এক দেখায় পর্ব ৫৪
সুরভী আক্তার
চোখ খুললো মিহি । চোখের পাতা ভারী লাগছে । চুল এলোমেলো মুখের উপর । রাফি স্পর্শ না করে আবার বললো…
” ওঠো !
হেলান দেওয়া থেকে উঠে বসলো মেয়েটা । নিজেকে স্বাভাবিক করতে সময় লাগলো । ততক্ষন অপেক্ষা করলো রাফি । অতঃপর বললো…
” নামো , এসেছি আমরা !
গাড়ি থেকে পা নামালো মেয়েটা । মাথা টলছে । কোমর লেগে বাঁশ । টান ধরেছে পুরো । পা দুটোও টনটন করছে । রুহির মতো কোমর চেপে ধরে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে মৃদু কুকিয়ে উঠলো ও । আশেপাশে নজর বোলাতেই ঘাবড়ে গেল । এটা তো চেনা জায়গা । সব ভুলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মিহি । পেছনে ওদের বাড়ির ছোট্ট রাস্তাটা । এদিক দিয়ে কতো হেঁটেছে ওরা । মুখ ফাঁক চোখ গোল করে রাফির দিকে তাকাতেই রাফি মৃদু হাসলো । উত্তেজিত হয়ে শুধালো মিহি…
” আমরা এখানে ? কেনো ?
উত্তর না করে পাল্টা প্রশ্ন করলো রাফি…
” ঠিক আছো , হাঁটতে পারবে তো ?
” আমি পারবো । আপনি বলুন না , আমরা এখানে কেনো ?
” এসেছি যখন, আর একটু ওয়েট করো । সব দেখতে পারবে কিছুক্ষণ পর ।
শান্ত রুহির থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দূরে দাঁড়িয়েছে । রুহি ওর থেকে কাতর দৃষ্টি সরিয়ে রাফি আর মিহির দিকে তাকালো । মিহি ওর কাছে আসতে গেলে বাঁধা দিলো রাফি । শাড়ির কুচি এলোমেলো । কুঁকড়ে গেছে আঁচল । মিহি প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে ভ্রু নাচাতেই রাফি এক হাঁটু গেড়ে বসে আলগোছে এলোমেলো কুঁচি গুলো গুছিয়ে দিলো । মলিন মুখে হাসি ফুটলো মিহির । এক চিলতে লাজুক হাসলো । ওদের দেখে রুহি তাকালো নিজের কুঁচির দিকে । ওরটাও এলোমেলো । ঠোঁট উল্টে শান্তর কাছ ঘেঁষে বললো আহত স্বরে…
” আমার শাড়ির কুঁচি এলোমেলো হয়ে গেছে , গুছিয়ে দিন !
” পারবো না !
না তাকিয়ে উপেক্ষায় নিরেট উত্তর শান্তর…
আজ সে রাগ করেছে । এটা গলবে না এতো সহজে । কথাটা বলেই রুহির পাশ থেকে সরে আসলো ও । মিহি রাফির থেকে নিজেকে সরিয়ে রুহির দিকে এগিয়েছে । রাফি জেনিকে জাগালো এর মধ্যেই । বেচারি যতটা উচ্ছাস নিয়ে এসেছিল , এখন ততটাই চুপসে গেছে । বড় রোড থেকে নিচে ঢালু রাস্তা । এই রাস্তার প্রায় শেষের দিকে মিহি দের সেই ছোট্ট ডুপ্লেক্স বাড়িটা । যেখানে মা মেয়ে ছিলো কতদিন ! মিহির কেমন উদ্বিগ্ন লাগছে নিজেকে । খুশি খুশি লাগছে । সেই সুপরিচিত স্থান । প্রকৃতি , কেমন মিষ্টি একটা গন্ধ । দূরত্বে অবস্থান রত বাড়িগুলো শান্ত । পাখির কোলকাক আশেপাশে । বরাবরের ন্যায় হিমেল হাওয়া বইছে । মিহি সজোরে পা চালাচ্ছে ।
রুহি তাল মেলাতে পারছে না কারোর সাথেই । শাড়ির কুচি একহাতে উপরে তুলে এগোচ্ছে কোনো রকমে । মুখখানা ভার এখনো । নাক ফুলিয়ে বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে শান্তর দিকে । তার কোনো হেলদোলই নেই । সে আর একবারও তাকাচ্ছে না রুহির দিকে । রাফি ও খেয়াল দেয় নি ওর দিকে । ও এক হাতের মুঠোয় জেনির ছোট্ট হাতটা ধরে হাঁটছে । আর এদিকে রুহি ?
সে কোন রকমে শান্তর পায়ে তাল মিলিয়ে ধীর চাপা কন্ঠে বলল…
” হাঁটতে পারছি না আমি । হাতটা একটু ধরুন না !
শান্তর প্রতিক্রিয়া নেই । শুনেও শুনলো না সে । রুহি আগ বাড়িয়ে ভাব জমাচ্ছে আজ । অথচ সে এড়িয়ে যাচ্ছে । অন্যদিন হলে হয়তো খুশিতে লাফাতো এক্ষুনি । কতশত বকবক শুনিয়ে দিতো । কিন্তু আজ ? আজ সে এসবে নেই !
শান্ত নিজেও নিজেকে সামলাচ্ছে অনেক কষ্টে । রুহি ওকে বোঝে না কখনো , বোঝার চেষ্টাই করে না । বাড়াবাড়ি করে অনেক । শান্ত নিজে ওকে বাইয়ে আনছে এতো দিন ।
শান্ত ফের উপেক্ষা করে দ্রুত পায়ে রুহিকে পিছু ফেলে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো । ফোঁস করে শ্বাস ফেলে নাক টেনে ঝট করে দাঁড়িয়ে গেলো রুহি । শান্ত তো এমন নয় ! তাহলে আজ কেনো এমন করছে ? রুহিকে উপেক্ষা করার সাধ্য আছে বুঝি ওর ? রুহিরই তো দোষ ! সে কেনো তখন ক্যাটক্যাট করতে গেলো ওর সাথে ?
রুহির কান্না পাচ্ছে । ও শান্ত কে ইগনোর করবে , কিন্তু শান্তর উপেক্ষা সহ্য করতে পারবে না । কাঁদো কাঁদো হয়ে এবার রাফি কে ডাকলো সে….
” ভাইয়া , আমি হাঁটতে পারছি না ! আমি যাবো না কোথাও , তোমরা যাও আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি !
তৎক্ষণাৎ পিছু ফিরলো রাফি । এবার নজর পড়লো বোনের দিকে । জেনি কে ছেড়ে রুহির কাছে আসলো ও ।
” সরি sissy , খেয়াল ছিল না । চল আমার সাথে …
বোনের হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল সে । শান্তর পাশাপাশি দাঁড়াতেই রুহির ছলছল চোখ দেখে শান্ত কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল রাফি….
” হয়েছে টা কি ?
” কি আবার হবে ?
” ও হাঁটতে পারছে না , দেখতে পারছিস না ?
” তোর বোন, তুই তো দেখেছিস । আমার না দেখলেও চলবে…
রাফি সূক্ষ্ম নেত্রে তাকালো । শান্তর হাবভাব দুর্বোধ্য । এই মুহূর্তে কথা বাড়ালো না এই নিয়ে ।
জেরিন দের বাড়ি পেরিয়ে সামনে রেহা দের বাড়ি । সেখানে দাঁড়াতেই আঁতকে উঠলো মিহি । আজকের তারিখ ধ্যানে আসতেই বুঝতে বাকি রইলো না আজ কি ! আজ তো রেহার বিয়ের তারিখ ! খুশিতে চিকচিক করে উঠলো মিহি । প্রজ্বলিত নয়নে তাকালো রাফির পানে ।
বাড়ির ভেতরে ঢুকলো ওরা । ছোট্ট আয়োজন । বিয়ে হয়েছে ইতিমধ্যে । রেহা আর এঁকেন , নবদম্পতিকে পাশাপাশি বসিয়ে তাদের প্রথা অনুযায়ী আশির্বাদ করা হচ্ছে ওদের ।
মিহি রেহা কে দেখে হাঁসফাঁস করে উঠলো । দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই পায়ের গতি বাড়ালো । ডাকলো জোরে…
” রেহা !
ওদের বন্ধু মহলের সবাই এখানে উপস্থিত । বাড়ির মানুষ টুকিটাকি । রেহার মা বাবা ব্যাতীত এদিকের আর কেউ নেই । এঁকেনের পরিবারের লোক আছে বাকিরা । মিহির ডাকে সচকিতে ফিরলো সবাই । জেরিন এক মুহুর্তে লাফিয়ে উঠলো । ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো মিহিকে । বললো উত্তেজিত হয়ে…
” মাহি , কেমন আছিস ?
” আলহামদুলিল্লাহ ! তুই ?
” এইতো ভালো , কতদিন পর দেখলাম তোকে ! একেবারে ভুলে গেছিস আমাদের ?
মিহি কে ছাড়লো সে । উত্তর করলো মিহি…
” ভুললে কি আর এখানে আসতাম ?
মিহির পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে সবাই । রাফি, শান্ত,রুহি,জেনি । রাফি কে হাসি হাসি মুখ খানা বেলুনের মতো চুপসে গেল জেরিনের । মিহি চলে যাওয়ার পর রেহা সব বলেছে ওকে আর বাকিদের । মিহি টা কতো লাকি ! রুজান রাফি চৌধুরীর প্রেয়সী সে , লাকি হবে না আবার ! জেরিন কে ছেড়ে মিহি রেহার দিকে এগোলো ঝটপট । এঁকেনের চিনতে অসুবিধা হয় নি মিহি কে । সে বললো…
” আরে কুদি ( শালিকা ) , আবার তুমি ? কোথায় ছিলে এতোক্ষণ ? তোমার বান্ডুপি কে বিদায় দিতে আইছো বুঝি ?
মিহি হাসলো । রেহা কথায় কান না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো মিহিকে । রুহির বোধহয় পছন্দ হলো না এটা । হিংসে হলো , ওর পাখি শুধু ওর । এই মেয়েগুলো এমন গায়ে পড়ছে কেনো ওর ? কটমট করলো রুহি । এদিকে জেরিন ঠোঁট উল্টে রাফি কে দেখছে । একটু এগিয়ে গলা ঝেড়ে বললো….
” আসসালামুয়ালাইকুম স্যার দুলাভাই ! ভালো আছেন ?
প্রথম সম্বোধনে বিরক্তি নিয়ে তাকালো রাফি । তাকাতেই ভ্যাট ভ্যাটে হাসলো জেরিন । রাফির গম্ভীর স্বর…
” হোয়াট ইজ , স্যার দুলাভাই ?
” আপনি তো আমাদের স্যার , আর মাহির হাবি ? সো , দুলাভাই ? দুটো মিলিয়ে আমাদের স্যার দুলাভাই !
ঠোঁট চেপে হেসে উঠলো শান্ত ।
রেহা মিহি কে ছাড়তেই জারিফ এগিয়ে গেলো । মুখখানা শুকনো ওর । ও শুকনো কন্ঠেই শুধালো …
” ভালো আছো মাহি ? ও সরি , আর ইউ মিহি !
” জ্বি ভাইয়া । আপনি !
” আছি ভালো ।
ছোট্ট উত্তরের পর একটা দীর্ঘশ্বাস ।
রেহার বিয়েতে আসাটা আসল উদ্দেশ্য নয় । সেই সকালে বাড়িতে একটু খেয়ে বেরিয়েছে সকলে । পথিমধ্যে আর কিছু খাওয়া হয় নি । রেহাদের বাড়িতে একটু আধটু খেয়ে ফেরার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে আবার । বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুই জুটি দুই দিকে । শান্ত ফেরার রাস্তায় পা বাড়িয়েছে । আর রাফি উল্টো দিকে । রুহি,মিহি আর জেনি থেমে । দুই যুবক দুদিকে যাচ্ছে । ওরা কাকে অনুসরণ করবে ! রাফি নিজের পিছু পিছু কাউকে আসতে না দেখে থামলো । চাইলো পিছু ফিরে ।
রুহি বলে উঠলো…
” ভাইয়া , ওদিকে কোথায় যাবে তুমি ?
রাফি এগিয়ে এসে মিহির হাত ধরলো , বললো বোনের উদ্দেশ্যে…
” তুই আর জেনি শান্তর সাথে যা । আমরা আসছি ।
” কোথায় যাবে ?
” পাশেই । আসছি !
মিহির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতেই মিহি ভড়কে শুধালো…
” ওদিকে কোথায় যাবেন ?
” তোমাদের পুরনো এপার্টমেন্টে !
” কেনো ?
” কিছু দরকারি জিনিস নেওয়ার আছে ! আন্টি তো সব নিয়ে যেতে পারেন নি । তালা বদ্ধ এখন ওটা । চাবি আছে আমার কাছে । চলো….
রেহাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে মিহি দের সেই এপার্টমেন্ট । রুহি ওদের যাওয়ার পান থেকে চোখ ফেরালো । শান্তর দিকে তাকাতেই গুরুভার স্বরে ডাকলো শান্ত….
” জেনি,, তাড়াতাড়ি এসো বাবুই । দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের !
জেনি রুহির হাত ছেড়ে ছুটে গিয়ে শান্তর হাত ধরলো । রুহি সটান দাঁড়িয়ে । শান্ত এখনো ওকে এড়িয়ে যাচ্ছে ! তখন থেকে কি শুরু করেছেন ইনি ?
রুহি চেঁচিয়ে উঠলো…
” আমি হাঁটতে পারছি না । শাড়ি জড়িয়ে যাচ্ছে পায়ে । কেউ এসে সাহায্য করুক আমায় ! নয়তো এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো ভাইয়া না আসা পর্যন্ত ।
পা বাড়াতে গিয়ে কিঞ্চিত থমকালো শান্ত । জেনির হাত ছেড়ে ঝট পট এসে এক মূহুর্তে গম্ভীর মুখে আচানক কোলে তুললো রুহিকে । সুযোগ পেয়েছে , হাতছাড়া করা যায় কিভাবে ? মনে মনে লাড্ডু ফুটছে ওর । কিন্তু উপরে গম্ভীর । সে আজ কিছুতেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করবে না । রুহি তো শান্তর অনুভুতি বোঝে না , প্রকাশ করে লাভ কি ? অপ্রকাশ্যেই থাক । আর একটু তড়পাক এই ছিঁচকাদুনে মেয়েটা ।
রুহির অবস্থা ও বুঝতে পারছে স্পষ্ট । কারোর উপেক্ষা সহ্য করতে পারে না রুহি । ও সবার এটেনশন চায় ।
কিন্তু শান্ত আজ ওকে উপেক্ষা করবে , যেভাবে রুহি করে ঠিক সেভাবেই ।
ও একবার ও তাকায় নি রুহির দিকে । রুহি নিজেকে সামলাতে তৎক্ষণাৎ শান্তর গলা জড়িয়ে ধরেছে । সে শান্তর নিরেট মুখ পানে চেয়ে বললো ধীর কন্ঠে…
” সাহায্য করতে বলেছিলাম কাউকে , এভাবে পাঁজাকোলা করতে বলি নি ।
শান্ত শুনলো না । জেনি চোখ গোল গোল করে বলে উঠলো…
” ভাইয়া, আপি তো কতো বড় । তুমি আপি কে কোলে নিয়েছো যে ?
” তুমি বড় হও , তারপর বুঝবে !
রুহিকে পাত্তা না দিয়ে জেনির প্রশ্নের উত্তর ।
রুহির রাগ উঠলেও দেখালো না । নিজেকে সামলে শান্তর গলা জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে । গলার কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল ওষ্ঠ উল্টে…
” সরি , আর ওভাবে কক্ষনো কথা বলবো না আপনার সাথে । এটাই শেষ….
এপার্টমেন্ট এর দরজায় তালা । রাফি মিহির হাতে চাবি ধরিয়ে দিলো । বললো দরজা খুলতে । মিহি চাবি ঘুরিয়ে দরজার তালা খুললো । প্রায় দুই সপ্তাহ বাড়ি বদ্ধ হয়ে পড়ে আছে । মিহি দরজা ঠেলে খুলতেই ডাগর চোখে ঠেকলো হলদে নিভু আগুনের ঝিলিক । আঁতকে চোখ তুলতেই দৃষ্টি আটকে গেলো ওর । বৃহৎ হলো অক্ষি যুগল । এপার্টমেন্টের ড্রইং রুমে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো মিহির । মুখ ফাঁক হয়ে আসলো আপনা আপনি । পুরো ড্রইং রুমে রক্ত গোলাপের সমাহার । সজ্জিত পুরো বাড়ি । গোলাপের সাথে সাথে পুরো বাড়িতে মিটিমিটি জ্বলছে মোমবাতি । আলো আঁধারিতে হলদে আভা পুরো বাড়িতে । চকচকে রুফ থেকে শুরু করে ফ্লোর ,সবটা জুড়ে গোলাপের ছড়াছড়ি । মার্বেল পাথরের মেঝে সাদা নেই , ঢেকে গেছে টকটকে লাল পাপড়িতে । কোথাও কোথাও তোড়ায় তোড়ায় সজ্জিত গোলাপ , আর কোথাও কোথাও ছড়ানো ছেটানো । একেবারে পুষ্প ভুবনের ন্যায় । মোমবাতির সুতোর আগুন ঢেউ খাচ্ছে দরজা বেয়ে আসা মৃদু বাতাসে । আর কোনো লাইট জ্বলছে না । হাজারের অধিক মোমবাতি জ্বলছে ঘরে । কি মিষ্টি মাদকীয় গন্ধে মুখোরিত আশপাশ । মিহি মূক্ , বাক রুদ্ধ, নির্বোধ । ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে ও । সামনের দৃশ্য কোনো অলিক কল্পনার চেয়ে কম নয় । রুপকথার জগতের ন্যায় লাগছে সবকিছু । এতো ফুল ! এতো আলো ! এতো সাজসজ্জা ! এই বদ্ধ বাড়িতে ? মিহি বোধহয় স্বপ্ন দেখছে । চোখে পলক পড়লো অনেকক্ষণ বাদ । এক পলকের পর ঘন পলক ফেললো মিহি । শেষের পলক দীর্ঘ । কিয়ৎ কাল চোখ বুজে সন্দেহ কাটানোর চেষ্টা করলো । নাহ , এসব তো স্বপ্ন নয় ! সব সত্যি ! হতবাক মিহি । কি করে এসব সত্যি ? পাশে যে রাফি আছে খেয়াল নেই । রাফি ওকে টপকে ভেতরে ঢুকলো । মিহির কম্পিত দূর্বোধ্য চাহনি দেখে মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে আবেশিত কন্ঠে বলল ধীরে….
” ওয়েল কাম ম্যাডাম …
মাই ডিয়ার ব্লোসোম , এই সামান্য পুষ্পের সমারোহে আরেক পুষ্পকে স্বাগত জানাই । ওয়েল কাম এগেইন ! প্লিজ….
নিজের হাত বাড়িয়ে হাত ধরার অনুরোধ শেষে । মিহি শুষ্ক ঢোক গিললো । গলা শুকিয়ে আসছে । রাফি ফের চোখের ইশারায় হাত ধরতে বললে নিজের কম্পিত হাত খানা বাড়িয়ে রাফির হাতে রাখলো মিহি । রাফি আলগোছে আলতো করে মিহির হাত ধরলো । চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো মিহি । রাফি অন্য হাতে দরজা ঠেলে লাগিয়ে দিলো ।
অভিবাদনের ন্যায় মিহি কে এনে দাঁড় করালো ড্রইং রুমের মাঝ বরাবর । মিহির মাথা ঘুরছে । ঘামছে শরীর । বুঝতে বাকি নেই এসব রাফির কাজ । এতো এতো গোলাপ আশেপাশে । পুরো বাড়ি আবৃত গোলাপে । মিহি ফের ঢোক গিললো । গলায় শব্দ আসছে না কিছু জিজ্ঞেস করার । অনুচ্চারিত দ্বিধা গলায় আটকে আছে । রাফি ওর অবস্থা বুঝে মুচকি হাসলো । বললো হীমেল স্বরে…
” বিশ হাজার গোলাপের রাজ্যে স্বাগতম আমার ব্লোসোম কে ! রুজান রাফি চৌধুরী কথা রেখেছে ম্যাডাম । বলেছিলাম না , আমাকে কেউ কিছু দিলে আমি তাকে সেটা হাজার গুণ করে ফিরিয়ে দেই । দিতে চেয়েছিলাম তো আপনাকেও । দিয়েই দিলাম । বিশটার পরিবর্তে বিশ হাজার গোলাপ । দুইশো গুন বাড়িয়ে দিয়েছি আরো । আগে ছিলো দুই হাজার , আর এখন বিশ হাজার ।
মিহি বিমূর্ত । জমে গেছে ও । শ্বাস পড়ছে ঘন । সোফার সামনে একটা উঁচু সেন্টার টেবিল । সাদা মখলমের মতো নরম কাপড়ে ঢাকা টেবিলটা । টেবিলের কিনারা বেয়ে নেমে এসেছে হালকা গোলাপি জালের পরত , মেঝেতে ছুঁয়েছে তার কিনার । টেবিলের উপর একটা দুই স্তরের কেক । শত গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে তার পাশে । রক্ত গোলাপের আকৃতির অনুরূপ কেকের ডিজাইন । সাদা প্রিঙ্কলস ছেটানো কেকের গায়ে । দূর থেকে বোঝা গেলো সোনালী অক্ষরে লেখা কিছু একটা । কেকের দুপাশে আরো দুটো গোলাপের বুকে । টেবিলেই মোমবাতি জ্বলছে কয়েকটা । আশপাশে তো অগনিত । সব মিলিয়ে হলদে আলোয় আলোকিত, ঝিলমিল করছে সব । চোখে টানছে ভীষণ ।
রাফি মিহি কে নিয়ে টেবিলের সামনে দাঁড়ালো । শীতল আবেশে ওর হাত ছেড়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো ওকে । থুতনি ঠেকালো কাঁধে । কাঁপলো মিহি । জমে যাওয়া শরীর টা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো । রাফির খোঁচা খোঁচা দাড়ি কাঁধে বিদ্ধ হতেই শিরশির করে উঠলো পুরো অঙ্গ । অনুভুতিতে চোখ বুজলো মিহি । বুক ধড়ফড় করছে তীব্র বেগে । রাফি ডাকলো…
” ম্যাডাম …
ঝট করে চাইলো মিহি । চমকে আলতো ঘাড় ঘোরাতেই ওর গাল স্পর্শ পেলো রাফির অধরের । এটা আচমকা । মিহি এক মুহুর্তে ফের সামনে ফিরেছে । চোখ বন্ধ করেছে খিচে । রাফি বাঁকা হাসলো । আবার ডাকলো হীম শীতল কন্ঠে….
” ম্যাডাম, শুনছেন ?
” হুঁ !
” চোখ খুলুন । দেখুন সামনে…
মিহি চোখ খুলে সামনে তাকালো । কেকের উপরের লেখাটা নজর কাড়লো এবার ।
” 597 days since I found you, madam…”
অমনি ঝট করে প্রশ্ন করলো মিহি…
“৫৯৭ ?
” হুম ! আপনাকে পাওয়ার পর সেই সন্ধ্যা থেকে আজ এই সন্ধ্যা , ৫৯৭ দিন ২২ ঘন্টা ৬ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড পেরিয়ে গেছে ।
Happy 597 days together,my dear blossom…!
মিহি চোখ নামিয়ে নিল । হাসলো লাজুক । হাজার হাজার গোলাপের মিষ্টি গন্ধে মুখোরিত আশপাশ । অদ্ভুত মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে । শিহরিত অনুভুতির সাথে মিশে যাচ্ছে সব । মিহি কে ছাড়লো রাফি । সামনে এসে ধীরে এক হাঁটু গেড়ে বসলো । টেবিলের এক কোণায় একটা চিকন সুতোয় টান পড়তেই উপর থেকে ঝড়ঝড় করে বৃষ্টির ন্যায় ঝড়ে পড়তে লাগলো শত শত গোলাপের পাপড়ি । মিহি চমকালো । প্রত্যেকটা পাপড়ির স্পর্শে নড়েচড়ে উঠলো । ঝড়ঝড়িয়ে পাপড়ি আছড়ে পড়ছে রাফি মিহির উপর । মিহি আচমকা চমকালেও পরমুহূর্তে দুহাত মেলে দিলো, আলিঙ্গনে জড়ালো পুষ্পের বৃষ্টিকে । ঘরের কোনো এক কোণ থেকে মৃদু গানের লিরিক্স ভেসে আসলো…
” Janam Janam Janam, Sath chalna yunhi …
Qasam Tumhe Qasam , aake milna yahin..
Ek jannat hai bhale , do badan ho Juda
Meri hoke hamesha hi rehna kabhi na kelna alvida..
গানের মধ্যেই ভেসে আসলো রাফির পুরু আবেশিত কন্ঠ….
” ম্যাডাম , উইল ইউ বি মাই লাইফ পার্টনার ফর এভার ?
মিহি চোখ নামিয়ে সামনে তাকায় । হাঁটু গেড়ে ওর সম্মুখে বসে রাফি । এক হাত ওর দিকে বাড়িয়ে দেওয়া । সেই হাতের দুই আঙ্গুলের মধ্যে একখানা উজ্জ্বল আংটি । রিংয়ে জ্বলজ্বল করছে চিকচিকে রত্ন পাথর । রাফির চোখে আবেশ । দৃপ্তি অদ্ভুত । খানিক সূক্ষ্ম দুচোখ । মিহি বরাবরের মতো এবারও বিমূঢ় হয়ে পড়লো । কিসব হচ্ছে আজ ওর সাথে ! রুজান রাফি চৌধুরী এভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করছে ওর প্রতি । সে তো ওকে ভালোবাসে জানা, কিন্তু সেই ভালোবাসার প্রকাশ এভাবে ?
মিহি ধ্যানে মগ্ন । সবকিছু স্বাপ্নিক লাগছে । এসব সত্যি ? এতো এতো ফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে সে ! অধর শুকিয়ে আসছে মিহির । ও জিভে অধর ভেজালো । কাঁপছে হাত পা । এর মধ্যে রাফি আবার বললো…
” কি হলো ! হবে আমার এক জীবনের জীবন সঙ্গী ?
শ্বাস পড়লো মিহির । মাথা ঝাঁকায় সে মূর্ত বনে । রাফি মুচকি হাসলো । চোখের ইশারায় হাত বাড়িয়ে দিতে বললো । মিহি কম্পিত হাত বাড়াতেই রাফি ওর হাতের অনামিকা আঙ্গুলে পড়িয়ে দিলো আংটি টা । অতঃপর চুমু খেলো হাতের পিঠে । শ্বাস আটকে আসছে মেয়েটার । রাফি উঠে দাঁড়িয়ে দূরত্ব ঘুচলো । সামনাসামনি কোমর জড়িয়ে ধরতেই ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো মিহি । তৎক্ষণাৎ ধ্যান ছুটলো । পিছিয়ে আসার চেষ্টা করলো সে । পারলো না । কোমর টেনে নিজের কাছে জড়িয়ে নিলো রাফি । গরম নিঃশ্বাস তার । যা আছড়ে পড়ছে মিহির মুখের উপর । শ্বাস প্রশ্বাসের গতি এলোমেলো হচ্ছে মিহির । শিউরে উঠছে লোমকূপ । শরীরের ভার ধরে রাখা দায় । নরম ফুলের পাপড়ির ন্যায় আর একটু পরশ পেলেই নেতিয়ে গলে পড়বে এক্ষুনি । রাফি ওর কানের কাছে মুখ নিলো । কানের লতিতে হাল্কা ঠোঁট ছোঁয়াতেই মিহি দুহাতে দূরে ঠেলার চেষ্টা করলো রাফি কে । বললো অস্ফুটে….
” এভাবে না প্লিজ…
” উঁহু !
” উই আর নট ম্যারেইড !
” হুঁ !
” সরুন ।
” উঁহু ! বলেছিলাম আবেদনময়ী রুপে দেখবো । দেখেছি , ভীষণ আবেদনময়ী লাগছে । এই আবেদনময়ীর কাছে এবার একটা আবেদন করি ? প্লিজ….
” ক…কি !
রাফি মুখ সরালো । চোখে চোখ রেখে গালে হাত রাখলো । গাল গলিয়ে কানের পাশে হাত পৌঁছালো তার । বৃদ্ধা আঙ্গুলে মিহির কম্পিত ওষ্ঠাধরে একটু স্পর্শ করতেই দাঁত খিচে চোখ বুঝলো মেয়েটা । খামচে ধরলো রাফির পাঞ্জাবির অংশ । শ্বাস আটকে নিলো দম খিচে । রাফির বিমোহিত ফিসফিসে হাস্কি স্বর…
” আই ক্যান ? জাস্ট ওয়ানস…
ধক্ করে উঠলো মিহি । উত্তর তৎক্ষণাৎ…
” নাহ….
” হ্যাঁ !
” প্লিজ !
” আই স্যাইড, প্লিজ ….
মিহি করুন চোখে ঠোঁট উল্টে তাকালো অসহায়ের ন্যায় । ওর এই অসহায় অবয়ব টুকু আরো বেশি আকৃষ্ট করলো রাফি কে । এক দৃষ্টি উল্টানো ওষ্ঠ যুগলের পানে । চোখের অসহায় টুকু আরো বেশি আবেদনাত্মক ঠেকলো । মেয়েটার শক্তি নেই ওকে দূরে সরানোর । রাফি বাধা না পেয়ে আরো বেশি অগ্রসর হলো । উপায়ান্তর না পেয়ে অসহায় অক্ষি যুগল বুজলো মেয়েটা । শ্বাস আটকে নিলো । রাফি সবে ঠোঁটে ঠোঁট স্পর্শ করবে , তার আগেই পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো বিকট শব্দে । আচমকা ভড়কালো দু’জনে । বাঁধন আলগা পেয়েই ছিটকে দূরে সরলো মিহি । পিছিয়ে আসলো রাফিও । ধ্যান ছুটতেই ভ্যাবাচ্যাকা খেলো রাফি । নতজানু মিহির পানে তাকিয়ে সম্বিত ফিরল পুরোপুরি । মেয়েটা পিছু ফিরে মুখ লুকালো । রাফি বড় বড় শ্বাস টানলো । ঢোক গিলে পকেট থেকে ফোন হাতড়ে বের করলো । স্ক্রিনে রাশেদ রায়হান চৌধুরীর নাম্বার টা আব্বু নামে সেইভ । অধর ভিজিয়ে কাঁপা হাতে ফোন রিসিভ করলো রাফি ।
এক দেখায় পর্ব ৫৩
” জ্বি আব্বু…
ফোনের ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতেই মুখের আদল বদলে গেলো ওর । সঙ্কিত হলো চেহারা । নিঃশব্দে সবটা শুনে বললো তড়িঘড়ি করে….
” আমরা আসছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব… আপনি খোঁজ করুন ।
