অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৯
তেজরিন উম্মীদ
খান পরিবারের দুপুরের খাবার টেবিল আজ যেন এক উৎসবের আমেজ ধারণ করেছে। বিশাল সেগুন কাঠের টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা খাসির বিরিয়ানি,কাবাব ইত্যাদি। রুশদী আজ নিজ হাতে সব রান্না করেছে। সব শেষে তৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে সে যখন সবার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছিল, তখন তাকে দেখাচ্ছিল কোনো এক প্রাচীন কাব্যের মায়াবী নায়িকার মতো।
রুশদী আজ পরেছে একটি আকাশি জামদানি শাড়ি। শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর আলগোছে পিন করা থাকলেও তার কারুকাজ করা জমিন শরীরের ভাঁজে ভাঁজে আভিজাত্যের জানান দিচ্ছে।আকাশি রঙের সেই মায়াবী আবহে তার গায়ের ফর্সা রং যেন কাঁচা সোনার মতো জ্বলজ্বল করছে। কপালের ছোট্ট টিপ আর কানে ঝুলে থাকা রূপোর ঝুমকো যখন নড়ছে, ফারাজের মনে হচ্ছে সময়টা যেন থমকে গেছে। রুশদীর এই স্নিগ্ধ রূপের মাঝে এক অদ্ভুত মাদকতা আছে, যা ফারাজকে তছনছ করে দিচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, কোনো স্বর্গীয় অপ্সরা বুঝি ভুল করে মর্ত্যের এই সাধারণ ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছে। কিন্তু এই রূপের আড়ালে একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর দূরত্বও আছে, যা ফারাজকে যেমন আকর্ষণ করছে, তেমনি এক অস্থির যন্ত্রণায় দগ্ধ করছে।
ফারাজ খাবারের প্লেটে মন দিতে পারছে না। বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছে রুশদীর দিকে। তার হাতের চুড়ির টুংটাং শব্দ ফারাজের হৃত্স্পন্দনের তাল বিগড়ে দিচ্ছে। এক অজানা অস্বস্তি আর তীব্র ভালোলাগার সংমিশ্রণে ফারাজের দম বন্ধ হয়ে আসছে। কোনোমতে কয়েক লোকমা মুখে দিয়েই সে দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
রুমে ফিরে ফারাজ অস্থিরভাবে পায়চারি করতে শুরু করল। তার ভেতরে এক প্রবল ঝড় বইছে। কিছুক্ষণ পরই রুশদী আর শের রুমে ঢুকল। শের বিছানার এক কোণে বসে নিজের খেলনা নিয়ে আপন মনে খেলা শুরু করলে।ফারাজের অস্থিরতা কমল না। রুশদী সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের কালো চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে একটা ঢিলেঢালা খোঁপা করল সে। কিন্তু কপালের দুপাশ দিয়ে অবাধ্য কিছু ছোট চুল বেরিয়ে এসে তার মুখাবয়বে এক অদ্ভুত কিউটনেস তৈরি করল।
ফারাজকে ওভাবে ছটফট করতে দেখে রুশদী শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এমন পাগলা বিড়ালের মতো ছুটছেন কেন?”
ফারাজ থমকে দাঁড়াল। নিজের ভেতরের অস্থিরতা চেপে রেখে কর্কশ স্বরে বলল,
“তাতে তোমার সমস্যা?”
রুশদী নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “নাহ! আমার কোনো সমস্যা নেই।”
“তবে কথা কম বলো!” ফারাজ প্রায় ধমকে উঠল।
রুশদী ঠোঁট উল্টে মুখ বাঁকালো। মনে মনে ভাবল, ‘অযথা ভাব দেখাতে এসেছে, হুহ!’
ফারাজ নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু রুশদীর শাড়ি পরা ওই ভুবন ভোলানো রূপ তার চোখের সামনে ভাসছে। তার হৃত্স্পন্দন এখন 100 মিটার দৌড়বিদদের মতো দ্রুত। শাড়ির ভাঁজে রুশদীকে দেখার পর থেকেই তার ভেতরে এক আদিম পুরুষালি আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। এক অদ্ভুত প্রণয় আর তীব্র উত্তেজনায় তার শরীর ঘামতে শুরু করেছে। রুশদীর দিকে তাকালেই সেই অনুভূতির পারদ তরতরিয়ে চড়ে যাচ্ছে। নিজেকে সামলাতে না পেরে সে হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
খানিকটা সময় পর সে যখন আবার রুমে ফিরল, দেখল রুশদী মনোযোগ দিয়ে নিজের পড়ার টেবিল গুছাচ্ছে। সে যখন একটা ভারী বই শেলফে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই ফারাজ ঝড়ের বেগে এসে বইটা কেড়ে নিল। রুশদী অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“সমস্যা কী?”
ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তোমার সমস্যা কী?”
“আমি কী করেছি?”
“শাড়ি পরেছ কেন?” ফারাজের কণ্ঠে এক অদ্ভুত অধিকারবোধ আর অস্থিরতা।
রুশদী অবাক হয়ে হাসল,“শাড়ি কারা পরে? মেয়েরা পরে, তাই আমিও পরেছি। এতে দোষের কী?”
ঠিক সেই মুহূর্তে রুশদীর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ‘MP’ নামটা ভেসে আসতেই ফারাজের চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। রুশদী ফারাজকে উপেক্ষা করে স্পিকার অন করে কলটা রিসিভ করল।রুশদী বলল,
“দ্রুত বল কি বলবি, আমার হাতে সময় নেই জান। ”
ওপাশ থেকে এক যুবকের সুমধুর এবং গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,যুবকটি বলল, “আমি ঢাকা আসব, দেখা করবি? দেখ, আমাকে ভুজুং ভাজুং বুঝ দিবি না। আমি জানি তোর বিয়ে হয়ে গেছে, আমি এমন
কোনো কাজ করব না যা তোর সংসার লাইফে প্রবলেম ক্রিয়েট করে। জাস্ট কিছু কথা বলার আছে। কোথায় দেখা করবি বল?”
রুশদী ফোনের দিক থেকে চোখ তুলে ফারাজকে জিজ্ঞেস করল, “বাসায় আসলে কোনো সমস্যা হবে?”
ফারাজ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। তার নিজের চোখের সামনে তার বিবাহিত স্ত্রী অন্য এক পুরুষের সঙ্গে এভাবে জান-ফান করে কথা বলছে! এই ‘MP’ নামটা ফারাজের কাছে আগে থেকেই সন্দেহজনক। সে দেখেছে রুশদী প্রায়ই এই লোকের মেসেজে ‘জান’ সম্বোধন করে উত্তর দেয়। ঈর্ষার এক কালনাগিনী ফারাজের কলিজায় দংশন করল। তবুও সে শান্ত থাকার অভিনয় করে বলল,
“সমস্যা নেই, আসতে বলো।”
রুশদী ফোনে ফিরল।
“আচ্ছা জান, তুই চলে আয় সমস্যা নেই। আমার শ্বশুরবাড়িতে চলে আয়, আমি অ্যাড্রেস সেন্ড করে দেব। কোনো সমস্যা হবে না, চিল থাক! আচ্ছা জান রাখি, আমি এখন একটু ব্যস্ত আছি।”
খটাস করে ফোনটা রেখে দিল রুশদী। ফারাজ তখন রাগে আর ঈর্ষায় কাঁপছে। তার মনে হচ্ছে কেউ তপ্ত কয়লা তার বুকে ঢেলে দিয়েছে। সে তীক্ষ্ণ স্বরে গর্জে উঠল,
“তুমি ওই ছেলেকে এভাবে ‘জান’ বলে ডাকলে কেন?”
রুশদী স্বাভাবিক গলায় বলল, “কারণ ও জান। জানকে তো জানই ডাকব।
“তুমি এভাবে তোমার হাজবেন্ডের সামনে একটা ছেলেকে ‘জান’ ডাকবে? হোয়াট দ্য…!” ফারাজ আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না নিজেকে।
রুশদী শান্তভাবে বলল, “আরে ওর নামই জান।”
ফারাজ থমকে গেল। “মানে?”
“আমি যাকে জান বলে ডাকছিলাম ওর নামই জান।”
“হোয়াট?”
“কানে কম শোনেন? ওর নাম উজান শেখ। আমার আপন মামাতো ভাই। আমরা বাড়িতে সবাই ওকে সংক্ষেপে ‘জান’ বলে ডাকি।”
ফারাজ একটু দমে গেল, কিন্তু তার সন্দেহ পুরোপুরি গেল না। “ও MP?”
রুশদী হাসল। “হুম!”
“উজান শেখ,এই নামে তো আমি কোনো MP-কে চিনি না। কোন এলাকার সে?”
রুশদী এবার শব্দ করে হেসে উঠল।
“আরে বাবা, MP মানে…ও কোনো সংসদ সদস্য না। MP মানে ‘Mental Partner’! ওর মাথার তার একটু ঢিলে তো, তাই আমরা এটা বলে ডাকি ওকে।”
ফারাজের ভেতরের উত্তেজনার পারদ এবার একটু নামল ঠিকই, কিন্তু ঈর্ষার রেশ কাটল না। সে রুশদীর খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার গায়ের শাড়ির সুবাস ফারাজকে আবার মাতাল করে দিচ্ছে। সে নিচু স্বরে বলল, “ভাই হোক আর জান হোক, অন্য কাউকে এভাবে সম্বোধন করা আমার একদম পছন্দ না। আর এই শাড়ি… এরপর থেকে আমার অনুমতি ছাড়া এই রঙের কেন কেনো শাড়ি পরবে না।”
রুশদী ভ্রু নাচাল। “কেন? আপনার পারমিশন নিতে হবে কেন?”
ফারাজ রুশদীর কোমরের কাছে শাড়িটা এক হাতে খামচে ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। দু’জনের নিঃশ্বাস একে অপরের গায়ে লাগছে। ফারাজ ফিসফিস করে বলল, “কারণ তোমাকে এই শাড়িতে যা লাগছে, তা সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। এই সৌন্দর্য শুধু আমার চোখের আড়ালে থাকা উচিত, জগতের সামনে নয়।”
রুশদী স্তব্ধ হয়ে ফারাজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফারাজের চোখের সেই তীব্র নেশা আর অধিকারবোধ তাকে এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ করে দিল।
বসুন্ধরা কিংসের বিশাল প্র্যাকটিস মাঠ। পড়ন্ত বিকেলের নরম আলোয় সবুজ ঘাসগুলো যেন সোনায় মোড়ানো চাদরে ঢাকা পড়েছে। অনেকদিন মাঠের বাইরে থাকার পর আজ পুরোদমে ট্রেনিং সেশন শেষ করল সিফাত আর শান। ফুটবলটা পায়ের জাদুতে নাচানো যাদের অভ্যাস, দীর্ঘ বিরতিতে সেই স্কিলগুলো যেন কিছুটা মরচে ধরা মনে হচ্ছিল। তবে গত কয়েক ঘণ্টার হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামের বিনিময়ে সেই পুরনো ছন্দটা আবার ফিরে পেতে শুরু করেছে তারা। ড্রিবলিং, পাসিং আর নিখুঁত শট নেওয়ার পর ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে।
ট্রেনিং শেষে যখন মাঠের অন্য খেলোয়াড়রা একে একে ক্লাবের দিকে ফিরে যাচ্ছিল, তখন সিফাত আর শান মাঠের ঠিক মাঝখানে বুক ভরে ঘাসের ঘ্রাণ নিয়ে শুয়ে পড়ল। আকাশের বুকে তখন গোধূলির রক্তিম আভা, মেঘের গায়ে লেগে আছে বেগুনি আর কমলা রঙের খেলা। চারপাশটা হঠাৎ করেই অদ্ভুত শান্ত হয়ে এল। শুধু দূরে কোথাও জিমনেসিয়াম থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট শব্দের অনুরণন। দুই বন্ধু চুপচাপ খোলা আকাশের নিচে শুয়ে যেন নিজেদের অস্তিত্ব নতুন করে অনুভব করছিল। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ সিফাত প্রশ্ন করল,
”তোর দুনিয়াটা আসলে কী নিয়ে রে শান?”
শান একটু সময় নিল। আকাশের এক কোণে জেগে ওঠা প্রথম তারাটির দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে উত্তর দিল, “আমার দুনিয়ার অর্ধেকটা জুড়ে আছে আমার ফ্যামিলি। বাকিটা এই ফুটবল, যা আমাকে পরিচিতি দিয়েছে। আর সেই দুনিয়ার এক চিলতে জায়গাজুড়ে মায়া ছড়িয়ে আছে তোর ভাবি… আই মিন, মিস তিথি।”
সিফাত কিছুক্ষণ আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব নিচু স্বরে বলল, “আমার পুরো দুনিয়াই ফুটবল।”
কথাটা ছোট হলেও একজন ফুটবলারের কাছে এর ওজন কতটুকু, তা শান খুব ভালো করেই জানে। ফুটবলের মাঠটাই সিফাতের ইমোশন আর টিকে থাকার লড়াই। কথাটি শানের হৃদয়ের গহীনে এক গভীর দাগ কেটে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য মাঠের সেই শান্ত আবহে এক গভীর আবেগ থমকে রইল।
হঠাৎ করেই গম্ভীর পরিবেশটা হালকা করতে শান উঠে বসল। মুখে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটিয়ে সিফাতের দিকে তাকিয়ে হি হি করে হেসে বলল, “আমি তো ভেবেছিলাম তোর পুরো দুনিয়া দুষ্টু গার্লস দিয়ে ভর্তি!”
সিফাত তৎক্ষণাৎ উঠে বসে শানকে একটা হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে উঠল, “ধুর শালা! এসব তো টাইম পাস। লাইফে বোর হয়ে গেলে একটু এনজয়মেন্টের জন্য কিছু তো লাগে। এই ক্যারেক্টারলেস মেয়েগুলো জাস্ট সেইটুকুই।Just enjoy yourself”
শান এবার একটু সিরিয়াস ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, তুই কি আজ পর্যন্ত কাউকে মন থেকে ভালোবেসেছিস?”
সিফাত বিদ্রুপের হাসি হাসল।
“এসব মেয়েকে খেয়ে দেয়ে ছেড়ে দেওয়া যায়, ভালোবাসা যায় না ভাই। এসব ক্রিম্পালদের প্রতি সিরিয়াস হওয়া মানে অযথা টাইম নষ্ট। বোরিংনেস কাটাতে যেটুকু করি, ওইটুকুই। রিলেশনশিপে সিরিয়াস হওয়া আমার ডিকশনারিতে নেই। আমি সিফাতের পক্ষে সব মেয়ের প্রতি সিরিয়াস হওয়া একদমই পসিবল না।জাস্ট খাও দাও জিও পিও টিকিট ইজি ইয়ার।”
বলেই সিফাত এবার শানের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার কণ্ঠে কৌতূহল মিশিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, তোরটা বল। তুই কি তিথির প্রতি সত্যিই সিরিয়াস?”
শানের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই পাল্টে গেল। গভীর এক প্রশান্তি আর একই সাথে তৃষ্ণা ফুটে উঠল তার চোখে। সে ঘাসের ওপর হাত বুলিয়ে বলতে লাগল, “সিরিয়াস কি না জানি না রে, তবে ওকে না পেলে জীবনে একটা বিশাল আফসোস থেকে যাবে। অচেনা ভিড়ে হঠাৎ আসা সেই মানুষটিই আজ আমার পুরো পৃথিবী হয়ে গেছে। কখন যে ভালোবেসে ফেলেছি, তা আজও আমার কাছে এক রহস্য। তুই তো আমাকে চিনিস, আমি কোনোদিন মেয়েদের দিকে ফিরেও তাকাতাম না। অথচ প্রথম দেখায় ওর দিক থেকে চোখ সরাতে পারিনি। আমার হৃদয়ে যেন কিসের এক জোয়ার বয়ে গেল, আমি নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। ও আমার হৃদয় ছুঁয়ে দিয়ে গেল এক পলকে। তাকে পাওয়া এখন আমার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, আর তাকে না পেলে আমি হয়তো…”
সিফাত এক দৃষ্টিতে শানের কথাগুলো শুনছিল। শানের গলার স্বর কাঁপছে, তাতে এক অদ্ভুত আকুলতা। সে মৃদু হেসে বলল, “তুই তো শেষ রে! তুই তো দেখছি পুরো বরবাদ হয়ে গেছিস শান।”
শান আকাশের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে মাথা নাড়ল। ধীর কণ্ঠে স্বীকার করল, “হ্যাঁ… বরবাদ হয়েছি।বরবাদ হয়েছি আমি তার অপেক্ষায়।”
গতকালই রুশদীর এইচএসসি (HSC) পরীক্ষার দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর অধ্যায় শেষ হয়েছে। দীর্ঘদিনের বইখাতা, নোটস আর পরীক্ষার হলের সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে সে যেন এক চিলতে মুক্ত বাতাসের খোঁজ পেয়েছে। আহা, কী এক স্বর্গীয় শান্তি! এতদিন মাথার ওপর যে পাহাড়সম পাহাড় ছিল পড়াশোনার, তা এখন নেই। এখন শুধুই অলস দুপুর আর ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানোর ছুটি।
আজ রুশদীর মেজো মামার বড় ছেলে উজানের আসার কথা। উজান তার শৈশবের খেলার সাথী, কিন্তু দীর্ঘ সময় সে দেশের বাইরে ছিল। রুশদীর বিয়েতে থাকতে না পারার এক রাশ আক্ষেপ ছিল উজানের। আজ সে সরাসরি বাড়িতে আসবে না, তাই ঢাকার গুলশানের একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে দেখা করার পরিকল্পনা হয়েছে। রুশদীর সঙ্গে এসেছে তার ফারাজ আর ছোট শের।
রেস্টুরেন্টে পা রাখতেই চোখে পড়ল এক কোণে জানালার ধারের টেবিলে বসে আছে উজান। পরনে হালফ্যাশনের বিদেশি পোশাক, উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রং আর চোখেমুখে এক ধরণের চপলতা। রুশদী আজ একটি খয়েরি রঙের আবায়া পরেছে, মাথায় নিখুঁত করে বাঁধা হিজাব। তবুও তাকে চিনতে উজানের এক মুহূর্ত দেরি হলো না। রুশদীকে দেখেই উজান চেয়ার ছেড়ে ঝড়ের বেগে এগিয়ে এল। দীর্ঘদিনের বিরতির পর প্রিয় বোনকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে সে যখন রুশদীকে জড়িয়ে ধরতে গেল, রুশদী ঠিক ততটাই দ্রুততায় এক পা পিছিয়ে গেল।
ফারাজ পাশে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখে এই কাণ্ড দেখছে। তার কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। রুশদী উজানকে শাসন করার ভঙ্গিতে বলল, “এই কুত্তা, আমি ম্যারিড!”
উজান দমবার পাত্র নয়। সে এক গাল হেসে বলল, “বিয়ে হয়েছে তো কী হয়েছে? বিয়ের পর কি তুই আর আমার বোন নেই?”
রুশদী কথা না বাড়িয়ে ফারাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
“উনি ফারাজ, আমার হাজবেন্ড।”
উজান বেশ সাবলীলভাবে হাত বাড়িয়ে দিল। “হ্যালো ভাইয়া, আমি উজান।”
ফারাজের মুখটা সামান্য কালো হয়ে উঠল। ঈর্ষার একটা সূক্ষ্ম স্রোত যেন তার ভেতরে বয়ে গেল। সে উজান এর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল, “হ্যালো, আমি ফারাজ। শারফারাজ খান।”
উজান এবার শেরের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে জিজ্ঞেস করল, “এই পুঁচকিটা কে?”
রুশদী সগর্বে বলল, “তোর ভাগিনা, আমার ছেলে।”
শুনে উজান শেরকে আদর করল।
সবাই এবার টেবিলে বসল। ফারাজ আর রুশদী একপাশে, তাদের মাঝখানে শের। উল্টো পাশে একা উজান। ফারাজের চোখদুটো গোয়েন্দার মতো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে উজানকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করছে। চব্বিশ বছরের এই ছোকরাকে তার মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না। তার ওপর রুশদীর ফোনে জান নামে সম্মোধন করা মেসেজগুলোর কথা মনে পড়তেই ফারাজের ভেতরের অস্বস্তি বহুগুণ বেড়ে গেল।
হঠাৎ উজান একটু নড়েচড়ে বসে বলল, “রুশদী, তোর সাথে কিছু পার্সোনাল কথা আছে।”
রুশদী সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, “বল।”
উজানকে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত দেখাল। সে বারবার আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকাচ্ছে। ইঙ্গিতটা পরিষ্কার—সে ফারাজের সামনে কথাগুলো বলতে পারছে না। সে বেশ সাহস করেই ফারাজকে উদ্দেশ্য করে বলে ফেলল, “ভাইয়া, আপনি কি একটু পাশের টেবিলে যাবেন? ওর সাথে আমার কিছু পার্সোনাল আলাপ ছিল।”
এই কথা শোনা মাত্রই ফারাজের মনে হলো কেউ জ্বলন্ত বারুদ ছিটিয়ে দিয়েছে। মনে মনে সে গর্জে উঠল, ‘এত বড় সাহস! আমার সামনে থেকে আমার বউকে সরিয়ে নিয়ে প্রাইভেট কথা?’ রুশদীর কাছে সে শুনেছিল এই ছেলের সাথেই নাকি তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। তবে কি উজান কোনো ব্যর্থ প্রেমিকের মতো এখন পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে চায়? ফারাজ হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে রেখে পাথরের মতো স্থির হয়ে বসল। তার শরীরী ভাষা বলে দিচ্ছিল—এখানে পারমাণবিক বোমা পড়লেও সে এক ইঞ্চি নড়বে না।
ফারাজ গম্ভীর স্বরে ঘোষণা করল, “রুশদী এখন আমার পার্সোনাল প্রপার্টি। যা বলার আমার সামনেই বলতে হবে।”
উজানের চেহারায় রাগের আভাস ফুটে উঠলেও পরক্ষণেই সে রুশদীর দিকে তাকাল। রুশদী তখন ফারাজের এমন পজেসিভ আচরণে মনে মনে মজা পাচ্ছে এবং মুচকি মুচকি হাসছে। উজান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফারাজ ভাবল, এই তো শুরু হয়েছে ব্যর্থ প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাস! কিন্তু তখনই উজান রুশদীর দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক বিচিত্র ভাষায় প্রশ্ন করল,
”হেঁতে বুঝিবো নি?” (অর্থ: সে কি বুঝবে?)
রুশদী দুষ্টুমিভরা হাসি নিয়ে উত্তর দিল, “পিওর ঢাকাইয়া! কিচ্ছু বুঝবে না। তুই বল।”
শুরু হলো এক অন্যরকম কথোপকথন। ফারাজ আর শের যেন অন্য কোনো গ্রহের বাসিন্দা হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। উজান এবার চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় পুরো দমে শুরু করল,
”কুত্তার ছোঁয়া, আঁরে থই তুই বিয়া গইজ্জলি ক্যান গরি? ছোটত তুন তোর লঅ আঁর বিয়া ঠিক অই আছিল, তুই আঁরে ক্যান গরি ধোঁহা দিলি? ওগগা বড়লোক ফোয়া ফাই তুই টপ গরি বিয়া গই ফেইল্লিউ? ছি! তোঁয়ারে আঁই হঁত ফোন হঁত মেসেজ দিইয়ুম, তুই এক্কানও জবাব ন দিলা। ক্যান গরি ফারিলা? আঁরে থই তুই বিয়া ক্যান গরি গইজ্জলি?”
ফারাজ উজান এর দিকে হা করে তাকিয়ে। তার মনে হচ্ছে এরা কোনো চাইনিজ বা জাপানিজ ভাষা বলছে। কিন্তু উজানের গলার স্বরে একধরণের অভিযোগের সুর স্পষ্ট।কথাগুলো স্পষ্ট না বুঝতে পারলেও, অর্থ সে মোটামুটি বুঝতে পারল
হঠাৎই উজান আর রুশদী দুজনেই খিলখিল করে হেসে উঠল। উজান আবার বলতে শুরু করল,
”হুন, আঁরে আম্মায় কইয়ে যে তোর নাকি তোর তুন বয়সে মেলা বড় এক্কান মুরুব্বি (বুড়া) মাইনষের লঅ বিয়া দিই ফেলার। আঁই এইয়া ভাবি তোরে বারবার ফোন গইজ্জুম যে, তুই না জানি ফুপার ইমোশনাল টর্চার খাই হাচা গরি হঁন বুড়া মাইনষের গলায় লটকি যস। এরল্যা তোরে ফোন দিই দিই এত ডিস্টার্ব গইজ্জুম—আঁর হবু বউ অথবা আঁর বইন ক্যাঁল্লা ওগগা বুড়া মাইনষেরে বিয়া গরিত যাইব? আঁই তো দেশের বাইর আছিলাম, আইত ন পারির, নহিলে আইয়্যি তোর কানের তলে দশটা থাপ্পড় দিইয়ুম অয়। ফুপার ডরে তুই বিয়াত রাজি অইলি ক্যান গরি? তুই বিয়া গইজ্জস হুনি আঁর যে মেজাজ খারাপ অইয়ে! কষ্টও পাইলাম মেলা। কিন্তু পরে আঁই নিজে নিজে হাঁসিতে হাঁসিতে শেষ অই গিয়্যুম। যখন তোর জামাইর ফটো চাইলাম, আঁই কইলাম—কিরে ভাই, ইবা বুড়া মাইনষ ক্যানে অইব? চাইতে তো বেশ সুন্দরী (হ্যান্ডসাম) আছে, তার ওপর বড়লোকও। দিন ধইজ্জে দেখা গরা যাইব, ইবা হঁন কথা নি?”
ফারাজ এখনো হা হয়ে তাকিয়ে। রুশদী এবার উজানের সাথে তাল মিলিয়ে সেই একই ভাষায় জবাব দিল,
”তোর কিতা মনে অর, আঁইও কিতা পাগল নি? আব্বায় কইয়ে আর আঁই ওগগা বুড়া মাইনষেরে বিয়া গরি ফেলাইয়্যুম? আসলে আঁই তলাই-চাই (ভেবেচিন্তে) চাইলাম যে, বিয়া তো ওগগা গরণই ফরিব—তয় আব্বার ইক্কান ইমোশনাল টর্চার ন খাই, ভালা-বুজি চাই ওগগা সুন্দর আর বড়লোক পোয়া চাই বিয়াত বসি গেয়্যি। কিতা, ঠিক গইজ্জি ন?”
সবশেষে উজান এবার প্রমিত বাংলায় ফিরে এল।
“একদম ঠিক করেছিস, আমি তোর সাথেই আছি। আচ্ছা শোন, আসল কথায় আসি। দাদি খুব অসুস্থ, তোকে দেখতে চেয়েছে। কবে যাচ্ছিস?”
রুশদী এবার ফারাজ আর শেরের দিকে তাকাল। দুজনের মুখের অবস্থা দেখে রুশদী হাসি থামাতে পারছে না। তারা যেন এক দীর্ঘ ভাষাতাত্ত্বিক ঝড়ের কবলে পড়ে বিধ্বস্ত। ফারাজ আর শের একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।
রুশদী বলল, “আপনারা এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
ফারাজ বিস্মিত কণ্ঠে বলল, “তোমরা এখন কী ভাষায় কথা বললে? মনে হলো অন্য কোনো ডাইমেনশনে চলে গেছিলাম!”
“ওসব আপনি বুঝবেন না,” রুশদী আলতো হেসে বলল, “আগে বলুন চট্টগ্রাম কবে যাচ্ছি?”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “চট্টগ্রাম কেন?”
“শুনলেন তো, আমার নানু অসুস্থ।”
“চাইনিজ ভাষায় কথা বললে বুঝব কী করে?” ফারাজ কিঞ্চিত বিরক্ত ও লজ্জিত।
“বাদ দিন, কবে যাবেন সেটা বলুন।”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৮ (২)
ফারাজ এবার একটু সহজ হয়ে রুশদীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কবে যেতে চাও?”
রুশদী উত্তর দেওয়ার আগেই উজান বলে উঠল, “আজকেই!”
ফারাজ এবার তীক্ষ্ণ চোখে উজানের দিকে তাকিয়ে জোর দিয়ে বলল, “আমি রুশদীকে প্রশ্ন করেছি।”
রুশদী পরিস্থিতি সামলাতে বলল, “আচ্ছা আজকেই যাব। রাত এগারোটার দিকে রওনা দিই? যেতে যেতে সকাল হয়ে যাবে।”
