Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৫৩

এক দেখায় পর্ব ৫৩

এক দেখায় পর্ব ৫৩
সুরভী আক্তার

মিহি আপ্লুত হয়ে চাইলো । ফ্রেমটা কাঠের । নিখুঁত ভাবে খোদাই করে দুটো চোখকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেখানে । নয়ন জোড়া কুঁচকানো । মিহি না বুঝে অবুঝ নয়নে চাইলো , ওর নির্বোধ চাহনি দেখে ভ্রু নাচালো রাফি ‌। এবার নিজের ফোন থেকে সেই প্রথম সন্ধ্যায় ক্যামেরা ধারন করা ভিডিও টা বের করলো । মিহির হাতে ফোন ধরিয়ে বললো…
” এই সন্ধ্যার কথা মনে আছে ?
রাফির থেকে অবুঝ দৃষ্টি সরিয়ে ফোনে তাক করলো মিহি । ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নিজের ভীত অবস্থা, চোখের চাহনি থেকে শুরু করে দৌড়ে রিকশায় ওঠা পর্যন্ত সবটা ধারন হয়েছে ভিডিও তে । অমনি মিহির চোখের সামনে সেই সন্ধ্যার ঘটনা টুকু ভেসে উঠলো । ফোন থেকে চোখ সরিয়ে ও তড়িতে চাইলো রাফির দিকে । অস্ফুটে বললো…

” আ.. আপনি ? আপনি ছিলেন সেদিন ?
” জ্বি , ম্যাডাম ! আর সেদিনই এক দেখায় প্রেমে পড়েছিলাম আপনার ! অচেনা একটা মেয়ে ঝড়ের বেগে এসে আমার মনকে নাড়িয়ে দিয়ে পালিয়েছিলো সেদিন । আপনার কম্পিত চোখের চাহনির সাথে কেঁপেছিল আমার হৃদয় । এক মুহুর্তেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি ।
তারপর , আপনাকে খুঁজলাম । আর পেলাম না । পুরো এক সপ্তাহ পর আবার পেলাম , আবার সন্ধ্যায় , সেই বৃষ্টি স্নাত সন্ধ্যায় । আমার বোনের সাথে , আমার বোনের বান্ধবী হিসেবে । সেদিন দ্বিতীয় বার নিজেকে হারিয়েছিলাম আপনার মাঝে । তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম , আমি নিজেকে হাজার বার আপনার মাঝে হারাবো , কিন্তু আপনাকে আর হারাতে দেবো না ।
কিন্তু আপনি হারালেন আমার থেকে । সাতটা মাস দহনে পোড়ালেন আমায় । বুঝলেন না আমায় । এবার না হয় আমার হয়ে যান । একটু বুঝুন আমায় ! এবার আপনি শুধু আমার.. এই রুজান রাফি চৌধুরীর হয়ে থাকুন….
মিহি অবাক নয়নের কোণে চিকচিক পানি জমতে শুরু করেছে । রাফি কথা শেষ করতেই ও হুট করে নিচু হয়ে জড়িয়ে ধরলো রাফি কে । আলগা করে হাঁটু মুড়ে বসে থাকায় , আচমকা মিহির জড়িয়ে ধরায় টাল সামলাতে না পেরে পিছনের দিকে হেলে পড়লো রাফি । মেঝেতে বসে পড়লো সে । মিহি চোখ বুজে আরো শক্ত করে ওর গলা জড়িয়ে ধরলো । বিড়বিড় করলো….

” সরি , আর হারাবো না ! আর পোড়াবো না আপনাকে । আমি শুধু আপনার…
” তুমি না বললেও তুমি শুধু আমার…
যতদিন না তোমাকে সম্পুর্ন রুপে নিজের করে পাচ্ছি , ততদিন পুড়তে হবে ।
মিহি ধীরে ধীরে ছাড়লো ওকে । চোখ তুলে না তাকিয়ে আচমকা উঠে দাঁড়ালো । ছুট লাগালো সেখান থেকে । রাফি নিজেকে ধাতস্থ করে দ্রুত বলে উঠলো….
” মিহি , ছুটছো কেনো ? পড়ে যাবে তো…!
মিহি আর কান দিলো না । আর না থামলো । ছুট্টে বেরিয়ে গেলো ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী এসেছেন খানিক আগে
। ফ্রেশ হয়ে নিজের ঘরে বসেছেন একটু । নিচে রাতের খাবারের আয়োজন হচ্ছে । সবাই নিচে । আফসানা বেগম সবার মধ্য থেকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন । ভাইয়ার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে কড়া নাড়লেন । গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন…

” ভাইয়া, আসবো ?
খাটে শরীর এলিয়ে বসে ছিলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । বোনের ডাকে সাড়া দিয়ে বললেন…
” অনুমতি নিতে হবে না । আয়….
মুচকি হেসে ঘরে ঢুকলেন আফসানা বেগম । বললেন এগোতে এগোতে…
” কি করছো ভাইয়া ?
” কিছু না ।‌ মাথা ধরেছে একটু । কিছু বলবি ?
” মাথায় হাজার খানিক চাপ নিয়ে ঘুরে বেড়ালে তো মাথা ধরবেই । কিছু বলতেই আসলাম । তোমার মাথা থেকে একটা চাপ দূর করার প্রস্তাব নিয়ে আসলাম ।
কপাল গুটিয়ে চাইলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । না বুঝে শুধালেন….
” কি প্রস্তাব ?
আলতো হেসে খাটের পাশে বসলেন আফসানা বেগম । বললেন…
” প্রস্তাব টা রুহি কে নিয়ে …
” রুহি ?
” হুম !
” একটু খোলাসা করে বলবি তো !
” আরে ভাইয়া , তুমি না মেয়ের বাবা । মেয়েকে নিয়ে টেনশন নেই তোমার ? মেয়ের বিয়ে দিতে হবে তো ! বাড়িতে আরো কতগুলো বিয়ে বাকি ! এক জনকে দিয়েই তো শুরু করতে হবে । মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলাম তোমার কাছে !
দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । আফসানা বেগম আবার বললেন…

” রুহির বিয়ের যথাযথ বয়স হয়েছে । দেরি করলে মেয়ের প্রতি মায়া, দূর্বলতা বাড়বে । মিহি ও আছে এর পর । রুহি কে আমার কাছে ছেড়ে দাও… আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি । শুনবে ?
রাশেদ রায়হান চৌধুরী সায় দিতেই প্রস্তাব পাড়লেন আফসানা বেগম । রুহির বিয়ের প্রস্তাব । সবটা শুনে রাশেদ রায়হান চৌধুরী ভেবে হ্যাঁ বোধক উত্তর করলেন ।

সকাল সাতটা । মিহি , ঘুমে বিভোর । রুহির ডাকে ঘুম ভাঙল ওর । রুহি চেঁচিয়ে ডাকছে…
” পাখিইই ! উঠবি না ? এইইই ,,ওঠ ! সারপ্রাইজ আছে । ওঠ না…..
নিভু চোখ মেলতেই , রুহি আবার বললো….
” কটা বাজে দেখেছিস । সাতটা পেরিয়েছে । ভাইয়া তোকে কিছু বলে নি ?
তড়িতে লাফিয়ে উঠলো মিহি । চোখ ডলে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো । সাতটা দশ বাজতে চললো । ও ঢোক গিলতেই রুহি ওকে ঝাঁকিয়ে বললো…
” কি রে ? ভাইয়ার কথা গুলো ভুলে গেছিস ?
মিহি চোখের পলক ফেলে চাইলো । রুহি জানে ? এটা জানা ছিলো না । মিহি অবুঝের ন্যায় শুধালো…
” হ্যাঁ ?
” উফফফ , তুই না !
যা তো , তাড়াতাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে । ভাইয়া ঘুরতে নিয়ে যাবে আমাদের । এই নে তোর শাড়ি , এটা পড়তে বলেছে ভাইয়া । আমি ছোট মা কে ডেকে আনছি , আমাদের শাড়ি পড়িয়ে দেবে…
কথা শেষ করে বিচলিতের ন্যায় ঝট পট খাট থেকে নেমে ঘরের বাইরে দৌড়ে বেরোলো রুহি । সিঁড়ির সামনে মুখোমুখি হলো রাশেদ রায়হান চৌধুরীর ! অমনি চঞ্চল পা যুগল থেমে গেল ওর । শান্ত হয়ে গুটিয়ে দাঁড়ালো একপাশে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী নিচে নামছিলেন , বাড়ি রং করানোর পর তারা উপরের ঘরে শিফট করেছিলেন । রুহি কে দৌড়াতে দেখেছেন তিনি । রুহি থামতেই তিনি এগিয়ে এসে বললেন মেয়ে কে আগা গোড়া দেখে..

” এভাবে ছুটছো কেনো ?
” না , আব্বু ! নিচে যাচ্ছিলাম , ছোট মা’কে ডাকতে ?
” তাই বলে ছুটবে ? বড় হয়েছো তুমি ! পড়ে গেলে কি হবে ?
রুহি কে নিশ্চুপ হয়ে মাথা নামিয়ে থাকতে দেখে আবার বললেন, এবার গলা নামিয়ে…
” ছোট মা কে ডেকে কি করবে ?
রুহি চকিতে তাকালো । খানিক খুশির ভঙ্গিতে বললো….
” শাড়ি পড়িয়ে নেবো । ভাইয়া ঘুরতে নিয়ে যাবে আমাদের । আমাকে আর পাখি কে ।
” কোথায় নিয়ে যাবে ?
” সেটা তো বলে নি !
” শান্ত যাবে ?
” হুম !
” আচ্ছা , যাও । নিচে যেতে হবে না আর । তুমি ঘরে যাও, আমি তোমার ছোট মা’কে পাঠিয়ে দিচ্ছি । তোমাকে আর নিচে নামতে হবে না ।
রুহি ঘাড় কাত করে বাধ্য মেয়ের মতো গুটি গুটি পায়ে ঘরের দিকে এগোলো । ও ঘরে না ঢোকা পর্যন্ত চেয়ে দেখলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । রুহি ঘরে ঢুকে মিহি কে এখনো পাথরের ন্যায় সটান বসে থাকতে দেখে চেঁচিয়ে উঠলো….

” পাখি , তুই এখনো বসে আছিস ?
মিহি ঘাড় ঘুরিয়ে নির্বোধের ন্যায় শুধালো…
” কোথায় যাবো ?
” ঘুরতে !
” কোথায় ?
” জানি না , ভাইয়া নিয়ে যাবে । আমাদের দুজনের জন্য দুটো শাড়ি এনেছে । চুড়ি আর ঝুমকো ও আছে । গোলাপি রঙের টা তোর , আর খয়েরী টা আমার । ভাইয়া তো বললো , তোকে বলেছে , ভুলে গেছিস ?
ছোট মা এক্ষুনি চলে আসবে শাড়ি পড়াতে । যা না , তাড়াতাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয় ।
মিহি সোফার দিকে তাকালো । রুহির শাড়িটা গুছিয়ে রাখা সোফার উপর । আর ওরটা নিজের কোলে । ও তো কাল রাফির ঘরেই ফেলে এসেছিলো এই শাড়িটা ।
মিহি কে ঠায় বসে থাকতে দেখে রুহি মুখে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করে ওকে টেনে খাট থেকে নামিয়ে ঠেলে ঠুলে ওয়াশ রুমে পাঠালো ।
হালিমা বেগম এসে ওদের শাড়ি পড়াতে পড়াতে আটটা বেজেছে । জেনি যোগ হয়েছে ওদের সাথে । ওও যাবে এখন । রাফি ওকে তৈরি হতে বলেছে । পুঁচকে টা লাফাতে লাফাতে নিজের ঘর থেকে নতুন একটা ড্রেস বের করে রেডিও হয়ে গেছে ইতিমধ্যে । মেহজাবিন যাবে না , ওকে একবার বলেছিল রাফি । এই অবস্থায় বেশি নড়াচড়া করা উপযোগী হবে না । হেনা বেগম বারন করেছেন ওকে যেতে । এমনিতেও ও যেতো না । ও বোনদের সাজগোজে সাহায্য করছে ।

মিহি খায় নি এখনো । রুহিও খায় নি । সকালের নাস্তায় নিচে বসেছে সবাই । হালিমা বেগম ওদের তাড়ায় নিচে নামতে পারেন নি এখনো । তিনি মহা ব্যাস্ত দুই মেয়ে কে সাজাতে । হেনা বেগম একবার উপরে উঠেছিলেন , মেয়েদের সাজগোজ দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আবার নিচে নেমেছেন সবাইকে নাস্তা দিতে । ‍রাফি আর শান্ত আয়েশ করে খাচ্ছে । খানিক আগে শান্ত একবার কড়া নেড়েছিল রুহির ঘরের দরজায় । ওরা দরজা খোলে নি । রাফিও ওদের আর দেখতে পায় নি । সাবিনা বেগম ওদের সাথেই আছেন । রাফি আর শান্ত আজ ফিটফাট । আজ ভোল পাল্টেছে দুজনের । দুজনের পড়নেই পাঞ্জাবি । রাফির পড়নে কালো , আর শান্তর পড়নে খয়েরী । ও অবশ্য রুহির সাথে ম্যাচ করে পাঞ্জাবি পড়েছে । রুহির শাড়িটাও কাল রাতে ও নিজেই কিনে এনেছে । তখনই পাঞ্জাবি কিনেছে ম্যাচ করে ।
আজ বৃহস্পতিবার । শুক্রবার ব্যাতীত ছেলেদের এমন সাজ পোশাকে দেখা হয় না । রাশেদ রায়হান চৌধুরী দুই ছেলে কেই এক পলক করে দেখে খেতে খেতে স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন….

” শুনলাম ঘুরতে যাচ্ছো ? তা যাচ্ছো টা কোথায় ?
রাফি তাকিয়ে খাবার গিলে উত্তর করলো…
” ঢাকার বাইরে !
” কোথায় ?
” সিলেট !
” সেখানে কেনো !
” বিয়ে করতে !
খাবারে মনোযোগ দিয়েই আচমকা মুখ ফসকে বেফাঁস বলে ফেললো শান্ত । ভুল বলেছে এটা ধ্যানে আসতেই গলায় খাবার আটকালো । অমনি খুক খুক করে কেশে উঠলো ও । রাশেদ রায়হান চৌধুরী , আর জুবায়ের চৌধুরী খাওয়া ছেড়ে চোখ বড় বড় করে তাকালেন । আফসানা বেগম প্রথমে খেয়াল করেন নি । কথাটা খেয়ালে আসতেই হা করে তাকালেন তিনিও ‌। হেনা বেগম ও তাই । রাফি খাওয়া রেখে কটমট করে তাকালো শান্তর দিকে । শান্ত চোখ তুলে ঝট করে এদিক ওদিক তাকালো । সবার তাজ্জব দৃষ্টি দেখে থতমত খেলো । রাফির নিরেট দৃষ্টি দেখে দাঁত কেলালো বোকার ন্যায় । অতঃপর নিজেকে শুধরে বললো মিনমিন করে…

” থুক্কু ,,
ভুল কইছি মামু । বিয়ে করতে না , বিয়ে দিতে যাচ্ছি । আই মিন, বিয়ের দাওয়াত খেতে যাচ্ছি । রাফির ক্যাফের একজন স্টাফের বিয়ে , সেই বিয়েতেই যাচ্ছি ।
সবাই যেনো স্বস্তি পেলো । আবার খাওয়ায় মনযোগ দিলো সবাই ।
হেনা বেগম প্লেটে চারটে পরোটা তুলে ,এক বাটি সবজি সমেত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন । তিনি দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে খট করে দরজা খুললেন হালিমা বেগম । সামনে হেনা বেগম কে দেখে মুচকি হাসলেন তিনি । হেনা বেগম বললেন….
” হয়েছে ওদের ? আর কতক্ষন লাগবে ? খাওয়ার কথা মাথায় আছে ? নাকি না খেয়েই যাবে ওরা ?
বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন তিনি । দুই মেয়ে পুরোপুরি তৈরি ।
ভেতরে ঢুকতেই মেয়েদের দেখতে পেলেন তিনি । অমনি হা হয়ে গেলেন । শাড়িতে দুই মেয়ে , মাথায় হিজাব । মুখে হালকা সাজগোজ । দু’জনেই চকচকে নয়নে হেনা বেগমের দিকে হাসি মুখে চেয়ে । হেনা বেগম তাকাতেই হাসির মাত্রা বাড়লো । রুহি গদগদ হয়ে কোনো রকমে হেঁটে আসলো…

” মাম্মি জি , কেমন লাগছে আমাদের ?
হেনা বেগম প্রগাঢ় মুগ্ধতায় দুই মেয়েকে চোখ ভরে দেখলেন । অতঃপর মিষ্টি করে বললেন…
” খুব সুন্দর লাগছে , মাশাআল্লাহ ! কারোর নজর না লাগুক ।
মেহজাবিন বিড়বিড়িয়ে বললো বিপরীতে..
” দুই মেয়ে কে নজর দেওয়ার জন্য তোমার দুই পুত্র নিচে হাপিত্যেশ করে বসে আছে মামনি । নজর কাটিয়ে লাভ নেই ।
কারোর কানেই পৌঁছালো না কথাটা
হেনা বেগম আবার বললেন…
” রাফি আর শান্ত অপেক্ষা করছে নিচে । তাড়াতাড়ি খেয়ে নে দেখি ।

বলেই বিছানার দিকে এগোলেন তিনি । রুহি কোনো রকমে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে । পা ফাঁক করে হাঁটতে পারছে না ঠিকমত । এই নিয়ে তিন দিন শাড়ি পড়া ওর । শাড়িতে কমফোর্টেবল নয় সে । এক পা এগোতেও হিমশিম খেয়ে যায় । আজ ও তাই । রুহি কে ওভাবে হাঁটতে দেখে হেনা বেগম ওর দিকে ভালো করে নজর বুলিয়ে নিলেন । কাল রাতে শোবার আগে রাশেদ রায়হান চৌধুরী আফসানা বেগমের দেওয়া প্রস্তাব টা জানিয়েছেন ওনাকে । হেনা বেগম কিছুই বলেন নি । চুপচাপ পাশ ফিরে শুয়েছিলেন । এখন মনে পড়লো কথা টুকু । অমনি মুখখানা মলিন হয়ে আসলো তার । মেয়ের বিয়ে নিয়ে কথা উঠেছে । একবার যেহেতু কথা উঠেছে , এটা নামবে না নিশ্চয়ই । আর রাশেদ রায়হান চৌধুরী ও তো সম্মতি দিয়েছেন । তিনি জোর পূর্বক মুখের উপর না বলেন নি । যত যাই হোক , নিজের বোন প্রস্তাব উত্থাপন করেছে বলে কথা । কাল শুক্রবার , কাল তো কিছু একটা হবে ।
হেনা বেগম ভরাট চোখে চেয়ে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলেন না । চোখ নামিয়ে বললেন দীর্ঘ স্বরে…
” শাড়ি পড়তে পারিস না , আবার সামলাতেও পারিস না । সামলানো টা শিখে নে । বড় হয়েছিস , বিয়ে দিতে হবে তো । নাকি ? শাড়ি পড়ে এভাবে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটবি নাকি বিয়ের পর ?

” ওও মামনি , বিয়ের পর এখন শাড়ি কে পড়ে বলতো ?
মেহজাবিনের কথায় পরোটা ছিড়ে সবজি মাখাতে মাখাতে আবার বললেন হেনা বেগম…
” বিয়ের দিন তো পড়বে নাকি ? তখন কি এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটবে ? এতো বড় মেয়ে , শাড়ি সামলাতে পারে না । মিহি তো পারে , ও তো রুহির ছোট ।
” উফফফ, আম্মু । কি শুরু করলে বলতো ? আমার বিয়ে টানছো কেনো এসবে ? আমি এখন বিয়ে করছি না । তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না এতো সহজে । তুমি খাইয়ে দাও তো । ভাইয়া ওয়েট করছে । পাখি,,, তাড়াতাড়ি আয় , দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের ।
হেনা বেগম কথা বাড়ালেন না । মুখে হাসি ও ফোটালেন না আর । থমথমে মুখে দুই মেয়েকে দু টুকরো পরোটা মুখে তুলে দিতেই ওদের পেট ভরলো । আর খাবে না ওরা । অনেক দূর জার্নি করে যেতে হবে । খাওয়ার জন্য বেশি জোর করলেন না হেনা বেগম ।
মিহি,রুহি আর একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের সাজগোজে ফিনিশিং টানলো । অতঃপর বেরোলো ঘর থেকে । ওদের পিছু পিছু সবাই । রুহি হাঁটতে পারছে না । ওকে সাথে নিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে সকলে ।

রাফি আর শান্ত সোফায় বসে ফোন ঘাটছিলো । রাশেদ রায়হান চৌধুরী অফিসে যান নি এখনো । ছেলে মেয়েদের বিদায় দিয়ে বেরোবেন তিনি । তিনি কোনো দরকারি ফাইল নিতে উপরে উঠেছেন । ঘর থেকে বেরিয়েই মেয়েদের সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখলেন । পিছু পিছু মুচকি হেসে নামলেন তিনি ও ।
রুহি, মিহির হাতে রিনিঝিনি কাঁচের চুড়ি । চুড়ির ঠোকায় ঝিনঝিন শব্দ হতেই , তা লক্ষ্য করে চোখ তুললো দুই যুবক ।
সামনে দুই ঊনবিংশী রমনী ঝিনুকের ন্যায় চিকচিকে হাসি সমেত এগিয়ে আসছে । ‌শাড়ির কুঁচি সামলাতে ব্যস্ত তারা । অনিমেষে মূক বনে গেলো দুই যুবক । বৃহৎ হয়ে আসলো দুই জোড়া নয়ন । যে যার নিজস্ব প্রেয়সীর পানে চেয়ে । প্রেয়সী দ্বয়ের পাশে যে মা বোনরা আছে , সেটা লক্ষ্য করলো আর কে ? তাদের দৃষ্টি তো একস্থির হয়ে আটকে গেছে তাদের প্রেয়সীর পানে । শাড়িতে আজ তৃতীয় বার রুহি আর মিহি কে দেখলো শান্ত আর রাফি । নতুন ভাবে নতুন রুপে । এই মেয়েরা একেক সময় একেক রুপ ধারণ করে কেনো বলতো ? প্রশ্ন জাগলো দুই যুবকের মনে ।
প্রশ্নের সাথে উথাল পাথাল ঝড় । শুরু হয়ে গেছে তোলপাড় । সৌন্দর্যে চোখ আটকায় , তবে চোখ সৌন্দর্যের গভীরে হারালে খেই থাকে না ।

সেটাই হলো দুজনের ক্ষেত্রে । ওরা তো হা বনে চেয়ে নিজ খেয়ালে । সিঁড়ি পেরিয়ে সবাই এসে দাঁড়িয়েছে ওদের পাশে । তবুও ওদের হুঁশ নেই । ওরা চেয়ে সেই একই ভাবে । হেলদোল নেই ,, এখনো যেনো চোখের সামনে দুই ঊনবিংশী রমনীকে হেলে দুলে আসতে দেখছে হাসি মুখে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী ও সিঁড়ি পেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন । ছেলেদের ওভাবে পাথরের ন্যায় ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে থাকতে গলা খাঁকারি দিলেন । হাওয়ায় চেয়ে আছে ছেলেরা । কি দেখছে সিঁড়ির দিকে ?
তার গলা খাঁকারিতেও কাজ হলো । এক চুল ও নড়লো না কেউ । হেনা বেগম এদিকে ধ্যান না দিয়ে এঁটো প্লেট নিয়ে কিচেনে ঢুকেছেন । রুহি ধীরে ডাকলো প্রথমে…
” ভাইয়া ?
কাজ হলো না । অতঃপর চেঁচিয়ে ডাকল জেনি…
” রাফি ভাইয়া ?
চমকে উঠলো দু’জনে । সিঁড়ির দিক থেকে চোখ সরিয়ে জেনির দিকে ঝট করে অবিলম্বে তাকালো । চোখ গোল গোল নির্বোধ । রাফি চমকে উত্তর করলো…
” হ্যাঁ ?
” আমরা রেডি ! চলো , যাবে না ?
রুহির কথায় সম্বিত ফিরল দু’জনের । শান্ত এখনো গোটা দৃষ্টিতে চেয়ে বিড়বিড় করলো নিজের মাঝে…

” একি নারী , না পরী ? মেরি জান , মারার প্ল্যান করছো আমায় ?
রাফি রুহির উত্তর না করে পাশে তাকালো । মিহির সাথে চোখাচোখি হতেই মিহি মাথা নামিয়েছে তৎক্ষণাৎ । চোখ নামিয়ে নিজেকে দেখলো ও । রাফির ভাষ্যমতে , আবেদনময়ী লাগছে তো ওকে ? ও তো সেজেছে রাফির দেওয়া সাজপোশাকেই ! লাগছে তো আবেদনময়ী ? আচ্ছা , আবেদনময়ী টা কি ? কেমন দেখতে হলে আবেদনময়ী লাগে ?
রাফির দৃষ্টি ফের আটকালো মিহিতে । চোখ সরছে না ওর । ঠোঁট শুকিয়ে আসছে । রাফি জিভে ঠোঁট ভেজালো । চোখে ফেললো এক দীর্ঘ পলক । ঢোক গিলে চোখ উপর নিচ করে আগা গোড়া দেখে নিলো নাজুক মেয়েটাকে । এক চিলতে হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোণে । এবার ধ্যান কাটলো আব্বুর ডাকে । ছেলের ভাবসাব দেখে রাশেদ রায়হান চৌধুরী কেশে গলা পরিষ্কার করে বলে উঠলেন…
” রাফি , দেরি হয়ে যাচ্ছে । অনেক টা পথ যেতে হবে । বেরোও এখন ।
রাবির বুক খানা ধড়াস করে উঠল । চোখ নামিয়ে নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করলো ও । কপাল চুলকে বললো , কন্ঠের কাঁপা বাক্যে…

” হ্যাঁ ? যা..যা.. যাচ্ছি ? এখন ! রু..রুহি ,চ.. চল ?
হালিমা বেগম কপাল গুটিয়ে শুধালেন….
” তোতলাচ্ছো কেনো রাফি ?
রুহি, মেহজাবিন অবস্থা বুঝে ফিক করে হেসে উঠলো । রুহির হাসি টুকু যে আর একজনের হৃদয়ে এসে তীরের ন্যায় বিধলো , সেটা কি বুঝলো সে ? সে কি একবারও তাকিয়েছে সেই একজনের দিকে ?
সাবিনা বেগম দেখেও দেখলেন না কিছু । ওদের পাশ কাটিয়ে দূরে সরে কিচেনে ঢুকলেন তিনি । রাফি উঠে দাঁড়িয়ে চোখ নিচু রেখেই আবার একই ভাবে বললো…
” না , ছোট মা । কি.. কিছু না ।
অতঃপর না তাকিয়ে তাড়া দিলো…
” চলো তোমরা ?
চোখ তুলে তাকালে সর্বনাশ ! তাকানো দায় । ভেতর কাঁপছে , স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে রাফি ! রুহি মিহির হাত টেনে বাইরের দিকে এগোলো । পিছু পিছু জেনি । ও বেচারি কাবাবে হাড্ডি হতে যাচ্ছে নাচতে নাচতে ।
রাফি বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে সংযত করতে ব্যস্ত । রাশেদ রায়হান চৌধুরী বললেন এর মাঝেই….
” তাড়াতাড়ি ফিরে এসো । আর , সাবধানে গাড়ি চালাবে ! নিজেদের সাথে ওদের ও খেয়াল রাখবে !
” জ্বি আব্বু ।

ঝটপট বাইরে বেরোলো ওরা । শান্ত নিরেট পাথরের ন্যায় থম মেরে টান টান হয়ে হাঁটছে । মুখ ফাঁক , চোখ স্থির । ঘোরে এখনো সে । রাফি চোখে কালো সানগ্লাস লাগিয়ে শক্ত মুখে গাড়িতে উঠে বসলো । শান্ত পাশে বসলো একই ভাবে । মিহি,রুহি ব্যাক সিটে দুই জানালার দুই পাশে । মাঝে জেনি । ও বকবক করছে । শান্ত,রাফি উঠতেই চুপ করলো । রুহি হাসি মুখে শুধালো তড়িঘড়ি….
” ভাইয়া , কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের ?
না তাকিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন চালু করতে করতে গম্ভীর স্বরে উত্তর করলো রাফি…
” গেলেই দেখতে পাবি !

গাড়ি চালু হলো । সানগ্লাসের আড়ালে টেনে টুনে নিজের চোখ দুটোকে সংযত করার চেষ্টা চালাচ্ছে রাফি । অবাধ্য চোখ কথা শুনছে না । নিজের দখলে থেকে , অন্যকে দেখতে মরিয়া হয়ে যাচ্ছে । কিন্তু দেখা যাবে না । পিছু ফিরে তাকানো যাবে না আর । আর না চোখ তুলে ফ্রন্ট মিররে তাকানো যাবে । রাফি দম খিচে এক মুহুর্ত চোখ বুজলো । বড় বড় শ্বাস টেনে চোখ খুলে পাশে তাকালো । শান্ত সিটে মাথা এলিয়ে পিছন ফিরে হা হয়ে ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে আছে রুহির পানে । রুহি শান্তর দৃষ্টি বুঝে মুখ বাঁকিয়ে চোখ ফেরালো ভেংচি কেটে । দীর্ঘ শ্বাস ফেললো শান্ত । এই মেয়েটা একেবারেই আন রোমান্টিক , শান্ত বেচারা কত যাতনা পুষে অস্থির হয়ে দেখছে ওকে , আর ও চোখ ফেরালো । এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ও প্রতিক্রিয়া দেখালো না ।
রাফিও দীর্ঘ শ্বাস ফেললো শান্ত কে দেখে ।

দীর্ঘ জার্নির পর সিলেটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল সাড়ে তিনটে বেজেছে । অর্ধেক পথ এক্সচেঞ্জ করে শান্ত ড্রাইভ করেছে । রুহি পুরো রাস্তায় না করে হলেও হাজার বার জিজ্ঞেস করেছে, কোথায় যাচ্ছি , কোথায় যাচ্ছি ? রাফি বরাবরই এক উত্তর দিয়েছে । রুহি জিজ্ঞেস করতে করতে মুখে ফেনা তুলে , অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েছে । পথে গাড়ি থামে নি , দীর্ঘ সময় বসে থাকতে থাকতে অবস্থা খারাপ । কোমর লেগে গেছে । সাজগোজের অবস্থাও রিক্ত । জানালা দিয়ে আসা বাতাসে হিজাব এলোমেলো । মাথা ধরবে ভেবে দুজনে হিজাব খুলেছে মাঝ পথে । এখন এলোকেশি দুজনে । এই রুপটা আবার দুই যুবকের চোখে ভিন্ন ভাবে ধরা দিলো ।
এখন ঘুমিয়ে তিন বোন । গল্প করতে করতে ঘুমিয়েছে । গাড়ি তো গন্তব্যে থামার নাম নেই , আর না কেউ উত্তর করছে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ! ওরা ঘুমিয়েছে তাই । শাড়ির কুচি ও এলোমেলো ।

সিলেটের সেই চেনা জায়গা । ছোট্ট আবাসস্থল । সেখানে রাস্তার পাশে থামলো গাড়ি টা । নিচে ছোট রাস্তা । গাড়ি নিয়ে যাওয়া বিপদজনক । গাড়ি নামলেও , রাস্তার বাঁকে চালানো মুশকিল । বড় রোডে গাড়ি থামালো শান্ত । বিষন্ন চোখে পাশ ফিরলো । শান্তর ন্যায় একই ভঙ্গিতে সিটে মাথা এলিয়ে নিগুড় স্থির সুক্ষ্ম চোখে ঘুমন্ত মিহি কে দেখতে ব্যাস্ত রাফি । এভাবেই দেখছে দু ঘন্টা যাবত । শান্ত শব্দ করে শ্বাস ফেলে বললো….
” হয়েছে ভাই , এবার তো চোখ ফেরা ! ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা । যেভাবে দেখছিস তখন থেকে, নজর লেগে যাবে তো !
” তুই কতক্ষন আমার বোনের দিকে তাকিয়ে ছিলি , গুনেছিস ? আমি বাঁধা দিয়েছি তখন তোকে ? আমার দৃষ্টিতে নজর লাগবে না ওর ।

” হাহহ্ , তোর বোনের দিকে আমি তাকিয়ে ছিলাম ‌। আর তুই আমার বোনের দিকে তাকিয়ে আছিস ! শোধ বোধ । এখন গন্তব্যে এসেছি , এবার থাম ভাই ? ঘুমিয়ে আছে ওরা , ডাক ওদের !
রাফি স্বাভাবিক হয়ে বসলো । মুখের ভঙ্গিমা শীতল । শীতল কন্ঠেই বললো…
” রুহি কে ডাক আগে…
শান্ত রুহি কে ডাকলো । দু একবার ডাকতেই চোখ খুললো রুহি । হাই তুলে গা মোড়ালো । চোখ ডলে বললো কাতর হয়ে…
” কি হয়েছে ? এসেছি ?
” হুম , উঠো ! ডাকো মিহি কে …
রাফি বাঁধা দিলো ,
” তোমরা নামো , আমি মিহি আর জেনি কে নামাচ্ছি ।
শান্ত গাড়ি থেকে নেমে ঘুরে গিয়ে পিছনের দরজা খুলে দিতেই রুহি নামলো । এতক্ষণ ধরে ঝিম মেরে বসে থাকায় কোমর লেগে গেছে । সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলো না ও । কুকিয়ে উঠলো কোমর চেপে ধরে । ব্যতিব্যাস্ত হয়ে পড়লো শান্ত…

এক দেখায় পর্ব ৫২

” কি হয়েছে,জান ? কোমর ব্যথা করছে !
খেকিয়ে উঠলো রুহি…
” সরুন তো , ছোঁবেন না । এতক্ষণ ধরে বসিয়ে রেখে এখন কি হয়েছে শুনতে এসেছেন ?
রুহির ঝাঁজালো স্বর শান্তর ভালো লাগলো না বোধহয় । মুখখানা মলিন করলো ও । বাধ্যের ন্যায় সরে আসলো । রুহি লক্ষ্য করলো বিষয় টুকু । অমনি খারাপ লাগলো নিজেকেও । এখানে রাফি আছে , রুহি কিছু বলতে গিয়েও পারলো না ।
রাফি বাম পাশের দরজা খুলে ঘুমন্ত মিহি কে শীতল কন্ঠে ডাকলো….
” মিহি….??

এক দেখায় পর্ব ৫৪