Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৩৪ (২)

এক দেখায় পর্ব ৩৪ (২)

এক দেখায় পর্ব ৩৪ (২)
সুরভী আক্তার

রাফির মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে আসলো মুহুর্তেই । কথাটা বোধহয় বুঝেও বোঝার চেষ্টা করলো না । ধক্ করে উঠে চোখ সরু করে তাকালো মানজাল হোসেনের দিকে । অবিশ্বাস্য রূঢ় কন্ঠে শুধালো…
” হোয়াট ? কি বললেন আপনি ?
মানজাল হোসেন তপ্ত শ্বাস ফেলে খানিক নিরস স্বরে জবাব দিলেন…
” হ্যাঁ বাবা ,, আজমাল হোসেন মারা গেছেন । আর ওনার পরিবার আজ বিকেলেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন কোথাও ।
রাফি আটকাতে পারল না নিজেকে । মুহুর্তেই কয়েক ধাপ এগিয়ে শক্ত করে কলার চেপে ধরলো মধ্য বয়স্ক লোকটার । আচমকা কান্ডে ভড়কে গেলেন মানজাল হোসেন । রাফি তীব্র ঝাজালো কন্ঠে দাঁত চেপে হুংকার ছাড়লো…

” বাড়ি ছেড়েছে মানে ? কোথায় গেছে ওরা ? বলুন কোথায় গেছে ?
লোকটা পিছনের দিকে হেলে বড় বড় চোখ করে তাকালেন । এই সুন্দর ছেলেটার সাথে এমন রুষ্ট ব্যবহার মোটেও মানাচ্ছে না । শান্ত দ্রুত পায়ে এগোলো রাফি কে আটকাতে । রাফির হাতের দৃঢ় বাঁধন কোন রকমে ছাড়ালো ওকে টেনে টুনে । রাফি কে পিছন থেকে জড়িয়ে দুরে সরিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো…
” আরে ভাই, পাগল হয়ে গেছিস নাকি ? ওনার বয়স দেখ , তোর বাপের বয়সী উনি । ওনাকে আগে বলতে দে সবটা । তার পর রিয়াক্ট কর ।
আপনি বলুন কোথায় গেছে মিহি আর ওর আম্মু ? বাড়ি ছেড়েছে মানে, হঠাৎ বাড়ি ছাড়লো কেনো তারা ? এই বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে উঠেছে ? কোথায়,কোন বাড়িতে উঠেছে ?
পরপর প্রশ্ন করলো শান্ত । বেচারা মানজাল হোসেন হাঁফ ছাড়লেন । রাফি এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাতে শক্ত করে মাথার চুল খামচে ধরলো । পুনরায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে তার মেজাজ । ভীষণ মাথা গরম হচ্ছে । কপালের পাশের রগ ফুলে উঠেছে অস্বাভাবিক ভাবে ।
মানজাল হোসেন রাফির দিক থেকে চোখ সরিয়ে ঢোক গিললেন । ভীত কন্ঠে মিনমিন করে বললেন…

” কোথায় গেছে তা তো জানি না । জিজ্ঞেস করেছিলাম,বলে যায় নি । শুধু বলেছে ঢাকায় আর থাকবে না তারা ।
পুনরায় তেঁতে উঠলো রাফি । লোকটার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তিনি আবারও সাফাই গাওয়ার স্বরে বললেন…
” বিশ্বাস করো বাবা , আমি জানি না কোথায় গেছে । ওরা তো আজ হঠাৎ করেই বাড়ি ছাড়লো । বিশ্বাস করো আমি অনেক জিজ্ঞেস করেছি , এই অবস্থায় তারা দুজন মা-মেয়ে কোথায় যাবে না যাবে , এটা নিয়ে আমিও ভেবেছি । কিন্তু ওরা যদি আমায় কিছু না বলে তাহলে আমি কি করবো বলো ?
তবে হ্যাঁ …
রাফি তৎক্ষণাৎ নিরেট কন্ঠে শুধালো…
” তবে,,, তবে কি ?
” যাওয়ার আগে মিহি মামুনি আমায় একটা বক্স দিয়ে গেছিলো । বলেছে কেউ খোঁজ করতে আসলে, ওটা যেন তাদের দেই । সেটা কি তোমাদের দেবো ?
সন্দিহান হয়ে শেষের প্রশ্ন টা করলেন তিনি । রাফি ওদের দিক থেকে শরীর ঘুরিয়ে পিছন ফিরলো । আড়াল করলো নিজের দৃষ্টি । নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল…
” নিয়ে আসুন !
মানজাল হোসেন এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলেন না । দ্রুত বেরিয়ে আসলেন বাড়ি থেকে । অতিরিক্ত প্রেসারে রাফির কপালের কাঁটা অংশ থেকে পুনরায় রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে । মোটা ব্যান্ডেজ ভেদ করে বাইরেও রক্তের লাল টকটকে ভেজা তরল স্পষ্ট লক্ষনীয় ।
চোখ মুখ খিচে শক্ত করে রেখেছে রাফি । মাথায় কিচ্ছু আসছে না এই মুহূর্তে । ঘোরপাক খাচ্ছে উল্টো পাল্টা চিন্তারা ।

কয়েক মিনিটের মধ্যে মানজাল হোসেন ফিরে আসলেন । হাতে একটা বড় প্যাকেট । তিনি এগিয়ে এসে শান্তর হাতে ধরিয়ে দিলেন সেটা ‌। শান্ত রাফির পিছনে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে ডাকলো…
” রাফি ! দেখ এটাতে কি আছে !
রাফি পিছন ফিরলো । প্যাকেট টার দিকে একপলক চেয়ে সেটা হাতে নিলো । কি অদ্ভুত, হাতে কম্পন অনুভূত হচ্ছে তার । কাঁপা হাতেই প্যাকেট টা খুললো রাফি । ভেতরে মিহির জন্মদিনে ওর দেওয়া সেই গোলাপী শাড়ি টা । সাথে ঝুমকা, চুড়ি সব । পাশেই এক টুকরো কাগজ । দুই আঙ্গুলে সেটা মুখের সম্মুখে ধরলো রাফি । কাগজ টাতে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা…
” বিশেষ দিন হয়তো আসবে আমার জীবনে , কিন্তু সেই বিশেষ দিনের সাক্ষী আপনি হবেন না । আপনার দেওয়া জিনিস ছুঁয়েছি শুধু , পড়িনি এখনো । নোংরা হয় নি এটা আমার স্পর্শে । তাই আপনার জিনিস আপনাকে ফেরত দিয়ে গেলাম । আপনার জীবনের স্থায়ী আবেদনময়ী কে দেবেন এগুলো । তাকে দেখবেন নতুন রুপে, চোখ ভরে দেখবেন । ভালো থাকবেন , রুহিকে ও ভালো রাখবেন । বিদায়……
লেখার লাইন গুলো ভাঙ্গা ভাঙ্গা । মনে হয় কাঁপা হাতে লিখেছে । রাফি চেয়ে থেকেই দু পা পিছিয়ে গেল । পড়লো আবারো । শাড়িটার দিকে তাকালো এবার । হাতে তুললো সেটা । হাতে তোলার সাথে সাথে ঝনঝন করে মেঝেতে কিছু পড়ার শব্দ হলো । রাফি আর শান্ত দু’জনেই চকিতে তাকালো সেদিকে । মিহি কে দেওয়া রোলেক্স ঘড়িটা মেঝেতে পড়েছে । শান্ত ওটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাফির দিকে তাকালো । রাফির চাহনি স্থির । শান্ত ঘড়িটা হাতে তুলে রাফির কাঁধে হাত রাখল । নরম কন্ঠে শুধালো…

” রাফি, ব্রো, আর ইউ ওকে ?
রাফি পিছনের সিঙ্গেল সোফা টায় সজোরে এক লাথি মারলো, চিৎকার করে ‘ড্যামেট’ বলে উঠলো সাথে সাথে । সোফাটা উল্টে পড়ে গেল নিমিষেই । মানজাল হোসেন চমকে উঠে ঝটকা মেরে পিছনে পিছিয়ে গেলেন । শান্ত রাফি কে সামাল দিতে বললো…
” কাম ডাউন রাফি ! শান্ত হ আগে । এই মুহূর্তে তুই এমন করলে, এমন বিচলিত হয়ে পড়লে চলবে না । প্লিজ, আমার কথাটা শোন…
রাফি কিড়মিড় করে হাতের প্যাকেট টা পাশে ছুড়ে মারলো । শান্ত কলার চেপে ধরলো আকস্মিক । রক্ত চক্ষু পাত করে তীব্র ক্ষোভ দেখিয়ে বললো…
” ও পারে না চলে যেতে । কিছুতেই পারে না । বাড়ি ছাড়ার সাহস কি করে হলো ওর । ও কিছুতেই চলে যেতে পারে না…
বার বার এক কথা আওড়াতে লাগলো রাফি । শান্ত সামাল দিতে বললো…

” কোথায় যাবে ও ? কোথায় যাওয়ার আছে ওদের, ভেবে দেখ ! কোথাও জায়গা নেই যাওয়ার । আগে ভালো করে খোঁজ নে , টোটালি ক্লিয়ার হ , তার পর এমন পাগলামী করিস । ওরা একা রাফি , কেউ নেই ওদের , যদি কোন বিপদ হয়…
” নাহ , কিচ্ছু হবে না ওর । ওর কিছু হলে আমি বাঁচবো কি করে ? আমাকে পাগল বানিয়ে এখন ও পালাবে ? কোথায় পালাবে ? পালাতে দেবো আমি ? আই ডোন্ট টলারেট ইট , সহ্য করবো না আমি । পালাতে দেবো না ওকে । ওকে বলেছিলাম না বাড়ি থেকে না বের হতে , এখন কিনা ও বাড়ি,শহর সব ছাড়ার পাঁয়তারা করছে ? ছাড়তে দেবো না ওকে ! আমাকে ছাড়তে পারবে না ও , কিছুতেই পারবে না । রুজান রাফি চৌধুরী ছাড়বে না ওকে…
কথাটা শেষ করেই হনহনিয়ে বাড়ি ছাড়লো রাফি ‌। শান্তও মেঝেতে পড়ে থাকা প্যাকেট টা হাতে তুলে পিছু নিলো ওর । এই রাফি ওর কাছে সম্পুর্ন নতুন । যাকে চিনতে পারছে না ও । কাল থেকে রাফি কে দেখে আসছে , এমনকি মিহি জীবনে আসার পর থেকেই দেখছে , এই রাফি আর আগের রাফির মধ্যে কতটা তফাৎ । এই রাফি এখন উন্মাদ , যে উন্মাদনা করছে একটা মেয়ের জন্য । অথচ আগের রাফি , তার জীবনে মেয়েদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না । কোনো মেয়ে কখনো ঠাঁই পায় নি তার জীবনে । কিন্তু এই যে , এক দেখায় একটা মেয়ের সাথে এভাবে জড়ালো রাফি , এটা কি অদ্ভুত নয়‌? যারা সহজে কোনো কিছুতে আটকায় না তারা একবার না একবার খুব সহজেই কোন জিনিসের সাথে আটকে যায় । সেটা মানুষ হোক বা অন্য কিছু । যেটার সাথে আটকালে নিজেকে ছাড়ানো অসম্ভব ভাবে দায় হয়ে পড়ে । রাফি ও এবার, আর জীবনে এই প্রথম বার আটকেছে কারোর সাথে । আটকেছে মিহির সাথে ।

সকাল সকাল রুহি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল । বাড়ির মোড়ের মাথায় শান্ত ড্রপ করে নিয়েছিল ওকে । দুই রাত ঘুমোনো হয় নি । না শান্তর আর না রাফির । শান্তর চোখ দুটো লাল । চেহারায় পরিশ্রান্ত ছাপ স্পষ্ট লক্ষনীয় । রুহি থমথমে মুখে বসে আছে গাড়িতে । শান্তর পাশে । শান্ত একটু আগে সময় নিয়ে সবটা খুলে বলেছে ওকে । রুহি তাজ্জব বনে শুনে গেলো সবটা । চোখে অবিশ্বাসের রেখা । বিশ্বাস হলো না শান্তর কথা গুলো । রুহি নিরুদ্বেগ হয়ে আহত স্বরে শুধালো.…
” মজা করছেন আমার সাথে ? দেখুন আমি কিন্তু এখন মজার মুডে নেই । একদম ভালো লাগছে না আমার ! আমায় আমার পাখির কাছে নিয়ে চলুন । ভাইয়া ওর সাথে আছে তাই না ? আমিও যাবো , নিয়ে চলুন আমায় …
শান্ত ওর হাতটা টেনে ধরলো । অসহায় চোখে তাকিয়ে নরম কন্ঠে বলল…
” আমি মজা করছি না , জান । মিহি বাড়িতে নেই , বাড়ি ছেড়েছে ওরা । কোথায় গেছে জানা নেই ।
রুহির চোখ ছলছল করে উঠলো । এক্ষুনি কেঁদে দেবে মেয়েটা । এমনিতেই ও নরম স্বভাবের । শান্ত ওকে বলতে চায় নি এক্ষুনি, কিন্তু না বলেও উপায় ছিল না । রুহি ঠিক জানতে পারতো । তখন আরো বেশি রিয়াক্ট করতো । রুহির ছলছল চোখ দেখে শান্তর মন বিচলিত হয়ে উঠলো । ও দুহাতের আজলায় রুহির কোমল মুখ খানা আগলে নিলো । রুহি শান্তর হাতের উপর হাত রেখে ভেজা কন্ঠে বলল…
” আমার পাখি কে খুঁজে দিন প্লিজ । ওকে আমার কাছে নিয়ে আসুন আপনি । ও আমার সবকিছু , ওকে পাইয়ে দিন ।

রুহি কথা বলতে পারছে না গলার রুদ্ধতায় । শান্ত ওকে নিজের বাহু দ্বারা জড়িয়ে নিলো । আশ্বাস জুগিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল…
” হুম, পাইয়ে দেবো ওকে । চিন্তা করো না জান । কোথায় আর যাবে ওরা । ঠিক ফিরিয়ে আনবো । সোর্স লাগিয়েছি চারপাশে । ঠিক খোঁজ পাবো ওদের । এইতো এইটুকু একটা শহর, কোথায় যাবে ওরা ? তোমার পাখি তোমার কাছে ঠিক ফিরে আসবে । আর তোমার ভাইয়ার কাছেও । ও যে বন্দি তোমার ভাইয়ার খাঁচায় , যার পাখি তার খাঁচায় ঠিক ফিরবে ।
রুহি মাথা তুললো । ঝাপসা দৃষ্টিতে শান্তর মুখপানে চেয়ে শুধালো…
” ভাইয়া কোথায় ?
” রিসর্টে আছে !
” আমি ভাইয়ার কাছে যাবো , নিয়ে চলুন আমায় !
” না জান , রাফি এখন অনেক ডিস্টার্বড । তুমি বাড়িতে যাবে এখন , এতক্ষণে হয়তো বড় মামা জেনে গেছেন আমাদের ফেরার কথা । তুমি বাড়িতে গিয়ে দেখো কি হচ্ছে…
” ভাইয়া ঠিক আছে তো ?

” ঠিক থাকতে পারে বলে মনে হচ্ছে তোমার ? তোমার আন্দাজের থেকেও রাফি বেশি ভালোবাসে মিহি কে । ভেবে দেখো ওর কি অবস্থা ? তবে তুমি টেনশন করো না , সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি আছি তো রাফির সাথে ।
রুহি ঠোঁট উল্টে ফুঁপিয়ে উঠলো । শান্ত আবারো ওর মুখখানি আগলে চোখের পানি আলগোছে মুছিয়ে দিলো । ওষ্ঠ বাড়িয়ে কপালে শক্ত চুমু আঁকলো এই প্রথম । অনুভূতিহীন থাকতে পারলো না মেয়েটা , চোখ বুজলো পরম আবেশে । শান্ত ওর মুখ পানে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ । অতঃপর কপালে কপাল ঠেকিয়ে শীতল কন্ঠে বলল…
” আই লাভ ইউ জান , আমিও তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি । এভাবে এক মুহুর্তের জন্য হলেও মিহির মতো দূরে সরে যেও না প্লিজ । রাফির মতো ধৈর্যবান ছেলেটাও ধৈর্য হারাচ্ছে । সেক্ষেত্রে আমি ? আমি হয়তো বাঁচবো না তোমায় ছাড়া…
রুহি চোখ খুলে শান্তর মুখ পানে তাকালো । মৃদু স্বরে আওয়াজ তুললো…
” আই লাভ ইউ ঠু মাচ…আই সয়ার,,,
কক্ষনো দূরে যাবো না আমি । শুধু আমার জন্য বেঁচে থাকুন আপনি, আমিও বাঁচতে চাই আপনার জন্য । আপনার সাথে , শুধু আপনার জন্য ।

দুপুরের দিকে বাড়ি ফিরেছেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । অনেক টা রেগে আছেন দেখেই বোঝা যাচ্ছে । বরাবর গম্ভীর থাকলেও রাগ প্রকাশ করেন না তিনি । ছেলে মেয়েদের ক্ষেত্রে তো একেবারেই না । যথাসম্ভব সংবরন করেন নিজেকে । তবে আজ ভিন্ন । রাফি ফিরে এসেছে এটা আজ অফিসে যাওয়ার পর‌ জানতে পেরেছেন তিনি । সুদানের ক্লাইন্ট দের সাথে মিটিং ছিল , যেটা হয় নি । তারা জানানোর পর রাশেদ রায়হান চৌধুরী জানতে পেরেছেন রাফির দেশে ফেরার কথা । গম্ভীর হয়ে থমথমে মুখে সোফায় বসে আছেন তিনি । রুহি সিঁড়ির পাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাথা নুইয়ে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী হেনা বেগমের উদ্দেশ্যে ভারী গলায় বলে উঠলেন…
” কি এমন মহৎ কাজ ছিল,যার জন্য এক রাতেই দেশে ফিরতে হয়েছে তোমার ছেলেকে ? তেরো কোটি টাকার প্রজেক্ট ছিল , দুমাস ধরে এই প্রজেক্টের পিছনে পড়ে আছি । কোটি কোটি টাকা ইনভেস্ট করেছি এতে ! এতো গুলো টাকার ব্যপার, ছেলে খেলা ভেবেছে ও সব কিছুকে ?
হেনা বেগম শান্তনার সুরে বললেন…

” এতো উত্তেজিত হবেন না আপনি । রাফি কে তো আপনি চেনেন , ও যে এসব কিছু কে ছেলে খেলা ভাববে না এটাও জানেন । নিশ্চয়ই কোনো জটিল কারণ আছে , নয়তো ও এভাবে কাজ ফেলে চলে আসবে কেনো ?
” সেটাই তো জানতে চাইছি , কি এমন কারণ আছে ওর দেশে ফেরার ?
হেনা বেগম কথা বললেন না । ফোন হাতে ছেলের নাম্বারে ফোন লাগিয়ে কানে তুললেন । রাশেদ রায়হান চৌধুরী আড়চোখে তা দেখে ফের গম্ভীর স্বরে বললেন…
” ফোন করে লাভ নেই, ফোন করে ওকে পাওয়া গেলে এখানে এসে হম্বিতম্বি করতাম না আমি ! হাজার বার ফোন করেছি, ফোন সুইচ অফ । শান্ত কেও পাই নি । কোথায় ওরা , দেশে ফিরেছে মানলাম, আমার ছেলের প্রতি বিশ্বাস আছে আমার ! কিন্তু ওরা বাড়ি ফেরে নি কেনো ? কি হয়েছে ওদের ?
শেষের কথা গুলো বলতে গিয়ে কন্ঠ নরম হয়ে আসলো তার । হেনা বেগম কান থেকে ফোন নামালেন । এবার চিন্তায় কয়েক স্তর ভাঁজ পড়লো তার কপালে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী চোখ ঘুরিয়ে সিঁড়ির পাশে গুটিয়ে থাকা রুহির পানে তাকালেন । অতঃপর শীতল কন্ঠে ডাকলেন…

” রুহি…
” জ্বি আব্বু…
তৎক্ষণাৎ চকিতে জবাব রুহির । রাশেদ রায়হান চৌধুরী উঠে গিয়ে ওর সম্মুখে দাঁড়ালেন । হালকা কন্ঠে শুধালেন…
” ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে ? ও কোথায় জানো তুমি ?
রুহি না চাইতেও অস্বীকার করলো । দুদিকে মাথা নাড়ালো নত মস্তিষ্কে । চোখ তুলে তাকালো না । তাকালে ছলছল চোখ দুটো ধরা পড়ে যেত আব্বুর নিকট । রাশেদ রায়হান চৌধুরী আবারো বললেন…
” শান্তর সাথেও কথা হয় নি ?
রুহি আবারো মাথা ঝাঁকিয়ে অসম্মতি প্রকাশ করলো । রাশেদ রায়হান চৌধুরী শান্ত কন্ঠে বললেন…
” ঘরে যাও…
রুহি চোখ নামিয়েই ঘাড় কাত করে পিছন ফিরলো । দু’ধাপ সিঁড়ি এগোতেই আবারো রাশেদ রায়হান চৌধুরী ডেকে বললেন…
” মিহি মামনি’র কাছে যাবে না আজ ? যাও নি কেনো…?
রুহি থমকালো । রুদ্ধ স্বরে বলল…
” পরে যাবো আব্বু…

আর কথা বাড়ালেন না কেউ । এদিকে কোটি টাকার প্রজেক্ট নিয়ে যতটা না টেনশন, তার থেকে বেশি টেনশন রাফি কে নিয়ে । রাফি এমন ছন্নছাড়া নয় , নিজের কাজের প্রতি যথেষ্ট তাগিদ আছে তার । এমন বেপরোয়া নয় ও । তাহলে কি এমন হলো , যে ও ওর এতো সাধ্যের কাজ ফেলে এভাবে হাত গুটিয়ে নিলো । তাও আবার কাউকে কিছু না জানিয়ে । না বাড়ি ফিরলো , আর না কাউকে কিছু জানালো ।
সন্ধ্যা গড়িয়েছে ধরনীতে । মিরপুরের একটা ছোট খাটো রেসর্টে পরপর শাঁ শাঁ করে দুটো কালো গাড়ি এসে থামলো । প্রথম গাড়িটা পার্কিং লট পর্যন্ত পৌঁছালো না । সেটা থামলো রেসর্টের একপাশে । সেই গাড়ি থেকে নামলো রাফি । টালমাটাল পায়ে রেসর্টে প্রবেশ করে দোতলার নিজ দখলের ঘরটায় ঢুকলো সে । পরের গাড়ি টা থেকে নেমে শান্তও দ্রুত ছুটলো ওর পিছু পিছু । ঘরে গিয়ে রাফি কে পেলো না । ওয়াশ রুমের দরজা চাপানো । শান্ত দরজা ঠেলে খুলতেই দেখতে পেল রাফি কে । শাওয়ার এর নিচে সামনের দেয়ালে দুহাত ঠেসে দাঁড়িয়ে আছে ও । গাঁ ভিজে জবজবে । গায়ের এলোমেলো সাদা শার্ট টা ভিজে লেপ্টে আছে সুঠাম পেটানো শরীরে । কাল থেকেই একই অবস্থা ওর । না কিছু খেয়েছে আর না কোনো পরিবর্তন এসেছে নিজের অবস্থার । শান্ত নিশ্চল চোখে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো । দরজা আবারো চাপিয়ে বেডের পাশের সিঙ্গেল সোফাটায় বসলো । দুহাতের তালুতে মুখ ঢেকে বসে রইলো কিছুক্ষণ । তার পর মাথা নিচু করে ঘাড় চেপে ফ্লোরে দৃষ্টিপাত করলো ।

প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর ওয়াশ রুম থেকে বের হলো রাফি ‌। পড়নে একটা শর্ট ধূসর রঙা ট্রাউজার, সেটাও ছোপ ছোপ ভেজা । কপালে ভেজা চুল লেপ্টে । পানি ঝড়ছে অনবরত । শরীরে বিন্দু বিন্দু পানির কনা ‌ । গলায় টাওয়েল ঝোলানো থাকলেও, শরীর টা মোছার চেষ্টা করলো না রাফি । এতক্ষণ ভেজার পর হাত পা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে । কেমন স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে ফর্সা উদ্দাম শরীর টা । কাল থেকেই চোখ রক্তিম লাল । শান্ত তাকালো ওর দিকে । নিস্তব্ধতা পুরো রুমে । রাফি বসলো বেডের একপাশে । দুর্বোধ্য ভাবভঙ্গি তার । ওকে দেখে বোঝার জোঁ নেই ভেতরে কি চলছে । তবে শান্ত ঠিকি আন্দাজ করতে পারছে ওর অবস্থা । মিহির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি এ অবধি । সেই কাল রাত থেকেই এক মুহুর্তের জন্য থেমে থাকে নি রাফি । গুপ্ত ফোর্স লাগিয়েছে চারদিকে । মিহির লাস্ট লোকেশন ছিল ওদের বাড়িতেই । এর পর আর খোঁজ নেই । ও আর ওর আম্মু – দুজনের ফোনই সম্পুর্ন আউট অফ লোকেশন । রাফির দেওয়া লোকেশন সেট ঘড়িটা ও রেখে গেছে মিহি । সেটা সাথে থাকলে কোনো কথাই ছিল না , এতক্ষণে মিহি রাফির সম্মুখে থাকতো । ঘড়িটা মিহির সাথে নেই ,, আর ভাগ্য রাফির সহায় নেই ।
থানা পুলিশের চক্করে পড়তে চায় না রাফি । সে নিজেই খুঁজবে তার ব্লোসোম কে । খুঁজেছে আজ সারাদিন , ঢাকা শহরের প্রতিটা ওলি-গলি, থেকে শুরু করে সব জায়গায় খুঁজেছে । বাস স্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন সব জায়গায় কড়া ফোর্স লাগিয়েছে , যাতে শহর ছাড়তে না পারে । আবার মাথায় চিন্তা এসেছে – যদি শহর ছাড়ে এতক্ষণে, তাহলে ? এই চিন্তায় শহরের বাইরেও আশেপাশের সব জায়গায় খোঁজ চালানোর ব্যবস্থা করেছে । এক রাতে না হোক , দুই রাত কিংবা তিন রাতের মধ্যে তো নিশ্চয়ই ঠিক খুঁজে পাবে মিহি কে ।

এই টুকু আত্মবিশ্বাস আছে নিজের মধ্যে । ও নিজে ঠিক খুঁজে পাবে মিহি কে ।
রাফির ফোর্স শুধু ঢাকায় থেমে থাকে নি । রংপুরে মিহি দের আগের বাসস্থলেও পৌঁছেছে । সেখানেও ওদের খোঁজ পাওয়া যায়নি । যদি ওরা আগের জায়গায় ফিরে থাকে তাহলে খবর পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই ।
শান্তর নিজেকে ক্লান্ত লাগছে ভীষণ । কাল থেকে অনেক দৌড় ঝাঁপ পোহাতে হচ্ছে ওকে , রাফি কে সামলাতে গিয়ে আরো বেশি । এদিকে রাফি ? ওর মাঝে ক্লান্তির রেশ টুকুও নেই । অথচ ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পুরো শরীর । চোখের নিচে ছাপ স্পষ্ট ।
শান্ত রাফির পাশে নিঃশব্দে বসলো । জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো…
” কাল থেকে খাস নি কিছু , খাবি একটু ? খাবার অর্ডার করি ?
রাফি তাকালো না । অসার কন্ঠে শুধু বললো…
” ক্ষিদে নেই !

” যা করছিস , তা করার জন্য তোকে স্ট্রং থাকতে হবে ! না খেয়ে এভাবে ছুটে বেরিয়ে দুর্বল হলে চলবে না । মিহি পাখি কে তো খুঁজে বের করতে হবে নাকি ? তুই এমন করলে , কি করে হবে ? বাচ্চাদের মতো হয়ে যাচ্ছিস তুই ?
রাফি তাকালো । চাহনি দূর্বল । ঠোঁটের কোণে ফিকে হাসি ঝুলিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বললো…
” ওকে তো খুঁজে পাবোই । পেতেই হবে ! ও আমার জীবনের একমাত্র চাহনা ছিল , ছাড়ি কি করে বলতো ? সবকিছু তছতছ করে হলেও ওকে খুঁজবো আমি । প্রয়োজন হলে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে যাবো , তবুও ওকে খুঁজে বের করবো। ওকে চাই আমার , খুব করে চাই । আমাকে দহনে পুড়িয়ে ও পালাবে কোথায় ? আমার দহনে ওকেও পুড়তে হবে । আমার দহনে পোড়ার জন্য হলেও ওকে চাই আমার ।
রাফির কন্ঠে জলন্ত প্রতিঙ্গা । চোখ মুখ শক্ত তার , অথচ মনটা যে ভেঙ্গে যাচ্ছে তা বুঝতে বাকি নেই শান্তর । শান্ত এবার না বলতে গিয়েও মনের বিরুদ্ধে বললো…

” হারানো জিনিস সাধ্যের মধ্যে থাকলে খুঁজে পাওয়া যায় , কারণ আশ্বাস থাকে সেটা হারিয়েছে, খুঁজলে ঠিক পাওয়া যাবে । মানুষের ক্ষেত্রেও তাই । কিন্তু যে মানুষ নিজে থেকে হারায় , লুকায় নিজে থেকে, তাকে কি করে খুঁজে পাবি তুই ? ও যদি ধরা না দেয় , ধরবি কি করে ?
রাফি চোখ সরালো । উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত কন্ঠে বলল…

এক দেখায় পর্ব ৩৪

” ধরা তো ওকে দিতেই হবে । ভেবেছে কি ও ? এতো সহজে ছাড় পাবে আমার হাত থেকে ? রুজান রাফি চৌধুরীর হাত এতোটা দূর্বল , যে ছাড়বে ওকে ? পৃথিবীর কোন কোণায় লুকিয়ে থাকবে ও ? সেখান থেকে ওকে খুঁজে বের করবো আমি ! ওকে ধরেছি ছাড়ার জন্য নয় , রেখে দেওয়ার জন্য , সারাজীবনের জন্য ।

এক দেখায় পর্ব ৩৫