Home আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৭

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৭

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৭
suraiya rafa

রাস্তা ঘাট বরফে আচ্ছন্ন, তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি। শহর জুড়ে ক্রীসমাসের আমেজ তখনও যায়নি, এরই মাঝে চলে এসেছে নিউ ইয়ার ইভে। কনকনে বৈরী আবহাওয়ার মাঝেও মানুষের আনন্দ উল্লাসের এইটুকু কমতি নেই যেন , সন্ধ্যা পেরোতেই লাল,নীল ফেয়ারী লাইট আর সন্ধ্যাবাতীর হলুদাভ রোশনাইয়ে ঝলমল করে উঠেছে গোটা মস্কো শহর। মস্কো থেকে কয়েক ক্রোস দূরে স্প্যারো হিলস নামক পাহাড়ের চূড়ায় নতুন বছর উপলক্ষে কয়েকঘন্টা ব্যাপী ফায়ার ওয়ার্কের আয়োজন করা হয়েছে, বছরের সবচেয়ে বড় আর জমকালো ফায়ারওয়ার্কস আজ। দিনের আলো নিভে যেতেই লোকজন দলে দলে গাড়ি নিয়ে ছুটছে সেদিকেই ।

এদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড মাফিয়াদের ক্যাসিনো ক্লাবগুলোও উৎসবে লোকারণ্য। জমকালো সাজসজ্জা আর সুন্দরী স্ল্যাটদের উপস্থিতিতে মৌমাছির মতো ছুটে আসছে দেশ-বিদেশের নামীদামী স্মা’গলাররা। আউটডোরের বিশাল হলরুমে করা হয়েছে পার্টির আয়োজন। সেখানে উচ্চস্বরে গান বাজনা,হইহুল্লোর, ম’দ-জু’য়া আর নগ্ন মেয়েদের সমাহার। অর্ধনগ্ন স্ল্যাটগুলো আবেদনময়ী ভঙ্গিতে পোল ড্যান্স প্রদর্শন করছে, তাদেরকে একযোগে হইরই করে বাহবা দিচ্ছে সকলে। পার্টিতে উপস্থিত মাফিয়া সদস্যরা মুখ হা করে উপভোগ করছে সেই বিকৃত মনোরঞ্জন । কেউ বা মদ নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে বিভোর,কেউ আবার ডুবে আছে জু”য়ার আসরে, এমনই উৎসবমুখর মাহেন্দ্রক্ষণে সকল সুন্দরীদের আকর্ষন কেড়ে নিলো এক আগন্তুক। ব্ল্যাক ভেলবেট ট্রাঞ্চকোট পরিহিত সুঠামদেহী লোকটার নাক অবধি হুডি টেনে নামানো, সহসা মুখাবয়ব স্পষ্ট নয়। ব্লেডের মতো তীক্ষ্ণ পুরুষালী চোয়ালে গাম্ভীর্যের ছাপ সুস্পষ্ট,আশপাশ থেকে দু’একজন লক্ষ্য করলেও লোকটার প্রখর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ভেতরের হলরুমে আবদ্ধ।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

গম্ভীর পদচারণায় সেদিকে এগিয়ে গেলে হাওয়ায় ভেসে লোকটার পথরোধ করে দাঁড়ালো দুজন সুন্দরী রমণী। মেয়েগুলো যেমন রুপবতী তেমনই কৌশলী, আবেদনময়ী ভঙ্গিতে হেলেদুলে গায়ে পরে খদ্দের যোগাড়ের সুক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় ভীষন পারদর্শী তারা।

মেয়েদুটোর মধ্যে একজনের দাপট খুব বেশী। দ্রীপ্ত চাহনিতে অহং ঝরে ঝরে পড়ছে তার। কথার ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে ও এখানকার প্রস্টিউটদের মধ্যে বেশ প্রতাপশালী আর অভিজ্ঞ। ওদিকে মেয়ে দুটোর অক্লান্ত তৎপরতায় ঠোঁট বাঁকালো আগন্তুক, এদিকওদিক সুক্ষ্ম দৃষ্টিপাত করে দাপুটে চেহারার মেয়েটিকে আঙুলের ইশারায় কাছে টেনে আনলো সে । মেয়েটা গদোগদো হেসে এগিয়ে আসতেই, কানের কাছে মুখ বাড়িয়ে কিছু একটা জানতে চাইলো সে ।
সুদর্শন পুরুষটিকে একান্তে কাছে পেতে মুখিয়ে আছে রমণী। হাতের পৃষ্ঠে ফুলে ওঠা ওই পুরুষালি শিরা-উপশিরা গুলো টানছে ওকে ভীষণ। ইস্পাত কঠিন সুডৌল বক্ষদেশ আর তার মাঝের তীক্ষ্ণ গভীর ক্ষতটা যেন অনিশ্চিত এক চৌম্বকীয় আকর্ষনে ক্রমশ উন্মাদ করে দিচ্ছে রমণীকে । সেই সাথে ঢাল হয়ে মিশেছে পুরুষালি ক্লোনের এক অকৃত্রিম মাস্কি সুবাস। রমণীর আর বুঝতে বাকি থাকে না, এ নিশ্চয়ই কোনো আলফা মেইল। নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই এখানে আগমন তার।
সহসা কপটায় গা ভাসালো রমণী। প্রলোভনময়ী এক গা জ্বালানো হাসি ফেরত দিয়ে বললো,

—যদি বলি আমি কি পাবো?
—যা চাইবে তাই,
ঝড়ের বেগে ভেসে এলো প্রত্যুত্তর।
মেয়েটা বৃদ্ধাঙ্গুলের নখ কামড়ে ধরে হেলেদুলে পুনরায় পরখ করলো লোকটাকে। পাথরের মূর্তির ন্যায় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আলফাকে বেশ মনে ধরেছে তার। যেমন পয়সা তেমন সুদর্শন। নিষিদ্ধ এক চাহিদা ক্রমশ গ্রাস করেছে মনমস্তিষ্ক, সাক্ষাৎ এর কয়েক মূহুর্ত যেতে না যেতেই আগন্তুকের প্রতিটি আচারণে প্রভাবিত হয়ে উঠেছে অস্তিত্ব তার। সহসা কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ব্যক্ত করলো স্বীয় চাহিদা,

— যদি বলি তোমাকে চাই! টাকা পয়সা কিচ্ছু না, স্রেফ তোমায়!
—চাইতেই পারো, এজ ইউওর উইশ!
ওষ্ঠকোণ ধীরে ধীরে বেঁকে গেলো আগন্তুকের,
— দেন গিফ মি ইউওর সেলফ,
এগিয়ে এসে লোকটার গলায় ঝুলে পড়লো রমণী। সে গ্রীবা নোয়ালো, মেয়েটার কানের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ালো,

— রাইট সেন্সে আমাকে সহ্য করার সাধ্য তোমার নেই, আ’ম আ এনিমেল!
— তো মি. এনিমেল, আপনাকে সহ্য করার জন্য কি করতে হবে আমায়?
মেয়েটা কৌশলে তার ট্রাঞ্চকোট ভেদ করে বুকের উপর হাত রাখতে চাইলে, ব্যগ্র থাবায় সেই হাত রুখে দিলো আগন্তুক।হঠাৎ বিগ্নতায় প্রশ্ন চোখে তাকালো রমণী, বিপরীতে ধ্বনিত হলো তার গভীর হাস্কিস্বর,
— উহু, আলফা অলওয়েজ ফার্স্ট।
মেকআপের প্রলেপে ঢাকা রমণীর লোলুপ চেহারা ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করলো নিমেষেই, হতাশা আর বিরক্তির মিশেলে তপ্তশ্বাস ফেলে প্রত্যুত্তর করলো সে,
— ডেনিয়েন আছে, কিন্তু এই মূহুর্তে সে কোনোরূপ বাক্যালাপ করবে বলে মনে হয়না,একটু বাদেই ফ্লাইট,আজ রাতের মধ্যে রাশিয়া ছাড়বে সে।

— আছে যে সেটা আমিও জানি, কোথায় আছে তাই বলো!
দাঁতে দাঁত পিষে ধমকের সুরে বাক্য ছুড়লো আগন্তুক, প্রত্যুত্তরে মেয়েটা আঙুল উঁচিয়ে সিলিং এর দিকে ইশারা করলো, নিস্তেজ গলায় বললো,
— রুফটপে একটা হিডেন রুম আছে। আপাতত ওখানেই রেস্ট নিচ্ছে ডেনিয়েল, সন্ধ্যা পেরোলেই হেলিকপ্টারে করে ব্ল্যাক সি পৌছাবে সে, সেখান থেকে ক্রুজ শীপে করে সমুদ্রপথে একেবারে সীমান্তের বাইরে। তবে এই মূহুর্তে ওর ঘরে সিকিউরিটি আছে , অনুমতি ব্যাতিত প্রবেশ একদম নিষেধ।
বিনিময়ে প্রলুব্ধ স্বরে হাসলো লোকটা। নৈঃশব্দ্যিক সেই ক্রুর হাসিতে বুকের ভেতরটা ছলকে উঠলো রমণীর। কোনোরূপ বাক্যব্যয় না করেই লোকটা হনহন করে স্থান ত্যাগ করলে পিছু ডেকে ওঠে সে,

— আ…আমার পাওনাটা!
থমকে গেলো আগন্তুক,অসহনীয় হৈ-হুল্লোড় আর লাউড মিউজিকের মাঝেই একফালি নিয়ন আলোক শিখা আঁচড়ে পড়লো তার আংশিক আবৃত মুখের উপর। যার জের ধরে এক অশুভ অভিলাসের মুখোমুখি হলো রমণী, ঠিক তখনই ঠোঁট নাড়িয়ে বিড়বিড়ালো লোকটা,

— পাওনা তোমার পেছনেই অপেক্ষা করছে। জাস্ট এনজয় হাওএভার ইউ্য ওয়ান্ট!
তার কথামতো পেছনে ঘাড় বাঁকালো রমণী, তৎক্ষনাৎ একটা ধবধবে শ্বেতকায় বিশালদেহী নেকড়ে ছুটে এসে ঝাপিয়ে পড়লো ওর উপর।কোনোরূপ সময় ব্যায় না করেই হিংস্র জানোয়ারটা চোখের পলকে নিজের ভয়ংকর শ্বদন্ত আর ধারালো নখড় থাবায় মনুষ্য শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করে আঁচড়ে ফেললো মেঝেতে।
নেকড়েটার ঘোঁ ঘোঁ আওয়াজের তীব্রতায় হঠাৎ থেমে গিয়েছে হট্টগোল, শ্বেত পাথরের মেঝেটা ইতিমধ্যে র’ক্তে প্লাবিত, ধারেকাছের দু’একজনের মুখেও বোধহয় ছিটকে পড়েছে সেই উষ্ণ লালচে তরল। ধীরে ধীরে পার্টিতে উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষ হতবিহ্বল হয়ে ঘু্রে তাকালো সেদিকে, পাল্টে গেলো তাদের অভিব্যক্তি, পরপরই চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্যে মুখ থেকে র’ক্ত সরে গেলো সবার।
একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মূহুর্তেই টুকরো টুকরো করে মাংসপিণ্ডের মতো ভক্ষণ করার সেই নির্মম দৃশ্য দেখা মাত্রই ভয়ে আত্ম কেঁপে উঠলো তাদের , সীমা ছাড়ালো আতঙ্ক, যে যেভাবে পারলো প্রাণপনে ছুটতে লাগলো দিগ্বিদিক।

রুফটপে সুদক্ষ সিকিউরিটিদের সারিবদ্ধ অবস্থান। সকলে কঠোর নিরীক্ষণে পাহারা দিচ্ছে শয়তান টাকে। সেই একঝাঁক সিকিউরিটিকে পরাস্ত করার জন্যই ট্রাঞ্চকোট পরিহিত আগন্তুকের পেছন ফুঁড়ে বেড়িয়ে এলো অগণিত সশস্ত্র গার্ড। demon knight দের অতর্কিত আক্রমণের কাছে ধরাসায়ী হতে বাধ্য হলো ড্রাগন হান্টার গ্রুপের নির্ভীক গার্ডেরা। ডেনিয়েলের সিকিউরিটি টীম দূর্বল হতেই, সুযোগ লুফে নিলো বিপরীত পক্ষ। খুব বেশি জটিলতা ছাড়াই পাইথন প্যারাডাইসের স্নাইপার গুলো হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো হিডেন কক্ষের অভ্যন্তরে। অতঃপর নিঃশব্দ এক আতঙ্ক খেলে গেলো সমগ্র কক্ষজুড়ে। মুখের উপর এতোগুলা বন্দুকের নল দেখা সত্ত্বেও উদভ্রান্তের মতো খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে উঠলো ডেনিয়েল। মুখ বাকিয়ে একটা প্রশ্নই করলো শুধু,

— কে পাঠিয়েছে?
উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন পড়লো না কারোরই, তার আগেই অশুভ প্রলয়ের মতো হাওয়ায় ভেসে ভেতরে পা রাখলো আগন্তুক, সামনে এগুতেই তার পা ঘেঁষে দাঁড়ালো বিশালদেহী এক শ্বেতকায় নেকড়ে। নেকড়েটার লকলকে জিভ বেয়ে চুয়িয়ে চুয়িয়ে র”ক্ত ঝরছে, খানিক আগেই যে সে তাজা মাংস দিয়ে ভুঁড়ি ভোজ করে এসেছে তা আর বোঝার অপেক্ষা রাখেনা।
ডেনিয়েল তখনও নিজের বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি অব্যহত রেখেছিল।কিন্তু যখন সেই মানব নিজের মাথা থেকে হুডি তুলে সরালো, সঙ্গে সঙ্গে হাত থেকে ব’ন্দুক ফস্কে গেলো তার, ভুত দেখার মতো চমকে উঠে পিছিয়ে গেলো কয়েক পা। নিয়ন্ত্রণহীন পদচ্ছাপে পেছাতে পেছাতেই বিড়বিড় করে আওড়ালো,

— রীশষ্কা!
বুটের আওয়াজ প্রগাঢ় হলো, এরীশ শক্ত পায়ে সামনে এগিয়ে এলে, ডেনিয়েল চট করেই নিজের আসনে বসে পড়লো। ভেতরের অদ্ভুতুড়ে আশঙ্কা দমিয়ে অভিব্যক্তিতে ছদ্ম গাম্ভীর্য টানলো সে, উড়ুর উপর পা ফেলে হেয়ালির স্বরে ছুড়ে দিলো বাক্যধ্বনি,
— এরীশ ইউভানের দূর্বলতা দেখার ইচ্ছে আমার বহুবছরের, তোমাকে এভাবে বিধ্ব’স্ত দেখে এইমূহুর্তে বেশ আনন্দ পাচ্ছি।

— অতি শীঘ্রই তোকে আনন্দের জোয়ারে ভাসাবো আমি ডেনিয়েল!
চোয়ালের পেশী শক্ত হয়ে গেলো এরীশের। ধূসর নেত্রে আগুনঝরা উত্তাপ। মাফিয়া বসের অশনি হুংকারে খুব একটা ভাবান্তর দেখা গেলো না ডেনিয়েলের মাঝে। সে নিরুত্তাপ স্বরে জবাব দিলো,
— বাই এনি চান্স তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছো? আমি এখনো ওতো বোকা নই রীশস্কা! মৃ’ত্যু নিশ্চিত যেনেও সিংহের গুহায় ঢুকে পড়বো, তাও আবার স্বয়ং সিংহীকে বধ করার উদ্দেশ্যে। আ’ম নট দ্যাট ক্রেজি ডিউড!
কথাটা বলেই ভ্রুকুটি করলো সে,কিছু একটা ভেবে ফের কপট হাসির ঢেউ খেলে গেলো তার ঠোঁটের আগায়। ভারী মজা পেয়েছে এমন একটা ভাব করে বললো,

— শেষমেশ ব্লাডিবিস্ট ও কিনা কোনো মেয়ের কাছে হেরে গেলো? আফসোস!
তোমার প্রিন্সেসকে দেখার আকাশ সমান ইচ্ছে আমার রীশষ্কা । মেয়েটা নিশ্চয়ই কোনো জাদু জানে, নয়তো তোমার মতো একটা হার্টলেসকে এতোটা কাবু করে ফেলা অসম্ভব। ব্লু আইড রাইট? তা বাঁচবে তো তোমার সেই অপ্সরী নীল নয়না?
কথা শেষ হতে না হতেই ছোঁ মে’রে ওর কলারটা চেপে ধরলো এরীশ। অতর্কিতে ঝুঁকে হাঁটু দাবালো ওর বুকের উপর ঠিক হৃদপিণ্ড বরাবর, সেখানটায় তীব্র চাপ প্রয়োগ করে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলো,
— মাইন্ড ইউওর ল্যাঙ্গুয়েজ ডেনিয়েল হ্যারিসন! তোর মুখে আমি আমার স্ত্রী সম্মন্ধে আর একটা বাক্যও শুনতে চাই না। শী ইজ মাইন! অল মাইন!

— ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণায় এভাবে কাতরাচ্ছো মাফিয়া বস? ভুলে গেলে সেদিনের কথা? যেদিন আমার ভালোবাসাকে নিয়ে উপহাস করেছিলে? বুলেটের আ’ঘাতে আমার বেবিগার্লটাকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিলে। ওর সেই দিশেহারা চিৎকার এখনো আমার কানে বাজে। কষ্ট হয় ভীষন, এই যে এখানে।
কথা বলতে বলতেই তর্জণী দিয়ে বুকের বাম পাশটাকে পয়েন্ট করলো ডেনিয়েল। পরক্ষনেই তীব্র ক্ষোভ নিয়ে আওড়ালো,
—এবার তোমার পালা এসেছে, আমিতো মজা দেখবোই।
— কি চাই বল?
— তোমার রাজত্ব, তোমার রাণী তোমার সবকিছু !
এরীশের কব্জাবন্দী থাকা সত্ত্বেও কদর্য গলায় খেঁকিয়ে উঠলো ডেনিয়েল। উদভ্রান্ত এরীশের মস্তিষ্কটা প্রতিশোধের স্পৃহায় দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো এবার ।ক্রোধের তোড়ে শরীরের প্রতিটি র’ক্ত কনিকা ফুটতে লাগলো টগবগিয়ে, আর সময় নষ্ট করলো না সে, পরপর কয়েকদফা মুষ্টাঘাতে র’ক্তা’ক্ত করে ফেললো শয়তানটার নাসারন্ধ্র। মা”রতে মা”রতে ওকে দূর্বল বানিয়ে ফেলে উঠে দাঁড়ালো এরীশ। রিভলবারটা লোড করে কপাল বরাবর তাক করে বরফের মতো শীতল আওয়াজে জিজ্ঞেস করলো,

— সাইকোটা কে?
এরীশের প্রশ্নের মাঝেই একদফা র”ক্ত বমি করে ফেললো ডেনিয়েল। বাম হাতের পৃষ্ঠে মুখটা মুছে চোখ তুললো ধীরে ধীরে, অতঃপর হাসতে হাসতে জবাব দিলো,
— আমাকে জিজ্ঞেস করে কোনো লাভ হবে না এরীশ ইউভান। কারণ ও তোমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। লোকে ওকে সুইট ডেমোন বলে, সুইট ডেমোন মানে বোঝো নিশ্চয়ই?
কথা শেষ হতেই জোরালো এক পদাঘাত আঁচড়ে পড়লো ডেনিয়েলের বুকের উপর, সঙ্গে সঙ্গে মেঝের মুখ থুবড়ে পড়লো সে, পরপর আরও কয়েকটা, শেষমেশ মাফিয়া বসের শক্ত বুটটা স্থির হলো তার পিঠের অগ্রভাগে।
যার দরুন পাতলা ত্বকের আবরণ ছিড়েখুঁড়ে কলিজা অবধি পৌঁছে গেছে শক্তি তার। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে ডেনিয়েলের , র’ক্ত জমেছে চোখের কোলে, সেসবে ভ্রুক্ষেপ করলো না এরীশ, শরীরের সমস্ত শক্তি ওর পিঠের উপর ছেড়ে একটু ঝুঁকে হাঁটুতে কনুই ঠেকালো সে, তারপর ধীরে ধীরে বললো,

— এরীশ ইউভান দিকভ্রান্ত হয়ে তোর কাছে সাহায্য চাইতে আসবে এটাই ভেবেছিলে তাইনা? অজ্ঞাত সাইকোর পরিচয় জানার জন্য তোকে মাথায় তুলে নাচাবো, সেটাই আশা করেছিলি? তুই বোধ হয় ভুলে গিয়েছিস আ’ম দ্যা মাফিয়া বস! লিডার অব পাইথন প্যারাডাইস! যদি ম’রিও নিজের জিত নিশ্চিত করে তবেই ম’রবো, তার আগে নয়।
কথাটা শেষ করেই ডেনিয়েলের একটা হাত আচানক মুচড়ে ধরলো সে । শরীরের ভেতর থেকে ভেসে আসা হাড় ভাঙার মটমট আওয়াজে শরীর শিউরে উঠলো উপস্থিত সকলে। সেই সাথে কানে বাজলো ডেনিয়েলের ঘর কাঁপানো প্রকান্ড আতর্নাদ । চিৎকারের উপর আরেকদফা আঘাত হানলো এরীশ, পেছনে ঘাড় বাঁকিয়ে চোখের ইশারায় ডেকে উঠলো বোজোকে,

— চু চু কাম হিয়ার!
নাদুসনুদুস শরীরটাকে হেলিয়েদুলিয়ে এগিয়ে এলো বোজো। সঙ্গে সঙ্গে ডেনিয়েলের উদ্দেশ্য বাক্য ছুড়লো মাফিয়া বস ,
— দ্রুত বল, ওর ব্যবহারকৃত কোন কোন বস্তু আছে এই ঘরে।
কথা বলার অবস্থাতে নেই ডেনিয়েল। রুহু তার কন্ঠায় আঁটকে আছে, সেই অবস্থাতেই ওর গ্রীবাদেশ খামচে ধরে গর্জে উঠলো এরীশ,
— কামঅঅঅন! টেল মি ফাস্ট !
ডেনিয়েলের প্রসস্ত শরীরটা কেঁপে ওঠে যন্ত্রণায়, কয়েকদফা কেশে উঠে ধড়ফড় করতে করতে সে আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিলো কিছু একটা, সেই ইশারা অনুসরণ করে এরীশ তাকাতেই দেখলো কফি টেবিলের উপর একটা আধখাওয়া ওয়াইনের গ্লাস।

— তারমানে বাস্টার্ডটা এতোক্ষণ এখানেই ছিল!
স্বগোতক্তিতে কথাটা বলে প্রবল আক্রোশে ডেনিয়েলের চুলের মুঠি খামচে ধরে সটানে ওর ঘাড়টাকে ঘুরিয়ে ফেললো এরীশ। র”ক্তেভেজা মুখটাকে পরখ করে দাঁতেদাঁত পিষে বললো,
— কিছু তো একটা কারসাজি করেছিস তোরা। বাট ইউ্য নো হোয়াট? এই প্ল্যান কোনোদিনও সাকসেসফুল হবেনা।
ব্যথাক্লিষ্ট ওষ্ঠজুগল অচিরেই প্রসারিত হয় ডেনিয়েলের,অস্পষ্ট ব্যথাতুর আওয়াজে গোঁ গোঁ করে বলে,
— ও তোমার এককাঠি উপরে মাফিয়া বস। শুধু দেখতে থাকো।
— ডোন্ট ওয়ারী, আই মাস্ট সি ইট!
বিপরীতে মাফিয়া বসের কণ্ঠ ভেদিয়ে উগড়ে আসে হিমশীতল বাক্যধ্বনি। আর তারপর, অতর্কিত গু”লির বর্ষণ। চোখের পলকে মস্তিষ্কটা ঝাঁঝরা হয়ে যায় ডেনিয়েলের। ড্রাগন হান্টার গ্রুপের গড ফাদার দ্যা গ্রেট ডেনিয়েল হ্যারিসনের কলুষিত অস্তিত্বের ইতি ঘটে সেখানেই , নিভে যায় তার আয়ুষ্কাল। অথচ কক্ষের প্রতিটি দেওয়াল যেন তার হাহাকারের সঙ্গী। আঠার মতো লেপ্টে থাকা ছি’ন্নভি’ন্ন গলিত মস্তক, ছিটকে পড়া র”ক্ত আর নিথর দেহাবশেষ সবকিছুই যেন নীরব সাক্ষী হলো তার অন্তিম পরিনতির।

ডেনিয়েলের অধ্যায় শেষ হলে এরীশ এগিয়ে গিয়ে ওয়াইনের গ্লাসটা স্পর্শ করলো, তারপর হাতের ইশারায় বোজোকে কাছে ঢেকে নিরুত্তাপ স্বরে আদেশ করলো,
— স্মেল ইট বোজো!
বোজো উল্টে পাল্টে ঘ্রান শুঁকলো গ্লাসটার। তারপর দৃষ্টি তুলে অবলার মতো চাইলো মালিকের পানে। চোখে তার অজানা বিস্ময়। এরীশ বুঝলো সেই চাহনি, যার দরুন ওর লোমশ শরীরে আঙুল বুলাতে বুলাতে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
— ইউ্য নো হোয়াট, আলফা অলওয়েজ স্ট্যান্ড বাই হিজ ওয়েম্যান। বাট আমি ততক্ষণ সাকুরার সামনে যাবোনা, যতক্ষন না এই বর্বরতার প্রতিশোধ নিতে পারছি। ওর প্রতিটি আর্তনাদের মূল্য চুকাবো আমি, ঠিক এইভাবে।
বাক্যটুকু শেষ হতেই নৈঃশব্দ্যিক চোখের চাহনিতে ডেনিয়েলের বিধ্বস্ত শরীরটাকে ইশারা করলো এরীশ।

অমানিশার আধারে ডুবে আছে ধরণী। পথঘাট বরফে আবৃত। নিস্তব্ধ নীরবতার মাঝেই অদূর থেকে ভেসে আসা নিশাচরের ভয়াল গর্জনে ক্রমশ শিউরে উঠছে প্রকৃতি। গা ছমছমে আবহ, আর রাতজাগা পাখির কদর্য কলতান জানান দিয়ে যায় অশুভ কোনো প্রলয়ের। এই নিকষ নিশীথে শহরের চাকচিক্য পেড়িয়ে দা’নবীয় নেকড়েটার তীক্ষ্ণ নখড় পদযুগল এসে থমকেছে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে,যেখানে এক ধূর্ত প্রিন্সের বসবাস ছিল। আন্ডারগ্রাউন্ডের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। নিজেকে সে প্রিন্স ভাবলেও মূলত তার পরিচয় ছিল ড্রাগ ডিলার হিসেবে। দ্যা গ্রেট টমেটো প্রিন্স এ্যালেক্সান্দ্রেয়।

এ্যালেক্স মা”রা গিয়েছে আজ দের বছর প্রায়, তারপর থেকেই এই স্থান পরিত্যাক্ত। এ্যালেক্স এর কোনো উত্তরসূরী না থাকায় ড্রাগ সাপ্লাইও পুরোপুরি বন্ধ। চোখের সামনে দানবের মতো দাঁড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত টমেটো ফ্যাক্টরীর দিকে তাকিয়ে তপ্তশ্বাস ফেললো এরীশ। পেছনে তার হাজার হাজার সশস্ত্র মাফিয়া গার্ড, প্রত্যেকেই ব”ন্দুক তাক করে আছে সেদিকে। কবরের মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবনটিকে দেখা মাত্র যে কারোর হৃদয় ছলকে উঠবে,এখানে মানুষ থাকা অসম্ভব! কিন্তু বোজো কে তো অবিশ্বাস করার অপশন নেই, কারণ সে বিশ্বস্ত। সহসা, ঘাড় বাঁকিয়ে বোজোর দিকে দৃষ্টিপাত করলো এরীশ। ঠান্ডা গলায় আওড়ালো,

— আর ইউ সিওর?
বোজো কি বুঝলো কে জানে? প্রত্যুত্তরে গলা উঁচিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে ভয়াল স্বরে হাউলিং করে উঠলো সে। সেদিকে চেয়ে দৃষ্টি জ্বলে উঠলো মাফিয়া বসের, তৎক্ষনাৎ দু’হাতের সাহায্যে গার্ডদের ইশারা করে ছুড়লো কঠোর আদেশ,
— ফায়য়য়াররর!
বন্দুক ধারী স্নাইপার গুলো নিজস্ব অবস্থান নিয়ে ট্রিগার টানার সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যক্ত ভবন থেকে একঝাঁক কালো কুচকুচে বাঁদুড় উড়ে এসে আ’ক্র’মন করলো তাদের উপর, পরপরই ভবনের আনাচে কানাচে থেকে বেড়ি এলো অজস্র ধনুকধারী আদিবাসীর দল। তারা জিহ্বা নাড়িয়ে উলুধ্বনির মতো অদ্ভুত শব্দ করে জাগিয়ে তুললো সকলকে। পরপরই শুরু হলো দু’পক্ষের অতর্কিত সংঘর্ষ আর ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ।

সবকিছুর মাঝেই ঝরের বেগে ভেতরে চলে গেলো এরীশ। বোজো ও অনুসরণ করলো তার মনিবকে। ফ্যাক্টরীর ভেতরে শশ্মানের নিরবতা, কোথাও আলোক শিখা নেই, নেই কোনো পথের দিশা। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভারিক্কি যন্ত্রের বহর।ধূলোময়লা আর ড্রাগের ঝাঁঝালো গন্ধে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। তিমিরে ঢাকা স্যাতস্যতে কক্ষটাকে সুচারু চোখে পরখ করতে লাগলো এরীশ। পথ দর্শানোর উদ্দেশ্যে হাতে থাকা লাইটারটা জ্বালাতেই যাবে, তখনই হটাৎ উদভ্রান্তের মতো ভোঁ ভোঁ করে উল্টো দিকে দৌড় দিলো বোজো। সন্দেহ প্রগাঢ় হলো এরীশের। সহসা জলদি পায়ে অনুসরণ করতে লাগলো জন্তুটাকে। তাড়াহুড়ো অন্ধকারের মাঝে ছুটতে গিয়ে বেশ কয়োকবার হোঁচট ও খেলো সে, মাকড়সার ধূসর জালে জড়িয়ে গেলো শরীর। সবকিছু ছাপিয়ে এরীশ যখন বোজোর পাশে এসে দাঁড়ালো, তখন লক্ষ্য করলো এটা একটা বেজমেন্ট।এমন ধ্বংসস্তূপের নিচে এতোটা গভীরে যে বিশাল এক বেজমেন্ট থাকতে পারে সেটা ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করেনি এরীশ, তবে ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে শিকার এখানেই আছে।

ঘরের এককোণে কারাগারের মতোই টিমটিমিয়ে জ্বলছে লম্বাটে কাঠের মশাল। চারিদিক ঘুরেফিরে সেই নিঃস্ব আলোক শিখাটুকু চোখে পড়তেই কৌতুহলী চেহারা বদলে পাথর কঠিন অভিব্যক্তি ধারণ করলো মাফিয়া বস।
মশালের নিচে ছোট্ট এক্সিকিউটিভ ডেস্ক, যার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ইলেকট্রনিক বর্তনী,মনিটর, ল্যাপটপ, ওয়াটকি সহ আরও কিছু অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস। তার মাঝেই রিভলভিং চেয়ারের উপর পা তুলে বসে একা একাই দাবা খেলছে কেউ একজন। নিজেই একবার সাদা গুটি চালছে, আবার হাত ঘুরিয়ে কালো গুটি। মাথায় তার বিশাল কালো হ্যাট, পেছনের দিকে ঘুরে থাকার কারণে মুখাবয়ব অস্পষ্ট। রাজার গুটিতে যখন চেক পড়লো, ঠিক সেই সময় কোথা থেকে যেন একটা ধাতব বুলেট ছুটে এসে সবগুলো গুটি সহ উড়িয়ে দিলো দাবার কোট। লোকটা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলো, সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে ভেসে এলো রুক্ষ রাশভারী কণ্ঠস্বর,

— চেকমেট!
অতঃপর নৈঃশব্দ্য।
কোনোরূপ বাক্যব্যয় না করেই হুট করে, একদম হুট করেই চেয়ার ঘুরিয়ে পেছনে ফিরলো লোকটা। জ্বলন্ত মশালের র’ক্তিম আলোয় একটা অপ্রত্যাশিত মুখ আচমকাই ভেসে উঠলো এরীশের চোখের সামনে। যা দেখে কুঁচকে থাকা নিস্প্রাণ চোখ দু’টো নিমেষেই কপালে উঠে এলো তার । বিস্ময়ে বিবর্জিত হয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো মাফিয়া বস । পরমূহুর্তেই রুক্ষ ঠোঁটের ফাঁক গলে বজ্রাহাতের ন্যায় ছিটকে বেড়িয়ে এলো একটা অকল্পিত নাম,
— জিসান!
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো জিসান। কোনোরূপ গতি জড়তা ছাড়াই মাথার হ্যাটটা খুলে এগিয়ে এলো কয়েক পা, বিগলিত হেসে অতি সাবলীল গলায় সম্মোহন করলো তাকে,

— ওয়েলকাম মাফিয়া বস!
চিরাচরিত বালক সুলভ অভিব্যক্তি, চেহারার কোথাও কোনো কপটতার লেশমাত্র নেই, অথচ কালকের সেই কদর্য হাসির ঝঙ্কার স্পর্শ মনে আছে এরীশের, সহসাই অনিশ্চিত ভাবনায় ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে গেলো তার, কপালে জড়ো হলো দুচিন্তার বলিরেখা, এই ছেলেটা কি করে সাইকোপ্যাথ হতে পারে?অসম্ভব!
কথাটা ভাবতেই মশালের আড়াল থেকে আঁধার কেটে বেড়িয়ে এলো হুবহু জিসানের মতো দেখতে আরেকজন। চমকে উঠলো এরীশ, এ যেন জীবন্ত ধাঁধা! নিজের চোখ দু’টোকে বিশ্বাস করতে একটু কষ্টই হয়ে গেলো মাফিয়া বসের । তবে অভিব্যক্তি তার পাথরের মতো কঠিন। এবারের জিসান কিছু বলে ওঠার আগেই কণ্ঠে আগুনের উষ্মা নিয়ে বাক্য ছুড়লো সে,

— যাক, পালাই পালাই নাটকের ইতি ঘটলো তাহলে?
— তুমি আমাকে ভীতু প্রমান করতে চাইছো?
কপাল বেঁকে গেলো জিসানের, পাশের জিসান তখনো স্থিরমূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে। যেন অবলা এক প্রাণী, মনিবের হুকুম ব্যাতীত এক পা ও চলতে জানেনা সে। এরীশ ওটাকে দেখিয়ে বললো,
— তা নয়তো কী? আমার ভয়ে নিজের মতো দেখতে জেরক্স কপি সাজিয়ে রেখেছো, তাও আবার এই ভাঙাচোরা বেজমেন্টে।
কথার এই পর্যায়ে ঘর কাঁপিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো জিসান। যেন খুব মজা পেয়েছে তেমন করেই জবাব দিলো,

— এটাকে মাস্টার প্ল্যান বলে । যা করার ক্ষমতা তোমাদের মতো মাফিয়া বসের নেই।
— আমার গু’লিতে পা খুয়িয়ে বসে আছো, তারপরেও কনফিউশান?
— পা নষ্ট করেছো তুমি আমার, মস্তিষ্ক নয়!তার বিনিময়ে তোমার স্ত্রী, সাম্রাজ্য, সন্তান সবকিছু নিঃশেষ করে তবেই ক্ষান্ত হবো আমি।
— একটা পায়ের জন্য এতো অনুযোগ?
উপহাসের ভঙ্গিতে ওষ্ঠ বাঁকালো এরীশ। সেই দৃশ্য লক্ষ্য করে ডানে-বামে তর্জণী নাড়ালো জিসান, মুখ ফুঁড়ে বেড়িয়ে এলো রহস্যে মোড়া বাক্য,
— উঁহু! মোটেই না।
ছোট্ট কথায় উত্তর দিয়ে কিছু একটা দেখানোর উদ্দেশ্যে পেছনে ঘুরলো শয়তানটা , ঠিক সেই মূহুর্তে বিদ্যুৎ বেগে ছুটে এসে ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এরীশ, একহাতের বাহুতে ওর কণ্ঠদেশ পিষে ধরে অন্যহাত দিয়ে রিভলবার তাক করলো কপালে। আত্মসমর্পণের মতো করে দু’হাত উপরে তুললো জিসান, পরমূহুর্তেই বিশ্রী ভঙ্গিতে হেসে উঠলো সাইকোটা,থেমে থেমে বললো,

— আমি কিন্তু নিরস্ত্র, তুমি কেন বন্দুক তাক করে আছো? ইট’স নট ফেয়ার মাফিয়া বস!
— তুই আমাকে ফেয়ার শেখাবি বাস্টা’র্ড ?
র’ক্ত জমাট মুখ নিয়ে তেজদ্রীপ্ত গলায় বাক্য ছুড়লো এরীশ। ততোধিক শান্ত গলায় হেসে হেসে জবাব দিলো জিসান ,
— মাথা গরম করোনা এরীশ ইউভান। সবেতো ট্রেইলার দিয়েছি, এখনো তো আসল খেলা শুরুই করিনি!
কথা শেষ হতেই আলখাল্লার ভেতর থেকে একটা চকচকে ধাতব নানচাক্স বের করে আচানক আ’ক্রমণ করে বসলো এরীশের উপর। অতর্কিত আ”ঘাতে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো এরীশ। হাত ফস্কে ছিটকে গেলো রিভলবার। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে ফিনকি দিয়ে বেড়িয়ে এলো টকটকে র”ক্তের স্রোত। এরীশের যেহেতু হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছে, তাই ঘড়ির দিকে চেয়ে ব্লাডপ্রেশার আর হার্টবিট চেক করে নিলো সে একবার,পরক্ষনেই ঠোঁটের কোণে জড়ো হওয়া র’ক্তের চটা মুছে জিভের ডগায় গাল ঠেললো সে। জিসান নানচাক্স নিয়ে সতর্ক হতেই এক ছুটে সামনে গিয়ে কৌশলে ওর গলায় পেঁচিয়ে ধরলো বস্তুটা।

— ইউ্য ফা’কিং বা’স্টার্ড!
ক্রোধের তাড়নায় থরথর করে কাপছে এরীশ। ঈশানীর তীব্র আকুতি আর অসহায় চিৎকার যেন হৃদযন্ত্রটাকে খঞ্জরের মতো এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে তার ।
সে অবস্থাতেই জিসানের অবশ পায়ে শক্ত পদাঘাত করে ওকে হাঁটুর উপর বসিয়ে দিলো মাফিয়া বস।পরিস্থিতি আঁচ করার আগেই মুখের উপর অবিরত মু’ষ্টাঘা’ত ছেড়ে হিংস্রের ন্যায় গর্জে উঠলো সে,
— তোর মতো একটা নরকের কীটের সাহস কি করে হয় আমার স্ত্রীকে আঘাত করার? হাউ ডেয়ার ইউ্য টু টাচ হার! কোন স্পর্ধায় ওর শরীরে ছু’রি চালিয়েছিস? হোয়াই ডিড ইউ্য কিল মাই আনবর্ন চাইল্ড! হোয়াই বাস্টার্ড! হোয়াই!
র’ক্তে মাখামাখি জিসানের সমগ্র মুখ। থেঁতলে যাওয়া সেই ক্ষতবিক্ষত মুখের ফাঁক গলে উগড়ে এলো অদ্ভুত বিকৃত হাসির ঢেউ। মুখের র’ক্ত চুয়িয়ে চুয়িয়ে গলায় পড়ছে তার। ভেসে যাচ্ছে পরিধেয় বসন। তবুও শরীর কাঁপিয়ে হাসছে সে মানব, হাসতে হাসতেই ভেসে আসে তার প্রলুব্ধ কণ্ঠস্বর,

— তুই আমাকে এতো সহজে মা’রতে পারবি না এরীশ ইউভান।কিছুতেই না।
এরীশ সবেগে ঝুঁকলো ওর দিকে,জোড়ালো থাবায় মাথার চুলগুলো মুঠিবদ্ধ করে, ফুঁসে ওঠা সাপের মতোই হিসহিসিয়ে বললো,
— সবচেয়ে বড় ভুল তো সেদিনই হয়েছিল আমার, যেদিন তোকে ক্রুজশীপে আহত অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার উচিৎ ছিল তোকে পিস পিস করে হাঙরের খাদ্য বানানো। বাট ইউ্য নো হোয়াট আজকেও তুই খাদ্য হবি, আমার নেকড়ের খাদ্য। তার আগে তোর এই ফাকিং সাইকো সাইকো খেলার কারণটা বল।
থু থু দিয়ে র’ক্তের দলা ফেলে আবারও ফিক করে হেসে ওঠে জিসান। এরীশের চোখে নিস্প্রভ দৃষ্টিপাত করে অনুভূতিহীন গলায় জবাব দেয় সে,
— রিল্যাক্স! এতো অধৈর্য কেন তুমি মাফিয়া বস? আগে নিজের সারপ্রাইজটা হজম করো, তারপর না হয় ধীরে ধীরে সব শুনবে।
জিসানের কথা শেষ হতেই পেছনে স্ট্রোলারের চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ শোনা গেলো। যা শোনা মাত্রই
এরীশের সন্দিগ্ধ দৃষ্টিজুগল আশ্চর্য শীতল হয়ে উঠলো। চকিতে পেছনে ঘুরতেই ততোধিক শীতল কণ্ঠ ভেসে এলো জিসানের,

— বলেছিলাম না সারপ্রাইজ!
এরীশ দেখলো একটা কুচকুচে কালো রঙের আদিবাসী গোছের মানুষ টেনে টেনে নিয়ে আসছে স্ট্রোলার, যার মধ্যে দুনিয়া ভুলে ঘুমিয়ে আছে অংশ তার।
— ইয়াশ!
এমন অশুভ মূহুর্তে নিজ সন্তানের মুখ দেখা মাত্রই রুদ্ধস্বরে ডেকে উঠে অনিয়ন্ত্রিত গতিতে কয়েক পা পিছিয়ে গেলো মাফিয়া বস। দুনিয়ার সকল অরাজকতা, অনিশ্চয়তা ভুলে দৃষ্টি তার আঁটকে রইলো ছেলের তুলতুলে কচি মুখটাতে। কে করলো এতোবড় বিশ্বাস ঘাতকতা? এরীশের স্পষ্ট মনে আছে, গার্ডরা ইয়াশকে নিয়ে সেইফলি হসপিটালে পৌঁছেছিল। পুরো হসপিটাল যেহেতু বুকড সেহেতু বাইরের কারোর ঢোকার সুযোগ নেই, তারমানে কোনো বিশ্বস্ত গার্ড এই কাজটা করেছে।

কথাটা ভাবতেই মনে পড়লো ডেনিয়েলের কথা। এরীশ যাওয়া পূর্বে জিসানের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছে ডেনিয়েল। তারমানে তখনই….. আর ভাবতে পারলো না এরীশ, মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আসছে তার। আবার এক অসহনীয় মূহুর্ত, যখন নিজের পিতৃত্ব প্রমান দিতে অসহায় হয়ে পড়লো মাফিয়া বস।
ঘটনার এই পর্যায়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো জিসান। ক্রীসে ভর করে এগিয়ে গিয়ে প্রথমেই ঘুমন্ত ইয়াশের দিকে ঝুঁকলো সে। যা দেখে প্রচণ্ড ক্রোধে আরেকদফা গর্জে উঠলো এরীশ,

— ডোন্ট টাচ মাই বেবী বয়! স্ট্রে এওয়ে ফ্রম হিম!
অতর্কিতে পেছনে ঘুরলো জিসান, ঠোঁটের আগায় তীর্যক হাসির রেখা ঝুলিয়ে কৌতুক স্বরে বললো,
— প্রাণটা এখনো আছে চিন্তা নেই। এখানে আসার পরে খুব উৎপাত করছিল, তাই সামান্য ড্রাগ পুশ করে দিয়েছি।
জিসানের কথায় দু’চোখ ছলকে ওঠে এরীশের। মুখ ফুটে কিছু বলে ওঠার আগেই হাতের ইশারায় ওকে থামিয়ে দিলো জিসান, হেয়ালির স্বরে ঠোঁট উল্টে বললো,
— খুব বেশি না এক সিসি মাত্র। তাই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, আগামী কয়েকদিনে ঘুম থেকে উঠবে বলে মনে হয়না আর।
কন্ঠস্বর ধরে এলো এরীশের। তবুও শান্ত গলায় বললো,
— ওকে সাইডে রেখে কথা বল জিসান। ও আমার র”ক্ত। অংশ আমার। ওর শরীরে একটা আঁচড় দিলেও তোকে এখানেই পুঁতে ফেলবো আমি।
— পারবেনা!
ছোট্ট করে উত্তর দিয়ে নিজের আসনে গিয়ে গা এলিয়ে বসলো জিসান। ক্রীসটাকে পাশেই রেখে বললো,
— বলেছিলাম না এতো সহজে মা’রতে পারবে না আমায়। দেখলে তো, কেমন এক ধাক্কায় পিছিয়ে গেলে ফটাফট ।
তারপর পেছনে দণ্ডায়মান অদ্ভুত পোশাকধারী তীরন্দাজ আদিবাসীটাকে ইশারা করে ভূভুক্ষ জা’নোয়া’রের মতো বলে উঠলো,

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৬

— ওর দু’হাত বেঁধে ফেলো, আমার সামনে এমন ভাবে বসিয়ে দাও যাতে আর উঠে দাঁড়াতে না পারে।
মনিবের বিপদসংকুল মূহুর্তে কোথা থেকে যেন ছুটে আসে বোজো, তবে এরীশের কাছাকাছি আসার আগেই ফাঁদ ফেলে আঁটকে দেওয়া হয় তাকে। অস্থির অপারগ হিংস্র জন্তুটাকে গভীর চোখে পরখ করে ঠোঁট বাঁকায় জিসান।
ওদিকে বিপদ আসন্ন জেনেও ছেলের সুরক্ষায় কলের পুতুলের মতো স্তব্ধ হয়ে রইলো এরীশ ইউভান। যা যা অনিষ্ট অনিবার্য সবকিছু হতে দিলো নিজের সঙ্গে। সেই জের ধরেই একটা সূঁচালো তীর এসে অকস্মাৎ বিদ্ধ করলো তার ডান পা। মাফিয়া বস কেঁপে উঠল একটু । কিন্তু মাথা নত করলো না। পরপরই আরও একটা তীর এসে গেঁথে গেলো তার বাম পায়ের মাঝখানে । এবার আর ধরে রাখা সম্ভব হলোনা শরীরের ভার। না চাইতেও ধীরে ধীরে ভাঁজ হয়ে গেলো পা দু’টো। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সে মেঝেতে। ঠিক জিসানের মুখোমুখি। সঙ্গে সঙ্গে আরও দু’টো লোক এসে মোটা শেকলে পেছন থেকে বেঁধে ফেললো তার দু’হাত। জিসান পায়ে পা তুলে বসলো এবার। এদিকওদিক ঘাড় ফুটিয়ে গভীর স্বরে হিসহিসালো,
— নাও পার্ফেক্ট!
তারপর ধীরে ধীরে বলতে আরম্ভ করলো নিজের আত্মকাহিনী।

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৮

4 COMMENTS

  1. Assalamu alaikum Apu ,,uponnash ta onek shundor chilo…onek Valo legeche porte..kintu Apu..Amar mone hoy apni uponnash ta akhono shesh koten ni…Ami thik Jani na…?¿Apu jisaner ki holo ei bishoy ta shompurno noy..tai ar ki mone holo uponnash ta apni akhono pori purno koren ni..Apu ..Amar Kano Jani onek kharap lagche..mone hocche ..uponnash ta ato Tara Tari Kano shesh Hoye Galo..prai protita Mon Kara uponnash shesh holey amon mone hoy…!¡Ami akjon uponnash premi…uponnash Amar akmatro nesha…Amar mone hoy Amar pokkhe uponnash Chara Kono vabey shomvob noy…!¡Charar onek cheshtau korechi,, bartho hoyechi bar bar…!¡Jai hok Apu..Ami joto tuku bujhte perechi..apni akjon khub Valo lekhika.. apnar Jonno shorboda doa roilo…Amar jonneu doa korben…. Thank you “Apu”🤗🤗

  2. Atto sundor uponnash tahh😩😩,,, “Suraiya Rafa” apu Tomer sob uponnash just…wow…!! Atao tar batikrom na. apu sob rohosso clear Kore then finish korien uponnash ta.

Comments are closed.