Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৮

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৮

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৮
তোনিমা খান

অনাকাঙ্ক্ষিত বৈবাহিক জীবনের দু’টো রাত পাড় করে ফেলেছে রূপকথা। এই বৈবাহিক জীবনের গন্ডি ছিল রান্নাঘর, শাশুড়ির ঘর, শাশুড়ির আরোপিত এক একটা আদেশ মান্য করা, সংসারের খুঁটিনাটি বিষয় আত্মস্থ করা পর্যন্ত। এই দু’টো দিনে শাশুড়ি তাকে পাশে বসিয়ে কানের কাছে তসবিহ’র মতো পাঠ করেছে সংসারের প্রতি তার কত দায়িত্ব! সংসারের প্রতিটি বিষয়ে তাকে পূর্ণ মনোযোগী হতে হবে, সংসারের হাল ধরতে হবে, স্বামীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজগুলোতে যেন আর কাজের লোকের হাত না লাগে। আর রূপকথা নিরুত্তর মেনে নিয়েছে সেই সকল দায়িত্ব। তার জীবনের ভিত্তি এখন এই সংসার জুড়েই, নাকোচ করবে কি করে? আর তার নাকোচ শুনবেই বা কে! যেখানে সে পুরো মানুষটাই গুরত্বহীন, পরিস্থিতির স্বীকার। যে যা পারছে, যেভাবে পারছে যুবতী মন মস্তিষ্ক, চাওয়া পাওয়াকে পিষ্ট করে একের পর এক দায়িত্ব কাঁধে তুলে দিচ্ছে।
বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা স্বর্নালংকার থেকে একটা বড় জড়োয়া হার সমেত চুড়ি কানের দুলের বাক্স রূপকথার হাতে দেয় নির্জনা বেগম। এক পলক রূপকথার শুকনো মুখটির দিকে তাকিয়ে থমথমে মুখে বললেন,

–“বিয়ের সময় তো বেশিকিছু দিতে পারিনি, এটা রাখো। আরোকিছু ছোট ছোট গহনা দিচ্ছি, সেগুলো সবসময় পড়বে। হাত কান গলা কখনো খালি রাখবে না।”
রূপকথা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। মৌনতা আর রোজ বিছানার এক কিনারায় আলাদা ভাবে রাখা অলংকার গুলো নেড়েচেড়ে দেখছিল। তা দেখে নির্জনা বেগম সাবধানী কন্ঠে বললেন,
–“ওগুলো যেন নষ্ট না হয়, আস্তে ধরো।”
মৌনতা মৃদু হাসল শাশুড়ির কথায়। সে হাতের অলংকারটি রেখে দেয়। এগুলো তানশানের মায়ের অলংকার। নির্জনা বেগম খুব যত্নে সামলে রেখেছে। কাউকে ছুঁতে দেয় না। বাহিরে বাজি ফোঁটার শব্দ ভেসে আসছে। নির্জনা বেগম মৌনতাকে বললেন,
–“মেজো বউমা নায়েল আর তানশানকে এখন ঘরে ডাকো। অনেক হয়েছে পিকনিক। পড়ে দেখাযাবে কোন অঘটন ঘটে বসবে।”
বাজির শব্দে পুলকিত, মাতোয়ারা রোজের মন। সে হাতের অলংকার গুলো রেখে মাকে অনুনয় করে বলল,

–“আম্মা আমি একটু বাইরে যাই তানশানদের কাছে?”
নির্জনা বেগম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মেয়ের দিকে।
–“তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি রোজ! এই রাতে মেয়ে মানুষ হয়ে অতো গুলো পুরুষের মাঝে যাওয়ার কথা তুমি মাথায় আনো কিভাবে? যত দিন যাচ্ছে মর্ডানিজামের নামে তুমি উচ্ছ্বন্নে যাচ্ছো।”
রোজ আহত দৃষ্টিতে তাকায় মায়ের দিকে। আহত কন্ঠেই বলে,
–“এটাকে তোমার উচ্ছ্বন্নে যাওয়া মনে হচ্ছে, আম্মা? বাহিরে সকলে বাজি ফুটাচ্ছে, আনন্দ করছে আমি সেটা উপভোগ করতে চাইছি, কোন পুরুষ মানুষকে দেখতে নয়। ওখানে কারা আছে তাতে আমার কি?আমি আমার মতো থাকলেই হলো!”
–“মুখে মুখে তর্ক করবে না রোজ! এমন করেই সকলে বিপথগামী হচ্ছে। আনন্দ ফুর্তির নাম করে অশ্লীলতা ছড়াচ্ছে যুবক-যুবতীদের মাঝে।”, নির্জনা বেগম ধমকে উঠল। রোজ রাগে লাল হয়ে যায়।

–“সবাইকে এক কাতারে ফেলবে না, আম্মা। সবাই এক হয় না।”
রাগান্বিত স্বরে বলেই রোজ উগ্র চিত্তে কোলের উপর রাখা বালিশটা ছুঁড়ে মেরে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। বালিশটা গিয়ে কক্ষের কিনারায় স্ট্যান্ডের উপর থাকা ফ্লাওয়ার ভাসটির গায়ে লাগে। ফলশ্রুতিতে ফ্লাওয়ার ভাসটি মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। নির্জনা বেগম ক্ষিপ্ত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন এহেন কান্ডে,
–“দেখেছো কতো বড় বেয়াদব হয়েছে ও? মেয়ে মানুষের এতো রাগ ভালো না। আর আমার ঘরের ছেলেরা তাদের বোনকে মাথায় চড়িয়ে চড়িয়ে এমন উশৃঙ্খল তৈরি করেছে। এর পরেও বলো ওকে পড়াতে? পড়াশুনা করে হাতির পাঁচ পা দেখে বসলে তাকে দিয়ে আর স্বামী,সন্তান, সংসার হবে না।”
মৌনতা, রূপকথা নির্বাক শ্রোতা হয়ে দেখে যায় মা-মেয়ের দ্বন্দ্ব। মৌনতা এসবের সাথে আগে থেকে পরিচিত হলেও রূপকথা অপরিচিত। তবে এতোটুকু বুঝতে পেরেছে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নির্জনা বেগম আধুনিক চিন্তাধারা এড়িয়ে চলা একজন মানুষ।
পড়াশুনা এই শব্দটির উপস্থিতির রূপকথার জীবনে আরো দৃঢ়ভাবে শঙ্কাজনক হতে লাগলো। যতোই দিন বাড়ছে পড়াশুনার প্রতি আগ্রহে দিনদিন তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ছে রূপকথা। পড়াশুনা তার জন্য দূর্লভ হয়ে যাচ্ছে বলেই কি এতো তৃষ্ণা?
মৌনতা শাশুড়িকে নম্র কণ্ঠে বলল,

–“ও কষ্ট পেয়েছে আম্মা, আপনি রেগে যাবেন না। বাইরে সকলে এতো আনন্দ করছে—যে কারোর ইচ্ছে করবে আনন্দে শামিল হতে।”
–“হ্যাঁ হ্যাঁ, যে কারোর ইচ্ছে তো করবেই, অপসংস্কৃতিতে মানুষ বেশি আগ্রহী যে! তোমাদের মনেও আবার এমন কোন ইচ্ছা জাগছে নাকি? জাগলে এখনি সেটা গলা চেপে মেরে ফেলো আর স্বামী সংসারের প্রতি মনোযোগী হও।”
নির্জনা বেগম ক্ষিপ্ত কণ্ঠে মৌনতা ম্লান হেসে মাথা না বোধক মাথা নাড়ে। এই বাড়িতে পা দেওয়ার সাথে সাথেই সে যুবতী মনের কিছু কিছু চাওয়া পাওয়া মেরে ফেলেছে। তবে অন্তরালে স্বামী নামক মানুষটিকে নিয়ে বেশ স্বপ্ন গড়েছিলো যেগুলো ও দিনশেষে কেমন অপূর্নতার খাতায় লিপিবদ্ধ। বিয়ে মানেই কি শুধু স্বামী-স্ত্রীর চাহিদা, প্রয়োজন আর দায়িত্ব পূরন? স্বামীর ভালোবাসা কেনো দৈহিক সম্পর্ক পর্যন্ত ই সীমাবদ্ধ? বিয়ে করো, স্বামীর প্রয়োজন পূরন করো, বাচ্চা উৎপাদন করো, সংসারের প্রয়োজনীয়তা পূরন করাই কি সংসারজীবন? নাকি সংসার, কাজ ছাপিয়ে একে অপরের হাতে হাত ধরে কোন এক নির্জনে বসে সুখ দুঃখ বিনিময় করাও স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার মাঝে পড়ে? সাঁঝ বেলায় স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে হাঁটতে যাওয়া কেন স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার মাঝে পড়ে না? কেন কারণ ব্যতীত মানুষটার সাথে ফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হয় না? এক বুক হাহাকার মিশ্রিত প্রশ্ন মৌনতার অন্তরালে। আসলেই কি এগুলো স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না? নাকি শুধু মৌনতার ক্ষেত্রেই এই অদ্ভুত বৈবাহিক জীবন? উপন্যাস, টেলিভিশনে তো বৈবাহিক সম্পর্ক কত সুন্দর, তবে তার বৈবাহিক সম্পর্ক এমন কেন? এই জীবনের সকল চাওয়া পাওয়া স্বপ্ন সে এই স্বামী আর তার সংসারের জন্য ত্যাগ করেছে। এই সংসার স্বামী তার জন্য অনেক মূল্যবান।

–“মেজো বউমা তোমার কি কিছু প্রয়োজন?”
মৌনতার স্থবিরতা ভাঙলো শাশুড়ির প্রশ্নে। মিহি স্বরে শুধায়,
–“কি আম্মা?”
–“গহনা?”
মৌনতা মাথা নেড়ে বলল,
–“নাহ আম্মা, আমার যথেষ্ট রয়েছে। কিছু লাগলে আপনাকে বলব।”
–“সবসময় ই তো এমন বলো, কিন্তু কখনো তো কিছু চাও না। তোমার নিজের ব্যাপারে অনেক উদাসীনতা মেজো বউ। কোন কিছু নিয়ে তোমার মাঝে কোন চাহিদা দেখা যায় না।”
–“এতো চাহিদা দিয়ে কি হবে আম্মা, দেখার মানুষ-ই যদি না থাকে?”, মৌনতা ম্লান কণ্ঠে বললো। রূপকথা চোখ তুলে তাকায় হঠাৎ করেই মৌনতার মলিন হয়ে যাওয়া মুখটির দিকে। এসেছে থেকে মানুষটাকে প্রাণোচ্ছ্বল, চঞ্চল, বড় বোনের মতো পাশে পেয়েছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একজন সুখী মানুষ মনে হয়েছে, তবে কি তার ও দুঃখ রয়েছে? কিন্তু কেন? নির্জনা বেগমের হাত থেমে যায় মৌনতার কথায়। সে গম্ভীর গলায় বলল,
–“দেখার মানুষকে নিজের গড়ে নিতে হয় বউমা। কিন্তু তোমার মধ্যে সেই বাসনাটাই দেখা যায় না।”
–“দেখার হলে এইসব প্রাণহীন অলংকার, কৃত্রিম সাজগোজের প্রয়োজন পড়ে না আম্মা, জীবন্ত মানুষটাই তার কাছে শ্রেষ্ঠ হয়।”, মৌনতা মৃদু হেসে বলল।

–“এইসব কাব্যিক কথা বইয়ের পাতাতেই মানায় বউমা, বাস্তবে নয়।”, নির্জনা বেগমের দৃঢ় কণ্ঠ।
–“সেই বইয়ের পাতায় ও তো কেউ না কেউ লিখেছে, আম্মা? একেবারেই কি নিরর্থক এই কথাগুলো?”
–“নাহ্, নিরর্থক নয় কিন্তু তোমার জন্য নিরর্থক। তাই ওগুলো মাথায় রাখলে তোমায় বারংবার আশাহত হতে হবে। এরজন্য ই আমি বলি এসব কথা কানে তুলবে না।”
–“এতোক্ষণে ঠিক কথা বলেছেন আম্মা। এগুলো আমার জন্য নিরর্থক।”, মৌনতা এক গাল হেসে বলল, অথচ দৃষ্টি তার টলমলে। রূপকথা যেন হঠাৎ করেই অনুভব করতে পারল এই হাসিখুশি মানুষটি দুঃখে জর্জরিত! সে ম্লান দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মুখ শক্ত করে তাকিয়ে থাকা মৌনতার দিকে। ঐ তো এক ফোটা শিশির বিন্দুর ন্যায় অশ্রু পড়ল বলে! রূপকথার অন্তঃস্থল খামচে ধরলো। নিজে দুঃখ লালন করলেও অন্যের দুঃখে তার বুক পোড়ে। সে নিজের হাতটি আলতো করে মৌনতার হাতের উপর রাখলো। মৌনতা মৃদু হকচকায় অত্যাধিক ঠান্ডা স্পর্শে। সে তড়িৎ চোখের পানি মুছে রূপকথার দিকে তাকায়। রূপকথার হাতটি নিজের দু’হাতের মাঝে নিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বলল,

–“তোমার হাত এত ঠান্ডা কেন কথা? এই চাদরে তোমার শীত মানছে না, তাই না? আমার সাথে এসো, আমার অনেক সোয়েটার রয়েছে—যা আমি একদিন ও পড়িনি। সেখান থেকে আপাতত একটা পড়ো।”
পরপরই শাশুড়ির উদ্দেশ্যে বলল,
–“আম্মা, রূপকথার অনেক কিছু কেনাকাটার প্রয়োজন।”
নির্জনা বেগম মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বললেন,
–“তপোবন আসলে আমি বলব। আপাতত তুমি একটা সোয়েটার দাও।”
–“আমার শীত করছে না, ভাবি।”, রূপকথা মিহি স্বরে বলল। মৌনতা বিরোধিতা করে বলল,
–“বললেই হলো? তোমার হাত কি পরিমাণে ঠান্ডা হয়ে আছে। চলো আমার সাথে।”
মৌনতা রূপকথাকে টেনে উপড়ে নিয়ে যায়। উপর থেকে অনেকক্ষণ পর নামে রূপকথা। খাবার ঘরে গিয়ে নিজের জন্য একগ্লাস পানি ঢেলে নিতেই কেউ ক্ষিপ্র গতিতে এসে তার পা জড়িয়ে ধরলো। আদুরে গলায় বলল,
–“বলো মাম্মা, আমায় পানি দাও।”
রূপকথা মৃদু হেসে নায়েলের দিকে তাকায়‌, পানির গ্লাসটি এগিয়ে দিয়ে তাকে দু’হাতে তুলে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বলল,

–“এখানে বসে পানি পান করো।”
নায়েল হাঁফাতে হাঁফাতে পানি পান করে। অনেক ছোটাছুটি করেছে ভাইজানের সাথে। তানশান নায়েলকে ডাকতে ডাকতে খাবার ঘরে আসে। রূপকথার সাথে চোখে চোখ পড়তেই তানশান সন্তপর্ণে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। সেও পানি পান করার জন্য ই এসেছে। নায়েলের পানি পান করা শেষ হতেই সে প্রফুল্ল হেসে ভাইজানকে বলল,
–“আমি ফার্স্ট, ভাইজান।”
–“তুমি দৌড়ে এসেছো, নায়েল। দৌড়ে আসলে আমিও ফার্স্ট হতাম।”
–“তোমায় বালন কলেছে কে?”, নায়েল মুখ বাঁকিয়ে বলল। তানশান কপাল কুঁচকে তাকায় তার দিকে। কথা ছিল দৌড় দেয়া যাবে না, কিন্তু বোন তার মস্তবড় চিটার। কুঁচকানো মুখটির সম্মুখে সরব কেউ এক গ্লাস পানি ধরতেই তানশান চোখ তুলে তাকায় রূপকথার দিকে। রূপকথা পানিটা এগিয়ে দিয়ে বললো,
–“নাও।”
তানশান এক পলক গ্লাসটির দিকে তাকিয়ে গ্লাসটি হাতে তুলে নেয়। সেভাবে দাঁড়িয়েই পানির গ্লাস মুখে নিতে নিলে পুনশ্চঃ রূপকথার কণ্ঠ ভেসে আসে,
–“বসে পানি পান করতে হয়।”
তানশান থতমত খাওয়া দৃষ্টিতে তাকায় রূপকথার কথায়। এটা তার একটা বদভ্যাস। বাবা সবসময় তাকে এর জন্য বকে। সে চেয়ার টেনে বসে পুরো পানি শেষ করে বেরিয়ে যায় খাবার ঘর থেকে।

আজ থার্টি ফার্স্ট নাইট। এইদিনে এক নতুন প্রারম্ভের আনন্দে শহর জুড়ে আলোকিত। কোনায় কোনায় প্রফুল্লতা বিরাজমান। সিকদার বাড়ির জন্য ও এইদিনটি খুব বিশেষ এবং আনন্দময়। তপোবনদের পাশাপাশি দুটো প্লটে দু’টো বাড়ি। একটি তিন তলা বিশিষ্ট যেখানে তারা নিজেরা থাকে আরেকটি পাঁচতলা বিশিষ্ট যেটা সম্পুর্ণটা ভাড়া দেয়া। পাশের প্লটে এইদিনে বিশাল পিকনিকের আয়োজন হয়, চারিপাশের অনেক পরিবার মিলে। সিকদার বাড়িও প্রতিবছর যুক্ত হয় এই পিকনিকে। নায়েল আর তানশান সন্ধ্যা থেকে সেখানেই ছিল।
রাত বাড়তেই তপোবন হাত ভরতি উপহার নিয়ে সরোবরে ঢোকে। তার সাথে ঢোকে তকদির সাহেব। তবে মৌনতার দৃষ্টিতে ব্যাকুলতা দেখা যায় ইমরোজকে না দেখে। মানুষটার আজ আসার কথা ছিল। বলেছিল রাতের মধ্যে এসে পড়বে। মৌনতা ফোন দিলো তাকে কিন্তু ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সে নিজেকে সামলে নিলো, হয়তো পথে আছে।
তকদির সিকদার ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসতে বসতে হাস্যোজ্জ্বল কন্ঠে বলল,

–“কই, কি উপহার এনেছ আমার জন্য? দাও।”
তপোবন বাবার হাতে একটা পাঞ্জাবির সেট তুলে দেয়। তকদির সিকদার সানন্দে সেটি খুলে দেখতে লাগলো। তার আর চিন্তা নেই এই পরিবারটির জন্য। সে জানে তপোবন দক্ষ হাতে সামলে নেবে তার পরিবারটিকে এবং পরিবারের খুশিকে। তপোবন একে একে সকলকে উপহার দেয়। নায়েলের খুশির অন্ত নেই নতুন জামা, জুতা আর চকলেট দেখে। তানশান বাবার আনা ব্যাগটি দেখে মৃদু হাসল। তার ব্যাগ ছিড়ে গিয়েছিল বাবার মনে আছে। ব্যাগের সাথে মিনিসো এর কিছু কিউট কিউট চাবির রিং আর একটা পানির বোতল রয়েছে। মায়ের জন্য, মৌনতার জন্য আর মাজেদার জন্য শাড়ি এনেছে। রোজ আর জবাকে দিয়েছে থ্রিপিস। রোজ সেটি মলিনমুখে নিলো। মায়ের সাথে ঝগড়া করে তার মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। তপোবন মৃদু হেসে বোনকে আগলে নেয় নিজের সাথে। নম্র কন্ঠে শুধায়,

–“মন খারাপ কেন, রোজ?”
–“কিছু না, ভাইজান।”, রোজ মুখ ফুলিয়ে বললো।
–“রোজের দেখছি খুব মন খারাপ। এখন এই মন খারাপ কিভাবে দূর করব? দেখো তো এই গুলো কেমন লাগছে?”, তপোবন একটি ছোট্ট প্যাকেট এগিয়ে দেয় রোজের দিকে। রোজ অনাগ্রহে সেটি খুলল। তবে খুলতেই তার চোখ বৃহৎ আকারের ধারণ করল ব্যাগ ভরতি আতশবাজি দেখে। সে বড় বড় চোখ করে তাকায় ভাইয়ের দিকে। তপোবন বোনের প্রতিক্রিয়া দেখে হেসে ফেলল। তাড়া দিয়ে বলল,
–“চলো ছাদে যাই। নায়েল, তানশান আব্বু চলো বাজি ফোঁটাবো।”
নায়েল আর তানশান হৈ হৈ করে উঠল আনন্দে। তবে সবাইকে উপহার দিলেও রূপকথাকে কোন উপহার দেয়নি তপোবন। বিষয়টি দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় মৌনতা এবং নির্জনা বেগমের। সকলের মাঝে মেয়েটি এক কিনারায় চুপটি করে বসে ছিল পুরোটা সময়।
রাত এগারোটা পর্যন্ত আনন্দ, হৈ হুল্লোড় করে কাটলো সকলের। অতঃপর খাওয়া দাওয়া করে সকলে যে যার ঘরে চলে গেল। মৌনতাকে উপরে যেতে দেখে নির্জনা বেগম তাকে পিছু ডাকলো।
–“মেজো বউ মা, একটু কথা শুনে যাও।”
মৌনতা গিয়ে শাশুড়ির পাশে বসে। নির্জনা বেগম হাতের কুশিকাটা রেখে মেয়েটির শুকনো মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করে। শুধায়,

–“শুনেছি আজ না-কি ইমরোজ আসবে? কখন আসবে?”
–“গতকাল বলেছিল আসতে আজ রাত হবে, আম্মা। এখন ফোন বন্ধ বলছে, কোন খোঁজ খবর জানি না।”
–“গতকাল? আজ আর কথা হয়নি?”, নির্জনা বেগমের ললাটে মৃদু ভাঁজের দেখা মিলে। মৌনতার চোখেমুখে উদাসীনতা ছেয়ে গেল। উদাসীন কন্ঠে বলল,
–“না রোজ তো কথা হয় না, আম্মা। আপনার ছেলে খুব ব্যস্ত থাকে তো, হুটহাট ফোন দিলে বিরক্ত হয়।”
নির্জনা বেগম অতল ভাবনায় তলিয়ে গেলেন। নত মস্তকে আবার কুশিকাটা হাতে তুলে নিতে নিতে বললেন,
–“স্বামী সংসারের প্রতি যত্নবান হও মেজো বউ মা। ইমরোজের খুশিমতো চলার চেষ্টা করো, ও যেমন চায় নিজেকে সবসময় তেমন করে সাজাও। আশাকরি আর ভেঙে বলতে হবে না। আজ আসছে, নিজেকে এমনভাবে গুছিয়ে রেখো যেন ও খুশি হয় আর ঘরের প্রতি ওর টান বাড়ে। স্বামীকে ধরে রাখা শেখো।”
মৌনতার হ্যাংলা পাতলা অবয়ব ফের মলিন হয়ে পড়ল শাশুড়ির কথায়। সে মলিন মুখে বলল,
–“স্বামী কি ধরে রাখার জিনিস, আম্মা? জলজ্যান্ত এক মানুষকে কি করে ধরে রাখে?”
নির্জনা বেগম শক্ত দৃষ্টিতে তাকায়। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

–“স্বামী ধরে রাখারই জিনিস, বউমা। প্রতিটা স্ত্রীর দায়িত্ব স্বামীর প্রতি সবসময় সহানুভূতিশীল, দায়িত্ববান থাকা।”
–“ধরে রাখার এই যুগে থেকে যাওয়ার মানুষ পাওয়া খুব ভাগ্যের ব্যপার, তাই না আম্মা?”
নির্জনা বেগমের মুখ চুপসে গেল।
–“ভাগ্য দূর্ভাগ্য যাই হোক না কেন তোমার সেই বিষয়ে এখন মাথা ঘামানো উচিৎ নয় বউমা। কারণ তোমার ভাগ্য এখন ইমরোজ। তাই কিভাবে তাকে আঁকড়ে ধরে আজীবন বাঁচতে পারো সেই চিন্তা করো।”
মৌনতার টলটলে নেত্র! সে তে সব ছেড়েছুড়ে এই স্বামী সংসারকেই তার পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছে। এই পৃথিবী যদি ওলোটপালোট হয়ে যায় তবে তার বাঁচার কোন উপায় থাকবে না। এই সংসার জুড়ে যে তার গভীর খুঁটি গাঁথা। এই খুঁটি যদি ইমরোজ উপড়ে ফেলে তবে সে আর তার নায়েল নিঃশেষ হয়ে যাবে।
ছেলের ঘর থেকে নিজের ঘরে এসে তপোবন দরজা আঁটকে পুরো ঘরে চোখ বুলায়। ঘরে ফিরে তার প্রতিদিনের কাজ হলো নিজের ঘরটা গুছিয়ে নেয়া। তবে আজ আর তার প্রয়োজন হলো না। ঘর আগে থেকেই গোছানো, লন্ড্রি বাস্কেটের পোশাকগুলো ও ভাঁজ করে সোফায় রাখা। সে সেগুলোকে কাবার্ডে ঢুকিয়ে রাখতেই রূপকথা বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকল। তপোবন তাকে দেখে বলে,

–“তুমি তোমার জামাকাপড় কোথায় রাখছো? রাখার তো জায়গা দেখছি না। তুমি বরং এখানে রাখো তোমার কাপড় চোপড়। পড়ে নাহয় কোন ব্যবস্থা করা যাবে।”
নিজের জামাকাপড় গুলো সরিয়ে সরিয়ে রেখে বলল তপোবন। দুই পাল্লার কাবার্ড। যেখানে একটাতে এখনো পূর্বার কাপড়চোপড় তারা বাবা, ছেলে সামলে রেখেছে। আর একটা তার। রূপকথা নতশির সায় জানায় আর বারবার আড়চোখে তাকায় তপোবনের দিকে। মৌনতা ভাবি বলেছে তপোবন ভাইজানকে বললেই সে পড়াশুনার ব্যবস্থা করে দেবে। সে বলার জন্য উশখুশ করছে। এতোক্ষণের তৈরি করা কথাগুলো কেমন ওলোটপালোট হয়ে গেল লোকটিকে দেখেই। লোকটির মুখটি যেমন রাগচটা ভেতরটা ও কি তেমন? মনে তো হয় না।
–“কিছু বলবে?”, ভাবনায় বিভোর রূপকথা আচমকা তপোবনের কন্ঠে হকচকায়। অপ্রস্তুত ঘন ঘন না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“নাহ।”
বলেই বোকা বনে গেল রূপকথা। সে তো কিছু বলতে চায়। তপোবন আবার নিজ কাজে মগ্ন হয়। পাঞ্জাবি খুলে ফতুয়া পড়ে সে। সেন্টার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগাতে লাগলো। শীতের দিনে চামড়া টানটান করে এটা বেশ বিরক্তিকর।
রূপকথা গুটিগুটি পায়ে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। মিনমিনে কন্ঠে বলল,
–“কিছু বলার ছিল।”
–“সেটাই তো জিজ্ঞাসা করেছিলাম? তুমি তো নাহ বললে।”

রূপকথা নিজের বোকামি হজম করে নিলো। সে মনে সাহস জোগায়। হয়তো মুখের ওপর না শুনবে এখন, তবুও মনের শান্তি বড় শান্তি। একবার বলে মনকে নাহয় মাটি চাপা দিয়ে রাখবে। সে লম্বা শ্বাস নিয়ে নম্র কন্ঠে বলল,
–“আমি পড়াশুনা করতে চাই।”
–“চাইলে করবে।”
নিজের কথা বলেই রূপকথা মাথা নিচু করে নিয়েছিল। কিন্তু সাথে সাথে ভেসে আসা পুরুষালী ভারী নম্র কন্ঠটিতে সে আশ্চর্য হয়ে গেল। তড়াক চকচকে দৃষ্টিতে তাকায় নিজ কর্মে মগ্ন তপোবনের দিকে। তবে উদগ্রীব হয়ে আর কিছু বলার সাহস করে ওঠে না। সম্মতি দিয়েছে এতোটুকুই তার জন্য অনেক। সে বিছানা করতে করতে আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল তপোবনকে। তপোবন যেন আরো কিছু এই বিষয়ে বলে আশা বলতে এতোটুকুই তার মনে। তপোবন নিজের কাজ সেরে টেবিলের উপর রাখা বিশাল প্যাকেটটি নিয়ে রূপকথার কাছে এসে দাঁড়ায়। রূপকথা চোখ তুলে তাকাতেই তপোবন হাতের প্যাকেটটি তার হাতে তুলে দিল। নম্র কন্ঠে বলল,
–“আজ বছরের শেষ দিন, আমাদের বাড়িতে এই দিনে সকলকে কিছু না কিছু উপহার দিতে হয়। কিন্তু তোমার বিষয়ে তো আমি কিছু জানি না। তাই কি দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তখন মনে হলো এই মুহূর্তে তোমার জন্য এর থেকে বেটার কোন গিফট হতে পারে না। হ্যাপি নিউ ইয়ার। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটা দিন তোমার ভালো কাটুক। অনেক বড় হও, অনেক কিছু অর্জন করো।”

বলেই তপোবন সরে যায়। নিজের কাজ সেরে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দেয়। রূপকথা তখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ভারী প্যাকেটটির দিকে। প্যাকেটে অনেকগুলো বই। ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে গোটা গোটা অক্ষরের দ্বাদশ শ্রেণী লেখা। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তিতে তার আঁখিদ্বয় ভিজে উঠল। ভেবেছিল এ যাত্রায় হয়তো আর পড়াশুনা করতে পারবে না। জীবনে এতো বড়ো বিদঘুটে পরিবর্তনের মাঝে সামান্য এক সুখের কাছে রূপকথার সকল দুঃখরা ফিকে পড়ল। সে বইগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে টেবিলে রেখে দেয়। লাইট নিভিয়ে নীরবে বিছানার এক কিনারায় শুয়ে পড়ল। তবুও খুশি, উত্তেজনায় ঘুম ধরা দিল না। সে পাশ ফিরে তাকায় তার দিকে পিঠ করে ঘুমিয়ে থাকা তপোবনের দিকে। মিনমিনে কন্ঠে শুধায়,

–“আমি কোন পর্যন্ত পড়াশুনা করতে পারব?”
তপোবন সদ্যই চোখ বুজেছিল। রূপকথার প্রশ্নে বদ্ধ নেত্রেই বলল,
–“যেই পর্যন্ত তুমি চাও।”
–“আমি কি ডাক্তার হতে পারব?”
–“চাইলে অবশ্যই পারবে।”
–“আমি ডাক্তার হতে চাই।”
–“হতে চাইলে হবে।”, তপোবনের নির্ভেজাল, শান্ত স্বাভাবিক কন্ঠে রূপকথার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে বোকাসোকা কণ্ঠে বলল,
–“হয়তো অনেক খরচ হবে। কিন্তু আমি যখন ডাক্তার হয়ে যাব, তখন আপনার সব টাকা দিয়ে দেব।”
এতোক্ষণ অনড় থাকলেও রূপকথার বুঝদ্বার কন্ঠে অবুঝ কথায় তপোবনের ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে রূপকথার দিকে কাত ফিরল। অন্ধকারে অস্পষ্ট মুখটির দিকে তাকিয়ে নম্র কন্ঠে বলল,

–“আমি ইনকাম করি-ই তো আমার স্ত্রী, সন্তানের জন্য। তাদের পড়াশুনা, সবকিছুর ব্যয় বহন করার জন্য। আমার যেটুকু যা ইনকাম সেটা তোমার আর তানশানের। তাই এসব বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে পড়াশুনায় মনোযোগ দাও। দিনশেষে দু’জনে আমায় একটা ভালো ফলাফল দিও তাতেই আমি সন্তুষ্ট। আর একটা কথা চেষ্টা করো খুলনা মেডিকেলে চান্স নেয়ার। তাহলে আমার একটু সুবিধা হবে আরকি। নয়তো দূরে কোথাও চান্স পেলে আম্মার সাথে আমার বিশাল এক দ্বন্দ্ব বেঁধে যাবে।”
বলেই তপোবন কপালে হাত দিয়ে সোজা হয়ে ঘুমায়। আর রূপকথা অন্ধকারে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল কপাল হাত দিয়ে শুয়ে থাকা মানুষটির দিকে। লোকটা কতোটা সহজভাবে সম্পর্কটাকে তুলে ধরলো। তার তো একটুও বিরক্ত আসছে না লোকটির প্রতি বরং মনে সাহস তৈরি হচ্ছে তার পাশে, তার সাথে একটি শক্ত,দায়িত্ববান ঢাল রয়েছে এই ভেবে। যে কি-না তার জীবনের সকল কাঠিন্যতা দূর করে দেবে।
কপালে হাত দিয়ে তপোবন অতল ভাবনায় তলিয়ে গেলো। জীবনে পরিবার এবং সম্পর্কগুলো নিয়ে ধাক্কা খেতে খেতে সে এখন দক্ষ জটিল সম্পর্ক গুলোকে সহজ করতে। তাই তো জীবনে দুইজন মানুষের ক্ষেত্রে স্ত্রী শব্দটি ব্যবহার করতেও দ্বিধাবোধ হলো না। সে তো স্বজ্ঞানে বিয়ে করেছে—তবে কি প্রয়োজন সম্পর্কটাকে জটিল করার। তার দায়িত্ব সে পালন করে যাবে। সর্বাবস্থায় স্ত্রীর মান সম্মান, ভালোথাকা সুনিশ্চিত করে যাবে। কখনো কোন বাঁধার সম্মুখীন হতে দেবে না।

ঘড়ির কাঁটা রাত সএকটা পেরিয়ে গেল। মৌনতা তখনো অপেক্ষা করছে ইমরোজের। মানুষটা তো বলেছিল রাত হবে। আর কতো! ফোনটাও যে বন্ধ!
শাশুড়ির কথা কখনো ফেলে না মৌনতা। শাশুড়ির কথামতোই নিজেকে সাজাতে চায় ইমরোজের পছন্দমতো। অথচ ইমরোজকে খুশি করার তাগিদে তাকে জড়াতে হবে এমন পোশাক, যা শরীরে জড়ালেও মনের গভীরতাকে বিষিয়ে তোলে। অতি ক্ষুদ্র, প্রলুব্ধকর সেই পোশাক চোখে পড়লেই তার ভেতরে জন্ম নেয় বিতৃষ্ণা—কিন্তু স্বামীর মুখে হাসি ফোটানোর একমাত্র উপায় যে এটাই। দ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন মৌনতা নিজের মনকে কোনোভাবেই মানাতে পারে না। কারণ তার কাছে রূপের প্রকৃত আকর্ষণ মানেই লাল টুকটুকে শাড়ি, সাথে অনাড়ম্বর আনুষাঙ্গিক কিছু ছোট অলংকার, আর খোঁপায় গুঁজে রাখা সাদা গজরা। সে পারলো না নিজেকে ইমরোজের পছন্দসই সাজাতে। সে সাজলো তবে নিজের পছন্দসই। একটা লাল টুকটুকে সুতির শাড়ি, কিছু অলংকার আর একটা কৃত্রিম গজরা। চোখে কাজ টানলো, ঠোঁটে লালচে রঙের রঞ্জক পদার্থ। অল্পস্বল্প কিছু সাজসজ্জা—যা ঘরকুনো বধূটির সৌন্দর্য তরতর করে বাড়িয়ে দিল।
মৌনতা যখন নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত ঠিক তখনি আলিশান বাড়িটির নিস্তব্ধতা ভেঙে কলিং বেলের আওয়াজ ক্ষিপ্রতার সাথে ঝনঝনিয়ে উঠল। সহসা মৌনতার বদনে উচ্ছ্বাস বয়ে গেল। ইমরোজ এসেছে নিশ্চয়ই! সে ছুটে বের হয় ঘর থেকে। ছোটার তালে পায়ে হালকা ব্যথা অনুভব হলেও তা উপেক্ষা করল। অসুখ বিসুখ সাময়িক এই স্বামীর সুখের কাছে বাঁধা হতে পারে না। সে ছুটতে ছুটতে এসে সদর দরজার সামনে এসে থামে। উচ্ছ্বসিত বদনে দরজা খুলতেই তার খুশি মিলিয়ে গেল। আচমকা বিস্ময় ছুঁয়ে গেল সম্মুখের অনাকাঙ্ক্ষিত মুখটি দেখে। দৃষ্টি আঁটকে যায় শিকারী দু’টো সূচালো ধূসর নয়নে। সে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৭

–“ছোট ভাইজান, আপনি?”
সদ্য নামানো আঁখিদ্বয় একদম নিরুদ্বেগ, অনুভূতিহীন। এরোজ লম্বা লম্বা কদমে তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে গমগমে স্বরে বলল,
–“জবাকে দিয়ে ব্যাগগুলো উপরে পাঠিয়ে দেবেন।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৯