Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৮

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৮

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৮
Maha Aarat

নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের প্রিয় গ্রহ পৃথিবীর একটি অংশ যখন সূর্যের আলোয় আলোকিত হয় তখন তা দিনরূপে গণ্য হয়।পৃথিবীর অন্য অংশে তখন সূর্যের ছায়া হিসেবে আলো আটকে যায় বা বাধাগ্রস্ত হয়।এ আবরণই হলো রাত।মানুষ যে সমস্ত বিষয়গুলোকে ভয় পায় তার মধ্যে অন্ধকার অন্যতম, কারণ আমরা জানিনা যে, অন্ধকারে আমাদের সাথে কি ঘটতে চলেছে বা সেখানে কি লুকিয়ে আছে।
প্রতিটি অন্ধকারেই পেছনেই লুকিয়ে থাকে এক টুকরো উজ্জ্বল আলো।গভীর অমানিশা,আর কুচকুচে অন্ধকারে রাতগুলো হারিয়ে যায়।ক্লান্ত চোখের স্বপ্নরা সব নিভে যায়।ছুটে চলে নতুন স্বপ্নে বুনতে।
হাফসা রুমে এসেছে বেশ কিছুক্ষন হলো।লোকটার ভাবসাব তাঁর সুবিধার লাগছে না।যত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে,ততো তাড়াতাড়ি তাঁর বুকের ধুকপুকানি কমে যাবে।

আরহাম কাছে আসতেই সে গুটিয়ে গেলো।চোখ তুলে আর তাকালো না।তাঁর নতমুখী ললাট স্পর্শ করতে আরহামকে ঝুঁকতে হলো খানিকটা।আলতো স্পর্শে কপালে স্পর্শ আঁকতেই তাঁর আচমকা শক খাওয়া অনুভব করতে পারলেন তিনি।লাজুকলতার এতো লাজুকলতা কীভাবে ভাঙ্গানো যায়!
সরে এসে হাতের উনার ভাঁজে তার হাত জড়িয়ে নিতেই কেন যেন আরেকটু পিছে সরে গেল সে।আরহাম অদ্ভুত দৃষ্টিতে কয়েক পলক তাকিয়ে হাত ছেড়ে দিলেন।এলোমেলো এলোমেলো নিজেকে গুছিয়ে নিতে নিতে অন্যপাশ ফিরে ঘুমোতে ঘুমোতে বললেন, ‘ঘুমিয়ে পড়ুন।’
হাফসা মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও উনার নীরবতায় আহত হলো।লোকটা কি কষ্ট পেলেন? না রাগ করে দূরে গেলেন?
এসব কিছু সে ভাবতে পারছে না।এখন তার ঘুম দরকার।
পেরিয়েছে ঘন্টা খানেক।আরহামের চোখে ঘুম নেই।পাশ ফিরতেই দেখলেন গালে হাত রেখে জড়োসড়ো হয়ে উনার বেশ কাছাকাছি শুয়েছে মেয়েটা।আরহাম ও এদিক ফিরেই একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন উনার লাজুকফুলের দিকে।আল্লাহ মেয়েদের এত যত্নে সৃষ্টি করেছেন যেনো মনে হয় তাঁর সৌন্দর্যের মাঝে কোনো খুঁত নেই।

সকালে উনার ডাকে ঘুম ভাঙতেই দেখলো শুভ্র জুব্বাতে তিনি রেডি।হাফসাকে নামাজের আদেশ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
হাফসা আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো।তাঁর নাকে লাগছে অসম্ভব সুন্দর একটা খুশবু।লোকটা তাঁর আশেপাশে ছিলেন বলে স্মেলটা কি তাঁর আশেপাশেও পাচ্ছে?এসব ভাবতে ব্যস্ত সে পরক্ষণেই সময় দেখে দ্রুত অযু করতে গেলো।
সন্ধ্যায় নাস্তার টেবিলে লোকটাকে অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশীই চুপচাপ লাগছে।এমনকি অন্যদিনের মতো হাফসার দিকে তাকাচ্ছেনও না।তিনি কি রাগ করলেন গতকালকের জন্য?উত্তরটা খুঁজছে সে।কিন্তু নিশ্চিত হলো তখনই যখন আরহাম রুমে যাবার আগে ড্রয়িং রুমে তার পাশেই আম্মুকে বললেন, ‘এক কাপ কফি চাই আম্মু।কষ্ট করে দিবেন প্লিজ।’
কিন্তু অন্যসময় হলে তিনি হাফসাকেই বলতেন।মনটা ভারী হয়ে গেলো হাফসার।সারাদিন খারাপ কেটেছে আজ।লোকটাকে তো ভালো করে বুঝেই না সে।তাহলে রাগ ভাঙ্গাবে কীভাবে!

আম্মুর সাথে কাবার্ড গুছিয়ে রাখতে বেশ দেরী হলো।আইরা মাইমুনা দূজনেই ঘুমে।হাফসার চোখেও ঘুম দেখে আম্মু বললেন, ‘অনেক কষ্ট করেছো বাকিটা আমি করে নিতে পারবো।তুমি ঘুমাও গিয়ে।’
হাফসা যেতে চাইলো না।তবুও আম্মু তাকে জোর করে রুমে পাঠানোর তাড়া দিয়ে হাতে ছোট্ট একটা ফাইল হাতে ধরিয়ে বললেন, ‘ওটা আরহামকে দিও।’
হাফসা চুপচাপ বেরিয়ে মাইমুনার ঘরের দিকে তাকালো।উনার তো আজকে আপুর ঘরে থাকার কথা।ঘুমে তাঁর চোখ বুজে আসছে।আর কোনোদিকে না তাকিয়ে সে রুমে যেতে দেখলো উনার রুমের ভেন্টিলেটর থেকে আলো আসছে।তারমানে এখনো জেগে তিনি।যত দ্রুত সম্ভব আমানতটা গুছিয়ে দিলেই হলো।কিন্তু আরহামের রুমের সামনে গিয়ে তাঁর বুক কাঁপলো।লোকটা তো আজকে সারাদিনে কথাও বলেননি।তাঁর রুমেও যাননি।নিশ্চয়ই রেগে আছেন।কীভাবে সামনে যাবে সে।ভাবতে ভাবতে নক করলো দরজায়।উনি উল্টোমুখ হয়ে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে কাজ করছেন।দরজায় নক হতেই মাথা দিয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর দিলেও তাকালেন না।

কিন্তু মিনিট দূয়েক পরেও কোনো আওয়াজ না পেয়ে ব্যস্তদৃষ্টিতে ঘুরে তাকালেন।প্রথমে চোখ সরিয়ে নিলেও পরক্ষণেই ওর দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন।ওপাশের মানুষটা যে উমায়ের হবেন,আরহাম ভাবেন নি।
হাফসা ফাইল টা ইশারা করতেই তিনি ওয়াডড্রবের ওপর রাখার ইশারা করে আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।হাফসা তখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে।এই ঠান্ডা মানুষটার রাগ আছে জানতোই না সে।
আরহাম তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালেন।উনার দৃষ্টি এখনো হাফসার দাঁড়িয়ে থাকার কারন জানতে চাইছে।হাফসা কিছুটা উসখুস করতে করতে বুঝালো, আপনি কি রাগ করে আছেন।আরহাম তাঁর দিকে ঘুরে ধীরলয়ে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়তেই মুখটা আরো শুকনো হয়ে গেলো হাফসার।
কীভাবে রাগ ভাঙ্গাবে জানতে চাইলে তিনি কিছুটা সময় নিয়ে উত্তর দিলেন, ‘পারবেন রাগ ভাঙ্গাতে?’
সুযোগ পেয়ে তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়ালো সে।
‘আমার রুমে থাকতে হবে।’
বেশ।হাফসা রাজি।কিন্তু আরহাম কথা শেষ করলেন না।বললেন, ‘যদি আপনার অস্বস্তি না হয়!’
থাকতে তো তাঁর সমস্যা নেই।এক ঘুমে রাত কাবার।যদিও এই রুমে তাঁর প্রথম বিচরন।অযু শেষেও এসে দেখলো তিনি উনার কাজে ব্যস্ত।কমফোর্টার টা গায়ে জড়িয়ে ঘুমাতে গেলেই তিনি বাতি বন্ধ করে ড্রীম লাইট দিতে দিতে বললেন, ‘ফ্যান বন্ধ করে দিবো?’
না উত্তর আসতেই পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঠান্ডা লাগছে?’
তবুও না উত্তর আসতে জানতে চাইলেন, ‘তাহলে কমফোর্টার কেন?’
এটা তাঁর অভ্যেস।উত্তর দিয়ে সে চুপচাপ শুয়ে পড়লো।

ঘুমের মধ্যে অনুভব করলো লোকটা তাঁর পাশে এসে শুয়েছেন।নাকে ভাসছে কড়া সুঘ্রাণ।হাফসা একটুও নড়লো না।আড়চোখে সামনে ঝুলিয়ে রাখা ঘড়িতে নিঁখুত দৃষ্টিতে তাকালো।মধ্যরাএি চলছে।হাফসা আর চোখ খুললো না।জড়তায় মিইয়ে গেলো সে।আরহাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘খিদে লেগেছে? ‘
হাফসা মাথা নাড়লো।আরহাম হেসে বললেন, ‘জেগে যে আছেন শিওর হলাম।এখন যদি আমি জিজ্ঞেস করতাম উমায়ের জেগে আছেন।ভুল করেও উত্তর দিতেন না।’
হাফসা আর কিছু না বলে ঘুমোনোর চেষ্টা করলো অথচ তার কানে এলো এক উন্মাদ কন্ঠস্বর।আরহাম ধীরসুরে টেনে টেনে বলতে লাগলেন ,
“আপনাকে ভালোবাসা থেকে আটকে থাকতে নিজের সাথে কয়েক’শো বার যুদ্ধ করেছি উমায়ের।এবার স্ব’ইচ্ছায় সেই যুদ্ধের পরাজয় মেনে নিলাম।আমার পরাজয়ে আপনার আপত্তি নেই তো,হোমাপাখি?”
আরহাম কোমল স্পর্শে তার নরম কায়া দখল করে নিলেন।হাফসা এলোমেলো নিজেকে সামলানোর সুযোগ পেলো না।
রাতের নিস্তব্ধতায় রাতারাতি আরহামের উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ হলো সে।জড়তায় গুড়িয়ে যাওয়া ছোট ফুলটাকে আরহাম ভালোবাসার চাদরে আগলে নিলেন।খোঁলা জানালা দিয়ে জোৎস্না গলিয়ে পড়লো,উজ্বল তারকারাজি অন্ধকারে আবিষ্ট হয়ে গেলো!শুদ্ধ ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে থাকলো কেবল এক টুকরো আঁধভাঙ্গা চাঁদ।

সকালের দূই ঘন্টা মাহেরকে কলেজে সময় দিতে হয়।তারপর হসপিটালের উদ্দেশ্য যাএা।যথারীতি শিডিউল চলছে কিন্তু আজকে সকাল সকালই হসপিটালে থেকে কল আসার কারন সম্পর্কে তিনি অজ্ঞাত।দ্রুত রেডি হয়ে হসপিটালে আসতেই রিসিপশনে অমিকে দেখলেন।সালামের জবাব দিয়ে অমিকে কেবল জিজ্ঞেস করলেন, ‘হুট করে এতো ইমার্জেন্সী কল?ঘন্টা দূয়েক পরে আমি তো আসতাম ই।
অমি অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো।রিসিপশনিষ্ট এসে বললেন, ‘স্যার আপনাকে এখুনি থার্ড ফ্লোরে মাহতাব স্যারের রুমে যেতে হবে।’
মাহেরের ভ্রু কুঁচকে এলো আপনাআপনি।বিশেষ কোনো কারন ছাড়া তো মাহতাব মির্জার কক্ষে ডাকা হয় না।লিফটে উঠে অমিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি জানো কেন ডাকা হয়েছে?’
‘শিওর নয় স্যার।তবে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি।’
‘কি?’
‘ধারনা ভুল হলে আপনি আবার শাস্তি দিবেন।তাঁর চেয়ে বরং নিজ কানেই শুনুন।’

মিনিট বিশেক পরে সিনিয়র মাহতাব মির্জার রুম থেকে বেরিয়েই মাহের ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে অমির দিকে তাকালেন।অমি মাথা নিচু করলে মাহের দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন সুরে বললেন, ‘তোমার দোষ আছে এতে।তোমাকে কতবার ওয়ার্ন করেছি ওই মেয়েটা যেনো আমার কেবিনে না আসে।এই দায়িত্ব টাও পারলে না।’
অমি অপরাধীসুরে বলল, ‘স্যার আমি তো আসতে দেইনি।লাস্ট দিন রিসিপশনেই তো….
‘আমাকে একটা কল দিয়ে জানাতে পারতে মেয়েটা রিসিপশনে।তাহলে তো আমি ওর এি সীমানায় ও আসতাম না।’
‘ন্ নামাজে ছিলেন তো স্যার…..
মাহের চোখমুখ কুঁচকে বেরিয়ে গেলেন।উনার চোখে ক্রোধের আগুন দাউদাউ করছে।বারবার বলছেন, ‘সামান্য একটা মেয়ের জন্য আমাকে এতো নিচু কথা শুনতে হলো।মান সম্মান কিছু বাকি আছে?’
‘না স্যার!’
বলেই চটপট জিভ কাটে অমি।ফের বলে, ‘জ্ জ্বি স্যার।’

‘কীভাবে থাকলো?’
‘মাহতাব স্যার তো আপনাকে সন্দেহ করছেন মিস মশা উফ সরি মিস এশার সাথে আপনার কিছু আছে।আপনি অন্য কাউকে বিয়ে করে স্যারকে প্রমান করে দিন,দোষটা মিস এশার।আপনি সত্যিই এসব কিছুর সাথে নেই।’
‘বিয়ে ছাড়া কোনো উপায় নেই?’
‘আ্ আপাতত নেই স্যার।’
‘ইডিয়ট।একটু বুদ্ধিও নেই মাথায়।আমার তো নেই-ই তোমারও নেই।চলো।’
অমি বিড়বিড়িয়ে বলল ‘যেমন গুরু তেমন শিষ্য!’
‘কিছু বললে?’
‘ন্ না তো স্যার।কিছু বলিনি।’
অমি বাধ্য ছেলের মতো মাহেরের পিছুপিছু চলতে লাগলো।সে যে কোনো একদিন এই স্যারের কাছেই প্রান টা খুঁয়াবে এতে তাঁর আর সন্দেহ নেই।স্যারের খুব উচিত একটা বিয়ে করা।বিয়ে করাটা একেবারে ইমার্জেন্সী হয়ে পড়েছে।একটা ভালো মেয়েই পারবে স্যারের আগুন মেজাজ কন্ট্রোলে রাখতে।

মাইমুনাকে আইসক্রিম খাইয়ে দিচ্ছেন আরহাম।এই ফাঁকে তাঁর নতুন মেডিসিনের লিস্টটাও বুঝে নিচ্ছেন।মাইমুনার এক্সিডেন্টের সময় তাঁর শরীরের বোনস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।যার দরুন সেইসব বোনস কে্ পাওয়ারফুল মেডিসিন দিয়ে অক্ষত রাখতে হয়।যাতে তাঁর এনার্জি একেবারে লো তে না আসে।
আরহামের দিকে তাকিয়ে তাঁর দৃষ্টি মলিন হয়ে যায়।আহত সুরে বলেন, ‘আমার জন্য মাসে মাসে এতো বড়ো অঙ্কের মেডিসিন ঢেলে কী হবে।আমি তো আর সুস্থ হবো না।’
আরহাম তাঁর গালে হাত রেখে বললেন, ‘ও হানি।এত অধৈর্য্য হওয়া যাবে না।এটা আল্লাহর একটা পরিক্ষামাএ।আমি চাই,আপনি এই ধৈর্য্যের পরিক্ষায় জিতে যান।’
‘আপনি আছেন বলেই ভরসা পাই।’
‘আর কাউকে লাগবে?’
‘না না আমি অমনটা বলিনি।’
আরহাম হেসে বললেন, ‘আর আপনি আছেন বলেই আমার হ্দয়ে প্রশান্তি থাকে।উমায়ের তো নতুন আমার জীবনে।কিন্তু উনি আসার আগে তো কম ঝড় বয়ে যায়নি।আমাকে উৎসাহ,আশ্বাস দেওয়ার জন্য আপনিই তো সবসময় পাশে ছিলেন,এখনও আছেন।নইলে আমি কবেই ভেঙে গুড়িয়ে যেতাম।’
মাইমুনা চমৎকার হাসলেন।উনার হাসিতে সন্তুষ্টির বারিধারা উপচে পড়ছে যেনো।আরহাম পুনরায় মুখে আইসক্রিম তুলে দিতে জিজ্ঞেস করলেন ‘হাফসাকে দিয়েছেন?’

‘না।’
‘ওর জন্য এনেছন?’
‘উহু।’
‘মানে?কেনো?এটার গুরুতর অন্যায়।’
‘উনার সর্দি।’
‘কীভাবে যে ঠান্ডা লাগালো মেয়েটা।’
আরহাম আইসক্রিম ফ্রীজে রেখে উঠতে উঠতে হাতঘড়িতে সময় দেখে বললেন, ‘আর খাওয়া যাবে না।কফ হবে।
আমি এখন আসি।আমাকে বেরোতে হবে রেডি হয়ে।’
‘যাওয়ার আগে দোয়া নিয়ে যাবেন।’
‘জ্বী।’
আরহাম বেরিয়ে গেলে মাইমুনা দরজা টা ভিড়িয়ে ফ্রীজের পার্শ্বে গেলো।বাকি আইসক্রিম টুকু শেষ করার আগে কী তাঁর নিস্তার হবে?

আইরাকে দিতে এসে কাকতালীয়ভাবে মাহেরের সাথে মুখোমুখি হয়ে গেলেন আরহাম।মাহেরের এখানে আসার কারন সম্পর্কে যখন অবগত হলেন আরহাম অবাক।
‘ব্যস্ততার জন্য তোমার সাথে কন্টাক্ট করতে পারিনি।আর এখানে জয়েন এর মাএ কিছুদিন হলো।এখানে জয়েনের অফারটা অনেক আগে এসেছিলো।আমি বরাবরই এড়িয়ে গিয়েছি সময় হয় না বলে।এখন যেহেতু শহরে পার্মানেন্টলি শিফট হয়ে গেলাম এখন আর কোনো অজুহাত দেখানোর সুযোগ পেলাম না।তবে খুব শীঘ্রই কোনো অজুহাত খুঁজে নিবো।’
আরহাম রম্যসুরে বললেন, ‘সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে।কিন্তু উমায়ের এর একজন ভাবি পাওয়া হচ্ছে না।’
মাহের হালকা হেসে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলেন।আরহাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘একা রান্না করে খাও?’
‘সময় আছে?কিনে খাই।’
‘বাহিরের খাবার যে কতটুকু হার্মফুল এটা শেষ বয়সে যখন স্থায়ী রোগে ভোগবে তখন বুঝবে।এর জন্য হলেও একজন হালাল সঙ্গীর প্রয়োজন।’

মাহের পুনরায় বিষয়টি এড়িয়ে বললেন, ‘হাফসা কেমন আছে?ওকে নিয়ে কবে আসবে বাসায়?যদিও এলোমেলো সব।চলে যাচ্ছে কোনোরকম।’
আরহাম মুচকি হাসতেই মাহের মাথা নেড়ে বললেন, ‘এখন বলো না ঘর গুছিয়ে রাখার জন্য হলেও একজন হালাল সঙ্গীর প্রয়োজন।’
‘বলার আগেই বুঝে নিলে।’
‘হু।’
‘তুমি কোন সেমিস্টারে ক্লাস নাও?’
‘ইন্টারমিডিয়েট,অনার্স।’
‘তাহলে তো আইরার ক্লাস পাও।এবসেন্স যারা থাকে তাদের জন্য কড়া পানিশমেন্ট রেখো।এই জন্য হলেও একটু ভয় পাবে।ও যেনো আবার ডাব্বা না মারে এই ভয়ে আছি।’
মাহের ঘড়িতে সময় দেখে বললেন, ‘হাফসাকে নিয়ে এসো।মিট হবে ইন শা আল্লাহ।আর আমার বোনকে কখনো কষ্ট দিবে না আরহাম।ব্যস্ততার কারনে কন্টাক্ট করতে পারছি না কিন্তু তোমার ওপর ভরসা আছে।’
‘কষ্ট দেওয়ার আগে একবার হলেও তোমার কথা ভাববো।সমন্ধিক ওৎ পেতে আছে আমাকে পানিশমেন্ট দেওয়ার জন্য।এনিওয়ে,তুমি এসো।অনেকদিন আসো না।দেখা হবে ইন শা আল্লাহ।’
‘ইন শা আল্লাহ।’

কলেজে এসেই সে ক্যান্টিনে টু মারলো।ক্যান্টিনের কিছু খাবার যেনো ফাইভ স্টার হোটেলের খাবার থেকেও ডিলিসিয়াস।ক্যান্টিনের খাবারটা মিস করবে না বলেই কলেজে আসার একটু আগ্রহ পায় সে।
ক্লাসে স্যারের মনোযোগ মাল্টিমিডিয়ার পর্দায় আর বইতে।আজকে সবচেয়ে পেছনের সিটে বসেছে সে।এজন্য স্যারের আর তাকে নজরে পড়ার সুযোগই নেই।অবশ্য স্যার এমনিও তাকাবেন না।সামনের সেইমলেস মেয়েদের ডিঙ্গিয়ে ডিঙ্গিয়ে উনার দৃষ্টি এতদূর আসবে না।
আইরা বইটা দাঁড় করিয়ে রেখেছে সামনের ব্রেন্চের মেয়েটার ব্যাগের সাথে হেলান দিয়ে।এখন আর তাঁর কোনো অসুবিধা হবে না।মেয়েদের কন্ঠ শোনা যাচ্ছে বেশী।এবার ঠেলা বুঝুন মেয়েদের ক্লাস নিতে কেমন লাগে।
খাওয়া শেষ পর্যায়।সমুচার শেষ অংশ টা মুখে দিবে সে।আচমকা বইটা হেলে পড়তেই ধড়ফড়িয়ে ধরতে গেলেই সেটা হাতছাড়া হয়ে গেলো।ভয়ার্ত চোখজোড়া তুলে দেখলো স্যারের হাতে সেটা।
‘ক্লাস কি খাওয়ার জায়গা?’খেতে যখন হচ্ছে ক্যান্টিনে গিয়ে খেতে পারলেন না?আমি এনার্জি লস করে পড়াচ্ছি।আপনি সেটা তোয়াক্কা না করে পুরোদমে অমনোযোগী।’
মাহেরের কন্ঠে কাঠিন্যতা।আইরার কেনো জানি চোখ ভরে জল চলে আসলো।বোধহয় সবাই এ মুহুর্তে তাকে নিয়ে হাসছে এজন্যই।তাকে এখনো বসে থাকতে দেখে মাহের বেশ ধমকে বললেন,
‘বাকি খাবারটা ক্যান্টিনে গিয়ে শেষ করুন।গেট লস্ট!’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৭

লোকটার ধমকে তাঁর রুহ অব্দি কেঁপে উঠলো।বারবার পলক ফেলে চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে।দ্রুত ব্যাগ আর বই হাতে নিয়ে চলে যেতে চাইলে মাহের পেছন থেকে বললেন ‘এগুলো নিয়ে যান!’
নিতে গিয়ে তাঁর খাবারের প্যাকেটটা হাত ফসকে পড়ে গেল।সেটা কোনোমতে তুলে কোণার ডাস্টবিনে ফেলে দ্রুত বেরিয়ে গেলো সে।মাহের কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তাঁর যাওয়ার দিকে পরক্ষনেই পড়ায় কনসেন্ট্রেইট করলেন।কারোর আর হাসি আড্ডা বা কানাঘুষো করার সাহস থাকলো না মাহেরের কঠিন রূপ দেখে।তাদেরকে কাজ দিয়ে মাহের একটু সময়ের জন্য ক্লাসের বাইরে এলেন।আজকে কোনোভাবেই মেজাজ টা ঠান্ডা হচ্ছে না।অন্যপাশে চোখ যেতে দেখলেন,দূরে চুপচাপ বসে আছে আইরা।তাঁর লাল নীল বাচ্চাদের স্টাইলের ব্যাগ দেখেই চেনা।মাহের একটু হলেও অনুতপ্ত হলেন কিছুক্ষন আগের ইন্সিডেন্টের জন্য।

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৯