Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৩৬

এক দেখায় পর্ব ৩৬

এক দেখায় পর্ব ৩৬
সুরভী আক্তার

রাফি থমকালো । সাথে সাথে আশেপাশের শান্ত পরিস্থিতিও । রাফির অবিশ্বাস্য চাহনি মেয়েটার পানে । মেয়েটা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে । রাফির চোখের সাথে চোখ মেলাচ্ছে না একটা বারের জন্যেও । রাফি তাকিয়েই এগোতে লাগলো , মেয়েটা নত জানু হওয়ায় রাফির পা এগোতে দেখে ঘাবড়ালো বোধহয় । একটু কেঁপে উঠে জিভে অধর ভিজিয়ে পেছাতে লাগলো সে ‌। কয়েক কদম পেছাতেই পিঠ ঠেকলো রাফির গাড়ির সাথে । থমকে দাঁড়ালো মেয়েটা । চোখ তুলে তবুও রাফি কে এগোতে দেখে কাঁপা গলায় আঙ্গুল তুলে বললো….
” দ..দেখুন ,, কে আপনি ? এভাবে এগোচ্ছেন কেনো ? মতলব কি আপনার ? আমি আপনাকে চিনি না বললাম তো । কেনো এমন করছেন আমার সাথে ? এগোবেন না আপনি ,, নয়তো আমি কিন্তু এবার চিৎকার করে লোক জড়ো করতে বাধ্য হবো ।

রাফি শুনলো না । এগোতে এগোতে একেবারে সন্নিকটে দাঁড়ালো মেয়েটার । ওর পুরুষালি সুঠাম শরীরের আড়ালে মেয়েটার শীর্ন শরীর খানা হারিয়ে গেছে প্রায় । মেয়েটা ভয়-আতঙ্কে চোখ খিচে আরো বেশি সিটিয়ে দাঁড়ালো । রাফি ওদের মধ্যকার শেষ অল্প দূরত্ব টুকুও ঘুচলো । কোমর জড়িয়ে একেবারে শরীরের সাথে মেশালো তার ব্লোসোম কে । আজ তার বুকের ভেতরের সমাধিতে পুষে রাখা হাজারো অনুভুতিরা দীর্ঘ সময় পর জেঁকে উঠেছে পুনরায় । রাফি আজ প্রশান্ত হলেও ওর হৃদয় অশান্ত । অশান্ত হৃদয়ে লালন করে রাখা আবেগ গুলো বাঁধ ছাড়া হয়ে যাচ্ছে আজ । রাফির নিয়ন্ত্রণে নেই সেগুলো । সে নিজেও নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে আজ । নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাফি দুহাতে শক্ত করে আকড়ে ধরেছে তার ব্লোসোম কে । তবুও সে অতৃপ্ত । ইচ্ছে করছে বুকের গহীনে মিশিয়ে নিতে । তবুও তৃপ্তি মিটবে কি না সন্দেহ ! এই দীর্ঘ সাত মাসের দূরত্ব, বিরহ-বিয়োগ , নিঃসঙ্গতা , তার ব্লোসোমের অনুপস্থিতি , সবমিলিয়ে রাফি কে এই মুহূর্তে আর স্বস্তি পেতে দিচ্ছে না । মেয়েটার থেকে আর এক নখ পরিমাণ দূরত্ব টুকুও বাড়াতে দিতে চাইছে না মন ।

রাফির শক্ত রাফি গরম শ্বাস বিঁধছে মেয়েটার কাঁধে । মেয়েটা কয়েক মুহূর্ত স্থির রইলো । দেখলো রাফির পাগলামি ‌। দেখেই গেলো শুধু , তাও চোখ বুজে অনুভবের মাধ্যমে । বললো না কিছু । বন্ধ চোখের কর্নিশ বেয়ে অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়লো এক পর্যায়ে ‌। এক ফোঁটা গালে এসে আটকালো,অন্য ফোঁটা রাফির ব্লেজার শুষে নিলো । বেশ কয়েক মুহূর্ত পর মেয়ে টাকে জড়িয়েই রাফি হিসহিস করে ক্ষীন নির্লিপ্ত স্বরে আওয়াজ তুললো….
” আর কিছু সময় তোমাকে এভাবে জড়িয়ে রাখি ? প্লিজ…! নাও , আই কান্ট কন্ট্রোল মাইসেলফ..!
মেয়েটা এবার নড়ে উঠলো । চোখ খুলে জড়ানো গলায় ঢোক গিললো । রুদ্ধ স্বরে আওয়াজ তুললো…
” ছাড়ুন আমায়…
রাফি ছাড়লো না । বরং হাতের বাঁধন নরম করলো একটু । জোর নরম হলেও ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা শক্ত, তীব্র । ভয় কাজ করছে, যদি এটা মরীচিকা হয় ? যদি উবে যায় আবারো ?
রাফি আলগা করে জড়িয়ে মাথা তুলে শীতল কন্ঠে বলল…

” কেনো করলে এমনটা ? চলে আসলে কেনো ? শুধু একটা মাসই তো চেয়েছিলাম তোমার কাছে , আর তুমি , সাত সাতটা মাস কাটিয়ে দিলে ? এভাবে পোড়ালে আমায় ? এই সাতটা মাসে কি অবস্থা হয়েছিল আমার কোনো আইডিয়া আছে তোমার ? পাগল হয়ে গেছি আমি ? কোথায় না খুঁজেছি তোমায়,বলো ? কিন্তু পাই নি, ব্যর্থ হয়েছি আমি । তোমাকে খুঁজে না পাওয়াতে ভেঙ্গে গেছি আমি , তোমাকে খুঁজে না পাওয়ার গ্লানিতে গুড়িয়ে গেছে রুজান রাফি চৌধুরী । প্লিজ আর জ্বালিয়ো না , আর শক্তি নেই আমার । ফুরিয়ে গেছে আমার ধৈর্য শক্তি !
আরো কিছু বিড়বিড় করে থামলো রাফি । এতক্ষণ মনযোগ দিয়ে কথা গুলো শুনলো মেয়েটা ‌। দৃষ্টি আহতের ন্যায় সংকুচিত হয়ে আসলো তার । সে নিজেকে ধাতস্থ করে সরে আসলো ,, ভঙ্গুর গলায় কঠোরতা টেনে বলল….
” আমি কোনো রুজান রাফি চৌধুরী কে চিনি না ? কে আপনি ? কেনো এমন করছেন আমার সাথে ? আমি কিছু বলছি না বলে বাড় পেয়ে গেছেন দেখছি । বার বার গায়ে হাত দিচ্ছেন কেনো এভাবে ? অচেনা অজানা মেয়েদের সাথে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় শেখেন নি ? দেখে তো স্মার্ট, শিক্ষিত লাগছে । এই টুকু কমনসেন্স নেই আপনার ? সরুন সামনে থেকে… কতটা সময় নষ্ট করে দিলেন আমার….

” মিহি….
মেয়েটা এবার চোখ মুখ কুঁচকে তেঁতে উঠলো…
” কে মিহি ? বারবার কি মিহি,মিহি করছেন ? বললাম তো আমি মিহি নোই , আমি মাহি…..মা..হি ? বুঝেছেন ?
রাফির চোয়াল শক্ত হলো এবার । সেই প্রথম থেকে একই গান গাইছে এই মেয়েটা । পেয়েছে কি ও ? রাফি এবার গলা শক্ত করলো…
” মিহি… অনেক হয়েছে !
” হুম,, অনেক হয়েছে । এবার মুক্তি দিন আমায় , পথ ছাড়ুন আমার । নয়তো এবার সত্যি সত্যি চেঁচিয়ে লোক জড়ো করতে বাধ্য হবো আমি…
রাফি আর সহ্য করতে পারলো না । মেয়েটার কনুই ধরে হেঁচকা টানে নিজের কাছে আনলো ‌। রুষ্ট কন্ঠে বলতে গিয়েও পারলো না , হাত মুঠো করে, কন্ঠ নরম হয়ে আসলো….
” দেখো,,, আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না । এই সাত মাস অনেক ধৈর্য্য ধরেছি আমি । অনেক হয়েছে, আর না । চলো আমার সাথে….
মেয়েটা ঝটকা মারলো….
চোখ ফিরিয়ে কয়েক কদম দূরে সরে বললো…

” ছাড়ুন আমার হাত । কথা কানে যায় না আপনার ? কে আপনি, আমি কেনো যাবো আপনার সাথে ?
রাফি এবার দাঁত পিষলো । সব কিছুর একটা লিমিট থাকে । এটা কি ধরনের মজা ! রাফির তোলপাড় হৃদয় এমনিতেই শান্ত হয়নি এখনো । বুকের ভেতর হার্টবিট ওঠা নামা করছে দ্রিম দ্রিম শব্দ করে । ঝড় বইছে যেন । অস্থিরতায় অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে । গলা কেমন সুরসুর করছে ,,, এই অনুভূতি গুলো হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হচ্ছে না রাফি ।
তার উপর আবার মিহির এই অস্বাভাবিক ব্যবহার ! রাফি বহু কষ্টে ঢোক গিলে এবার শক্ত করলো নিজেকে…।
নিরেট কন্ঠে বললো…
” ব্যাস…এনাফ ইজ এনাফ..!
রাগিও না আমায় । এমনিতেই আর সক্ষমতা নেই আমার । এই সাতটা মাসে পাগল বানিয়ে ছেড়েছো আমায় । আর না..। সবকিছুর একটা লিমিট থাকে । তোমার সাথে অনেক হিসেব বাকি , এখন চলো আমার সাথে ।
মেয়েটা শুকনো ঢোক গিললো । নিভু চোখে চেয়ে ভীত হয়ে সিটিয়ে পিছিয়ে যেতে যেতে কাঁপা গলায় বললো…

” দেখুন…
” এই মাহি,, ওখানে কি করছিস ? তাড়াতাড়ি আয় , দেরি হয়ে যাচ্ছে তো আমাদের । কখন থেকে এখানে অপেক্ষা করছি তোর জন্য । আর তুই এখনো ওখানে…
মেয়েটার কথার মাঝেই পিছনে অনেকটা দূর থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসলো । কেউ চেঁচিয়ে বললো কথা গুলো ‌। যা কর্ণকুহরে পৌঁছা মাত্রই মেয়েটা সহ রাফি দু’জনেই চকিতে তাকালো পিছনে । রাফি তাকিয়েই কপাল কুঁচকালো । রাস্তার বাঁকের ওপাশে দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । দূর থেকে চেহারা অস্পষ্ট । রাফি এক ঝলক তাকিয়েই আবারো মিহির দিকে ফিরেছে । রাফি ফেরা মাত্রই মেয়েটা যেন কেঁপে উঠলো । এবার একটা সাহস পেলো বোধহয় । নিজেকে ধাতস্থ করে জড়ানো কন্ঠে বিড়বিড় করতে লাগলো…
” দ.. দেখেছেন, আমি মিহি নোই , আমি মাহি । ওরা আমার ফ্রেন্ড , আমাকে মাহি বলে ডাকলো শুনলেন তো । আমি আপনার ঐ মিহি নোই , সে অন্য কেউ । আমাকে আর জড়াবেন না আপনার সাথে । ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে ,, এখন তো বিশ্বাস হলো ?

আমি আসি…
বলেই হাঁটা লাগালো । রাফি আবারো পিছন থেকে হাত টেনে ধরলো । সে তাজ্জব ! ঘটনা মেলাতে গিয়ে কথা বলার ফুরসৎ পেলো না । কি হচ্ছে এসব ? মেয়েটা সাথে সাথে পিছন ফিরলো না । কয়েক মুহূর্ত পর ফিরলো । চোখ দুটো পিটপিট করছে ওর । সজল চোখে চেয়ে মেয়েটা ধীর শান্ত কন্ঠে বলল….
” সরি,,, আমি মিহি নোই…! ছেড়ে দিন ,,, আর ভালো থাকবেন..! এভাবে কোইনসিডেন্স হয়েও, ভুল করেও যেন আপনার সাথে দেখা হওয়ার ভুল টা না হয় কোনো দিন…
বলেই হাত ছাড়িয়ে ছুটলো মেয়েটা । রাফি এবার আর আটকানোর চেষ্টা করলো না । মেয়েটা থামলো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে দুটোর কাছে । রাফি এখনো তাজ্জব বনে সেভাবেই তাকিয়ে আছে । অবাক সে ! চোখের চাহনি নিপুণ ,, ভ্রু দ্বয়ের মাঝে সুক্ষ্ম ভাঁজ । মেয়েটা হাত ছাড়িয়ে গেছে, তবুও রাফির হাত এখনও বাড়ানো । সে একপলক তাকালো নিজের হাতের দিকে । এই হাতের মুঠো থেকে মিহি হাত ফসকে, ছাড়িয়ে বেরিয়ে গেল আবারো ? কিন্তু কি বলে গেল,, ও মিহি নয় ? হুহ !! রাফি বক্র হেসে ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকালো আবারো ঐ দূরে মেয়েগুলোর দিকে । ইতিমধ্যে তিন জনই হাঁটা শুরু করে দিয়েছে উদ্যম পায়ে । কয়েক পা এগিয়ে মাঝের মেয়েটা এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে পিছন ফিরলো । দূর থেকে তার চাহনি গূঢ়, দুর্বোধ্য । তবুও বুঝতে অসুবিধা হলো না রাফির । সেও কিংকর্তব্য বিমূঢ়, হতবাক । মূক হয়ে রইলো ওর দৃষ্টি যুগল । আচমকা ফোনের শব্দে সম্বিত ফিরল রাফির । চোখের পলক পড়লো ঝট করে, সাথে সাথে নড়ে উঠে সে । সিটের উপর মুঠো ফোনটা বাজছে । রাফি এক পলকেই চোখ সরিয়েছে ফোনের দিক থেকে । ফের করুন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে তিন রমনীর হাঁটার পানে । মাঝের জনের দূর্বল কম্পিত পায়ের প্রত্যেকটা ধাপ কাঁপিয়ে তুলছে ওর পুরুষালি ক্ষত বিক্ষত হৃদয় কে ।
মেয়ে গুলো এগিয়েছে অনেক দূর । এগোতে এগোতে অন্য দুজন একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে গলা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করলো…

” কি বলতো , মাহি ? ঐ ছেলেটা কে ? দূর থেকে দেখলাম, মুখটা বোঝা যায় নি । তাই জিজ্ঞেস করছি আর কি ! কে উনি ? এতক্ষণ কি কথা বলছিলি ?
মাহি থতমত খেলো । পল্লব ঝাপটে ঢোক গিলে ইতস্তত কন্ঠে বলল…
” কোই, আমি তো চিনি না ? আর চিনবো কি করে বলতো ? তোরা তো জানিস সব !
” ওও আচ্ছা । তা কি কথা হচ্ছিল তোদের মাঝে ? আমরা কখন থেকে অপেক্ষা করছিলাম তোর জন্য , তোর তো আসার নামই নেই । তাই বাধ্য হয়ে বসে না থেকে বাইরে বেরিয়েছিলাম , তখন দেখলাম আরকি….
” কি দেখলি ?
আতঙ্কিত হয়ে আচমকা থেমে প্রশ্ন করলো মাহি । মেয়ে দুটোও থেমে কপাল কুঁচকালো । একজনের নাম –‌ জেরিন,অন্য জন – রেহা । রেহা পাহাড়ি ,, চাকমা জনগোষ্ঠীর মেয়ে । নম্র, শীতল, ঠান্ডা স্বভাবের মেয়ে । অন্য দিকে জেরিন ছটফটে । সে ছটফট করেই ঠোঁট উল্টে বললো…
” কি আবার দেখবো ? দেখছিলাম , কথা বলছিলি ছেলেটার সাথে ।
মাহি হাঁফ ছাড়ল । আবারো চলতে আড়ম্ভ করে ছোট্ট করে বললো…

” ওও…
জেরিন ফের বললো…
” আচ্ছা, একটা কথা বলি রাগ করবি না তো ?
রেহা শীতল কন্ঠেই সন্দিহান হয়ে শুধালো…
” ও রাগ করলে কি বলবি না নাকি ?
” আলবাত বলবো । আচ্ছা মাহি,, ছেলেটা দেখতে কেমন রে ? খুব সুন্দর তাই না , কি বলতো দূর থেকে না দেখতেই পাই নি , কাছে যেতে চেয়েছিলাম,এই রেহার বাচ্চা যেতে দেয় নি । বলনা ছেলেটা কেমন ? যতটুকু দেখলাম, পাশেই একটা দামী চকচকে গাড়ি ছিল । আয় হায়, তারমানে খুব বড়লোক,তাই না ? নাম টাম কিছু বলেছে তোকে ? কোথায় থাকে….
মাহি বিরক্ত হলো । গলা বাঁধছে ওর । তবুও মুখে বিরক্তি প্রকাশ না করে রুক্ষ কন্ঠে বলল….
” জানিনা….

জেরিন চুপসে গিয়ে হতাশ শ্বাস ফেললো । এই উত্তর ব্যতীত অন্য কোন উত্তর আশা করাটাই হতাশ জনক । এই মেয়ের কাছে এই উত্তর ছাড়া অন্য কোন উত্তর পাওয়া যাবে না আগেই জানতো । তবুও আগ্রহ দমিয়ে রাখতে না পেরে প্রশ্ন করেছিল । লাভ আর হলো কোই ? আশাহত চুপসে যাওয়া মেয়েটা মুখ গোমড়া করে মাহির দীর্ঘ পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটা লাগালো । রেহা ওর চুপসানো বেলুনের মতো মুখখানা দেখে ফিক করে হেসে ফেললো । উজ্জ্বল টানটান চেহারার ধবধবে ফর্সা পাহাড়ি মেয়েটার হাসিটা বেশ আকর্ষণীয় । মেয়েটা শব্দ করে দাঁত কেলিয়ে হাসে না তেমন , হাসলে ফিক করে ঠোঁট জোড়া প্রসারিত হয় একটু । তাতেই বেশ ভারী মিষ্টি লাগে । মাহি আড়চোখে দেখলো ওর হাসি টুকু ।
হাঁটার পথে হাঁটতে হাঁটতে তিন বান্ধবী জনবসতি’তে পৌঁছেছে । আশেপাশে সবগুলো সাদা আর আকাশি রঙ্গের মিশ্রনের ডুপ্লেক্স বাড়ি । আবাসিক স্থল । হাতে গোনা কয়েকটা বাড়ি । তাও বেশ দূরত্বে একেকটার অবস্থান । বাড়ির তুলনায় প্রকৃতির সবুজ’ময়তা বেশি । আশপাশ ঢেকে আছে সবুজ প্রকৃতিতে । হিমেল হাওয়া বয় সবসময় । এই এপ্রিলেও গরমের তীব্রতা নেই । রেশ টুকুও নেই বললেই চলে । সাদা মেঘ ঘুরে বেড়ায় হাতের নাগালেই । জাফলংয়ের পাশেই ক্ষুদ্র জনবহুল বেশ রোমান্সকর বিলাসময় স্থান ।

তিন বান্ধবীর বাড়ি বেশ দূরত্বে । প্রথমেই জেরিনের বাড়ি । সে নেমে গেল মাহি আর রেহার থেকে বিদায় নিয়ে । পরে রেহার বাড়ি ,আর শেষ মাথায় মাহিদের একটা ছোট্ট বাড়ি । মাহি চাবি দিয়ে ডোর খুলে বাড়িতে ঢুকেছে । পুরো বাড়ি অন্ধকার । একেই বিশাল প্রকৃতির মাঝে চাপা পড়ে সবসময় তমসাছন্ন থাকে চারপাশ । সেক্ষেত্রে বাড়ির ভেতরে তো আরো বেশি , সবসময় তিমিরে ঢেকে থাকে । মাহি অন্ধকার দেখে দুদিকে মাথা নেড়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । এটা নিত্যদিনের ব্যপার ,, মাহি রোজকার মতো লাইট জ্বালিয়ে দিলো । চারকোনা ছোট্ট ড্রইং রুমটাতে কেউ নেই । কোথাও থেকে পানির টুপটাপ ফোঁটা পড়ার শব্দ ভেসে আসছে । মাহি হাতের ব্যাগটা সোফার উপর রেখে এগলো কিচেনের দিকে । কল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে , ঠিকঠাক ভাবে বন্ধ হয়নি । সেটা বন্ধ করলো মাহি ।

অতঃপর এগোলো কিচেনের পাশের রুম টার দিকে ‌। চাপানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নজরে আসলো বেডের উপর ব্লাংকেট মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে কেউ । মাথার উপরের অংশ দেখা যাচ্ছে একটু । মাহি এগোলো , নিঃশব্দে আলতো হাতে কম্বল সরিয়ে দিলো । সরিয়েই স্নিগ্ধ শোভন মাতৃ মুখখানা দেখে আহত চোখে তাকিয়ে নরম হাসার চেষ্টা করলো । কপালে হাত ঠেকালো একবার । জ্বর নেই , কাল থেকেই গাঁ গরম ছিল । আজ আর নেই । মাহি কিছু সময় নিষ্পলক চেয়ে থাকলো প্রসূতির মুখাবয়বের দিকে । চোখের পাপড়ির সুক্ষ্ম কম্পন দেখে বুক ভরে শ্বাস টানলো । অতঃপর কম্বল খানা আবারো ভালো ভাবে জড়িয়ে দিলো গায়ে । এবার সে এগোলো ওয়াশ রুমের দিকে । ওয়াশ রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল । পিছন ফিরতেই আয়নায় নিজের চেহারা ভেসে উঠলো । মাহি নরম ভাবে চোখ কুঁচকালো । ছোট পায়ে আয়নার একেবারে সম্মুখে দাঁড়ালো । নিজের চেহারার দিকে চেয়ে থাকলো বেশ কিছুক্ষণ । আনমনে নিজের ডান হাত উঠিয়ে ডান গালে রাখলো । নিজেরই ঠান্ডা হাতের স্পর্শে সে নিজেই কেঁপে উঠলো । তবুও কম্পমান দৃষ্টি সরালো না আয়নার দিক থেকে ‌। ভালো ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো নিজেকে । আজ বোধহয় অনেক দিন পর আবারো নিজেকে এভাবে দেখার সময় হলো ‌ওর ‌। না না, সময় নয় , সময় তো ছিল । তবে বাসনা ছিলো না । আজ বাসনা জাগলো । অভিলাষি হয়ে মুহূর্তের পর মুহুর্ত তাকিয়ে দেখলো নিজেকে । দেখতে দেখতে উপলব্ধ হলো চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে ওর ।

ঘোলাটে হয়ে আসছে সামনের নিজের প্রতিবিম্বটা । মাহি তৎক্ষণাৎ চোখ সরালো সামনে থেকে , চোখের পাপড়ির ঝটকায় লুকানো অশ্রু টুকু ঝরলো মূহুর্তেই । মাহি এবার বাম হাত খানা উঁচু করলো । মাথা নিচু করে কব্জির কাছটায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পাত করলো । তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে নোনা জল । মাহি অন্য হাতে চোখ দুটো মুছলো । অশ্রুসিক্ত নয়ন স্পস্ট হলো এবার । হাতের কব্জিতে কিছু নেই । কনুইয়ের কাছটায় কয়েক ফোঁটা রক্ত জমাট বেঁধে আছে । সেদিকে খেয়াল দিলো না মাহি । সে কব্জির কাছটায় হাত বোলালো অত যত্ন সহকারে । চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে আবারও । গলায় দলা পাকিয়ে কিছু একটা আটকে আসছে ।

রূদ্ধ হয়ে আসছে শ্বাস প্রশ্বাস । মাহি সামলালো নিজেকে । ধাতস্থ করার চেষ্টা করলো সর্বোচ্চ । একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগছে এখনো । গন্ধ টা অনেকটা অপ্রত্যাশিত হলেও পরিজ্ঞাত । নিজের গাঁ থেকেই আসছে গন্ধটা । মাহি মাথা নুইয়ে নিজের শরীর থেকে ঘ্রাণ টানার প্রয়াস চালালো । অতি সামান্য গন্ধ নাকে বাঁধতেই চোখ বন্ধ হয়ে আসলো আবেশে । বন্ধ চোখে উপলব্ধি ক্ষমতা আরো বাড়লো । গন্ধ টা আরো বেশি অনুভূত হলো । যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শিহরণ জাগলো নারী কোমল অঙ্গে । গাঁয়ে কাঁটা দেওয়ার সাথে সাথে বেহায়া চোখ দুটো আবারো সজল হয়ে আসলো । এ পর্যায়ে অশ্রু ধারা আর বাঁধ মানলো না । ঠোঁট ভেঙে ঝরঝর করে একসাথে ঝরে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু কণা । এতক্ষণে জমিয়ে রাখা দগ্ধা ব্যাথারা হাহাকার হয়ে বেরিয়ে আসলো বন্দী চার দেয়ালের মাঝে । তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলো নারী কোমল সত্ত্বা । আর পারা গেল না নিজেকে সামলে রাখতে । দুহাতের তালুতে শক্ত করে মুখ চেপে ধরে গুমড়ে কেঁদে উঠলো মেয়েটা । চোখের দৃপ্তি অদ্ভুত ভাবে শক্ত হয়ে আসছে । খিচে নিরেট হয়ে আসছে পুরো শরীর । ইচ্ছে করছে প্রাণ খুলে, সমস্ত দ্বিধা – সংশয় কাটিয়ে চিৎকার করে কান্না করতে । কিন্তু হাত পা বাঁধা । চিৎকার করতে গিয়েও পারলো না মেয়েটা । ভিতর ভিতরেই দম আটকে দুমড়ে মুচড়ে উঠলো ।

ঘরে আম্মু আছে । হালকা শব্দেই জেগে উঠতে পারেন তিনি । মাহির গুমড়ে ওঠা আর্তনাদে যেই না দম বন্ধ হয়ে আসলো , সেই ধক্ করে শ্বাস টানলো মেয়েটা । আরো শক্ত করে চেপে ধরলো মুখটা । চোখ রক্তিম হয়ে উঠছে । মেয়েটা দ্রুত শাওয়ার অন করলো । কনকনে ঠান্ডা পানি ঝিরঝির করে গায়ে পড়তেই আবারো কেঁপে উঠলো মেয়েটা । মুহুর্তেই পানির ধারা নিজেদের মাঝে মিষিয়ে নিলো চোখ হতে গড়িয়ে পড়া নোনা জল টুকুকে ।
প্রায় বিশ মিনিট অতিবাহিত হলো এভাবেই । অবশেষে শাওয়ার ছেড়ে ভেজা কাপড়েই শরীরে টাওয়াল পেঁচিয়ে বাইরে আসলো মাহি । ওয়াশ রুম থেকে বের হতেই দরজা বরাবর মুখোমুখি হলো নিজের আম্মুর । ঠিক সামনেই চোখ সরু করে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি । মাহি আম্মু কে দেখে ভিমড়ি খেলো । হাসার চেষ্টা চালিয়ে নরম কন্ঠে বলল….
” উঠে পড়েছো আম্মু ? কখন উঠলে ?
আম্মুর পাল্টা প্রশ্ন….
” কখন এসেছিস তুই ? এভাবে ভিজেছিস কেনো ? ঠান্ডা লেগে যাবে তো , এভাবে ভেজা কাপড়ে না থেকে তাড়াতাড়ি গিয়ে চেঞ্জ করে নে আগে ।

মাহি মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো । কাপড় বের করার জন্য আলমারির দিকে এক পা এগোতেই ফের আম্মু ডাকলো । থামলো সে । পিছন ফিরতেই আম্মুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির মোকাবেলা করতে হলো ওকে । সে দৃষ্টি এড়াতে চোখ সরালো । ঘন পল্লব ঝাপটালো । আম্মু এগিয়ে এসে মুখখানি উঁচু করে শান্ত কন্ঠে বললো…
” কতক্ষন ধরে ভিজেছিস এভাবে ? চোখ লাল হয়ে আছে কেনো ?
মাহি কথা ঘোরালো…
” একটু মাথা ধরেছে আম্মু , তাই হয়তো । তুমি এক কাপ কফি বানিয়ে দেবে, প্লিজ !
আম্মু ও আর ঘাঁটলেন না । নরম কন্ঠে বললেন…
” কাপড় বদলে বাইরে আয়…
মা পিছন ফিরতেই মেয়ে ডাকলো এবার…
” আম্মু,, দু কাপ কফি বানিয়ো !
তিনি থামলেন । পিছন ফিরে ভ্রু উঁচিয়ে শুধালেন…
” কেনো ? ও আসবে ?
মাহির মুখ খানা গুটিয়ে আসলো অমনি । ফিকে হাসি টুকুও মুছে গেলো । দায় সারা ভাবে বললো…
” না , তোমার আর আমার জন্য !!

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত আটটার কোঠায় । মাহিদের বাড়িটা দোতলা নয় , একতলা ছোট একটা বাড়ি । দুই মা মেয়ের জন্য এটাই অনেক বড় । আর তো কেউ নেই তাদের । চারদিক গাছ পালায় ঢাকা হওয়ার কারণে সন্ধ্যা গড়াতেই চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে যায় । রাস্তার ধারেই বাড়ি । রাস্তায় বড় বড় ল্যাম্পপোস্ট । মাহি দের বাড়ির বাইরেও আছে । ওদের বাড়িটা ছোট একটা এপার্টমেন্ট এর মতো হলেও বেশ দৃষ্টি কাড়ক । রাস্তার উল্টো দিকে অর্থাৎ বাড়ির পিছনের দিকটা পুরোটাই বারান্দা । তবে খোলা নয় , লোহার গ্রিলে আবদ্ধ । উল্টো দিকে হওয়াতে বারান্দা দিয়ে রাস্তার দিকটা পুরোটা দেখা যায় না , পেছনের জঙ্গলের দিকটা দেখা যায় শুধু । তবে বারান্দার ডান দিকে দাঁড়ালে সোজা পিচের রাস্তাটা নজরে আসে বেশ । আবার রাস্তা থেকেও সকাল থেকে শুরু করে রাতেও টিমটিমে আলোয় আলোকিত বারান্দা টার এক অংশ দেখা যায় । এই সোজা রাস্তা বরাবর গেলে মেইন রোড , তার পর শহরের রাস্তা । মাহি দের ডিনার হয় নি এখনো , আম্মু রেডি করছে । এই ফাঁকে মাহি একটু বারান্দায় এসেছে । এই বারান্দাটা ওর পছন্দ নয় একদম । বারান্দা হবে তো, খোলামেলা । এমন শিকলে আবদ্ধ নয় । খোলা বারান্দায় নিজেকে মুক্ত পাখির মতো লাগে । যেখানে দাঁড়ালে আকাশ ছোঁয়ার মুক্ত তৃপ্তি আসবে ।
আর এই বারান্দা ? এই বারান্দায় দাঁড়ালে তো নিজেকে বন্দি পাখির ন্যায় অনুভূত হয় । যাকে লোহার শিকের মাঝে আটকে রাখা হয়েছে এমন মনে হয় । ঠিক মতো বুক ভরে শ্বাস টেনে নেওয়াও মুস্কিল এখানে । তৃপ্তি মেটে না এভাবে । তাই সচরাচর বারান্দায় আসে না মাহি । খুব বেশি মন খারাপ হলে , যখন আম্মু ঘুমায় তখন মাঝেমধ্যে বারান্দায় পা পড়ে ওর । তাও ভালো লাগে না , বারান্দা থেকে শুধু অদূর থেকে অদূর পর্যন্ত জঙ্গলের কালো অন্ধকারই নজরে আসে । এটা দেখার ইচ্ছে জাগে না কখনো ‌।

আজ বোধহয় মাহির মনটা খারাপ , আম্মুর সামনে শান্ত, স্থির থাকলেও উশখুশ লাগছে নিজের ভিতর । তাই কিছু মুহূর্তের জন্য হলেও আম্মুর চোখ থেকে নিজেকে আড়াল করে বারান্দায় পা রেখেছে সে । চারদিকে কুচকুচে অন্ধকার , সাথে জঙ্গলের গাঁ ছমছমে ভাব । বিশাল বারান্দার দুদিকে দুটো লাইট জ্বলছে । জঙ্গলের দিক থেকে ঝিঁঝিঁ পোকা, মশা, উভয়ের আক্রমণাত্মক ডাক ভেসে আসছে । শেয়াল ডাকছে জঙ্গলের খুব গভিরে । সেটাও শোনা যাচ্ছে । এতো কিছুতেও একটুও ভয় লাগলো না মাহির । সে আনমনা হয়ে এদিক ওদিক পায়চারি করলো কয়েক বার । অতঃপর বারান্দার ডান দিকে এসে থামলো । গ্রিল ঘেঁষে দাঁড়ালো সন্তর্পণে । লোহার ঠান্ডা গ্রিলে দুহাত রেখে কোনো এক দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । অতঃপর কপাল ঠেকলো গ্রিলে ‌। চিনচিনে ঠান্ডা অনুভব হলেও ভ্রুক্ষেপ দেখালো না । মশারা হানা দিচ্ছে ইতিমধ্যে । তবুও ভাবাবেগ দেখালো না । সে আপন মনে চেয়ে আছে কোন এক দিকে । এভাবে কাটলো আরো বেশ কয়েক মুহূর্ত । মাহি মেয়েটা যেন ভাবনায় বুঁদ । নড়ছে না একটুও । ওর ভাবনার ছেদ ঘটলো দীর্ঘ এক পলক পড়ার মাধ্যমে ।

এতক্ষণ চেয়ে থাকায় , ছোট ছোট পলক পড়েছে চোখে । চোখের ভিতরে অত্যাধিক ঠান্ডা অনুভব হতেই জ্বলে উঠলো অক্ষি যুগল‌‌‌ । অমনি বড় পলক ফেললো সে । চোখ বুজে রাখলো কয়েক সেকেন্ড । অতঃপর আবারো খুললো । এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল । আচমকা রাস্তার দিকে দৃষ্টি পড়তেই কপাল কুঁচকে দৃষ্টি সংকুচিত হয়ে আসলো আপনা আপনি । বাড়ি থেকে একটু দূরে যে ল্যাম্পপোস্ট টা আছে , সেটার ঠিক নিচে কালো ছায়া মতো কিছু নজরে আসলো । ল্যাম্পপোস্টের ঝিলকে আলোয় ছায়া মতোই ঠেকছে বটে । মাহি চোখ জোড়া আরো বেশি সংকুচিত করে ভালো মতো দেখে বোঝার চেষ্টা করলো । কেউ একজন একদম স্থির সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পুরো শরীর কালোয় আবৃত । পড়নে কালো হুডি মতো কিছু , হুডির টুপি দ্বারা মাথা টাও কপাল পর্যন্ত ঢেকে রাখা ‌। মুখে কালো ছায়া পড়েছে, তাই বোঝা যাচ্ছে না মুখ খানা ।

দুহাত পকেটে গুঁজে রাখা । এমতাবস্থায় কাউকে দেখে প্রথমত খানিক চমকালো মাহি । পর মূহুর্তে লোকটার দৃষ্টির ঠিকানা বুঝে ভড়কে গেলো মেয়েটা ‌। আবছা আলোতেই ঠাহর করতে অসুবিধা হলো না লোকটার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যে এই বাড়ির দিকেই আছে । শুধু বাড়ি নয় , একদম সোজাসুজি বারান্দার কোনায়, যেখানে মাহি দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক সেখানেই । লোকটা নড়ছে না , একদম সটান দাঁড়িয়ে আছে । মাহির মনে কিছু একটা আন্দাজ আসতেই বৃহৎ নয়নে তাকালো মেয়েটা । বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হলো তার ডাগর চক্ষু দ্বয় ‌। চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের রেশ ফুটে উঠল এক ঝলকেই । মেয়েটা অত্যাধিক ঘাবড়ে দু’পা পিছিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলো । হাত পা অস্বস্তিতে শিরশির করতে আড়ম্ভ করেছে ইতিমধ্যে । মাহি ঢোক গিললো শুকনো , গলা ভেজানোর চেষ্টা করে পলক ফেলতে ফেলতে পেছাতে শুরু করলো । এমন সময় বারান্দার দরজা থেকে আম্মুর ডেকে উঠলেন….

” খাবি না ? খাবার বেড়ে বসে আছি তো , তাড়াতাড়ি আয় !!
আকস্মিক ডাকে ভড়কে এক ঝটকায় পিছন ফিরলো মাহি । ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিভে অধর ভেজালো । উত্তর করার আগে আরো একবার গ্রিল গলিয়ে রাস্তার দিকটায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো । ফের পিছন ফিরে আম্মুর পানে তাকিয়ে ভাঙ্গা গলায় তাড়াহুড়ো করে বলল…
” হুম আম্মু ,, চ..চলো !
বলে এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না আর । বারান্দা ছাড়লো আম্মু কে নিয়ে । পেছনে আবারো রেখে গেলো এক জোড়া সূক্ষ্ম দৃষ্টি । যেটা এখনো এদিকটায় চেয়ে আছে নিগুড় ভাবে ।

সকাল নয়টা । আজকের আবহাওয়া টাও বেশ শীতল । ফজরের দিকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়েছে । বৃষ্টির পরের ঠান্ডা বাতাসে এখনো ছেয়ে আছে পুরো প্রকৃতি । বাতাসের শনশন শব্দ শোনা যাচ্ছে । ‘সানফ্লাওয়ার’ ক্যাফে,, ক্যাফের পাশাপাশি ফুড কর্ণার ও বটে । মোটামুটি সব কিছুই পাওয়া যায় ।
শহরের বাইরে আশেপাশে এই একটাই ক্যাফে আছে,, খুব বড় নয় , তবে একেবারে ছোট খাটোও নয় । এই দিকটা টুরিস্ট জোন থেকে উল্টো পথে হলেও গুটিকয়েক টুরিস্ট সহ আশেপাশের সব মানুষের ভিড় জমে এই ক্যাফেতেই । পাহাড়ি মানুষ অধিক । এই ক্যাফে ছাড়াও আশেপাশে টি স্টল অগনিত । ক্যাফের কাঁচের দরজা ঠেলে ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো মাহি । গায়ে ব্যাবি পিংক রংয়ের শুভ্র একটা থ্রি-পিস । ওরনাটা মাথায় সুন্দর করে টেনে রাখা । চোখ মুখ শুকনো মেয়েটার । দেখে রুগ্ন লাগছে । ক্যাফের ভেতরে ঢোকা মাত্রই মাহির সংকুচিত নেত্র আরো বেশি কুঁচকে আসলো । হতবাক নয়ন ঘোরালো এদিক ওদিক । ভেতরটা বেশ ঝকঝকে করে নতুন ভাবে সাজানো হয়েছে । আগের তুলনায় আজ বেশি পরিপাটি । প্রত্যেক টা টেবিল সহ ,দেয়াল জুড়ে বেলুন সাজানো হয়েছে । মেঝেতে ও পড়ে আছে বেশ কিছু রঙ্গিন বেলুন । ভেতরে ঢোকার সময় বাইরেটা ও দেখলো , বাইরেও সাজানো হয়েছে । তবুও মাহি খেয়াল দেয় নি সেভাবে । তবে ভেতরটা দেখে অবাক হওয়ার সাথে সাথে সংকিত হলো ।
মাহি এদিক ওদিক তাকানোর মাঝে জেরিনের উচ্ছাস ভরা কন্ঠ ভেসে আসলো…..

” কি রে মাহি ? তুই ? তুই এসেছিস ?
বলতে বলতে এগিয়ে আসলো মেয়েটা । চুল গুলো টিংটিংয়ে করে বেঁধে রাখা । হাতে কয়েকটা বেলুন , ও নিজেই সাজাচ্ছিলো এসব । সে এসেই চঞ্চল কন্ঠে শুধালো….
” কি রে , তুই আসলি যে ? তুই নাকি অসুস্থ ? সকালে ফোন দিলাম , আন্টি বললো তুই আসবি না । তাই তো আর অপেক্ষায় থাকি নি আমরা , চলে এসেছি ! তুই অসুস্থ ? কি হয়েছে তোর ?
মাহি হাতের ব্যাগটা একটা টেবিলের উপর রাখলো । অতঃপর শান্ত কন্ঠে বললো….
” কাল রাত থেকে মাথা ধরেছিল একটু । তাই আম্মু বলেছে হয়তো ।
” কি বলিস , মাথা ধরেছিল ? তাহলে আসতে গেলি কেনো এই অবস্থায়‌ ? এখন কেমন আছিস , মেডিসিন নিয়েছিস ? মাথা ব্যাথা কমেছে , এখন ঠিক আছিস তুই ?
ক্যাফের কিচেন থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে বেরিয়ে গড়গড় করে প্রশ্ন গুলো করলো রেহা । মেয়েটার পড়নে একটা শেফ অ্যাপ্রোন । জেরিনের উঁচু কন্ঠে মাহির নাম শুনেই হাতের কাজ ফেলে বেরিয়েছে সে । মেয়েটা কে দেখে এই মুহূর্তে বেশ চিন্তিত চঞ্চল লাগছে । মাহি না চাইতেও নরম হাসলো । ধীর গলায় বলল…
” সকাল অবধি মাথাটা ঝিমঝিম করছিল , ভার হয়ে ছিল । তবে এখন ঠিক আছি । আম্মু আসতে বারন করেছে, তবুও আসলাম । তাইতো দেরি হলো !
বলেই এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে সাজসজ্জা পরখ করে আবারো বললো…
” আচ্ছা , আজকে এভাবে সাজানো হচ্ছে কেনো ? বাইরেও দেখলাম । কি হয়েছে বলতো , আজ কি কোনো প্রোগ্রাম আছে, নাকি ?
জেরিন ফিক করে হাসলো । চাপা স্বরে বললো…

” আর প্রোগ্রাম ? ঐ কিপ্টে বুড়োর কাছে কি প্রোগ্রামের আশা করিস তুই ? আর কি ভাবলি ,,ঐ বজ্জাত বুড়ো এভাবে এমনি এমনি সাজাচ্ছে ? এভাবে এতো সুন্দর করে সাজানোর আগে, টাকার হিসেব কষেই হার্টফেল হয়ে যাবে ওর ।
বলেই আবারো ঠোঁট কামড়ে হাসলো । মাহি ভ্রু যুগল নাকের ডগা বরাবর জড়ো করে ভারী গলায় বলল….
” আবার শুরু করলি ? যত যাই হোক , কিপ্টে হোক বা অন্য কিছু, উনি আমাদের অনেক বড় । আর উনি এই ক্যাফের মালিক , উনি এসব করবেন না তো কে করবেন ?
জেরিন কিঞ্চিত বিরক্তি নিয়ে ব্যাঙ্গ করে বললো…
” এ্যাহহ… এসেছেন ক্যাফের মালিক । ঐ বুড়ো এই ক্যাফে বিক্রি করে দিয়েছে । তাও আবার যেন তেন দামে নয় , পুরো এক কোটি এক লক্ষ এক হাজার একশত এক টাকায় । ভাবা যায়,,এই মফস্বলের ক্যাফের এতো দাম ! কোন হতভাগা সাদাসিধে গর্দভ কে বলির পাঁঠা বানিয়েছে কে জানে ? ওও থুক্কু,,বলির পাঁঠা নয় , বলির গাধা হবে । ঐ বুড়ো তো মালামাল বড় লোক হয়ে গেল রে , ভাবছি আজ রাতে ডাকাতি করবো ওর বাড়িতে । কি বলিস ? তোরা পার্টনার হবি আমার ? দু-আনা করে ভাগ দেবো তোদের !!

কথা শেষ করেই চোখ টিপলো জেরিন । কিচেন থেকে আরো দুজন বেরিয়ে আসলো । এবার পুরুষালি কন্ঠ….
” আমি আছি তোর সাথে ,, আমাকে এক আনা ভাগ দিলেই হবে । আমার আবার অতো লোভ নেই বোন !
তিন জনে চকিতে তাকালো কন্ঠ বরাবর । জারিফ আর নিহার দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁট বাঁকিয়ে বুকে হাত গুটিয়ে । ওদের দুজনকে দেখে মাহি আর রেহা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো । এবার জেরিনের দলে যোগ হলো আরো দুজন । জারিফ জেরিনের ভাই । যমজ ওরা । নিহার ও ওদের সমবয়সী । জেরিন, জারিফ, রেহা আর নিহার- ওদের চার জনের তুলনায় মাহি ছোট । তবুও বেশ বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক পাঁচ জনের মাঝেই । মাহি আর রেহা শান্ত , আর বাকি তিন জন একেবারে অশান্ত । সবসময় তাদের খুনসুটি । মাহি এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল….
” এসব বাদ দিয়ে ,কি হয়েছে খোলাখুলি বলবে আমায়‌ ?
জারিফ তৎক্ষণাৎ দুহাত মেলে নাচের ভঙ্গিতে এগোতে এগোতে সুর তুললো…

” খোলাখুলি বলতে গেলে ,, পড়ে গেছি তোর কবলে…তলিয়েছে মন , ভীষণ রকম, অথৈ জলে….
বলতে বলতে মাহির সামনে থেকে পিছনে একেবার চক্কর কেটে , ফের সামনে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানানোর ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিলো । এতে যেন চরম বিরক্ত হলো মাহি । চোখ মুখ শক্ত করে কুঁচকালো । তিক্ত কন্ঠে বলে উঠলো…
” দেখো জারিফ ভাইয়া , সব সময় ইয়ার্কি একদম ভালো লাগে না আমার ।
ভাইয়া সম্বোধন শোনা মাত্রই চুপসে গেল বেচারা । হাত নামিয়ে অভিমানি থমথমে মুখে বিড়বিড় করলো…
” দুরু… নামের শেষে ভাইয়া ডাকা’টা কি খুব বেশি দরকার ?

এক দেখায় পর্ব ৩৫

কথাটা কারো কানেই পৌঁছালো না । রেহা ক্যাফে বিক্রি সম্বন্ধে সবটা খুলে বললো মাহি কে । নতুন কারোর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে এই ক্যাফে টা । তবে কার কাছে, জানা যায় নি ? যে কিনেছে, আজ তাকে স্বাগত জানানো হবে বিধায় এভাবে সাজানো হচ্ছে পুরো ক্যাফে । ওরাও ক্যাফে বিক্রি সম্বন্ধে আজ সকালে আসার পর পরই জানতে পেরেছে । কোর্ট প্যান্ট পড়া একটা ভদ্র মতো লোক সবকিছু এরেন্জ করে দিয়েছে সাজানোর জন্য । এখন সাজানো প্রায় কমপ্লিট ।

এক দেখায় পর্ব ৩৭