অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৭
তোনিমা খান
মানুষ পরিস্থিতির কাছে অসহায়। তেমনি রূপকথা ও অসহায় হয়ে পড়ল পরিস্থিতির কাছে। রূপকথার পরিবর্তিত জীবনের প্রথম সকালটা ছিল অন্যরকম। তার মনে সৃষ্টি হওয়া ক্ষত’র না আছে কোন প্রতিষেধক আর না আছে সহানুভূতি দেখানোর মতো কেউ। বিছানার ঐ হেডবোর্ডের সাথেই হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল রূপকথা। ঘুম থেকে উঠে ঘরে নিজেকে একাই পেয়েছিল সে। উঠেই শাশুড়ির তলবে তাকে সেজে উঠতে হয় সিকদার বাড়ির বড় বউয়ের রুপে। যেখানে শুধুমাত্র দায়িত্বের ছোড়াছুড়ি এবং প্রত্যেকটা কথার সমাপ্তি হয়— সে এই বাড়ির বড় বউ, তার অনেক দায়িত্ব এটা দিয়ে। রূপকথা নিরুত্তর মেনেও নিয়েছে এই সত্যটিকে। আর সেই সত্য আঁকড়েই মেয়েটি একা হাতে এত গুলো মানুষের এলাহী খাবারের আয়োজন করছে।
জবা সবজি কাটছে, মাজেদা চাচি মাছ ধুয়ে নিচ্ছে। স্টোভে রান্না বসানো। সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রূপকথা। কর্নকুহরে বিঁধছে শাশুড়ির বলা এক একটি বাক্য।
–“তপোবন চাপা স্বভাবের মানুষ। নিজের শত অস্বস্তি, চাহিদা কখনো কারোর কাছে প্রকাশ করে না। তাই তোমার দায়িত্ব হচ্ছে সবটা নিজ থেকে বুঝে নেয়া। তোমায় যেন বলে বোঝাতে যেন নাহয় স্বামীর প্রতি কি কি কর্তব্য রয়েছে! আর এইসব পড়াশুনা তো শুধু আক্ষরিক জ্ঞান যা আমার পুত্রবধূদের পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। আর প্রয়োজন নেই। এই নিয়মটি সকলের জন্যই প্রযোজ্য।”
এযাত্রায় বুঝি পড়াশুনাটাও আর হলো না! তার জীবনের গন্ডি কি এই সংসার পেরিয়ে বেরোতে পারবে না? একজন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন কি স্বপ্ন-ই থেকে যাবে? শুকতারাকে আর মাকে একটা সুন্দর জীবন দেয়ার বাসনা কি অপূর্ন ই থেকে যাবে? আচ্ছা শুকতারা আর মা কেমন আছে? ভালো আছে কি? নাকি রাতের অন্ধকারে ঐ প”শু”রা তার মা বোনকে ছিঁড়ে খেয়েছে? ঝিমিয়ে পড়া অন্তঃস্থল উজ্জ্বীবিত হয় পুনশ্চঃ। ম্লান দৃষ্টি এদিক ওদিক নিক্ষেপ করতেই দেখলো অদূরে ডাইনিং টেবিলে মৌনতা আর রোজ দাঁড়িয়ে আছে। একপলক চুলোর উপরে থাকা প্যানের দিকে তাকিয়ে সে মাথায় কাপড় তুলে ধীরস্থির এগিয়ে যায় সেদিকে। রূপকথাকে দেখতেই রোজ চঞ্চল কন্ঠে বলল,
–“বড় ভাবি, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না এত গুলো রান্না করতে? আমি এসে গিয়েছি আমি তোমায় সাহায্য করছি বুঝলে। আম্মা এখন অতিথিদের সাথে ব্যস্ত বুঝতে পারবে না।”
রূপকথা মাথা নাড়লো না বোধক। মিহি স্বরে বললো,
–“সমস্যা নেই আপু, আমি একাই পারব। আমায় শিখতে হবে এগুলো। এখন থেকে এগুলোই তো আমার দায়িত্ব। আমার তো অভ্যাস করতে হবে এত রান্নার।”
রোজের মুখটি ম্লান হয়ে আসল রূপকথার ক্লেশে পরিপূর্ণ জবাবে। তবে সে বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। এই পরিবারের নিয়মনীতির বাধ্যবাধকতার আরেকটি অংশ যে সে নিজেই। সেখানে রূপকথা তো পুত্রবধূ! তাকে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতেই হবে। মৌনতা এগিয়ে আসে রূপকথার কাছে। নীরাবতা ভেঙে স্নেহের কন্ঠে শুধায়,
–“কিছু বলবে, কথা?”
রূপকথা উপরনিচ মাথা নাড়লো,
–“আপনার কাছে ফোন আছে, ভাবি? আমি বাড়িতে একটা ফোন করব।”
–“আমার ফোন তো উপরে..”
–“আমার কাছে আছে ভাবি, আমারটা নাও। আমি বড় ভাইজানকে বলব তোমায় ফোন এনে দিতে। আপাতত এটা দিয়ে কথা বলো।”, মৌনতার কথার মাঝেই রোজ ব্যগ্র কন্ঠে বলল।
রূপকথা এগিয়ে দেয়া ফোনটি নিয়ে কৃতজ্ঞতার সাথে বলল,
–“ধন্যবাদ আপু।”
–“এতো ধন্যবাদের প্রয়োজন নেই, বড় ভাবি। আমরা একই পরিবারের অংশ হয়তো তোমার মানিয়ে নিতে একটু কষ্ট হবে। কিন্তু মানিয়ে নিলে আমি আর মৌন বউ তোমার বন্ধু হবো, ঠিক আছে? মৌন বউ না আমার সাথে খুব হিংসা করে বুঝেছো? তুমি আমার দলে এসো, হ্যাঁ? তাহলে আমার দল একটু ভারী হবে। নয়তো এই মৌন বউয়ের শয়তানি মাথার সাথে আমি পেরে উঠি না। আমি খুব নম্র ভদ্র ভালো মেয়ে তো তাই!”, রোজ নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো। মৌনতার ভ্রুযুগল টান টান হয়ে গেল। সে সুর টেনে বলল,
–“খুব নম্র ভদ্র ভালো মেয়ে তুমি ননদিনী; তোমার কাছে তো ইবলিশ ও হার মেনে যায় শয়তানিতে।”
–“মৌন বউ মুখ বন্ধ করো।”, রোজ চোখ গরম করে শাসিয়ে বলল। মৌনতা জিভ বের করে ব্যঙ্গ করে পা বাড়ায় সিঁড়ির দিকে। রোজ তেতে উঠে তার পিছু নেয়।
রূপকথা ম্লান হাসলো দু’জনের দুষ্টুমি দেখে। সে ফোন দেওয়ার জন্য ফোনটি খুললেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল কি করবে এটা ভেবে। সে কখনো স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে নি। এই বিষয়ে সে কিছু জানে না। রূপকথা নিরুপায় এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। মৌনতা আর রোজ উপড়ে যাচ্ছে। সে কি পিছু ডাকবে?
সে পিছু ডাকার উদ্দেশ্যে গেলেও দেখল গতকালকের সেই বিড়াল চোখের সুন্দর ছেলেটি সিঁড়ি বেয়ে নামছে। ছেলেটিকে সে চিনে নেয় ছেলেটিকে, তপোবন সিকদারের আরেক রূপ যে! রোজ, মৌনতা ততক্ষণে উপরে উঠে গিয়েছে তাই সে বাধ্য হয়ে তানশানের-ই স্মরণাপন্ন হয়। ইতস্ততার সাথে ডেকে ওঠে,
–“শুনছো?”
ব্যক ইয়ার্ডে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ানো তানশান ফিরে তাকায় কারোর ডাকে। গম্ভীর চোখমুখ আরো গম্ভীর হয়ে গেল রূপকথাকে দেখে। থমথমে মুখে বলল,
–“বলুন।”
রূপকথা এগিয়ে যায় ফোনটি নিয়ে। ফোনটি দেখিয়ে বলল,
–“আমি একটা ফোন করব আমার বাড়িতে কিন্তু আমি তো এই ফোন চালাতে পারি না। তুমি কি আমায় একটু সাহায্য করবে?”
তানশান কোনরূপ দ্বিরুক্তি না করে ফোনটা নিয়ে নেয়। ডায়ালপ্যাড বের করে বলল,
–“নাম্বার বলুন।”
রূপকথা নাম্বার বললে তানশান সেটি উঠিয়ে সেইভ করে দিল। অতঃপর কল দিয়ে সেটি রূপকথার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–“এখানে নাম্বার সেইভ করে দিয়েছি আমি। কল দিতে হলে এখানে ঢুকে এই নাম্বারে ক্লিক করলেই কল চলে যাবে।”
রূপকথা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলে,
–“ধন্যবাদ!”
পরপরই সাগ্রহে শুধায়,
–“তোমার নাম কি?”
তবে তার আগ্রহ মিলিয়ে গেল ছেলেটি জবাব না দিয়েই সেখান থেকে চলে যেতে। রূপকথার চঞ্চলতা মিইয়ে গেল ছেলেটির কাছ থেকে পাওয়া উপেক্ষায়। পরিস্থিতি আরেকবার দেখিয়ে তার অবস্থান আর প্রাপ্য। একজন সৎ মা তো এর থেকে উত্তম ব্যবহার আশা করে না। রূপকথা ম্লান হাসল।
–“কি হলো নতুন ভাবিজান? আফনে এইহানে দাঁড়াইয়া আছেন ক্যান?”, জবার প্রশ্নে রূপকথা তাকে ফোনটি দেখিয়ে বলল,
–“আমি এই ফোন ব্যবহার করতে পারছিলাম না, আপা? কিন্তু ও বুঝিয়ে দিয়েছে।”
জবা হেঁটে যাওয়া তানশানকে দেখে শুধায়,
–“কে, তানশান বাবায়?”
রূপকথা কিয়ৎকাল বোঝার চেষ্টা করল জবা কার কথা বলছে। বুঝল ঐ ছেলেটির নাম ই তানশান। সে বলল,
–“জি।”
–“আপনার সাথে কথা বলছে? খারাপ ব্যবহার করে নাই?”
রূপকথা অপ্রস্তুত হয়। না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“না, ও খুব ভালো ছেলে। আমায় সাহায্য করেছে।”
–“যাক শান্তি! আমি আরো কালকে থিকা ভাবতেছিলাম তানশান বাবায় কেমন না কেমন করে। আমগো তানশান বাবা খুব ভালো ছেলে। দেখতে হইবে না কার ছেলে! তপোবন ভাইজানের ছেলে, যে সবাইকে আদব কায়দা শিখাইয়া বেড়ায় তার ছেলে কোনদিন বেয়াদবি করতেই পারে না। আমি অনেক খুশি হইছি ভাবি! আপনার বয়স হইছে না-কি সংসার, বাচ্চাকাচ্চা সামলানোর। তার মধ্যে যদি আবার দূর্ব্যাবহার সহ্য করতে হইতো, তবে কষ্টের সীমা থাকত না। সবাই তো আর এমন মানুষদের ভালো চোখে দেখে না।”
জবা প্রফুল্ল হেসে বলল। রূপকথা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। অবুঝ কণ্ঠে বলে,
–“কেমন মানুষ, আপা?”
–“এই যে সৎ মা।”, জবা চঞ্চল কণ্ঠে বলেও মিইয়ে গেল। পরমুহূর্তেই বোকাসোকা কণ্ঠে বলল,
–“আফনে কষ্ট পাইয়েন না, ভাবি। আমি আরকি কথার কথা বলছি। আমগো তানশান বাবা অমন না।”
জবার কথার প্রেক্ষিতে রূপকথা মলিন হাসলো। সত্য তিতকুটে হলেও সত্যিই হয়। আর সত্যি এটাই সে সৎ মা। এই সমাজে সৎ মায়ের জীবন মোটেই সহজ নয় সে বোঝে।
জবা চলে যেতেই, মায়ের নাম্বারে কয়েকবার ফোন দেয় রূপকথা কিন্তু কেউ ফোন তুলল না। রিং হয় কিন্তু রিসিভ হয় না। রূপকথার অন্তস্থলে ভয় জেঁকে বসল। শরীর ঘেমে উঠলো কুচিন্তায়। তাকে তো নিরাপদে পাঠিয়ে দিয়েছে কিন্তু তারা দুজন কেমন আছে? আদৌ কি সুস্থ আছে?
কাছারি ঘরের ময়লা আবর্জনা প্রায় অনেকাংশ পরিষ্কার করা শেষ তখন। নিলীমা আঁচলে ঘাম মুছে পিঁড়িতে বসে ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে লাগল। তখনি সিকদার বাড়ির একজন কাজের মেয়ে ছুটে আসল তার কাছে। নানা আঙ্গিভঙ্গি করে বলতে লাগল,
–“ও রূপকথার মা, তাজা খবর কি শুনিছো? তোমাগো বাড়ি তো পুইড়া ছাই হইয়া গেছে।”
নিলীমা মৃদু চমকালো। আ’ত’ঙ্কে জর্জরিত কন্ঠে শুধায়,
–“কি বলো? সব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে?”
–“হু হু, একটা কিছুর টিকিটিও পাইবা না। কি ঝামেলা বাধাইছো দেখিছো? তোমাগো মারতে চায় এখন। হাতের কাছে পাইলে তোমাদের তিন মা মেয়ের খবর ছিল। ভাবোতো আইজকা রাইতটা ওই বাড়িতে থাকলে তোমাদের তিন মা মেয়ের কি হইতো? মাইয়ারে বিয়া দেয়ার সিদ্ধান্ত তোমার সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, নয়তো যেই মাইয়াগো ভালো থাকার জন্য এতোকিছু করো সেই মাইয়াগোই তুমি খুইয়ে ফেলতা। এহনো কি কানবা আর মাইয়া বিয়া দেয়ার শোকে?”, মেয়েটি রসিয়ে রসিয়ে বলল।
–“এগুলো কি ইচ্ছাকৃত নাকি দূর্ঘটনা, আমিনা? মিন্টু, গজা তো নাও করতে পারে এমনটা। আগে তো এমনকিছু করেনি।”
–“কি বলো দূর্ঘটনা? আশেপাশের অনেকে দেখিছে মিন্টু গজাদের ঐখানে বইসা মাতলামি করিতে।”
নিলীমা জবাব দেয় না শুকনো ঢোক গিললো সে। মেয়েকে বিয়ে দেওয়া তার কাছে এই মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত ই লাগছে, কিন্তু এর পরিনতি কি? তাদের তো এখানে থাকাই এখন বিপদজ্জনক। সিকদার বাড়ির এই এড়িয়ার ভেতরে ঢুকে তো তাদের কেউ কিছু করতে পারবে না কিন্তু বের হলে? জৈবিক চাহিদার কারনে তো তাকে বের হতেই হবে। কিন্তু যদি গজা মিন্টুদের সামনে পড়ে তবে? তাকে তো জানে মেরে ফেলবে!
–“আম্মা..,আম্মা..কেউ ফোন দিয়েছিল আম্মা ধরো।”, শুকতারার কথায় নিলীমা স্থবিরতা ভেঙে তড়িৎ গতিতে ফোন কেড়ে নেয়। নিশ্চয়ই রূপকথার ওখান থেকে ফোন দিয়েছে। বুক জুড়ে উচ্ছ্বাস নেমে আসলো। কেমন আছে তার মেয়েটা? মাকে ছাড়া তার একটারাত কেমন কাটলো? একটারাত মেয়ের থেকে দূরত্বে কলিজা শুকিয়ে গিয়েছে তার। মেয়ের একটু কন্ঠ শুনলেও কলিজাটা একটু ঠান্ডা হবে। নিলীমা কল ব্যাক করল এবং সাথে সাথেই রিসিভ হলো। অপরপাশে থেকে ভেসে আসলো উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর,
–“আম্মা? আম্মা তুমি কি ঠিক আছো?”
নিলীমার শুকনো মুখটিতে প্রাণবন্ত হাসি ফুটে উঠল মেয়ের কন্ঠে। মাতৃস্নেহের সাথে বলল,
–“ভালো আছি রে মা। তুই কেমন আছিস? তোর কি ওখানে কোন সমস্যা হচ্ছে কথা? কষ্ট হচ্ছে?”
মায়ের কন্ঠে রূপকথার মাথা থেকে একরাশ চিন্তারা বিলীন হয়ে গেলো। উদ্বিগ্নতা সামলে থমথমে মুখে বললো,
–“গোটা বিয়েটাই তো আমার জন্য একটা সমস্যা, আম্মা। তুমি যখন সেই সমস্যার কথা চিন্তা করোনি, তবে বিয়ের পরের সমস্যার কথাও চিন্তা করার দরকার নেই। আমি ভালো আছি; এই সমস্যা , কষ্ট নিয়েই ভালো আছি। এটাই তো এখন আমার জীবনের মানে।”
নিলীমার মুখটি আবার শুকনো হয়ে গেল। ম্লান কন্ঠে শুধায়,
–“মায়ের ওপর অভিমান কমেনি?”
–“মায়ের ওপর অভিমান করে কিভাবে, আম্মা? অভিমান করলে তো আর আমি ফোন দিতাম না।”
নিলীমা মৃদু হাসলো। ম্লান কন্ঠে বলল,
–“হয়তো আজ সংসার জীবনটাকে কষ্ট, সমস্যা মনে হবে। কিন্তু আমি জানি আমার কথা সুখ খুঁজে নেবে এই সমস্যার মাঝে থেকেই। সেদিন আমি হাসব তোর সুখ দেখে। মায়ের দোয়া সবসময় আছে তোর সাথে।”
রূপকথা উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে শুধায়,
–“শুকতারা কেমন আছে?”
–“আপাকে ছাড়া আমি ঘুমাবো কি করে? এই কথা জপতে জপতে গতকাল রাত থেকে বিছানায় গড়াগড়ি করছে আর ঘুমাচ্ছে।”, বলেই হেসে উঠলো নিলীমা।
–“ওই লোকগুলো তোমাদের কিছু করেনি তো আম্মা?”
নিলীমা ম্লান হেসে মেয়েকে শান্তনা দিয়ে বলল,
–“এগুলো নিয়ে আর চিন্তা করিস না। ঐ লোকগুলো এখন আর কিছু করতে পারবে না আমাদের। সিকদার বাড়ির দেয়াল টপকে আমাদের ক্ষতি করার সাধ্য কারোর নেই।”
–“আর সিকদার বাড়ির বাইরে বের হলে?”, রূপকথা তৎক্ষণাৎ প্রশ্নে নিলীমা নীরাবতায় আচ্ছন্ন হয়। এই প্রশ্নের জবাব যে অনিশ্চিত।
দুপুরের খাবার টেবিলে শাশুড়ি, ননদ, জা আর তানশান ব্যতীত কেউ খেতে আসলো না। সকলে নিজ নিজ কর্মে ব্যস্ত থাকায় নির্জনা বেগমের নিয়ম অসম্পূর্ণ থেকে গেল। সে আদেশ করলেন পরিবারের সকল সদস্য যখন একসাথে হবে তখন আবার এই আয়োজন হবে। মৌনতা অসন্তোষ প্রকাশ করলেও করার কিছু থাকে না। সে দেখেছে মেয়েটাকে রান্না করতে ঠিক কতটা হিমশিম খেতে হয়েছে। সে নম্র স্বরে বলল,
–“আম্মা, ঐটুকু মেয়ের উপর বিয়ের প্রথম দিনেই কি এত দায়িত্ব উঠিয়ে দেয়া ঠিক হচ্ছে?”
–“এখানে ঠিক বেঠিক এর কিছু নেই মেজো বউমা? এই দায়িত্বগুলো তার! আজ নাহোক কাল তাকে নিতেই হবে। তাই আজ থেকেই চর্চা শুরু করা উত্তম। তার জন্য সহজ হবে! আর তুমি তাকে আহ্লাদ না দিয়ে, দক্ষ হতে সাহায্য করলে বেশি ভালো হবে।”
–“আমি তাকে কোন আহ্লাদ দিচ্ছি না। শুধু তার বয়স বিবেচনা করে দায়িত্ব দিতে চাইছি, আম্মা।”
নির্জনা বেগম চোখ তুলে তাকায়। কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে বলে,
–“বয়স বিবেচনা না করে তার স্থান বিবেচনা করো, মেজো বউমা। সে এই বাড়ির বড় বউ, এক সন্তানের মা। তার দায়িত্ব অনেক অনেক বেশি তোমাদের থেকে।”
সেই দীর্ঘ বাকবিতন্ডা থেকে রূপকথা নীরবে শিক্ষা নেয়। জীবনের গন্ডি মাপে, যেখানে স্বামী সন্তান আর সংসার ব্যতীত আর কোন কিছুর জায়গা নেই। নেই সদ্য যৌবনে পা দেয়া নারী মন, বয়স আর স্বপ্নের কোন মূল্য।
সারাদিনের ব্যস্ততা সামলে রাত দশটা নাগাদ তপোবন বাড়ি ফিরল। অফিসের এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের কারণেই বাগেরহাট থেকে তড়িঘড়ি করে ফিরতে হয়েছে। লিভিং রুম পেরিয়ে যেতে নিলে নির্জনা বেগম ডেকে উঠলেন তাকে।
–“তপোবন, আমার কাছে এসে একটু বসো।”
তপোবন পা ঘুরিয়ে মায়ের সামনের সোফায় গিয়ে বসে। নির্জনা বেগম জবাকে বললেন,
–“তোর বড় ভাবিকে বল, তপোবনের জন্য এক গ্লাস পানি আনতে।”
–“দরকার নেই, আম্মা। আমি উপরে গিয়ে খেয়ে নেব। আপনি বলুন, কি বলবেন। তানশানকে পড়াতে বসতে হবে।”, তপোবনের ব্যস্ত কণ্ঠ। ছেলের পড়াশুনায় বেশ ভালো গ্যাপ পড়ছে। আজ পড়াতে না বসলে ছেলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
–“বড় ভাবিজান তো রোজ আফার ঘরে, আমি বরং আইনা দেই ভাইজানরে”, জবা চঞ্চল কণ্ঠে বলতেই নির্জনা বেগম গরম চোখে তাকায় তার পানে। শাসিয়ে বলে,
–“তোকে যেটা বলেছি তুই সেটা কর।”
জবা হড়বড়িয়ে ছুটলো রোজের ঘরে। রূপকথা কিয়ৎকাল বাদ পানি হাতে বসার ঘরে আসলো। তপোবন পানি নিল না ইশারায় টি টেবিলে রাখতে বলল। রূপকথা জবার পিছু পিছু ফিরে যেতে নিলে নির্জনা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন,
–“তপোবন কখন বাড়ি ফেরে, বের হয় এই সময়গুলো মাথায় রাখবে বড় বউমা। সারাদিন কাজ করে ফিরে এক গ্লাস পানি চাওয়ার জন্য যেন তোমায় অন্য এলাকা থেকে ডেকে আনতে না হয়।”
রূপকথা নির্বাক শুধু মাথা নেড়ে সায় জানায়। তপোবনের মধ্যে বিতৃষ্ণা ছেয়ে গেল। রূপকথা যেতেই সে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
–“এগুলো কি বাড়াবাড়ি নয়, আম্মা? আমি অচল নই—যে এক গ্লাস পানির জন্য কাউকে নিজ কর্ম থেকে ডেকে আনতে হবে।”
–“এগুলো কোন বাড়াবাড়ি নয় তপোবন। সে ছোট, এগুলো এখন থেকেই এভাবে হাতে কলমে বুঝিয়ে শুনিয়ে তাকে গড়ে নিতে হবে। নয়তো একটাসময় গিয়ে সে তোমার সংসারের হাল ধরতে হিমশিম খাবে।”
পরপরই বলল,
–“তোমায় যে কারণে ডেকেছিলাম। এরোজের সাথে কথা হয়েছে কি?”
–“হয়েছে।”
–“দেশে আসার কথা কিছু বলেছে?”
–“বলেনি, কিন্তু আমি বলেছি। ওর উইন্টার ভ্যাকেশন শুরু হয়েছে সপ্তাহ আগে। লম্বা ছুটি, বলেছি দেশে এসে ঘুরে যেতে। নায়েল, তানশানের জন্য হলেও একবার আসতে।”
নির্জনা বেগম হাতের কুশিকাটা রেখে চোখ তুলে তাকায়। চোখেমুখে উচ্ছ্বাস! সাগ্রহে শুধায়,
–“কি বলল, আসবে?”
তপোবন না বোধক মাথা নাড়লো। নির্জনা বেগমের সকল আগ্রহ, উদ্বেগ মিলিয়ে গেল হতাশার আড়ালে। আকাঙ্ক্ষা ভরা চাহনিতে চেয়ে বলে,
–“আমার ছেলেটা এমন কেন হয়ে গেল, তপোবন? এতটা উশৃঙ্খল, উদাসীন এরোজকে আমি কখনো কল্পনা করিনি। এত বছরেও ওর মাঝে একটুও পরিবর্তন দেখা গেল না। আমার কাছে একটাবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে না, মা কেমন আছি?”
নির্জনা বেগমের কম্পিত কণ্ঠে তপোবন নীরব থাকে। বলার মত কিছু খুঁজে পায় না। কিয়ৎকাল বাদ আশ্বস্ত করে বলল,
–“আমি ওর সাথে আবার কথা বলব, আম্মা।”
নির্জনা বেগম মাথা নেড়ে সায় জানায়।
–“একটু মায়ের সাথে এসে অন্তত দেখা করতে বলো। কত বছর হলো একটু ছুঁয়ে দেখি না।”
তপোবন সম্মতি জানিয়ে দ্রুত উপরে যায়। ব্যস্ততার সাথে কোনরকম পরিবর্তন করে ছেলের ঘরে ঢুকলো। ঢুকতে ঢুকতে জবাকে হাঁক ছেড়ে বলল খাবার ছেলের ঘরেই পাঠাতে। তানশান সারাদিন পর বাবাকে দেখে স্মিত হাসলো। তপোবন দ্রুত চেয়ার টেনে গম্ভীর গলায় বলে,
–“তানশান দ্রুত ম্যাথ বের করো। দুদিনে যতটুকু গ্যাপ পড়েছে তা আজ মেটাতে হবে।”
পড়াশুনা তানশানের প্রত্যাহিক জীবনের একমাত্র প্রিয় বিষয় হওয়ায়, পুরো দিনের মধ্যে বাবার সাথে পড়াশুনা করার এই সময়টুকু তানশানের খুব পছন্দের সময় হয়। সে সাগ্রহে বই বের করে পড়ায় মনোযোগী হয়। এটা উচ্চ মাধ্যমিক এর ম্যাথ! তার বর্তমান একাডেমিক এর বই সব কয়েকবার শেষ করায়, বাবা এখন তাকে উপর ক্লাসের ম্যাথ করাচ্ছে। নতুন কিছু শেখার তালে থাকায় তার পড়াশুনায় কখনো একঘেয়েমি আসে না বরং প্রতিটা দিন নতুন অনুভূতি আর জ্ঞানের মধ্য দিয়ে যায়। মা বিহীন একাকী জীবনে পড়াশুনা দারুণ এক সঙ্গী তানশানের।
তপোবনের ছেলেকে পড়াতে পড়াতেই খাবার খেয়ে নেয় আর সাথে ছেলেকেও খাইয়ে দেয়। শীতের রাত! বাবা ছেলে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশুনা করে আড়মোড়া ভেঙে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তানশান ক্লান্ত হয়ে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ল। বদ্ধ নেত্রে আবদার করে বলে,
–“পাপা, কম্ফোর্টার প্লিজ!”
তপোবন ছেলের ক্লান্ত স্বরে মৃদু হেসে কম্ফোর্টার গায়ে জড়িয়ে দিল। তানশান পুনশ্চঃ বলল,
–“লাইট নিভিয়ে চলে যেও, পাপা।”
তপোবন নীরবে ভেপোরাইজার মশার রিপ্লেন্ট লাগিয়ে দিয়ে লাইট নিভিয়ে দিল। লাইট নিভে যেতেই তানশান ফের লহু স্বরে বলল,
–“পাপা, দরজা চাপিয়ে দিও।”
ছেলের কথামতো তপোবন দরজাও চাপিয়ে দিও। তানশান ঘুমে আচ্ছন্ন হতে যাবে তন্মধ্যেই কম্ফোর্টারের আড়ালে শক্তপোক্ত দু’টো হাত তাকে জড়িয়ে নিলো। তানশান তড়াক মাথা তুলে তাকায় বাবার মুখপানে। কৌতুহলী গলায় শুধায়,
–“তুমি এখানে কেন?”
–“পাপা তোমার সাথে একটু ঘুমাতে পারি না?”, তপোবনে মৃদু হেসে শুধায়। তানশান নিরুদ্বেগ মাথা নেড়ে বলল,
–“পারো।”
বলেই সে শুয়ে পড়ে বাবার বুক ঘেঁষে। তপোবন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
–“ক্লান্ত বেশি লাগছে? বেশি পড়িয়ে ফেলেছি পাপা?”
–“নো, ইট’স ওকে। আমার ম্যাথ করতে ক্লান্ত লাগে না। কিন্তু আজ একটু ঘুম বেশি পাচ্ছে।”
–“ঠিক আছে ঘুমাও, পাপা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।”
তপোবন দেখল তানশানের মাঝে অভ্যাসের কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। এই যেমন ঘুমের অভ্যাস একটা পরিপাটি শৃঙ্খলার মধ্যে চলে এসেছে। অথচ সে আগের সেই মেসি এলোমেলো তানশানের জড়িয়ে ধরে ঘুমানোকে মিস করছে।
সে আক্ষেপ করে বলল,
–“আমার তানশান বড় হয়ে গিয়েছে, তাই না? এখন আর পাপার গায়ে হাত পা তুলে ঘুমায় না। আগে তো বেড নয়, পাপার বুক ছিল তানশানের ঘুমানোর জায়গা।”
বাবার আক্ষেপভরা কণ্ঠে তানশান স্মিত হাসল। বয়সের তারতম্যে এখন অনেক কাজেই তার ইতস্ততা অনুভব হয়। সে আজ নিজের এই পরিবর্তনকে খানিক উপেক্ষা করতে চাইল। ঠিক আগের মত বাবাকে চার হাত পায়ে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করল। তপোবনের বক্ষস্থল শীতল হয় সেই আলিঙ্গনে। কাঁটা কাঁটা চুলের ভাঁজে চুমু দিয়ে স্নেহের কণ্ঠে বলে,
–“ঘুমাও, কাল সকালে নাহয় বাড়িতে নামাজ পড়ো। মসজিদে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
–“নো, আমি যাব।”
–“আচ্ছা, যাবে।”
তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে সিলিং এর দিকে স্থির দৃষ্টি রাখে। একহাতে অনবরত ছেলের চুলগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে। জীবন সবসময় আমাদের মনের মত গতিতে চলে না। তার জীবন ও চলছে না। গতকালকের ঐ অস্বস্তিভরা অনুভূতি থেকে বাঁচতে, আর মেয়েটির স্বস্তি নিশ্চিত করতেই আজ এখানে ঘুমানো। তার জন্যই বোধহয় গতকাল মেয়েটি সারারাত ঘুমায়নি। সে জানে না এমন অস্বস্তিকর পরিবেশে কিভাবে সামনের দিনগুলো চলবে।
রাত এক ভয়ঙ্কর প্রহর রূপকথার জীবনে। সে পছন্দ করে না রাতের এই ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার। কারণ তার জীবনে এই অন্ধকার রজনীতে শক্তপোক্ত সঙ্গী হওয়ার মত শক্তিশালী কেউ নেই। তাই সে চারিদিকে ওঁত পেতে থাকা পশুদের ভীড়ে রূপকথার রাত কাটতো ভীষণ ভয়ার্ত অনুভূতির সাথে। যেই ভয়ার্ত অনুভূতি থেকে বাঁচার এবং নিশ্চিন্তে রাত্রী যাপনের একমাত্র মাধ্যম হতো মায়ের কোল। ঐ কোলটুকু রূপকথার ভাগ্যে যতক্ষণ স্থায়ী ছিল ততক্ষণ ভয় ককনো ছুঁতেই পারেনি তাকে। অথচ আজ? আজ ভয়ে কুঁকড়ে আছে রূপকথা।
খোলা বারান্দার দরজাটুকু পর্যন্ত লাগানোর সাহস পাচ্ছে না, এমনকি তাকাতেই পারছে না ঐ অন্ধকারের দিকে।
মা বোধহয় এই সুরক্ষিত জীবন দেয়ার জন্যই তাকে বিয়ে দিয়েছে। মা কি জানে তার রূপকথাকে নিরাপদ জীবন দিতে গিয়ে সে কেমন একাকী দুনিয়ায় ছুঁড়ে ফেলেছে? এখানে তার ভয়গুলোকে দূর করার জন্য কোন শক্তপোক্ত আশ্রয় নেই। কারোর ভ্রুক্ষেপ ই নেই ছোট্ট মেয়েটির কোন সমস্যা হচ্ছে কি-না এটা দেখার!
একাকী ঘরের এক কিনারয় সোফায় দুই হাঁটু আঁকড়ে সেঁটে বসে থাকা রূপকথা টলটলে নেত্রে নিজের ভয়কে সামাল দিচ্ছে। মনে মনে স্বান্তনা দেয়—এই তো আরেকটু তারপরেই রাতের অন্ধকার কেটে যাবে। তার ভয় ও দূর হয়ে যাবে।
স্বামী নামক মানুষটা না-কি তাকে সব বিপদ আপদ, ভয় থেকে রক্ষা করবে, আগলে রাখবে—মায়ের ভাবনাকে ভুল হতে দেখে রূপকথার ঠোঁট ভেঙে আসল। ঘুমে চোখ বুঁজে আসলেও চোখ বন্ধ করার সাহস পায় না। সে ঝিমাতে থাকে ঐ সোফার এক কিনারায় বসে। গায়ে শুধুমাত্র একটা শাল। ভয়ে ঘেমে ওঠা শরীরের কাছে প্রকৃতির শীতলতা নিছকই প্রহসন!
রাত গভীর হতেই থাকে। বহু সময় বাদ খট করে শব্দ হলো রূপকথার ঘরে। ঝিমিয়ে রূপকথা চার হাত পায়ে লাফিয়ে উঠল। শব্দের উৎস খুঁজতে গেলে কেউ বিকট শব্দে হাঁচি দিতে দিতে তার ঘরের দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো। রূপকথা সেভাবেই জমে রইল সোফায়। পরিচিত মুখ দেখে বক্ষস্থলে খানিক স্বস্তি ছড়িয়ে গেল। টিস্যুতে মুখ গুঁজে লাগাতার হাঁচি দিতে দিতে লাল হয়ে যাওয়া নাক চোখ মুছতে মুছতে তপোবন ঘরময় দৃষ্টি ফেললে ভড়কে যায়। পুরো ঘরময় আলোয় জ্বলজ্বল করছে। তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঘরের এক কিনারায় সোফায় গুটিয়ে বসে থাকা ভয়ার্ত মুখটি। সে অপ্রস্তুত শুধায়,
–“কি হলো, তুমি এতরাতে ওখানে বসে আছো কেন?”
রূপকথা টলটলে নেত্র তুলে বাঁকা চোখে তাকায়। মিনমিনে স্বরে বলে,
–“ঘুমাতে পারছিলাম না, তাই বসে আছি।”
–“কেন? কোন সমস্যা হয়েছে?”, তপোবন বেডসাইড মিনি কাবার্ড থেকে নিজের এলার্জির ওষুধ বের করতে করতে শুধায়। এই এলার্জির করণে তার বেহাল দশা হয়ে যায় প্রায়শই। ঘুমাতে গেলে হাঁচি কাশি সর্দির অনাকাঙ্খিত আবির্ভাব ভীষণ বিরক্তিকর। রূপকথা জড়তায় ভুগলো কিয়ৎকাল, অতঃপর সাহস করে বলল,
–“আমি একা ঘুমাতে পারি না।”
–“ওহ্!”, তপোবন ওষুধ খেয়ে বলল। এরপর আর টু শব্দটি হলো না কক্ষ জুড়ে। তপোবন ওষুধ খেয়ে বের হয়ে যায় ঘর থেকে। রূপকথার এবার ঠোঁট ভেঙে কান্না আসল এমন মানুষের ভরসায় কি-না আম্মা তার গোটা জীবনটা লিখে দিল? যার বিন্দুমাত্র খেয়াল কিংবা মনুষ্যত্বের কাজ করে না তার প্রতি! নিরব অশ্রু গড়াতে লাগল। হয়তো এভাবেই বসে বসে জীবনের বাকি রাতগুলো কাটাতে হবে, অন্তত যতদিন ভয়কে না জয় করতে পারে!
তবে তার সকল অবুঝ ধারণাকে ভ্রান্ত ধারণায় পরিণত করে দিয়ে মিনিট তিন বাদেই তপোবন আবার ঘরে ঢুকলো। রূপকথা দ্রুত চোখের পানি মুছে আড়চোখে তাকায়। তপোবনে দরজা আঁটকে, বারান্দার দরজা আঁটকালো অতঃপর লাইট নিভিয়ে দিয়ে সোজা বিছানার এক কিনারায় শুয়ে পড়ল। রূপকথা কিয়ৎকাল অবুঝের মত তাকিয়ে তাকিয়ে তার কার্যক্রম দেখলো। কিয়ৎকাল বাদ অনুভব করল তার এখন ভয় কম লাগছে। পুরো ঘরময় যখন একবারে শুনশান হয়ে গেল তখন সে ধীরস্থির সোফা থেকে নেমে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল। আজ আর বসে রাত কাটানোর ভুল ভাবনা মাথায় আনলো না, বরং জড়তা সমেত তপোবনের অপরপ্রান্তে বিছানার পাশ ঘেঁষে গুটিয়ে শুয়ে পড়ল।
তপোবন আঁধারে ধূসর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে অন্তঃস্থল থেকে। ছেলের ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে এসেছে, নয়তো ফজর ওয়াক্তে উঠতে পারবে না। সে কাছে থাকলে তো আর এলার্মের প্রয়োজন পড়ে না। কারণ তার আজানের সাথে সাথে ঘুম ভেঙে যায়। তবে এযাত্রায় সে বুঝে নেয়, তাকে এখন থেকে আরেকজনের মন বুঝে চলতে হবে। মনে পড়ে লোকমুখে মুখে শোনা ভীষণ তীক্ত বেদনাদায়ক এক সত্যের কথা—
–“দুনিয়া থেকে যখন কোন মানুষ চলে যায়, সে এমনভাবে চলে যায়—যেন কখনো তার কোন অস্তিত্বই ছিল না।”
তপোবন আজ অনুভব করছে বাক্যটি ভীষণ বেদনাদায়ক সত্যতা বহন করে।
