Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৮

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৮

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৮
তেজরিন উম্মীদ

ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হতেই একরাশ আর্দ্রতা আর সাবানের মৃদু সুবাস নিয়ে বেরিয়ে এল ফারাজ। হাতের টাওয়ালটা দিয়ে নিবিষ্ট মনে মুখ মুছছিল সে, কিন্তু বের হওয়া মাত্রই যেন এক ঝোড়ো হাওয়ার মুখোমুখি হতে হলো তাকে। দরজার ছিটকিনিটা ঠিকঠাক লাগানোর ফুরসতটুকুও দিল না রুশদী; আগলে দাঁড়ালো পথ। অধৈর্য কণ্ঠে আবদার ছুড়ে দিল,

“আপনার ফোনটা দিন তো!”
হঠাৎ এমন অতর্কিত হানা আর অদ্ভুত দাবিতে ফারাজ কিছুটা অপ্রস্তুত হলো বটে। টাওয়ালের আড়াল থেকে ভ্রু কুঁচকে সে অবাক চোখে রুশদীর অস্থিরতা মেপে নিল। তারপর খানিকটা বিরক্ত মেশানো শান্ত স্বরে জবাব দিল, “আমি কি ফোন নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকেছিলাম? ওটা ওখানেই চার্জে আছে, তোমার দরকার হলে নিয়ে নাও।”
অনুমতি পাওয়া মাত্রই রুশদী যেন এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চাইল না। দ্রুত পায়ে সে এগিয়ে গেল বেড সাইড টেবিলের দিকে। ফারাজ আড়চোখে তার এই হন্তদন্ত ভাব লক্ষ করছিল। আসলে রুশদীর মনের ভেতর তখন এক তোলপাড় করা সমুদ্রের ঢেউ বইছে। একটু আগেই শের-এর মুখে শোনা সেই অবিশ্বাস্য সত্যটা তার মগজে হাতুড়ি পেটাচ্ছিল—ফারাজ তাকে আগে থেকে পছন্দ করত!

কথাটা বিশ্বাস করতে গিয়েও যেন বারবার হোঁচট খাচ্ছিল রুশদী। কিন্তু শের-এর স্বভাব তো তার জানা।পিচ্চিটা মজার ছলেও কখনো মিথ্যা কথা বলে না। তবে ফারাজের মতো মানুষ, যার সাথে প্রথম দেখাতেই তিক্ত ঝগড়ায় মেতেছিল, সে কীভাবে তাকে মনের গহিনে যত্ন করে পুষে রাখতে পারে? এই অমিমাংসিত রহস্যের জট খুলতে রুশদী যেন মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যখন শের তাকে কানে কানে বলল, “বিশ্বাস না হলে তুমি পাপার ফোন চেক করতে পারো, পাপার ফোনে তোমার অনেক গুলে ফোটো আছে।”

ফোনটা হাতে নিতেই যেন সময় থমকে গেল। চার্জার থেকে ফোনটা বিচ্ছিন্ন করতেই লক স্ক্রিনের আলোয় ফুটে উঠল এক কিশোরীর অমলিন হাসিমাখা মুখ। কলেজ ড্রেস পরা সেই হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটি আর কেউ নয়—স্বয়ং রুশদী! নিজের সেই পুরনো অবয়বকে ফারাজের ফোনের ওয়ালপেপারে দেখে রুশদীর যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। ডাগর ডাগর চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে রইল সেই স্ক্রিনের ওপর।ছবিটা দেখে যতদূর মনে পড়ছে, ছবিটা কলেজের নবীন বরণের।কিন্তু তাদের তো নবীন বরণের বেশ কিছুদিন পরে দেখা হয়েছিল।
ভিতরের অস্থিরতা আর কৌতুহল এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। ফারাজ তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখছিল আর আলতো করে চুল মুছছিল। রুশদী হনহনিয়ে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনের স্ক্রিনটা ফারাজের চোখের সামনে তুলে ধরে প্রায় রুদ্ধ স্বরে প্রশ্ন করল,

“এটা কী? এই ছবি আপনার কাছে এলো কি করে?”
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় তখন জোড়া প্রতিবিম্ব—একপাশে বিমূঢ় রুশদী, অন্যপাশে নির্বিকার ফারাজ। ফারাজ শান্ত হাতে টাওয়ালটা গুছিয়ে রাখল। পেছনে ফিরে খুব সহজ গলায় সে শুধু বলল,
“খুব চেনা লাগছে না? ওটা তোমারই ছবি।”
রুশদীর বুকের ভেতর তখন প্রশ্নেরা ডানা ঝাপটাচ্ছে। সে প্রায় রুদ্ধশ্বাসে পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “আপনার কাছে এই ছবিটা এল কোত্থেকে? এটা তো এবারের নবীন বরণের সময়কার। অথচ আপনার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল তারও প্রায় এক মাস পরে!”
ফারাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে তেরছা চোখে তাকিয়ে রসিকতার সুরে বলল,

“আসমান থেকে টুপ করে কোলে এসে পড়েছে আরকি!”
রুশদীর ধৈর্য যেন এবার বাঁধ মানল না। চোখের মণি দু’টো রাগে আর বিস্ময়ে বড় বড় করে সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “আমি আপনার সাথে একদমই ঠাট্টা করার মেজাজে নেই ফারাজ। সোজা সাপটা উত্তর দিন—শের যা বলেছে, তা কি সত্যি? আপনি কি সত্যিই আমাকে আগে থেকেই চিনতেন?”
ফারাজ এবার আর সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিল না। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে অবহেলার সুরে বলল, “শের যা বলেছে সেটা শেরকেই জিজ্ঞেস করো। আমার কাছে কেন?”
“আমি আপনাকে প্রশ্ন করেছি, জবাবটা আপনার থেকেই চাই!” রুশদীর কণ্ঠস্বরে জেদ আর আর্তির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
ফারাজ এবার কিছুটা ত্যাড়ামো করে ঘাড় নাড়িয়ে বলে দিল, “আমি উত্তর দেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করছি না।”

“কিন্তু আমি প্রয়োজন বোধ করছি!” রুশদীর গলার স্বর এবার সপ্তমে চড়ল।
ফারাজ তখনো অবিচল, “সেটা আমার দেখার বিষয় নয়।”
যেই ফারাজ তাকে এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল, রুশদী যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। উত্তেজনার এক চরম মুহূর্তে সে খপ করে খামচে ধরল ফারাজের টি-শার্টের কলার। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ফারাজকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল সে। উচ্চতায় ফারাজের ধারেকাছেও নয় সে, তাই জেদ বজায় রাখতে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নিজেকে বেশ কিছুটা উঁচুতে তুলে ধরল রুশদী। তার নাকের ডগায় তখন রাগের লাল আভা, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম আর চোখে এক আকাশ সমান কৌতূহল ও তেজ। ফারাজের চোখের গভীর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সে আবার হুঙ্কার ছাড়ল, “আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তবেই যাবেন!”
ফারাজ তার এই রূপে অবাক হলেও মুখে তা প্রকাশ করল না। বরং বিদ্রুপের এক অদ্ভুত শীতলতায় সে একবার রুশদীর পায়ের আঙুলের দিকে তাকালো, যেখানে রুশদী ভারসাম্য বজায় রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। তারপর তার মুখমণ্ডলে দৃষ্টি স্থির করে ব্যঙ্গভরা সুরে বলল,

“আঙুলের ওপর ওভাবে কসরত না করে বরং একটা টুল নিয়ে এসো। খামোখা আঙুলগুলো ভেঙে যাবে তোমার। গলার স্বর তো বেশ উঁচুতে তুলেছ, অথচ নিজেকে উঁচু করতে এখনো আঙুলের ওপর ভর দিতে হচ্ছে! ব্যাপারটা বড্ড বেমানান লাগছে না?”
রুশদী মুহূর্তের জন্য থমকাল, শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে আঙুলের ডগায় টান পড়ল তার, কিন্তু জেদ দমল না। ফারাজের বিদ্রুপ তাকে দমাতে তো পারল না সে আগের মতোই তেজদীপ্ত কণ্ঠে পুনরাবৃত্তি করল,
“আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন, আপনি কি সত্যিই আমাকে আগে থেকেই পছন্দ করতেন?”
ফারাজ এবার তার দু’চোখে গভীর এক দৃষ্টি রাখল। যে দৃষ্টির তল পাওয়া দায়। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “তাতে কি তোমার খুব সমস্যা হচ্ছে?”

“সমস্যা নয়,কনফিউশন হচ্ছে। আর আমি ধোঁয়াশার ভেতর বাস করতে পারি না।”
“তাহলে সেই ধোঁয়াশা নিজেই কাটিয়ে নাও। এখন ছাড়ো আমাকে, যেতে দাও।”
ফারাজ নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।রুশদী এবার রাগে ফুঁসে উঠল। টি-শার্টের কলারটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “আপনি কিন্তু আমাকে ভীষণ রাগাচ্ছেন। ভুলে যাবেন না, আমি কিন্তু মোটেও খুব একটা ভদ্র কিংবা ধৈর্যশীল মেয়ে নই। আমার ব্যবহারের কতটা খারাপ আপনার জানা নেই। যেটা জিজ্ঞেস করেছি, সেটার সোজাসুজি উত্তর দিন!”

ফারাজ এবার একচিলতে বাঁকা হাসি হাসল। শান্ত গলায় মনে করিয়ে দিল, “নিজের চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড় একটা লোকের কলার চেপে ধরে এভাবে চিৎকার করতে তোমার লজ্জা লাগছে না?”
রুশদী এক মুহূর্ত দেরি না করে উত্তর দিল, “নিজের চেয়ে দশ বছরের ছোট একটা মেয়েকে বিয়ে করতে যদি আপনার লজ্জা না লাগে, তবে আমার কেন লাগবে? ত্যাড়ামো ছেড়ে জবাবটা দিন।”
ফারাজ এবার শক্ত হলো। পাথরের মতো কঠিন স্বরে বলল, “দিব না। যা করার করে নাও।”
সোজা আঙুলে যে ঘি উঠবে না, সেটা বুঝতে রুশদীর আর বাকি রইল না। সে ঝট করে ফারাজের কলার ছেড়ে দিল। এক পা পিছিয়ে গিয়ে হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে বাঁধল। চোখের মণি সরু করে একটা খোঁচা মেরে বলল, “তা তো দেবেনই না। নিজের প্রথম ভালোবাসাকেই যেখানে আজও ভুলতে পারেননি, সেখানে আমাকে আবার পছন্দ করেছেন? বুঝেতে হবে তো, আপনার ক্যারেক্টারে গ্যাস্ট্রিক আছে!”

কথাটা ফারাজের গায়ে লাগল। সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু ‘ক্যারেক্টারে গ্যাস্ট্রিক’ শব্দদুটো শুনেই তার পায়ের তলা যেন থমকে গেল। এক ঝটকায় পেছনে ফিরে রুশদীর মুখোমুখি দাঁড়াল সে। চোয়াল শক্ত করে বলল, “হোয়াট ডু ইউ মিন বাই ক্যারেক্টার গ্যাস্ট্রিক?”
রুশদী অবহেলার ভঙ্গিতে কাঁধ নাচাল। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “আপনি যা বুঝেছেন, ঠিক সেটাই।”
ফারাজ এবার সত্যিই দমে গেল কি না বোঝা গেল না, তবে তার স্বরে এবার কিছুটা নমনীয়তা এল। সে রুশদীর জেদ দেখে ক্লান্ত স্বরে বলল, “ঠিক আছে, বলো তোমার আর কী কী প্রশ্ন আছে?”
কিন্তু রুশদীও তো সেই ঘুণে ধরা জেদেরই অংশ। সে এবার বিজয়িনীর হাসি হেসে বলল, “না, এখন আর আমি কিচ্ছু বলব না। আমার আর জানার কোনো আগ্রহ নেই।”
ফারাজ এবার বিরক্ত হয়ে বলল, “এখন আবার আমার সাথে ত্যাড়ামো শুরু করলে?”
রুশদী ঘাড় বাঁকিয়ে তেজি স্বরে জবাব দিল, “হ্যাঁ করছি। তো? আপনার মতো লোকের সাথে এমনটাই সাজে!”

ফ্ল্যাশব্যাক —
কলেজে ফারাজের পা পড়ে খুব কম। বিশেষ কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া তাকে এখানে দেখা যায় না। কিন্তু আজ বাধ্য হয়েই আসতে হলো।আজকের প্রোগ্রামে, শেহজাদ খানের আসার কথা ছিল কলেজে,তিনি আসতে পারবেন না বলে ফারাজকে পাঠিয়েছেন।
প্রায় দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। প্রখর রোদের তাপে চারপাশটা যেন তপ্ত কড়াইয়ের মতো হয়ে আছে। সেই রোদে প্রথম সারির সোফায় বসে প্রিন্সিপালের দীর্ঘ ভাষণ আর বিশেষ শুনে এবং অতিথির তকমা সইতে সইতে ফারাজ ক্লান্ত। কলেজের অধ্যক্ষ তাকে মঞ্চে উঠে দু-কলি বলার জন্য বারবার অনুরোধ করলেও, সে স্রেফ মৃদু হেসে প্রত্যাখ্যান করেছে। কাঠফাটা দুপুরের এই ধকল তার সহ্য হচ্ছিল না, তার ওপর পরনে কালো স্যুট—যা গরমকে যেন আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাথে থাকা শেরের অবস্থাও খারাপ।

মধ্যাহ্নভোজের বিরতি শুরু হতেই প্রিন্সিপাল তাদের আপ্যায়নের জন্য মিটিং রুমে নিয়ে গেলেন।ফারাজ তেমন কিছু খেলো না, শুধু কয়েক টুকরো ফল আর একটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল হাতে বেরিয়ে এল করিডোরে। দোতলার নির্জন করিডোরের রেলিংয়ে দুই হাত ঠেকিয়ে সে একটু ঝুঁকে দাঁড়ালো। নিচে তখন নবীন বরণের উন্মাদনা। কনসার্টের তালে তালে একদল ছেলেমেয়ে হইহুল্লোড় করছে, কেউ বা বন্ধুর সাথে খুনসুটিতে মত্ত।

শীতল পানীয়তে এক চুমুক বসিয়ে উদাস চোখে ফারাজ নিচে তাকালো। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন জগতের সব কোলাহল থমকে গেল তার কাছে। ভিড়ের এক কোণে, ঘাসের ওপর বসে থাকা শ্বেতশুভ্র এক কিশোরীর ওপর তার দৃষ্টি আটকে গেল। মেয়েটির পাশে বসা বান্ধবীটি কানে কানে কী একটা বলতেই সে খিলখিল করে হেসে উঠল।
সেই হাসি! যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা শ্রেষ্ঠ এক ক্যানভাস। হাসির তোড়ে মেয়েটির চোখের কোণ কুঁচকে যাচ্ছে, যেন মুক্তো ঝরছে তার অধর থেকে। সে এক পশলা বৃষ্টির মতো স্নিগ্ধ হাসি, যা মরুভূমির বুকেও হাহাকার জাগাতে পারে। সেই হাসির দমকা হাওয়ায় ফারাজের ভেতরকার পাথরচাপা আবেগগুলোও যেন আচমকা নড়েচড়ে বসল।

সাদা কলেজ ড্রেস আর শুভ্র হিজাবে আবৃত মেয়েটি যেন শরতের মেঘে ঢাকা এক টুকরো চাঁদ। ফারাজ কয়েক সেকেন্ডের ভেতর তার নয়নপল্লব থেকে পায়ের নখ অব্দি মেপে নিল। কিশোরী বয়সের সেই চপলতা আর স্নিগ্ধতা তাকে মুহূর্তেই আচ্ছন্ন করে ফেলল। লোকে বলে, ভালোবাসা জন্মাতে বছরের পর বছর লাগে, কিন্তু প্রেমে পড়তে লাগে মাত্র এক পলক। মানুষ হয়তো আগে রূপের মোহে পড়ে, মায়াবী হাসির মোহে পড়ে, কিংবা ওই ডাগর চোখের মায়ায়। ফারাজের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হলো। তার চোখের কোণে লেগে গেল নেশার এক হালকা আস্তরণ।
বসন্তের বাতাস তখন তার চুলে বিলি কেটে যাচ্ছিল,পরিবেশটা এক নিমেষে বিষাদ কাটিয়ে কাব্যিক হয়ে উঠল। ফারাজ তাকিয়ে রইল; চোখের পাতা ফেলার সাহসও হলো না তার। মনে হলো, এই বুঝি পলক ফেলতেই মেয়েটি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। এক অজানা আকর্ষণ আর প্রেমের ব্যাকুলতা নিয়ে ফারাজ তার দৃষ্টির নোঙর ফেলল সেই কিশোরীর হাসিমাখা মুখে।মানুষ কি তবে সত্যিই এতখানি মোহনীয় হতে পারে? ফারাজ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল সেই শুভ্রবসনা কিশোরীর দিকে। ক্ষণিকের জন্য তার মনে হলো, এ যেন কোনো রক্ত-মাংসের মানবী নয়, বরং স্বর্গচ্যুত কোনো পরি; ভুল করে মর্ত্যের এই ধুলোবালি মাখা শহরে এসে ঠাঁই নিয়েছে। তাকে কোনো পার্থিব উপমায় বাঁধতে গিয়েও ফারাজ বারবার থমকে যাচ্ছিল।

হৃদপিণ্ডের ভেতর এক অজানা কম্পন অনুভব করল সে। মেয়েটিকে আরও কাছ থেকে দেখার, তার হাসির রেশটুকু নিজের ভেতর আজীবনের মতো গেঁথে নেওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ফারাজকে পেয়ে বসল। অস্থির হাতে পকেট থেকে নিজের স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোনটা বের করল সে। ক্যামেরা লেন্সের ওপাড়ে বন্দী হলো সেই অপরূপা।
দূরত্ব অনেকটা থাকলেও ফোনের আধুনিক লেন্সের জুম করার ক্ষমতায় মেয়েটির মুখচ্ছবি স্ক্রিনে ভেসে উঠল জীবন্ত এক ছবির মতো। ফারাজ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই ডিজিটাল ক্যানভাসের দিকে। মেয়েটির হাসিতে তখনো সেই অমলিন চপলতা—আক্কেল দাঁত উঁকি দেওয়া সেই অকৃত্রিম খিলখিল হাসি যেন ফারাজের বুকের সবটুকু দখল করে নিতে চাইল। এত মায়াবী হাসির দেখা সে আগে কখনও পায়নি।

কিন্তু পরক্ষণেই এক অদ্ভুত আঁধার নেমে এল ফারাজের মনের কোঠরে। এক তীক্ষ্ণ অধিকারবোধ আর দুর্ভেদ্য হিংসা তার হৃৎপিণ্ডকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। এই যে স্নিগ্ধতা, এই যে মায়াবী আলোর বিচ্ছুরণ—তা তো আজ এই মাঠের শত শত মানুষ দেখছে! তার মতো আরও কত চোখ হয়তো এখন এই মেয়েটির ওপর নিবদ্ধ, কত কিশোর মন হয়তো মনে মনে তাকে নিয়ে কাব্য বুনছে। এই ভাবনাটাই ফারাজকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে লাগল।
কেন এই অকারন ঈর্ষা? কেন এই অপরিচিতার ওপর এমন তীব্র অধিকারের দাবি? এই প্রশ্নের কোনো যৌক্তিক উত্তর ফারাজের জানা ছিল না। তবু এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে সে হারিয়ে গেল নিজেরই গড়া এক গোলকধাঁধায়। বাইরের কোলাহল, রোদের প্রখরতা কিংবা শেরের উপস্থিতি—সবই যেন তার কাছে তখন তুচ্ছ হয়ে গেছে। ফারাজ শুধু নিমগ্ন হয়ে রইল ফোনের স্ক্রিনে ধরা দেওয়া সেই অপার্থিব কিশোরীর মায়াবী হাসির দিকে।

সেদিন রাত টা অন্যদিনের মতোই ছিল, অথচ ফারাজের দু’চোখে ঘুমের কোনো রেশ ছিল না। বইয়ের পাতায় কিংবা সেলুলয়েডের ফিতায় এতদিন কতই না পড়েছে সে—মানুষ প্রেমে পড়লে নাকি আকাশের চাঁদটাও বড় দেখায়, রুগ্ন পৃথিবীর সবটুকু সৌন্দর্য তখন ওই একজনের মাঝেই উঁকি দেয়। রাত জেগে কারো কথা ভাবতে ভালো লাগা, তপ্ত রোদে পুড়ে কারো অপেক্ষায় প্রহর গোনা কিংবা অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে প্রিয় মুখটি দেখার যে অদ্ভুত উন্মাদনা, তা ফারাজের কাছে এতদিন ছিল স্রেফ অলীক কল্পনা।
কিন্তু আজ রাতের প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাকে সেই নতুন এক ব্যাকুলতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। সারা রাত বিছানায় ছটফট করে কাটাল সে। ভোরের আলো ফুটতেই তার ব্যস্ততা শুরু হলো। অনেকদিন পর শের-কে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার নাম করে সে গিয়ে দাঁড়াল ‘এস.কে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের’ গেটে। তার মূল উদ্দেশ্য শের নয়, বরং সেই অচেনা কিশোরীর একটা খোঁজ পাওয়া। গতকালকের পর থেকে ফারাজের জগৎটা কেবল ওই হাসিমুখেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

শের তার ক্লাসে চলে গেল, কিন্তু ফারাজ ফিরল না। কোনো রূপালী পর্দার নায়কের মতো ধুলোবালি মেখে মাঝদুপুরে সে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে রইল না ঠিকই, তবে নিজের এসিবন্দি গাড়ির ভেতর বসেই তার উৎসুক নজর গেটের দিকে নিবদ্ধ রাখল। কলেজের এইচএসসি ক্যান্ডিডেটদের ভালো ছাত্রীদের তালিকায় মেয়েটির নাম আছে—এইটুকু তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ফারাজের এই প্রহর গোনা।
গতকাল রাতে নিজের মোবাইলে জুম করে তোলা সেই ছবিটি সে কতবার দেখেছে, তার হিসাব স্বয়ং বিধাতা ছাড়া আর কেউ জানে না। এক অদ্ভুত অস্থিরতা আর আকাঙ্ক্ষার আগুন তার ভেতরে টগবগ করে ফুটছে। এমন উন্মাদনা তো ফারাজের উনত্রিশ বছরের জীবনে আগে কখনও হানা দেয়নি! তবে আজ কেন?
প্রেমে পড়লে বুঝি মানুষ সময়ের হিসাব ভুলে যায়, ভুলে যায় তার নিজের আভিজাত্য কিংবা গাম্ভীর্য। তাই তো রোদের কড়া তেজ যখন বাইরের পিচঢালা রাস্তাকে পোড়াচ্ছে, ফারাজ তখন পাঁচ-পাঁচটি ঘণ্টা অসীম ধৈর্য নিয়ে গাড়িতে বসে রইল। তার সমস্ত সত্তা কেবল একবার সেই অপরিচিতার মুখোমুখি হতে চায়, যে মেয়েটি না জেনেই ফারাজের হৃত্পিণ্ডের স্পন্দন চুরি করে নিয়েছে।

ততক্ষণে সেই মায়াবী কিশোরীর আদ্যোপান্ত ফারাজের নখদর্পণে। রুমাইসা হক রুশদী। বয়স মাত্র উনিশ। বাবা আনাস হক। আনাস হকের নামটা কানে আসতেই ফারাজের ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল; মেয়েটিকে না চিনলেও তার জন্মদাতাকে ফারাজ খুব ভালো করেই চেনে।
কলেজের ছুটি হতেই গেট দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ঢল নামল। হইহুল্লোড় আর চঞ্চল পায়ের শব্দে চারপাশ মুখর। কিন্তু ফারাজের নির্দেশে তার দু’জন ব্যক্তিগত দেহরক্ষী আগে থেকেই পাহারায় ছিল। ভিড় কিছুটা পাতলা হতেই ফারাজ দেখল—দু’টো বিশালদেহী কালো স্যুট পরা লোকের সামনে দাঁড়িয়ে রীতিমতো রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করেছে রুশদী। ছোট্ট মেয়েটা কি অকুতোভয়! আঙুল উঁচিয়ে বুক চিতিয়ে লোক দু’টোর সাথে সমানে তর্ক করে যাচ্ছে সে।
গাড়ির এসির হিমেল হাওয়ায় বসে ফারাজ মুগ্ধ হয়ে সেই দৃশ্য দেখল। লোকগুলোকে সে নিজেই হুকুম দিয়েছিল যেন রুশদীকে কিছুক্ষণ আটকে রাখা হয়। কোনো ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং কেবল নিজের তৃষ্ণার্ত চোখ দুটোকে শান্ত করার জন্য। ওইটুকুন একটা মেয়ে, অথচ তার তেজি ভঙ্গি আর সাহসের বহর দেখে ফারাজ মনে মনে হাসল। রুশদীর এই ঝগড়াটে রূপটাও যেন তার কাছে এক অদ্ভুত অলঙ্কার মনে হলো। ফারাজ বিড়বিড় করে বলল, “বাপরে! এ তো রীতিমতো আগ্নেয়গিরি!”

ফারাজ ফোন করে গার্ডদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিতেই তারা পথ ছেড়ে দিল। রুশদী গটগট করে গাল ফুলিয়ে নিজের পথে হাঁটতে শুরু করল। তাকে যেতে দেখে ফারাজ নিজের কপালে একটা হালকা থাপ্পড় মেরে আপন মনেই হেসে উঠল। তার মতো একজন মানুষ শেষমেশ কি না এই একরত্তি পুঁচকি মেয়ের প্রেমে পড়ে নাস্তানাবুদ হচ্ছে!
নিজেকেই নিজে শাসন করার স্বরে ফারাজ বলল, “ছিঃ ছিঃ ফারাজ! তোর মেন্টালিটি কি দিন দিন এতই নিচে নেমে গেল? শেষে এই কচি খুকির প্রেমে পড়লি? তুই তো দেখছি একদম শেষ!”
নিজের ওপর এমন বিদ্রুপ করে সে সশব্দে হেসে উঠল। রুশদী তখন অনেকটা দূরে চলে গেছে, তার উড়ন্ত হিজাবের প্রান্তটুকু কেবল দেখা যাচ্ছে। ফারাজ এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে তালের ঝংকার তুলে গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
“অল্প বয়সের সকিনা ছেরি,
আমার মনটা কেন করলি চুরি?
সত্যি করে বল না ছেরি গো—
কোন জেলায় তোর বাড়ি?”

সেই দুপুরে রোদের প্রখরতা ছাপিয়ে ফারাজের মনে তখন বসন্তের দখিনা বাতাস বইছে। সে জানত না, এই চুরির দায় মেটাতে তাকে একদিন নিজের সমস্ত হৃদয়টাই ওই অবাধ্য মেয়েটির নামে লিখে দিতে হবে।মন আর চোখ—দুটোকেই যখন মেয়েটা হরণ করে নিয়েছে, তখন তাকে নিজের করে পাওয়া ছাড়া ফারাজের আর কোনো গতি নেই। ফারাজের মনে এক অদ্ভুত জেদ দানা বাঁধল। এমন এক অধিকার, যেখানে অন্য কারোর ছায়াটুকুও পড়বে না। তার রাজত্বে কেবল ওই চঞ্চল মেয়েটির বিচরণ হবে। কিন্তু সমস্যা হলো পরিবারকে নিয়ে। আগের বিয়েতে তার কোনো দোষ ছিল না ঠিকই, তবে নতুন করে বিয়ের পিঁড়িতে বসার খায়েশ বা নিজের পছন্দের কথা বলতে গিয়ে ফারাজের যেন কেমন একটা অস্বস্তি বিঁধল। নিজের মুখে এসব বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
তাই দাবার ঘুঁটি হিসেবে সে বেছে নিল নিজের কলিজার টুকরো—শেহরান খান শেরকে।
রাতের ঢাকা শহরের ব্যস্ততা মাড়িয়ে বাইকে করে ছেলেকে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল এক অজানা উদ্দেশ্যে। শেষমেশ বাইক থামল মাওয়া ঘাটে, পদ্মার পাড়ে। চারদিকে রাতের শীতল হাওয়া আর পানির কল্লোল ধ্বনি এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছে। দূরে মানুষের আনাগোনা, কেউ আইসক্রিম খাচ্ছে, কেউ বা গল্পে মত্ত। ফারাজ বাইকের সাথে হেলান দিয়ে হাত দু’টো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে দাঁড়াল। শের তখন বেশ তৃপ্তি করে আইসক্রিম চাটছে। পদ্মার জলের দিকে তাকিয়ে ফারাজ খুব নিচু স্বরে ডাকল,

“শের!”
“ইয়েস পাপা?” শের আইসক্রিম থেকে মুখ না তুলেই জবাব দিল।
“তোমার কি একটা মা লাগবে?”
শেরের হাসিখুশি মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা হয়ে গেল। সে বিষণ্ণ সুরে বলল, “লাগত, কিন্তু তুমিই তো সেদিন বললে—আমার কোনো মায়ের দরকার নেই। তুমিই আমার মা, তুমিই বাবা।”
ফারাজ এবার একটু ঝুঁকে ছেলের চোখে চোখ রেখে বলল, “সেটা তখন বলেছিলাম। এখন যদি বলি সত্যিই তোমার একজন মা লাগবে, তবে?”
শেরের চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “হুম লাগবে! আমারও খুব ইচ্ছে করে কাউকে মম বলে ডাকতে। ইচ্ছে করে মম আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করুক।”
ফারাজ আর দেরি করল না। পকেট থেকে ফোন বের করে গ্যালারিতে রাখা সেই ছবিটা শেরের চোখের সামনে ধরল।

“দেখো তো, এই মেয়েটাকে তোমার মম হিসেবে কেমন লাগে?”
ছবিটা দেখামাত্রই শের চিৎকার করে উঠল, “আরে! এই আপুটাকে তো আমি চিনি! সেদিন আমাদের কলেজের করিডোরে দেখা হয়েছিল।”
“মম হিসেবে পছন্দ হয়েছে তো?” ফারাজের কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা।
শের খিলখিল করে হেসে উঠল, “খুব পছন্দ! জানো পাপা, সেদিন একটা ভাইকে মিথ্যে করে রাগানোর জন্য তিনি বলেছিলেন আমি নাকি উনার ছেলে। হি হি! দেখো, সত্যিই তাই হতে যাচ্ছে!”
ফারাজ এবার আসল চালে এল। সে শেরের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, “তাহলে একটা কাজ করতে হবে। এই আপুটাকে, সড়ি তোমার হবু মমকে আমার বউ হতে সাহায্য করতে হবে তোমাকে। যদি পারো, তবে সিঙ্গাপুর থেকে দশ কার্টুন চকলেট এনে দেব তোমাকে। আর মনে রেখো, এই ডিল আমাদের দু’জনের গোপন থাকবে। আমি যা যা বলব, তুমি ঠিক তাই তাই করবে। মনে থাকবে? ডিল ডান?”
শের মহানন্দে বাবার বাড়ানো হাতে হাত মেলাল। হ্যান্ডশেক করে চপল ভঙ্গিতে বলল, “ডিল ডান পাপা! যদিও মম এর লোভে আমি কাজটা ফ্রিতেই করে দিতাম।ডান ডান, একদম ডান!”

বিকেলের পড়ন্ত রোদ তখন খান বাড়ির ড্রয়িংরুমের ভারী পর্দার পাশ দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। হাতে রাখা খবরের কাগজটা ভাঁজ করে নামিয়ে রাখলেন রাইমা খান সামনে কোমরে দুই হাত দিয়ে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছে নাতি শেহরান খান শের। তার গম্ভীর মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে আজ কোনো মস্ত বড় দাবি নিয়ে এসেছে।
“দাদু, আমি অনেক ভেবে দেখেছি। এবার আমার একজন মম লাগবেই লাগবে!” শেরের কণ্ঠস্বরে এক অটল জেদ।
রাইমা খান চশমার ফাঁক দিয়ে নাতিকে পরখ করলেন। পায়ের ওপর তুলে রাখা পা-টা নামিয়ে কিছুটা সোজা হয়ে বসলেন তিনি। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে আলতো হেসে বললেন, “মহামান্য শেহরান খান শের, আপনার এই বিনীত প্রস্তাবটি দাদুর কাছে না করে আপনার আব্বাজানের কাছে করুন। তিনি তো ইদানীং সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেছেন।বিয়ে-শাদী নাকি করবেন না। বিয়ে-শাদির কথা তুললে মনে হয় তার ডিকশনারিতে এই শব্দটাই নেই। আমি বাবা এই ঝামেলার মধ্যে নেই!”

কথাটা পাশের সোফায় নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে থাকা ফারাজের গায়ে একপ্রকার খোঁচা দিয়েই বললেন রাইমা খান। ফারাজ যেন শুনতেই পায়নি এমন ভান করে ল্যাপটপে চোখ আটকে রাখল। তবে শের দমবার পাত্র নয়। সে ফারাজের দিকে তাকিয়ে তেজি স্বরে বলল, “পাপাকে বলে লাভ নেই দাদু। আমি আমার মমকে অলরেডি সিলেক্ট করে ফেলেছি। তুমি জাস্ট একবার তাকে দেখো!”
শের তার ট্যাবটা নিয়ে দাদুর কোলের ওপর হামলে পড়ল। স্ক্রিন অন করে রুশদীর সেই মায়াবী হাসিমাখা ছবিটা দাদুর চোখের সামনে ধরল। “এই দেখো দাদু! আমার মম হিসেবে কেমন লাগে?”
রুশদীর ছবিটা দেখা মাত্রই রাইমা খানের চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল। সাদা হিজাবে মোড়া সেই স্নিগ্ধ মুখমণ্ডল আর চোখের ভেতর লুকিয়ে থাকা চপলতা যেন এক নিমেষেই রাইমা খানের মন জয় করে নিল। তিনি ছবিটার ওপর হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “মাশাআল্লাহ! মেয়েটা তো বড়ই সুলক্ষণা। একে কোথায় পেলে শের?”
ফারাজ এবার ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে কিছুটা বিরক্তির অভিনয় করল। ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল, “ধ্যাততেরিকি! তোমাদের ড্রামা কি শুরু হলো আবার? ওইটুকু একটা বাচ্চার কথায় তোমরা এখন নাচানাচি করবে? আমার এসব পছন্দ না।”

শের এবার তার তুরুপের তাস চালল। চোখের কোণে একটু জল জমিয়ে, ঠোঁট উল্টে করুণ স্বরে বলতে লাগল, “আমি জানি পাপা, তুমি আমাকে ভালোবাসো না। সবাই যখন স্কুলে তাদের মম এর হাতে টিফিন খায়, তখন আমি একা বসে থাকি। আমার বুঝি আদর পেতে ইচ্ছে করে না? দাদু, তুমিও যদি আমাকে সাহায্য না করো, তবে আমি আজ থেকে আর কিচ্ছু খাব না!”
এমন ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলে রাইমা খানের মন মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল।সাথে তিনি খুশি, ছেলের এবার সত্যি বিয়া দেয়া দরকার। তাদের কথায় তো কাজ হবেনা, যদি ছেলের কথাই শুনে। তবে মন্দ কিসের? তিনি ফারাজের দিকে কড়া নজরে তাকিয়ে বললেন, “থাম তো ফারাজ! ছেলেটার মা নেই বলে ওর আবদারগুলো কি আবদার নয়? মেয়েটাকে আমার বড্ড পছন্দ হয়েছে। আমি ওর খোঁজখবর নেওয়া শুরু করছি।”
ফারাজ এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চেহারায় বিরক্তির চূড়ান্ত সীমা ফুটিয়ে তুলে বলল, “তোমরা যা খুশি করো।আমি রুমে যাচ্ছি!”
গটগট করে ফারাজ রুমের দিকে চলে গেল ঠিকই, কিন্তু আড়ালে যেতেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিজয়ী হাসি। মনে মনে ভাবল—সাবাস শের! বাপ কা বেটা! একদম ঠিক জায়গায় ঘা দিয়েছিস। ফারাজ জানত, দাবার ঘুঁটি এখন ঠিকঠাকভাবে চালিত হয়েছে। এবার শুধু রুশদীকে তার রাজপ্রাসাদে রানী করে আনার অপেক্ষা।

০-বর্তমান-০
“এরপর… এরপর আর কিছু নেই।” বলে ফারাজ দম নিলো।দীর্ঘক্ষণ একটানা কথা বলার পর তার কণ্ঠে যেন এক ক্লান্তি আর প্রশান্তি ভর করেছে।
রাত তখন অনেক গভীর। আকাশের বুক চিরে রূপালী চাঁদটা ম্লান আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে। ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ফারাজ আর রুশদী। মাঝখানের ব্যবধানটুকু যেন এক অলঙ্ঘ্য প্রাচীর, অথচ তাদের নিশ্বাসের শব্দ একে অপরের কানে বাজছে।চারিপাশে হালকা শীতল বাতাস বইছে—সেই বাতাসে রুশদীর মাথার আলগা ওড়নাটা বারবার অবাধ্য হয়ে দুলছে। রুশদী মৃদু হাতে ওড়নাটা টেনে আবার মাথায় ঘোমটা টেনে দিল।
শের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়ার পরেই দু’জনে ছাদে এসেছে—জমানো একরাশ সন্দেহের অবসান ঘটাতে। ফারাজ খুব সংক্ষেপে তার অতীতের সেই ধূসর পাণ্ডুলিপিটা রুশদীর সামনে মেলে ধরল। কিন্তু রুশদীর কাছে এসব যেন নিছক কোনো গল্পের প্লট ছাড়া আর কিছু নয়। সে অবিশ্বাসের সুরে উপহাস করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে বিদ্রূপ ছিল, ছিল একরাশ সংশয়। আকাশের ওই রূপালী চাদরটার দিকে তাকিয়ে সে টিপ্পনী কেটে বলল,

“তা এই চমৎকার স্ক্রিপ্টটা লিখতে আপনার কতক্ষণ সময় লাগল? বিশ্বাস করুন, আপনি চাইলে নাম করা কোনো রাইটার হতে পারবেন। বেশ গুছিয়ে বানিয়ে বলতে পারেন তো!”
ফারাজ নিজেও চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। রুশদীর এই অবিশ্বাস ভাঙানোর কোনো চেষ্টাই সে করল না। নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিল, “বেশি সময় লাগেনি, মাথায় এল আর তোমাকে বলে দিলাম।”
রুশদী এবার ভ্রু কুঁচকে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালো, “তার মানে এসব ডাহা মিথ্যা ছিল?”
“তুমি সত্য হিসেবে গ্রহণ করলে সত্য, আর মিথ্যা ভাবলে মিথ্যা। জোর করে বিশ্বাস করানোর ইচ্ছা আমার নেই।”
“আচ্ছা, তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নিই আপনি আমাকে প্রথম দিন থেকেই পছন্দ করতেন—তবে সেদিন রেস্টুরেন্টে অত ছাগলের মতো ঝগড়া কেন করেছিলেন??”
“ওটা একটা টপ সিক্রেট। এখন বলা যাবে না।”
রুশদী এবার আরও একটু কাছে এগিয়ে এল। চোখে চোখ রেখে চূড়ান্ত খোঁচাটা দিল, “কিন্তু আপনি তো আপনার এক্স এর স্মৃতি থেকেই বেরোতে পারেননি। তবে আমাকে প্রথম দেখায় পছন্দ করলেন কীভাবে? মনটা কি আপনার বড্ড সস্তা?”

ফারাজ এবার আর কোনো শব্দ খরচ করল না। সে ধীরস্থিরে রুশদীর চোখের গহিনে ডুব দিল দু’নের দৃষ্টি স্থির হলো একে অপরের ওপর। ফারাজের সেই গভীর চাউনিতে হাজারো না বলা কথা, কয়েক বছরের জমানো হাহাকার আর অব্যক্ত প্রেমের দহন স্পষ্ট ছিল। যে মানুষ চোখের ভাষা পড়ে হৃদয়ের মানচিত্র বুঝতে পারে না, তাকে হাজার শব্দে ব্যাখ্যা দিলেও সে তা বুঝবে না।
ফারাজ শুধু মনে মনে ভাবল, যদি তার এই স্থির দৃষ্টি থেকেই রুমাইসা হক রুশদী তার হৃদস্পন্দন চিনে নিতে না পারে, তবে মুখে বলে লাভ কী? কিন্তু রুশদী কি সেই নিস্তব্ধতার ভাষা আদৌ বুঝতে পারল?ফারাজের ওই অতলান্ত দৃষ্টির মায়ায় ধরা না দিয়ে রুশদী বরং ভ্রু নাচিয়ে বাঁকা এক হাসি হাসল। কণ্ঠস্বরে বিষ ঢেলে বলল, “কী হলো? ওভাবে তাকিয়ে কী দেখছেন? আপনার সেই প্রাণপ্রিয় প্রাক্তনকে মনে পড়ছে বুঝি?”

ইস, কী দারুণ ঈর্ষা! যে মানুষটাকে রুশদী কোনোদিন দেখেনি, যার অস্তিত্ব এখন কেবলই অতীতে, তাকে নিয়েও তার এই জ্বলন্ত জেলাসি! ফারাজ আলতো করে হেসে যেন সবটা উড়িয়ে দিল। মাথা দুলিয়ে বিদ্রূপের স্বরে বলল, “ইউ আর সো টক্সিক ব্রো! তোমার এই জেলাসি তো সংক্রামক।”
রুশদী দমল না, বরং দর্পভরে বলল, “আই নো দ্যাট। তাতে আপনার কী?”
“তাহলে… জুনিয়ার ছবি দেখবে নাকি একবার?” ফারাজ যেন আগুনের ওপর ঘি ঢেলে দিল।
রাগের এক চরম লেলিহান শিখা রুশদীর ভেতরটা পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। অথচ সে তা বাইরে প্রকাশ পেতে দিল না। জ্বাজল্যমান চোখে ফারাজের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “নো নিড। আপনার এক্স আর তার স্মৃতি নিয়ে আপনিই সুখে থাকুন!”

পরদিন সকাল।দিনটা শুক্রবার। গত রাতের উত্তেজনার রেশ যেন রুশদীর চোখের পাতা এক করতে দেয়নি। ফারাজের সেই অবিশ্বাস্য স্বীকারোক্তি আর লুকানো অতীতের গল্পগুলো তার মগজে কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছিল। খুশির এক চোরা স্রোত আর অদ্ভুত এক অস্থিরতা নিয়ে ফজর হতেই সে জায়নামাজে দাঁড়ালো।
নামাজ শেষে মনের ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলতে গোসল সেরে নিল রুশদী। ততক্ষণে ভোরের সোনাঝরা আলো ধরণীর বুকে পরিপূর্ণভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে মুছতে হঠাৎ রুশদীর মনে এক দুরন্ত ইচ্ছা জাগল—আজ একটা শাড়ি পরলে কেমন হয়? যে স্বামী তার প্রেমে আগে থেকেই হাবুডুবু খাচ্ছে, তাকে আরেকটু ঘোলা জল খাওয়ালে মন্দ হয় না! এটা নিঃসন্দেহে এক মোক্ষম আইডিয়া।
তবে শাড়িটা এখনই না পরে, মাথায় ওড়নাটা জবরদস্ত করে পেঁচিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। সোজা রান্নাঘরে। সেখানে কাজের লোকের কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছে। রাইমা খান নিজে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য কফি বানাচ্ছেন। রুশদী নিঃশব্দে পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো।

“কী বানাচ্ছেন আম্মি?”
রাইমা খান কিছুটা চমকে ফিরে তাকালেন। পুত্রবধূর উজ্জ্বল মুখটা দেখে মৃদু হেসে বললেন, “এই তো মা, কফি। খাবে নাকি এক কাপ?”
“নাহ! বলুন দুপুরে কী রান্না করবেন?”
প্রতি শুক্রবার রাইমা খান নিজেই খুন্তি নাড়েন। তাঁর মতে, এই পবিত্র দিনে পরিবারের সবাইকে নিজের হাতের রান্না খাওয়ানো এক পরম তৃপ্তির বিষয়। রাইমা খান ভাবুক স্বরে বললেন, “কী যে রাঁধি, সেটাই ভাবছি।”
রুশদী বেশ চটপটে ভঙ্গিতে বলে উঠল, “আজকের দায়িত্বটা কি আমি পেতে পারি? আজ আমি রাঁধি?”
রাইমা খান কফি কাপে ঢালতে ঢালতে কিছুটা অবাক হয়ে রুশদীর দিকে তাকালেন। “পারবে তো?”
“অবশ্যই পারব আম্মি। আব্বুর বাসায় তো আমিই সামলাতাম সবকিছু।”রুশদীর আত্মবিশ্বাসী উত্তর।
“তবে তো ভালোই হয়! আজ তবে তোমার হাতের জাদুর স্বাদ গ্রহণ করি। তো, মেনুতে কী থাকছে?”
রুশদী একটু ভেবে নিয়ে হাসিমুখে জানালো, “বাসমতি চালের খাসির কাচ্চি, শাহী গরুর রেজালা আর জালি কাবাব। সাথে বোরহানি কিংবা লাচ্ছি?”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৭

“বোরহানিটাই বেস্ট হবে!” রাইমা খান সায় দিলেন।
রুশদী এবার কোমরে ওড়না গুঁজে উর মজাদার সুরে বলে উঠল, “ওকে ম্যাম! আজ আপ লোগো কো ম্যায় আপনে হাত কা জাদুই খানা খিলাউঙ্গি!” (ঠিক আছে ম্যাম! আজ আমি আপনাদের আমার হাতের জাদুকরী রান্না খাওয়াব!)
রাইমা খান রুশদীর এই চঞ্চলতা দেখে মুগ্ধ হলেন। তাঁর মাতৃহৃদয় যেন এক প্রশান্তিতে ভরে উঠল।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৮ (২)

1 COMMENT

Comments are closed.