Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫
Maha Aarat

নিয়াজ সাহেব বরাবরই পানচুয়াল।সময়ের কম-বেশী তিনি মোটেও পছন্দ করেন না।আরও পছন্দ করেন না রুটিন ছাড়া চলা।উনার কথামতো ইশার নামাজ পড়েই ঘুমিয়ে যেতে হবে।উঠতে হবে ফযরের আগে।নামাজ তিলাওয়াত সেরে ফ্রেশ মনে কাজে লাগতে হবে।সকালবেলার সময় বরকতপূর্ণ থাকে,কাজ তাড়াতাড়ি এগোয়।আর দেরি করে উঠা মানেই দিনের দামি সময়গুলো হারিয়ে ফেলা।
সকালবেলা উনার অফিসের যাওয়ার সময় একবিগত ঝগড়া হয়ে যায়।উনার মোজাজোড়া জায়গামতো পান না।ঘড়িটা জায়গামতো পান না,টাই গুলো যে কে কোথায় নিয়ে রাখে প্রতিদিন এ রহস্য তিনি আজ পর্যন্ত উদঘাটন করতে পারেন নি।
কড়া মেজাজ নিয়ে ডাকেন মিসেস মাইশাকে,

‘এদিকে কে আছে?শুনতে পাচ্ছো কেউ?’
ডাক তেমন জোরালো হল না। কিংবা জোরালো হলেও কেউ শুনল না।মিসেস মাইশা নিশ্চয়ই রান্নাঘরে।এছাড়া আর কাউকে পাওয়া যাবে না।একমাএ ছেলের সকাল হয় বেলা বারোটায়।আর মেয়ে রুমে মিউজিক ছেড়ে হয়তো মুভি দেখছে।
মেয়ের রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।রুমে উঁকি দিতেই চমকালেন. রুমের সবকিছু গোছগাছ।আশেপাশে কোনো মিউজিক বা মুভির ডীপ লিরিক্সের আওয়াজ নেই।বরং রুমে ধীরসুরে বাজছে নাশিদ।
নিয়াজ সাহেব ভারী চমকালেন।বেলকনির দিকে এগোতে দেখলেন এশা রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে টাইপিং এ ব্যস্ত।আচমকা বাবাকে দেখতেই বিস্তর হাসলো সে।উঠে এসে বাবাকে বসার জায়গা করে দিলো।নিয়াজ সাহেব শান্তদৃষ্টিতে হাতঘড়ির দিকে তাকালেন।একদিন অফিসের পানচুয়ালিটির ব্যাঘাত ঘটু্ক।আজ তিনি মেয়ের সাথে সময় কাটাবেন।

‘কেমন আছো?’
‘কন্যা ভারগ্রস্ত মেয়েকে এখনো ঘরে রেখে বাবারা যেমন থাকে তেমন।’
এশা খানিক বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘উফফ বাবা আলাপের শুরুতেই এমন কথা?আমি তো বিয়ে করবো।না করিনি।সময় হোক।’
‘ঘরে উপযুক্ত মেয়ে রেখে ছেলের বিয়ের তোড়জোড় চলছে।মানুষ কি বলবে?’
‘মানুষ কি বলবে সেটা ভাবার দরকার নেই।একজনের বিয়ের বয়স হয়েছে সে বিয়ে করবে ব্যাসস।এখানে অন্য কিছু ভাবার প্রয়োজন নেই।’
‘তুমি কি ডক্টর মাহেরকে নিয়ে সিরিয়াস?’
এশার মস্তক অবনমিত হয়ে যায়।সে তো সিরিয়াস কিন্তু লোকটা?লোকটা তো একদম খাপছাড়া আচরন করেন।
বাবার পলকহীন দৃষ্টি দেখে চমকায় এশা।স্বাভাবিক হয়ে বলে, ‘হ্যাঁ।’
‘মাহেরের বোনের জন্য সাফওয়াতকে তাহল তুমিই কনভিন্স করেছো?’

এশার নীরবতায় নিয়াজ সাহেব উত্তর খুঁজে নেন।থেমে থেমে ধীরগলায় বললেন, ‘আবেগ দিয়ে জীবন চলে না এশা।মেয়েটা বাকহীন।আমি জানি সে রুপবতী।আর তোমার ভাইয়ের দূর্বলতা এটাই।যখন কাজের প্রেসারে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরবে তখন মেয়েটার সাথে না চাইতেও খারাপ আচরন করবে।দূরে থেকে মায়ের অসুস্থতার কথা যখন জানতে চাইবে তখন ওর বাকহীনতায় তাঁর মেজাজ ঠিক থাকবে না।সে যখন আবেগে প্রেমের বুলি ছুড়বে তখন ওর নীরবতায় তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গবে।তুমি জানো তোমার ভাই কেমন।তারপরও কেনো এমন করলে?এটা বুঝতে তো তোমার বাকি নেই যে তুমি অন্যায় করছো?’
এশা চুপ হয়ে যায়।মাহের মানুষটাকে সে প্রচন্ডরকম ভালোবাসে।আর তাঁকে পাওয়ার সে সব অন্যায় হয়তো করতে পারে।বাবা বিচক্ষণ মানুষ।তিনি সহজেই হয়তো বুঝে নিলেন যে হাফসা সাফওয়াতের স্ত্রী হওয়া মানে মাহের এশাকে মেনে নেওয়া।
‘কাছের কিছু পাওয়ার জন্য আবেগের বশে ভুল সিদ্ধান্ত নিও না।আমি চাই না আমার ঘরে যে আরেকটা মেয়ে আসবে,সে অবহেলা পাক।’
বাবা প্রস্থান করলেন।এশা অপরাধবোধ নিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে কল দিলো ডায়ালের প্রথম নাম্বারে।সাথে সাথেই ব্যস্ত দেখালো ফোন।এশার জিদ বাড়লো।হাফসাই মাহেরের একমাত্র দূর্বল পয়েন্ট।আর মাহেরকে পেতে হলে এ সুযোগটা তাঁর নিতে হচ্ছে।

আইরা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে হাফসার দিকে।এই আপুটাকে ওর এতো ভালো লাগছে দেখতে,এতো ভালো লাগছে যে সারাক্ষণ ইচ্ছে করছে চোখের সামনে বসিয়ে রাখতে।আইরা তাঁর একান্ত ভাবনায় মগ্ন।সে ভাবছে তাঁর যদি আরেকটা ভাই থাকতো,বা ভাই যদি এখনো অবিবাহিত থাকতেন তবে ভাইকে জোর করে হলেও এই ফুটফুটে আপুটার সাথে বিয়ে দিয়ে দিতো।অবশ্য জোর করা লাগতো না।
কি মায়া চেহারায়!এত পুতুল পুতুল চেহারার মানুষ হয়?তাঁর ভাবনা আরো দূরে গড়ায়।এবার সে ভাবছে সে যদি ছেলে হতো তাহলে সে নিজেই বিয়ে করে নিতো এই আপুকে।ভাইকে দেওয়া যেতো না এই পাএীকে।এমন একটা বার্বিডলের মেয়ের কথা বলার প্রয়োজন লাগবে না।শুধু সারাক্ষণ সে বসিয়ে সামনে বসে থাকতো।
‘আপু আর কাঁদবেন না আমাকে একটু ভালোমতো দেখতে দিন আপনাকে প্লিজ।’
হাফসার উদ্দেশ্যে কথাটা বলেই জিভ কাটে সে।তৎক্ষনাৎ নিজের ভুল সামলে বলে, ‘মানে এত কাঁদতে দেখে আমার মায়া হচ্ছে আপনার জন্য।চোখগুলো লাল হয়ে যাওয়ায় আরো বেশী কিউট লাগছে আপনােকে।’
হাফসা চোখ তুলে তাকায় আইরার আজিব আজিব কথায়।ততক্ষণে সে আবার করা ভুলে মুখে হাত দিয়েছে বিস্ময়ে।
আইরা নিজেই এগিয়ে চোখমুখ মুছে দেয় হাফসার।হাফসা মাথা নিচু করে নিলো তৎক্ষনাৎ।বুকের ভেতর ভারী কান্নাগুলো কোনো বাঁধা মানছে না।চোখ ছাপিয়ে জমানো স্রোতের মতো গড়িয়ে পড়ছে।
আইরা মূলত এসেছিলো আরহামের সাথে।আরহাম এ বিষয়ে আম্মুর সাথে কথা বলার সময় সে শুনে বায়না ধরেছিলো আসার জন্য।তাকে আসতে দেওয়া হচ্ছিলো না বলে কেঁদেকেটে একাকার।আরহাম না পারতে নিয়ে এসছেন।পরে অবশ্য আম্মুও আপত্তি করেন নি।হাফসা একা থাকবে।আইরা না হয় কিছুক্ষণের জন্য তাঁর একাকীত্বের সঙ্গী হলো।

সাফওয়াত এর পরনে ঘিয়ে কালার পান্জাবির সাথে নীল কূর্তি কূর্তি।চোখে মাঝারি ফ্রেমের চশমা।সামনের চুলগুলো খানিক লম্বা,গালে খোঁচা দাড়ি।আরহাম আড়চোখে ছেলেটাকে পরখ করছেন।পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন।কেন জানি এখানে উনার এক মুহুর্তও ভালো লাগছে না।
মাহের আসে অন্দরমহল থেকে।এ মুহুর্তে রুমে সাফওয়াত, আরহাম, আর মাহের।মাহের এসে বললেন, ‘বোন তো রাজি হচ্ছে না তুমার সাথে কথা বলতে।তাও অনেক কষ্টে কোনোমতে রাজি করিয়েছি।আশা করি, তুমি ওকে ভয় পাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতিতে ফেলবে না।’
‘ঠিক আছে।’
মাহের অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন আরহামের দিকে।মাহেরের চোখেমুখে ভয়।কি জানি হাফসা যদি কোনো সিনক্রিয়েট করে বসে।সাফওয়াতকে ইশারায় পাশের রুম দেখিয়ে বললেন, ‘সিটিং রুমে ও আসবে।তুমি যেতে পারো।’
আরহাম গেস্ট রুম ত্যাগ করে চুপচাপ সামনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।উনার এত অস্বস্তির কারন খুঁজে পাচ্ছেন না।মাহের একা মানুষ।একটা আয়োজন দেখে এখানে আসা।মাহেরের বাবা বেঁচে থাকলে আরহাম আসতেন না।ফোন বের করে ওয়ালে তাকিয়ে দেখলেন পরিচিত নাম্বার থেকে চারটা কল এসেছে।নোটিফিকেশন সরিয়ে লক করলেন।ফোনের দিকে তাকাতে পারছেন না।চোখে ব্যাথা করছে সাথে বাড়ছে মাথাব্যাথাও।কানের হেডসেটে লো আওয়াজে একটা তিলাওয়াত লাগিয়ে ব্রেন্চে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে নিলেন।

মাহের হাফসার রুমে আসলেন কোনো প্রয়োজনে।এ রুমের সাথে গেস্টরুম লাগোয়া।আর গেস্টরুমের সাথে ছোট্ট সিটিং রুম।মাহের মূলত এসেছিলেন উনার অস্থিরতার জন্য।হাফসাকে একা ছেড়ে উনি শান্তি পাচ্ছেন না।
হাফসার রুমে ডুকতেই মৃদু চিৎকার শুনতে পেলেন।বিছানায় পা তুলে বসে ফিরনী খাচ্ছিলো আইরা।নিকাবের নিচ দিয়ে খাচ্ছিলো সে।আচমকা দরজার আওয়াজে মাথার ওপর আলগা করে রাখা নিকাব পিরিচে পড়ে ফিরনিতে মাখামাখি হয়ে গেছে।কয়েক সেকেন্ডের দ্রুততায় পিরিচও শব্দ করে পড়ে গেলো।আইরা অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো ফ্লোরে মাখোমাখো হয়ে পড়া ফিরনীর দিকে।।মাহের পরিস্থিতি বুঝতে সময় নিলেন কয়েক সেকেন্ড।মাহের রুমে এসেই বিছানার দিকে নজর গিয়েছিলো।কিন্তু বিছানার চাদরও তো কালো।এখানে কোনো মানুষ থাকবে সেটা ভাবেননি তিনি।
আইরা রাগে হয়তো বিড়বিড়িয়ে কিছু বলল।মাহের বুঝলেন না ঠিকই কিন্তু মেয়েটা যে উনাকে ভালো কিছু বলেনি এটা নিশ্চিত।
‘সরি।’
মাহের দ্রুত বেরোতে চাইলেন।কিন্তু তাঁর আগেও মেয়েটার কন্ঠ শুনলেন, ‘আমার ডিলিশিয়াস ফিরনী টা পড়ে গেলো।আপনি আসলে’ই একটা এক্সিডেন্ট।’

আকাশ ঘোলাটে।একটু পর পর বিজলী চমকাচ্ছে।ঝড়ের সাথে আবারো বৃষ্টি নামবে হয়তো।বিজলীর ভয়ে আইরা আম্মুর পাশে এসে গুটিসুটি মেরে আছে।আরহাম সোফায় ল্যাপটপে কিছু করছেন।
আইরা আর আম্মু আজকের বিষয় নিয়ে আলাপে ব্যস্ত।
‘জানো আম্মু হাফসা আপু এতো কিউট তুমি তো উনাকে দেখো নি দেখলে পাগল হয়ে যেতে।সত্যি বলছি।’
‘তাই?’
‘অবশ্যই তাই।বলে আইরার উচ্ছলতায়র ভর্তি মুখ মুহুর্তেই চুপসে গেলো।আওয়াজ ক্ষীণ করে বলল, ‘কিন্তু আপুটা এতো কাঁদলেন।আমার এত্তো খারাপ লাগছিলো আম্মু।উনি তো একা থাকেন।উনাকে যদি আমাদের বাসায় নিয়ে আসতে পারতাম আমি একটুও কাঁদতে দিতাম না উনাকে।’
‘কেনো কাঁদলো সে?’

‘হয়তো ওই পাএকে পছন্দ হয়নি।না হওয়ারই কথা।কান্নার আগে যতক্ষণ আমার সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছেন তখন জেনেছি উনার এমন ছেলে পছন্দ নয়।’
আরহাম এবার স্কিন পজ করলেন।না চাইতেও উনার মনোযোগ আইরার কথাগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে।
আইরা এবার ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আমি না করেছি আপুকে ওই ছেলের সামনে না যেতে।’
আম্মু এক্সাইটমেন্টে একটু জোরে বলে উঠলেন, ‘কি বলো?কেন?’
‘আমারও ছেলেটাকে পছন্দ হয়নি আপুর জন্য।তাই এমন বুদ্ধি দিলাম।’
আইরার ফিসফিসানি কথাবার্তা আরহাম বুঝছেন না বলে বিরক্ত হচ্ছেন তিনি।কথা আবার ফিসফিসিয়ে বলতে হচ্ছে কেন?উনি কি বাইরের কেউ?
আরহামের মনোযোগ তাদের দিকে বুঝে আম্মু উৎসুক গলায় বললেন, ‘আরহাম আইরা না কি না করেছে হাফসাকে।ছেললটার সাথে দেখা না করার জন্য।’
আইরা ভীতু নজরে তাকালো ভাইয়ের দিকে।
আরহাম স্বাভাবিকভাবে বললেন, ‘ভালো।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪

‘ভালোর কি দেখলে তুমি?’
আম্মুর প্রশ্নে নিজের উত্তর মনে মনে আবার রিপিট করতে গিয়ে আরহাম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন।নিজের ভেতরের অশান্তি আড়াল করে বললেন, ‘আইরার কথায় উনি এমন সিদ্ধান্ত নেন নি হয়তো।হয়তো উনারও পছন্দ ছিলো না।”
আইরা ভাইয়ের পজিটিভ মন্তব্য পেয়ে জোর গলায় বলল, ‘হ্যাঁ ভাইয়া।আপুর আসলেই পছন্দ ছিল না।আপুর তো তোমার মতো কাউকে পছন্দ।’
‘মানে?’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬