এক দেখায় পর্ব ১৮
সুরভী আক্তার
মিহি দাঁড়ায় । একটু সময় নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকায় । মিহির মুখের ভঙ্গিমার কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না ।
শান্ত আর রুহি একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে রাফির পানে তাকায় ।
মিহির দৃষ্টি স্বাভাবিক । আগ বাড়িয়ে কিছু বলে না ও । রাফি খানিক চুপ থেকে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে কন্ঠ ভার করে বলে….
” গাড়িতে এসে বসুন..!
মিহি কপাল কুঁচকে তাকায় । স্বাভাবিক কন্ঠে বলে….
” তার কোন প্রয়োজন হবে না । আমি একা চলতে পারি । এখান থেকে আমার বাসা বেশি দূরে নয় । আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না ? আমি যেতে পারবো !
রাফি থমকে দাঁড়ায় । মিহির দিকে ঘুরে দ্বিগুণ গম্ভীর গলায় বলে…
” আমি আপনার কাছে পারমিশন চাই নি, বা আপনাকে জিজ্ঞেস করি নি আপনি একা যেতে পারবেন কি না । আমি আপনাকে গাড়িতে এসে বসতে বলেছি । এতে আমার কষ্টের কথা আপনার না ভাবলেও চলবে । আপনাকে যা বলেছি তাই করুন । আসুন ।
” বললাম তো, তার কোন প্রয়োজন হবে না । আমি একা যেতে পারবো ।
মিহির কন্ঠে খানিক তেজ । কথাটা বলেই হাঁটা শুরু করে মিহি । রাফি কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে দেখে ওকে ।
তার পর বড় বড় পা ফেলে ওর সামনে গিয়ে পথ রোধ করে দাঁড়ায় । মিহি দাঁড়িয়ে যায় । ভ্রু কুঁচকে তাকায় । কিছু বলার আগেই রাফি ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে গাড়িতে বসিয়ে দেয় । বসিয়েই ধাম করে দরজাটা লাগিয়ে দেয় ।
নিজে ঘুরে গিয়ে বসে ড্রাইভিং সিটে । একটুও সময় ব্যয় না করে গাড়ি স্টার্ট দেয় । মিহি রাফির দিকে ঘুরে উঁচু স্বরে বলে…
” কি করলেন এটা ? নামিয়ে দিন আমায় ।
” চুপচাপ বসে থাকুন ।
মিহি আর কিছু বলে না । বললেও কাজ হবে না । দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকে মিহি ।
মিহির কান্না পাচ্ছে খুব । কেনো তা সে নিজেও জানে না । তবে রাফি কে দেখলেই ওর কান্না পাচ্ছে । মিহির চোখ ছলছল করে ওঠে । নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায় ।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি থামে মিহি’দের বাড়ির সামনে । মিহি কিছু বলে না, আর না রাফির দিকে তাকায় । গাড়ি থামাতেই দরজা খুলে নেমে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হতেই রাফি শীতল কন্ঠে ডাকে…
” শুনুন…
মিহি না চাইতেও থেমে যায় । রাফির শীতল কন্ঠে মিহির বুকটা কেঁপে ওঠে, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় । মিহি রাফির দিকে ফিরে তাকায় না, একই ভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে আবারো বসে । রাফি খানিক নিরব থেকে বলে…
” Sorry….
মিহি চকিতে তাকায় । রাফি ও তাকায় । দুজনের চোখই একে অপরের দিকে স্থির । রাফি বলে….
” তখন আমার ওভাবে রিয়াক্ট করাটা ঠিক হয় নি । বাজে ব্যবহার করে ফেলেছি । I am sorry, প্লিজ ক্ষমা করে দিন । আর কখনো এমনটা হবে না । আসলে তখন, আমার মাথাটা ঠিক ছিল না । কি থেকে কি বলে ফেলেছি বুঝতে পারিনি ।
রাফির অনুনয় মিশ্রিত কন্ঠ শুনে আচমকা ঠোঁট উল্টে কেঁদে ওঠে মিহি । এতক্ষণ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলেছে । আর পারলো না । ছোট বেলা থেকে কোন দিন কেউ একটু ঝেড়ে কথা বলেনি মিহির সাথে । আব্বু আম্মুও কোন দিন রাগি কন্ঠে কথা বলেনি ওর সাথে । বড্ড আদুরে মিহি । কারো উঁচু আওয়াজ শুনতে পারে না ।
রাফির হঠাৎ এমন ব্যবহারে মিহি রাগ করেছে কি না জানা নেই, তবে অভিমান জমেছে মিহির মনে । মিহি শব্দ করে ফুঁপিয়ে ওঠে । মিহির চোখে পানি দেখে রাফি ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলে…
” Sorry মিহি,, I am really sorry,,
I swear আর কখনো এমনটা হবে না । কেঁদো না প্লিজ । হাতে বেশি ব্যথা পেয়েছো ?
মিহি মাথা নিচু করে কান্না আটকে শক্ত গলায় বলে…
” আমাকে রাগ দেখাবেন না কখনো , আমি কারোর রাগ সহ্য করতে পারি না । আমার সাথে রেগে কথা বলবেন না আপনি ।
আর আমি সরি,, আমি যেটা করেছি ঠিক করি নি । আমি ভাবতে পারি নি এতো কিছু হয়ে যাবে । পারলে ক্ষমা করে দেবেন ।
আমি আসি… ভালো থাকবেন…
বলেই রাফি কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মিহি মাথা নিচু করেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে । বড় বড় পা ফেলে সোজা বাড়িতে ঢুকে পড়ে । রাফি পিছন থেকে ডাকতে গিয়েও আর ডাকে না । নিষ্ক্রিয় চোখে তাকিয়ে দেখে সপ্তদশীর অভিমানী চলার বেগ ।
আজমাল হোসেন আজ দুপুরেই বাড়িতে এসেছেন । মিহি বাড়িতে ঢুকে কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে যায় । আজমাল হোসেন ড্রইং রুমে বসে টিভি দেখছিলেন । মেয়ের পায়ের শব্দে মেয়ের দিকে তাকান তিনি । মিহিকে কোন দিকে না তাকিয়ে গোমড়া মুখে সোজা উপরের দিকে চলে যেতে দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে তার ।
সকাল সকাল বান্ধবীর জন্মদিনের জন্য বেশ খুশি ছিল ও । তাহলে এখন আবার কি হলো ? আজমাল হোসেন সোফা ছেড়ে উঠে মেয়ের পিছু পিছু যান । ঘরে গিয়ে দেখেন , মিহি খাটের উপর উবু হয়ে শুয়ে আছে । আজমাল হোসেন মেয়েকে ডাকেন..
” আম্মু…
বাবার ডাকে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে মিহি । মিহির মুখ ভার , চোখ ভেজা দেখে আজমাল হোসেন এগিয়ে যান । বলেন…
” কি হয়েছে আম্মু ? এতো তাড়াতাড়ি ফিরলে যে ? রুহির বার্থডে সেলিব্রেট করো নি ? মুখটা এমন দেখাচ্ছে কেনো ?
মিহি চোখ সরিয়ে মুখ নামিয়ে রেখেছে । আজমাল হোসেন এগিয়ে যান মেয়ের কাছে । মৃদু স্বরে বলেন…
” কিছু বলছো না যে ?
মিহি ছল ছল চোখ তুলে তাকায় । আজমাল হোসেন বলেন….
” কি হয়েছে মা , কাঁদছো কেনো ? কেউ কিছু বলেছে তোমায় ?
মিহি হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে, ভেজা কন্ঠে বলে..
” কিছু হয় নি আব্বু ।
” তাহলে কাঁদছো কেনো ?
” এমনি,,, কান্না পাচ্ছে ।
” এমনি এমনি কেউ কাঁদে ?
” ১৮ জুলাই আমার জন্মদিন, তাই না আব্বু ?
” হুম, এইতো আর চৌদ্দ দিন পর ! তা এবার জন্মদিনে কি চাই আমার মায়ের ?
” কিচ্ছু চাই না আব্বু । জানো, ১৮ জুলাই না মিফতাহুলের ও বার্থডে । তোমাকে বলেছিলাম না মিফতাহুল এর কথা । ওর ও বার্থডে ।
” তাই,, কিন্তু ও তো….
” মারা গেছে ।
আজমাল হোসেনের কথা শেষ না হতেই মিহি বলে কথাটা ।
” জানো আব্বু, ১৮ জুলাই ওর বার্থডের দিনই ও মারা গেছে ।
বলেই মাথা নামিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে মিহি । মেয়ের কথা শুনে আজমাল হোসেনের মুখের আকৃতি বদলে যায় । চমকে তাকান তিনি । বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে । শুকনো ঢোক গিলতেও গলায় বাঁধে ।
দরজায় শব্দ হতেই বাবা মেয়ে দুজনেই ফিরে তাকায় দরজার দিকে । সাবিনা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন । তিনি আজমাল হোসেনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ছুটে যান নিজের ঘরে । মিহি অবুঝ স্বরে বাবার দিকে চোখ ফিরিয়ে বলে….
” আম্মুর কি হলো আব্বু । বাইরে থেকে চলে গেল যে ? ভেতরে আসলো না কেনো ?
আজমাল হোসেন খানিক চুপ থেকে ঢোক গিলে বলেন…
” কিছু না আম্মু ,, তুমি ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও । আমি আসছি ।
বলেই দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি । মিহি ভ্যাবলার মত তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে ।
আজমাল হোসেন পাশের র ঘরে গিয়ে দেখেন সাবিনা বেগম উল্টো দিকে ঘুরে খাটের উপর বসে আছে । আজমাল হোসেন এগিয়ে যান তার কাছে । সাবিনা বেগমের মুখ পানে তাকাতেই আজমাল হোসেন শুল্ক ঢোক গেলেন । সাবিনা বেগমের চোখে পানি টলটল করছে । আজমাল হোসেন কে দেখেই সেই পানি গড়িয়ে গাল বেয়ে গলায় নামে ।
তিনি অস্থির হয়ে উঠে গিয়ে আজমাল হোসেনের দুই হাত আঁকড়ে ধরেন । কান্নারত অস্থির কন্ঠে বলেন….
” আ.. আমি আর ঢাকায় থাকবো না । আপনি আমাদের নিয়ে অন্য শহরে চলে যাবেন । আমি আর একটা দিনও এখানে থাকবো না । আপনি শুনছেন আমার কথা । আমি আমার মেয়ে কে নিয়ে আর এই শহরে থাকবো না । অনেক দূরে চলে যাবো আমরা,, অনেক দূরে । এই অভাবের শহরে আমি আর থাকবো না আমার মেয়েকে নিয়ে । আপনি আমাদের নিয়ে যাবেন ? বলুন না ?
সাবিনা বেগম অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছেন । কথা গুলো বলতে বলতে শব্দ করে কেঁদে ওঠেন তিনি । আজমাল হোসেনের দুই বাহু ঝাঁকিয়ে অনাড়গল একই কথা আওড়াতে থাকেন তিনি । আজমাল হোসেন নিস্তেজ দাঁড়িয়ে থেকে শ্বাস টেনে ক্লান্ত স্বরে বলেন…
” পৃথিবীটা গোল সাবিনা,, কোথায় যাবে তুমি ? যত দূরেই যাও না কেনো , কোন না কোন ভাবে ভাগ্যের পরিহাসে ভাগ্য তোমায় আবার একই জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে আসবে । জীবন বৃত্তের মত যেখানে শুরু হয় শেষটাও ঠিক ফিরে এসে সেখানেই হয় । আমরা যেটা ভুলতে চাই, সেটাই ঘুরে ফিরে আমাদের সামনে আসে ।
” আ..আমি অতো কিছু বুঝি না । আপনি আমাকে আর আমার মেয়েকে অনেক দূরে নিয়ে যাবেন । আমি শুধু সেটাই জানি ।
” পালাতে চাইছো ?
সাবিনা বেগম আচমকা স্থির হন । হঠাৎ করেই থেমে যান তিনি । অস্থিরতা নিস্তেজ হয় । একটু পিছিয়ে ধপ করে খাটের উপর বসে পড়েন । আজমাল হোসেন অদ্ভুত হাসার চেষ্টা করেন । গলা নামিয়ে বলেন….
” সময়ের থেকে পালাতে পারবে তুমি ? পালাতে পেরেছো আদো ? ঘুরে ফিরে তো আবার একই জায়গায় ফিরে এসেছো ।
সাবিনা বেগম ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে ওঠেন । অস্পষ্ট স্বরে বলেন…
” আমি ওকে হারাতে পারবো না । আমি বাঁচবো না ওকে ছাড়া । আপনি তো জানেন, আমি নিঃস্ব । আমার আর কেউ নেই । থেকেও নেই । আমি ওকে কখনো দুরে যেতে দেব না । আমার কাছ থেকে হারাতে দেব না ।
” হারানোর সময় হয়ে গেছে এবার । কতদিন আর নিজের কাছে রাখবে ? যার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে না ?
আজমাল হোসেনের কথাগুলো কেঁপে কেঁপে পৌঁছায় সাবিনা বেগমের কানে । সাবিনা বেগম
ছ্যাঁত করে চিল্লিয়ে ওঠেন…..
” নাহ….
কিছুতেই না । ও আমার সম্পদ । আমার জীবনের পূর্ণতা ও । আমি ওকে কিছুতেই হারাতে দেব না । কিছুতেই না ।
আমি তো আপনার কাছে কিছু চাই না বলুন ,, আজ চাইছি – ওকে আমার থেকে দূরে নিয়ে যাবেন না প্লিজ । আমি বাঁচবো না , আর আপনি, আপনি বাঁচতে পারবেন ওকে ছাড়া ?
আজমাল হোসেনের গলা কাঁপছে । কথাগুলো টেনে হিচড়ে বেরিয়ে আসছে গলা থেকে । শ্বাস আটকে আসছে । বুকের উপর পাথর চেপে রাখার মতো কষ্ট হচ্ছে । চোখের পানি বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে ।
ভীষণ ব্যথা অনুভব হচ্ছে বুকে । তিনি দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছেন সেই ব্যথা । তবে আর সহ্য করতে পারেন না তিনি ,, হঠাৎ বুক চেপে ধরে খাটের উপর টলে পড়েন তিনি । শ্বাস আটকে আসছে । সাবিনা বেগম তব্দা খেয়ে হুড়মুড়িয়ে খাটের পাশে বসেন । কান্না গলায় আটকে যায় তার । কান্নারত ব্যস্ত গলায় বলেন….
” কি হলো আপনার ,, এই , কথা বলছেন না কেনো আপনি । কি হয়েছে আপনার ?
আজমাল হোসেনের চোখ মুখ নিমিষেই রক্ত জমাট বেঁধে লাল হয়ে যায় । কপালের পাশের রগ গুলো অস্বাভাবিক ফুলে ওঠে । চোখ মুখ খিচে রেখেছেন তিনি । শ্বাস নিতে পারছেন না । সাবিনা বেগমের চিৎকারে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে মিহি । হুড়মুড়িয়ে পাশের ঘরে ঢোকে । আব্বুকে বিছানার উপর অস্বাভাবিক অবস্থায় চোখ মুখ খিচে রাখতে দেখে এলোমেলো পায়ে ছুটে যায় মিহি । সাবিনা বেগম পাশে বসে বারবার আজমাল হোসেনকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কান্নারত কন্ঠে ডেকে যাচ্ছেন । মিহিকে দেখে আরো জোরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি । মিহি কিছু বুঝতে না পেরে, আব্বু কে ঝাঁকায়….
” আ.. আব্বু , ও আব্বু । কি হলো তোমার । আব্বু….
আজমাল হোসেন কথা বলছেন না । সেন্স’ লেস হয়ে গেছেন তিনি ।
হাসপাতালের করিডোরে সাদা দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মিহি । মাথা উঁচিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে রাখা ওর । পাশেই একটা চেয়ারে নিস্তেজ হয়ে মাথা এলিয়ে বসে আছেন সাবিনা বেগম । তার নিস্তেজ ভেজা চোখ সামনের একটা কেবিনের দরজার দিকে নিবদ্ধ । দরজা বন্ধ । দরজার ওপারে আছে আজমাল হোসেন । দরজার পাশে বুকে হাত গুটিয়ে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সাফি । সাফি বারবার তাকাচ্ছে মিহি আর সাবিনা বেগমের দিকে ।
তখন ভাগ্যক্রমে সাফি এসেছিল মিহি’দের বাড়িতে । বাড়ির দরজা হাট্ করে খুলে রাখা ছিল । সাফি ভেতরে ঢুকে খানিক অবাক হয় । ড্রইং রুমে কেউ নেই । দরজাটা ও খুলে রাখা । উপর থেকে সাবিনা বেগমের কান্না আর মিহির গলা শুনে তড়িঘড়ি করে উপরে ওঠে সাফি । ঘরে ঢুকেই আজমাল হোসেনের অবচেতন অবস্থা দেখতে পায় সে ।
পর পর এক মুহুর্ত দেরি না আজমাল হোসেনকে নিয়ে আসা হয় হসপিটাল এ । আব্বুর এমন অবস্থা দেখে মিহি কাঁদে নি । তবে বুকের ভেতর টা ফেটে যাচ্ছে ।
কাঁদতে ইচ্ছে করছে খুব, চোখের পানিরা বারবার উঁকি দিচ্ছে কিন্তু চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ার সাহস পাচ্ছে না,, কাঁদতে পারছে না মিহি । সাবিনা বেগম খুব দুর্বল হৃদয়ের মানুষ । অল্পতেই ভেঙ্গে পড়েন তিনি । তিনিও ছিলেন তার বাবা মার বড্ড আদরের মেয়ে । আদুরে আহ্লাদি’পনায় বেড়ে উঠছেন তিনি । তার জীবনে কোনো অভাব বুঝতে পারেন নি তিনি । আর না তার চোখে কখনো পানি এসেছে । কিন্তু যখন সবাইকে ছেড়ে আজমাল হোসেনের সাথে চলে আসলেন, সবার মধ্য থেকে আজমাল হোসেনকে বেছে নিলেন – তখন থেকে তিনি খুব সহজেই ভেঙ্গে পড়েন । খুব ছোট ছোট বিষয়েই কাঁদতে শিখেছেন । আজমাল হোসেনের সঙ্গ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তার একান্ত ছিল, আর এ সিদ্ধান্ত ভুল নয় , আর না তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আফসোস করেন ।
তবে নিজের আপন মানুষদের জন্য কেঁদেছেন তিনি । আড়ালে আবডালে অনেক কেঁদেছেন ।
এখন ছোট্ট ছোট্ট বিষয়েই ভয় পান তিনি ।
মায়ের দুর্বলতা বাড়াতে চায় না মিহি । মিহি যদি কাঁদে তাহলে তার মা আরো বেশি ভেঙে পড়বে । মায়ের কথা চিন্তা করে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে রেখেছে মিহি । সাবিনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে নিশ্চুপ হয়ে গেছেন ।
পুরো করিডোরে নীরবতা । সবার নীরবতার মাঝেই ডাক্তার বেরিয়ে আসেন কেবিন থেকে । ডাক্তার বের হতেই সাফি এগিয়ে যায় । সাবিনা বেগম মাথা তুলে শ্বাস টেনে উঠে দাঁড়ান । মিহি দৌড়ে যায় ডাক্তারের সামনে । ডাক্তার সবার অবস্থা বুঝতে পেরে স্বভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলেন….
” চিন্তার কোন কারন নেই ? পেসেন্ট এখন ঠিক আছেন । তবে…
” ত…তবে…তবে কি ?
কাঁপা গলায় ব্যস্ত হয়ে কথাটা বলেন সাবিনা বেগম । মিহি মায়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে ডাক্তারের পানে তাকায় । ডাক্তার বলেন…
” ওনার উপর কোন প্রেসার ক্রিয়েট করবেন না । বেশি চিন্তা ভাবনা ওনার জন্য মোটেই ভালো নয় কিন্তু । এই নিয়ে তিন তিন বার….
” ওনার কাছে এখন যাওয়া যাবে কি ? আ.. আমরা ভেতরে যেতে পারি এখন ?
ডাক্তার কে কথার মাঝে থামিয়ে কথাটা বলে সাফি । সাফির কথায় ডাক্তার সরু চোখে তাকান, সাফির ইশারা বুঝে কথার মোড় ঘোরান তিনি ।
” আ..জ্বি, এখন আপনারা ওনার সাথে দেখা করতে পারেন । তবে বেশি কথা বলবেন না ওনার সাথে ।
মিহি বলে…
” আপনি কি যেন বলতে গিয়ে বললেন না । তিন তিন বার….
কি হয়েছে ? আব্বু ঠিক আছে তো ? বলুন না ডাক্তার ?
” উনি একদম ঠিক আছেন । একটু প্রেসার ফল্ট হয়েছিল এই আর কি । ওনাকে বেশি টেনশন দেবেন না । আজকে উনি হসপিটালেই থাকবেন, কাল সকালে ওনাকে রিলিজ দেওয়া হবে ।
আপনারা যান , এখন ওনার সাথে গিয়ে দেখা করতে পারেন ।
ডাক্তারের কথা শেষ হওয়া মাত্রই মিহি আর সাবিনা বেগম ঢুকে পড়ে কেবিনে ।
ওদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ডাক্তার সাফির দিকে তাকিয়ে বলেন…
” মি. মির্জা… এনারা কি হন আপনার ?
সাফি সময় নিয়ে বলে…
” রিলেটিভ….
” পেসেন্টের এই নিয়ে তিন বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে । ওনার কথা মাথায় রাখবেন , আর একবার যদি এমনটা হয় তাহলে কিন্তু ওনার লাইফ রিস্ক হতে পারে ।
” আমি বুঝতে পারছি ডাক্তার ,, তবে এই কথাটা যেন ওনার পরিবারের কেউ না যানে ।
” এটা ওনার ফ্যামিলি কে জানানো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল । কিন্তু আগের বার যখন আপনি ওনাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন তখনই উনি নিজেই আমাকে বারন করে দিয়েছিলেন- যেন এই বিষয়ে তার স্ত্রী বা মেয়েকে না জানানো হয় । আজকে এই অবস্থাতেও ঠিক মতো কথা বলতে পারছিলেন না উনি, তবুও আমাকে বলেছেন যেন কাউকে কিছু না বলি ।
So Don’t worry , কাউকে কিছু বলব না ।
বলেই সেখান থেকে চলে যান ডাক্তার । সাফি কেবিনে ঢোকে । মিহি আর সাবিনা বেগম দুজন বেডের দুদিকে বসে আছেন । আজমাল হোসেনের জ্ঞান ফিরেছে । তবে চোখ বন্ধ করে আছেন তিনি ।
মিহি ধীর কন্ঠে আব্বু কে ডাকে…
” আব্বু…
আজমাল হোসেন পিটপিট করে চোখ খুলে তাকান । চোখ ঘুরিয়ে তিন জনকেই দেখে নেন । সাফি চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝায় তাকে । তিনি মুচকি হাসার চেষ্টা করে ক্লান্ত ক্ষীন স্বরে বলেন….
” আমি ঠিক আছি আম্মু , টেনশন করো না । এতো সহজে তোমাদের রেখে কোথাও যাবো না আমি ।
সাবিনা বেগম কেঁদে ওঠেন । এবার কেঁদে ওঠে মিহি ও । নিজেকে সামলাতে না পেরে বেডের উপর শুয়ে থাকা অবস্থায় আব্বুকে জড়িয়ে ধরে । কাঁদতে কাঁদতে বলে….
” কোথায় যাবে তুমি আমাদের ছেড়ে ? শুধু সহজে নয়, কঠিন অবস্থাতেও আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না । তুমি ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই আব্বু । কক্ষনো আমাদের ছেড়ে যাবার কথা ভাববেও না তুমি ।
নিজের শরীরের একদম খেয়াল রাখো না তুমি । কিসের এতো চিন্তা তোমার ? আজ থেকে আর কোনো চিন্তা করবে না তুমি ।
আজমাল হোসেন হাসেন । চোখের কোনা দিয়ে দুফোঁটা জল কান বেয়ে গড়িয়ে পড়ে । তিনি আধো আধো স্বরে বলেন…
” পাগলী মেয়ে আমার ।
তোমার আম্মু কে কান্না থামাতে বলো আম্মু , আমার কিচ্ছু হয় নি । আমি যে তার চোখে পানি দেখতে পারি না ।
সাবিনা বেগম চোখ মুছে কান্না আটকায় ।
আজমাল হোসেনের চোখ একটু খোলা । তিনি সরু চোখে তাকান সাবিনা বেগমের দিকে । সাবিনা বেগমের ফর্সা মুখশ্রী লাল হয়ে গেছে কান্নার তোপে । নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে ।
আজমাল হোসেন মৃদু হাসেন ।
মিহি ওয়াশ রুমে গেছে ফ্রেশ হতে । সাফিও নিচে গেছে প্রয়োজনীয় ঔষধ পত্র আনতে । কেবিনে পিনপতন নীরবতা । আজমাল হোসেন অনেক্ষণ যাবত সাবিনা বেগমের দিকে চেয়ে থাকেন । মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন…
” আমার এই টুকু অসুস্থতাতেই কেঁদে কেঁদে নিজের এমন অবস্থা বানিয়ে ফেলেছো সাবিনা । আমি চলে গেলে কি করবে ?
তৎক্ষণাৎ আজমাল হোসেনের মুখ চেপে ধরে সাবিনা বেগম ।
” চুপ,, এমন কথা কক্ষনো বলবেন না । আপনার আগে যেন আমার মরন হয় । কারন আপনার বিরহ আমি সইতে পারবো না ।
” আর তোমার বিরহ যে আমি সইতে পারবো না । তুমি তো জানো আমার ইহ’জগতে কেউ নেই, আর না কেউ ছিল।
এই জগত থেকে যখন আমি পর’জগতে যাবো , তখন না তোমাকে ছেড়ে যেতে আমার খুব বেশি কষ্ট হবে সাবিনা ।
” আর আমার ? আমার কষ্ট হবে না বুঝি ? কে আছে আমার বলুন ? আপনি আর মিহি ছাড়া । আমাকে ছেড়ে কখনো কোথাও যাবেন না প্লিজ, যেখানে যাবেন আমাকে নিয়ে যাবেন । আপনার হাত ধরে এতগুলো বছর চলেছি, বাকি বছরগুলো চলার জন্য আমার এই হাতটা প্রয়োজন । এই হাতটা কখনো ছাড়বেন না প্লিজ ।
আজমাল হোসেনের হাত শক্ত করে ধরে কথাটা বলেন সাবিনা বেগম । মিহি দরজায় দাঁড়িয়ে আব্বু আম্মুর সব কথা শোনে । মুখে আপ্লুত হাসি ফুটে ওঠে মিহির । মনের ভেতর ভালো লাগার পুষ্প ফুটে ওঠে ।
বরাবরই আব্বু আম্মুর একে অপরের প্রতি ভালোবাসা দেখে এসেছে মিহি । বারংবার মুগ্ধ হয়েছে সে । দু’জনই দুই প্রান্ত থেকে নিঃস , তবুও তারা পরিপূর্ণ তাদের ভালোবাসার জন্য ।
নিজের জীবন নিয়ে মিহি যতবার ভেবেছে, ততবারই নিজেকে সাবিনা বেগম রুপে কল্পনা করেছে, আর নিজের জীবন সঙ্গী কে চেয়েছে আজমাল হোসেনের রুপে ।
আজমাল হোসেনের অসুস্থতার কথা শুনে পরদিন সকাল সকাল রুহি আসে হসপিটাল এ । রাফিই নিজে নিয়ে এসেছে ওকে । রাতে সাবিনা বেগম আর মিহি দুজনেই হসপিটালেই ছিল । সাফি সকাল হতেই চলে এসেছে । অন্য সব সময় সাফিকে দেখলে বিরক্ত লাগতো মিহির । তবে এখন আর লাগছে না । ধীরে ধীরে সাফির উপর কৃতজ্ঞতা বেড়েই চলেছে ।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য হলেও সাফির সাথে বেশ হেসে হেসে কথা বলছে মিহি । একটুও বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে না কথায় ।
মিহি আব্বু কে ঔষধ খাইয়ে সাবিনা বেগমের সাথে একটু নিচে গেছে । আজমাল হোসেন আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছেন বেডে । সাফি একটা চেয়ার টেনে বসে সামনে ।
সবসময়ের মত মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে…
” এখন কেমন লাগছে আঙ্কেল ?
” ভালো লাগছে বাবা । তুমি না থাকলে যে কি হতো ? পরপর দুবার জীবন বাঁচালে আমার ।
” এভাবে বলবেন না আঙ্কেল । এটা আমার কর্তব্য ।
কিন্তু আঙ্কেল, এবার থেকে আপনাকে কিন্তু একদম স্ট্রিক থাকতে হবে । আপনি তো জানেন সব কিছু ।
“তোমার আন্টি বা মিহি যেন কিছু জানতে না পারে বাবা । ওরা জানলে নিজেকে সামলাতে পারবে না ।
” ওদের জানানো কি প্রয়োজন নয় ? পর পর তিন বার স্ট্রোক হয়েছে আপনার , প্রথম দিন আমি ছিলাম ভাগ্যক্রমে, দ্বিতীয় দিন তো অফিসেই অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন , আবার কালকে । এভাবে চলতে থাকলে ওরা যেকোনো মুহূর্তে যেনে যাবে,, তখন আরো বেশি ভেঙে পড়বে ।
” তখন কার কথা তখন ভাবা যাবে । কিন্তু এখন আমি ওদের কিছু জানাতে চাই না ।
সাফি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে । ফোনটা বেজে ওঠে ওর…ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতেই সাফি বলে….
” ওকে,, আমি আসছি এক্ষুনি..
ফোন পকেটে রেখে আজমাল হোসেনের দিকে চোখ ফিরিয়ে বলে…
” আঙ্কেল, আমার এখন অফিসে যেতে হবে , একটা জরুরী মিটিং আছে । আমি আসি ? নিজের খেয়াল রাখবেন ।
” ঠিক আছে বাবা ,, এসো তুমি । সাবধানে যেও ।
সাফি মুচকি হেসে কেবিন থেকে বের হতেই মিহি আর সাবিনা বেগমের মুখোমুখি হয় । সাবিনা বেগম বলেন..
” চলে যাচ্ছ বাবা ?
” জ্বি আন্টি, একটা আর্জেন্ট মিটিং এটেন্ড করতে হবে । তাই যেতে হচ্ছে , তবে আমি বাকি সব ফর্মালিটিজ শেষ করে দিয়েছি । আঙ্কেল কে একটু পরেই রিলিজ দিয়ে দেওয়া হবে । গাড়ি নিচেই আছে, পৌঁছে দেবে , সমস্যা হবে না ।
” ধন্যবাদ বাবা ,, অনেক করেছ আমাদের জন্য ।
সাফি মুচকি হাসে । সাবিনা বেগম কেবিনে ঢোকেন । মিহি পিছন পিছন ঢোকার সময় সাফি বলে..
” আসি..?
মিহি ঘুরে তাকিয়ে মিষ্টি হাসে । হেসে বলে…
” জ্বি,, সাবধানে যাবেন ।
বলেই কেবিনে ঢোকে মিহি ।
সাফি ঠোঁট বাঁকিয়ে অদ্ভুত হাসে । চোখে সানগ্লাস পড়তে পড়তে হসপিটাল এর নিচে নামে ।
রিসিপসন থেকে লিফটের দিকে যাচ্ছিল রুহি আর রাফি । আজমাল হোসেন কে তিন তলায় ৩০২ নং কেবিনে রাখা হয়েছে ।
রাফির মুখে মাস্ক ।
লিফটের সামনে এগোনোর সময় রাফি কে পাশ কাটিয়ে বাইরের দিকে যায় সাফি । রাফি একটু এগিয়ে থমকে যায় । চট করে পিছন ফিরে তাকায় । চঞ্চল চোখ ফেরায় এদিক ওদিক । তবে চেনা কোন মুখ নেই । রাফির কেনো যেনো মনে হলো খুব চেনা কাউকে দেখলো ও । রাফি এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখে নেয় সবটা । রাফি কে থামতে দেখে রুহি পিছন ফিরে ডাকে…
” ভাইয়া,, থেমে গেলে কেনো ? তাড়াতাড়ি এসো ..
রাফি পিছন থেকে সামনে তাকায় । এগিয়ে যায় লিফটের দিকে ।
৩০২ নং কেবিনের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় রাফি আর রুহি । দরজা একটু চাপানো । রুহি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে ।
মিহি আব্বুর সব ঔষধ পত্র গুছিয়ে ব্যাগে রাখছিল । সাবিনা বেগম একই ভাবে আজমাল হোসেনের পাশে বসে আছেন ।
দরজা খোলার শব্দে সবাই তাকায় দরজার দিকে । রুহিকে দেখে মিহি মিষ্টি হাসে । ব্যাগ রেখে এগিয়ে আসে রুহির দিকে । এমন সময় রাফি ঢোকে কেবিনে । অমনি থেমে যায় মিহি, মুখের হাসি টুকুও মিলিয়ে যায় । রাফি ভেতরে আসতেই চোখাচোখি হয় দুজনের, মিহি একটু সময় নিয়ে চোখ ফেরায় । মুখে অপ্রস্তুত হাসি ফুটিয়ে বলে…
” এসেছিস পাখি ,, তোকে তো বললাম আসতে হবে না । আমরা বাড়িতেই যাচ্ছি এখন ।
” তো কি হয়েছে ? আমি আমার আঙ্কেল কে দেখতে আসতে পারি না ? আমি ওনার মেয়ে নোই বুঝি, শুধু তুই ওনার একার মেয়ে ?
মিহিকে কথাটা বলে আজমাল হোসেনের দিকে এগিয়ে যায় রুহি । মিহিও পেছন পেছন এগিয়ে যায় । রাফি মিহির থেকে স্থির দৃষ্টি সরায় । মিহি যে রাফি কে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে তা সম্পূর্ণ বুঝতে পারছে রাফি ।
রাফি আর রুহিকে দেখে আধশোয়া থেকে উঠে বসেন আজমাল হোসেন । রাফি সালাম দেয় তাকে । আজমাল হোসেন সালামের উত্তর দেন । রাফি বলে…
” এখন কেমন আছেন আঙ্কেল ?
আজমাল হোসেন বলেন…
” আমি ভালো আছি বাবা । তোমরা কেমন আছো ?
” জ্বি আঙ্কেল, ভালো আছি । হঠাৎ আপনার কি এমন হয়েছিল আঙ্কেল যে আপনাকে হসপিটালে এডমিট করতে হলো ?
আজমাল হোসেন একবার সাবিনা বেগমের দিকে তাকান । সাবিনা বেগমের চোখ দুটো ভীত নয়নে আগে থেকেই তাকিয়ে আছে তার দিকে । তার চোখ যেন বলে দিচ্ছে অনেক কথা । আজমাল হোসেন চোখ ফিরিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলেন….
” একটু প্রেসার ফল্ট, আর তেমন কিছু নয় ।
আজমাল হোসেন এবার রুহির দিকে তাকিয়ে বলে…
” শুভ জন্মদিন মামনি ,, কালকে তো তোমাকে wish করতে পারি নি । আজকেই করলাম ।
মিহি কালকের ঘটনাটা আমাকে বলেছে মা,,মিফতাহুল এর ঘটনাটাও শুনলাম ।
সাবিনা বেগম আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলেন…
” আ..বাবা , দা.. দাঁড়িয়ে আছো কেনো ? বসো, মিহি চেয়ার এগিয়ে দে । বসতে দে ওদের ।
আজমাল হোসেন সাবিনা বেগমের দিকে তাকান । অদ্ভুত হাসেন তিনি । সাবিনা বেগম ওনার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে দুদিকে মাথা নাড়েন ।
রাফি বলে…
” ইটস ওকে আন্টি ,, বসতে হবে না আমাদের ।
আজমাল হোসেন বলেন….
” জানো রাফি.. আমার মিহির জন্মদিন ও ১৮ ই জুলাই । যেদিন তোমাদের মিফতাহুলের জন্মদিন , ঠিক সেইদিন আমার আম্মুরো জন্মদিন ।
কিন্তু এটা শোনার পর খারাপ লাগছে, যে মিফতাহুল ওর এই বিশেষ দিনেই… । যাই হোক এসব নিয়ে আর কথা না বলি..
রাফি মিহির দিকে তাকায় । মিহি আব্বুর পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে । রাফি কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই দরজায় কড়া নাড়ে কেউ । সবাই চকিতে তাকায় দরজার দিকে । একজন ওয়ার্ড বয় দাঁড়িয়ে আছে ।
তিনি মিহির উদ্দেশ্যে বলেন…
” আপনাদের রিলিজ দেওয়া হয়েছে । সব ফর্মালিটি অলরেডি পূরন করা হয়েছে । জাস্ট একটা পেপারে পেসেন্টের ফেমিলির কারো সাইন প্রয়োজন । আপনাদের মধ্যে কেউ রিসিপশনে গিয়ে সাইন টা দিয়ে আসুন ।
মিহি দাঁড়িয়ে বলে…
” জ্বি , আমি যাচ্ছি ।
রুহি মিহিকে বলে…
” চল পাখি , আমিও যাচ্ছি তোর সাথে ।
মিহি মুচকি হেসে পা বাড়ায় । আজমাল হোসেন রাফি কে উদ্দেশ্য করে বলেন…
” ওদের সাথে তুমিও একটু যাবে বাবা ? মিহি তো এতো সব কিছু বোঝে না , যদি কোন সমস্যা হয় ।
” এভাবে কেনো বলছেন আঙ্কেল,, যাচ্ছি আমি ।
মিহি আর রুহি দাঁড়িয়ে ছিল । রাফি ওদের নিয়ে কেবিনের বাইরে আসে । ওরা কেবিন থেকে বের হতেই সাবিনা বেগম ধড়ফড়িয়ে আজমাল হোসেনের হাত ধরেন । তার হাত নিজের মাথায় রেখে বলেন…
” আপনাকে আমার কসম ,, আপনি কাউকে কিচ্ছু বলবেন না । দয়াকরে কাউকে কিচ্ছু বলবেন না । বাঁচবো না আমি…
আজমাল হোসেন হাসেন । বলেন…
” আমার অবর্তমানে ওকে তোমার প্রয়োজন হবে সাবিনা । নয়তো কে সামলাবে তোমায় ? কাউকে জড়িয়ে কাঁদার জন্য হলেও ওকে তোমার প্রয়োজন হবে । চিন্তা করো না , আমি চুপ থাকবো , বলবো না কাউকে কিছু ।
” আপনি আবার এসব কথা বলছেন ? কি হয়েছে আপনার ? কেনো বলছেন এসব ? কোথাও যাবেন না আপনি আমায় ছেড়ে । আমাদের সুখি পরিবার ঠিক যেমন ছিল, তেমনই থাকবে ।
আজমাল হোসেন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ।
এদিকে বাইরে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোয় মিহি । মিহিকে সিঁড়ির দিকে এগোতে দেখে রুহি ডাকে…
” ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস পাখি ? লিফট তো এদিকে ।
মিহি থেমে যায় । রাফি চোখ সরু করে দাঁড়িয়ে আছে । মিহি আমতা আমতা করে বলে…
” আ.. সিঁড়ি দিয়ে নিচে যাই ? লিফটের কি প্রয়োজন ?
” তিন তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামবি ? লিফট তো আছেই , তাহলে সিঁড়ি বেয়ে কষ্ট করে নামার কি প্রয়োজন ?
মিহি রাফির দিকে একবার তাকায় । চোখ সরিয়ে মিন মিন করে বলে…
” ঐ লিফটে উঠলে আমার অস্বস্তি হয় , মাথা ঘোরায় ।
” তো কি হয়েছে ? আমি তো আছি আয় তো…
বলেই মিহির হাত ধরে টেনে লিফটে নিয়ে যায় রুহি । রাফি লিফটে ঢোকে ।
মিহি শুকনো ঢোক গিলে চোখ গোল গোল করে ভীত নয়নে তাকিয়ে আছে । লিফটের দরজা বন্ধ হতেই ধক্ করে ওঠে মিহি । লিফট চলতেই মিহি চোখ খিচে বন্ধ করে পাশে রাফির বাহু ঝাপটে ধরে । আচমকা মিহির কান্ডে বিস্মিত হয়ে যায় রাফি । চোখ গোল গোল করে রুহির দিকে তাকায় । রুহি বড় বড় চোখে তাকিয়ে ছিল , রাফি তাকাতেই ঠোঁট চেপে হেসে ওঠে রুহি ।
মিহি রাফির হাত খামচে ধরে চোখ মুখ খিচে রেখেছে । রুহি এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, সামনের দৃশ্য এড়িয়ে যেতে চাইছে সে । মিহির স্পর্শে রাফি শুল্ক ঢোক গিলে ওর হাতের উপর হাত রাখে । রাফির হাতে মিহির নখ দেবে গেছে ।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই লিফট থামে । মিহি পিটপিট করে চোখ খোলে । নিজের হাতের বন্ধনে রাফির হাত আবিষ্কার করতেই ছিটকে দুরে সরে যায় মিহি । রুহি এখনো ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে । লিফট থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে মিহি ঘন ঘন চোখ ঝাপটে বলে…
” স..সরি….
রাফি রাশভারী গলায় বলে…
” ইটস ওকে ।
হসপিটালে এসেছে থেকে এই প্রথম কথা হলো মিহি আর রাফির মাঝে । তাও আবার দু’বাক্যের । কথা বলার সময় মিহি রাফির চোখের দিকে তাকায় নি ।
রাফির হাতে মিহির চারটা নখের দাগ বসে গেছে । রক্ত বেরিয়ে আসছে সেখান থেকে । মিহির চোখ আচমকা যায় রাফির হাতের দিকে । অমনি সে তড়িৎ বেগে তাকায় রাফির দিকে ।
নিরত কন্ঠে বলে…
” আপনার হাতে তো অনেকটা দাগ বসে গেছে । আম…রিয়েলি সরি,, আমি বুঝতে পারি নি ।
আ..নখ কাটতে মনে ছিল , আমি আজকেই গিয়ে কেটে ফেলবো । আপনি চলুন, মলম লাগাতে হবে তো , নয়তো ইনফেকশন হয়ে যাবে ।
” সমস্যা নেই…! এই টুকুতে কিচ্ছু হবে না ।
ব্যাস্ত হবেন না এতো ।
” সমস্যা নেই বললেই হলো ? যদি ইনফেকশন হয়ে যায় ?
” হলে আমার হবে , আপনার কি ?
” আমার কি মানে ? আমার সবকিছু..
আমার জন্যই ব্যথা পেয়েছেন আপনি ।
জেদ খাটিয়ে কথাটা বলে মিহি । মিহির কথায় রাফি ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে..
” এই ব্যথা পাওয়ার জন্য বারংবার প্রস্তুত আছি আমি.. ম্যাডাম !
” কি বিড়বিড় করছেন ? চলুন.. ওদিকে নার্স আপনাকে স্যানিটাইজ করে দেবে ।
বলেই একজন নার্সকে ডাকে মিহি । পাশের একটা ফাঁকা কেবিনে নিয়ে যাওয়া হয় রাফি কে । বসানো হয় একটা চেয়ারে । রাফি মুখের মাস্ক খুলতেই সামনে থাকা নার্সটা চিৎকার করে ওঠে । মুখ হাঁ করে চোখ দুটো মার্বেলের মতো গোল গোল করে তাকিয়ে থাকে রাফির দিকে ।
চোখ কচলে আবারো রাফির দিকে তাকায় । সামনে স্বয়ং রুজান রাফি চৌধুরী বসে আছে এটা ধ্যানে আসতেই লাফিয়ে উঠে নার্সটি । প্রফুল্ল কন্ঠে বলে…
” আপনি রুজান রাফি চৌধুরী ,,, স্যার,, আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান স্যার । প্লিজ আমাকে একটা অটোগ্রাফ দেবেন প্লিজ । আমি আপনার সব গান শুনি । ফেসবুকে রোজ স্টক করি আপনাকে । প্লিজ স্যার ,,শুধু একটা অটোগ্রাফ দেবেন প্লিজ ।
” ওকে, ওকে আপনি একটু আস্তে কথা বলুন । বাইরে যেন কেউ জানতে না পারে ।
আপনি আপনার কাজ করুন, আমি আপনাকে অটোগ্রাফ দেবো ।
” সত্যি স্যার। ,, thank you so much….
আপনার হাতে ঔষধ লাগাতে হলে তো আপনাকে ছুঁতে হবে ,, আ.. আমি আপনাকে ছুঁতে পারবো ! সত্যি ? ও মাই গড,, আমি স্বপ্ন দেখছি না তো ।
নার্সটা তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে মিহির সামনে যায় । মিহি আর রুহি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে । নার্সটা নিজের হাত মিহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে…
” আপু, আমাকে একটা চিমটি কাটুন তো । আমার না সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতো লাগছে । ঘোর লাগছে আমার । আমি সত্যি রুজান রাফি চৌধুরী কে আজ সামনা সামনি দেখলাম, আবার ছুঁতেও পারবো !
মিহি দাঁতে দাঁত পিষে বড় বড় নখ দিয়ে জোরে একটা চিমটি কাটে । এতে নার্সের কোন পরিবর্তন দেখা যায় না । বরং সে আবারো লাফিয়ে লাফিয়ে রাফির সামনে এসে বসে । মিহি আহাম্মকের মত তাকিয়ে থাকে ওর দিকে । কনুই দিয়ে রুহিকে খুঁচিয়ে বলে….
” ভাই এ কি পাগল নাকি ,, এতো বড় বড় নখ দিয়ে ওর ঐ নরম ত্বকে চিমটি কাটলাম, অথচ ওর কোনো রিয়াকশন নেই । আর তোর ভাই , তোর ভাইয়ের হাতে দাগ বসে গেছে । আর আমার এই নখের কবলে পড়ে এখন এই পাগলের পাল্লায় পড়েছে ।
বলতে বলতে হেসে ওঠে মিহি । রুহি মিহির কাঁধে থুতনি রেখে হাস্কি স্বরে বলে…
” আমার ভাইয়ের হাতে যে দাগ বসেছে সে দাগ কোনো সাধারণ দাগ নয় লা,, এটা হলো ভালোবাসার প্রথম চিহ্ন । যাকে বলে — লাভ বাইট ।
মিহি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে…
” কি সব আবোল তাবোল বলেছিস ?
” ঠিকি তো বলছি , আমার ভাইয়ার হাতে তুমি তোমার ভালোবাসার আঁচড় বসিয়ে দিয়েছো । ভালো ভালো,, ভালোবাসলে সেই ভালোবাসার দাগ রাখা প্রয়োজন ।
” ছিঃ রুহি ,, এসব কি বলছিস তুই ?
” আমি তো শুধু বললাম , আর তুই তো করলি ।
” আমি কি জেনে বুঝে করেছি নাকি ?
” না জেনেই হোক,, তবুও করেছিস তো । লাভ বাইট ইজ লাভ বাইট,, সেটা জেনে হোক বা না জেনে ।
” যাই হোক, এটা একটা ভুল ছিল । তাইতো ওনাকে এখানে নিয়ে আসলাম । নয়তো ওনার হাতে এই দাগ দেখলে তোর ভাবি ব্যাকুল হয়ে পড়তো ।
” ব্যাকুল হয়ে পড়েছো তুমি ? দেখলাম তো…
” আমি কেনো ব্যাকুল হতে যাবো ?
” আফটার অল, তুমি আমার ভাবি….
” ছিঃ রুহি ,, এসব কথা আর কখনো বলবি না । মজা করেই হোক, তবুও এই ধরনের মজা করা ঠিক নয় । তোর ভাইয়ার একজন মায়াবতী আছে তো । সেইদিন মেহজাবিন আপুর বিয়ের দিন বললো,, মনে নেই তোর ?
উনি তো তোর ভাবি হবেন । দেখিস নি ওনাকে ?
নিশ্চয়ই অনেক সুন্দরী ?
” কার কথা বলছিস বলতো ?
” কেনো,, মনে নেই ? সেইদিন রাতে তোর ভাইয়া বললো…
” ও মনে পড়েছে ,, আরে বুদ্ধু , ভাইয়া তো ওটা এমনি এমনি বলেছিল । লিনা আপুকে শোনানোর জন্য এমনি এমনি বলেছিল ।
আমি আমার ভাইয়া কে চিনি না নাকি ?
রুহির কথায় খানিক চুপ থাকে মিহি । মিহিকে চুপ থাকতে দেখে রুহি ওকে ঝাঁকিয়ে বলে…
” কি হলো রে ? তুই কি ভাইয়ার সেইদিনের ঐ কথাটাকে সত্যি মনে করেছিলি নাকি ?
” আ… হুম ।
ছোট্ট করে জবাব দেয় মিহি । রুহি শব্দ করে গাঁ দুলিয়ে হেসে ওঠে ।
” উফস্… আমার ভাইয়ার জীবনে কেউ নেই বুঝলি । কিন্তু তোকে একেবারে এন্ট্রি করাবো আমার ভাইয়ার বউ হিসেবে । ইশশশ.. আমার না ভাবলেই খুব খুশি লাগে , তুই যদি আমার ভাবি হোস, তাহলে খুব ভালো হবে রে ।
” তুই না যা তা একেবারে । যা খুশি তাই বলে দিস । সর তো এখান থেকে…
বলেই রুহির কাছ থেকে সরে আসে মিহি । রাফির হাতে মলম লাগিয়ে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে নার্স । অটোগ্রাফের সাথে রাফির সাথে ছবিও তুলেছে সেই নার্সটি । নার্সটি চলে গেছে অবশেষে । এতক্ষণ বকবক করে রাফির মাথার পুরো পোকা নাড়িয়ে দিয়েছে সে ।
মিহি রিসিপশনে এসে বাকি ফর্মালিটিজ গুলো শেষ করে ।
আজমাল হোসেন কে লিফট দিয়ে নিচে নামানো হয়েছে । সাফি আগে থেকেই বাইরে গাড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছিল । যার কারণে কোনো সমস্যা হয়নি আর ।
বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে আজমাল হোসেন কে । সম্পুর্ন বেড রেস্টে থাকতে হবে তাকে । এই কারনে অফিস থেকে টানা ২০ দিনের জন্য ছুটি নিয়েছেন তিনি । অসুস্থতার কারণে তার ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছিল ।
মিহি সবসময় আব্বুর খেয়াল রাখে । আজমাল হোসেনকে এখন নিচ তলা থেকে উপরে মিহির পাশের ঘরে সিফট করা হয়েছে । নিচে নামতে দেওয়া হয় না তাকে । মাঝে মাঝে ঘরেই হাঁটাহাঁটি করেন তিনি । ব্যালকনিতে গিয়ে হেলান কেদারায় মাথা এলিয়ে বসে থাকেন । এখন আর তেমন কোন কাজ নেই তার । অফিস থেকে ছুটি তো একেবারেই ছুটি । অফিসের কোন কাজ বাসায় করতে দেওয়া হয় না তাকে । মেয়ের কড়া নির্দেশ আছে এতে ।
মিহি যখন কোচিংয়ে থাকে, তখন মিহির দায়িত্ব পালন করেন সাবিনা বেগম ।
আজমাল হোসেন চেয়ে চেয়ে দেখেন সবটা । এই মা মেয়ে মিলে তাকে কতই না যত্ন করছে ।
এভাবে ঘরে বসে থাকতে থাকতে পুরো এক সপ্তাহ কেটে গেছে । মাঝে কেটে গেছে আরো পাঁচটি দিন ।
মিহি ওর নিজের মতো পড়াশোনায় ব্যস্ত । আব্বুর অসুস্থতার পর থেকে কোচিং থেকে সোজা বাড়ি ফেরে মিহি ।
আজও ফিরেছে । ফিরেই আব্বুর ঘরে চক্কর কেটেছে একবার । তারপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিতেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে মিহি ।
সন্ধ্যা ৭ টা ।
এক দেখায় পর্ব ১৭
রাফি সবে অফিস থেকে ফিরেছে । হেনা বেগম ছেলের জন্য কফি বানিয়ে ঘরে রেখে গেছেন । রাফি ফ্রেশ হয়ে গলায় টাওয়েল জড়িয়েই কফির মগ হাতে নিয়ে সোফায় বসে ।
একহাতে ফোন ঘাটতে ঘাটতে কফিতে চুমুক দেয় রাফি । ঘরের দরজার বাইরে কেউ পায়চারি করছে । দরজা চাপানো । দরজার নিচ দিয়ে কারোর ছায়া দেখা যাচ্ছে, কেউ বারবার দরজার সামনে এপাশ ওপাশ হাঁটাহাঁটি করছে । রাফি কফির মগে আরো একটা চুমুক দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে ডাকে..
