Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩০

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩০

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩০
Maha Aarat

সকালের রোদ্দূর তখন মাঠে নেমে এসেছে।বেলকনিতে অযত্নে পড়ে থাকা টবে ঝুলে আছে ফুলের গাছ।এক কোণায় পড়ে আছে একটা ছোট্ট বনসাই।চারিপাশে নজর বুলালে বোঝা যায়,এ বাসায় থেকে নির্বাসন নেওয়া আগের ভাড়াটিয়া বেশ শৌখিন ছিলেন।নিচে পড়ে থাকা শুকনো ফুলগুলো মুঠোতে পুরে রুমে ফিরলো হাফসা।মাহের ব্যস্তভঙ্গিতে শার্টের টাই বাঁধতে বাঁধতে ধীরসুরে বললেন ,’তুমি এখানে কেন?আরহামের কাছে যাও।ও একা বসে আছে।’

ভাইয়ের এমন অভিজ্ঞসুরের আদেশ এক সাইডে ফেলে মাহেরের শার্ট ইশারা করে চোখমুখ কুঁচকালো সে।মাহের ভ্রু কুঁচকে তাকাতে বুঝলেন বোনের দৃষ্টি নিজের গেট আপের দিকে।এক হাত দূরে আয়নার সামনে নিজেকে স্ক্যান করতে গিয়ে বুঝলেন শার্ট টা অগোছালো হয়ে লেপ্টে আছে শরীরের সাথে।আয়রন করতে দিতে ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি।বোনের সূচালো আদেশ অমান্য করে হাত দিয়ে দূ একবার ঝেড়ে বলতে লাগলেন, ‘খেয়াল ছিলো না।কালো শার্ট বোঝা যাবে না।’
ততক্ষণে আরেকটা শার্ট হাতে সে হাজির।শার্ট চেন্জ করার ইশারা করলে মাহের নিজের তাড়াকে আরেক ধাপ জোর দিয়ে বললেন ,’সময় নেই হাফসা।দেখো বুঝা যাচ্ছে না।’
বক্স থেকে একে একে খাবার গুলো পরিবেশন করতেই মাহের হাজির।মাহেরের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে মুচকি হাসলো সে।মাহের চেয়ার টেনে আরহামের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন , ‘আরহাম তুমি নিশ্চয়ই এতোদিনে বুঝে গেছো আমার বোন কতো জেদী।’
আরহাম ফোন থেকে দৃষ্টি তুলে আশ্চর্য হয়ে বললেন ,’জেদী?তোমার বোন জেদী?’

‘ভীষন।’
‘বুঝি নি এখনো।’
নাস্তা শুরু করতে গিয়ে যখন আরহাম প্রথম লোকমা টা হাফসার মুখে তুলে দিচ্ছিলেন তখন লজ্জ্বায় যেনো তার মরিমরি অবস্থা।ভাইয়ের সাথে খাবারে বসেও এমন করতে হবে!
মাহের বেরিয়ে গেছেন।বিদায় নেওয়া শেষে আরহাম বললেন ‘আপনাকে একা কীভাবে রেখে যাবো উমায়ের।আমার তো টেনশন হবে।’
সে ইশারায় স্বস্তিদায়ক উত্তর দিলেও আরহামের উৎকন্ঠা কমলো না।নিচের ফ্ল্যাট থেকে আঁখি এসেছে।তাঁর সাথেই থাকবে সে।আর মাহের তো ঘন্টাখানিক পরেই ফিরে আসবেন।
মাহের ,আরহাম দূজনে একসাথ বেরিয়ে গেলে দরজা আটকায় সে।সোফার কোণায় বসে থাকা আঁখির দিকে কয়েক পলক তাকায়।মেয়েটা ডিসাব্লিড।বাম হাত নেই তাঁর।এমন ফুটফুটে একটা মেয়ে অথচ সে প্রতিবন্ধী।মেয়েটার মুখ মলিন।লোক সমাগমে সে আরও গুটিয়ে নেয় নিজেকে।হাফসা তার গালে আদূরে হাত রেখে বুঝায়, দেখো আমি কথা বলতে পারি না আর তোমার হাত নেই।তাতে কী?আমরা বন্ধু হতে পারি না?

টানা দূইদিন পর কলেজে এসেছে সে।তবুও আজকে দেরী।দূর থেকে দেখছিলো মাহের ক্লাসের দিকেই যাচ্ছেন।অথচ ততক্ষণে আসতে আসতে একটু দেরী হয়ে গেলো।
মাহের নিজের লেকচার শুরু করে দিয়েছেন।দরজায় নক হতেই তাকে দেখলে আড়চোখে হাত ঘড়িতে একবার চোখ বুলিয়ে আসার পারমিশন দিলেন।আইরা ক্লাসে ঢুকতেই সবার চাপা একটা হাসির আওয়াজ শোনা গেলো।সেদিনের ঘটনার পর মোস্ট ইন্টারেস্টিং টপিক সে।তাও আবার এমন সুদর্শন স্যারের ক্লাসে।
ক্লাসে স্টুডেন্ট নিতান্তই কম নয়।অথচ অন্যান্য পিরিয়ডে ক্লাস ফাঁকা থাকে।মাহের জিজ্ঞেস করছিলেন কোনো হোমওয়ার্কের কথা।আইরা দেখলো সবাই চট করে খাতা বের করে সামনে রাখছে।আইরা উদাস ভঙ্গিতে তাকাচ্ছিলো।পাশ থেকে ফিসফিস আওয়াজে কেউ জিজ্ঞেস করলো, ‘এই তুমি হোমওয়ার্ক করো নি?’
বোকাভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো সে।মেয়েটার চোখেমুখে আতঙ্কের রেঁখা ফুটে উঠলো তৎক্ষনাৎ।বলল, ‘আজকে তো পানিশমেন্ট দিবেন বলছিলেন স্যার।তাড়াতাড়ি লিখা শুরু করো আমার খাতা দেখে।’

এতগুলো লিখা আর চিএগুলো সে কীভাবে কমপ্লিট করবে।তাও ঝটপট খাতা কলম বের করতেই মাহেরের চোখাচোখি হলো।কী কাঠিন্যতা সে চোখে।সেদিন তো ঝাড়ি দিয়েছিলেন।আজকে কি মারবেন?ভয়ে ইচ্ছে হলো চোখ বন্ধ করে এক দৌড়ে ক্লাস ছেড়ে পালাতে।
যারা এক্সারসাইজ আনে নি তাদের দাঁড়ানোর কথা বললে ভয়ে কলিজাটা কাঁপতে থাকে আইরার।কোন দূ:খে ক্লাস মিস দিয়েছিলো সে।দূর্ভাগ্যবশত পুরো ক্লাসে একমাত্র সে আর আরেকজন দাঁড়ালো।চশমার আড়ালে এক নজর গাঢ় দৃষ্টিতে তাকালেন মাহের।
অতপর বললেন, ‘দূইটা অপশন আছে।এই বোটানি বই সম্পূর্ণ লিখে কালকের ক্লাসে জমা দিতে হবে অর কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে যতক্ষন আমি ক্লাসে থাকবো।নাউ বথ অব ইউ ক্যান চোজ এনি ওয়ান অব দিস অপশনস।’
পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা তৎক্ষনাৎ কানে হাত রাখলো।তার চোখেমুখে কোনো লজ্জ্বা নেই বরং মনে হচ্ছে স্যারের এই শাস্তি সে সন্তোর্পনে গ্রহন করছে।

বইতে ছয়’শর অধিক পৃষ্ঠা।যা একদিনে লিখা অসম্ভব।এক সেকেন্ডের জন্য আইরার মনে হলো লোকটার মন বলে কিছু নেই।এই পৃথিবীর সবচেয়ে পাষাণ মানুষটা ঠিক তার সামনে দাঁড়ানো।গতদিন ক্লাসে এসে সে যদি হোমওয়ার্ক না করতো তাহলে পানিশমেন্ট মানা যেতো।লজ্জ্বায় মাথা নত হয়ে এলো তাঁর।অনেকে হেসে উঠলো পৈশাচিক আনন্দে।মাহের এক কঠিন ধমকে সবাইকে থামিয়ে দিলেন।দিব্যি পড়ানো শুরু করলেন।সবাই নিজের মতো ব্যস্ত।কেউবা বইতে ডুবে কেউবা লোকটায়।অথচ নিকাবের আড়ালের ভেজা চোখ কারো দৃষ্টিতে পড়লো না।
মিনিট পাঁচেক আলোচনা করে থেমে গেলেন মাহের।বারবার টপিকে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।কথার খেই হারিয়ে ফেলছেন।কিন্তু কেন!বই রেখে তাদের দূজনের উদ্দেশ্যে বললেন , ‘টেইক সিট।’
বাকি ক্লাসটুকু একবারও মুখ তুললো না আইরা।তবে যাবার সময় খুব কাছ থেকে শুনতে পেলো, “ক্লাসে আসলে রেগুলার আসতে হবে।আর না আসলে একেবারে আসতে হবে না।আর কোনো প্রবলেমের কারনে আসতে না পারলে ফ্রেন্ডসদের থেকে পড়া কালেক্ট করতে হবে।আর পানচুয়ালিটি মেইনটেইন মাস্ট।এনিওয়ে,আমি কাউকে ইচ্ছে করে শাস্তি দিইনি।’
স্যার বেরিয়ে যেতেই পাশে এসে বসলো একটু আগের মেয়েটা।নিজ থেকে তার পরিচয় দিলো স্নেহা।আইরা আলাপ লম্বা করলো না।আজ সে বাসায় যাবে।মুডটা খুব বাজেভাবে নষ্ট করেছেন লোকটা।কান্না করার জন্যই বুঝি ক্লাসে আসা তাঁর।তাকে কাঁদতে দেখলে সবাই আবার হাসবে।তাকে হাসির পাএ বানিয়ে বোধহয় এবার একটু স্বস্তি পেয়েছেন মিস্টার স্যার।

ইন্সটিটুয়েশন থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরোলেন আরহাম।উমায়েরকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরার আদেশ আম্মুর।গাড়িতে বসেই ভাবছিলেন মাইমুনাকে ফোন করবেন তার আগেই আব্বুর কল এসে ঢুকলো।আব্বুর সাথে আলাপ শেষ হয়েছে যতক্ষণে ততক্ষণে আরহাম বাসার সামনে।কলিং বেল টিপতেই দরজা খুললেন।এলোমেলো বাসা এখন চকচক করছে দেখে আরহাম ঠোঁটচেপে হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি আমার ওয়াইফকে দিয়ে কাজ করাচ্ছো?’
মাহের সমানতালে হেসে বললেন, ‘হুম এজন্যই তো আনা ওকে।’
‘আর দিবো না।’
খাবারের থালা হাতে নিয়ে হাফসা বেরিয়ে এলো ততক্ষণে।তাকে একপলক দেখতেই চোখের স্বস্তি হলো আরহামের।

খাবার শেষে মাহেরের সাথে আলাপ শেষেই হাফসাকে তাড়া দিয়ে বললেন, ‘রেডি হয়ে আসুন।’
নিকাবের কোণা আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে অসহায় দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছিলো সে।আরহাম নোট করলেন ভাই বোনের মধ্যে চোখের ইশারায় কত কি হিসেবনিকেশ হয়ে যাচ্ছে অথচ তিনি সেটা টের পাচ্ছেন না।
মাহের গলাকেশে আস্তেধীরে বললেন, ‘সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে।আজকে থেকে যাও।কাল সকালে ফিরবে।’
হাফসা পিটপিট করে চোখ তুলে তাকালো।আরহাম তখনো নিরুত্তর।আসার সময় মেয়েটাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে পড়িয়ে এসেছেন সে যেনো থাকার আবদার না করে।
আরহাম হাফসার উদ্দেশ্যে ধীরে ধীরে প্রশ্ন ছুঁড়লেন ,’আপনি থাকতে চান?’
সাথে সাথে সে মাথা উপরনিচ ইশারা করে বুঝিয়ে দিলো তাঁর জোরালো সিদ্ধান্ত।আরহাম চোখ সরু করে তার দিকে তাকালেন।এ কেমন বিশ্বাসঘাতকতা!
‘তোমার কোনো সমস্যা নেই তো?’
মাহেরের প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরে বললেন, ‘আমাকে যেতে হবে।উনি থাকুন।’
‘সে কী!একদিনই তো।’
‘ইন শা আল্লাহ থাকবো।এখন না।’
‘বেশ।তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি চলো?’
আরহামের ইচ্ছে করলো প্রিয়তমার কপালে ছোট্ট ভালোবাসা আঁকতে।অথচ মাহের সামনে থাকায় নিজের বোধটুকু হজম করে হাসিমুখে বিদায় শেষে বেরিয়ে গেলেন।

সন্ধ্যের পরিবেশ।নিয়নের আলোকবিন্দু দূর থেকে ভাসতে ভাসতে কাছে এসে মিলিয়ে যাচ্ছে।সিটে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন আরহাম।
‘বউকে রেখে দেওয়ায় মন খারাপ হচ্ছে?’
আরহাম নিরুত্তর।কেবল মুচকি হেসে বিষয়টা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও মাহের যেনো তূখর আরহামের হার দেখতে।
‘ভাবছিলাম বাসা ঠিক করে বোনকে দেড় দূই মাসের জন্য বাসায় এনে রাখবো।’
আরহাম তড়িৎ মাহের এর দিকে মুখ ফিরিয়ে বিড়বিড় করলেন, ‘দিবো না।’
‘আমার বোন।আমি বললে সে আসবে।তুমিও থাকবে এসে।’
‘আমার ওয়াইফ।আমি মানা করলে উনি যাবেন না।’
‘দেখলাম তো আজ!’
মাহের এর সূক্ষ্ম খোঁচা আরহাম বেশ বুঝতে পারলেন।মিনমিনে সুরে বললেন, ‘ভাই বোন সেইম।’
শাঁই শাঁই বেগে গাড়ি ছুটছে।আর মিনিট পাঁচেকের রাস্তা।মাহেরের সম্পূর্ণ ধ্যান-দৃষ্টি শহরের ব্যস্ত যানবাহনের অলিতে গলিতে।যা পেরিয়ে উনাকে নিজের রাস্তা খুঁজে নিতে হচ্ছে খুব সাবধানে।
‘মাহের!কি করলে তোমার বোন একটু আমাকে নিয়ে ভাববেন আই মিন একটু বর পাগল হবেন?নিজে থেকে এসে একটু কথাটথা বলবেন?একটু টিপস দাও।’
‘হাফসা কি তোমাকে এড়িয়ে চলে?’

‘যমের মতো ভয় পান আমাকে।আমি নিজেই বুঝিনা কেন।’
‘ও প্রচন্ড লাজুক।এজন্য বোধহয়।’
আরহামের অনুরোধে মাহেরকে বাসায় আসতে হলো।কলিং বেল শুনে দ্রুত দরজা খুলে দিলেন আম্মু।হাফসাকে দেখতে না পেয়ে মুখ ভার হলো উনার।
একসাথে বসতে গিয়ে আম্মুর হাতে খাবার দেখে আরহাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখনও খান নি আম্মু।’
‘আইরা খায়নি।একটা ক্লাস করেই বাসায় চলে আসছে।খাবার খাওয়ার জন্য ডাকতে গিয়ে দেখলাম কান্না করছে।জিজ্ঞেস করলে কিছু বলে না।আসার পর থেকে কাঁদছিলো।কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ছিল এইমাএ উঠলো…
আরহাম অস্থির হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘কেন?কি হয়েছে? কেন কান্না করেছে?’
‘ জানিনা জিজ্ঞেস করলে বলে না…
মাহের এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন।কান্নার কারন উনার বুঝা হয়ে গেছে।হাফসার কথা বলে তাড়া নিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবছিলেন এতো ছিঁচকাঁদুনে মেয়েটা!এতো অল্পতেই কান্নাও আসে?

রাতের আকাশে তখনো মেঘের আনাগোনা।অথচ আজকাল একেবারেই বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায় না।মাঝে মাঝে আকাশে মেঘের ভারী টুকরোগুলো আকাশের বুকে আঁচড় কেটে দাগ রেখে যায়।তবুও বৃষ্টি আসে না।রাতের গুড়ুম গুড়ুম শব্দ বা মেঘলা আকাশ,কোনোটাই বৃষ্টি নামাতে পারে না।
অশ্রুর স্বাদ যে বড়ো নোনতা।চোখ গলিয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা জল কখন যে ঠোঁট গড়ালো সেদিকে ধ্যান নেই মাইমুনার।মেয়েরা কখনো বা রাগী,কখনো অভিমানী কখনো বা নীরব।এই নীরবতা যে পুরুষ পড়তে পারে না,সে পুরুষ কীভাবে হৃদয়ে স্থান পায়।
ঘড়ির কাটা আটটা পেরোয়।আরহাম এখনো ফিরেননি।অথচ ফেরার কথা বিকেলেই।তাঁরা তো একসাথে।নিশ্চয়ই তাদের সুন্দর সময় কাটছে এটা ভাবতেই চোখের বাঁধ পুনরায় ভেঙে আসলো।অথচ আজ সকালেই তো শাহ এর সাথে সবচেয়ে সুন্দর সময় কাটছিলো তাঁর।প্রিয়তমের কাঁধে মাথা রেখে সকালের সৌন্দর্য অনুভব করার অনুভূতি তো ফিকে নয়।তবুও কেন এতো হাহাকার!

নিচে কলিংবেলের আওয়াজ বাজতেই চোখমুখ দ্রুত মুছে ফেললো সে।বেলকনির আলো নেভাতেই অন্ধকারের দখল চলে এলো।খানিক পর দরজায় নক হয়।
রুম থেকে আসা মৃদু আলোয় দেখলেন উনার প্রিয়তমা ঘুমে।চটপট কপালে অধর ছুঁইয়ে বেরিয়ে যেতেই বদ্ধ চোখের অশ্রু গলিয়ে পড়ে টপাটপ।এইমাএ তাকে ঘুমের অভিনয় করতে হলো কারন তাঁর অশ্রুতে টলমল চোখ দেখলে শাহ অস্থির হয়ে যাবেন।
কিছুক্ষণ পর আরহাম যখন রুমে আসলেন ততক্ষণে মাইমুনা নিজেকে সামলে নিয়েছে।উনার বক্ষে আচ্ছাদিত হতেই শীতলতা অনুভব করলো সে।
‘ঘুম হয়েছে?’
‘হু।’
‘আফওয়ান।আপনার সাথে কথা বলতে পারিনি।একটা ইম্পোর্টেন্ট কাজে গিয়েছিলাম।’
‘হাফসা এসেছে?’
‘নাহ।’
কিছুক্ষণ নীরবতা শেষে আরহাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘রাগ করেছেন হানি?’
‘কেন?’
আরহাম প্রত্যুত্তর করলেন না।মাইমুনার দিকে গাঢ় দৃষ্টিতে তাকালেন কয়েক সেকেন্ড।পরক্ষনে বললেন, ‘চলুন খেয়ে নিই।’
‘এখনি?’
‘হুমম।’
‘আচ্ছা।’
‘আমি নিয়ে আসছি।’

আরহাম খাবার মুখে দেওয়ার সময় বারবার চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছিলো।মাইমুনার মধ্যে জড়তা ভর করলো।এই লোকটা এবার নিশ্চয়ই তার চোখ পড়ে বুঝে নিবে কান্নার কথা।
রাত গভীর।চোখে ঘুম নেই মাইমুনার।প্রিয়তমের বুকের থেকে সেরা নিরাপদ জায়গা কিছু হতে পারে না।অজানা কিছু কারনে কান্নায় বুক ফেটে আসছিলো তাঁর।বেশ কিছুক্ষণ চোখের গড়িয়ে পড়া অশ্রুর ঢেউ দূহাতে আড়াল করলেও পরে আরহাম বুঝে ফেললেন।ঝটপট উঠে গালে হাত রেখে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি কারনে এতো কান্না?আমি কীভাবে কষ্ট দিয়েছি বুঝতে পারছি না হানি।বলুন আমাকে।’
সে টলমলে চোখে বোকার মতো প্রশ্ন করে বসলো, ‘আজকে সারাদিন হাফসার সাথে ছিলেন আপনি।আমি কেন সহ্য করতে পারছি না শাহ।আমি কেমন জানি হয়ে যাচ্ছি।’
আরহামের দৃষ্টি ক্লান্ত,চোখে অনুতপ্তের বেড়ি।দূহাতের আজলায় তাঁর মুখ নিয়ে বুকে জড়িয়ে বললেন, ‘না ছিলাম না।উনাকে দিয়ে আমি চলে গিয়েছিলাম।বিকেলে আনতে গিয়েছিলাম উনি কালকে আসতে চাইলেন।আর বিকেলে তো আপনি ঘুমোচ্ছিলেন।বিকেলে অফিসে গিয়েছিলাম কিছু আর্জেন্ট কাজে।এরপর তো একটু আগেই ফিরলাম।এখন তো আপনার সাথেই আছি হানি।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৯

বুক থেকে ভারী পাথর উঠে যাওয়ার মতো অনুভব হলো মাইমুনার।কি আবোলতাবোলই না সে বকেছে অথচ সবকিছুই তাঁর পাগলামি।পুনরায় চোখ বুজার আগে আরহামের কপালে অধর ছুঁয়াতে গিয়ে অনুভব করলো উনার মাথা গরম হয়ে আছে।চোখগুলো যেনো খুব কষ্টে খুলে রেখেছেন।
কপালে গালে হাত রেখে মাইমুনা প্রশ্ন ছুঁড়লো, ‘আপনি ঠিক আছেন?এমন দেখাচ্ছে কেন?’
‘ঠিক আছি।’
বলে তাকেও ঘুমাতে দিয়ে চোখ বুজলেন তিনি।মাইমুনা তাকিয়ে রইলো তখনো।উনার দূর্বলতার কারন খুঁজে পেলো না।অনুচিত কথা বলে শাহকে আঘাত দিয়ে বসলো না তো!

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩১