Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪
Maha Aarat

চেম্বারে মুখোমুখি বসে আছেন দূজনে।বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি।এশার অ্যাঁশ কালার পোষাক ভিজে একাকার।বর্ষার দিনে বর্ষাতি ভুল করে ফেলে আসা তাঁর স্বভাবগত বদঅভ্যেস।মাহের বাইরে দৃষ্টি স্থির করে অন্যপাশ হয়ে বসে আছেন।মাহেরের এমন ইগনোর এশাকে খুব করে পোড়ায়।এ পর্যন্ত কোনো মেয়ে কি এতটা অসহায় হয়ে কাউকে চেয়েছে?দিনের পর দিন পিছু ছুটছে?লোকটার কি একটুও মায়া হয় না?
‘আজকে আর কোনো পাগলামি করবো না।সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা বলতে আসছি।প্লিজ শুনুন।’
‘আপনি এখানে একঘন্টা থেকে চুপচাপ বসে আছেন।আমি কি করে শুনবো?আর আমি এখানে নাটক করতে আসি না,পেশেন্ট দেখতে আসি।এটা আমার প্যাশন।এমনি এমনি কেউ আমার পকেট ভরে না।’

‘এত কঠিন হয়ে কথা বলেন কেন?’
মাহের এ প্রশ্ন রীতিমতো উপেক্ষা করে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, ‘বলুন কেন এসছেন।’
এশা প্রস্তুত হয়ে বলতে লাগলো, ‘হাফসার জন্য ছেলে খোঁজছেন শুনেছি।আমি একটা রিকুয়েষ্ট নিয়ে এসেছি।’
‘ডিরেক্টলি বলুন।এত প্যাঁচানোর মানে কি।’
এশা দাঁতে দাঁত খিচে ধরে।যদি একবার এই লোকটার সাথে তাঁর বিয়েটা কোনোমতে হয়ে যায় তবে এমন আনরোমান্টিক কাঠখোট্টা ব্যবহারগুলোর হিসাব নিবে সে।
‘বলছিলাম সাফওয়াত, আমার ভাই।ওকে হাফসার সম্পর্কে বলেছিলাম।ও ইন্টারেস্টেড।হাফসার সম্পর্কে মোটামোটি সবকিছু জানিয়েছি।ওর আপত্তি নেই।ও একবার হাফসাকে দেখতে চায়।’
মাহের চুপচাপ শুনলেন সব।কিছুটা সময় নিয়ে ভেবে বললেন, ‘বায়োডাটা দিয়ে রাখবেন।সময় করে দেখে নিব।’
‘সেটা এক সপ্তাহ আগেই দিয়েছি।আপনি তো ভুল করেও আমার মেসেজ দেখেন না।এক সপ্তাহ থেকে আপনার সাথে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করেছি।এখানেও এসেছি কয়েকবার।আপনার চ্যালা অমি আমাকে বিদেয় করে দিয়েছে।’
এশার কন্ঠে রাগ।মাহের তখনও নীরব।

এবার কন্ঠ বদলায় এশার।দূর্বলসুরে বলে, ‘আচ্ছা আপনি এমন কেন?আর কতোটা অসহায় হলে আমার দিকে তাকাবেন।আমাকে নিয়ে একটু ভাববেন।আপনি বলুন আমি কি করলে আপনি আমাকে নিয়ে সিরিয়াস হবেন?শুধু একবার বলুন।জানেন আপনার কথা আমার পরিবার জানে,আমার কয়েক জন ফ্রেন্ডও জানে।তারা আমাকে কী বলে জানেন।বলে আমি এতোটা বেহায়া কেন।তবুও উত্তর দিই না।আপনার জন্য না হয় একটু বেহায়া হলাম।’
এশার কন্ঠে দূর্বলতা।মাহের দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।অনেক চেষ্টা করে নিজেকে সামলে নরম গলায় বললেন, ‘আমার থেকে আপনার মনোযোগ সরান, এশা।আমার যদি সত্যিই আপনাকে প্রয়োজন হয় আমি নিজেই আপনাকে খুঁজে নিব।’

‘সেই দিনটা কি আদৌ আসবে?’
‘আপনি একজন এস্টাবলিসড গার্ল।দশজনের মধ্যে একজন।আপনি নি:সন্দেহে বেটার কেউ ডিজার্ভ করেন।’
এশা মাহেরের এসব কথা পাত্তা দিলো না।সে বরং খুশিতে আটখানা হয়ে পড়লো।হের ইনডিরেক্টলি ওর রুপের প্রশংসা করেছেন।তাঁর মানে লোকটা একটাবার হলেও আমার কথা ভেবেছেন।ইসস কি খুশি লাগছে তার।এশা একটা প্রশান্তির নি:শ্বাস ফেলে হরহর করে বলতে লাগলো, ‘আমি জানতাম আপনি আমাকে নিয়ে একবার না একবার সিরিয়াস হবেন।থট রিডিং এর মতো দারুন পাওয়ার আমার নেই।কিন্তু আমি আপনাকে নিয়ে এতই ভাবি,এতই ভাবি যে…

মাহের এশার উচ্চ আওয়াজে বিরতিহীন কথায় চোখমুখ কুঁচকালেন।শব্দ করে ডাকলেন, ‘অমি!!!’
অমি দৌড়ে আসলো বাহির থেকে।মাহের ইশারায় কিছু একটা বুঝাতেই অমি ক্রুর হেসে রুমে ফিনাইল স্প্রে করলো।এশার কথায় ব্যঘাত ঘটলো ফিনাইলের তীব্র গন্ধ নাকে আসায়।মাহের মাস্ক পড়ে নিয়েছেন।এশা ভয়ংকর রেগে তাকালো অমির দিকে।ওরনা নাকে চেপে নিতে নিতে বলল, ‘আমি আমার জীবনে যদি কাউকে হত্যা করি আপনাকেই করবো কিন্তু।বলে দিলাম।আর একবার শুধু আপনার ডাক্তারকে পাই আপনার চাকরিও নট হয়ে যাবে।এই দূইটা ভবিষ্যৎবাণী করে গেলাম।’
এশা দ্রুত বেরোলো রুম থেকে।ফিনাইলের গন্ধ সে সহ্য করতে পারে না।মাহের আড়ালে মুচকি হাসতেই অমির চোখে পড়ে যায় সেটা।সে আরও উৎসুক হয়ে বলে, ‘স্যার ম্যাম যদি আমার চাকরি সত্যিই নট করে দেয় আমার কী হবে তখন?’
‘মেয়েটার কথা ভালো করে বুঝতে পারো নি তুমি।বুঝে শুনে তারপর কথা বলো।’
‘বুঝেছি তো স্যার।ম্যাম আপনাকে পাওয়ার কথা মানে তো বিয়ের কথা বল গেল।বিয়ে তো আপনাকে করেই ছাড়বে উনি এটা আমি….
‘গেট লস্ট ফ্রম হেয়ার, ইডিয়ট।’
স্যারের ধমক খেয়ে অমি মলিনমুখে চলে যেতে উদ্যত হলো।তখনই মাহের তাকে পুনরায় ডেকে ছাতাটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি এটা দিয়ে এসো।’
‘আচ্ছা।’
অমি বেরোতে উদ্যত হলেই মাহের বললেন, ‘আমি দিয়েছি বলবে না।এটা জানলে তোমার ফিনাইল আর কাজ করবে না তাকে আটকানোর জন্য।’

মালিবাগ আসার কথা গতকাল থাকলেও ব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারনে আসা হয়নি আরহামের।কিন্তু মাইমুনার দাদূ অসুস্থ বলে আজকেই আসতে হলো।মাইমুনা তখন শাওয়ারে।আরহাম প্রথমেই দাদূর সাথে মিট করলেন।এ বাসায় যে মানুষটার প্রতিদিনের আলোচনায় আরহামের অদৃশ্য উপস্থিতি পাওয়া যায়।আরহামকে ভীষন রকমের পছন্দ করেন উনি।
ভদ্রলোক আসার পর থেকেই আরহামের হাত ধরে নীরবে ক্রন্দন করছেন।শেষ বয়স এলে যেমন মানুষ মৃত্যুর পায়তারা অনুভব করতে পারে, দাদূর অবস্থা এমনিই।গত সপ্তাহেই তাকে রিলিজ করে আনা হয়েছে।এখনো হাতে ক্যানেলা সাথে অক্সিজেন মাস্ক।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর বিছানার সাথে মিশে আছে অচিরেই।মোটা কন্ঠ বসে গেছে কন্ঠনালীতে।যুবক বয়সে যখন তাঁর পায়ের আওয়াজে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় মহলটা কেঁপে উঠতো, সিনিয়র, সহ স্যাররা যার বিচরনে বাঘের উপস্তিতি অনুভব করতো, রাজনীতির ময়দানে এক নামে পরিচয় সেই মিফতাহ রেহমান আজ বয়সের ছাপে একজন মূমুর্ষ বৃদ্ধা।আরহামের সাথে উনার সম্পর্কটা বেশ আপন।আরহামকে উনি উনার জীবনের সেরা সেরা মুহুর্তের গল্প,স্মৃতি, গুলো শোনাতেন।আরহামও সেগুলো মনোযোগ নিয়ে শোনতেন।অথচ আজ কথা বলতেও উনার অক্সিজেন মাস্ক আটকানো থাকা লাগে।

ভদ্রলোক অস্পষ্ট স্বরে কিছু বললেন।আরহাম উনার হাত নিজের হাতে নিয়ে মাথা এগিয়ে শুনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন।কিছুক্ষণের মধ্যেই উনার ব্রিদেন ভারী হয়ে গেলে আরহাম সাথে সাথে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দিতেই চোখ বুজে নেন দাদূ।চোখ বেয়ে দূ ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ে।ক্ষমতার লড়াই স্থায়ী হয় না।
রুমে এক অদ্ভূত নিস্তব্ধতা।মাইমুনা রুমে প্রবেশ করলেন।আরহাম স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন কয়েক পলক।মাইমুনার চোখ চকচক করছে।এতদিন পর স্বীয় স্বামীর দেখা পাওয়া গেলো।
নীরবে সালাম বিনিময় শেষে মাইমুনা পাশে বসলেন দাদূর।মাথায় হাত বুলিয়ে হাতে চুমু খেলেন।পরিচিত স্পর্শ পেয়ে ভদ্রলোক চোখ খুললেন।উনার দৃষ্টি আরহামকে কিছু বলছে।মাইমুনা অক্সিজেন মাস্ক খুলতে চাইলে আরহাম বাঁধা দিয়ে বললেন, ‘একটু আগে নি:শ্বাস ভারী হয়ে আসছিলো।খুলবেন না।’
কিন্তু দাদূর ইশারায় খুলতে হলো সেটা।তিনি ভাঙ্গা গলায় বললেন, ‘আমার দাদূমণিকে কষ্ট দিয়ো না দাদাভাই।আমি তোমার ওপর ভরসা করেছি।ওর এুটির জন্য সবসময় ওকে আলাদা নজরে দেখতেন ওর বাবা।ওর মনে ওর বাবাকে নিয়ে অনেক কষ্ট।আশা করি তুমি ওকে আঘাত পেতে দিবে না কখনো।ও আমার আমানত তোমার কাছে।’
মাইমুনা তাড়াতাড়ি মাস্ক লাগিয়ে দিলো।আরহাম মাইমুনার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে বললেন, ‘ইন শা আল্লাহ।আমানতের যত্ন নিবো।আপনি চিন্তা করবেন না।’

ঝিরিঝিরি বাতাসের সাথে তীব্র মেঘের গর্জন।কমফোর্টার ছাড়িয়ে হাফসা নেমে এলো বিছানা থেকে।ডিনার রেডি করতে গিয়ে দেখলো মাহের অলরেডি ডিনার সার্ভ করছেন।
কিছু বোঝাতে চাইলো হাফসা।তবুও থেমে গেলো।দূজনে হাত ধুয়ে খেতে বসলো একসাথে।মাহের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি ঘুমাচ্ছিলে?’
হাফসা না বোধক মাথা নাড়ায়।মাহের পুনরায় বললেন, ‘ডাকলাম শুনো নি?’
হাফসা ঠোঁট উল্টে ব্যাপারটা শেষ করে।মানে তার খেয়াল ছিলো না।মাহের হঠাৎ বলতে লাগলেন , ‘তুমি আপত্তি করবে না।আমি সামনের উইকে ডক্টর আদিলা’র এপোয়েনমেন্ট নিয়ে রেখেছি।একবার যাওয়া উচিত।’
মুহুর্তেই হাফসার চোখমুখ মলিনতায় ছেঁয়ে গেলো।আর সেটা স্পষ্ট টের পেলেন মাহের।
তিনিও খাবার থামিয়ে নরম গলায় বললেন, ‘তুমাকে নিয়ে আমার সবসময় চিন্তা হয় হাফসা।বাড়ির বাইরে একবিন্দুও শান্তি পাই না।এবার তোমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার ভাবতে হচ্ছে।আমি জানি আমি তোমাকে কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারছি না।কিন্তু তুমি আমাকে নিয়ে ভুল ভেবো না।আমার একমাত্র আপন তুমিই।আমি তোমার জন্য কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিবো না।’

হাফসা নীরব রইলো তখনো।ভাতগুলো দলা পাকিয়ে ছেঁড়ে দিচ্ছে আবারও।গলা দিয়ে আর নামবে না খাবার।
‘তোমার সমস্যার জন্য এখনো আমার নিজেকে দায়ী মনে হয়।’
মাহের অনুতপ্ত সুরে কথাটা বলতেই হাফসা ভাইয়ের পাশে যায়।মাহের বোনের হাত নিজের হাতের দখলে নিয়ে বললেন, ‘কখনো নিজেকে একা মনে করো না।আমি দূরে থাকলেও না।সারাজীবন আমি তোমার পাশে আছি।বোন আমার মানা করো না।আগামী মান ডে আমরা ঢাকায় যাচ্ছি।শেষবারের মতো একটা সুযোগ নিয়ে দেখি।’
হাফসা কেবল সাক্ষী হলো ভাইয়ের দূর্বল কন্ঠস্বরের।হাফসার বাকশক্তি হারানোর জন্য মোটেও তার ভাই দায়ী নয়।ওইদিন যদি সেই নৃশংস ঘটনা ওর সামনে না ঘটতো তবে সে কথা হারাতো না।সেখানে ভাইয়ের এক্ষেত্রে কোনো দায় নেই।

সকালবেলা আরহামকে বেশ তাড়া নিয়েই বেরোতে হচ্ছে।দাদূর থেকে বিদায় নিয়ে মাইমুনার রুমে আসলেন আরহাম।হাতটা নিজের হাতে নিয়ে হাতের পিঠে আলতো স্পর্শ এঁকে জিজ্ঞেস,
‘কবে ফিরবেন?’
‘জানিনা।’
‘দাদূর পাশে থাকবেন।কাল রাতেও যা করলেন আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’
‘দোয়া করবেন বেশী করে।’
‘অবশ্যই।মা মনে হয় বাইরে।আমি ওখানেই বিদায় নিয়ে চলে যাব।আপনি বেরোবেন না আর।’
মাইমুনার মুখ আঁধারে ছেঁয়ে গেলো।আরহাম সেটা পরখ করে তাকে হালকা করে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কথা তো হবে হানি।মন খারাপ কেন?আমিও আসবো।মিস করলেই ফোন দিবেন।’
আরহাম বেরিয়ে গাড়িতে উঠেই ফোন হাতে নিলেন।মাহেরের কনভারসেশন থেকে একটা ডকুমেন্ট এসে ডুকেছে।ওপেন করতে দেখলেন একটা বায়োডাটা।

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩

মাহের জানতে চেয়েছেন, ‘প্রোপোজালটা কি দেখবো?’
আরহাম বায়োডাটা দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।ছেলে ব্রিটিশ সিটিজেন।এবং সে উমায়ের সম্পর্কে সব জেনে এগিয়েছে।আরহামের ভেতরে অস্থিরতা বাড়ে।কেন জানি ছেলেটাকে ভালো লাগলো না উনার।উত্তরে লিখলেন, ‘ফরেন সিটিজেন।একটু ভালো করে খোঁজ নাও আগে।’
পরক্ষণেই মেসেজ টা আনসেন্ট করে লিখলেন, ‘দেখো।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫