এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৭
আসিফা খান
গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করার আগেই রিফাত এর যেনো মনে হলো কেও তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।। কানে আসলো কারোর কণ্ঠ ” ভাইজান”। ভ্রু কুঁচকে পিছন ফিরে দেখতেই চোয়াল শক্ত হলো রিফাত এর।। রাগ হলো কিছুটা। কিন্তু তার পরেও নিজেকে যথা সম্ভব সংযত রাখার চেষ্টা করলো। সিয়াম হয়তো কিছুটা রিফাত এর অবস্থা অনুমান করতে পারলো। ঠোটের কোনে হাসি টেনে বললো,,,
“আমায় দেখে আপনার রাগ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। আপনার জায়গায় আমি হলে হয়তো আমার প্রতিক্রিয়াও এরকম টাই হতো।”
শুনলো কিন্তু কোনো রকম উত্তর দিলো না রিফাত। একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল সিয়াম এর দিকে। কঠিন, নীরব তার দৃষ্টি।। সিয়াম আবারও বললো,,,”আসলে আমি অত্যাধিক লজ্জিত।নির্বোধ আচরণের জন্য অনুশোচনাপূর্ণ আমি। সমস্ত কিছু আমাদের জানা উচিত ছিলো। হুট নেওয়া আমাদের পদক্ষেপে আপনারাও কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।”
সিয়াম থামলো। কেনো জানি রিফাত এর দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছে না তার। এই মানুষটার সামনেই তারই স্ত্রীর জন্য বিবাহ প্রস্তাব জানিয়েছিল সে,,,ভাবতেই নিজের উপর কেমন রাগ লাগছে সিয়াম এর সাথে রয়েছে লজ্জা।। সমস্ত কিছু শুনে রিফাত ও কিছুটা খান্ত হলো। সিয়াম ছেলেটা ভালো,, তার ভদ্রতার পরিচয় কালকেই পেয়েছে সে।। রিফাত এবার গা ছাড়লো,,,আচরনে পরিবর্তিত আনার চেষ্টা করলো সে।। এখন যেনো সিয়াম কে ধন্যবাদ জানাতে মন চাইছে তার। জিবনে প্রথম বার রিফাত যদি কারোর প্রতি ঈর্ষা অনুভব করে তাহলে সেই মানুষটি হলো সিয়াম।।রিফাত সভাবিক কন্ঠে বলল,,,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ইটস ওকে।। আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড। প্রথম পরিচয় ওকোয়ার্ড ছিল,,, আম রিফাত হোসেন।”
সিয়াম বিস্তার হাসলো,,,রিফাত এর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের মাঝে নিজের হাত বাড়িয়ে হ্যান্ড শেক করলো।
“সিয়াম আহমেদ।। আপনার সাথে কথা বলে কিছুটা ভালো লাগছে,,,নাহলে কাল থেকেই অপরাধবোধে ভুগছিলাম।।”
সিয়াম থেমে আবারও ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফোটানোর চেষ্টা করে বললো,,”এমনিতেও, সব কিছু পেতে হবে এমন কোনো কথা নেই, কিছু জিনিস দূর থেকেই সুন্দর।।”
“উঁহু,,, যাহ পাওনি তাহ তোমার ছিল না,,,যেটা তোমার সেটা পাওয়া থেকে কেও তোমায় আটকাতে পারবে না।।”
কথাটি বলে রিফাত ড্রাইভিং সিটে বসতে উদ্যোগী হয় এমন সময় সিয়াম আবেগী কণ্ঠে বলে ওঠে,,,”আপনাকে আমি নিঃসন্দেহে একজন লাকি পার্সন বলতে পারি মিস্টার রিফাত।”
সিয়াম এর এহেন কথায় রিফাত এর বুক এর মাঝে এক অনুরাগের অনুভূতি কেমন খলবোলিয়ে উঠলো। নজরের সামনে ভেসে উঠলো ইয়ানার নির্মল মায়াবী চেহারা।। সত্যি তো সে লাকি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই,থাকার কথাও না। তার চোখের সামনে বেড়ে ওঠা ওই মেয়ে নিতান্তই বিচিত্র। রিফাত ফিরে তাকালো,,,দেখলো সিয়াম এর হেঁটে চলা,বুঝলো মন ভাঙ্গার কষ্ট,শুনলো সেই অনুল্লেখ ঝনঝন শব্দ। অনুভবে বুজে যায় নয়ন জোড়া। কিছু মুহূর্তের জন্য মনে পড়লো নিজের তিক্ত অতীত।। জীবনের এক অতীব বাস্তব,,,অতীত মুছে ফেলা অসম্ভব,অসাধ্য।।
ইয়ানা নিজের রুমে শুয়ে আছে। রিফাত না থাকলে ভীষণ একাকী বোধ করে ইয়ানা তাইতো আগে যে রুমে তার আস্তানা ছিল সেখানেই চলে আসে।। হাতে ফোন থাকা সত্বেও তার নজর সিলিং এর দিকে, আকাশ পাতাল চিন্তা করছে। আর আনমনে হেসে উঠছে সে, আবার মাঝে মধ্যেই লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে তার দুই গাল।। আজকাল রিফাতকে নিয়ে চিন্তা করতে তার ভীষণ ভালো লাগে। কেমন অজানা শান্তি অনুভব করে সে।।
হেলে দুলে ইয়ানার রুমে প্রবেশ করলো আলেয়া। চোখে মুখে কেমন ক্লান্তির ছাপ।সোজা খাটের উপরে উঠে ইয়ানার পাশে শুয়ে পড়ে,তত্পর ঠোঁট উল্টে বলে,,,
“আপি,,,মাথা টিপে দাও ঘুমাবো।”
ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে এক পলক আলেয়ার দিকে তাকালো। ফোন সাইডে রেখে আলেয়ার মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বললো,,,”চোখ মুখের অবস্থা এরকম কেন?”
আলেয়ার চোখ বন্ধ রেখেই বললো,,”কাল বাদে পরশুদিন পরীক্ষা আপি ভীষণ ভয় করছে। মনে হচ্ছে যা পড়েছি সব ভুলে যাব।”
ইয়ানা হালকা হাসলো,,, আলেয়ার গাল টিপে দিয়ে বললো,,,”বেশি চিন্তা করিস না! সব ঠিক হবে।। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে দু’রাকাত সালাতুল হাজত এর নামাজ পড়ে নিবি। মন মস্তিষ্ক দুটোই ভালো থাকবে। পরীক্ষা ভালো হবে ইন- শা- আল্লাহ।।”
আলেয়া মাথা ঝাকালো, সম্মতি জানালো ইয়ানার কথায়।। তারপরে কিছুক্ষণ কথা চলল দুই বোনের মধ্যে একটা সময় আলেয়ার মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে ইয়ানাও হারিয়ে গেল ঘুমের রাজ্যে।।”
আসরের আযান কানে আসতে, ঘুম ভেঙে গেল ইয়ানার। পিটপিট চোখে তাকালো মাথার উপর ওয়াল ক্লক এর দিকে।। ঘড়িতে সাড়ে চারটা বাজে, জানলা থেকে বাইরে তাকাতেই দেখল আকাশটা বেশ ঘোর হয়ে আছে, পশ্চিম আকাশে জমেছে কালো মেঘের ভেলা। সময় নষ্ঠ না করে ইয়ানা উঠলো, ঝটপট ওয়াশরুম থেকে অজু করে এসে নামাজে দাঁড়ালো। তারপর কোরআন তেলাওয়া। আলেয়া এখনও ঘুমে আচ্ছন্ন,,,নামাজের জন্য তাকে ডেকে বিফল হলো ইয়ানা।।
ফিন কে খাবার দিলো। মিয়াও আওয়াজ শুনে বারান্দায় উকি দিতেই দেখলো মিশি কে,,তাকে কোলে তুলে নিজেকে গুছিয়ে নিচে আসলো ইয়ানা।। ইয়াসমিন বেগম,মিসেস আসফিয়া, ইসরাত বেগম সবাই ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছেন। ইব্রাহিম সাহেব আর আফতাব মিয়া গেছেন মসজিদ,একে বারে মাগরিবের নামাযের পরেই আসবেন তারা।। ইয়ানা সবার উদ্দেশ্যে বললো,,,
“চা করি?”
ইসরাত বেগম মঞ্জুরি দিলেন সাথে এটাও বললেন,,,”দশ বার হাত ধুবি,,,ওই বিড়াল এর ছোঁয়া তোর হাতে।”
আসফিয়া বেগম ইয়ানার উদ্দেশ্যে বললো,,,”তুই বস আমি করছি। শাড়ি পরে গ্যাস এর ধরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।। এমনিও রান্নাঘরে কিছু কাজ আছে।”
ইয়াসমিন বেগম ও পিছে গেলো তার। ইয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে জানতো এরকম টাই হবে।। মিশি কে কোলে নিয়ে বসলো সোফায়। ইসরাত বেগম তাসবিহ গুনতে গুনতে ইয়ানার উদ্দেশ্যে বললো,,,”রিফাত কই? দেখছিনা যে।”
“নার্সিংহোম গেছেন দাদী।”
“কখন আসবে।”
“বললো তো সন্ধায় ফিরে আসবে।”
ইয়ানার উত্তরে ভীষণ অসন্তুষ্ট হন ইসরাত বেগম।। মুখভঙ্গি বদলায় তাঁর। আজ কালকার মেয়ে মানুষ দের সাথে নিজের কালের বউ, ঝির বেশ পার্থক্য লক্ষ্য করলেন তিনি।। তসবিহ উপর চলমান আঙ্গুল থেমে গেল,,বেশ দৃঢ় ভাবে বললেন,,,
“স্বামীর প্রতি এত উদিসিনতা ভালো নয় মেয়ে।। রিফাত কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে তার পূর্ণ খেয়াল তোর রাখা উচিত।। এমনিতেও স্বামীর অধিকার তুই এখনও রিফাত কে দিসনি তাহ ভালই বুঝেছি আমি।।
পুরুষ মানুষের ভালোবাসা হলো গুপ্ত খাজনা, যে মেয়ে পায় সেই ভাগ্যবতী।”
ইসরাত বেগম এর কথায় ইয়ানা চোখ বড় বড় করে তাকায় তার দিকে। বুকটা কেঁপে ওঠে তার।। ইয়ানা নিজেকে সামলে ওঠার আগেই ইসরাত বেগম আরো বলেন,,,
“রিফাত এর বয়স দেখ,,,প্রায় তিরিশ ছুঁই। এই বয়সে সবাই বাবা হতে চায় আর তুই কি না!! শুনে রাখ,,,পুরুষ মানুষেরা জীবনে দুই নারীকেই বেশি প্রাধান্য দেয়,,এক তার জন্মদাত্রী আর দ্বিতীয় তার সন্তানের জননী।।”
ইয়ানার শরীর শিউরে উঠলো। মনটা আনচান করছে তার।। মাথায় অবাঞ্চিত ভাবনা চিন্তারা বাড়ি দিচ্ছে জোরে সোরে।। তবে কি রিফাত তাকে এখনও মেনে নেয়নি! না না কি সব ভাবছে ইয়ানা।। ইয়ানা ঘনো নিশ্বাস ছাড়ে।। কোনো কথা বলতে পারে না। সব কিছু কেমন দলা পাকিয়ে আটকা পড়েছে গলার মাঝে।। বিবর্ণ মুখদয় নিয়ে চুপ চাপ সোফা ছেড়ে উঠে গেলো ইয়ানা।। নিজের রুমে গিয়ে ব্যালকনিতে দাড়ালো।। মোচড় দিয়ে উঠলো অন্তর,,,নিজের অজান্তেই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা বারিকনা। সংসার জীবন নিয়ে ইয়ানর ধারণা কম কিন্তু স্বামী স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক নিয়ে তার ধারণা সল্প নয়।।
মাগরিবের আজান শোনা গেলো চারি দিক থেকে।। সময় নষ্ঠ না করে উযূ সেরে নামাজে দাঁড়ালো। মোনাজাত করলো লম্বা সময় ধরে। আশা,আকাঙ্ক্ষা, কষ্ট সবকটাই মেলে ধরলো আল্লাহর কাছে।।
বিছানায় বসে নিজের হাফ বোরখা হিজাব খুলতে খুলতেই দেখলো আলেয়া আলোসি ভাঙছে।। উঠে বসে ড্যাব ড্যাব করে তাকালো আলেয়া। মেয়েটার চোখ মুখ ঘুমের চোটে ফুলে গেছে।। আলেয়া ইয়ানার দিকে তাকিয়ে বললো,,
“এখন সকাল না সন্ধ্যা আপি?”
ইয়ানা আলেয়ার কথায় অবাক না হয়ে পরলো না। মানে এত ঘুমিয়েছে যে,সকাল সন্ধ্যার পার্থক্য করতে পারছে না এই মেয়ে।।
“এখন সন্ধ্যা আলুর বাচ্চা,,,ওঠ এবার যাহ ফ্রেশ হ।”
“আল্লাহ,,,,সন্ধ্যা হয়ে গেছে!! আমি পড়তে বসবো নাহলে সব ভুলে যাবো।”
আলেয়া একপ্রকার লাফ দিয়ে নামলো বিছানা থেকে। কিছুক্ষন পর ফ্রেশ হয়ে দৌড়ে নিজের রুমে চলে যায়।। ইয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোন হাতে নিল। দোনোমনায় ভাবছে রিফাত কে একটা কল করবে কি করবে না।। অবশেষে কাপা হাতে ডায়েল করলো রিফাত এর নাম্বার। ধুকপুক করছে ইয়ানার বক্ষ।। অধীর ব্যাকুল মন শিথিল হলো না,,,রিফাত ফোন রিসিভ করেনি।। ইয়ানা ঠোঁট বাঁকিয়ে নিজেকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করে নিজে নিজেই বললো,,,”হয়তো ব্যাস্ত।”
প্রবাহিত হলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা,,,ঘড়ির কাঁটা বাধাহীন স্রোতের মতো আপন গতিতে ছুটে চলেছে।। আকাশের গুমোট ভাবটা এখন কেটে গেছে অনেকটাই। মাঝে মধ্যেই মেঘের ভেলার অন্ত থেকে উকি দিচ্ছে পূর্ণ শুভ্র চাঁদ।। হওয়া চলছে বেসামাল। ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই। রিফাত এখনও বাড়ি ফেরেনি।। খাবার টেবিলে সকলেই প্রায় ইয়ানার কাছ থেকেই জানতে চেয়েছে রিফাত এর ফেরার সময়। কিন্তু ইয়ানা নির্বাক,,,উত্তরে কি বলবে বুঝে আসেনা তার।। অল্প করে রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসেছে সে।। ফাঁকা রুমে বিমর্ষতাপূর্ণ মনো ভাব নিয়ে বড়ো ব্যালকনির এক কোণে চুপ চাপ বসে আছে ইয়ানা।। উদাসীনতায় ভুগছে সে। রাতের খাবার সেরে রুমে এসে মোবাইল চেক করতেই দেখে নয়টা পনেরোর দিকে রিফাতের মোবাইল থেকে একটা ম্যাসেজ এসেছিল,,ইয়ানা দ্রুত ম্যাসেজ খুলে পড়তেই মুখটা চুপসে যায়,,,”রিফাত ব্যাস্ত বনু,,,আমি আহিল। সে বলল তোমায় যেনো বলেদি রিফাত এর ফিরতে দেরি হবে,,,কেও যেনো তার জন্য অপেক্ষা না করে।”
মলিন চোখে তাকিয়ে আছে আকাশ পানে। চাঁদের স্নিগ্ধ শোভন আলোক ছোঁয়া ইয়ানার বিমর্ষ চেহারায়।। দুই হাঁটু জড়িয়ে আকাশ কুসুম কল্পনা করতে ব্যাস্ত সে। ক্ষণে ক্ষণে নিশ্বাস নিচ্ছে। চারি পাশ শূন্যতায় ভরপুর,,,এরকম পরিবেশে ইয়ানা ভয় পায় কিন্তু আজ কি হলো তার! নিজেকে বিলীন করে দিচ্ছে এই শূন্যতার মাঝে।।
রুমে মৃদু আলো জ্বলতে দেখে রিফাত বিছানার দিকে তাকালো,,সঙ্গে সঙ্গে কপালে ভাঁজ পড়ল তার।বিছানা খালি। মেয়েটা কোথায়।। আজ কাল নিজের রুমের দরজা খুলেই ইয়ানা কে চোখে হারানোর এক অভ্যাস তৈরি হয়েছে রিফাত এর মাঝে।।ইয়ানা হয়তো তার রুমে,,,কথাটি ভেবেই রুম ত্যাগ করার আগেই চোখ গেলো ব্যালকনির দিকে। ইয়ানার শাড়ির আঁচল এর কিছু অংশ দেখেই রিফাত অবাক হয়,,,প্রায় পৌনে এগারটা ঘড়িতে। মেয়েটা এই সময় ব্যালকনিতে কি করে? রিফাত ধির পায়ে এগিয়ে গেলো,,,ইয়ানা কে গুটি শুতি হয়ে বসে থাকতে দেখে রিফাত ধির আওয়াজে তাকে ডাকলো কিন্তু ইয়ানার কোনো সাড়া নেই।।
উপায় না পেয়ে রিফাত ঝপ করে বসে পড়লো ইয়ানার দেহ ঘেঁষে।। কারোর অবাঞ্চিত আভাস পেয়ে ইয়ানা ঝট করে পাশে তাকালো।রিফাত তার দিকেই অনিমেষ চেয়ে আছে।। কুচকানো শার্ট, উষ্ক খুস্কো চুল,,,চশমার ফাঁকে গ্লান চক্ষুদ্বয় ইয়ানার চোখ এড়ালো না।। তবুও মুখ ফুটে কিছুই উচ্চারণ করলো না সে।। রিফাত কে এক প্রকার উপেক্ষা করে আবারও চাঁদ দেখায় মশগুল হলো।। রিফাত ইয়ানার আচরনে ভ্রু কুঞ্চিত করলো,,,তত্পর বীথিকা না পেয়ে নিজেই বললো,,,
“এইভাবে এখানে একা বসে আছো কেন!”
উত্তর নেই ইয়ানার। রিফাত আবারও বলল,,,”ঘুমাওনি কেনো এখনও।”
ইয়ানা এবার উঠে দাড়ালো।। সহসা রিফাত চেপে ধরে ইয়ানার হাতের কব্জি। টেনে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে দিল।। ইয়ানা তাকাচ্ছেনা রিফাতের দিকে,,, নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে আর দৃষ্টি রেখেছে ফ্লোরে। রিফাত আলগোছে ইয়ানার অবাধ্য চুল তার কানের পিছে গুজে দিল,,, গালে আলতো হাত বুলিয়ে বলল,,,
“ইগনোর করছেন মিসেস!”
“———————-”
রিফাত আর একটু দৃঢ়ভাবে ইয়ানাকে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে,,,ফিসফিসিয়ে বলো,,,,”আপনি চাইলে আমি আপন পদ্ধতিতে আপনার আচরণের বদল ঘটাতে পারি।। ঘটাবো!?”
ইয়ানা নিজের অদম্য স্পৃহা বজায় রেখে চুপ থাকে।। ভেতর থেকে তার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠছে।। মানুষটা সান্নিধ্য এত ভয়ঙ্কর কেন!! তাকে বার বার দগ্ধ করে দেয়।। ইয়ানা জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেই রিফাত এর কাছ থেকে।। শাড়ি সামলে রুমে প্রবেশ করে ইয়ানা।। রিফাতও আসে তার পিছে পিছে।।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল গুছাতে ব্যস্ত মেয়ে।। একবার চোখ উঠিয়ে আয়নায় রিফাতের প্রতিফলন দেখে আবারো নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে যায় ইয়ানা।। রিফাত এদিক সেদিক তাকিয়ে রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো। শার্টের দুই তিনটা বোতাম খুলে ফেলে সে,,,। চশমা খুলে বিছানায় ফেলে এগিয়ে যায় ইয়ানার দিকে।।
শান্ত শিষ্ট ভদ্র রিফাত এবার নিজের লুকাহিত রূপ দেখায়। ধির পায়ে হেঁটে ইয়ানার পিছনে দাড়ায়। সংগোপনে শাড়ি ভেদ করে নিজের দুই হাত ইয়ানার উন্মুক্ত উদরে রাখতেই ইয়ানার চেতনা ফেরে।। ডগর ডগর চোখ গুলো বড় আকার ধারণ করে।। ধুকপুক করে ওঠে হৃদয়।। ইয়ানাকে আরো বেশি বিস্মিত করে তুলতে রিফাত পদক্ষেপ বাড়ায়।।মেয়েটার সিল্কি লম্বা চুল পিঠ থেকে সরিয়ে বাম কাঁধের সামনে রাখে। ততপর মাথা নামিয়ে নিজের খাড়া নাক ঘষতে আরম্ভ করে ইয়ানার ঘাড়ে।। ভারিক্কি নিশ্বাস ফেলছে ইয়ান।া। দাঁতের দাঁত পিষে নিজের শাড়ির আঁচল খামচে ধরে। অবিরাম কেপে চলেছে তার বদন। হঠাৎ করেই আচমকা রিফাত এর এহেন কার্য কলাপে ইয়ানা বিমূঢ়। শিউরে উঠে সর্বাঙ্গ।।মুহূর্তে অনুভব করে নিজের ঘাড়ে, কাঁধে রিফাতের মৃদু উষ্ঠ ছোঁয়া। টকবগিয়ে ওঠে ইয়ানার লোহূ। বুকের ওঠা নামা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।।
রিফাত এর কোনই প্রতিক্রিয়া নেই। সে এক মনে ইয়ানাতে মত্ত। এঁ্যঠে দিচ্ছে গাঢ় চুমু ইয়ানার ঘাড়, কাধে।। ইয়ানা নড়ে চড়ে উঠলে তাকে আরো গভীর ভাবে নিজের সাথে চেপে ধরে। মিশিয়ে নিলো নিজের প্রশস্ত বুকে ইয়ানার পিঠ।। ইয়ানা এবার থরথর করে কাঁপতে লাগলো। হাপরের মত নিশ্বাস নিচ্ছে সে।। রিফাত এবার ইয়ানার উন্মুক্ত পিঠের কিছু অংশে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে মৃদু স্বরে বলল,,,,
“রাগের কারণ জানতে চাই।”
ইয়ানা চোখ বন্ধ করে ছিল এতক্ষণ। যেই না রিফাত এর বলা কথা কানে এলো ওমনি চোখ খুলে তাকালো আয়নার দিকে।। রিফাত এর আচরনে লজ্জায় একাকার হয়েগেছে সে।। নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলে,,,কোমরে চাপ অনুভব করে।। রিফাত এবার চোখ তুলে আয়নার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,,,,”বৃথা চেষ্টা কোরো না ইয়ানা। যাহ জানতে চেয়েছি তঃ বলো।”
টালমাটাল ইয়ানা। ছলাৎ ছলাৎ বুকে নিজেকে সামলায়।। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কোনো রকম উচ্চারণ করলো,,,”ফিরতে দেরি হলো কেনো আপনার! বলেছিলেন সন্ধায় ফিরবেন।”
রিফাত ভ্রু কুচকে ফেললো। এই সামান্য কারণে মেয়েটার এমন রাগ তার কাম্য নয়।। রিফাত এবার ইয়ানা কে ঘুরিয়ে ঠেসে ধরে নিজের সাথে।। মেয়েটার লাজুকতায় ভরপুর মুখশ্রীর পানে চেয়ে গভীর ভাবাবেগ নিয়ে আড়াল,,,,”মিস করছিলে?”
ইয়ানা এবার চট করে তাকালো রিফাত এর পানে।।
উত্তরে কিছুই মাথায় আসছে না তার।। সে কি সত্যিই রিফাত কে মিস করছিল! না কি শুধুই রিফাত এর কথার খেলাফির জন্য রাগ! চঞ্চল হৃদয় কুকড়ে উঠলো।। অক্ষি নোয়ালো।। রিফাত এবার ইয়ানার চিবুক ধরে ওর মাথা তুললো,,,দৃষ্টি মেলালো,,,
“কথা বলবে চোখে চোখ রেখে।। দৃষ্টি নামবে না! তুমি অপরাধী নও। রিফাত হোসেন এর চিত্ত আকুল করে তোলার ইন্দ্রজাল তুমি।”
হতভম্ভ ইয়ানা। সহসা অন্তরে মৃদু চাপ অনুভব করলো । লোকটা কি বললো তাকে! রিফাত জানে না তার ছোটো ছোটো বাক্যে ইয়ানা ঘায়েল হয়! এতক্ষণে রিফাত ছাড়লো ইয়ানা কে। ইয়ানাও বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস নিল।। ফ্রেশ হতে হবে রিফাত কে।।
ওয়াশরুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করার আগেই রিফাত এর ফোন বেজে উঠলো। বেশ বিরক্ত হলো রিফাত। পকেট থেকে মোবাইল বের করে রিসিভ করে কানে দিয়ে কিছুক্ষন ‘ হুঁ ‘ ,’ হ্যাঁ ‘,’ আসছি’ বলে ফোন কেটে দিলো সে।।
ইয়ানাও এতক্ষণ রিফাত এর দিকেই তাকিয়ে ছিল। ছেলেটার শেষের ‘ আসছি ‘ কথাটি শুনেই বুকটা কেঁপে উঠল।। রিফাত ফিরেছে চল্লিশ মিনিটও হয়নি।। রিফাত নিরিবিলি চোখে ইয়ানার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইয়ানা বলে উঠলো,,,
“আবার যাবেন!”
“আর্জেন্ট! ”
“না গেলে হবে না!”
“নাহ,,,যেতেই হবে।। ফিফটিন মিনিটের কাজ।”
কথাটি বলেই রিফাত নিজের খোলা শার্টের বোতাম গুলি লাগিয়ে দিল। চশমা পরে চুলের মাঝে হাত চালিয়ে ঠিক করে নিল। একজন চিকিৎসক রিফাত। কখন কোন সময় তার ডাক পড়ে বলা মুশকিল। তারপর নিজের নার্সিংহোমের হেড ডক্টর নিজেই। রেপন্সিবিলিটিস থেকে মুক্ত নয় সে।। রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই ইয়ানা রিফাত এর হাত ধরে ফেললো,,,রিফাত ঘুরে তাকালো। ইয়ানা তার দিকেই নজর সীমাবদ্ধ রেখেছে।।
” কিছু বলবে?”
“আমি ও যাবো।”
“কিন্তু।”
“আমি যাবো।”
একপ্রকার বাচ্চাদের মত জেদ ধরে বসলো ইয়ানা। রিফাত কিছুক্ষন চুপ চাপ তাকিয়ে থাকলো মেয়েটার পানে।। সহসা রিফাত বিস্মিত হলো।। ইয়ানা চঞ্চল কিন্তু একগুঁয়ে নয়। রিফাত বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগালো,, বুঝলো ইয়ানার এহেন আচরণের পিছনে কারোর হাত আছে আর সেই মানুষটা কে তাহ বুঝতে একটুও অসুবিধে হলো রিফাত এর।।
ইয়ানার পিটপিট চোখ, উল্টানো ঠোঁট, করুন আবেগী চেহারা রিফাত কে বেসামাল করে তুলতে সক্ষম। তার উপর মেয়েটা শাড়ি পরে তার সামনে দাঁড়িয়ে। আঁচলের ও ঠিক নেই। ইয়ানা ব্যাস্ত নিজের জেদ পূরণের আশায়। এদিকে যে তার রূপে কেও ছারখার হচ্ছে তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার।। রিফাত উপায় না পেয়ে ইয়ানা কে নিজের দিকে টেনে ধরে।। কণ্ঠে দৃঢ়তা বজায় রাখার চেষ্টা করে ধমক দেওয়া সুরে বললো,,,
“জেদ করো না ইয়ানা।”
“আমি করবই”
“রাত বাড়ছে!”
“বাড়ুক।”
“জবরদস্তি!”
“হ্যাঁ তাইই।”
“আমায় রাগাচ্ছ তুমি!”
“বয়ে গেছে।”
“আমি জেদ ধরলে বাঁচবে তুমি?”
“মৃত্যু অনিবার্য। আপনার হাতের মাঝেই আমি,জেদ ধরুন। মেরে ফেলুন।”
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৬
নিজের গোঁ বজায় রাখতে ইয়ানা কি বলছে সে নিজেও জানে না।। চোখের দৃষ্টি অনড়।।ইয়ানা কে এক নতুন ধর্মারোপ এ দেখে রিফাত হতবাক।। নিজের জেদ ও যেনো হার মানলো ইয়ানার কাছে। আজ রিফাত এর মনে হচ্ছে নিজের টক্করে পেয়েছে কাওকে।। রিফাত বাঁকা হাসলো,,,ঝুঁকে গেল ইয়ানার সামনে,,, গাঢ় কন্ঠে বলল,,,,
“আমার উন্মাদনা কে আহ্বান জানিও না,,,তোমার সর্বস্ব দিয়েও থামাতে পারবে না।”
