি। আর ওখান থেকে তুই কীভাবে বের হস সেটা আমি দেখে নেব। আমি এরোজ যতদিন বেঁচে আছি তুই ততদিন কারাগার থেকে বের হতে পারবি না। আর কোনোদিন তোর জন্য কোনো মৌনতা ধুঁকে ধুঁকে মরবে না, আর কোনো নায়েলরা বাবা হারা হবে না।
এরোজের চোখ টলটল করছে। অক্ষিদ্বয়ের সফেদ অংশে অচিরেই লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ল‌। সৃজা এবার তেজ ভুলে গেল। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে। ছটফট করতে করতে বলল,
– এরোজ আমি দুঃখিত! আমি দুঃখিত। আমি তোমার পায়ে পড়ছি এমনটা করো না প্লীজ। আমি আর কখনো এমন কোনো কাজ করব না এরোজ। প্লীজ আমায় কারাগারে পাঠিও না। আমি আজ পর্যন্ত যা যা করেছি তার জন্য সবার কাছে পা ধরে ক্ষমা চাইব তবুও আমায় বাঁচিয়ে নাও এরোজ। আমার বাবা নেই। আমার পরিবার চালাতে আমার এসব করতে হয়েছে। তুমি তো জানো একটা মেয়ের জন্য সমাজে মানসম্মানের সাথে বেঁচে থাকা কতটা কঠিন। আমাদের না খেয়ে মরে যেতে হতো এই কাজ না করলে। প্লীজ এরোজ!
সৃজা ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর অনুনয় করছে। কিন্তু সময় শেষ! এবার‌ শুধুই ফয়সালা হবে। সৃষ্টিকর্তা বেঁচে থাকার জন্য অনেক হালাল এবং পবিত্র উপায় রেখেছেন। অল্প খেয়ে বাঁচব কিন্তু তবুও অসৎ পথে গিয়ে টাকা রোজগার করব না এই নীতিমালা অনুযায়ী জীবনযাপন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সৃজা এই নীতিমালা অনুসরণ করেনি। তাই তার চূড়ান্ত স্থান হলো ওই অন্ধকার কাল কুঠুরিতে।
ফোনটি কেটে গেল। হাত পা বাঁধা অবস্থায় সৃজা ছটফট করতে করতে একদম শ্রান্ত হয়ে গেল। সানাফ এবার অন্য কাউকে ফোন দিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সুপ্তির ক্রন্দনরত মুখশ্রী। বোন আর মায়ের করুণ দশা দেখে সুপ্তি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে অনুনয় করে বলল,

– ভাইয়া প্লীজ, আপুকে আর আম্মুকে ছেড়ে দিন। তারা আর কখনো এমন কাজ করবে না ভাইয়া। প্লীজ এমনটা করবেন না ওদের সাথে। মা আর বোন ছাড়া আমার এই পৃথিবীতে কেউ নেই ভাইয়া। একটু দয়া করুন।
সানাফ কঠিন চোখে তাকালো সুপ্তি আর সুপ্তিকে আগলে ধরা নত মাথায় থাকা ছোট ভাইয়ের পানে। কঠোর গলায় বলল,
– তারা যত পাপ করেছে তার জন্য এতটুকু শাস্তি খুব প্রয়োজন সুপ্তি। তোমায় এর জন্য দেখাচ্ছি যে এরপর থেকে নিজেকে সামলে চলবে। আমার ভাই আর আগত বাচ্চা নিয়েই তোমার আগামী জীবন হবে। তুমি যদি এর বাইরে কোনোরকম ষড়যন্ত্র কিংবা দুশ্চরিত্রের মতো কাজ করো কিংবা আমার পরিবার ভাঙতে চাও তবে তোমার অবস্থাও তোমার মা আর বোনের মতো হবে। মাইন্ড ইট!
পরপরই ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল,

– সানি, নিজের বউকে সামলে রাখিস। কেমন পরিবারের মেয়ে তা তো জানিস ই। এরপর কোনো বিপদ ঘটলে কিন্তু আমি তোকে একটুও সাহায্য করব না।
সানি মাথা নিচু করে নিয়ে বলল,
– আমি ওকে চোখে চোখে রাখব, ভাইয়া। আমার বাচ্চা কিংবা আমার সংসারের কোনো ক্ষতি করতে চাইলে ওকে এখানেই একদম পুঁতে ফেলব, তুমি চিন্তা করো না।
সুপ্তি থমকে গেল সানির হুমকি শুনে। সে কিয়ৎকাল মা আর বোনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। যেন এটাই শেষ দেখা। দিনশেষে এটাও বুঝল সে একদম নিঃস্ব হয়ে গিয়েছে। এখন সানি আর তার বাচ্চাকে আঁকড়ে ধরে একটি পাক পবিত্র সুন্দর জীবনযাপন করাই তার জীবনের একমাত্র মানে। আর কোনো উপায় নেই। উঁচু পেট আঁকড়ে ধরে সুপ্তি একটা ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলল।
সানাফ বেরিয়ে যায় কামরা থেকে।
এরোজ ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে থাকা অফিসার সাঈদের পানে চেয়ে বিনম্র কণ্ঠে বলল,

– থ্যাংক ইউ অফিসার। শেষ মুহূর্তে যদি আপনি আমাদের কথা শুনে সাহায্য না করতেন তবে এই কাজ কখনোই সম্ভব ছিল না। আজ আপনার সাহায্যের কারণে হয়তো অনেক নারীর সংসার বেঁচে যাবে, অনেক বাচ্চার মাথার উপর বাবার আশ্রয় টিকে থাকবে।
অফিসার সাঈদ মৃদু হেসে বলল,
– এটা আমার কর্তব্য ছিল মিঃ এরোজ। আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ সমাজে লুকিয়ে থাকা এরকম একজন ঘুণোপোকাকে আইনের আওতায় আনতে সাহায্য করার জন্য।
এরোজ মৃদু হাসল। বলল,
– ধন্যবাদ আমায় না স্যার, সানাফকে দিন। বেচারা অনেক কষ্ট করেছে। ইউটিউব দেখে দেখে ফ্লার্টিং করা শিখেছে, গায়ে পড়া মেয়েদের থেকে কীভাবে নিজের ইজ্জত বাঁচাতে হয় তার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।
বলেই এরোজ আর সাঈদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সানাফ গরম চোখে তাকালো এরোজের দিকে। অফিসার সাঈদ সানাফের দূরসম্পর্কের একজন আত্মীয়। নিজেদের পরিকল্পনার শেষ পর্যায়ে এসে তার সাথে যোগাযোগ হয়। কথা বলার পর সাঈদ জানায় সে তাকে সাহায্য করতে রাজি।
আর এভাবেই সমাজে লুকিয়ে থাকা একটি ঘুঁণোপোকার নিধন হলো। যেই ঘুঁণোপোকা হয়তো একটু একটু করে সমাজে বসবাসরত অনেক সুখী পরিবারের সুখ খেয়ে নিতো।
সানাফ উঠে দাঁড়াল। বিদায়ের উদ্দেশ্যে সাঈদের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল,

– আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে গিয়েছে স্যার। আমায় যেতে হবে। আশাকরি উদ্ধারকৃত টাকা সব আপনার হেফাজতে সুরক্ষিত থাকবে।
পুলিশ অফিসার সাঈদ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
– তার হিসাব পড়ে হবে মিঃ সানাফ। কারণ সৃজা আর তার পরিবারের সাথে মিঃ ইমরোজ সিকদার ও সমানভাবেই দোষী। এই টাকা উদ্ধার করতে তাকে বেগ পেতে হবে।
– অবশ্যই অফিসার। আমার আপনার উপর পুরো বিশ্বাস আছে। আজ তবে আসি, খোদা হাফেজ।
একটা আলতো আলিঙ্গন শেষে সানাফ বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। মনটা আজ তার ভীষণ ফুরফুরে লাগছে। বাতাবরণ আজ একটু বেশিই পবিত্র, দূষণমুক্ত মনে হচ্ছে। এরোজের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম প্রথম এই কাজ করতে তার নারাজি থাকলেও,ঔ আজ মনে হচ্ছে সে জীবনের সবচেয়ে ভালো কাজটি সাকসেসফুললি সম্পন্ন করেছে। ওষ্ঠকোনে একটা বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে সানাফ নিজের ফ্লাইটে উঠে বসল। বদ্ধ চোখে প্রার্থণা করল, সৃজা আর ইমরোজদের মতো প্রতিটা মানুষ যেন এভাবেই পুরো দুনিয়ার সম্মুখে লাঞ্ছিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। মৌনতা আর নায়েলের মতো নিষ্পাপ মানুষগুলোকে আর সে যেন আর কখনোই ঠকতে না হয়। সৃষ্টিকর্তার সকল রহমত বর্ষিত হোক মৌনতা আর নায়েলের মতো দুঃখী মানুষগুলোর উপর। বলুন আমিন! আমিন! আমিন!

স্ফিত উদরে হাত বুলাতে বুলাতে তপোবন দীর্ঘক্ষণ বাদে আবছা আঁধারে নিমজ্জিত বারান্দার মাঝে জ্বলজ্বল করা চাঁদটির পানে তাকাল। গালে মেদ জমেছে, যেই মেদের চাপে লালচে ঠোঁট দুটো আরো ছোট্ট হয়ে গিয়েছে, চেহারায় যেন পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বলতা বেড়েছে। ছোট্ট মেয়েটির সৌন্দর্যে ডুবতে ডুবতেই পুরুষালী হাত দু’টো আরেকটু কাছে টেনে নিলো মেয়েটিকে।
রূপকথা নড়েচড়ে উঠে ঘাড় উল্টে তাকাল অত্যাধিক ফর্সা মুখপানে। ধূসর ঘোলাটে চোখের কারণে এই ফর্সার মাত্রা আরো বেড়ে যায়। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
– তানশানের পাপা!
মোহগ্রস্ত তপোবনের স্থবিরতায় বিঘ্নতা ঘটল। চোখে চোখ পড়ল। মুখ নামিয়ে লালচে চিকন ওষ্ঠদ্বয়ে আলতো চুম্বন করে প্রত্যুত্তর করল,
– বলুন, মুরুব্বি।
রূপকথা স্মিত হাসল। বলল,
– ছানারা কার মতো হলে আপনি বেশি খুশি হবেন?
বাচ্চাদের হার্টবিট এসেছে থেকে মেয়েটি এমন কতশত কৌতুহল প্রকাশ করে! তপোবন একটুও ভাবুক হলো না। বেতের সোফায় কাঁধ এলিয়ে দিয়ে মেয়েটির রেশমের ন্যায় চুলে হাত গলিয়ে দিয়ে বলল,
– তারা সুস্থ সবল আমার বুকে আসুক শুধু, আমি তাতেই খুশি।
রূপকথা বিরক্ত হলো। পুরুষালী বুক চাপড়ে বলল,

– আহ্ তানশানের পাপা! যা জিজ্ঞেস করেছি তাই বলুন। বলুন, কার মতো হলে আপনি বেশি খুশি হবেন?
– উমমম, একজন আমার ফেইরিটেইলের মতো আর একজন তাদের ভাইজানের মতো হলে বেশি খুশি হবো।
– আপনার মতো হলে খুশি হবেন না?
রূপকথার উৎসুক কণ্ঠে তপোবন চমৎকার হেসে বলল,
– তানশান তো একদম আমার কপিপেস্ট। আমার আর তানশানের মাঝে মধ্যে তফাৎ নেই। একজনের মতো হলেই হলো।
রূপকথা নীরব রইল। তপোবন কিয়ৎকাল বাদ জিজ্ঞেস করল,
– এবার তুমি বলো, ছানারা কার মতো হলে তুমি বেশি খুশি হবে?
রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
– আপনি যেমন চান ছানারা তেমন হলেই আমিও খুশি হবো।
– কেন? তোমার নিজস্ব কোনো ইচ্ছা নেই?
– উঁহু, আমি আমার সব ইচ্ছা একদিন আপনার নামে করেছিলাম। সেদিন থেকে আপনি আর আপনি জড়িত সবকিছুই আমার একমাত্র পছন্দ।
তপোবনের মাঝে হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল মেয়েটির অদ্ভুত স্বীকারোক্তিতে। ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল,

– এত কেন ভালোবাসো এই খুঁত যুক্ত মানুষটাকে?
রূপকথা গেট সংলগ্ন বাগানবিলাস গাছটির পানে চেয়ে ধিমি কণ্ঠে বলল,
– আপনি আমার ভাগ্য বলে।
– আর যদি আমি তোমার ভাগ্য না হতাম?
– এই ‘যদির’ কোনো স্থান নেই জীবনে। হবে সেটাই যেটা ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। আর আমার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে বহু পূর্বে।
– মানিয়ে নেয়ার এত শক্তি পেলে কোথায়?
– যেদিন থেকে বাবা নামক মানুষটা হারিয়ে গিয়েছে সেদিন থেকে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতাকে একটু একটু করে চিনতে পেরেছি।

– তোমার বাবা আজ তোমাদের জীবনের থাকলে আমাদের গল্পটা ভিন্ন হতো রূপকথা।
– কিন্তু এই গল্পটা আর এই গল্পের মূলচরিত্র তপোবন সিকদার আমার খুব প্রিয়। দুঃখের বিনিময়ে যদি এমন একজন তপোবন সিকদার পাওয়া যায় তবে আমি এমন হাজার দুঃখ সইতে রাজি।
তপোবনের ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায়। সে ঘাড় নুইয়ে বক্ষপানে চেয়ে বলল,
– কিন্তু এই তপোবন সিকদারের মাঝে আছে কী?
রূপকথা দুষ্টু হাসি দিলো। মুখ বাড়িয়ে চট করে তপোবনের গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
– আমার স্বামী আছে, আমার ব্যক্তিগত টিচার আছে, আমার তিন ছানাদের পাপা আছে।
মেয়েটির বাচ্চামো ভরা কণ্ঠে তপোবন হো হো করে হেসে উঠল। দু’হাতে শক্ত করে মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল। দাড়িযুক্ত মুখটি ভীষণ আদরের সাথে ঘষতে ঘষতে বলল,
– আমার আদুরে ফেইরি টেইল। আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি।
রূপকথা লাজে রাঙা লজ্জাবতীর ন্যায় মিইয়ে রইলো। তপোবন তার কাঁধে থুতনি ঠেকাল। বলল,

– তো এখনো কী আপনার ‘তানশানের পাপা’ ডাকটি বদলানোর সঠিক সময় আসেনি?
রূপকথা সরব চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
– এসেছে এসেছে।
তপোবন আগ্রহী হলো। ভীষণ আগ্রহের সাথে পিটপিট করে চেয়ে বলল,
– কী?
– আপনি এখন আমার তিন ‘ছানাদের পাপা’ সুন্দর না?
তপোবন সরব মুখ গোমড়া করে নিলো। বলল,
– নাহ, সুন্দর না। আমি ছানাদের পাপা হওয়ার আগে রূপকথার বর।
রূপকথা থমথমে মুখে সায় জানিয়ে বলল,
– হুম, রূপকথার বুড়ো বর।
মেয়েটির দুষ্টুমি ভরা কণ্ঠে তপোবন সরব মেয়েটির মাথায় একটা চাটি মেরে বলল,

– পাজি মেয়ে!
রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল তাকে ক্ষেপাতে পেরে। হাসতে হাসতে গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
– আপনি কী জানেন, আমি ‘তানশানের পাপা’ ডাকটিতে বারংবার প্রাণ হারাই। এই একটি ডাক আমায় প্রতি মুহুর্তে অনুভব করায় আমি কারোর মা। আমি ‘তানশানের মা’। এই ডাকটা আমার শক্তি। আমি এই ডাকটিকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি আজীবন আপনাকে ‘তানশানের পাপা’ বলে ডাকতে চাই। এবং আজীবন ‘তানশানের মা’ হয়ে বাঁচতে চাই।
তপোবন হাল ছেড়ে দিল। মেনে নিলো মেয়েটির মাতৃত্বভরা আবদারকে। বশ্যতা স্বীকার করে বলল,
– এই ডাকটি আজীবনের জন্য আপনার জন্য বরাদ্দ করা হলো। আমার মুরুব্বি যেন আজীবন আমার তানশনের মা হয়ে বাঁচতে পারে সৃষ্টিকর্তার কাছে সবসময় আমার এই আর্জি থাকবে।
রূপকথা মৃদু হাসল। তপোবন মেয়েটির ছোট্ট মুখটি বুকে চেপে ধরে বলল,
– এখন একটু ঘুমান। রাত তিনটা বাজে। আর কত রাত জাগবেন?
– আপনার ছানারা দুষ্টু তানশানের পাপা। ঘুমাতে দেয় না আমি কী করব? শরীরে অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করে চোখ বুজতে পারি না।

– আচ্ছা ঘুমাতে হবে না। চলো একটা প্রতিযোগিতা করি তুমি আমি। যে জিতবে তাকে আগামীকাল সকালে ট্রিট দেয়া হবে।
– কিসের প্রতিযোগিতা আর কেমন‌ ট্রিট।
– ইস্তেগফার এর প্রতিযোগিতা। তুমি জিতলে আমি তোমায় আগামীকাল সকালে পুরো শহর রিকশায় ঘুরিয়ে দেখাব আর ব্রেকফাস্ট করাব বাইরে নিয়ে গিয়ে। আর আমি জিতলে, তুমি একদিনের মধ্যে ফিজিক্স দ্বিতীয় পত্রের সকল এমসিকিউ রিভাইস দেবে। রাজি আছো?
রূপকথা চোখ পাকিয়ে তাকাল। রাগত স্বরে বলল,
– আপনার সবকথা পড়াশুনায় গিয়ে কেন আটকায়? আমি অবশ্যই জিতব।
– ওকে দেখা যাক।
তপোবন তসবিহ পড়ার দু’টো ডিজিটাল তসবিহ কাউন্টার নিয়ে আসল। একটা রূপকথার হাতে দিয়ে বলল,
– আমি যখন স্টার্ট বলব তখন শুরু করবে। প্রতিযোগিতা হবে এক ঘন্টা অব্দি। এর মধ্যে যে যত বেশি বার ইস্তেগফার করতে পারবে। স্টপ ওয়াচ যখন এলার্ম দেবে তখন শেষ করবে, ওকে?
– ওকে।
‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ সবচেয়ে ছোট ইস্তেগফার। পুরুষালী বক্ষে পিঠ ঠেকিয়ে একে অপরকে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরে দু’জনে ভরপুর মনোবল নিয়ে ইস্তেগফার করা শুরু করল। নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সুন্দর কোয়ালিটি টাইমগুলোর মধ্যে একটি এই মুহুর্তটুকু। এক ঘন্টা নিমিষেই কেটে গেল। স্টপ ওয়াচ এলার্ম দিতেই তারা দু’জন ইস্তেগফার থামালো।
দু’জনে দুজনের কাউন্টার দেখতেই রূপকথার মুখ ছোট হয়ে গেল কিন্তু তপোবনের মুখে হাসি। সে এগারোশো বার ইস্তেগফার করেছে আর রূপকথা এক হাজার বার।
রূপকথা পাণ্ডুর মুখে শব্দ করল,

– ধুর!
তপোবন হাসতে হাসতে বলল,
– আগামীকাল ফিজিক্স দ্বিতীয় পত্রের সব এমসিকিউ রিভাইস দিতে হবে মনে থাকে যেন।
– আমি অতো ভুলোমনা নই।
রূপকথা মুখ বাঁকিয়ে বলল। তপোবন হেসে তার নাক চেপে ধরল নাকলসের মাঝে। রূপকথা চেঁচিয়ে উঠল।
রাতটুকু সেভাবেই প্রিয় বুকটিতে কেটে গেল রূপকথার। হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে রূপকথার ইদানিং ঘুম হয় না। তার কারণে সারাদিন শেষে তপোবনের রাতটুকু ও এমনি এলোমেলো কাটে। কিন্তু কখনোই এর জন্য ক্লান্তিবোধ হয় না। কেননা মেয়েটির এই সকল কষ্ট যে শুধুমাত্র তাকে আরো একবার বাবা ডাক শোনানোর জন্য। সে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে।
ফজরের আজান দিতেই তপোবন ছেলেকে নিয়ে নামাজ পড়তে গেল। নামাজ পড়ে এসে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রূপকথাকে ফোন দিল। বলল,
– বাইরে চলে আসো তাড়াতাড়ি।
– কেন?
– রিকশায় করে শহর ঘুরবে না? খালিশপুর গিয়ে ব্রেকফাস্ট করব আসো।
রূপকথা কোমরে হাত দিয়ে বলল,
– কিন্তু আমি তো প্রতিযোগিতা হেরে গিয়েছি।
তপোবন হেসে বলল,
– আপাতদৃষ্টিতে তুমি হেরে গেলেও আল্লাহর কাছে তুমি বিজয়ী। কারণ সংখ্যাটা ম্যাটার করে না, ম্যাটার করে তুমি কতটা ধীরস্থির সুন্দর করে ইস্তেগফার করেছ। আর নিঃসন্দেহে এতে তুমি জিতে গিয়েছ। সুন্দর করে তৈরি হয়ে এসো। স্লিপার পড়বে কোনো ফ্লাট হিল নয়।
রূপকথার মুখে হাসি ফুটে উঠল প্রিয় মানুষটির মনোমুগ্ধকর কথায়। এই মানুষটা হেরে যাওয়া রূপকথাকে সবসময় বিজয়ী অনুভব করায়। সে তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে নিচে নামতেই তানশান বরাবরের ন্যায় হাত বাড়িয়ে দিল মায়ের দিকে।
রূপকথা আঁকড়ে ধরল ছেলের হাত। অজস্র প্রভাতের ন্যায় আজকের প্রভাতটিও রূপকথার জন্য সুপ্রভাত ছিল তার তিন ছানার সাথে।

নিঝাম সত্যিকার অর্থেই একজন স্বার্থবাদী নারী ছিল। যার সব জেদ, স্বার্থ, নেশা জুড়ে ছিল শুধুমাত্র ওয়াহেদকে আঁটকে রাখা। আজ যখন ওয়াহেদ তাকে ছেড়ে চিরতরে ছেঁড়ে চলে গেল, তখন সে তার মানসিক শক্তি খুঁইয়ে বসল। সে ভুলে বসল সে কারোর মা। সে ওয়াহেদ ব্যতীত নিজের একাকী শূন্য ব্যর্থ জীবন সহ্য করতে না পেরে পাগল হয়ে গিয়েছে। তাকে এখন বেশিরভাগ সময়ই হাসপাতালে রাখা হয়।
আর নিহাম। সে একটু একটু করে বড় হচ্ছে নিলীমার টানাপোড়েনের সংসারে। তপোবনের করা বাড়িটির মাত্র এক তলা সম্পন্ন হয়েছে। নিলীমা তার বেঁচে থাকার সম্বলটুকু নিয়ে সেখানেই উঠেছে। শুকতারা কে নিহাম আর তানশানের স্কুলে ভর্তি করিয়েছে তপোবন। তাদের সকল প্রকার দেখাশুনা সেই করে।
নিলীমা দুঃখে জর্জরিত এক নারী। তার জীবনের প্রতিটা ধাপে দুঃখ ভিন্ন ভিন্ন রূপে এসে হাজির হয়। দশ বছর পূর্বে তার দুঃখের নাম ছিল ‘স্বামীর হারিয়ে যাওয়া’
দশ বছর পর তার দুঃখের নাম ছিল ‘স্বামীর ফিরে আসা’
বর্তমানে তার দুঃখের নাম ‘ স্বামীর রেখে যাওয়া দায়িত্ব’।
দুঃখ কোনোভাবেই ওনার পিছু ছাড়ে না। কেউ বোঝে না তিমি নিহাম নামক ছেলেটির দিকে তাকালে পুরোনো সব দুঃখগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে‌। তবুও বরাবরের মতো ওনাকে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে হয়। কারণ? কারণ তিনি একজন মা। একজন নারী পাষণ্ডতা করতে পারলেও একজন মা কখনোই পাষণ্ডতা করতে পারে না। নিলীমাও পারেন না। ভাত একই রকম পড়ে থাকতে দেখে নিলীমা এগিয়ে গেলেন। আঁচলে গলার ঘাম মুছে নম্র স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

– খাচ্ছো না কেন? স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।
নিহাম নত নাথায় বলল,
– আমি হাত দিয়ে খেতে পারি না।
নিলীমা এক পলক শান্ত দৃষ্টি ফেলে রান্নাঘরে গিয়ে হাত ধুয়ে আসলেন। নির্বিকার ভাত মেখে নিহামের মুখের সামনে ধরতেই নিহাম মুখ তুলল। এক পলক নিলীমার শান্ত মুখশ্রী দেখে চুপচাপ খাবারটি মুখে পুরে নিলো। এতদিন নির্জনা বেগম-ই তার খেয়াল রেখেছেন, খাইয়ে দিয়েছেন, নিজের কাছে রেখেছেন।
খাওয়া শেষে ওয়াহেদের ড্রাইভার বাড়ির সামনে আসল। নিলীমা মেয়েকে কিছু টাকা দিয়ে বললেন,
– অচেনা কেউ ডাকলে যাবে না আর কিছু দিলে খাবেও না।
শুকতারা সায় জানাল। নিলীমা দাঁড়িয়ে থাকা নিহামকে দেখে পুনরায় মেয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,
– ভাইয়ের সাথে সাথে থেকো।
শুকতারা এবারেও সায় জানাল। নিলীমা এগিয়ে গিয়ে আঁচলের গিঁট থেকে নিহামকেও একশো টাকা বের করে দিলেন। বললেন
– এটা দিয়ে কিছু খেয়ে নিও।
– কিন্তু আমার কাছে অনেক টাকা আছে।
নিলীমা নির্বাক এগিয়ে দেয়া টাকাটা ফিরিয়ে নিলেন। বললেন,
– আচ্ছা যাও। নিজের খেয়াল রেখো।
নিহাম মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল। শুকতারা গাড়ির কাছে এসে দাঁড়াতেই নিহাম নিজ উদ্যোগে গাড়ির দরজা খুলে দিল। শুকতারা উঠে বসল। গাড়িটি হারিয়ে গেল দৃষ্টি সীমা থেকে। নিলীমা একবুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন।
নতুন ঘরে লেগে থাকা ইট বালি সিমেন্টের ধূলো পরিষ্কার করতে থাকা তিনজন মহিলা কিছুটা ব্যথিত নয়নে নিলীমাকে দেখল। এসেছে থেকে তারা দেখছে এই মহিলাটি একটু বেশিই দুঃখী। মুখে কখনো হাসি তো দূরের কথা মন খুলে কথা বলতেও দেখা যায় না।
একজন না পারতে প্রশ্ন করেই বসল,
– এই তুমি এত দুঃখী ক্যান? সারাক্ষণ মন খারাপ কইরা থাকো ক্যান?
নিলীমা ফিরে তাকালেন নিজের ডান দিকে। বললেন,
– জীবনের মানেই তো দুঃখ।
মহিলাটি ভ্রু কুঁচকে হঠাৎ করেই প্রশ্ন করল,
– জীবন তোমারে কী দিছে?
নিলীমা অবিচল কণ্ঠে বললেন,
– দুঃখ।
– আর কিছুই দেয়নাই?
নিলীমা ম্লান হাসলেন। বললেন,
– দিয়েছে। দুঃখগুলো এক নিমিষেই ভুলে যাওয়ার জন্য দু’টো সুখ দিয়েছে।
– তবে হাসো।
– আমার হাসি দশ বছর আগে কেউ কেড়ে নিয়েছে। তাই এখন হাসতে ভুলে গিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি ভীষণ সুখী।
মহিলাটি ফের ব্যথিত হলো নিলীমার এমন ধরণের কথায়। সে মলিনমুখে আবার কাজে মনোযোগ দিল।

তপোবন রূপকথা আর তানশানকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখল ঘরময় থমথমে পরিস্থিতি। রোজ, নির্জনা বেগম, তকদির সিকদার থমকে দাঁড়িয়ে আছে বসার ঘরে। সকলের উৎসুক দৃষ্টি টিভির পর্দায়।
ব্রেকিং নিউজ: হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে দুই নারী প্রতারক আটক।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
গতকাল সকাল ১০ টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ভুয়া পাসপোর্ট ও ভিসাসহ দুই নারীকে আটক করেছে কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তাদের বিরুদ্ধে ধনী ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলে অর্থ আত্মসাৎ ও একাধিক সুখী পরিবার ধ্বংস করার লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
জানা গেছে, গতকালও তারা জনৈক ব্যক্তির সকল সম্পত্তি প্রতারণার মাধ্যমে বিক্রি করে দিয়ে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ভুঁয়া ভিসায় দেশত্যাগের চেষ্টা করছিলেন। যেই ব্যক্তি ছিলেন ওনার অস্থায়ী স্বামী। বর্তমানে তারা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। এই চক্রের সাথে আরও কেউ জড়িত কি-না, তা খতিয়ে দেখতে জোরদার তদন্ত শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
নির্জনা বেগম বাঁকরুদ্ধ হয়ে গেলেন টিভির স্ক্রিনে সৃজার আর তার মায়ের ছবি ভেসে উঠতেই। দিনশেষে তিনি মা। অনুভূতি আজ ও রয়ে গিয়েছে।
তিনি অবিশ্বাস্য নয়নে তপোবনের পানে চেয়ে বললেন,

– তপোবন, আমাদের ইমরোজ? ইমরোজের সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল সৃজা?
তপোবন পেছনে হাত গুটিয়ে থমথমে মুখে ছেলের পানে চাইল। বাবার নীরব ইশারা বুঝতেই তানশান নীরবে নিজের ঘরে চলে গেল। তপোবন থমথমে মুখে বলল,
– আম্মা, আমাদের দায়িত্ব ছিল ছোটবেলা থেকে ভালো খারাপের জ্ঞান দিয়ে ভাই বোনকে বড় করা। আমরা করেছি। কিন্তু ভাই বোন আমাদের পরামর্শ কতটুকু গ্রহণ করবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যপার।
আমি ইমরোজ আর এরোজকে সমানভাবে বড় করেছি। এখন একজন মানুষ আর একজন অমানুষ হয়েছে এতে আমার কোনো হাত নেই। আমি মোটেই অবাক হইনি ইমরোজের পরিণতিতে। বরং অপেক্ষা করছিলাম এই দিনটির। তবে এত তাড়াতাড়ি-ই যে এই দিনটি আসবে তা আমার ধারণা ছিল না। তাই আমার কোনো সহানুভূতি আসছে না তার জন্য। দয়াকরে আপনিও আপনার আবেগকে সামলান। এই জীবন তার নিজের জ্ঞানে বেছে নেয়া‌। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। এই বিষয়ে এই ঘরে আর কোনো আলোচনা হবে না। রোজ ঘরে যাও।
ভাইয়ের দারাজ কণ্ঠে রোজ নীরবে ঘরে চলে গেল। রূপকথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। অন্তঃস্থলে একটা কথাই আসল,

– কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ ভালো থাকে না। একদিন না একদিন ঠিক তার কর্মের ফল পাবেই।
অতঃপর সকলের প্রাপ্য- পুণ্য, দেনা-পাওনা, ভালোবাসা, অ-ভালোবাসার হিসাব মিটে গেল। কিন্তু হিসাব মিটল না শুধু এরোজ মৌনতা নামক দুটি ভঙ্গুর অবয়বের। তারা আজো কেমোর বিদঘুটে যন্ত্রণাদায়ক প্রতিক্রিয়া আর হারানোর ভয়ের মাঝেই আঁটকে আছে।
আড়াই মাসের বিবর্তন! অথচ এরোজ মৌনতা এখনো সেই আড়াই মাস আগের স্থানে আর পরিস্থিতিতেই দাঁড়িয়ে আছে।
বমি করতে করতে কোলে থাকা দেহটি একটাসময় রক্ত বমি করতে লাগল। নারীটিকে আগলে ধরা পুরুষটি পাগলের ন্যায় ছটফট করে উঠল সেই রক্ত বমি দেখে। হুট করেই একটা সময় নারীটির দেহ সর্বশান্ত হয়ে গেল পুরুষটির বাহুডোরে। বাম গাল গলিয়ে রক্তের সরু স্রোত গড়িয়ে পড়ছে অনবরত।পুরুষটি থমকে গেল। নারীটি যেই হারে নিস্তেজ হয় তার থেকে দ্বিগুণ হারে পুরুষটির স্নায়ু নিস্তেজ হয়ে আসল। দেহ বল ছেড়ে দেয়। অন্তঃস্থলে থাকা সুপ্ত আশাটুকু বুঝি এই মুখ থুবড়ে পড়ল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সর্বশান্ত এরোজ বলহীন দেহে নির্নিমেষ চেয়ে রইল রক্তমাখা দেহটির পানে। এইতো সব শেষ! ভয় গুলো জিতে গেল বুঝি! চোখের কার্নিশ ভিজতে ভিজতে আজ রক্ত গড়িয়ে পড়ার উপক্রম! তবুও সৃষ্টিকর্তার করুণা হলো না বুঝি!
এরোজ ফাঁকা ঢোক গিলল। থরথরিয়ে কাঁপতে থাকা হাতটি বাড়িয়ে আলতো করে নারীটির দেহ ছুঁয়ে দিল। নেই, কোনো সাড়াশব্দ নেই। পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়ে গেল! তবে যেখানেই শেষ সেখানেই যেন নতুন প্রারম্ভের সূচনা হয়। সর্বহারা পুরুষটির নিস্তব্ধ পৃথিবীতে আলোড়ন তুলে একটি ক্ষীণ দূর্বল কণ্ঠ‌ ভেসে আসল।

-এখনো মরিনি, শুধু ক্লান্ত! মৃত্যু কখন আসবে?”
অপলক চেয়ে থাকা এরোজ পলক ফেলল। সাথে সাথেই টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল অদূরে নিস্তেজ দেহটি চোখ মেলে তাকাতেই।
সদ্য খোলা দু’টো কাজলমাখা আঁখি দেখতেই এরোজের ঠোঁটের কোনে এক ফালি হাসি ফুটে উঠল—অথচ ভেতরটা ঠিকরে হু হু করে কান্না বেরিয়ে আসল। এরোজ অবসাদগ্রস্ত ক্লান্ত দেহে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। ঘাড় কাত করে চেয়ে থাকা মৌনতা ম্লান হাসল সেই কান্নায়। কণ্ঠনালী থেকে কথা বের হয় না কষ্টে তবুও ফিসফিসিয়ে বলল,
-কাউকে এতটা ভালোবাসতে নেই—যেই ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তোমার ভেতরটাকে সর্বশান্ত করে দেয়। ভালোবাসা যে আস্ত পিছুটান!”
এরোজ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল নারীটির কণ্ঠ শুনতেই। আর এক মুহুর্ত বিলম্ব করল না বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে নিস্তেজ দেহটি কোলে তুলে নিয়ে ছুটতে লাগল। হড়বড়িয়ে বলল,
-কিছু হবে না মৌন। আমরা এখুনি হাসপাতালে যাচ্ছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। বমি কমে যাবে। কেমো শেষ মৌন। আর একটু সাহস রাখুন।
এরোজের স্বান্তনা বানীগুলো পৌঁছাল না মৌনতার কানে। বাহুডোরে সমস্ত ভর ছেড়ে ততক্ষণে দেহটি অচেতন হয়ে গিয়েছে। এরোজ সেদিকে এক পলক চেয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে নিচে নামতে লাগল। ঘড়িতে তখন রাত দুইটা। সে ছুটতে ছুটতে বজ্রকণ্ঠে হাঁক ছেড়ে বলল,

-আন্টি, মৌন আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছে আপনি খালামনির সাথে হাসপাতালে আসুন।
মাসুমা ভয়ার্ত দেহে ধড়ফড়িয়ে ছুটে বের হলো কামরা থেকে। অস্ফুট স্বরে বলল,
-মৌন? ও তো কিছুক্ষণ আগেও ঠিক ছিল।
তিনি ছুটে নিচে নামলেন। কিন্তু এরোজ ততক্ষণে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। সুখের হাত আঁকড়ে ধরার জন্য মৌনতা ভীষণ সাহসিকতার সাথে পাঁচটি কেমোর সাথে লড়ে ফেলল। আজকেই ছুটি পেয়ে বাড়িতে ফিরেছিল কিন্তু হঠাৎ করেই সে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে।
বাহুডোরে চোখ মুছতে মুছতে এরোজ একহাতে গাড়ি চালাচ্ছে আর কোলে থাকা দেহটির মাথায় হাত বুলাচ্ছে। সাথে থাকে কতশত আদুরে বুলি।
মৌনতার ডাক্তার ফোনটি রিসিভ করতেই এরোজ সব জানালো। ডাক্তার রেগে গেলেন,
-আমি তোমায় আগেই বলেছিলাম ওর শারীরিক কান্ডিশন ভালো না। বাড়িতে নেয়া যাবে না। কিন্তু তুমি তো শোনোনি। রিডিকিউলাস! দ্রুত হাসপাতালে আনো। আমি সব রেডি রাখছি।
এরোজ ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল নিজের বোকামিতে। মৌনতা হাসপাতালে থাকতে চায় না। এখন বেশিরভাগ সময় তার সাথে থাকতে চায়। তাই জোর করে আজ বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু ভাবেনি তার ফল এভাবে ভোগ করতে হবে।
পাঁচ মিনিটের মাথায় এরোজ মৌনতাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাল। ডাক্তার ইমার্জেন্সি তাকে আবার আইসিইউতে শিফট করল।
আইসিইউতে ঢোকানোর সময় মৌনতা এক মুহুর্তের জন্য চোখ মেলে তাকালো। লিরা হাঁক ছেড়ে এরোজকে ডেকে বলল,

-এরোজ এদিকে আসো। মৌন ডাকছে তোমায়।
এরোজ টলমলে পায়ে এগিয়ে গেল চোখ মেলে তাকাতে না পারা মুমূর্ষু নারীটির দিকে। এরোজ অবলোকন করল, এটি তার দেখা সেই দুঃস্বপ্নের রাতটির সাথে ভয়ঙ্করভাবে মিলে যাচ্ছে। একদম একই রকম। ঠিক যেমন স্বপ্নটি ছিল। মুহুর্তেই এরোজের গা ঘেমে উঠল। চোখের সামনে সব ধোঁয়াশা হয়ে আসল। তার মনে পড়ল নিজের আবদারটির কথা। সেদিন দেরি হয়ে গিয়েছিল আবদারটি করতে। কিন্তু আজ আর দেরি করল না সে। এরোজ হুট করেই অশ্রুসিক্ত নয়নে আবদার করে বলল,
-মৌন, আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারি?
অক্সিজেন মাস্কের আড়ালে মৌনতা ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে না বোধক মাথা নাড়ল। নাড়াতে না পারা হাতটি দুই আঙুল নেড়ে এরোজকে কাছে ডাকল।
এরোজ নিজের কান এগিয়ে নিলো তার মুখের কাছে। কর্নকুহরে আন্দোলিত হয় ফিসফিসিয়ে বলা একটি সুন্দর বাক্য।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (৩)

-একদম কবুল বলার পর।
একটু থেমে পুনরায় বলল,
-আপনি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন আমার কোনো ইচ্ছা আছে না কি! আমার একটা ইচ্ছা আছে। আমার একটা সুন্দর সংসার হবে, আমার স্বামী আমায় আর আমার নায়েলকে পুরো পৃথিবীর উর্ধ্বে গিয়ে ভালোবাসবে, কখনো আমায় ছেড়ে অন্য নারীর কাছে যাবে না, আমায় চোখে হারাবে।
বলতে বলতেই মৌনতার আওয়াজ ফুরিয়ে গেল। চোখ পুনরায় বুজে গেল। কার্নিশ বেয়ে টপটপ করে গড়তে থাকা নোনাজলগুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এরোজ। জীবন কখন এতটা বিদঘুটে পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়াল —যে আজ তাকে তার প্রিয় মানুষটির শেষ ইচ্ছা শুনতে হচ্ছে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৩ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here