আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬২
suraiya rafa
চারিদিকে নিগূঢ় শূন্যতা। কানের কাছে শোঁ শোঁ হাওয়া বইছে। হাওয়ার সাথে কুণ্ডলী পাকিয়ে ভেসে আসছে নিরবধি সুরের সয়লাব। হিমহিম কুয়াশায় ভার হয়ে আছে নিশীথের আকাশ। গোটা শহরটাকে যেন গ্রাস করেছে অদ্ভুত এক ভয়াল অন্ধকার। শ্বেতরঙা বরফের টুকরো গুলো নীহারিকার মতো ঝরে পড়ছে চারিদিকে। নিস্তব্ধ সড়কের গায়ে সফেদ চাদরের মতো ছড়িয়ে রয়েছে তুষারের পাতলা আবরণ।
প্রকৃতি জুড়ে বরফের উল্লাস,তবুও প্রচণ্ড শীতে জনজীবনের বেহাল দশা, তারউপর মাঝরাতে ঘরে ফেরার তাড়া। রাস্তায় আটকে থাকা প্রতিটি মানুষের মাঝে ছাইচাপা অসন্তোষ, অথচ শহর জুড়ে অকস্মাৎ লকডাউন। কোথাও কোনো গাড়ি চলছে না। অলিগলি থেকে মহাসড়ক সমগ্র জায়গা জুড়ে অকারণ যানযট। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হর্ণ বাজানোর কঠোর নিষেধাজ্ঞা। এ যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। দীর্ঘ জানযট আর বৈরী আবহাওয়ার তোড়ে মানুষ জন অতিষ্ঠ হয়ে গাড়িতেই বসে ঝিমাচ্ছে সব। যেন কয়েক মূহুর্তের মাঝে গোটা শহরটাকে থমকে দিয়েছে কেউ। নিস্তেজ করে রেখেছে সমগ্র পৃথিবী। কিন্তু কার এতো স্পর্ধা ?
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মহাসড়কের মাঝ বরাবর যেখানে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর থেকে হাইওয়ে এসে মিলেছে, ঠিক সেখানটায় পরপর সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে শতাধিক কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি। সারির সর্বপ্রথম গাড়িটা রয়্যাল ব্লু থীমের রোলস রয়েস ড্রপটেইল। পৃথিবী বিখ্যাত এই গাড়ির অভ্যন্তরে যে কোনো বিশেষ আলফা ম্যানের উপস্থিতি যা বুঝতে বাকি নেই কারোর। কিন্তু কে সে?
দীর্ঘ এই যানজটের মাঝেই পেছনের গাড়ি থেকে বেড়িয়ে রোলস রয়েসের দিকে ছুটে এলো একজন। কালো ওভারকোট পরিহিত লোকটা সবিনয়ে ন্যুজ্ব হয়ে সম্মান জানাতেই খুলে গেলো জানালার তকতকে কাচ। ওপাশের ড্রাইভিং সিটে আসীন হয়ে আছে স্বয়ং মাফিয়া বস। আঙুলের ডগায় ধূমায়িত শলাকা তার। পাশেই প্যাসেঞ্জার সিটে কুণ্ডলী পাকিয়ে গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে আছে এক সদ্য বিবাহিতা সুশ্রী রমণী। পড়নে তার জমিনজোড়া বিশাল ভলিউম গাউন। নিগূঢ় আঁধারে নিমজ্জিত শুনশান গাড়ির মাঝে নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে তার কোমল তুলতুলে মুখ । ঘুমন্ত রমণীর দৃপ্ত চেহারা জুড়ে জোৎস্নাভেজা রূপসী চাঁদের মতোই চোখ জুড়ানো দ্যুতি । যেন রূপকথায় বিচরণ করা কোনো অচিনপুরির ঘুমন্ত রাজকন্যা এসে ঠায় জমিয়েছে এক দুষ্টু জাদুকরের তিমিরাচ্ছন্ন ডেরায়।
তার ঠিক পেছনের সিটে গোলাকার স্ট্রোলারের মধ্যে গা ছড়িয়ে উবু হয়ে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট এক অস্তিত্ব ।গভীর ঘুমের দোলাচলে খানিক বাদে বাদেই হেসে উঠছে তার কচি কোমল ঠোঁট। কখনো বা স্বপ্নের ঘোরে কাঁদোকাঁদো চেহারা করতেই তীক্ষ্ণ ভাঁজে ঢেকে যাচ্ছে তার অধর তলার কুচকুচে কালো তিল। কয়েক সেকেন্ডের ব্যাবধানে গাড়ির অভ্যন্তরে একপল নজর বুলিয়ে আশ্চর্যের শিয়র ছুলো লোকটা। মাফিয়া বসের দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে অস্থির স্বরে বলতে আরম্ভ করলো,
— বস ইট’স আর্জেন্ট…
জিভ খসে বাকি কথা বের হওয়ার আগেই লোকটাকে মাঝপথে রুখে দিলো মাফিয়া বস। ঠোঁটের উপর তর্জণী দাবিয়ে সতর্ক গলায় বললো,
— হুঁশশশ,মাই বেবি বয় ইজ স্লিপিং।
লোকটা ভড়কালো। গলার আওয়াজ ততোধিক ক্ষীণ করে জানালো,
— বস এটা পুরো শহরের টার্নিং পয়েন্ট। গত একঘন্টা যাবত আমরা এখানে অপেক্ষা করছি। কম করেও হলেও একশোর উপরে গাড়ি, অলরেডি রাস্তাঘাট সব ব্লকড। তারউপর কোনো একজ্যাক্ট রিজন দেখানো হয়নি। আর ঘন্টাখানিক এভাবে থাকলে মস্কোর সাথে পুরো রাশিয়ার কানেকশন বিচ্ছিন্ন হতে পারে।
গোটা দেশজুড়ে এতো এতো সমস্যা, তবুও কোনোরূপ ভাবান্তর ঘটলোটা মাফিয়া বসের । না তো একচুল অবধি নড়লো তার গাড়িটা।উল্টো সিগারেটের শলাকায় লম্বা টান দিয়ে নিস্পৃহ গলায় প্রত্যুত্তর করলো সে,
— গাড়ির মধ্যে আমার পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে, শহরকে বলো ওয়েট করতে।
— কিন্তু বস…
মাফিয়া গার্ডটা ফের কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল তৎক্ষনাৎ তার মুখের মধ্যে আচানক জ্বলন্ত সিগারেটটা ঠেসে ঢুকিয়ে দিলো এরীশ।
— জাস্ট শাট ইউওর ফাকিং মাউথ ।
সময় গড়ালো আরও ঘন্টা দুয়েক। নদীর জলস্রোতের মতো সময় পেরোলেও গোটা মস্কো শহরটা একই জায়গা আটকে আছে যেন । কোনো এক অদেখা বাঙালি রমণীর ঘুমের সুরক্ষায় থমকে
আছে চারিপাশ। আশেপাশের রাস্তা গুলোতে আরোপিত হয়েছে কড়া নিরাপত্তার বহর। এমনই এক মূহুর্তে সমুদ্রাগত ঠান্ডা হাওয়ার তোড়ে আচানক ঘুম ভেঙে গেলো ঈশানীর । তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা ক্রমশ কেটে যেতেই ঝাপসা চোখে নিজের অবস্থান পরখ করলো সে। আড়মোড়া ভাঙতেই কোথা থেকে যেন দমকা হাওয়ার মতো ভেসে এলো মাফিয়া বসের রাশভারি কণ্ঠস্বর,
— হাউ ওয়াজ দ্যা স্লিপ?
গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়েছে ব্যাপারটা উপলব্ধি হতেই একটুখানি বিভ্রান্ত হলো ঈশানী। ঘুমের সময়টা ঠিক কতক্ষণ সেটা অনুমান করার জন্য উত্তরের তোয়াক্কা না করে উল্টো প্রশ্ন ছুড়লো সে,
— কয়টা বাজে এখন?
— অলমোস্ট ফোর এ.এম।
ঈশানী ধড়ফড়িয়ে উঠলো। ব্যতিগ্রস্থ নয়নে পেছনের সিটে নির্বিগ্নে ঘুমিয়ে থাকা ইয়াশকে পরখ করে বললো,
—কিহ! কিন্তু আমরা তো এখনো গাড়িতে।
— ইয়েস বেইব, ফর ইউওর বিউটি স্লিপ।
মাফিয়া বসের মসৃণ কণ্ঠে প্রশ্রয়ের আভাস।
— কিন্তু এভাবে মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে, না মানে সমস্যা হয়নি?
এরীশ এবার ঝুঁকে এলো খানিক। রমণীর পেলব চেহারায় তপ্তশ্বাস ছেড়ে জবাব দিলো,
— না, সমস্যা হয়নি। ওরা ওয়েট করেছে।
— ওরা কারা?
ঈশানীর ঘুম জড়ানো কণ্ঠে অদম্য কৌতুহল। তৎক্ষনাৎ হিমশীতল আওয়াজে প্রত্যুত্তর করলো এরীশ,
— নট সামওয়ান স্পেশাল, জাস্ট দ্যা এনটায়ার টাউন।
এরীশের কথা শুনে দু’চোখ কপালে উঠে গেলো ঈশানীর। মুখ ফস্কে বেরিয়ে এলো অবিশ্বাস্য আওয়াজ ,
—কিহ!
সবসময়ের মতোই ঈশানীর বাড়ন্ত কৌতুহলে এক বালতি জল ঢেলে দিয়ে কোনোরূপ প্রত্যুত্তর না করেই গাড়ি স্টার্ট দিলো এরীশ।
তুষারের নমনীয় আবরণটুকু চাকায় পিষে নিজের লোকজনকে সাথে নিয়ে ছুটলো দূর বহুদূর….
You r the light
You r the night
You r the colour of my blood
You the cure
You r the pain
You r the only think
i wanna touch…..
গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের টিন্ডেট জানালাটা নির্দ্বিধায় নামানো। যেন কোনো অভূতপূর্ব সুখ সুখ হাওয়া বইছে তার অভ্যন্তরে।
এমনটা সাধারণত হয়না। মাফিয়া সদস্যরা মূলত বুলেট প্রুফ গাড়ির পাশাপাশি এক্সট্রা প্রটেকশন নিয়ে চলে, সেখানে এতো স্বাচ্ছন্দ্যে এগিয়ে যাওয়া গাড়িটাতে আজ স্বয়ং মাফিয়া বস রীশষ্কার উপস্থিতি। অশুভ মরিচীকা যেন বেমালুম উদ্বেগহীন। কিন্তু কেন? কিসের এতো নিস্পৃহতা তার?
পাশেই খোলা জানালার কার্নিশে দু-হাত ভর করে তাতে চিবুক ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে লুটিয়ে আছে ঈশানী। গানের সুরটা ভীষণ ভালো লাগছে ওর । হৃদয়ের খুব কাছে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো অকারণ একটা ভালোলাগা ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। তাই ড্যাশবোর্ড হাতড়ে ভলিউম বাড়ালো একটু। পরপরই গাড়ির ব্রেক টানার আওয়াজে ভ্রম ছুটে গেলো আচানক । বিভ্রান্ত চোখে পাশ ফিরে তাকাতেই এরীশ আবারও ঝুঁকে এসে সিট বেল্ট খুলে দিলো ওর। ছোট্ট করে বললো,
— নামো।
— এখানেই?
ঈশানীর আচ্ছন্ন কণ্ঠে অপ্রত্যাশিত কৌতুহল। মেয়েটার অবান্তর প্রশ্নে ভ্রু উঁচালো বিপরীত পক্ষ, চোয়ালের পেশি শক্ত করে গম্ভীর আওয়াজে জবাব দিলো,
— এভাবে কথা বলোনা আমার সঙ্গে। তোমার ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বোধ হয় কিছু একটা মেশানো। আ’ম আলরেডি ক্রেভিং ফর ড্রাগ। এ্যন্ড ইট’স ড্রাইভিং মি ক্রেইইজি। কোনোভাবে ডেস্পারেট হয়ে গেলে ব্রেক ফেইল করে তিনজনই মা’রা পড়বো।
এরীশের কথার মানে বুঝতে পারলো না ঈশানী। সহসা গাড়ির খোলা জানালা গলিয়ে বাইরে তাকালো একবার । আশপাশটা ধোঁয়াসার মতো তমশাচ্ছন্ন, ধারেকাছে কোথাও সমুদ্র আছে বোধহয়। বিস্তর বালুচরের গায়ে ঝাপিয়ে পড়া উদ্যম জলরাশির হুঙ্কারে মুখর হয়ে উঠেছে কর্ণকূহর । জায়গাটা অপরিচিত লাগছে,ফলস্বরূপ আবারও ভেসে এলো উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর,
— এটা তো পেন্ট হাউজ নয় এরীশ!
— ঠিকই ধরেছো।
— তাহলে এখানে কেন নিয়ে এলে? আমিতো…
বাক্য সম্পন্ন করতে পারলো না ঈশানী, তার আগেই জিভের ডগায় অধর ভিজিয়ে জবাব দিলো এরীশ,
— তোমার জন্য একটা গিফট আছে।
— গিফট! কি গিফট?
সবিস্ময়ে জানতে চাইলো ঈশানী। বলতে না বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো মাফিয়া বসের শীতল কণ্ঠস্বর,
— দ্যা রেস্ট অফ মাই লাইফ!
এরীশের মতো অনুভূতিহীন নিস্পৃহ মানবের মুখে এহেন বাক্যখানা আজও ভীষণ অবিশ্বাস্য আর মেকি লাগে ঈশানীর। অবান্তর ভাবনায় থমকে আসে তার নিঃশ্বাস। বক্ষমাঝের সুখ সুখ যাতনায় নীলাভ চোখের অবলা দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে ওঠে ক্রমশ। মাফিয়া বসের একটুখানি আস্কারা পেতেই সেই জল মুক্ত দানার মতো ঝরে পড়ে রমণীর মোমারাঙা কপোল বেয়ে। রিনরিনে ধ্বণিতে প্রকাশ ঘটে এক আকাশ অভিমানী অনুরক্তির,
— একবার ভালোবাসি বলবে? প্লিইজ!
সারাদিনের ক্লান্তি, তারউপর এতোভারি একটা গাউন সামলাতে সামলাতে মুখটা পাংশুটে হয়ে আছে ঈশানীর। মেয়েটার মলিন মুখখানা পরখ করে, একটু থেমে ফের নিজের চিরাচরিত গম্ভীর সত্তায় ফিরে গেলো এরীশ। ভারিক্কি আওয়াজে বললো,
— আর একটাও প্রশ্ন নয়। জাস্ট ফলো মাই কমান্ড।
এরীশের ওমন জোড়ালো আদেশ শোনা মাত্রই ভেতর ভেতর অপমান বোধ হলো রমণীর। আধুনিক ভাষায় ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ বোধ হয় একেই বলে। জীবন দিতেও পারে, আবার জীবন নিতেও পারে অথচ ভালোবাসি বলতে পারেনা একটাবার। এইটুকুনি শব্দটা উচ্চারণ করা কি এতোই কঠিন? ভেতর ভেতর ক্রোধ জমলো ঈশানীর। বহুদিন ধরে ঝিমিয়ে পড়া আত্মসম্মানটা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো বুকের ভেতর,সহসা সপ্রতিভ কণ্ঠে সেই কঠোর আদেশকে প্রতিহত করলো সে,
— আমি তোমার অধিনস্ত কোনো গার্ড নই মাফিয়া বস।
ঈশানী বলতে বাকি মূহুর্তেই হ্যাঁচকা টান মে’রে তড়িৎ হাতে ওকে কোলে তুলে নিলো এরীশ। অতঃপর গাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে যেতে দৃষ্টির মিলন ঘটিয়ে আওড়ালো,
— ইউ্য আর অ্যাবসুলেটলি রাইট, মাই ওয়েম্যান! ইউর উইশ ইজ মাই কমান্ড।
গাড়ি থেকে বেরোতেই একজন গার্ড তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে ইয়াশের স্ট্রোলার নামিয়ে আনলো। লোকটা ওদের কাছাকাছি আসতেই অতি সংবেদনশীল হাতে বাচ্চা সমেত স্রোলাটখানা তুলে নিলো এরীশ। অতঃপর নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডটাকে উদ্দেশ্য করে ছুড়ে দিলো কঠোর বাক্য বহর,
— আই ক্যান টেইক কেয়ার অফ মাই বেইবী।
এরীশ যখন গার্ডের সঙ্গে কথায় ব্যস্ত তখনই সামনের দৃশ্যপটে চোখ আটকে যায় ঈশানীর। ও দেখতে পায় বিশাল সমুদ্রের কোল ঘেঁষে নীলাভ জলরাশির পানে মুখ করে সীমাহীন দম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশালাকৃতির মাফিয়া ম্যানশন। চারিদিকের নিস্তব্ধতার মাঝে এই একটুকরো আলো ঝলমলে ম্যানশনটাকে অদ্ভুত রহস্যময় লাগছে। এক হাতে ঈশানী আর অন্যহাতে নিজের ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে এরীশ ইউভান। ঈশানীর মনে কৌতুহলের দানাবাঁধে। মস্তিষ্কে ঘুরপাক খায় হাজারো প্রশ্নের সমাহার।
কালো রঙের ভারী লোহার গেইটটাতে বরফ জমে শীতল হয়ে আছে । গেইটের দু’ধারে বিশালদেহী সিংহমুখগুলো থেকে ঝরনার মতো গড়িয়ে পড়ছে কৃত্রিম জলের ফোয়ারা। তার ঠিক মাঝেই জ্বলজ্বল করছে একটা চৌকাকৃতির বিশেষ নেইম-প্লেট। ম্যানশনের মূল ফটকের সঙ্গে লাগোয়া সেই নেইম-প্লেটটার দিকে তখন থেকে স্তব্ধ বিমূঢ় চিত্তে তাকিয়ে আছে ঈশানী। যেখানে গুটিগুটি ইংরেজি অক্ষরে লেখা রয়েছে স্পষ্ট দু’টো নাম।
— mr.&mrs yuvan
অসহনীয় নৈঃশব্দে সময় অতিবাহিত হলো আরও কিছুক্ষণ।এরীশ পেছনেই দাঁড়িয়ে, চোখের পাতায় বার কয়েক পলক ছেড়ে আরও একবার নেইমপ্লেটের লেখাগুলো বিড়বিড় করে আওড়ালো মেয়েটা । তারপর ঘাড় ফিরিয়ে এরীশের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিপাত করে জিজ্ঞেস করলো,
— এটা কি এরীশ?
— তোমার স্বপ্ন। যাও খুলে দেখো।
অচিরেই প্রত্যুত্তর করে ঈশানীর হাতে একটা ডোর-কি তুলে দিলো মাফিয়া বস।পরিস্থিতি আঁচ করতে না পেরে কয়েকমূর্হুতের জন্য স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মেয়েটা। পরক্ষণে স্বামীর চোখের ইশারায় ধাতস্থ হয়ে এগিয়ে গিয়ে দরজার নব খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো ও । তার পিছু পিছু এগিয়ে গেলো এরীশ আর ইয়াশও । ছেলেটা তখনও স্ট্রোলারের মধ্যে ঘুমিয়ে। ওদিকে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতেই থমকে গেলো পদযুগল । আশ্চর্য দৃষ্টি ঘুরপাক খেতে লাগলো হলরুমের প্রতিটি কোণে। বাকরুদ্ধ ঈশানী, মস্তিকজুড়ে ঘুরপাক খেতে থাকা অবিন্যস্ত কথাগুলো সব গলায় আটকে আছে ওর ।
প্রাসাদের মতো বিশাল ম্যানশন। আলোকসজ্জিত ঝলমলে তার প্রতিটি কোণ। কোথাও কোনো গোলাবারুদের আওয়াজ নেই, নেই কোনো শুকিয়ে যাওয়া রক্তের চটা। গোটা হলরুম জুড়ে মেঘের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে ওয়াইল্ড ল্যাভেন্ডারের মিঠেমধুর সৌরভ। সমগ্র মেঝেতে বিছানো নান্দনিক গালিচার মখমলি আবরণটুকু পায়ের নিচে আদর মাখিয়ে দিচ্ছে যেন।
ভেতরে চোখ ধাঁধানো ইন্টেরিয়র। প্রতিটি আসবাব থেকে শুরু করে ঘরের আনাচে কানাচে সবকিছু চেরিব্লোসমের থীমে ডেকোরেশন করা হয়েছে । মাথার উপর সদ্য কিশলয়ের ন্যায় ঝুলে আছে চেরিব্লোসমের মতো দেখতে কয়েক স্তরের আকর্ষনীয় চ্যান্ডেলিয়র। সেদিকে চোখ পড়তেই বিস্ময়ে ফাঁক হয়ে গেলো ওষ্ঠাধর, উচ্ছ্বাসে,পুলকে একাগ্র হয়ে সগতোক্তিতে বিড়বিড়ালো রমণী,
— এতো সুন্দর কেন এটা?
— কারণ এটাও সাকুরা।জাস্ট লাইক ইউ্য।
পেছন থেকে এরীশের হাস্কিস্বর ভেসে আসতেই দৃষ্টি ঘোরালো ঈশানী। চাতকিনীর মতো ডেকে উঠলো,
— রীশ!
প্রবল উত্তেজনায় গলদেশ শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে ওর। চোখের তারায় চিকচিক করছে এক সমুদ্র খুশির জোয়ার। একটু দূরেই ছেলের স্ট্রোলারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এরীশ। ঈশানী গুটিগুটি পদক্ষেপে সেদিকেই এগিয়ে গেলো। ক্লান্ত, ঝাপসা দৃষ্টি মেলে লোকটাকে পর্যবেক্ষণ করলো কিয়ৎক্ষণ। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আড়ষ্ট কণ্ঠে জানতে চাইলো,
— এটা কাদের বাড়ি এরীশ?
— আমাদের।
— মানেহ,
— তুমিতো এটাই চেয়েছিলে, একটা সাজানো সংসার। যেখানে সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। না থাকবে কোনো নৃ’শংসতা,মারামারি, হানাহানি, আর নাতো কোনো সিকিউরিটি । চারিদিকে তাকিয়ে দেখো এখানে কোনো গার্ড নেই , পেন্ট হাউজের মতো রহস্য নেই, অন্ধকারের ছিটেফোঁটাও নেই, ভালোকরে দেখো কত আলো!
এরীশের কথামতো আরও একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পুরো হলরুমটাকে অবলোকন করে ঈশানী। দেখতে দেখতেই নীলাক্ষী দু’টো টলমল করে ওঠে ওর, পরপরই বিনা বাক্যব্যয়ে একপ্রকার ছিঁটকে এসে ঠায় জমায় মাফিয়া বসের ইস্পাত কঠিন বুকের মাঝে, বেখেয়ালে খামচে ধরে তার শার্টের অগ্রভাগ। বুকভাঙা আর্তনাদে ফুঁপিয়ে ওঠে শব্দ করে। এরীশের শার্ট ভিজে যায়, শক্ত বুকের বাম পাশে কোমল ঠোঁটের পরশ অনুভূত হতেই দু’হাত মুঠি বদ্ধ করে নেয় হিংস্রমানব। সেসবে কোনোরূপ ভ্রুক্ষেপ না করেই উন্মাদের মতো বলতে থাকে ঈশানী,
— সত্যিই! তুমি সত্যিই আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছো? এটা আমাদের বাড়ি এরীশ? আমার সংসার? আমার ছেলেটা এবার থেকে পরিবার পাবে, একটা সুস্থ স্বাভাবিক পরিবার, থাকবে তুমি আমাদের সাথে, বলোনা?
মেয়েটার প্রবল আর্তনাদে একটুখানি কেঁপে ওঠে মাফিয়া বসের লম্বা চওড়া সুঠামদেহী অস্তিত্ব । তবুও নির্বিকার সে মানব। ঠান্ডা হৃদয়ের মৃতের মতোই নিস্প্রাণ তার দু’নয়ন।
ঈশানী অপেক্ষা করেনা প্রত্যুত্তরের, চোখে জল আর মুখে হাসির ঢেউ নিয়ে ছুটে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে ঘুমন্ত ছেলের মুখোমুখি হয়ে । পরপরই ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠে বলে,
— বাবা তাকিয়ে দেখোহ, তোমার ড্যাডি আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছে। এটা আমাদের বাড়ি! চারিদিকে কোনো গার্ড নেই, কোনো হাহাকার নেই,কোনো র’ক্ত নেই। সবকিছু শান্ত এখানে। এখন থেকে আমি, তুমি আর বাবা একসাথে থাকবো। আমরা আর বিচ্ছিন্ন নই৷এবার থেকে আমাদেরও একটা পরিবার হবে। ওই ভয়ানক পেন্ট হাউজে থাকতে হবেনা আর তোমাকে । আর ভয় নেই বাবা, আর কষ্ট নেই।
ঈশানীর কান্না বিজরিত প্রলাপে নদীর পাড় ভাঙার মতোই ভেতরের পাথুরে হৃদয়টা ভাঙতে লাগলো এরীশের, এইটুকু জীবনে মেয়েটা কত কষ্টই না পেয়েছে ওর সঙ্গে থেকে । সম্ভব হলে বোধহয় ঈশানীকে ছেড়ে দেওয়ার মতো মহৎ কাজটা এরীশ করেই ফেলতো আজ । কিন্তু ওতো শ্বাস নিতে পারবে না মেয়েটাকে ছাড়া। ম’রে যাবে একদম।
মায়ের অবিরাম ক্রন্দনে ঘুম ভেঙে যায় ইয়াশের। বড় বড় চোখ দু’টো মেলে বিস্ময় নিয়ে দেখতে থাকে তার মা’কে। মায়ের অনুভূতির সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনে যথাসম্ভব প্রয়াস চালায় সে। একপর্যায়ে তাকিয়ে থেকে থেকে জলে থইথই করে ভেসে ওঠে তার আদুরে দু’চোখ।
ছেলেকে সামলে উঠে দাঁড়ায় ঈশানী। এরীশের দিকে ঘুরে ওর বুকের পাঁজরে করতল ছোঁয়ায়। আবারও ভীতিগ্রস্ত গলায় জানতে চায়,
— এই সবকিছু সত্যি তাইনা রীশ? কোনোকিছুই আমার মতিভ্রম নয় তো?
এরীশ দু’কদম এগিয়ে দূরত্ব কমায়। সহনীয় হাতে ওর গ্রীবাদেশ চেপে ধরে, মেয়েটার ভেজা চোখের পাতায় অধর ছুঁয়িয়ে শুষে নেয় সব নোনাজল। পরপরই লম্বা ঢোক গিলে মুখের সংস্পর্শে মুখ নিয়ে উগড়ে দেয় ধারালো শীতল বাক্য,
— কাঁদবে না, ফার্স্ট এ্যান্ড লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি তোমাকে, আমার সামনে কখনোই কাদবে না তুমি।
মাফিয়া বসের নীরব হুংকারে দিগুণ তালে ফুঁপিয়ে ওঠে সরল মেয়েটা। অদ্ভুত এক সুখ সুখ ব্যথায় ভরে ওঠে তার বুক।নাক টেনে বলে,
— এই দিনগুলো স্বপ্নের মতো। যা আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি রীশ।
সত্যিই তো এরীশের মতো একটা মাফিয়া বসের জন্য নিজের স্ত্রী সন্তান নিয়ে স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করা কি এতই সহজ? নাকি নিজের অন্তস্তলের দূর্বলতার কাছে আরও একবার হেরে গেলো মাফিয়া বস? পবিত্রতার সংস্পর্শে পাপীকে ধ্বংস হতে হয়, এরীশ তো একটা পাপী, রুথলেস জানোয়ার। যার জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি শুধুই নৃশংসতার জয়গান ।তবে কি এরীশও ধ্বংস হবে?
ভাবনা গুলো অবান্তর নয়। তবে এরীশ ইউভান সেসবে তোয়াক্কা করেনা এখন আর। ওর কাছে সাকুরার চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই। না নেই!
— তোমার ইচ্ছানুয়ী গার্ডগুলো সব সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই ম্যানশনে তুমি আমি ব্যাতীত শুধু ন্যানী থাকবে দু’জন। ওরা তোমার ছেলেকে দেখাশোনা করবে। কিন্তু ম্যানশনের বাইরে গার্ড থাকবে সবসময়। এছাড়া ঘরের প্রতিটি কোনে সিকিউরিটি ক্যামেরা রয়েছে এ্যাজইউজুয়াল ওয়াশরুমেও।
কপাল কুচকে গেলো ঈশানীর । অসন্তোষ গলায় শুধালো,
— ওয়াশরুমে কেন এরীশ?
এরীশ এগিয়ে এসে ওর সরু গলাটা হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরলো ফের। হালকা চাপ প্রয়োগ করে ঈশুর কণ্ঠদেশে নাক ঘষলো উন্মাদের ন্যায় , গভীর স্বরে হিসহিসিয়ে জবাব দিলো,
— কারনটা তুমি ভালো করেই জানো।
— তুমি আমাকে ওয়াশরুমেও প্রাইভেসী দিবেনা? কেন এরীশ? আমি তোমার পুতুল নই।
— ইয়েস বেইব! ইউ আর!
মাফিয়া বসটার নিস্প্রাণ শীতল আওয়াজে যেন কতৃত্বের মহাপ্রাচীর। যা শোনা মাত্রই আসন্ন কোনো প্রলয়ের আশঙ্কায় সর্বাঙ্গ শিউরে ওঠে রমণীর। সহসা শুষ্ক একটা ঢোক গিলে তড়িঘড়ি করে মাথাটা তুলে সন্দিগ্ধ চোখে তাকালো মেয়েটা । বিপরীতে দূর্বোধ্য এক চোখের হাসিতে কিঞ্চিৎ ঠোঁট বাকালো এরীশ। নিজের অবস্থানে ফিরে গিয়ে গম্ভীর মুখ করে বললো,
—ওয়ান্না সে ইউ সামথিং ইম্পর্টেন্ট। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলার আছে তোমাকে।
এবারও কৌতুহলের দোলাচলে আঁটকে রইলো ঈশানী। ওয়েডিং ভেন্যু থেকেই শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছিল ওর, তাই সবাইকে ফেলে রেখে ছেলে আর তার মা কে নিয়ে দ্বীপ ছেড়েছিল এরীশ। এরমাঝে কি এমন ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলার আছে লোকটার?
— বেবিকে ঘুম পাড়িয়ে যতদ্রুত সম্ভব উপরের ঘরে এসো।
বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতেই যাবে ঈশানী, তন্মধ্যে বাক্যখানা উগড়ে দিয়ে শার্ট হাতড়ে বুকের কাছের কয়েকটা বোতাম খুলতে খুলতে হনহনিয়ে দোতলায় চলে গেলো মাফিয়া বস।
চারিদিকে নৈঃশব্দ্য। তমশাচ্ছন্ন করিডোরটাকে মৃত্যুপুরীর ন্যায় ভয়ানক লাগছে। ঘড়ির কাটায় টিকটিক আওয়াজ করে সময় বয়ে যাচ্ছে, তার চেয়েও ধীর গতিতে পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে এরীশের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো ঈশানী। ভেতরের আলো নেভানো। রক্তাভ ডিম লাইটের কাঁচা আলোয় অদ্ভুত ভয়ংকর লাগছে চারিপাশ। প্রথমে ঘাড় বাঁকিয়ে একটু উঁকিঝুঁকি দিয়ে দু-হাতে গাউন সামলে ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো ঈশানী। ঘরের অভ্যন্তরে পা রাখা মাত্রই কোনোকিছুর ঝাঁঝালো গন্ধে অকস্মাৎ মস্তিষ্কটা দুলে উঠলো ওর। কোনোমতে নিজেকে স্থির রেখে ঝাপসা চোখে সামনে তাকাতেই দেখলো লেদারে মোড়ানো রিভলভিং কাউচ চেয়ারটাতে পা ছড়িয়ে বসে আছে এরীশ।কোট টাই খুলে, শার্টের আস্তিন গুটিয়ে এলোমেলো ভঙ্গিমায় ঈশানীর দিকে ঝুঁকি আছে মানুষটা। একপল এরীশের আপাদমস্তক পরখ করে শুষ্ক ঢোক গিললো ঈশানী।বড্ড অসহনীয় লাগছে মূহুর্তটা।সহসা দৃষ্টি নমনীয় করে প্রশ্ন ছুড়লো মানবী,
— কি হয়েছে তোমার? এমন লাগছে কেন ? আর এই জায়গাটা….
বাকি কথা জিভেই আটকে রইলো ওর, যখন দেখলো এরীশের সামনে কফি টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শক্তিশালী মাদকের সফেদ গুঁড়ো। তার পাশেই ফেলে রাখা মাফিয়া বসের আনলিমিটেড ব্ল্যাক কার্ড।
নিস্পৃহ দৃষ্টে সবকিছু অবলোকন করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ঈশানী। বিপন্ন গলায় জানতে চাইলো,
— তুমি আবারও ড্রাগ নিয়েছো?
রমণীর রিনরিনে কণ্ঠস্বরখানি কর্ণগোচর হতেই অপ্রস্তুত ভঙ্গিমায় মাথা তুললো এরীশ, অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড়ালো,
— না নিলে ম’রে যাই।
এরীশের নির্বিকার প্রত্যুত্তর। লোকটার কথার মাঝে অদ্ভুত বেসামাল ভাব। চারিদিকের রক্তিম আলোয় মাদকের ঘোরে বুদ হয়ে থাকা এরীশকে দেখে ঈশানী একটু ভয়ই পেলো এবার। অগত্যা সামনে এগোনোর সাহস হলোনা আর। স্বীয় স্থানে স্থিতিশীল হয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে শুধালো,
— তুমি কিছু একটা বলতে চেয়েছিলে আমায়,গুরুত্বপূর্ণ কিছু।
কাউচের গায়ে মাথা এলিয়ে দিলো এরীশ।অতঃপর ঘোর লাগানো শীতল চোখে ঈশানীর আপাদমস্তক পরখ করে ছোট্ট করে বললো,
— জিজ্ঞেস করেছিলে না কেমন লাগছে তোমায়?
ঈশানী অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো একটু। মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই জবাব দিলো এরীশ,
— ইউ্য লুক ডেঞ্জারাসলি বিউটিফুল। নাও টেইক ইট অফ!
— হুহ!
— ড্রেসটা খুলে ফেলো।
ভ্রু কুঁচকে গেলো ঈশানীর। কথাটা যেন মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে ওর তেমন করেই চেয়ে রইলো বিভ্রমে। আর কোনো প্রত্যুত্তর করার প্রয়োজনবোধ করলো না মাফিয়া বস। ঝড়ের বেগে উঠে এসে এক লহমায় মেয়েটাকে পেছনে ঘুরিয়ে মুখ ডোবালো তার কমনীয় গ্রীবায়। নিমেষেই জমে গেলো রমণী। বলিষ্ঠ হাতখানা গাউনের লম্বা জিপারের সংস্পর্শে আসতেই শিওড়ে উঠলো তার সর্বাঙ্গ। এরীশের বেসামাল হাতের স্পর্শ ক্রমশ বন্য হয়ে উঠেছে। অস্থির অপ্রতিরোধ্য তার গতি।
জমে থাকা ঈশানী ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে এবার। ফলস্বরূপ মাফিয়া বসের অপ্রতিরোধ্য হাতের মাঝে কুঁকড়ে গিয়ে প্রকম্পিত স্বরে বলে উঠলো,
— তুমি অবসেসড হয়ে আছো এরীশ। এটা ভালোবাসা নয়। নিজেকে সংবরণ করো।
এরীশ কর্ণপাত করলোনা সেই নিষেধাজ্ঞায়। উল্টো মোহাচ্ছন্ন স্বরে আওড়ালো,
— ইট’স নট জাস্ট আ ফাকিং অবসেশন,ইট’স এ্যাডিকশন।আ’ম এডিক্টেড টু ইউওর আইস,ইউওর স্মেল, ইউওর বডি, ইউওর এভরিথিং। এ্যান্ড ইউ্য আর মাই ফেবরেট ড্রাগ। মি আমর!
ঈশানীকে তৎপর হওয়ার ফুরসত দিলোনা এরীশ। বাক্যকটা শেষ হতেই মেয়েটাকে তুলে নিয়ে রাখলো নরম বিছানায়।কেবল ধূসর মেঝেতে অবলীলায় পড়ে রইলো দু’টো আকর্ষনীয় বিয়ের পোশাক।
ঈশানীকে বিছানায় ফেলে এরীশ এগিয়ে এসে শার্টের বোতামে হাত রাখতেই আরেকদফা ঝটকা খেলো নীলাম্বরী। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে নিজেকে আড়াল করলো সফেদ কম্ফোর্টারের ভাজে। এরীশ একটু বিভ্রান্ত চোখে তাকালো। কম্ফোর্টার সরিয়ে ফের ঈশানীর কাছাকাছি আসতেই সিলিং এর দিকে আঙুল তাক করে কিছু একটা ইশারা করলো মেয়েটা। শঙ্কিত গলায় আওড়ালো,
— এখানে একটা আয়না, স..সিলিং মিরর!
ওর কথা শুনে এরীশের অধর কোলে জাগ্রত হলো নৈঃশব্দ্যিক বাঁকা হাসির লেশ। কোনোরূপ দ্বিধান্বিত না হয়ে ফের ঈশানীতে মত্ত হলো সে। একটা গভীর বন্য চুম্বন শেষে বর্ষার অবিশ্রান্ত বারিধারার মতো ধীরে ধীরে অধর গলিয়ে নেমে এলো মোমরাঙা গ্রীবায় অতঃপর আরও গভীর থেকে গভীরে। ভালোবাসার চূড়ান্ত মূহুর্তে বেসামাল, বেলাগাম, অস্থির মানুষটার বক্ষমাঝে কলমিলতার ন্যায় গুটিয়ে গিয়ে আরও একবার মুখ ফুটেছিল রমণীর,
— রী…রীশ!এটা ঠিক নয়।
— আমার স্পর্শগুলো পীড়াদায়ক তুমি আগেই জানতে।
লজ্জায় আরক্ত ঈশানী এবার ভেজা চোখ তুলে ইশারা করলো সিলিং মিররটার দিকে। এরীশ তোয়াক্কা করলোনা সেসব। উল্টো প্রতিটি কতৃত্বে ভরা অধিকারী স্পর্শে মিষ্টি যন্ত্রণার আড়ম্বর ছড়িয়ে দিলো প্রিয়তমার শরীরের খাঁজে । গভীর মাদকীয় স্বরে জবাব দিলো,
— মাই হাউজ, মাই বেড, মাই ওয়াইফ! হোয়াই নট?
বিয়ের আয়োজনের সকল আনুষ্ঠানিকতা চুকিয়ে,অবশেষে ভোর পাঁচটার দিকে পেন্টহাউজে ফিরেছে দ্বায়িত্বশীল মহামানব তুষার জাওয়াদ। যেহেতু নববিবাহিত দম্পতি তাই ফ্লোরাও সাথে ফিরেছে ওর। ছিমছাম গড়নের শীর্ণকায় মেয়েটাকে এতো ভারী ব্রাইডাল গাউন সামলাতে বেগ পোহাতে হচ্ছে ভীষণ। তারউপর প্যারাডাইস গেইট থেকে সোজা পেইন্ট হাউজের লাউঞ্জ অবধি হেঁটে এসেছে এই অবস্থায়। একটি বারের জন্যও পেছনে তাকায়নি তুষার। বিনাবাক্যে হনহনিয়ে এগিয়ে গিয়েছে নিজের মতো। তুষারের এহেন নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি একটুও কি কষ্ট দেয়নি ফ্লোরাকে? দিয়েছিল বৈকি।
লাউঞ্জে আসা মাত্রই মেয়েটা দাঁড়ালো না আর এক মূহুর্ত জলদি পায়ে এগিয়ে গেলো নিজের ঘরে। তবে দরজার আগল ঠেলে সরাতেই বাঁধসাধে তুষার, সামান্য ঘাড় ফিরিয়ে নিরুত্তাপ স্বরে আদেশ করে,
— এদিকে এসো।
ফ্লোরা বিস্মিত হয়,তবুও প্রশ্ন করেনা বিপরীতে। চুপচাপ ভলিউম গাউনটাকে টেনে তুলে এগিয়ে আসে তুষারের নিকট। কাছে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন চোখে তাকাতেই তুষার বলে,
— এখানে নয় উপরে চলো।
— ক..কেন?
ফ্লোরার কণ্ঠে অজানা আড়ষ্টতা। নিজের স্যুটটাকে ইশারা করে খুব সাবলীল ভাবেই উত্তর দিলো তুষার,
— এই স্যুটটা দেখছো?ব্র্যান্ড নিউ।
তারপর পায়ের দিকে ইশারা করে বললো,
— জুতোটাও নতুন। এগুলো গুছিয়ে রাখতে হবে, আপাতত এটাই কারণ।
— আপনার জুতো আপনি গুছিয়ে রাখুন,না পারলে বিয়ে করে বউকে বলুন, আমাকে কেন জ্বালিয়ে মা”রছেন?
মুখটা ঝামটি দিয়ে কথাটা বলতেই যাচ্ছিল ফ্লোরা, তখনই মনে পরে গেলো এই যন্ত্রমানবের বউটা আসলে ও নিজেই। তাই কথা বাড়িয়ে বাক্য খরচ করলোনা আর, চুপচাপ উঠতে লাগলো সিঁড়ি ডিঙিয়ে। এতোভারি বিয়ের গাউনটাকে সিঁড়ি ভেঙে বয়ে নিয়ে যেতে আরেকদফা নাজেহাল হয়ে যাচ্ছে রুশরমণী। এক পা এগোচ্ছে তো তিন পা পেছাচ্ছে।তারউপর পেছনের ট্রেইল নিয়ে টানাটানি তো আছে।
আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬১
এমতাবস্থায় নিজের কাজে মগ্ন ফ্লোরা হঠাৎ ই টের পেলো ওকে শূন্যে ভাসিয়ে উপরে নিয়ে যাচ্ছে কেউ। বিভ্রম কেটে যেতেই হকচকিয়ে উঠলো মেয়েটা।নিজের সুরক্ষায় তড়িৎ হাতে আঁকড়ে ধরলো বিপরীত পক্ষের চওড়া কাঁধ । একটু সময় নিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই বুঝতে পারলো ও আসলে তুষারের কোলে। এতো ভারি গাউন সমেত ফ্লোরাকে বাহুবন্ধী করে রোবটের মতোই নির্বিগ্নে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যাচ্ছে সে যন্ত্রমানব।

Api eei upponnah er part ase na kno
Tumi ki r continue korbe naa api
er porer part gula koi apu