এক দেখায় পর্ব ৩৫
সুরভী আক্তার
সময় বহমান । চলছে তা নিজ গতিতে । থেমে নেই কারোর জন্য । টিক টিক করে ঘড়ির কাঁটায় কয়েক লক্ষ সেকেন্ড বয়ে গেছে । দিন কেটেছে, সপ্তাহ গড়িয়েছে । আজ পুরো আট দিন পর চৌধুরী বাড়িতে ফিরেছে রাফি । চেহারার হাল বেহাল । এই আটটা দিন দমে থাকে নি সে । ঢাকা’তেও থাকে নি । পাগলের মতো এখানে ওখানে আন্দাজে ছুটে বেরিয়ে খুঁজেছে মিহি কে । কোথায় কোথায় খুঁজেছে ঠিক নেই । এক জায়গায় তন্ন তন্ন করে বারবার খুঁজেছে । প্রতিটা মুহূর্তে শান্ত ছিল ওর সাথে । রাফি আজ ব্যাহত । গুঁড়িয়ে গেছে সে । মনে মনে হতাশ হয়ে পড়ছে । এতো কিছু, এতো ফোর্স, এতো খোঁজার পরেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তার ব্লোসোম কে । এটা কি ব্যর্থতা নয় ? রাফি কি ব্যর্থ নয় ওকে খুঁজতে ? তার ব্লোসোম এই টুকু একটা শহরের গন্ডি পেরিয়েছে শুধু , তাতেই পুরো দেশের আনাচে কানাচে খোঁজ করেছে রাফি । কিন্তু পায় নি । তাহলে এর মানে কি দাঁড়ায় ? রাফি পরাভূত ?
ব্যার্থ প্রেমিক পুরুষ সে ? এতটাই ব্যর্থ, যে সামান্য খোঁজ টুকু ও পাচ্ছে না এতো দিনে । রাফি বাড়িতে ছিল না এতো দিন । কারোর সাথে কথাও বলে নি । তবে শান্ত বাড়ির সবাই কে ম্যানেজ করেছে এটা ওটা বুঝিয়ে । রাফি কে অনেক বোঝানোর পর ও এই কদিনে বাড়িতে ফেরাতে পারে নি । আজ নিজে থেকেই বাড়িতে এসেছে রাফি । ক্লান্ত অবসন্ন শরীর টা এলোমেলো । নিজের যত্ন নেওয়া হয় নি কদিন । পরিপাটি ফিটফাট ছেলেটা অপরিপাটি আজ । যে কেউ দেখলে ভিড়মি খাবে প্রথম প্রথম । রাফি কে এভাবে দেখতে কেউই অভ্যস্ত নয় । এভাবে দেখেছে কি না জানা নেই কারোর । গায়ে একটা অফ হোয়াইট টিশার্ট , সেটাও কুঁকড়ে আছে । চুল গুলোও এলোমেলো । এমন অবস্থায় বাড়ি ফিরেছে রাফি । সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে কোনো দিকে তাকায় নি । সোজা বড় বড় কদম ফেলে এগিয়েছে সিঁড়ির দিকে । পেছনে ড্রইং রুমে রাশেদ রায়হান চৌধুরী, জুবায়ের চৌধুরী উপস্থিত । রাশেদ রায়হান চৌধুরী নিজের ছেলেকে এমতাবস্থায় দেখে ভড়কালেন । ছেলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বৃহৎ নয়নে তাকালেন । ডাকলেন পিছন থেকে, রাফি সাঁড়া দিলো না । তার ডাক শুনে কিচেন থেকে ছুটে বেরিয়েছেন হেনা বেগম । ছেলে কে পিছন থেকে পরিশ্রান্ত অবস্থায় সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে দেখে তিনি ও ডাকলেন । রাফি কারোর ডাকেই প্রতিক্রিয়া দেখালো না । শান্ত সিঁড়ির নিচ থেকে হেনা বেগমের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…
” রাফি অনেক টায়ার্ড মামি । ওকে ফ্রেশ হতে দাও আগে , তার পর আমি ওকে নিচে নিয়ে আসছি । আপাতত দু কাপ কফি পাঠাবে উপরে ? ভীষণ প্রয়োজন এটার…
হেনা বেগম ক্ষুদ্র নেত্র ফেরালেন ছেলের দিক থেকে । অতঃপর শান্তর দিকে তাকিয়ে নিরাস বললেন…
” তোরা যা , আমি এক্ষুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি ।
শান্ত ও আর কথা বাড়ালো না । নিজেও উঠলো সিঁড়ি বেয়ে । রাফি ঘরে এসে শাওয়ার নিয়েছে । ফ্রেশ হয়ে বসেছে সোফায় । চোখ বুজে মাথা এলিয়ে দিয়েছে পিছনের দিকে । ভীষণ ক্লান্ত সে । চোখ বুজে আসছে আপনা আপনি ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দু কাপ কফি নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকলো রুহি । এতোক্ষণ বিষন্ন মনে জেনির সাথে ছাদে পায়চারি করছিল সে । ভাইয়ার আসার খবর পেয়ে ছুট লাগিয়েছিল নিচে , হেনা বেগম ডেকে দু কাপ কফি ধরিয়ে দিয়েছে ওর হাতে । রুহি দুহাতে দু কাপ কফি নিয়ে এক প্রকার হুড়মুড়িয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকেছে । ঠান্ডা শীতল ঘরে রাফি কে সোফায় মাথা এলিয়ে বসে থাকতে দেখে কাঁপা গলায় ডাকলো রুহি…..
” ভাইয়া ..!
রাফি বন্ধ চোখ মেললো ধীরে ধীরে । রুহি কে দেখে মলিন মুখে শুকনো হাসলো । রুহি এলোমেলো পায়ে এগিয়ে গেল । কাপ দুটো টেবিলের উপর রেখে বসলো রাফির পাশে । জড়ানো গলায় বলল…
” এসেছো তুমি ? আমি সরি ভাইয়া ,, আমার পাখি কে একা রেখে আসা উচিত হয়নি । বিশ্বাস করো আমি ওকে একা রেখে আসতে চাই নি , আমি জানতাম না এমনটা হবে ! আমি অনেক অনেক সরি ভাইয়া…. তোমার কথা রাখি নি আমি, শুনিনি তোমার কথা ।
বলতে বলতে পানি জমলো চোখে । রাফি নিরুদ্বেগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । বললো না কিছু । বলার ইচ্ছেও জাগলো না । রুহি ফুঁপিয়ে উঠে ভেজা কন্ঠে আবারো বললো….
” পাখির এখনো কোনো খোঁজ পাও নি ভাইয়া ?
এবার এক শব্দের কথা ফুটলো রাফির জবানে । সে নিস্তেজ মৃদু আওয়াজে বলল…
” উঁহুম…
রুহি এবার মাথা নামিয়ে চিবুক গলায় ঠেকিয়ে শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো । রাফি তাকালো চঞ্চল চোখে । অসার তবে উদ্বিগ্ন হয়ে শুধালো…
” কাঁদছিস কেনো ?
রুহি ক্রন্দনরত কন্ঠে বললো….
” সবটা আমার জন্য হয়েছে । আমার ভুল সবটা , আমি ভুল করেছি । ওকে এই অবস্থায় একা রেখে আসা একদম উচিত হয়নি আমার । শোনা উচিত হয়নি কারোর কথা । তোমার কথা রাখতে পারি নি আমি । আমি পারিনি ওকে সামলে রাখতে ।
” এতে তোর কোনো দোষ নেই Sissy । যা হবার হয়েছে , তোকে ভাবতে হবে না এসব নিয়ে ।
” পাখি কে খুঁজে পাওয়া যাবে তো ভাইয়া ?
রাফি চোখ ফেরালো । পিছনের দিকে হেলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সিলিংয়ের দিকে । চোখে পলক ফেললো কয়েকবার । ভারী বুকে লম্বা শ্বাস টানলো বুক ভরে । অতঃপর হুতাশ স্বরে বলল…
” যাবে । ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে ।
” তুমি ঠিক আছো তো ?
রাফি তাকালো । নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল….
” হুম ,,,একদম ঠিক আছি !
রুহির কান্না পাচ্ছে ভীষণ । ঠোঁট ভেঙে কান্না আসছে । রাফির সামনে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করে রাফিকে আর দূর্বল করতে চায় না রুহি । ঠোঁট কামড়ে কান্না চেপে রুহি আবারো অপরাধি স্বরে বলল….
” আমি আবারো সরি ভাইয়া… তোমার কথা অনুযায়ী আমি আমার ভাবি জান কে দেখে রাখতে পারি নি । তুমি আমার উপর রেগে আছো , তাই না ?
” নাহ বোন ! আমি একদম রেগে নেই তোর উপর । তুই তো আমার লক্ষী বোন , তোর উপর রেগে থাকতে পারি আমি ?
” তাহলে তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করো আমার ভাবি জান কে । আমি কিন্তু অপেক্ষায় আছি । এবার ওকে আর হারাতে দিও না । বিয়ে করবে তো এবার ওকে ? সারাজীবন নিজের কাছে আর আমার কাছে রেখে দেবে এবার , আর যেন হারাতে না পারে ।
রাফি নিঃশব্দে হাসলো । রুহির মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিলো । শান্ত ওয়াশ রুমের দরজা থেকে দেখলো দুই ভাই বোন কে । রাফির শুকনো মুখের মলিন হাসি টুকুও প্রশান্তি জোগালো শান্ত কে ।
রুহি ঘরে থেকে বেরিয়ে আসার পর রাফির ফোনে একটা কল আসে । রাফি থমথমে মুখে রিসিভ করে সেটা । নিজে কিছু বলে না । ওপাশ থেকে কিছু বলতেই আবারো ব্যাহত হয়ে ফোন রেখে দেয় ।
সাড়ে আটটার দিকে রাতের খাবারে টেবিলে বসেছে সবাই । রাফি এসেছে থেকে নিচে নামে নি । ওর অবস্থা দেখে কেউই আর ওকে ডিস্টার্ব করে নি । সময় দিয়েছে ওকে । হেনা বেগম ছেলের ঘরে যেতে চাইলে বাঁধা দিয়েছেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । এখন খাবারের সময় । তবুও নিচে নামছে না রাফি । হেনা বেগম অসহায় মুখে চেয়ে আছেন স্বামীর পানে । রুহি আর জেনি একপাশে বসে আছে মাথা নুইয়ে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী একে একে সবাই কে দেখে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন । রাফির সাথে কথা বলা প্রয়োজন । ছেলেটা কে কেমন ভঙ্গুর লাগছে । কিছু তো হয়েছে ! নয়তো রাফির হাবভাব এমন হবে কেন ? হঠাৎ করে দেশেই বা ফিরলো কেনো ? তাও আবার কাউকে কিছু না জানিয়ে । আর এই আটটা দিন কোথায় বা ছিল ও ? রাশেদ রায়হান চৌধুরী চিন্তিত, অবসন্ন । তিনি উঠলেন রাফির ঘরের দিকে । দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শব্দ করে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিলেন । দরজা হালকা চাপানো ছিল । উপস্থিতি টের পেয়ে শান্ত কয়েক মুহূর্তের মাঝেই চাপানো দরজা খুলে সামনে দাঁড়ালো । দরজার সামনে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পেছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । শান্ত তাকে দেখে অপ্রস্তুত হাসার চেষ্টা চালালো । রাশেদ রায়হান চৌধুরী ফাঁক গলিয়ে ঘরের ভিতর নজর বুলিয়ে নিলেন একবার । অতঃপর শান্তর দিকে ফিরে শান্ত কন্ঠে বললেন…
” নিচে যাও তুমি , সবাই অপেক্ষা করছে খাবারের টেবিলে । রাফির সাথে কথা আছে আমার , আমি ওকে নিয়ে আসছি একটু পর ।
শান্ত নিজেও পিছন ফিরে একবার তাকালো । অতঃপর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । ওর বেরিয়ে আসার পর সময় নিয়ে আরো একবার গলা খাঁকারি দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । রাফি বাবার উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে । বুকে হাত গুটিয়ে নিগুড় চোখে চেয়ে আছে দূর আকাশের পানে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী পিছনে দাঁড়ালেন । ছেলেকে কিছু সময় সরু চোখে পর্যবেক্ষণ করে ডাকলেন অতঃপর….
” রাফি….
রাফি পিছন ফিরলো । নরম সুরে উত্তর করলো…
” জ্বি আব্বু…
রাশেদ রায়হান চৌধুরীর সোজাসুজি প্রশ্ন…
” কি হয়েছে তোমার ?
” কোই , কিছু না আব্বু ! কি হবে ?
তপ্ত শ্বাস ফেললেন তিনি । এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন ছেলের পাশে । কাঁধে হাত রাখলেন নিজ উদ্যোগে । কন্ঠ আরো বেশি মোলায়েম করে শুধালেন …
” কিছু হয় নি ?
রাফি উত্তর দিতে পারলো না । চোখ সরালো । আবারো তাকালো দূরের আকাশের দিকে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী ফের বললেন…
” রাফি ,, কি হয়েছে বাবা ?
প্রশ্ন টা কানে পৌঁছানো মাত্রই চোখের পলক পড়ার আগে রাফি এক মুহুর্তেই শরীর ঘুরিয়ে জড়িয়ে ধরল আব্বু কে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী হতভম্ব । কপালে ভাঁজ পড়লো তার । ছেলের আচরণ দূর্বোধ্য । তিনি হাত রাখলেন ছেলের পিঠে । উদ্বিগ্ন হয়ে শুধালেন…
” রাফি ,, ঠিক আছো তুমি ? কি হয়েছে বাবা ? শরীর খারাপ ?
রাফি হাতের বাঁধন আলগা করে আব্বু কে ছাড়লো সময় নিয়ে । ভঙ্গুর কন্ঠে বলল….
” আই এম ফাইন , আব্বু ।
” দেখে তো মনে হচ্ছে না ! পিতৃ অধিকার থেকে আবারো জিজ্ঞেস করছি,, কি হয়েছে বাবা ? তোমাকে এমন লাগছে কেন ? আর এই কদিন কোথায় ছিলে তুমি ?
রাফি প্রসঙ্গ পাল্টালো…
” প্রজেক্টের কাজ হয় নি আব্বু । আমাদের ডিটারমাইন্ড প্রজেক্ট অন্যদের কাছে হ্যান্ড ওভার হয়েছে । সমস্ত ইনভেস্ট…
” থাক ,, এসব নিয়ে ভেবো না । আমার কিছু যায় আসে না এসব নিয়ে । তোমার কি হয়েছে সেটা বলো ? এই তুমি টাকে আজ দ্বিতীয় বার দেখছি আমি । প্রথম বার দেখেছিলাম ছয় বছর আগে , আর আজ আবার ! তোমাকে এভাবে দেখে অভ্যস্ত নই আমি । এভাবে মানায় না আমার ছেলে কে । কোনো কিছু নিয়ে টেনশনে আছো তুমি ? বলা যাবে না আমায় ?
রাফি তাকিয়ে থাকলো । মনের সকল কথা গলা অবধি এসে আটকে গেছে । আর ওগলাতে পারছে না রাফি । সংশয় কাজ করছে মনে । কুন্ঠা ঠেলে মনের কথা গুলো ঝেড়ে বাইরে প্রকাশ করতে ইচ্ছে করছে । তবে এখনো হয়তো সঠিক সময় আসে নি । রাফি বলতে গিয়েও বলতে পারলো না । শুধু আশ্বাস দিয়ে বলল….
” আমি একদম ঠিক আছি আব্বু । কিচ্ছু হয় নি আমার ।
ছেলের দ্বিমত বুঝে আর এই নিয়ে কথা এগোলেন না রাশেদ রায়হান চৌধুরী । তপ্ত শ্বাস ফেলে তিনিও থমথমে মুখে হাসার চেষ্টা করলেন । অতঃপর বললেন….
” নিচে চলো ,, সবাই অপেক্ষা করছে । তোমার আম্মু তোমার পছন্দের সব রান্না করেছেন আজ , চলো….
রাফি মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আব্বু কে সায় দিলো । অতঃপর নিচে নামলো ।
আজ কদিন পর বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিয়েছে রাফি । অশান্ত মনটাকে শান্ত করার চেষ্টায় ব্যস্ত সে । তবে চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে । মন টিকছে না এক মূহুর্ত । শ্বাস নেওয়া দায় হয়ে পড়েছে । এতোটা কষ্ট হচ্ছে কেনো ? কেনো ? কেনো রাফি বিচলিত হয়ে পড়ছে বারবার ? মনকে মানাতে পারছে না কেনো ? মন কেনো বিপরীতে মোড় নিচ্ছে । কি সব আজেবাজে চিন্তা আসছে মনে । মিহি কে তো পাওয়া যাবে, ঠিক পাওয়া যাবে , রাফি নিজেকে আশ্বাস জোগাচ্ছে বারবার । কিন্তু কবে পাওয়া যাবে ? আর কত দিন ? কত ঘন্টা ? কত মুহূর্ত লাগবে ওকে কাছে পেতে ? ওকে চোখের সামনে একটাবার দেখার তৃষ্ণা জাগছে ? খুব ইচ্ছে জাগছে ।
রাফি ভাবতে ভাবতে শোয়া থেকে উঠে বসলো । পাশে তাকালো শান্তর দিকে । ও ঘুমিয়ে , এই কদিনে ও নিজেও অনেক কিছু সহ্য করেছে । রাফি ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিঃশব্দে নেমে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো । খোলা আকাশের দিকে মুখ করে চোখ বন্ধ করে লম্বা লম্বা শ্বাস টানলো । দম আটকে আসছে মনে হচ্ছে । রাফি চোখ খুললো , আকাশে অর্ধচন্দ্র । অর্ধেক চাঁদ আলো দিচ্ছে ক্ষীন । রাফির চোখের কালো কুচকুচে মনিতে তুখোড় ভাবে ধরা দিলো চাঁদটা । মনে পড়লো অনেক কিছু । চাঁদের আলোয় লক্ষনীয় হলো চোখের কোনায় জমা চিকচিক বারি টুকু । ওটুকুর সাক্ষী রইল না কেউ , এক ঐ আকাশের চাঁদ ছাড়া । রাফি চোখ সরিয়ে নিজের ফোন হাতে নিলো । এলবামে পুষে জমিয়ে রাখা একটা ছবি বের করলো । সেটার দিকে নিশ্চল , নিখুঁত,নিগুড় চোখে তাকিয়ে থাকলো ক্ষনের পর ক্ষন । ডান হাত বাড়িয়ে চার আঙ্গুলে ছুঁয়ে দিলো ছবিটাকে । অতঃপর সেটাকে বুকের সাথে মিশিয়ে চোখ বন্ধ ফিসফিস করলো…
” কোথায় হারালে তুমি ? তোমার শূন্যতা ভীষণ ভাবে পোড়াচ্ছে আমায় । দেখো, আমি ঠিক নেই । আজ আমার তোমার অভাব বোধ হচ্ছে । তোমার অভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি । তোমাকে না ছুঁয়ে উপলব্ধি করেছি সবসময় , কিন্তু আজ , আজ তোমাকে একটা বার ছোঁয়ার ইচ্ছে জাগছে ভীষণ । ইচ্ছে জাগছে আমার মনের কথা বলতে । আর তুমি , কি করলে এটা তুমি ? আমার অনূভবের কথা , মনের কথা সব বলার আগেই হারিয়ে গেলে ? কোথায় হারালে ? প্লিজ ফিরে এসো । আর পারছিনা আমি । আমার সহ্য শক্তি কমে আসছে । তুমিই প্রথম ছিলে , যাকে নিজের করে চেয়েছি আমি । যাকে আমি আমরা বিশেষ পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রেখেছি , যাকে নিজের আপন বানাতে চেয়েছি । বিশ্বাস করো, আগে কখনো চাইনি এমন । তুমি কিন্তু আমার অপশন নও, তুমি আমার একমাত্র সমাধান , ওয়ান এন্ড অনলি প্রায়োরিটি । প্লিজ ফিরে এসো….
সময় চলছে । দেখতে দেখতে সাত সাতটি মাস পেরিয়েছে ।
সিলেট শহর ,, যেখানে নতুন একটা সকাল । বৃষ্টি হয়েছে সকাল থেকে । পিচঢালা রাস্তার দুই ধার কর্দমাক্ত । লালচে রঙের কাদা মাটি । বৃষ্টি হওয়ায় গাছের পাতা চুঁইয়ে চুঁইয়ে টুপটাপ পানি পড়ছে এখনো । ঝিরঝির বৃষ্টি ঝড়ছে খোলা আকাশ থেকে । জাফলং এর আধো পাহাড়ি রাস্তা , রাস্তায় বাক অনেক । পাহাড়ের বুক চিরে আসা ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টিময় আবহাওয়া মিলে মিষ্টি শীতল শীহরন বইছে চারপাশে । গায়ে কাঁটা ফেলছে উক্ত ঠান্ডা শীহরনে । রাস্তার দুই ধারে বৃহৎ উন্মুক্ত খোলা আকাশের নিচে চা বাগানের সারি, সবুজের পর সবুজ । সবুজে ঘেরা চারদিক । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর চারপাশ ।
এখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর নেই , কমেছে পুরোপুরি । তবে আবছা কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে আছে এখনো । মেঘ আর পাহাড়ের মিলনস্থলে সবুজে ঘেরা এক অদ্ভুত অপূর্ব রূপসী ভুমি জাফলং । এখানে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে তুলির আঁচড়ে এক জীবন্ত ছবি এঁকেছে । পাহাড়ের দিক থেকে শহরের দিকে চলে গেছে কালো পিচের রাস্তা । রাস্তার দুই ধারে ফাঁক ফাঁক করে লাগানো উঁচু উঁচু বিরাটকায় গাছ , তার পাশেই নিচু ভূমিতে চা বাগান । ভোর ভোর কচি চা পাতা তোলার ধুম পড়ে । শহরে ঢোকার আগে মেইন রাস্তার পাশে কতকগুলো সারি সারি চায়ের দোকান ।কফিশপ, আইসক্রিম পার্লার, ছোট ছোট মল সবকিছুই আছে । এগুলো মেইন শহরের বাইরে । জাফলংয়ে বর্তমান টুরিস্ট কম । শহরের বাইরে হওয়ায় রাস্তা ঘাটেও যানযট কম, নেই বললেই চলে । যেসব গাড়ি চলাচল করে সেগুলো মেইন শহরের দিকে অগ্রসর হয় । ভেজা পিচঢালা রাস্তায় চার চাকা গাড়ি আর সাইকেল চলে অধিক চলে ।
একটা কালো চকচকে চার চাকা গাড়ি ছুটে চলেছে শহরের দিকে । গতি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি । ড্রাইভিং সিটে একজন যুবক । চোখে কালো সানগ্লাস ,, মুখের ভঙ্গিমা শক্ত , তবে তার নিজের কাছে এটা স্বাভাবিক । পাশের সিটের উপর মুঠো ফোনটা বেজে যাচ্ছে সেই কখন থেকে । ফোনের শব্দে চশমার আড়ালেই চোখ কুঁচকায় সে । বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ পড়ে । বাঁকা চোখে একবার নজর বোলায় ফোনের স্ক্রিনের দিকে । ভেসে থাকা নাম্বার দেখে চোখ সরায় । সেভাবেই বাজতে বাজতে কেটে যায় ফোনটা । তৃতীয় বার ফোন আসলে চরম বিরক্তিতে মুখে ‘চ’ সূচক শব্দ উচ্চারণ করে সে । একহাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে অন্য হাত বাড়িয়ে সিটের উপর থেকে ফোন খানা হাতে তুলে নেয় ।
সাথে সাথে রিসিভ করে কড়া কাঠ কাঠ রুষ্ট কন্ঠে বলে….
” হোয়াটস ইউর প্রবলেম…? বার বার এভাবে কল করার মানে কি ? বলছি তো আসছি ?
ফোনের ওপাশ থেকে চুপসে যাওয়া কন্ঠে কেউ কিছু বলতেই শিথিল হয় পুরো মুখশ্রী । কপালের ভাঁজ স্বাভাবিক হয়ে টানটান হয়ে আসে । শক্ত কন্ঠে নির্মলতা টেনে সে আবারো বলে….
” আই উইল কাম , এজ সুন এজ পসিবল..!
বলেই ফোন খানা কেটে দেয় । সেটা আবারো আগের জায়গায় ছুড়ে মারে । গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দেয় আগের তুলনায় । শহরের কোলাহল থেকে দূরে চারপাশের নীরবতায় অদ্ভুত প্রশান্তি লাগছে আজ । বহুত দিন পর এমন অনুভুতি হচ্ছে । নিজেকে নতুন লাগছে , অদ্ভুত শিহরণ জাগছে ।
সামনের একটা চায়ের দোকানের সামনে কতগুলো মানুষের সমাগম । তারা একসাথে দাঁড়িয়ে কাউকে ঘিরে রেখেছে হয়তো । আশেপাশের গুটি কয়েক মানুষ সেদিকে খেয়াল না দিয়ে নিজের কাজে ব্যাস্ত । ড্রাইভ করার সময় চায়ের দোকানের সামনের মানুষ গুলোর ভিড়ের দিকে নজর পড়লো একবার । পর মূহুর্তে নজর সরিয়ে সামনে মোড় ঘুরতেই আচমকা গাড়ির সামনে পড়লো কেউ । তৎক্ষণাৎ ভিমড়ি খেলেও এক ঝটকায় ব্রেক কষলো গাড়ির মালিক । চাকার ঘর্ষণে গাড়িটা থামলো সামনের মেয়েটার ঠিক কয়েক সেন্টিমিটার দূরে , মেয়েটার পায়ের কাছে বোধহয় । ভয়ে – আতঙ্কে সামনের শীর্ণ মেয়েটা চোখ মুখ খিচে দুহাত কানে দিয়ে চিৎকার করে উঠেছে মুহূর্তেই । সাথে সাথে আঁতকে উঠে টাল হারিয়ে হুমড়ি বসে পড়েছে গাড়ির সামনের পিচের রাস্তায় । গাড়ির মালিক সামনের গ্লাস ভেদ করে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটার কান্ড , কপাল কুঁচকে ক্ষিপ্ততায় দাঁতে দাঁত পিষলো অবিলম্বে । তার তো কোন দোষ নেই ! একেই দেরি হচ্ছে , তার উপর আবার এই উটকো ঝামেলা । দেখে চলতে পারে না নাকি এরা ? গাড়ির মালিক দরজা খুলে বেরিয়ে আসলো গাড়ি থেকে । গাড়ির সামনের গুটিয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকালো । কোমর ছড়ানো ঘন লম্বা লম্বা চুল গুলো দিয়ে ঢেকে আছে মেয়েটা । মুখশ্রী আড়ালে । গলার ভাঁজে চিবুক নামানো । মুখের উপর এলোমেলো চুল । এখনো কান চেপে ধরে বসে আছে । মেয়েটা কে এভাবে দেখে বিরক্ত লাগলো ভীষণ । কটমট করে উঠলো লোকটা , তীব্র কঠিন স্বরে ধমকে উঠলো…..
” আর ইউ স্টুপিড ,,, দেখে চলতে পারেন না ?
ধমক শুনে আরো গুটিয়ে গেল মেয়েটা । চমকে উঠলো বোধহয় । তবে নড়চড় দেখিয়ে মুখ তুলে তাকালো না । সেভাবেই রইলো । আবারো ধমক আসলো গর্জিত কন্ঠে….
” এক্সকিউজ মি… এভাবে বসে আছেন কেনো ?
উঠুন সামনে থেকে…। কি হলো , কথা কানে যাচ্ছে না ?
মেয়েটা আবারো চমকালো । মুখ না ফিরিয়ে দ্রুত উঠলো । পিছন ও ফিরলো না , এলোমেলো কম্পিত পা এক কদম বাড়াতেই পায়ে ওরনা জড়িয়ে টালমাটাল হয়ে আবারো হুমড়ি খেয়ে পড়ল খাঁজ খাঁজ রাস্তায় । সাথে সাথে ব্যাথিত কন্ঠে অস্ফুটে ‘আহ্’ সূচক আর্তনাদ বেরিয়ে আসলো আপনা আপনি । উক্ত শব্দ কানে পৌঁছাতেই পিছনের জন ধক্ করে উঠলো । এক কদম বাড়িয়েও থেমে গেল । মেয়েটা উঠে বসেছে কনুই চেপে । ব্যাক সাইড ব্যতীত কিছুই দেখা যাচ্ছে না তার । ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ কানে আসতেই পিছনের জন এগোলো এবার । এগোতে এগোতে শক্ত কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো….
” আর ইউ ওকে…?
বলতে বলতে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো । মাথা নিচু করে দেখার চেষ্টা করলো মেয়েটা কে । আচমকা উঠে দাঁড়ালো মেয়েটা, উদ্দাম পায়ে পিছন ফিরে সবেগে পা বাড়ালো । টু শব্দ টুকুও করলো না মুখ দিয়ে । প্রথম পা মাটিতে পড়লেও দ্বিতীয় পা বাড়িয়ে মাটিতে ফেলতে পারলো না সে । তার আগে পিছন থেকে হেঁচকা টানে এক ঝটকায় ওকে নিজের দিকে ফেরালো কেউ । সচকিত হয়ে উঠল মেয়েটা । সঙ্কিত হয়ে চোখ তুললো । সামনের জন চেয়ে আছে বৃহৎ নয়নে । চোখে স্থিরতা,আর অবিশ্বাস্য । দুজনের চোখ একে অপরের দিকে অনড় । সামনের ছেলেটা একহাতে মেয়েটার কনুই চেপে ধরে আছে । অন্য হাত তাকিয়ে থেকেই বাড়িয়ে দিলো মেয়েটার দিকে । মেয়েটা নড়লো না এক রত্তিও । সে চেয়ে আছে অদ্ভুত দৃষ্টিতে । ছেলেটা হাত বাড়িয়ে মেয়েটার গালে হাত রাখতেই সম্বিত ফিরল মেয়েটার । ওর টনক নড়তেই সামনের ছেলেটা ফিসফিসে অস্পষ্ট কন্ঠে বলে উঠলো…
“মিহি…
সামনের মেয়েটার ভাবভঙ্গি দূর্বোধ্য । বুদঁ হয়ে চেয়ে আছে সে । এভাবে ওর তাকিয়ে থাকার মাঝেই ছেলেটা হাঁসফাঁস করে অদ্ভুত স্বরে বললো…
” ইউ মিহি,,? আর ইউ মিহি ?
বলতে বলতে এবার অবস স্বরে বলল…
” আই ক্যান হাগ ইউ …? প্লিজ !!
বলেই উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে একটানে নিসংকোচে আঁকড়ে ধরলো মেয়েটাকে । শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের মাঝে । একহাত কোমরে অন্য হাত মেয়েটার মাথায় চুলের ভাঁজে চেপে রাখা । পৌরুষের তীব্র কঠোর বাঁধনে জড়ালো মেয়ে টাকে । নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ । কেউ হয়তো দেখছে না তাদের , দেখলেও তাদের খেয়াল নেই । কয়েক মুহূর্ত এভাবে কেটে যাওয়ার পর মেয়েটা উশখুশ করতে লাগলো নিজেকে ছাড়ানোর জন্য । শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে কাজ হলো না । অবশেষে একটা চিকন কন্ঠ ভেসে আসলো.. মেয়ে টা জড়ানো কন্ঠে বলল….
” ছ..ছাড়ুন আমায় ! আই এম ফাইন…
এভাবে ধরার মানে কি ? ছাড়ুন বলছি….
ছেলেটা শুনলো না । সে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল । চোখ বুজে উপলব্ধি করার চেষ্টা করলো বুকের মধ্যিখানে আবৃত করে রাখা ছোট জীর্ণ নারী শরীরটাকে । বুকের ভেতর হার্টবিট বেড়ে গেছে তার । মেয়েটা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে সেটা । এদিকে পুরুষালি স্পর্শ তাকেও জমিয়ে দিয়েছে । মেয়েটা ছোড়াছুড়ি না করে চোখ বন্ধ করে ঢোক গিলে একই স্বরে আবারো বললো…
” কি হলো ? ছাড়ুন বলছি..
ছেলেটা এবার ছাড়লো । নিজের থেকে মেয়েটাকে সরিয়ে ওর দুই বাহু আঁকড়ে ধরলো , দৃষ্টি তার কম্পমান , হাত পাও কাঁপছে ক্রমান্বয়ে । চেহারায় বিচলিত ভাব স্পষ্ট । সে উদ্বিগ্ন হয়ে নিজেকে ধাতস্থ করতে না পেরে আবারো মেয়ে টাকে জড়ালো নিজের প্রশস্ত বুকের সাথে । ও কিছু বলার আগেই মেয়েটা চরম বিরক্তিতে দুহাতে ঠেলে দূরে সরাতে সরাতে রুক্ষ কন্ঠে বলে উঠলো….
” আজব তো…!
একটা অচেনা অজানা মেয়েকে এভাবে বারবার জড়িয়ে ধরছেন কেনো আপনি ? মেয়েদের দেখলে গায়ে ঢলে পড়তে ইচ্ছে করে শুধু.. তাই না ?
উৎসুক ঠোঁটের হাসি টুকু ফিকে হলো খানিক । মেয়েটা চোখ মুখ কুঁচকে দূরে সরে দাঁড়িয়েছে । ভ্রু দ্বয় নাকের ডগা বরাবর জড়ো করে রেখেছে । ছেলেটা ঘাঢ় কাত করে চেয়ে থাকলো খিয় মুহূর্ত । অতঃপর এগিয়ে গেল,, দুহাতের আজলে মেয়েটার মুখখানি আগলে নিয়ে দূরত্ব ঘুচে সন্নিকটে দাঁড়ালো । ঘোর দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে কপালে কপাল ঠেকালো । চোখ বুজে নিস্তেজ হয়ে বললো….
” কোথায় ছিলে তুমি এতোদিন ? তুমি জানো , কতো খুঁজেছি তোমায় ?
তুমি , তুমি এখানে কি করছো ?
মেয়েটা এক ঝটকায় দূরে সরালো ছেলেটাকে । তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রুক্ষ কন্ঠে বলল….
” এখানে কি করছি মানে ? জন্মের পর থেকেই এখানে আছি,,আর এখানে থাকবো না তো কোথায় থাকবো ? আর আপনি আমায় খুঁজতে যাবেন কেনো ? কে আপনি ?
সামনের জন হতভম্ব । হতবাক কন্ঠে বলল…
” আমি কে ? জিজ্ঞেস করছো ? ভুলে গেছো রুজান রাফি চৌধুরী কে ? আমার চেহারায় কি কোনো পরিবর্তন এসেছে ? নাকি মজা করছো আমার সাথে ?
মেয়েটা পুনরায় ঢোক গিললো । নজর নিচু করে স্থান ত্যাগের জন্য পিছন ফিরে পা বাড়ালো । আবারো রাফি কনুই ধরে হেঁচকা টান মারলো ওকে । রাস্তায় পড়ে যাওয়ার ফলে কনুইয়ের কাছে ছিলে গেছে অনেকটা অংশ । সেখানে হাতের চাপ পড়তেই ব্যথায় কুকিয়ে উঠলো মেয়েটা । মুখ দিয়ে ব্যথিত অস্ফুট স্বর বের করতেই রাফি কনুই ছেড়ে দিলো ।
আতঙ্কিত কন্ঠে বলল…
” সরি মিহি ,, আই এম রিয়েলি সরি ,,, লাগলো তোমার ? ব্যথা পেয়েছো ? দেখি কি হয়েছে…
বলেই হাতখানা উল্টে পাল্টে দেখতে লাগলো মেয়েটার । মেয়েটা কিংকর্তব্য বিমূঢ় । গোল চোখে তাকিয়ে আছে নির্বিকার ভঙ্গিতে । চোখের কোণা ছলছল করছে তার । ব্যথায় কি না জানা নেই ! ব্যথা তো বটেই ! তবে হাতের এই সামান্য ব্যথা নয় এটা ।
রাফি বিচলিত হয়ে মেয়েটার হাত দেখছে । ওর ঠোঁট জোড়া কাঁপছে তির তির করে । এই মুখে হাসি ফুটছে , আবার গায়েব হচ্ছে । চোখের চাহনি কম্পমান । কনুইয়ের কাছটায় হাত বুলিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালো রাফি । প্রথমেই তাকালো ডাগর চোখ দুটোর দিকে । চোখ দুটো দেবে গেছে , কালি পড়েছে চোখের নিচে । চোখের পাপড়ি গুলো ভেজা বোধহয় । নিজের ভেজা চোখে ঠিক ঠাহর করতে পারল না রাফি । এবার আগা গোড়া পরখ করলো মেয়েটা কে । ওর চেনা মতে পাতলা ছিমছাম চেহারা টা আগের তুলনায় শুকিয়েছে কয়েক স্তর । রাফির নিজের চেহারায় পরিবর্তন এসেছে কি না ওর জানা নেই , তবে মিহির চেহারায় যে পরিবর্তন এসেছে তা স্পষ্ট চোখে ধরা দিচ্ছে । রাফি বিচলিত, উত্তেজিত , নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়েছে ওর কাছে । এতো দিন পর সেই চিরচেনা মুখটাকে দেখে , সেই অতি স্বল্প পরিচিত মেয়ে টা-যে তার হৃদয়ে প্রথম দেখায় বিস্তর জায়গা করে নিয়েছিল, সেই মেয়েটাকে এইভাবে দেখে খেই হারিয়ে যাচ্ছে রাফির । কন্ঠ নালি শুকিয়ে যাচ্ছে । বুক ধড়ফড় করছে তীব্র গতিতে । এই মেয়ে টাকে তো কম খোঁজে নি রাফি । গত সাত মাসে আকাশ পাতাল এক করে খুঁজেছে , এখনো খুঁজেই যাচ্ছে । খোঁজার চেষ্টায় খামতি রাখে নি কোনো । তবুও খুঁজে না পেয়ে নিজেকে দোষারোপ করেছে বারংবার । নিজের চেষ্টার ঘাটতি খুঁজেছে , হয়তো কোন ঘাটতি আছে, নয়তো খুঁজে পাবে না কেনো ? এক রাতেই কোথায় গায়েব হয়ে গেল তার প্রেয়সী !
আর আজ , আজ এভাবে হঠাৎ মিহি কে এভাবে খুঁজে পাবে ,রাফি কি ভেবেছিল ? ওর চোখে এখনো অবিশ্বাস ! মনে হচ্ছে ভ্রম ! ভ্রম কাটলে আবার গায়েব হয়ে যাবে তার ব্লোসোম । কিন্তু রাফি, ও আর হারাতে দেবে না এই মেয়েকে ।
রাফি চেয়ে আছে মেয়েটার পানে । মেয়েটাও সজল চোখে চেয়ে আছে । দুজনের দৃষ্টিই একে অপরের দিকে থমকে আছে । পলক ফেলতেও ভুলে গেছে রাফি ।
অনেক মূহুর্ত কেটে গেলো এভাবে তাদের দৃষ্টির অদ্ভুত মিলনের মধ্য দিয়ে । অবশেষে মেয়েটা চোখ ফেরালো । ঘন পলক ঝাপটে এদিক ওদিক চোখ ঘোরালো । পলক পড়তেই টুপ করে পানি গড়ালো চোখ থেকে । তৎক্ষণাৎ হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিলো সেটা । রাফি বিমূঢ় হয়ে চেয়ে থেকে নিঃশব্দে হাসলো ।
হাত বাড়িয়ে দিলো পানি টুকু মুছিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে । মেয়েটা পিছিয়ে গেল তৎক্ষণাৎ । ভেজা নরম কন্ঠ ঠেলে আবারো তীব্র কন্ঠে বলল….
” ছোঁবেন না আমায়…
রাফি শ্বাস টানলো ,, কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো…
” সরি মাই ডিয়ার ব্লোসোম,, আই এম রিয়েলি ভেরি সরি…! তোমায় পেতে পেতে অনেক সময় ব্যয় করে ফেললাম । অনেক দেরি করে ফেললাম । প্লিজ ক্ষমা করে দাও আমায় !
দেখো আজ পেয়েছি তোমায় , আমি কিন্তু পাইনি তুমি নিজে এসেছো । আর এমন ভাবে আসলে দেখো , ব্যাথা পেলে তুমি । সরি মিহি , আমার দোষ, আমি বুঝতে পারি নি গাড়ির সামনে এসে যাবে তুমি ! সরি , আমার জন্য ব্যাথা পেয়েছো তুমি ।
রাফি কি থেকে কি বলছে সে নিজেও জানে না বোধহয় । মাথা কাজ করছে না তার , এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু । মেয়েটা না বোঝার ভঙ্গিতে চেয়ে থেকেই বললো….
” ইটস ওকে… আমি ঠিক আছি !
বলেই হনহনিয়ে হাঁটা লাগালো । রাফি সুক্ষ্ম নেত্রে তাকালো । মিহি কে এভাবে এগোতে দেখে পথ রোধ করে দাঁড়ালো । মেয়েটা চোখ তুলে তাকালো রাফির দিকে ।
” কি হলো , এভাবে সামনে দাঁড়ালেন কেনো আবার ?
” কোথায় যাচ্ছো তুমি ?
” কোথায় যাচ্ছি মানে ? আর আপনি আমায় তুমি তুমি করে বলছেন কেনো ? চেনেন আমায় ?
” চিনি না বুঝি ?
মেয়েটা চোখ নামালো । জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁপা গলায় বলতে আড়ম্ভ করলো…
এক দেখায় পর্ব ৩৪ (২)
” দ…দেখুন আমি চিনি না আপনাকে ! কে আপনি ? বারবার আমার গায়ে পড়ছেন কেনো এভাবে ? মিহি , মিহি কে ? আমি মিহি নোই । আমি চিনি না মিহি কে ! আপনার হয়তো ভুল হচ্ছে । অন্য কারোর সাথে গুলিয়ে ফেলছেন আমায় । আমি, আমি মিহি নোই । আমার নাম মাহি । সরুন আমার পথ থেকে , যেতে দিন আমায় ।
