Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪২

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪২

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪২
ইসরাত জাহান দ্যুতি

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে রাঙামাটিতে। শহরের রাস্তাতে তখন গাড়িটা চলছে ইয়াসিফের। মিনিট দশেক হলো গাড়ির ভেতরের পরিবেশ নিস্তব্ধ৷ সরাসরি ইয়াসিফের প্রত্যাখ্যান মাভিশাকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। ছাব্বিশ বছরের জীবনে ওর প্রতি পুরুষের মুগ্ধ চাহনি দেখতে দেখতে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসটা ছিল ওর দৃঢ়। তাই তো মানতেই পারছে না মুখের ওপর ইয়াসিফের প্রত্যাখ্যান৷ দুই বছর ধরে জমানো সকল অনুভূতি, সকল ভালোলাগা ধীরে ধীরে বিষাদে পরিণত হচ্ছে যেন। এই মুহূর্তে অপমানের বিনিময়ে অপমান ফিরিয়ে দেওয়ার জিদ্দি মনোভাব গড়ে উঠল ওর মনে।
পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের রাস্তাতে গাড়িটা উঠতেই সে বিদ্রুপত্মাক উক্তি ছুঁড়ল ইয়াসিফকে, ‘আমি না হয় ছদ্মবেশে থাকার জন্য নিজেকে নোংরা মেয়ে হিসেবে উপস্থাপন করেছি। কিন্তু আপনি কেন নিজেকে ভালো ছেলে বেশে দেখালেন?’

-‘কী? বুঝলাম না কী বললে। ক্লিয়ারলি বলো।’
মাভিশা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, ‘বুঝছেন না? না কি এখনও নিজেকে ভালো ছেলে দেখাতে চাইছেন? আপনার ব্যাপারে ইনফরমেশন কালেক্ট করার পর এও জানতে পেরেছি আপনি প্রতিটি অপারেশন বলুন আর মিশন বলুন, নিজের রিল্যাক্স মুডের জন্য লাস্যময়ীদেরকে খুঁজে নেন সব জায়গাতেই। তাহলে… ‘
-‘তাহলে তোমার মতো হটি নটিকে কেন ছেড়ে দিলাম, তাই তো?’ মাভিশার মুখের কথা কেঁড়ে নিয়ে বলল ইয়াসিফ তির্যক হাসি মুখে ধরে।
-‘এক্সাক্টলি। আমার কাছে নিজেকে কেন গুড বয় প্রেজেন্ট করলেন?’
-‘সহজ হিসাব। তুমি আমার কোনো লক্ষ্য নও। বরং উটকো ঝামেলা।’
-‘লক্ষ্য বলতে কী বোঝালেন?’
ইয়াসিফ মুহূর্তেই জবাব দিলো না৷ স্টিয়ারিংয়ের উপর আঙুল নাচাতে থাকল সামনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে। বেশ কিছুক্ষণ পর মাভিশার রাগ, বিরক্তি মিশ্রিত মুখপানে তাকিয়ে বলল, ‘আমার মিশন সাকসেসের স্বার্থে যদি তোমাকে নিয়ে ঘুমাতে হত তাহলে অবশ্যই তোমাকে গ্রহণ করতাম। এবার বোঝাতে পেরেছি?’

-‘হুহ্! আপনি বলতে চাইছেন শুধু প্রফেশন লাইফের স্বার্থে আপনি চরিত্রহীন হতে হলে চরিত্রহীন হন? এর বাইরে ইনোসেন্ট বয়!’ আরেকবার প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপ মন্তব্য মাভিশার।
ইয়াসিফ কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না প্রথমে। কিন্তু পরমুহূর্তে ভাবল, মাভিশার আত্মম্ভরিতা একটু হলেও চূর্ণ করা উচিত। তাই ওকে চটিয়ে দিতে
কিয়ৎ ক্ষণ পর বলে উঠল, ‘ইয়াসিফ শেখের দেহের ঘ্রাণও ইয়াসিফ শেখের কাছে ভীষণ মূল্যবান। তা যে কোনো রূপসী চাইলেই পেতে পারে না।’
গা জ্বালানো অপমানের আগুনে মাভিশা চোখ, মুখ শক্ত করে ফেলল। একটা সেকেন্ডও আর ইয়াসিফের গাড়িতে থাকতে চাইল না সে। গাড়িটা সে থামাতে বলার পূর্বেই আকস্মিক ব্রেক কষল ইয়াসিফ। অদূরে কী যেন তাকিয়ে দেখল কয়েক পল। তারপরই গাড়ির জানালা থেকে মাথাটা বের করে চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই হ্যালো, ফ্লোরেন্স আপা? ও আপা…!’

ফ্লোরেন্স সকালের সেই বেশেই ঘাড়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে দোকানের ছাউনির নিচে। গাড়ি কিছুটা দূরে থাকতেই ইয়াসিফ দেখতে পেয়েছিল তাকে। কিন্তু দূর থেকে মানুষটাকে ঠিকমতো ঠাওর করতে পারছিল না সে শুরুতে। কাছাকাছি আসতেই ফ্লোরেন্সের মুখটা স্পষ্ট হলো।
নিজের নাম শুনে ফ্লোরেন্স ইয়াসিফের লাল গাড়িটার দিকে তাকাতেই আরেকবার সেই বাসের হেলপার ছেলেদের মতো করে ডেকে উঠল তখন ইয়াসিফ, ‘ও ফ্লোরেন্স আপা, এদিকে আসেন।’
তখনও ইলশেগুঁড়ি পড়ছে বাইরে। ফ্লোরেন্স নিজের নামের পাশে অমন করে আপা ডাকটা শুনে প্রথমবার ভেবেই নিয়েছিল পুলিশ সুপার ডাকছে বোধ হয় তাকে। কিন্তু ইয়াসিফকে দেখার পর মুখের অভিব্যক্তি হলো তার হতবুদ্ধির মতো। সকালবেলা এই ছেলেকে যেমন আম্ভরিক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লেগেছিল, এমনতর ডাকার ভঙ্গিমা দেখে সে ধারণা ঈষৎ বলদাল। ইয়াসিফের সাথে কথা বলার পর পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল সে-ই। সেই লোকটিরও তাকে সম্বোধনের সুর এমনই ছিল। বাঙালি পুলিশদের আচরণ, কথাবার্তা বোধ হয় এরকমই হয়?
কাঁধের ব্যাগটা একটু টেনে নিয়ে সে এগিয়ে এলো জানালার কাছে। ইয়াসিফের পাশে বসা মাভিশাও অমন করে ফ্লোরেন্সকে ডাকতে দেখে হতবুদ্ধিকর চোখে দেখছিল ইয়াসিফকে। ফ্লোরেন্স জানালার কাছে এসে দাঁড়ালে তার মাস্কে ঢাকা মুখটার দিকে তখন কৌতূহল নিয়ে তাকাল। চোখাচোখি হলো ওদের দুজনের দু সেকেন্ডের জন্য।

-‘আপনাকে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে না ডেকে পারলাম না। যাচ্ছেন কোথাও?’
ফ্লোরেন্স সৌজন্যবোধ থেকে একটু হেসে বলল, ‘ইয়াহ, আই উইল রিটার্ন টু ঢাকা। বাসের জন্য অপেক্ষা করছি।’
-‘ঢাকায় ফিরছেন? কাশেম স্যার কী বললেন? স্যারের সাথে আর কথা বলার সুযোগ পাইনি ব্যস্ততায়।’
বৃষ্টির ছাঁটে ফ্লোরেন্সের মুখে বিন্দু বিন্দু পানি জমে আছে। ভেজা চোখের পাতা ঝাপটে ম্লান গলায় বলল সে, ‘কেসটা খুব জটিল। দুদিন পরই কোর্টে উঠবে কেস। তখন যদি প্রমাণ হয় ফ্লোরা আর ওর বন্ধুরা এই চক্রের সাথে জড়িত ছিল না তাহলেই ছাড়া পাবে। এছাড়া আর কিছু করার নেই। লয়্যার নিয়ে এলেও নাকি কিছুই লাভ হবে না।’

ইয়াসিফও বলতে চাইল, সত্যিই কোনো লাভ হবে না। আরও চরম সত্যটা বলতে চাইল, ‘আপনার বোনও আর ছাড়া পাবে না।’ কিন্তু ফ্লোরেন্সের নত রাখা চোখজোড়ায় সহসা অশ্রু জমতে দেখে কথাগুলো আর বলতে পারল না সে। ফ্লোরা আর ওর বন্ধুরা মাদকাসক্ত ছিল বহু আগে থেকেই। এ স্বীকারোক্তি ওরা নিজেরাই দিয়েছিল ইয়াসিফের কাছে। মূলতঃ ফ্লোরার ছেলে বন্ধুগুলো বড়ো বড়ো ড্রাগ ডিলারদের থেকে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্যও ভার্সিটির বহু ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বিক্রি করত গোপনে। ফ্লোরাকেও তারায় অভ্যস্ত করেছে মাদক গ্রহণ করতে। রাঙামাটিতে মা’কেই খুঁজতে এসেছিল সে। কিন্তু সে জানত না বন্ধুদের খপ্পরে পড়ে নেশাদ্রব্য নিতে গিয়ে এই চক্রের ফাঁদে পড়ে জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই জলদি সামলে নিলো ফ্লোরেন্স। তখনই ইয়াসিফ জিজ্ঞেস করল, ‘এখন তাহলে আপনি কী করতে চাইছেন?’

-‘লয়্যার খুঁজব। যদি কেস কোর্টে যাওয়ার আগে কিছু করা সম্ভব হয়!’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইয়াসিফ প্রস্তাব রাখল, ‘আপনাকে লিফ্ট দিই? যদি কিছু মনে না করেন। আমরাও ঢাকাতেই ফিরছি।’
-‘থ্যাঙ্কস আ লট। কিন্তু আমি বাসেই যেতে পারব, সমস্যা নেই।’
-‘সমস্যা নেই আবার হতেও তো পারে। এটাই তো প্রথম আপনার এ দেশে আসা, তাই না?’
-‘ইয়েস।’
-‘তাহলে বিপদ কোথা থেকে কীভাবে আসবে তা বুঝতেও পারবেন না। একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত নাগরিক হিসেবে এ দেশের অতিথির নিরাপত্তার দায়িত্ব তো আমাকে নিতেই হবে। আর না করবেন না। উঠে পড়ুন প্লিজ।’ গাড়ি থেকে নামতে নামতেই কথাগুলো বলল ইয়াসিফ। পেছনের দরজাটাও খুলে দিলো ফ্লোরেন্সকে বসতে অনুরোধ করে।
দুজনের এই জরুরি কথোপকথনের মূল বিষয় না বুঝেও চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল মাভিশা। কিন্তু বিদেশী মেয়েটাকে ইয়াসিফের গাড়িতে তোলার এত আগ্রহটা একটুও সহ্য হলো না ওর। পেছনের সিটে ফ্লোরেন্স উঠে বসলে প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে একবার পিছু ফিরে তাকিয়ে তাকে দেখে নিলো সে।

কিছুক্ষণ পূর্বে গোসল করে আসা শীতল শরীরটা দীধিতির এখন ঘর্মাক্ত। অনবরত কেঁপেই চলেছে ওর সারা দেহ আর বক্ষঃস্থল। মাত্র দু-চার সেকেন্ড ওর চোখের সামনে নাওফিলের বিভৎস রূপের মুখটা ছিল। চোখ বুজে যখন চিৎকার করে উঠল, তারপরই চোখের পাতা খুলতে সবকিছু কেমন মিথ্যা হয়ে গেল পলকেই। কোথায় নাওফিল? কোথায় সেই চেলাগুলো? কিছুই ছিল না তার আশেপাশে আর। এমন বিভ্রমজনক পরিস্থিতির শিকার এর আগেও একবার হয়েছিল সে। সেই কক্সবাজার যাওয়ার পথে নাওফিলদের সাথে প্রথম দেখা হওয়ার দিনটাতে। আর আজ দ্বিতীয়বার। তাছাড়া এ বাসাতে আসার পর থেকেও মাঝেমধ্যেই তার মনে একটা ব্যাপারে ভীতি কাজ করত। যখনই সে সারা বাসায় একা থাকত, মনে হতো তখন আশেপাশেই কেউ একজন চলছে ওর সঙ্গে বা ওর খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে৷ তারপর বিয়ের আগেও যে ক’বার সে নাওফিলের বাসাতে এসেছিল, একাকী দুজন কথা বলত কখনও। তখনও এমন একটা উপলব্ধি হত ওর৷ কিন্তু এই উপলব্ধি নিছক মনের ভুল বলেই উবিয়ে দিয়েছে সে এতদিন। কেবল আজকের ঘটনাটায় মনের মধ্যে গেঁথে বসে গেছে। নাওফিল এখনও নিচে বন্ধুদের মাঝে বসে শোরগোল করছে, তার নাম ধরে বন্ধুদের ডাকাডাকি ভেসে আসছে কানে এখনও। তাহলে কিয়ৎ কাল আগে ওই ভয়ঙ্কর চেহারার নাওফিল কে ছিল তবে? না কি এটা সম্পূর্ণই ওর অক্ষিবিভ্রম? রাত হলে ফ্যান্টাসি, হরর, এসব সিনেমা দেখার কুফলই কি আজকের ঘটনা? কিন্তু তখনের ভীতি অনুভব, ওই বিকৃত মুখের নাওফিল এত জীবন্ত ছিল যে, ও মানতেই পারছে না এটা ওর দৃষ্টিবিভ্রম ছাড়া কিছুই নয়। ওকে বোধ হয় খুব দ্রুত নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য একজন সাইক্রিয়াটিস্টের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

শেষমেশ এমন মনস্থির করেই দীধিতি পরিপাটি হয়ে নিচে নেমে এলো। ধর্মীয় জ্ঞান বিজ্ঞান জ্ঞানের তুলনায় স্বল্প থাকার জন্য আর বিজ্ঞানে অধিক বিশ্বাসী হওয়ার জন্যই সে বুঝতেই পারল না, নিজের সাথে আজকের ঘটা এই ঘটনা মোটেও কোনো ভ্রম নয় ওর।
নিচে আসতেই সৌরভের পাশে বসা নাওফিলের উজ্জ্বল মুখশ্রীতে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকল দীধিতি। লালচে ফর্সা মুখটা তার দাড়ি কামানো বলেই এত কি এত বেশি জ্যোতির্ময় লাগে? না কি এই পুরুষটার হৃদয় স্বচ্ছ বলেই মানুষটাকেও দীপ্তমান লাগে? অথচ একটু আগেও এই মানুষটির যে কদর্য মুখটি দেখে ভয় আর ঘৃণায় গা গুলিয়ে আসছিল ওর, হৃৎস্পন্দন থমকে যেতে চাইছিল। এখন সেই মানুষটির অমলিন মুখেই মোহিত হয়ে চেয়ে থাকছে।

কথার ফাঁকে আর কেউ খেয়াল না করলেও সৌরভের নজর ঠিকই গেল দীধিতির দিকে। কেমন লাজহীন, অনিমেষ চোখে দেখছে মেয়েটা স্বামী পুরুষটিকে! কী ভেবে সৌরভ তখন একবার নাওফিলের দিকেও তাকাল। আর তাই চমৎকার এক মুহূর্তের সাক্ষীও হতে পারল সে সময়— বন্ধুদের সঙ্গে গল্পের মাঝেই নাওফিল কোনাচে চোখে দেখছে দীধিতিকে, চোখাচোখিও হচ্ছে দুজনের। মাথা চুলকানোর বাহানায় সে হঠাৎ তর্জনী আঙুলটা চুলের ওপর দু’বার ঠোকা দিয়ে কিছু একটা ইশারা করল দীধিতিকে। কীসের ইশারা? সে ইশারা কি বুঝল দীধিতি?
তা দেখতে সৌরভ তখন ওর দিকে চাইল আর দেখল দীধিতিকে মাথায় ওড়না তুলে নিতে। এই অতি সামান্য ইশারা আর বুঝের খেলা সৌরভের অন্তরে নাড়া দিলো অনেকটা। আর মন বলল তাকে, হয়তবা এমন করে ভালোবাসা-বাসি স্মরণ আর সৌরভের মাঝে হত না কখনও। ‘মেড ফর ইচ আদার’ ইডিয়মটাও স্মরণ আর সৌরভ নামের পাশেও অতটা মানাত না, যতটা মানায় নাওফিল স্মরণের সঙ্গে।

নৈশভোজের পর্ব শেষে তাওসিফ বাদে সবাই-ই ট্যারেসে চলে আসে। কিরণকে জাগিয়ে তাকে খাবার আর ওষুধ খায়িয়ে দীধিতি তাকেও পাঠিয়ে দিয়েছে সবার সঙ্গে৷ ঐশী, তামান্না আর তন্বীকে সঙ্গে করে সে খাবার টেবিল গুছিয়ে তারপর একত্রে আসল চারজন ট্যারেসে।
সবার মাঝে সৌরভ আর নাওফিলকে দেখা গেল ট্যারেসের বাইরে। তারা দুজন ছাদের অন্য প্রান্তে কার্নিশে হেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাশাপাশি। সৌরভের চেহারায় আড়ষ্টভাব লক্ষিত হয়৷ আর নাওফিল! স্বভাবজাত থেকে কিছুটা গাম্ভীর্যপূর্ণ অভিব্যক্তিতে মাথা উচিয়ে শূন্য তাকিয়ে আছে সে উদাস চোখে। সকলের মাঝ থেকে সৌরভকে হঠাৎ ডেকে এনে তার নিরালায় দাঁড়ানোর কারণ নিয়ে সৌরভ সন্দিগ্ধ, সেই সাথে কিছুটা চিন্তিতও। মন বলছে, কিরণ বা স্মরণ এদের যে কোনো একজনের প্রসঙ্গেই কথা বলবে নাওফিল।
মিনিট দুয়েক পর সৌরভের সন্দেহকেই সত্য প্রমাণ করল নাওফিল— ললিত কণ্ঠে সৌরভের বুকে কাঁপন ছড়ানো স্বীকারোক্তি দিলো সে, ‘আমার কেন যেন মনে হয় আমি স্মরণের আগেই এই দুনিয়া ছাড়ব৷ ওর প্রতি আমার কতটা লোভ, ওকে ঘিরে আমার কতটা চাওয়া আর কতটা আকাঙ্খা, তা পরিপূর্ণ জানানোর আগেই চলে যাব হয়ত। তাই আমার একটা সিদ্ধান্ত আছে, সৌরভ। আমার মৃত্যুর পর আমি বাদে ওর জীবনে দ্বিতীয় এমন একজন পুরুষকেই স্বীকৃতি দিয়ে যাব, যার প্রতি স্মরণের প্রগাঢ় এক টান কোনো একদিন ছিল। কিন্তু সে টানের মর্মার্থ ধরতে পারার আগেই নতুন এক পুরুষ ওর মনটাকে কব্জা করে নেয়। আমি সেই পুরুষ ওকে ছেড়ে যাবার পর ওর জীবনে আসা প্রথম অনুভূতির পুরুষটিকেই স্বীকৃতি দিতে চাই, যদি সে আজীবনই একইভাবে ওকে চেয়ে যায়।’

সৌরভ অবনত মুখটা তুলে বিস্ময় চোখে তাকাতেই নাওফিল ফ্যাকাসে হেসে ওর বুকের বাঁ পাশটায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, ‘এখানটার আঘাতের গল্পটা বলবে আমাকে?’
-‘আপনাকে স্মরণ বলেছে এ ঘটনার কথা?’ অপ্রতিভ কণ্ঠ সৌরভের।
-‘যে ঘটনা কোনোদিনই কাউকে বলতে পারেনি, সে ঘটনা আমাকে মুখে বলা ওর মতো মেয়ের দ্বারা সম্ভব নয় তা তুমিও জানো। কিন্তু আমাকে না জানিয়েও থাকেনি। যা মুখে বলতে সঙ্কোচ তা ও আমাকে ন্যোটপ্যাডে লিখে জানায়। কিন্তু আমি তোমার মুখে ওই ঘটনার পুরোটা জানতে চাই। তুমি লজ্জা কোরো না, প্লিজ৷ নির্দ্বিধায় বলো। আমার জানাটা প্রয়োজন।’

সৌরভ নাওফিলের দিকে কয়েক পল স্থির চোখে চেয়ে থেকে মুখটা ফের নত করল। প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল, ‘ওর এইচএসসি পরীক্ষার পরদিন দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল৷ ঝুমুর আন্টির সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল ওর সেদিন সন্ধ্যায়। কাঁদতে কাঁদতে বাসা থেকে বেরিয়ে প্রথমে আমার বাসাতে এসেছিল, আমার খোঁজে৷ আমাকে না পেয়ে একাই সামনের কলোনির রাস্তায় যায় হাঁটতে হাঁটতে। আমি মাগরবিবের নামাজ শেষ করে ফেরার পথে ওকে ওদিকে যেতে দেখে ডাকতে ডাকতে পিছু নিই। ওই সময় ওই রাস্তাতে মানুষজন থাকে না বেশিরভাগ সময়ই। তারপর কী হলো! আমি পৌঁছানোর আগেই আমারই সামনে চারটা অপরিচিত ভদ্র পোশাকের লোক ওর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল, কী যেন বলল ওকে তাদের মধ্যে থেকে একজন। আমি দ্রুত হেঁটে ওর কাছে যেতেই তারা ওর মুখে স্প্রে করল কিছু একটা৷ আমি চিৎকার করার সঙ্গে সঙ্গেই দুজন আমার মুখ চেপে ধরে।

স্মরণ ততক্ষণে অজ্ঞান হয়ে বাকি দুজনের হাতে। আশ্চর্যভাবে আমাকে তারা অজ্ঞান করল না। স্মরণকে দুজন মিলে ধরে আর আমাকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলল৷ কোনোভাবেই ওদের সঙ্গে পেরে উঠলাম না গাড়ির মধ্যে। রাস্তাও দেখতে পেলাম না ঠিকমতো, আমাদেরকে কোন রাস্তা হয়ে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আধা ঘণ্টার বেশি সময় পর একটা একতলা বাড়িতে তারা ঢোকাল আমাদের৷ স্মরণকে বিছানাতে ফেলে ওর গা থেকে ওড়নাটা টেনে নিয়ে ফেলে দিলো নিচে। তারপর একজন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷ কিছুক্ষণ পর সে ফিরে ওই তিনজনের সঙ্গে যা বলাবলি করল তা ছিল, আমাদেরকে কোনোরকম আঘাত করা যাবে না। স্মরণকে যা করার তা আমার দ্বারায় করা হবে। এ কথার অর্থ আমার কাছে তখন দুর্বোধ্য হলেও আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল, স্মরণের সাথে যা হবে তা নিশ্চয়ই সব থেকে খারাপ কিছু হবে। ওরা যখন আমাকে হঠাৎ করেই ইনজেক্ট করল, তখন আরেকজন ঘরের কোনে মোবাইল ক্যামেরা ফিট করতে আরম্ভ করল। আমার মাথায় আসছিল না কী করতে চাইছিল আসলে ওরা৷ আমি চেঁচামেচি করলেও আমার কণ্ঠ দূর পর্যন্ত যেতে পারছিল না আমার মুখ চেপে ধরে রাখার কারণে৷ আমাকে যে ইনজেক্ট করেছিল তার ঊরুসন্ধিতে আমি পা দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে লাথি কষি। সেই লোকটা মারাত্মক ব্যথা পেয়ে নিচে বসে পড়তেই অন্য একজন রেগে উঠে পকেট থেকে নাইফ বের করে তেড়ে আসে আমাকে মারতে৷ আমি তখনই তার বুকে লাথি মারি।

সে ছিটকে পড়লেও আবার উঠে পড়ে আবারও নাইফ নিয়ে তেড়ে আসলে বাকি দুজন আটকায়। তারা মনে করিয়ে দেয়, আমাদের গায়ে আঘাত করা বারণ। সে কথা শুনে লোকটা আমাকে কিছু না করতে পারার ব্যর্থতায় রেগে গিয়ে নাইফটা ছুঁড়ে ফেলে। সেটা বিছানাতেই পড়ে। আমার শরীরের মধ্যে হঠাৎ একটু অন্যরকম কিছু ফিল হতে থাকে। গায়ে বোধ হয় কোনো দানব ভর করেছিল মনে হচ্ছিল। একজনকে তখন এত জোরে ধাক্কা দিয়ে বসি, সে ছিটকে গিয়ে দরজার সাথে বারি খায়। আমাকেও আরেকজন ধাক্কা দিয়ে বিছানাতে ফেলে দেয়, স্মরণের কাছে। আমাকে তারা বলতে থাকে স্মরণকে জড়িয়ে ধরতে, চুমু খেতে। অশ্লীল ভাষায় আমাকে ইন্টিমেট হতে বলে ওর সঙ্গে। শরীরটা তখনও পুরোপুরি আয়ত্তাধীন হয়নি আমার। তবে খুব তাড়াতাড়িই যে হবে তা ওদের কথাতেই বুঝতে পারছিলাম৷ আমাকে ছোটো মানুষ ভেবে আমার সামনেই ওদের প্ল্যানের একেকটা বাক্য একেক সময় বলে যাচ্ছিল। একদম শেষ যে কথাটা কানে স্পষ্ট এসেছিল তা হলো, তারা আমাদের দুজনকে এখানে এনেছেই এ কাজের জন্য।

ওই ক্যামেরাটা ফিট করার ব্যাপারটাও তখন আমার মাথায় ক্লিক করে। আমি আজও জানি না ওরা কেন চাইছিল এটা। আমার শরীরটাও এদিকে ওটাই চাইতে আরম্ভ করেছিল, যেটা তারা চাইছিল। আমি স্মরণের মুখের দিকে চেয়ে ওর দিকে হাতটা বাড়াতেই দুজন নোংরা ভাষায় আমাকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে ওর কাছে যেতে, কীভাবে কী করব তা বলে দিতে থাকে। আর ঠিক তখনই ওদেরকে বোধ হয় আমি প্রচণ্ড সারপ্রাইজড করে দিয়েছিলাম— নাইফটা নিজের বুকের দিকে গেঁথে দিয়ে। আমি কোনোভাবেই স্মরণের কোনো ক্ষতি করতে পারি না, হতে দিতেও পারি না। আমার মন মস্তিষ্কে এ কথাগুলোই চলছিল এত জোরালোভাবে যে, শরীরের কামনাও হারতে বাধ্য হয়েছিল আমার বিবেকের কাছে। ওদের অর্ডার নেই আমাদের গায়ে হাত দেওয়ার। তাই এটুকু নিশ্চিত ছিলাম ওরা সুযোগ পেলেও স্মরণের ক্ষতি করবে না। আসলে ওই মুহূর্তে ওদের সঙ্গে তো আমি পেরে উঠতাম না৷ আর লড়াই করার মতো শক্তিটাও তখন ছিল না আমার। তাই নিজের ভয়াবহ ক্ষতি দ্বারায় স্মরণের ক্ষতি আটকানো সম্ভব বলে বিশ্বাস করেছিলাম আমি।’

-‘তারপর?’ সৌরভ থামতেই মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করে উঠল নাওফিল।
সৌরভ একবার নাওফিলের দিকে তাকিয়ে তারপর ট্যারেসে বসা দলটির মাঝে দীধিতির দিকে তাকাল, বলতে থাকল এরপর, ‘আমার চোখ বুজে আসার আগ পর্যন্ত দেখতে পেরেছিলাম ওরা ছুটে আসে আমার কাছে। ভয়ে নাইফটা টেনে তোলে না, একজন আরেকজনের সাথে অস্থিরভাবে কথা বলতে থাকে৷ এরপর আমি বোধ হয় জ্ঞান হারাই। সজাগ হয়েছিলাম টানা তিনদিন পর। আমাকে আই.সি.ইউ রাখা হয়েছিল ওই তিনদিন। বাঁচার আশঙ্কা ক্ষীণ ছিল নাকি। হসপিটালে পৌঁছে দিয়েছিল ওই চারজনই। বুকে ছুরি গাঁথা মানে তো পুলিশ কেস ব্যাপার স্যাপার। কিন্তু তারা কী করে হসপিটাল থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছিল জানা যায়নি। সুহাইল আঙ্কেল শত চেষ্টা করেও ওদেরকে সারা যশোরে কোথাও খুঁজে পায়নি।’

-‘আর স্মরণকে কী করেছিল?’
-‘ওকে অতি সাবধানে ওর বাসার সামনেই ফেলে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ-ই নাকি তা দেখতে পায়নি।’
এই অদ্ভুত উদ্দেশ্যটা কার ছিল, এটা বোঝার জন্য নাওফিল গতকাল থেকেই ব্যাকুল হয়ে আছে। সৌরভের কথা থেকে সে ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা কঠিন। কিন্তু ওর মনে হচ্ছে, এই ঘটনার মাঝেই ও ক্লু খুঁজে পাবে। সৌরভের থেকে আরও বিস্তারিত জানতে হবে তার জন্য। তবে সেটা এ মুহূর্তে নয়। ইয়াসিফ ফিরলে তখন এক সঙ্গে এ ব্যাপার নিয়ে আলোচনাতে বসবে সে। ঘটনাটা কয়েক বছরের পুরোনো হলেও এটা কোনো ছোটোখাটো ঘটনা নয়। নিশ্চয়ই বৃহৎ কোনো পরিকল্পনা লুকিয়ে ছিল এর পেছনে। যেটা সফল হয়নি কেবল সৌরভের জন্যই। আর এই পরিকল্পনার পিছে কে অথবা কারা আছে, কী উদ্দেশ্যই বা আছে? এটা জানা অবশ্যই জরুরি। এবং এ কাজে সুহাইল শেখকেও প্রয়োজন।

মৌনতা বিরাজ করছিল দুজনের মাঝেই। নাওফিলের ভাবনাচিন্তার ভেতর সৌরভ স্বীকারোক্তি দিলো এবার, ‘বাস্তব অভিজ্ঞতা আমার থেকেও আপনার বেশি, ভাইয়া। কিরণকে আমি কখনই বিয়ে করতে পারব না৷ আপনিই বলুন, এটা কি হয়? কিরণ বয়সের তুলনায় যথেষ্ট বুঝদার, এটাই জানতাম। তাই ওকে আমি সত্যিটাই বলেছি ওকে বিয়ে করতে না পারার কারণ। কিন্তু মেয়েরা বোধ হয় ভালোবাসার কাছে বোকা হয়ে যায়। ও ভেবে বসেছে, সৌন্দর্য বিচারে আমি স্মরণকে পছন্দ করি আর ওকে অপছন্দ। কিন্তু আমার ওকে এক্সপ্ল্যানেশন দেওয়ার ধৈর্য নেই, ওর বর হওয়া মানে স্মরণকে যখন তখন ফেস করা। বউ হিসেবে ও কখনই সহ্য করতে পারবে না আমার বহু বছরের ফিলিংস ওর বোনকে ঘিরে।

তা চাইলেই ম্যাজিকের মতো উধাও করে দেওয়া যায় না মন থেকে। ভাইয়া, আপনি শেষ কথাটা বললেন যদি আজীবন একইভাবে চেয়ে যাই আমি স্মরণকে। তাহলে আপনি ওর জীবনের দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে আমাকে স্বীকৃতি দিয়ে যাবেন। আপনি নিজেও জানেন এটা কখনই সম্ভব না। আপনি স্মরণকে নিয়ে আমার মনের বর্তমান ভাবনা বা চিন্তাচেতনা বুঝতেই যে ওই অতি আবেগি কথাগুলো বলেছেন, তা আমি জানি। আমার জীবনে তো শুধু আপন মানুষ হিসেবে একজন স্মরণ নেই। আমার বাবা-মা, বোন আছে। আমার তাদের প্রতিও দায়িত্ব, কর্তব্য আছে। তাই আবেগে গা ভাসিয়ে দেওয়ার সুযোগ আমার নেই। আমি এটাও বুঝতে পারছি আপনি স্বামী হয়ে স্ত্রীর এক অনুরাগীর মুখে এসব শুনতে বেজাজ রাগ লাগছে, আমার মনে এখনও স্মরণকে নিয়ে থাকা ফিলিংস সম্পর্কে জেনে আপনি নিতে পারছেন না। কিন্তু মনের ওপর মনের মালিকেরও মর্জি চলে না। তা বোঝেন নিশ্চয়ই?’

নাওফিল উপরন্তু মুগ্ধ হয় সৌরভের ব্যক্তিত্বে, বুদ্ধিমত্তায়। এক অপ্রতিরোধ্য সম্মানও জাগ্রত হয় সেই ব্যক্তিত্বের প্রতি। হ্যাঁ, ও চেয়েছিল সৌরভের মানসিকতা যাচাই করতে। কিন্তু কেন যেন প্রত্যাশাও ছিল, সৌরভের প্রতি গতকাল রাত থেকে জন্ম নেওয়া ভালো লাগা কমবে না। বরঞ্চ বৃদ্ধি পাবে।
-‘আমি নিজেও চাই না তুমি কিরণকে বিয়ে করো, সৌরভ।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪১

এ কথায় সৌরভ ক্লেশিত মনেই হাসল একটুখানি। তা দেখে নাওফিল বলল, ‘আমি প্রেমিক হলে জিতিয়ে দিতে পারতাম তোমাকে৷ বিয়ের আগে এ ঘটনা জানলে সত্যিই তুমি জিততে। কিন্তু আমি যে এখন পৃথিবীর সকল প্রেমিকের থেকেও ঊর্ধ্বে৷ মহামূল্যবান শীর্ষ স্থানে আছি। ততটাই শীর্ষ স্থানে, যতটা কেবল একজন পুরুষ স্বামী হলে থাকতে পারে।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here