Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২
Maha Aarat

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি,সাথে তীব্র বাতাস।আকাশে চাঁদ নেই,ঘোর অমাবস্যা আজ।তাঁরাগুলো মেঘের টুকরোর আড়ালে চাপা পড়ে গেছে।মোজাইকের মেঝেটা পিচ্ছিল হয়ে আছে বৃষ্টির পানিতে।রুমের সাথে লাগোয়া বেলকনির গ্লাস ঝাপসা হয়ে আছে।কাউচে বসলে সোজা দৃষ্টি বেলকনির সামনের উঁচু অর্কিড গাছটায় পড়ে।গ্লাসের এপারের ধোঁয়া ধোঁয়া বৃষ্টির বিন্দুকণা বাইরের পরিবেশটা ঝাপসা করে রেখেছে।
আপন পরিবেশে মগ্ন আরহামের ধ্যান ভাঙ্গে দরজায় আচমকা নক হওয়ায়।আম্মুকে দেখে উঠে বসতেই আম্মু বললেন, ‘এত রাত হলো।ঘুমাচ্ছো না যে।’
‘এখনই ঘুমাবো।’
‘তুমি কি কোনো কারনে আপসেট আরহাম?’
‘না তো আম্মুৃ।’
‘কিছু একটা নিয়ে তো টেনশন করছিলে।আচ্ছা যাই হোক,তোমার কালকে মালিবাগ যাওয়ার কথা।ওকে নিয়ে আসো।একলা বাসায় ভালো লাগে না।তোমার বোন তো সারা দিন-রাত ঘুমায়।’
আরহাম আর পাল্টা জবাব দিলেন না।

থেমে থেমে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।প্রতিবারে চমকে উঠছে হাফসাও।মাহের সেটা লক্ষ্য করে খাবার থামিয়ে বললেন, ‘খাবার নিয়ে রুমে চলে যাও।খালা হয়তো আজ আর আসবে না।একা থাকতে পারবে?’
হাফসা ভীতু দৃষ্টিতে তাকালেও মাথা নাড়লো।
‘আমি পাশের রুমে ঘুমাবো।যদি ভয় পাও রাতে,আমাকে ডেকো।’
হাফসা খাবার হাতে প্রস্তুত হলো রুমে ফিরতে।তখনই মাহের ইতস্ততভাবে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘আমি যদি তোমার জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিই তুমি মেনে নিবে তো?’
ভাইয়ের প্রশ্নের তীর টা বুঝতে অসুবিধা হলো না হাফসার।নিচুমুখে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো সে।
‘আমাদের মা-বাবা নেই।আফসোসেরও কিছু নেই।তাদের হায়াত কম ছিলো…
মা-বাবার কথা উঠতে হাফসার মুখ শুকনো হয়ে গেল মুহুর্তেই।মাহের সেটা লক্ষ্য করে দ্রুত প্রসঙ্গে পাল্টে উঠে এসে নীরবে হাফসার মাথায় হাত রাখলেন।বললেন, ‘আমি তো আছি।মন খারাপ কোরো না।দরজা খোলা রেখে ঘুমাবে।’

মনোরম ভোর!ভোরের নীরবতা মাড়িয়ে কোলাহল জমেছে পরিবেশে।বাড়ির পাশ দিয়ে লোকজনের সমাগম বেড়েছে।খুব নিকটের কোথা থেকে আসছে উচ্চ আওয়াজে মিউজিক।বাইরের গেটের তালা খুলে মাহের বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন।ফযরের পর নিয়মিত হাঁটার অভ্যেস ছিল উনার।গত একমাসে সেই রুটিন বদলেছে।শেষবার যখন বেরোচ্ছিলেন বাবা সাথে ছিলেন।মাহের দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্দরমহলে ডুকলেন।রান্নাঘরে টুং টাং শব্দ হচ্ছে।
ড্রয়িং রুমে বসেই সোফায় গা এলিয়ে দিলেন।তখনই ঘোমটা মাথায় খালা প্রবেশ করতেই মাহের ফোনে ব্যস্ত দৃষ্টি রেখে বললেন, ‘আপনার যদি ইচ্ছে হয় ও বাসায় স্টিল থেকে যেতে তবে থেকে যান।যদি এমনই চান,দ্বিধাবোধের কিছু নেই।যেতে পারেন।’
শাপলাখালা ধুপধাপ পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।তাকে রাখা হয়েছিল মূলত হাফসার জন্য।বেশ কয়েক বছর থেকেই এখানে থাকছেন।কিন্তু সামাদ মুসতাকিমের এ বাড়িতে আসার পর উনার বিচরন সেখানেই বেড়ে গেছে।
হাফসা নাস্তা টেবিলে এনে রাখলো।মাহেরও বসে পড়লেন চেয়ার টেনে।মাহেরের সামনে গরম এক কাপ সুগার লিমিটেড চা দিয়ে হাফসা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা খালাকে ইশারায় ডাকলো তাদের সাথে বসতে।তিনি না বোধক মাথা নাড়িয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।হাফসা অসহায় দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালো।মাহের গম্ভীর, একরোখা।খালা উনাকে যথেষ্ট ভয় পান বলেই উনার সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলেন।

আরহাম আজকে বাইরে যান নি।পুরো সকাল মায়ের সাথে সময় কেটেছে।দূপুরের লান্চের সময় এখম।ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থায় সে নিচে নামছে।আম্মু খাবার সার্ভ করতে ব্যস্ত।ঘুৃমে চিত-কাত হতে হতে সে ডাইন ইন পর্যন্ত আসলো।আরহামের পাশের চেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাবিকে আনবে না?মিস করছি।কবে আনবে?’
‘হু।’
‘ভাইয়া একটা কথা বলতাম।’
আরহাম হাত বাড়িয়ে দিতেই আইরা দাঁত বের করে হেসে দিলো।সে কি করবে।আর তো কোনো বুদ্ধি পায় না সে।মাসে চার থেকে পাঁচবার ভাইয়ের হাতে লম্বা লিস্ট তুলে দেশ বইয়ের।শুধু এই বিষয়টাতেই ভাইয়ের কাছে যতটুকু নরম আর গুডগার্ল হওয়া যায় সে হয়।নয়তো ভাইয়ের সাথে তাঁর খুব একটা বনে না।মা যখন ছেলেকে মুখে তুলে খাবার খাইয়ে দেন,তখন সে পাশে বসে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে সেই জ্বলেপোড়া, কলিজায় আগুন লাগানো দৃশ্য দেখে।আরহাম তখন ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসেন।আর আরহামের এই হাসিটাই আগুণে ঘি ঢালার মতো।এটা আম্মু অস্বীকার করতে পারবেন না যে,তিনি ভাইয়াকে বেশী ভালোবাসেন।আর আব্বুও এটা অস্বীকার করতে পারবেন না যে তিনি আইরাকে বেশী ভালোবাসেন।সমান সমান বিচার টা যদিও মেনে নেওয়া যায়,তবে চোখের সামনে সবসময় তো মা ছেলের আদিখ্যেতা দেখতে ভালো লাগে না।

আরহাম লিস্টে চোখ বুলিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘চুনোপুঁটির মতো কলিজা নিয়ে তুমি এসব হরর সিরিজও পড়ো?
এমন সুক্ষ্ম অপমানে আইরারও ইচ্ছে হলো পাল্টা জবাব দিতে।কিন্তু এটা এই মুহুর্তে বোকামি হয়ে যাবে।সৌজন্যমূলক হেসে বলল, ‘পড়িনি।পড়বো।’
‘ইসলামিক বই পড়তে চাও পড়ো।মানা করছি না।কিন্তু এসব বই পড়া যাবে না।’
‘কেন কেন?কি সমস্যা?’
‘যে বই পড়ে সময় নষ্ট হবে,ঈমান ডাউন হবে সেই বই পড়ার দরকার কী।’
‘প্লিজ ভাইয়া।আমি একটু একটু করে পড়বো।১০ টা ইসলামিক বই পড়লে একটা উপন্যাস পড়বো।সত্যি।মিথ্যে বলছি না।’
‘হবে না।’
‘আচ্ছা আর কখনো এমন বই চাইব না।এই প্রথম এই শেষ।’
‘না।এসব বই ঘরে থাকা যাবে না।’
আইরা এবার রাগ করে বলে, ‘তাহলে একাডেমিক বই সবগুলো তো ইসলামিক না।ওসব কেন পড়তে হবে?’
আরহাম প্রত্যুত্তর করলেন না।উনার ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, উনার থেকে আর কোনো উত্তর পাওয়া যাবে না।আইরা মাথা ঠান্ডা করলো।বুঝিয়ে বলতে হবে ভাইয়াকে।মস্তিষ্ককে একটু সময়ের জন্য স্থির হতে দিয়ে নাস্তার প্লেট টা এগিয়ে নিলো।ভাইকে কীভাবে বুঝাবে মনে মনে সেই ছক কষতে থাকলো।সারাক্ষণ থ্রীলার বইয়ের দারুন রিভিউ দেখতে দেখতে এখন আর সহ্য হচ্ছে না।তাই এবার কিছু আউট বই পড়েই ছাড়বে সে।ভাইকে কীভাবে কনভিন্স করা যায় সেটা ভাবতে ভাবতে আনমনে ব্রেডে কামড় বসাচ্ছে।অমনি আচমকা কলিংবেল বেজে উঠে।
আরহাম লক স্ক্রীনে সময় দেখে বললেন, ‘ভেতরে যাও।মাহের আসছে।’
আইরা শুকনো ঢুক গিলে।আরহাম উঠে দরজা খোলার উদ্দেশ্যে গেলেন।লক খোলার আগে আরেকবার পিছু ফিরে আইরাকে বেশ ধমকে বললেন, ‘ভেতরে যাও না!’
আইরা ঈষৎ কেঁপে উঠলো ধমক শুনে।তড়িঘড়ি করে খাবার নিয়ে গেস্ট রুমে চলে গেলো সে।

আরহাম আর মাহের লাঞ্চ করে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেরে নিলেন।তাদের এখন বেরোতে হবে।আরহাম রেডি হওয়ার উদ্দেশ্যে উঠতে উঠতে বললেন, ‘আমি রেডি হই।তুমি এখানে থাকবে?না আমার রুমে আসবে?’
মাহের উপরে যেতে চাইলেন না।আরহানের বাসায় এর আগে বেশ কয়েকবার আসা হয়েছে মাহেরের।এর মধ্যে দূইবারই এক্সিডেন্টলি আরহামের বোনের সাথে দেখা হয়েছে।একবার সে ব্রাশ মুখে নিয়ে গুনগুন করতে করতে বাইরের বারান্দায় হাঁটছিলো, আরেকবার বারান্দার দোলনায় দূলতে দূলতে বই পড়ছিলো।মাহের আর কোনো বিব্রত অবস্থায় পড়তে চান না তাই আরহামকে বললেন, ‘এখানে আছি।তৈরী হয়ে তাড়াতাড়ি আসো।’
আইরার মাথায় লা জাওয়াব একটা বুদ্ধি এসছে।কিন্তু নন-মাহরামের সামনে সে কীভাবে যাবে।আর ভাইয়া দেখলে তো…ভাবতেই কেঁপে কেঁপে উঠলো সে।দরজার আড়াল থেকে মুখ বাড়িয়ে চুপিচুপি তাকালো ড্রয়িংরুমে।ব্রাউন কালার শার্টের স্লিভ গোটানো,চোখে মাঝারি ফ্রেমের চশমা আর ঘনকালো চুলের সাথে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি।লোকটা যতটা সুদর্শন উনার ভাবভঙ্গি তাঁর চেয়েও অনেক বেশী কঠিন।ডাক্তার মানুষ কাঠখোট্টা হবে এটাই স্বাভাবিক।আইরা দরজা থেকে সরে যায়।লোকটার দিকে কয়েক পলক তাকালেই ওর হার্ট ধামধাম করে বিট করতে থাকে।হাত পা কাঁপে।কি আছে লোকটার মাঝে?না কিছু নেই।নন মাহরামের ক্ষেএে এমন হতেই পারে।কিন্তু তাকে এবার এই অসাধ্য সাধন করতে হবে।যেকোনো উপায়ে।

বড় আবায়ার সাথে লং হিজাবে ঢেকে নেয় নিজেকে।মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে প্রস্তুত হয়।কিচেনে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।তাহলে আম্মু এই মুহুর্তে বের হবেন না ভেবে ড্রয়িংরুমে আবারো একবার সতর্কের দৃষ্টি ফেলে চুপিচুপি।কিন্তু তখনই চোখাচোখি হয়ে যায় লোকটার সাথে।আইরা তড়িৎ সরে আসে।নিজেকে কয়েকশো বার ঝাড়ি দিতে ভুলে না।
মাহের চুপচাপ বসে আছেন।উনার দৃষ্টি মোজাইকের ওই মেঝে থেকে ভুল করেও আর তুলবেন না।আচমকা কোনো কালো ছাঁয়া এসে পড়ে।মাহের তড়িৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন।পেছনে কোনো নারী অবয়ব দেখে চমকান মাহের।আইরা কাঁপাস্বরে বলল, ‘আমার একটা সাহায্য করবেন?’
মাহেরের উত্তরের অপেক্ষা করে না সে।
টেবিলে খাম রেখে বলে,
‘এই লিস্টের বইগুলো ইমার্জেন্সী প্রয়োজন।ভাইয়া যখন নামাজ পড়াবে তখন বইগুলো কিনে আপনি গাড়ির পেছনে রেখে দিবেন প্লিজ।পারবেন তো?’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১

মাহের কোনোরুপ উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না।এও বুঝতে পারছেন না মেয়েটা ওর ভাইকে না বলে তাকে কেন বলছে।জিজ্ঞেস করা উচিত।কিন্ত কীভাবে জিজ্ঞেস করবেন সেটাও বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছে উনার।ভ্রু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড কিছু চিন্তা করে কিছু বলতে উদ্যত হতেই দেখলেন মেয়েটা নেই।পালিয়েছে সে।আরহামের কাশির শব্দ শোনা গেছে।মাহেরের মাথা এখনও ভোঁ ভোঁ করছে।একটু এগিয়ে সেন্টার টেবিলের খামটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখলেন।আরহামকে কাছাকাছি আসতে দেখে সতর্ক হয়ে গেলেন মাহের।আরহাম মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে মাহেরকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই আইরা তড়িৎ আসলো ড্রয়িং রুমে।লোকটা কি লিস্ট আর খাম নিয়েছে চেক করতে দেখে খামটা পড়ে আছে টেবিলে।আর লিস্ট টা কোথায়!প্রশ্নবিদ্ধ হয় সে।টেবিলের ওপর-নিচ খুঁজতে খুঁজতে যখন দেখলো লিস্টটা ওর হাতেই থেকে গেছে তখন অস্বস্তিতে মরে যেতে ইচ্ছে হলো ওর।একে তো লজ্জা,অস্বস্তি সব জলাঞ্জলি দিয়ে লোকটাকে বলেই ফেলেছিল সে।কিন্তু লিস্টটা অব্দি দেয়নি।রাগের পরিবর্তে খুব করে মন খারাপ হয় ওর।লোকটা ওকে কী ভাববে!

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩