Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৫

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৫

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৫
Maha Aarat

‘খাবার শেষ করে দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হতে পারলে আমার সাথে যাবে আদারওয়াইজ সারাদিন লক করা থাকবে।’
কানের পাশে গম্ভীর গলা শুনে ঘুমে জড়ানো চোখ টেনে টেনে খুললো আইরা।ফজর নামাজ পড়ে ঘুমিয়েছে সে।মাত্র চার ঘন্টায় তাঁর ঘুমের একাংশও সম্পূর্ণ হয়নি।সারাদিন ঝিমোবে আজ।ঘুম জেঁকে বসা ছোট ছোট চোখ তুলে তাকালো মিররে।সকাল সকাল গোসল করে লোকটা রেডি।শরীরটা ছ্যাৎ করে উঠে তাঁর।কাল পর্যন্ত ওয়াশরুমের হট ওয়াটার পাইপটা অকেজো ছিলো।এতো শীতে ঠান্ডা পানি দিয়ে শাওয়ার নেওয়া হয়তো কোনো বিষয় না উনার কাছে।কিন্তু তার কাছে এটা সাংঘাতিক বিষয়।
আইরাকে এখনো বসে থাকতে দেখে মাহের চোখমুখ কুঁচকে পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন , ‘তুমি যাবে?’
আইরা হ্যাঁ বোধক উত্তর দিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে এগোয়।ফ্রেশ হতে গিয়ে পানির কল ছেড়েই ঠান্ডা পানির স্পর্শ পেয়ে মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠতেই মাহের দরজার ওপাশ থেকে বললেন, ‘সিংকের পাশের জারে গরম পানি রাখা আছে।’

নাস্তা খেতে এসে ব্রেডে নাটেলা লাগাতে গিয়ে হাত বাড়াতে দেখে মাহের ঘড়িতে চোখ বুলাচ্ছেন।আইরা চুপিচুপি সেটা রেখে দিয়ে ডিমপোচ খেতে শুরু করে।ফোনে দৃষ্টি রেখে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন মাহের।
খাবার গিলতে গিলতে আড়চোখে মাহেরকে লক্ষ্য করছিলো আইরা।এই যে একটা ভালো দিক হচ্ছে,আড়চোখে মাহেরকে দেখতে গিয়ে সে ধরা পড়বে না।কারন লোকটার সরাসরি দৃষ্টি খুব সহজে তাঁর দিকে পড়ে না।ফ্লোর থেকে টেবিলে,টেবিল থেকে হয়তো তাঁর হাতে,অতপর আবার নেমে যায় টেবিলেই।দৃষ্টি এভাবেই ঘুরঘুর করে।চোখতুলে স্বীয় স্ত্রীকে দেখতেও বোধহয় এ চোখের মানা।

হাফসা কথা বলতে পেরেছে এটা অবশ্যই রমরমা খবর।ডাক্তারের আশ্বাসটুকু মিথ্যে ছিলো না।মেন্টাল শকে পড়া একজন মানুষের শরীরের যে কোনো পার্টস’ই একটা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিকলাঙ্গ/অচল হতে পারে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।তবে এর সুস্থতার গ্যারান্টি দেয়া কঠিন হলেও হাফসার ক্ষেত্রে সেটা সহজ ছিলো,আলহামদুলিল্লাহ।
সোফায় বসে হাফসার কথা বলা নিয়ে খুশিতে আটখানা হয়ে অজস্র কথা বলে যাচ্ছে মাইমুনা।অথচ আরহাম পেছনে হাত বেঁধে একেবারে নির্বাক হয়ে দূরে তাকিয়ে আছেন।মাইমুনার এতোসব আনন্দ-উল্লাস-খুশিতে মোড়ানো কথার বোল উনার স্নায়ুতে আঘাত আনছে বলে মনে হচ্ছে না।মন:ক্ষুণ্ন হয় সে।শাহ কেন চিন্তিত?নিশ্চয়ই ভালো কিছু নয়।
চেয়ারের সাহায্যে উঠে ধীরে ধীরে আরহামের পাশে যায় সে।হাতে এক নরম স্পর্শ পেয়ে তৎক্ষনাৎ ধ্যান ভাঙ্গে আরহামের।মাইমুনাকে দেখতে পেয়ে চমৎকার এক হাসি দিয়ে তাকে মুখোমুখি বসিয়ে বললেন, ‘আফওয়ান।আমি কিছুক্ষণ হয়তো অমনোযোগী ছিলাম।ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কি যেনো বলছিলেন…
‘হাফসা কথা বলতে পারে এখন,আপনি খুশি না?’
‘আলহামদুলিল্লাহ।’

মাইমুনা হঠাৎ আনমনা হোন।অতীত আর বর্তমানের হিসাব নিকাশ সম্পূর্ণ করে বেশ সময় নিয়ে বললেন, ‘হাফসা অবশ্যই সুশ্রী কুমারী।ওর একটা উইক সাইড ছিলো আর আমারও।আজ থেকে তো ও সম্পূর্ণ।আপনার আর ওর..
কথা শেষ করার আগেই কায়ায় শাহাদাত আঙ্গুলের স্পর্শে বাঁধা পায় সে।আরহাম তাঁর মাথায় স্নেহের হাত রেখে বললেন, ‘আপনি অসুস্থ বলে আমি আপনাকে যতটুকু ভালোবাসি,এখন যদি আপনি পুরোপুরি সুস্থ ও হয়ে যান আমি আপনাকে ঠিক ততটুকুই ভালোবাসবো।তেমনি উমায়েরের ক্ষেত্রেও।আপনি আমার প্রথম স্ত্রী।যে জেনেশুনে তাঁর হাজব্যান্ডকে ভাগ করে দিয়েছে।এটা কি সহজ কিছু?আমি আল্লাহর কাছে আপনার হয়ে এর শ্রেষ্ঠ প্রতিদান চাইবো।কখনো ভাববেন না মাইমুনা,আমি আপনার আর উনার ভালোবাসায় তারতম্য করছি।আমার কাছে আপনারা দূজনই সেরা,এুটিমুক্ত, আমার চক্ষুশীতলকারীনী।সো,কখনো আপনার এসব উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা দিয়ে এই হৃদয়ে আঘাত দিবেন না যে হৃদয়ে আমি আপনাদেরকেই যত্নে স্থান দিয়েছি।’
মাইমুনার দূচোখ আপনা-আপনি অশ্রুসিক্ত হয়।প্রিয়মতের বুকে পড়ে রবের কাছে হাজার কোটি শুকরিয়া জানাতে ভুলে না সে।আরহামও শুকরিয়া জানান।দেরি হয়েছে বলেই তিনি মাইমুনাকে পেয়েছেন।যে উনার কাছে শ্রেষ্ঠ নিয়ামত, হৃদয়ের অর্ধাংশ,সুখের সাথী আর দূ:খের উত্তরসূরী।

কলেজে একই সাথে আসলেও প্রবেশের আগের রাস্তায় মাহের গাড়ি ব্রেইক নিলেন।আইরা গেটে ঢুকার কিছুক্ষণ পরে তিনি প্রবেশ করলেন।হাতঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে ভাবছিলেন,খুব দ্রুত ক্লাসে যেতে হবে।এই মেয়েটার জন্য আজকে এতো দেরী উনার।
আইরা ক্লাসে আসলো বেশ হাঁপাতে হাঁপাতে।অলমোস্ট দশ মিনিট লেট তাঁর।কলেজে সময়মতো এসেও তাঁর দেরীর কারন মাহের বুঝতে পারছেন না।ক্লাসে না গিয়ে সে কোথায় গিয়েছিলো।
প্রবেশের অনুমতি দিয়ে বেশ কড়াস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দেরীর কারন?’
আইরা থতমত খেয়ে গেলো।পুরনো এক বান্ধবী পেয়ে গল্পে মজে সময়ের দিকে নজর ছিলোই না তাঁর।মাথা নিচু করে বললো, ‘স্ সরি স্যার।’
‘আমি জানতে চেয়েছি দেরি করে আসার কারন কি?’
কি উত্তর দিবে সে।ভয়ে আটসাট হয়ে রয় আইরা।ধমক খেয়ে মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে, ‘ন্ নতুন বিয়ে হয়েছে।নতুন সংসার স্যার।হাজবেন্ড সামলে,সংসার সামলে তারপর রেডি হয়ে আসতে হয়েছে।কাল থেকে আর দেরি হবে না,প্রমিস।’

মাহের বাকরুদ্ধ। কি উত্তর দিবেন ভেবে পাচ্ছেন না।আইরা চুপিচুপি গিয়ে বসে পড়লো তাঁর জন্য রাখা বরাদ্দকৃত জায়গায়।স্নেহা তাকে চুপিচুপি কি বলছে, তাঁর কানে আসছে না।সে ভাবছে বাঁচার জন্য কি উল্টাপাল্টা কথা বলে ফেলেছে সে।
মাহের পড়ায় মনোযোগ দিলেন।আজকে আলোচনা করছেন নার্ভাসসিস্টেম নিয়ে।ফিগার ড্রয়িং করে বুঝিয়ে দিয়ে সবাইকে রিভাইস করতে দিয়ে হোমওয়ার্ক গুলো চেক করছিলেন তিনি।
এতোক্ষণে কথা বলার একটু সুযোগ পেতেই স্নেহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার বিয়ে হয়ে গেল?দেখা হয়নি বলে ফোনেও তো জানালে না?কীভাবে কী হলো হঠাৎ?’
আইরা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল, ‘আরে নাহ!ওটা একটা এক্সকিউজ দিয়েছি।’
‘তাহলে রিং পড়লে যে?কাহিনী কি সত্যি করে বলো?’
‘শখের বসে রিং পড়া যায় না?আরে আমার বিয়েই হয়নি।আমি এখনো স্টিল সিঙ্গেল।’
কিছুক্ষণ হলো স্নেহা উত্তর দিচ্ছে না।বই থেকে মুখ তুললো আইরা।হঠাৎ এই বাঁচাল মেয়ের হলো কি।চোখ তুলতে দেখে স্যার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে।অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছেন।আইরা বই সামনে রেখে আড়াল করে নিজেকে।জিভ কেটে নিজেকে মনে মনে খুব করে শাসায়।বেখেয়ালে কি সাংঘাতিক কথা বলে ফেলেছে সে। কথাটা কি তিনি শুনে ফেলেছেন?

ড্রয়িং রুমে আব্বু, আরহাম, মাইমুনা হাফসা সকলেই।হাফসা কথা বলতে পারায় সবাই যারপরনাই খুশি। চায়ের আড্ডার সাথে আলাপ চলছে তাঁর হুট করে এমন পরিবর্তন আসার কারন।আম্মু হাজারো শুকরিয়া আদায় করে বলছেন,আমি খুব করে চাইতাম তুমি কথা বলো।সবাই যখন তোমার কথা বলতে না পারা নিয়ে নেগলেক্ট করতো আমার খারাপ লাগতো খুব।
আম্মুর এহেন কথায় আরহাম সাথে সাথে হুঁশিয়ারি ইশারা দিয়ে বললেন, ‘আম্মু!’
‘কি হলো?খারাপ কিছু বলিনি।এখন যে কাউকে বলতে পারবো দেখে যাও আমার বউমা সবগুণে গুণান্বিত।তাঁর কোনো এুটি নেই।’
‘আম্মু স্টপ।আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু হিয়ার এবাউট ইট।’
আরহামের কিছুটা অসন্তোষ নিয়ে বলা কথায় আম্মু চুপচাপ উঠে গেলেন।আরহাম অসহায় চোখে আব্বুর দিকে তাকাতে তিনি ইশারায় তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ঠিক হয়ে যাবেন।ডোন্ট ওয়োরি।’
আব্বুও কিছুক্ষণ পর রুমে চলে যেতেই ড্রয়িংরুম নীরব। আরহাম মাইমুনার দিকে তাকাতে বুঝলেন তাঁর মন ভার।আরহাম তাদের দূজনের উদ্দেশ্যেই বললেন, ‘আপনারা যেমনই থাকেন আমার কাছে দূজন সবসময়ই এুটিমুক্ত।’

ডিনার শেষে রুমে প্রবেশ করেই নাক সিটকালেন আরহাম।হাফসা দূর থেকে আরহামের এহেন আচরণ দেখছিলো।
আরহাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘আগরবাতি?’
‘হু।’
‘কেন?’
‘ইচ্ছে করছে।’
হাফসা বেলকনিতে ছিলো।আরহামকে দেখে তাঁর ভাবনা, বিছানা গুছিয়ে খুশবু টা দূরে সরিয়ে ঘুমিয়ে যাবে।আরহাম তাকে বাঁধা দিলেন।হালকা কাঁপছে হাফসা।রুম থেকে শাল এনে তাঁর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে আরহাম পাশাপাশি দাঁড়ালেন।তীব্র তুষারপাতের পাশাপাশি কেমন যেনো একটা স্যাঁতসেঁতে ভাব।কুয়াশায় মোড়ানো ধোঁয়াশা অর্ধচাঁদ।আওয়াজ কমে আসছে পঙ্কীকুলের।সাথে রাত গভীর হওয়ার সাথে কপাট লাগছে অমিমাংসিত কিছু রহস্যের চ্যাপ্টারে।যেগুলো ভেতরে ভেতরে জখম করে দিচ্ছে উনাকে।
অসহিষ্ণু হয়ে জিজ্ঞেস করেই বসলেন, ‘হিসাবটা মিলছে না উমায়ের।এমন কিছু আছে যেটা এখনো লুকোচ্ছেন আমার থেকে।স্বপ্ন দেখে হুট করে ঘুমের মধ্যে চিৎকার দিয়ে উঠা,কথা বলতে পারা, বাবার জীবনের কঠিন সত্য আর মায়ের অসুস্থতা, এসব কি?কিসের কঠিন সত্য কিসের রহস্য?’

আরহামের হঠাৎ আক্রমনে হাফসা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।গতদিন অতীতে ডুবতে গিয়ে বেখেয়ালে বলা কথাগুলো লোকটার মাথায় এভাবে ফিক্সড হয়ে থাকবে ওতোটুকু বোধ ছিলোই না তাঁর।তার স্বপ্নের কোনোকিছুই আরহামকে জানায়নি সে।যত যাই হোক,বাবার প্রতি রাগ নেই তাঁর।তবুও বাবার লুকোনো সত্য উদঘাটন করা মানে এক সেকেন্ডের জন্য হলেও বাবাকে অপরাধী বানানো।যেটা সে মোটেও চায়না।’
হাফসা কথা ঘুরিয়ে নেয়।তাঁর কন্ঠ শোনা যায় বেশ কিছুক্ষণ পর।
‘আমার ‘কথা’ বলায় আপনি খুশি হোননি এতটুকু নিশ্চিত আমি।’

আরহামের মুখোবয়বের কোনোরুপ পরিবর্তন না হওয়ায় হাফসা চমকালো।তাঁর অনুমান গাঢ় হলো।উমায়ের উনার পারিবারিক বিষয় আলোচনা করতে চাচ্ছেন না বুঝে আরহামও দ্বিতীয় বার জানতে চাইলেন না।তাঁর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে বললেন, ‘আমি আগের উমায়েরকে মিস করছি।কথা বলার চেষ্টায় ঠোঁটের কম্পন,ঘনঘন পলক ফেলা,গোল গোল চোখে লাজুকতা,ভ্রু কুঁচকানো, লাজুক হাসি সবকিছু মিস করছি।এখনকার উমায়ের আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলে।লাজুকতা নয় বরং তাঁর চোখের দৃষ্টি যেনো ঝলসে যাওয়া আগুনের ফুলকি।নিকাহের অর্নামেন্টস দিতে গিয়ে বড় হওয়ার পর প্রথমবারের মতো আপনার চেহারা দেখেছি।

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৪

তারপর থেকে আপনার কথা মনে পড়লে প্রায়ই একা হাসতাম।আমার এতো আনন্দ লাগতো।মনে হতো কয়েকদিন পর যখন আপনি আমার বাসায় আসবেন,আমি সারাদিন আপনাকে দেখবো।আপনি ঘুমিয়ে গেলে আপনাকে দীর্ঘক্ষণ দেখতাম।আপনার মুখ ফুলানো,চুপিচুপি রাগ করা বা ভয় পাওয়া ফেইস আমাকে কতো এট্রাক্ট করতো বুঝাতে পারবো না।
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।কথার সমাপ্তি টানলেন অপ্রত্যাশিত এক উপসংহারে, ‘এই বদলে যাওয়া উমায়েরকে আমি মেনে নিতে চেষ্টা করছি,কিন্তু পারছি না….

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪৬