Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪ (২)

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪ (২)

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪ (২)
তেজরিন উম্মীদ

পাশে বাইকের ইঞ্জিনের গর্জনে ফারাজ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, সমান্তরাল গতিতে পাল্লা দিয়ে ধেয়ে আসছে শান। হেলমেটের কাঁচের ওপাশ থেকে তার পরিচিত কণ্ঠস্বরের চিৎকার ভেসে এলো, “হ্যালো!”
শানকে দেখে ফারাজের কপালে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠল। এই ছেলেটার কি কোনো রাডার আছে? সে যে শেরকে নিয়ে আজ ৩০০ ফিটে আসবে, এই খবর শান পেল কোত্থেকে? নির্ঘাত পিছু নিয়েছে অথবা ট্র্যাকিং করছে। শানকে উপেক্ষা করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল ফারাজ, কিন্তু ততক্ষণে তার ঘোরাঘুরির ফুরফুরে মেজাজটা উড়ে গেছে। বিরক্তি নিয়ে মনে মনে ভাবল, “ছেলেটা সব সময় কাবাব মে হাড্ডি হতে চলে আসে!”

তবে ফারাজ বিরক্ত হলেও ছোট্ট শেরের আনন্দের সীমা নেই। তার ঝিংকু চাচুকে দেখা মাত্রই খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল সে। নিজের ছোট্ট হাতজোড়া নেচে উঠল, “হেহ ঝিংকু!”
ওপাশ থেকে শানও একইভাবে গলা চড়িয়ে জবাব দিল, “হেহ শের!”
রাস্তার দিকেই নজর রেখে ফারাজ প্রশ্ন ছুড়ল, “তুই এখানে কেন?”
শান উত্তরে একরাশ অভিযোগ নিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, “আমাকে রেখে এসেছ কেন?”
দুই বাইকের গতি এখন অনেকটা কম। রাজপথের হাওয়ায় তাদের কথাগুলো কাটাকাটি হয়ে কানে আসছে। ফারাজ বাঁকা হেসে বলল, “না বলে কী হবে, তুই তো ঠিকই গন্ধ শুঁকে চলে এসেছিস!”
শান এবার দাঁত বের করে হাসল, “আসব না? তোমরা আমাকে ছাড়া একা একা ট্যুর দিবে আর আমি সেটা মুখ বুজে মেনে নেব? তাই উড়তে উড়তে চলে আসলাম!”

“এখন বকবক না করে সামনের দিকে তাকিয়ে বাইক চালা, নাহলে বেশি উড়তে গিয়ে একেবারে আসমানে গিয়ে সেট হয়ে যাবি!”
অতঃপর তিনজনের গন্তব্য গিয়ে ঠেকল ৩০০ ফিটে। রাতের নিস্তব্ধতা আর খোলা বাতাসের মাঝে চলল রসনা বিলাস,গরম গরম হাসের মাংস আর মচমচে চাপটি রুটি। খাওয়ার শেষে তারা আবার ছোটালো তাদের যান্ত্রিক ঘোড়া। গন্তব্য এবার মাওয়া ঘাট।
রাতের অন্ধকার যখন ফ্যাকাশে হয়ে আসছিল, তখন তারা গিয়ে পৌঁছাল পদ্মার পাড়ে। পদ্মার বুকে ভোরের প্রথম আলো যখন আলতো করে ছুঁয়ে গেল, তারা মুগ্ধ হয়ে দেখল সেই অপার্থিব সূর্যোদয়।ভেদ করে রক্তিম সূর্য যখন আকাশে আধিপত্য বিস্তার করল, তখনই তারা তিন পথিক ফেরার পথ ধরল। গন্তব্য এবার পরিচিত নীড় সেই খান বাড়ি।

খান বাড়ির লনজুড়ে এখন সাজসাজ রব। আলোকসজ্জা আর ফুলের সুবাসে চারপাশটা এক অন্যরকম রূপ ধারণ করেছে। এনগেজমেন্টের আয়োজন চলছে।
এদিকে এনগেজমেন্টের শপিং সারতে ফারাজ ও শান এসেছে বসুন্ধরা সিটি মলে। সাথে আছে ছোট্ট শের আর রুশদী। রাইমা খান নিজে গাড়ি পাঠিয়ে রুশদীকে আনিয়েছেন, যাতে শপিংয়ের এই পর্বে সেও সঙ্গী হতে পারে।
বসুন্ধরা মলের তৃতীয় তলার প্রতিটি ঘুরে দেখছে তারা। শের বেশ উৎফুল্ল, রুশদীর হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে সে। তারা অনেকটা আগে আগে হাঁটছে। তাদের ঠিক পেছনেই ধীরলয়ে হাঁটছে ফারাজ আর শান। শপিং পর্ব সাঙ্গ করে তারা মলের ভেতরেই একটি রেস্টুরেন্টে হালকা খাবার খেয়ে নিল।

আজকের পুরো সময়টায় রুশদী নিজেকে অন্য এক রূপে তুলে ধরেছে। গত কয়েকদিনের সেই চঞ্চলতা বা জেদ যেন উধাও। সে যথেষ্ট ধীরস্থির এবং ভদ্রতার পরিচয় দিচ্ছে। শান অবিরাম বকবক করে গেলেও রুশদী শুধু হ্যাঁ বা হুঁ বলে সংক্ষেপে উত্তর দিচ্ছে। অকারণে একটি কথাও খরচ করছে না সে। রুশদীর এই অভাবনীয় পরিবর্তন দেখে ফারাজ মনে মনে বিস্মিত। সে ভাবল, মেয়েটা যদি প্রথম দিন থেকেই এমন শান্ত থাকত, তবে হয়তো পরিস্থিতি আজ অন্যরকম হতে পারত। তাদের বন্ডিং টা হয়তো এমন ইদুর বিড়ালের মত হত না ।
কাজ শেষ করে মল থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। শহরজুড়ে নিয়ন আলোর ঝলকানি। শান আর শের একসাথে পার্কিং এরিয়া থেকে গাড়ি আনতে গেল। মলের প্রবেশপথের সামনে তাদের অপেক্ষা করছে ফারাজ আর রুশদী।

ফারাজ প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণ চিরে বেরিয়ে আসছে মৃদু শিসের শব্দ। পাশে রুশদী হাত বগলদাবা করে উদাসীন চোখে আশেপাশের ব্যস্ততা দেখছে। ফারাজের শিসের শব্দটাা তার কানেও পৌঁছাচ্ছে। সে একবার আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকালো।
উনত্রিশ বছরের এই যুবকের অবয়বে এক ধরণের আভিজাত্য মিশে আছে। গায়ে একটা ঢিলেঢালা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। গায়ের রংটা ঠিক শ্যামলা নয়, আবার একদম টকটকে ফর্সাও বলা যায় না।দুটোর মাঝামাঝি। মাথার ঘন চুলগুলো কপালে এসে পড়ছে। রুশদীর চোখ গিয়ে আটকাল ফারাজের গালে। একদম ক্লিন শেভ করা মুখ।রুয়শদী দৃষ্টি আটকে গেল ফরজের চোখে।চোখের পাপড়ি গুলো ঘন সাথে বড় বড়।চোখের মনিটা হালকা স্কাই ব্লু এর মত, যেন শান্ত এক সমুদ্র। ঠিক সেই মুহূর্তেই আচমকা ফারাজও তার দিকে তাকালো।দুই জোড়া চোখ এক হলো। মুহূর্তের জন্য সময়টা যেন থমকে গেল। ফারাজ শিস বাজানো থামিয়ে দিল। রুশদী কিছুটা চমকে উঠলেও তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল না। বরং নিজেকে ভীষণ স্বাভাবিক রেখে, অতি ধীরস্থির ভঙ্গিতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সামনের জনসমুদ্রের দিকে।

“কংগ্রেচুলেশন মিস রুমাইসা হক রুশদী।”
ফারাজের শীতল কণ্ঠস্বরটা আচমকা রুশদীর কানে এসে আছড়ে পড়ল। নিজের পুরো নামটা ফারাজের মুখে শুনে রুশদী কিছুটা অবাক না হয়ে পারল না। মনে মনে ভাবল, ‘বাহ! আমাকে নিয়ে দেখছি ভালই খোঁজ খবর নেয়া হয়েছে!’

রুশদী তার চোখের কোণে একরাশ অনাগ্রহ নিয়ে ফারাজের দিকে তাকাল। নিস্পৃহ কণ্ঠে শুধাল, “কেন?”
ফারাজ সরাসরি রুশদীর চোখের দিকে তাকাল। একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে আপাদমস্তক পরখ করে নিল সে। রুশদীর পরনে আজ আকাশী রঙের একটি থ্রি পিস, ওড়নাটা একপাশ থেকে অবহেলায় কাঁধে ফেলা। মুখে মেকাপের লেশমাত্র নেই। অথচ তার বয়সী মেয়েরা বাইরে বেরোলে আটা ময়দা সুজি যা আছে সব মেয়েকে বের হয়।রুশদীর অব্দিপিঠ চুলগুলো খুলে রেখেছে। দেখতে রুশদীকে খুব শান্ত আর কোমল মনে হলেও তার চাহনিতে এক অদ্ভুত দাপট আর একরোখা জেদ মিশে আছে। মেয়েটা রূপসী,সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রথম দেখায় হয়তো কারো মনে না ধরলেও, কারো চোখে ধরা পড়তে সে বাধ্য। ফারাজও কি কোনো এক মুহূর্তের জন্য তার এই রূপে থমকে গিয়েছিল? হয়তো গিয়েছিল, কিন্তু রুশদীর উগ্র মেজাজের কারণে তা প্রকাশ করেনি।
ফারাজ কয়েক পা এগিয়ে এল রুশদীর দিকে। তাদের মাঝখানের দূরত্ব এখনএক হাত। রুশদীর উচ্চতা ফারাজের বুক সমান। সে মাথা উঁচু করে ফারাজের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। ফারাজ কিঞ্চিৎ ঝুঁকে নিজের মুখটা রুশদীর কানের কাছে নিয়ে গেল। অতি মৃদু স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,

“কারণ, তুমি এই শারফারাজ খানকে পাচ্ছ। তুমি কিন্তু জিতে গেছ বস!”
ফারাজের এত কাছে আসাটা রুশদীর জন্য যথেষ্ট অস্বস্তিকর ছিল, কিন্তু সে তা প্রকাশ করল না। নিজেকে সামলে নিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল সে। শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
“আমার কাছে কিন্তু ঠিক তেমনটা মনে হচ্ছে না।”
ফারাজের ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে বলল, “আগে বিয়েটা তো করো, তারপর না হয় রিভিউ দিও। কথা দিচ্ছি, বিয়ের পর তোমার মন বদলে যাবে।”
রুশদী ভ্রু কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন করল, “কেন? বিয়ের পর কী হবে?”
ফারাজ এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার গভীর দৃষ্টি রুশদীর ওপর নিবদ্ধ রেখেই খুব স্বাভাবিক স্বরে বলল, “বিয়ের পর কী হবে? বিয়ের পর বাসর হবে।”

ফারাজের এমন নির্লজ্জ উত্তরে রুশদী ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠল। এই লোকটাকে এতদিন সে স্রেফ ম্যানারলেস বলেই জানত, কিন্তু এখন দেখছে সে তার চেয়েও কয়েক ডিগ্রি উপরে।একেবারে যাকে বলে নির্লজ্জ! একটা জনবহুল জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউ এমন কথা বলতে পারে?
রুশদী রাগে দাঁত কিড়মিড় করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “নির্লজ্জ একটা!”
ফারাজ মৃদু হাসল এবং বেশ ভাব নিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “এই ফারাজের নির্লজ্জতার দামও কিন্তু কোটি টাকা, বুঝলে?”
রুশদী মুখ বাকাল।যেই না চেহারা, তার নাম আবার পেয়ারা! তার নির্লজ্জতার দাম নাকি কোটি টাকা! আজব পাবলিক তো! সে ফারাজের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় বলল, “নাই কোনো লাজ, আবার নাম রেখেছে ফা..রা..জ!”

ফারাজ নামটি সে শেষের দিকে বেশ টেনে টেনে নাটকীয় ভঙ্গিমায় উচ্চারণ করল। রুশদী এমন একটা খোঁচামার্কা কথা বলবে আর ফারাজ তা হজম করে নেবে, তা তো হয় না। সেও সমান তালে মুখ বাঁকিয়ে পাল্টা জবাব দিল,
“কাজের মেয়ে জরিনা, ভাব নেয় ক্যাটরিনা!”
রুশদীর মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে আফসোসের সুর টেনে বলল, “আপনার ভাগ্যটা আসলে কতটা খারাপ হলে একটা কাজের মেয়ে কে বিয়ে করছেন, ভাবলেই আমার মায়া লাগছে। আপনার জন্য আমার আসলেই আফসোস হয়, বুঝলেন? সো স্যাড!”

ফারাজও তড়িৎ উত্তর দিল, “একবার ভেবে দেখো তোমার কপালটা কত ভালো যে কাজের মেয়ে হয়েও মালিককে বিয়ে করার সুযোগ পাচ্ছো! তোমার মতো এমন রাজকপাল ক’জনেরই বা থাকে, বলো?”
রুশদী আর কোনো তর্কে গেল না। কেবল একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফারাজের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে সে ফারাজকে ততোধিক গালমন্দ করতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তেই শান গাড়ি নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলো। রুশদী আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গটগট করে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।

আজকের দিনটি রুশদীর জীবনের এক নতুন অধ্যায়। আজ শারফরাজ খানের সাথে তার বাগদান। এই দিনটি আসার আগে কত ঝড়ই না বয়ে গিয়েছে তার মনের ওপর দিয়ে। কত নাটক, কত অজুহাত আর কত শত কৌশলী চাল সে চেলেছিল এই বিয়েটা ভাঙার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্যকেই সে মেনে নিয়েছে,নিজের সুখ কে বেছে নিয়েছে।
রুশদী বুঝেছে, অন্যকে ভালো রাখার মিথ্যে মরীচিকার পিছে ছুটে নিজেকে মানসিক যন্ত্রণার নীল বিষে নীল করার চেয়ে, নিজের সুখটুকু আঁকড়ে ধরে বাঁচা হাজার গুণ শ্রেয়। যে ত্যাগের কোনো কদর নেই, যে বিসর্জনের কোনো মূল্য নেই,সেই ত্যাগ করা কেবল বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। জীবনের এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রুশদী আজ নিজের সুখটাকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে, আর এই অবাধ্য মন আজ শান্ত।নিজের সুখে তাজমহল সে নিজেই গড়বে।

খান বাড়ির সুবিশাল লন আজ অসংখ্য ফেরি লাইটের মৃদু আলোয় সাজানো হয়েছে।লনের সব কিছু ডেকোরেট করা হয়েছে হোয়াইট থিমের উপর।আমন্ত্রিত সকল অতীতের পরনেও সাদা পোশাক দেখা যাচ্ছে। দেশের নামী-দামী রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী শিল্পপতি আর মিডিয়া লোক জলে ভরে উঠেছে খান বাড়ির লন।
মন্ত্রী শেহজাদ খান স্মিত হাসিতে অতিথিদের সাথে কুশল বিনিময় করছেন। তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ফারাজ। বাবার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সেও সবার সাথে কথা বলছে। শেহজাদ খান নিজের বড় ছেলেকে সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।অন্যদিকে রাইমা খান ব্যস্ত অতিথিদের আপ্যায়নে।সবকিছুই তদারকি করছেন তিনি।

এই জাঁকজমকপূর্ণ ভিড়ের এক কোণে একটি টেবিলে বসে আছেন আনাস হক ও নাহিদা বেগম। চারপাশের এই আড়ম্বর দেখে তারা যেন কিছুটা বিমূঢ়। পরিচিত সব বড় বড় রাজনীতিবিদ আর গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চোখের সামনে ঘুরতে দেখে বারবার অবাক হচ্ছেন তারা।
আনাস হক ও নাহিদা এক কোণে বসে থাকলেও যেন তারা সেখানে অদৃশ্য। রাইমা খান কিংবা শেহজাদ খান কারও যেন তাদের দিকে তাকানোর প্রয়োজন হচ্ছে না। শেহজাদ খান, সাধারণ জনগণের সাথে মন্ত্রীর যে ব্যবধান, তা আজ তিনি নিজের হবু আত্মীয়দের সাথে বজায় রেখেছেন। তাদের অবহেলার আচরণে একবারের জন্যও মনে হচ্ছে না যে, তারা হবু আত্মীয়।
এমনকি ফারাজও, যার সাথে রুশদীর জীবনের বন্ধন হতে যাচ্ছে, সেও একবারের জন্য প্রয়োজন বোধ করেনি হবু শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে গিয়ে দুটো সৌজন্যমূলক কথা বলার। এই তীব্র উপেক্ষা আনাস হক ও নাহিদাকে ভেতরে ভেতরে অপমানের বিষে নীল করছিল।তবে এতে তাদের কিছু যায় আসছিল না, সম্মান দিয়ে তারা কি করবে তাদের যা দরকার সেটা দিলেই হবে।

শহরের নামকরা এক বিউটি পার্লারের এসির বাতাসে বসে আছে রুশদী। দেশের সেরা মেকআপ আর্টিস্টের হাতের ছোঁয়ায় তার রূপ আজ এক অন্য মাত্রা পেয়েছে।
সাজ শেষ করে রুশদী যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে নিজেই হয়তো মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পরনে নিরেট কালো রঙের একটি সিল্কের গাউন। গলার কাছে চিকচিক করছে হিরের একটি নেকলেস, কানে পরেছে ছোট্ট হিরের টপ,সবচেয়ে সুন্দর লাগছে তার কেশসজ্জা। পিঠ অব্দি ছড়ানো ঘন কালো চুলগুলোকে নিখুঁতভাবে ফেয়ারি স্টাইল বিনুনি করা হয়েছে। সেই বিনুনির খাঁজে খাঁজে গুঁজে দেওয়া হয়েছে তাজা কিছু সাদা ফুল।

মেকআপের প্রলেপটা অত্যন্ত নিখুঁত,ঠিক যেন নো মেকআপ লুকেও এক অপার্থিব সৌন্দর্যের হাতছানি।
পার্লারের ওয়েটিং রুমে তখন অধীর অপেক্ষায় বসে ছিল শান আর ছোট্ট শের। মেকআপ রুমের ভারী দরজাটা যখন ধীরে ধীরে খুলে গেল, ভেতর থেকে বেরিয়ে এল রুশদী। তার পরনের সেই নিকষ কালো রাজকীয় গাউনটি সামলাতে দুজন পাশ থেকে সাহায্য করছিল। গাউনটি বেশ ভারী হওয়ায় রুশদী নিজেও দুই হাতে সেটা কিছুটা উঁচিয়ে ধরে ধীরলয়ে এগিয়ে আসছিল।
রুশদীকে দেখামাত্র সোফা ছেড়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল শান আর শের। শের যেন আগে থেকেই সব পরিকল্পনা করে রেখেছিল। সে একছুটে এসে রুশদীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, ঠিক যেভাবে রূপকথার রাজপুত্ররা রাজকুমারীদের প্রস্তাব দেয়। শেরের পরনেও আজ কালো রঙের ছোট্ট একটা স্যুট-কোট, যা তাকে এক খুদে জেন্টলম্যানের রূপ দিয়েছে। তার ছোট্ট হাতে ধরা ছিল একগুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপ। ফুলের তোড়াটা রুশদীর দিকে উঁচিয়ে ধরে আদুরে গলায় সে বলে উঠল,

“হেহ মম, তুমি কি আমার পাপার বউ হবে?”
শেরের এই অভাবনীয় আর মিষ্টি প্রপজালে রুশদী নিজেকে সামলাতে পারল না। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মুক্তোঝরা এক চিলতে হাসি। সেই হাসির স্নিগ্ধতা দেখে ছোট্ট শেরের মুখেও জয়ের হাসি ফুটে উঠল। রুশদী আলতো করে শেরের হাত থেকে গোলাপের তোড়াটি নিল এবং স্নিগ্ধ ঘ্রাণ নিয়ে একটি মৃদু চুমু খেল ফুলে। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে থাকা সেই খুদে রাজপুত্রের চোখের দিকে তাকিয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, “শিওর!”

সম্মতি পাওয়ামাত্রই শের আনন্দে আত্মহারা হয়ে রুশদীকে জড়িয়ে ধরল। ভারী গাউনের কারণে রুশদী পুরোপুরি নিচু হতে পারল না ঠিকই, তবে সে তার হাঁটু অবধি শেরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। রুশদীর আগে থেকেই বাচ্চা বেশ পছন্দ, বিশেষ করে যারা একটু চঞ্চল আর বয়স অনুযায়ী যে বাচ্চা গুলো একটু বুদ্ধিমান হয়।
শের ঠিক তেমনই এক বাচ্চা। সাড়ে চার বছর বয়সের অন্য সব শিশুরা যেখানে এখনো কথা জড়িয়ে ফেলে, সেখানে শেরের প্রতিটি শব্দ যেমন স্পষ্ট, তেমনি তার ভাবনাগুলো প্রখর। বয়সের তুলনায় তার এই পরিপক্বতা আর প্রখর আই-কিউ লেভেল তাকে বাকি সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই রুশদীর হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে এই খুদে জাদুকর।
শান্ত মেজাজের শান এতক্ষণ একদৃষ্টে রুশদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখেমুখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা এমনভাবে খেলা করছিল যে, সে যেন চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গিয়েছে। শানের এই দৃষ্টি দেখে রুশদী কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। নিজেকে একবার দেখে নিয়ে সে কিছুটা দ্বিধা মেশান গলায় বলল,”আমাকে কি খুব বেশি খারাপ লাগছে?”

রুশদীর কথায় শানের ঘোর কাটল। সে একগাল হেসে বলে উঠল, “খারাপ লাগছে মানে? কী যে বলছ ভাবি! তোমাকে দেখি যদি ভাইয়া যদি ফিট না খেয়েছে, তাহলে আমাকে বলো।তোমাকে অমায়িক সুন্দর লাগছে।অনুষ্ঠানে কেউ আজকে তোমার দিকে চোখ ফেরাতে পারবেনা।ভাই কিন্তু জিতছে ভাবি!”
শানের কথা বলার ভঙ্গি আর, ভাইয়া ফিট খাবে এমন রসিকতায় রুশদী আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে সশব্দে হেসে উঠল।শান ফারাজের পাঁচ বছরের ছোট, রুশদী বেশ কয়েক বছরের বড়ো।তবুও সে রুশদীকে ভাবি বলে ডাকে। রুশদী যদিও সে চাইলে তার নাম ধরে ডাকতে পারে।তাও শান ভাবি বলেহ ডাকে।

শান এর গাড়িটা যখন খান বাড়ির বিশাল ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, রুশদীর বুকের ভেতরটা অজানা এক শঙ্কায় দুরুদুরু করছিল। এই প্রথম সে খান বাড়িতে পা রাখল। চারপাশের সবকিছুই তার কাছে একদম অচেনা, অজানা। শান গাড়িটা প্রধান ফটক দিয়ে না নিয়ে পেছনের গেট দিয়ে প্রবেশ করাল, যাতে আমন্ত্রিত অতিথিদের ভিড় এড়িয়ে সরাসরি ভেতরে যাওয়া যায়। সেখানে নির্জনে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন রাইমা খান।
গাড়িটা থামতেই রাইমা খান ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে এসে নিজেই গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। রুশদী গাড়ি থেকে নামার সময় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাকে সালাম দিল। রাইমা খান সস্নেহে রুশদীর হাত ধরে তাকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করলেন। রুশদী পা মাটিতে রাখা মাত্রই রাইমা খান যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। তিনি পলকহীন চোখে রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার সেই নিবিড় দৃষ্টি রুশদীকে কিছুটা সংকুচিত করে তুলল। অস্বস্তি কাটাতে রুশদী যখন কিছু একটা বলতে চাইল, ঠিক তখনই রাইমা খান মুগ্ধ গলায় বলে উঠলেন,
“মাশাআল্লাহ! আমি জানতাম আমার পুত্রবধূ সুন্দরী, কিন্তু এখন তো দেখছি তুমি সাত আসমানের হুর মা! মাশাআল্লাহ, কারো নজর যেন না লাগে।”

রাইমা খানের এই প্রশংসা রুশদীর ভেতরের ভয়টাকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করল। রাইমা খান তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “চলো মা, ভেতরে চলো।”
ভারী গাউন আর লম্বা ট্রেইল হওয়ার কারণে রুশদীর হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছিল। রাইমা খান সেটা বুঝতে পেরে আগলে ধরে।রুশদী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। লোকমুখে সে শুনেছিল, মন্ত্রী শেহজাদ খানের স্ত্রী নাকি ভীষণ অহংকারী মানুষ। অথচ সেই মানুষটিই একজন সাধারণ মেয়ের ড্রেস টেনে ধরে পথ চলতে সাহায্য করছেন! এমন কাজ করতে গিয়ে অনেক উচ্চবিত্তেরই আত্মসম্মানে বাঁধে, কিন্তু রাইমা খানের মাঝে সেই লেশমাত্র নেই। প্রথম সাক্ষাতেই রুশদীর মনে রাইমা খানের জন্য একটি সফট কর্নার বা কোমল জায়গা তৈরি হয়েছিল, আর আজকের এই অতি সাধারণ একটি আচরণ সেই জায়গাটুকুকে আরও গভীর করল। আসলে যারা প্রতিনিয়ত অবহেলার শিকার হয়, তারা সামান্য একটু ভালোবাসা বা গুরুত্ব পেলেই তা আগলে রাখতে চায়।

এখন রুশদী রাইমা খানের বিশাল রাজকীয় বেডের ওপর বসে আছে। ঘরটা সব বিলাসবহুল আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো। রাইমা খান জরুরি কোনো কাজে একটু বাইরে গিয়েছেন।
এমন সময় কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলেন শেহজাদ খান। তাকে দেখামাত্রই রুশদী দাঁড়িয়ে পড়ল। এর আগে কখনো সরাসরি দেখা না হলেও, পাঞ্জাবি পরিহিত এই গম্ভীর আর ব্যক্তিত্ববান মানুষটিকে চিনতে রুশদীর এক মুহূর্ত দেরি হলো না,তিনিই মন্ত্রী শেহজাদ খান। রুশদী মাথা নিচু করে তাকে বিনয়ের সাথে সালাম দিল।
শেহজাদ খান স্মিত হেসে সালামের উত্তর নিলেন বললেন, “আমাদের তো এই প্রথম দেখা হলো মা। তুমি সালাম দিলে, এখন তো তোমাকে সালামি দিতে হয়।”

এই বলেই তিনি রাইমা খানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “রাইমা, তোমার কাছে ক্যাশ আছে না?”
রাইমা খান মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “জি আছে।” তিনি আলমারির লকার খোলার জন্য পা বাড়ালেন।
রুশদী বুঝে ফেলল এর কারন। সে কিছুটা সংকুচিত হয়ে শেহজাদ খানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সালামি কেন দিচ্ছেন আঙ্কেল? আপনি আমাকে মা বলে ডেকে আপন করে নিয়েছেন, এটাই আমার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সালামি।”
“আঙ্কেল? আঙ্কেল বলে তো আমাকে পর করে দিচ্ছ মা!”

শেহজাদ খান খানিকটা রসিকতার সুরে বললেন।
রুশদী তাৎক্ষণিক নিজের ভুল বুঝতে পারল। লজ্জা আর কুণ্ঠায় সে জিভ কেটে বলে উঠল, “ছি ছি! আপনাকে পর করে রাখব কেন? ভুল করে আঙ্কেল বলে ফেলেছি।”
শেহজাদ খান এবার বেশ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললেন, “ঠিক আছে, এবারের মতো মাফ করলাম। কিন্তু নেক্সট টাইম এই ভুল করলে আমি কিন্তু খুব মাইন্ড করব, বুঝতে পেরেছ?”
রুশদী মাথা নিচু করে বলল, “জি, বুঝতে পেরেছি।”

রাইমা খান রুশদীকে আগলে ধরে বাড়ির লনে সাজানো সেই ঝকঝকে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে এলেন। উপস্থিত শত শত মানুষের গুঞ্জন ছাপিয়ে তখন মাইক্রোফোনে তাদের বাগদানের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। রাইমা খান তাকে নিয়ে সোজা চলে আসলেন স্টেজে।
সেখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন শেহজাদ খান এবং তার পাশেই দাঁড়িয়ে ফারাজ। ফারাজের পরনে একটি কালো স্যুট-কোট, যা তার ব্যক্তিত্বকে যেন আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রুশদী একবার আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই এক অজানা সংকোচে চোখ সরিয়ে নিল। তার বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক স্পন্দনে কাঁপছে।

তারা এখন একদম মুখোমুখি। দুজনের হাতেই দুটি সোনার আংটি, যা তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে প্রস্তুত। রুশদী স্থির চোখে অপলক তাকিয়ে রইল ফারাজের মুখের দিকে। সে হয়ত কিছে খুচ্ছে তা কি কোনো লুকানো ভালোবাসা? নাকি আগামী দিনের কোনো নিশ্চিন্ত ভরসা? এক অদ্ভুত আশায় রুশদীর মন তখন তোলপাড়।
রুশদীর মৌনতা আর দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা দেখে ফারাজ নিচু গলায় বলে উঠল, “আংটি পরানোর ইচ্ছা আছে নাকি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে?”

ফারাজের আকস্মিক কথায় রুশদীর ধ্যান ভাঙল। সে চমকে উঠে ফারাজের প্রসারিত হাতের দিকে তাকাল। আর কোনো দ্বিধা নয়, আর কোনো পিছুটান নয়—রুশদী ফারাজের রিং ফিঙ্গারে আংটিটি পরিয়ে দিল। এবার ফারাজের পালা। ফারাজ যখন রুশদীর হাতটি নিজের হাতের ওপর রাখল, সেই স্পর্শে রুশদীর সারা শরীরে এক স্রোত বয়ে গেল। ফারাজ রুশদীর আঙুলে আংটিটি পরাতে পরাতে,
“নাও, তোমাকে দলিল করে নিলাম, এবার সময় করে বিয়েটা সেরে ফেলব।”

ফারাজের এই অভাবনীয় আর কিছুটা অধিকারবোধ সম্পন্ন কথাটি শুনে রুশদী স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হৃদয়ের সবটুকু ভয় আর সংশয় যেন ওই এক মুহূর্তের কথায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। চারপাশ থেকে তখন করতালির শব্দ ভেসে আসছে, ক্যামেরার ফ্ল্যাশবাল্বগুলো জ্বলে উঠছে বারবার। কিন্তু রুশদীর কাছে সেই মুহূর্তের পৃথিবীটা কেবল ফারাজের ওই ছোট একটি কথার মধ্যেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল।

“পাপা,ঘুম আসছে না। ”
শের ফারাজ প্রশস্ত এর বুকের উপর কচ্ছপ ছানার মত গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছি।অনেকটা সময় চেষ্টা করার পরেও ব্যর্থ হয় সে ঘুমাতে। ঘুম কিছুতেই তার দুচোখে দেখা দিচ্ছে না, একটু উঁকিও দিচ্ছে না। ঘুমটা কোথায় পালালো কে জানে? অনেক চেষ্টা করে যখন ঘুমাতে পারল না শের, এক সময় ঘুমের উপরই বিরক্ত হয়ে কথাটা বলে উঠলো সে।
ফারাজ তখন প্রায় ঘুমের দেশে তলিয়ে গিয়েছিল।সারাদিনের ব্যস্ততার পর, বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গা ছেড়ে দিয়েছে। শের কন্ঠ কর্নকুহরে পৌছাতেই ঘুমটা হালকা হয়ে গেল তার। তবে চোখ খুলো না। চোখ দুটো বন্ধ রেখে ঘুমের ঘোরে বলল,

“কেন?ওভার এক্সাইটেড তাই? ”
শের তার বাবার বুকে মুখ গুজে দিয়ে অসহায় গলায় বলল,
“আই ডোন্ট নো পাপা।”
ফারাজ একটু একটু নড়েচড়ে শুয়ে বলল,
“তা এখন সমাধান?”
শের এবার মাথা তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে একরাশ প্রত্যাশা নিয়ে বলল,
“তুমি ঘুম কিনে নিয়ে এসো। ”
ছেলের কথায় তাজ্জব বনে গেল ফারাজ। ঘুম কেনার জিনিস নাকি? সে কোথা থেকে কিনে নিয়ে আসবি? ফারাজ বিস্ময় চেপে রেখে হেসে বলল,
“ঘুম কেনা যায় না পাপা। ”

শের মুখ ফুলিয়ে বাবার দিকে তাকালো। তার পাপা তো দেখছি আজকাল বেশ মিথ্যা কথা বলতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগেও না বলল টাকা থাকলে সব করা যায়। শের এই ভেবে বলল,
“তুমি তো বলো টাকা থাকলে সব করা যায়। তাহলে এখন ঘুম কিনে নিয়ে আসো।”
ফারাজ খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শের এর দিকে তাকাল। ছেলেটা আজকাল বড্ড বেশি লজিক দেখাচ্ছে।তার সামনে কিছু বলাই যায় না, কথাটা মনে রেখে, সময় মত ব্যবহার করে। না না ফারাজকেএখন থেকে সাবধান হয়ে চলতে হবে।নাহলে তার এই পুচকি কোথায় কোথায় যে তাকে ফাঁসিয়ে দিবে মহান আল্লাহ তা’আলা ভালো জানেন।
ফারাজ শেরকে বোঝানোর চেষ্টা করে বলল,

“আরে বাবা, টাকা থাকলে সব কেনা যায় মানে—দামি গাড়ি কেনা যায়, আইফোন কেনা যায়,তোমার প্রিয় চকোলেটও কেনা যায়। কিন্তু ঘুম তো কোনো দোকানের সেলফে সাজানো থাকে না!আর কেনাও যায় না।”
শের বাবার বন্ধ করে রাখা চোখের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,
“কেন? তুমিই তো সেদিন বললে, যারা অনেক বড় লোক তারা নাকি ‘শান্তির ঘুম’ কেনে। তাহলে শান্তি আন্টির দোকান থেকে আমার জন্য এক কেজি ঘুম কিনে নিয়ে আসো।”
ফারাজ চোখ খুলে তার এই পুংটা ছেলের দিকে তাকালো।ফারাজ নিজেও হয়তো এতটা পুংটা ছিল না যতটা পুংটা তার ছেলে হয়েছে। সে কপালে হাত দিয়ে বলে,
“শান্তি কোনো আন্টির নাম না রে বাপ! ওটা মনের অবস্থা। আর ঘুম কেজি দরে বিক্রি হয় না। তুমি ঘুমালে এমনিই ঘুম আসবে।”

শের আপত্তি তুলে বলল, “মোটেও না! আমি চোখ বন্ধ করে বসে থাকি, কিন্তু ঘুম আসে না। আমার মনে হয় আমার ঘুমগুলো অন্য কেউ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে গেছে। তুমি নিশ্চয়ই কিপটেমি করে আমার জন্য ঘুম কেননি!”
ফারাজ হাল ছেড়ে দিল। এই ছেলেকে তার দ্বারা বোঝানো সম্ভব নয়। সে ভারি নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে! কালকে আমি বড় কোনো সুপার শপে গিয়ে তোমার জন্য সবচেয়ে দামী এক প্যাকেট ঘুম কিনে আনব, খুশি? এখন অন্তত চোখটা বন্ধ কর।”

বলে ফারাজ আবার ঘুমাতে নিলে, শের আবার আপত্তি করে বলে,
“প্যাকেট করা ঘুম আমার চাই না। পচা হবে। তুমি বরং অনলাইন থেকে অর্ডার দাও। ডেলিভারি ম্যান যখন আসবে, আমি নিজে চেক করে নেব যে ওটা আসল ঘুম নাকি শুধু হাই তোলা!”
ফারাজ চোখ খুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ছেলেটা পাগল টাগল হয়ে গেল না তো? এসব কিবকছে?সে মনে মনে আওড়ায়’এই ছেলের পাল্লায় পড়লে আমার নিজের ঘুমটাই আজ চিরতরে উধাও হয়ে যাবে।’
ফারাজের ক্লান্ত শরীরে এখন একটু ঘুমিয়ে প্রয়োজন। তাই সে ছেলের কথায় রাজি হয়ে বলল,
“ঠিক আছে পাপা, আমি এখনই অ্যাপে ঢুকে অর্ডার কনফার্ম করে দিচ্ছি। আজকের মত তুমি একটু ঘুমাও আর আমাকেও ঘুমাতে দাও। ”

বলে ফারাজ চোখ বন্ধ করে ফেলল। শের আর কথা বাড়ালো না। এর মধ্যে ঘুম চলে আসে ফারাজের। যখন ফারাজ ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই আবার শের তাকে বলে ওঠে,
“পাপা!ইন্টারনেটে সার্চ দাও তো, এক কেজি ঘুমের দাম কত?’ গুগলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।”
আহ আবার শুরু হয়ে গেল এই রেডিও । এর থেকে এখন পিছু ছাড়ানো সম্ভব নয়। ফারাজ বালিশের পাশে হাতরে ফোনটা খুজলো।ফোন হাতে নিয়ে অভিনয় করে বলল,
“এই তো সার্চ দিলাম। গুগল বলছে অনেক দামি জিনিস। ”
“পাপা সিফু চাচুটা সারাদিন ঘুমায়। সিফুর নিশ্চয়ই অনেক টাকা!কারণ ও প্রতিদিন এত দামী ঘুম নষ্ট করে! ও কি ঘুমের ডিলার?”

“হতে পারে! কাল সিফুকে জিজ্ঞেস করব ও পাইকারি দরে ঘুম বিক্রি করবে কি না। এখন তুমি ঘুমাও তো!”
“আরেকটা কথা! যদি ঘুম কিনতে না পারো, তাহলে অন্তত একটা ঘুমের রিমোট কিনে দাও। আমি বাটন টিপব আর অমনি টুস করে ঘুমিয়ে পড়ব।ডিরেক্ট ঘুম! আর যদি বেশি টাকা থাকে, তবে আমার জন্য একটা রোবট কিনে আনো যে আমার হয়ে ঘুমিয়ে দেবে, আর আমি সারারাত কার্টুন দেখব। আইডিয়াটা জোস না?”
ফারাজ কপাল চাপড়াতে থাকে ছেলের এমন ভয়ংকর আইডিয়া শুনি। সে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে,
“বাপজানরে, তোমার এই আইডিয়াগুলো শোনার চেয়ে ঘুম কিনে নিয়ে আসা অনেক বেটার অপশন।কাল আমি সারাদিন তোমার ঘুমের ফ্যাক্টরি খুঁজে, এক বস্তা ঘুম কিনে এনে দিব। কিন্তু প্লিজ দয়া করে আমাকে এখন একটু ঘুমাতে দাও। প্লিজ পাপা।”
ফারাজের কথায় শের খুশি হলো বলল,

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪

“ডিল! তবে মনে রেখো, ফ্যাক্টরি থেকে একদম ফ্রেশ ঘুম আনবে। বাসি ঘুম হলে কিন্তু আমি ফেরত দেব!”
ফারাজ মনে মনে পন কর শের আর যাই বলুক না কেন সে কোন উত্তর দিবে না। ছেলে নিজে পাগল হবে তো হবে তাকে সঙ্গে নিয়ে পাগল হবে। শের এর সেই মারাত্মক লেভেলের কথাগুলো শুনে মারাত্মক লেভেলের উত্তর দিতে গেলে ফারাজ আর ফারাজ থাকবে না। তাকে অতি দ্রুতই পাবনার মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি হতে হবে।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৫