Home এক প্রণয় রাত্রি এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৩

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৩

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৩
আসিফা খান

চারিদিকে ফজরের আযানের ধ্বনি ভেসে আসলো ইয়ানার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনা পানি। রিফাত চোখ বন্ধ করে জোরে নিশ্বাস টানলো। পাশে তাকিয়ে দেখলো ইয়ানা ফুপিয়ে কাদঁছে।। রিফাত আলগোছে আগলিয়ে নিলো তার ইনু কে।।
মনের গহীন থেকে কেও বলে উঠলো,,,’ তার নূর আল্লাহর কাছে গিয়ে সত্যি তার জন্য পারফেক্ট লাইফ পার্টনার এর কথা বলেছে,,,আর আল্লাহ তাকে ইয়ানা দিয়েছে। ‘

কান্নার এক পর্যায়ে হিচকি উঠে ইয়ানার।। তার হৃদয় ভঙ্গুর।। কিছু ঘণ্টা আগে পর্যন্ত যেথায় মাতাল অনুরাগে লুটোপুটি খাচ্ছিলো এখন সেখানেই বেদনা উপলব্ধি করতে পারছে ইয়ানা।। চোখের পানি গাল বেয়ে গলায় পৌঁছায়। বুক ফাটছে তার। এখন যার বক্ষবন্ধিনী সে,তারই হৃদয় নগরে ফুটে ওঠা প্রথম ভালোবাসার ফুল সে নয়! কথাটি আওড়ায় মনে মনে আর তখনই চৈতন্য ফেরে ইয়ানার।। ভারিক্কি নিঃশ্বাস নিতে লাগলো মেয়েটা।। আজ নিজেকে বড়ই হতভাগ্য প্রতীতি হচ্ছে।। তার স্বামীর প্রথম ভালোবাসার ভাগীদার অন্য নারী। কেনো! সে কেনো নয়? রিফাত তো তার প্রথম ভালোবাসা। সময়ের সাথে সে রিফাত কে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে। মনের গহীনে শুধুই রিফাত।। কিন্তু রিফাত এর মনে যে অন্যকারোর বসবাস।। বিমর্ষতা আজ আকাশ ছোঁয়া।
নারী তার প্রিয় মানুষের প্রতি ভীষণ অধিকারসূচক।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তারা সব জিনিসের বণ্টন মেনে নিলেও, নিজের ব্যাক্তিগত পুরুষের বেলায় তারা কৃপণবত।। বুকের ভেতর মুচড়ে উঠছে ইয়ানা।। কন্ঠনালিতে ব্যাথা অনুভব হচ্ছে ভীষণ।। ধীরে ধীরে আসমান আলোকিত হচ্ছে। ইয়ানা মাথা তুললো খানিল,অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালো তার পুরুষের দিকে।। দেখলো রিফাত তার দিকেই তাকিয়ে আছে,,,চোখ লাল,আননে ছেয়ে আছে স্পষ্ট ক্লেশ।।
ক্ষতবিক্ষত হৃদয় নিয়ে ইয়ানা সোজা হয়ে বসলেও,,, সান্নিধ্য গুচিয়ে ফেলেনি রিফাত।। ইয়ানার পৃষ্ঠদেশে তার বিশাল হাতের স্পর্শে আবৃত যাতে করে ইয়ানা আর তার মাঝে কোনো প্রকার ফাঁক নেই।। ইয়ানার মনে প্রশ্ন জাগে,,,বিয়ের এত বছরে রিফাত তার অতীত কেনো তাকে বলেনি? কেনো লুকিয়ে রেখেছিল এই পীড়াদায়ক সত্য!! ইয়ানা নাক টানে। শুকনো ঢুক গেলে পর পর।। দৃষ্টি ফ্লোরে রেখে ভঙ্গুর কণ্ঠে সুধায়,,,,
“এত দিনে বলেননি কেনো? কেনো লুকিয়ে রেখেছিলেন? আর যখন লুকিয়েই রেখেছিলেন তাহলে এখন বললেন কেনো?”

কি ছিল ইয়ানার কণ্ঠে যাহ রিফাত কে ভিতর থেকে নাড়িয়ে তুললো। রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো সচেতন ভাবে।।
দুরু দুরু বক্ষে ইয়ানার মাথার এক পাশে হাত রাখলো সে,,,বললো,,,
“বিশ্বাস করো ইয়ানা,,, সত্যটা যতবার তোমায় বলতে গিয়েছিলাম ততবার আমার বুক কেপে উঠেছিল।।”
নতজানু ইয়ানা মাথা তোলে। সহসা রিফাত কে স্তম্ভিত করে তার ডান হাত টেনে নিজের মেয়েলি বক্ষের কিছুটা উপর চেপে ধরে। রিফাত চমকায়। ইয়ানা জড়ানো কন্ঠে বলে,,,
“আমার হৃদপিন্ড জ্বলছে রিফাত,,,মনে হচ্ছে কেও হাজারো সুই গেঁথে দিয়েছে এথায়।।”
রিফাত যেনো বিমূর। অতীত যেনো পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।। আশ্চর্যান্বিত রিফাত। প্রতিধ্বনি হচ্ছে ইয়ানার বাক্য। রিফাত এর শাস ভারী হয়।। ইয়ানা কে টেনে নিজের বুকের উপর ফেলে,,,জড়িয়ে ধরে শক্ত করে।। মুখ গুজে দেয় কাধের ভাঁজে।। দাতে দাঁত চেপে অশ্রু চেপে রাখে। নিরস গলা ভেজাতে ঢোক গেলে।। এদিকে ইয়ানা ভরকে যায় রিফাতের এহেন আচরণে। সে প্রকট ভাবে অনুভব করতে পারছে রিফাত এর হৃদস্পন্দন,,যাহ অস্বাভাবিকভাবে ছুটে চলেছে।। শুনতে পায় রিফাত এর মৃদু স্বর,,,,

“সব ঠিক করে দেবো ইয়ানা,,,সমস্ত কিছু।। আমার মূর্ছা ধরা ভালোবাসার ঘরের বন্ধ দরজা খুলে আমায় দ্বিতীয় বার ভালোবাসতে শিখিয়েছো।। আমি তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি ইয়ানা,,,শুধুই এটা জানাতে চেয়েছি যে,তোমার রিফাত ভালোবাসার দিক থেকে কতটা ভাগ্যহীন।।”
ইয়ানা সচকিত হয়। সে কি করে এতটা স্বার্থপর হতে পারলো। একবার ও ভাবলো না রিফাত এর জন্য।। রিফাত এর দুঃখ কি তার কষ্ঠের চেয়ে বেশি!,,,রিফাত তার ভালোবাসার মানুষ তাকে খুইয়ে ফেলার ভাবনাই তাকে সাত আসমান থেকে জমিনে আছার মারে, মনে হয় কেও তার অন্তর কেটে ফেলছে।। আর রিফাত এই অনুভুতির সাক্ষাৎ পেয়েছে।। ভালোবাসা না পাওয়ার বেদনা একদিকে আর ভালোবাসা পেয়ে হারিয়ে ফেলার পীড়ার কাছে সকল পীড়া তুচ্ছ।। রিফাত তাকে কষ্ট দিতে চাইনি,,,কথাটি বুঝতে পারে ইয়ানা। রিফাত এর পিঠে হাত রাখে আলতো ভাবে। ইয়ানার স্পর্শ পেয়ে রিফাত আরো একটু বেশিই ঘরিষ্ঠ হয়।। ভারিক্কি নিশ্বাস ফেলে আবারও বলে ওঠে,,,
“ভালোবাসা হারানোর আর শক্তি নেই ইয়ানা।। আমি এক নারীকে জয় করার চেষ্টা করেছিলাম,কি জানতাম! আরেক নারী এসে আমায় জয় করে ফেলবে।।”

ইয়ানার অনুরাগ খলবোলিয়ে ওঠে।। চোখ বন্ধ করে দৃঢ় নিশ্বাস নেয়।। এবার রিফাত মাথা তোলে ,,,নিজের সুগভীর চোখ স্থির রাখে ইয়ানার মুখপানে।। ইয়ানা তীব্রভাবে উপলব্ধি করতে পারছে রিফাতের কষ্ট।। কিন্তু ওই যে নারী জাতি ,,কিছুটা অভিমান পুরুষের প্রথম ভালবাসার উপর থেকেই যায়।। ইয়ানা ফিছলে কন্ঠে বলে,,,
“কি অদ্ভুত,, সে দুনিয়ায় না থেকেও আপনার হৃদয় দখল করে আছে। আর আমি,,,”

বাক্যপূর্ণ করার আগে ইয়ানার নরম অধরে নিজের রুক্ষ ত্তষ্ঠ চেপে ধরে রিফাত।। রিফাত হয়তো বুঝেছে ইয়ানার পরের বাক্য কতটা মর্মান্তিক হতে পারে! রিফাতের হৃদয় কেঁপে উঠলো যেন।। ইয়ানা কে কোনমতে হারাতে দেবে না রিফাত। নিজের সবটুকু দিয়ে মেয়েটাকে আগলে ধরে রাখবে আজীবন ,,সারা জীবন।। ইয়ানার চোখ বড় আকার ধারণ করে,, হুট করে রিফাতের আক্রমণে সে কিছুটা বিচলিত।। নিজের ছোট্ট ঠোঁটের মাঝে রিফাতের রুক্ষ ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে ইয়ানা স্তম্ভিত ,,,শরীর শিউরে উঠেছে তার। শরীরের প্রতিটা রন্ধে রন্ধে ছুটে বেড়াচ্ছে শীতল শিহরণ।। পেটের ভিতরে কেমন ব্যাথা হচ্ছে। বুক ধড়পড় করছে মেয়েটার।। এতক্ষণে মন মস্তিষ্কে জমা অভিমান, ক্লেশ, কষ্ট সব যেনো নিমিষেই উড়াল দিলো দুর আকাশে।।

চুম্বন এঁকে রিফাত তাকালো তার অর্ধাঙ্গিনীর পানে। যে কিনা চোখ বুজে ভারী প্রশ্বাস টানতে ব্যাস্ত।। রিফাত কপাল ঠেকলো তার প্রিয়তমার ললাটে। ইয়ানা এবার আঁখি মেললো।লাজ গালে টোল পড়েছে,,, কিছুক্ষণ আগে রিফাতের দখলে থাকা নিজ অধরের কোণে দন্ত চেপে ধরলো।। শোনে তার প্রিয়তম এর মিহি কণ্ঠ,,,
“ভালোবাসা অদ্ভুত এক অনুভূতি ইয়ানা। যেই অনুভূতির তোলে পিষে হাজারো মন। কেও এই ভালোবাসার যুদ্ধে জয়ী হয় আবার কেও হেরে গিয়েও জিতে যায়।। নূর আমার জীবনে আসা এক দমকা হাওয়া,,,যে হাওয়ায় মুহূর্তের জন্য প্রাণ,মন জুড়িয়ে গেলেও পরমুহুর্তে আবারও উষ্ণ হয়ে যায় দেহ।। হুট করেই ভালোবাসা গুলো কষ্ট দেয় বেশি,তাই আমিও কষ্ট পেয়েছি।। নুরকে দাফন করার সময় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলাম নিজের সাথে যে, দ্বিতীয় বার কাউকে ভালবাসবো না, তার স্মৃতি নিয়ে কাটিয়ে দেবো বাকিটা জীবন।।

কিন্তু সৃষ্টিকর্তা অন্য কিছুই ভেবে রেখেছিলেন,,,আর ওনার ভাবনা আমাদের জন্য সর্বসময় সঠিক সাবিত হয়।। আমার দুঃখের জীবনে সুখের বার্তা নিয়ে হাজির হলে তুমি।।তুমি ক্ষণে ক্ষণে আমায় উপলব্ধি করাতে, আমার মাঝেও একটা হৃদয় আছে যে ,হৃদয়ে রয়েছে সীমাহীন ভালোবাসা, যে ভালোবাসা কাউকে উজার করে ভালবাসতে পারে, দ্বিতীয় বারও ভালোবাসা যায়।।”

ইয়ানা বদন দুলে উঠলো। অধর খানিক ফাঁকা হলো তার। অননে দেখা দিলো বিস্ময়।। হৃদয় আকুল হয়ে প্রশ্ন জাগলো,,,রিফাত কি বলতে চাইলো! মানুষটা কি তাকে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটালো! দিলো তাকে প্রেম বিনোদন? স্বীকার করলো ইয়ানা কে ভালোবাসার? মস্তিষ্ক স্থির করতে পারলো না কিছুই।। দুঃখের মাঝে সুখ ফরফর করে হানা দিলো।। রিফাত মাথা সরালো,,,চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার বউ এর বিস্মিত চেহারা।। অবুঝ মেয়েটা কি বুঝতে পেরেছে, ডক্টর রিফাত হোসেন প্রথম ভালোবাসার ব্যর্থ প্রেমিক দ্বিতীয় এবং শেষ ভালোবাসার নিখুঁত প্রেমে আচ্ছন্ন! কিছু মুহূর্ত আগে যে রিফাত স্বীকারোক্তি দিলো ইয়ানার প্রতি তার গভীর আসক্তি,অনুরাগের,বিবশ ইয়ানা কি তাহ বুঝলো?! রিফাত হাসলো খানিক। ইয়ানার এহেন মুখভঙ্গি সর্বত্র তার প্রিয়।। অগোছালো ভাবনা ইয়ানার।।
রিফাত ইয়ানার চুল গুছিয়ে তার অধরে বৃদ্ধা আঙুল স্পর্শ করল।আলতো ঘোষে দিলো সেথায়। ইয়ানা চমকায়। তার অবয়ব মৃদু কেপে উঠে। ততরপর রিফাত দুই হাত গলিয়ে দেয় ইয়ানার দুই গালে। আঁখি নামায় মেয়েটা।।

“ইয়ানা,,,”
শরীর শিউরে ওঠার মত ডাক,,যাহ বক্ষস্পন্দন দ্বিগুণ করতে সক্ষম।। ইয়ানা দ্রুত তাকায় রিফাত এর পানে। রিফাত ইয়ানার গালে হালকা স্লাইড করে নির্মল কন্ঠে বললো,,,”এই রিফাত শুধু তোমার। আল্লাহর দেওয়া এই জীবনে আমার হৃদ মাঝারে কেবল তোমার রাজত্ব। আমার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত আমি তোমার নামে লিখিত।। তুমি ভালোবাসার যুদ্ধে জয়ী ইয়ানা,নিজের জয় করা আমার হৃদয় রাজত্ব সামলাবে না?”
ইয়ানার চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনা পানি।। মেয়েটা সাতিশয় মাথা উপর নিচ করলো পর পর অনেক বার।। রিফাত ঠোঁট প্রসারিত করলো।। কিছুটা ঝুঁকে পড়ে মেয়েটার কানের কাছে,,, ঠোঁট কিছুটা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে সুধায়,,,

“আমাকেও সামলাতে হবে পারবে তো!।”
ইয়ানা অন্তর কুঁকড়ে উঠলো। ভারিক্কি নিঃশ্বাস গোপনে ফেলে মৃদু স্বরে বলে,,,”পারবো।”
চারিদিকে পাখিদের কিচির মিচির গানে মুখরিত।।রিফাত ইয়ানার দুই চোখ মুছিয়ে দিল। তত্পর পায়ের ব্যাথা প্রাপ্ত স্থানে হাত বুলিয়ে দেখলো কিছুক্ষন। ইয়ানা চুপ রয়। রিফাত পায়ের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞাসা করে,,,”ব্যাথা আছে?”
“নেই,,সেরকম।”
“বেশ,,,ফজরের নামাজ পড়বে?”
“হ্যাঁ,,,”
“চলো তাহলে এক সাথে আদায় কারি।”
ইয়ানার মনে আদরের প্রজাপতি মেলে উঠলো।। তত্পর সময় অপচয় না করে এক এক জন পরপর গেলো ওয়াশরুমে। অজু সেরে নামাজে দাড়ায় দুই ভালোবাসার পাখি। রিফার এর খানিক পিছে ইয়ানা।দুইজনের মোনাজাত হয় দীর্ঘ। কে কি চাইলো তাহ সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ জানে না।।

নামাজ শেষে ইয়ানা চুপ চাপ বিছানায় শুয়ে পড়ল কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে রিফাত তার বুকের উপর মাথা রেখে ঝাপটে ধরলো ইয়ানা কে।। চারিদিকে ফুলের ঘ্রাণ এখনও বিদ্যমান,,,যেদিকেই চোখ যায় ফুল আর ফুল। ইয়ানা কিংকর্ব্যবিমুর। বদন থরথর করে উঠলো তার।। নিজের চিকন দেহের ওপর রিফাতের বলিষ্ঠ সুঠাম দেহের ভার সইতে কিছুটা বেগ পোহাতে হচ্ছে তার। দুরু দুরু বুক ইয়ানার।। রিফাত গভীর কন্ঠে বলল,,,
“ঘুমাও ইয়ানা। আর যদি ঘুম না আসে তাহলে শুধু আমায় নিয়ে ভাবো,,শুধু আমার কথা চিন্তা করো।।তোমার হৃদয় শহর জুড়ে ছড়িয়ে দাও আমার বিজ্ঞপ্তি।।”

বাক্য শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রিফাত টুপ করে চুমু খায় ইয়ানার থুতনিতে। ইয়ানার শাস ভারী হয়।। রিফাত বোঝে তার ভার সইতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তার ছিমছাম গড়নের হালকা মেয়েটা কে,,কিন্তু রিফাত তাও রিফাত সে দিকে লক্ষ্য দেবে না। দূরত্ব গুছিয়ে ফেলতে হবে দ্রুত,,,নিজের ভালোবাসা উজাড় করার লক্ষ্যে নেমেছে রিফাত।। ইয়ানা কে সে সেখানে ভালোবাসার পাঠ,,,তার ভালোবাসা দিয়ে নাজেহাল করবে মেয়ে টা কে। রিফাত মৃদু হাসলো,,, ব্যাস আর কিছুদিনের অপেক্ষা।। ইয়ানা নিজেই আত্মসমর্পণ করবে তার কাছে।। রিফাত আরো একটু ঘনিষ্ট হয়।

“কষ্ট হচ্ছে?”
“উম,,কিছুটা।”
“অভ্যাস করে নাও।”
ইয়ানা দ্রুত চোখ বুজে ফেললো।। তার দেহের ওপর নিজের আধিপত্য জমিয়ে রাখা রিফাত কে ভীষণ মাতাল ঢেউ লাগছে,যাহ যে কোনো সময় তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।।

সকালের রোদ কক্ষের ভেতর প্রবেশ করে।। সারা রাত জেগে থাকার সুবাদে কারোরই চোখ দ্রুত খুলিনি। তাদের ডাকার জন্যও কেও আসেনি। ইয়ানার যখন ঘুম ভাঙ্গলো অনুভব হলো তার শরীর বেশ ভারী লাগছে। ঘুমানোর সময় সসারাক্ষণ রিফাত তার সান্নিধ্যেই ছিলো।। আড়মো়র ভেঙ্গে উঠে বসে সে। আশেপাশে নজর বুলিয়েও দেখতে পেলো না রিফাত কে। পুরো রুম সুন্দর করে গুছানো। ফুলের ছিটেফোঁটা ও নেই কোথাও।। ইয়ানা ধির গতিতে নামলো বিছানা থেকে। ওয়াশরুমে গিয়ে,ব্রাশ করে ,ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো।। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে লাগলো। ঠিক তখনই রুমে আসলো রিফাত।। সোজা এগিয়ে এলো ইয়ানার কাছে।।

“কখন উঠলে?”
“কিছুক্ষন আগে।। আপনি আমায় ডাকেননি কেনো?”
“কাল দেরি করে ঘুমিয়েছো,,, ইভেন কাল না আমরা আজ ভোরে ঘুমিয়েছি। গভীর ঘুমে ছিলে তাই ডাকিনী।। আচ্ছা,,,কোনো রকম ব্যথা পাচ্ছো?”
ইয়ানা ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো,,,”কিসের?”
“স্টুপিড,,,কাল আমি কোথায় ঘুমিয়েছি?”
ইয়ানার হুস ফিরল।। লাজুকতায় মীহীয়ে গেলো মুহূর্তে। কেপে উঠলো খানিক।। ঠোঁট ভিজিয়ে মিনমিনে কন্ঠে বলল,,,”না,,পাচ্ছি না।”
রিফাত হাত উঠিয়ে ইয়ানার গাল ছুঁয়ে দিলো। মৃদু বৃদ্ধা আঙুল ঘোষে দিয়ে বললো,,”গুড,,, চলো নিচে । নাস্তা করবে।”
ইয়ানা মাথা নাড়ায়। তত্পর রিফাত মেয়েটার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে এগিয়ে গেলো।।

সকলে নাস্তা করার এক পর্যায়ে আফতাব মিয়া বলে উঠলো,,,”রিফাত তোমার কথায় আমি আর তোমার দাদু মিলে,,গেস্ট লিস্ট,মেনু, সেন্টার পর্যন্ত ঠিক করে ফেলেছি।এখন শুধু তুমি দিনটা ফিক্স করো তোমার সুবিধা মত।”
রিফাত এক ঢোক পানি পান করে বললো,,,”আরেঞ্জমেন্ট শুরু করুন। আন্টি, খালামা দের সম্মতি নিয়ে ইনভিটেশন কার্ড ছাপান। জুয়েলারি , কাপড় আরো যা যা লাগে সেই দিকেও দেখুন।।”
“আচ্ছা তুমি চিন্তা করো না।”
টেবিলে উপস্থিত ইয়ানা,আলেয়া,মিসেস আসফিয়া,ইয়াসমিন,ইসরাত বেগম সবাই বোঝার চেষ্টা করলো বাবা ছেলের কথা।এর কিসের বিষয়ে কথা বলছে! জানার কৌতুহল উপচে পড়ছে মুখায়বে।। সবার মনের এই আশা পূরণ করলো আলেয়া।। উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞাসা করল,,,

“কিসের কথা বলছো আব্বু,দাদাভাই।”
আফতাব মিয়া মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,,,”তোমার দাদাভাই আর ইনুপির রিসেপশন হবে সেই বিষয়ে।”
ইয়ানা ভরকে গেল। হাতের খাবার প্লেটে পড়লো। বড়ো আঁখিতে কোণা চোখে তাকালো তারপাশে বসে থাকা রিফাত এর দিকে। রিফাত বুঝলো ইয়ানার ভাবনা। সবার অগোচরে হাত রাখলো ইয়ানার উরূতে,মৃদু চাপ দিয়ে চোখের ইশারায় বললো,,,”খাও।”
এদিকে আলেয়া লাফিয়ে উঠলো। জাপটে ধরলো রিফাত কে,,,উল্লাস কন্ঠে বলল,,,”ইয়া হুউউউ,,,কি মজা। মস্তি হবে অনেক। দাদাভাই আমাকে একটা নতুন আর সুন্দর জামা কিনে দিতে হবে। জুতো,ব্যাগ, এক্সসেসারি সব।”
রিফাত হালকা হেসে আলেয়ার নাক টিপে দিয়ে বললো,,,”আচ্ছা আলু বুড়ি যা চাইবে সব পাবে। আজ না তোর এক্সাম শুরু!”

“হ্যাঁ দাদাভাই,,,”
“অল দ্যা বেস্ট,,,মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরীক্ষা দিবি,,,ঠিক আছে!”
“জ্বী দাদাভাই।”
আলেয়া আবারও খাওয়াতে মন দিলো। আফতাব মিয়া বললেন,,,”আর তারিখ টা!”
আফতাব মিয়ার কথার পরিপেক্ষিতে রিফাত বলে,,,”সেটা আমি আপনাকে ফোনে জানিয়ে দেবো।।(কিছুটা থেমে আবার বললো) ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হচ্ছে সুইজারল্যান্ড এ।। প্রায় পনেরো কুড়ি দিন লাগবে ফিরতে।”

টেবিলে বসে থাকা সবাই অবাক হয় রিফাত এর কথায়। সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হয় ইয়ানা। ভ্রু কুঞ্চিত হয় আপনা আপনিই। রিফাত তো এই বিষয়ে কিছুই বলেনি তাকে।। আফতাব মিয়া অবাকতা কাটিয়ে বলে,,,”কবে যাচ্ছো?”
রিফাত গলা ঝেড়ে, কোণা চোখে একবার ইয়ানার দিকে তাকালো তত্পর শান্ত কন্ঠে বলল,,” কাল রাতের ফ্লাইট।”
ইয়ানা যেনো ৪৪০ ভোল্টের ঝটকা খেলো।। আশ্চর্যান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রিফাত এর দিকে।। মনের মধ্যে জমলো পাহাড় সমান অভিমান।। চোখে মুখে চেয়ে গেলো গম্ভীর ভাব। অপ্রীতিকর ভাবনা মাথা চাগার দিয়ে উঠলো। লোকটা তাকে এতটাই পর ভাবে যে,এই যাওয়ার কথাও তাকে বলার প্রয়োজন মনে করেনি! আসলেই কি ইয়ানা রিফাত এর মনে জায়গা করতে পেরেছে?! এই ধরনের অযথার্থতা,অদ্ভুত, অকাঙ্ক্ষিত ভাবনা দের দল ইয়ানার মস্তিষ্কে হামলা চালায়।। মেয়েটা অল্পতেই বেশি কষ্ট পায়। ইয়ানার অচল অন্তর। কোনো রকম সামলে রাখলো নিজেকে।। রিফাত সবটাই পরখ করলো। ইয়ানার মতি গতি বুঝলো সাফ-সাফ।। রিফাত গোপনে নিশ্বাস ত্যাগ করে।।

বুঝেছে ইয়ানার পাহাড় সমান অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য তাকে বেশ কসরত করতে হবে।। রিফাত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভেবে চিন্তে।। ইয়ানা সময় দিতে চায় সে।। নাস্তা শেষ করে রিফাত উঠে দাড়ায়,,, ইয়ানার উদ্দেশে বলে,,,”রুমে আসো।”
ইয়ানা জবাব দিলো না। শান্ত হয়ে বসে থাকলো।। রিফাত চলে গেলো রুমে।। ধীরে ধীরে টেবিল ফাঁকা হলো। যে যার মতো কাজে ব্যাস্থ হয়ে পড়লো। শেষ পর্যন্ত টেবিলে রইল ইয়ানা আর ইসরাত বেগম।। ইসরাত বেগম নিজের চেয়ার ছেড়ে ইয়ানার পাশে এসে বসলো। তত্পর কোনো রূপ না ভেবেই ইয়ানার মাথার ওড়না সরিয়ে দিয়ে চুলে হাত দিলো। ইয়ানা চমকে গিয়ে নজর ফেরালো।। ইসরাত বেগম অসন্তুষ্ট চিত্তে আওড়ায়,,,

“তোর চুল ভিজে নেই কেনো?”
ইয়ানা নজর ফেরালো,,,উত্তর দিলো না সে।। ইয়ানা কে নিরুত্তর দেখে ইসরাত বেগম বেজার কন্ঠে বলল,,,,” এই ইয়ানা সত্যি করে বল দেখিনি তোদের মাঝে কি চলছে? স্বামী স্ত্রী এক সাথে থেকেও কিছু করিস না কেনো তোরা! নাকি তুই বাঁধা দিস!! শোনো মেয়ে যদি এরকম কিছু করো,,,তাহলে স্বামী হাত ছাড়া হতে বেশি সময় লাগবে না এই বলে রাখলুম।।”
কথাগুলো বলে ইসরাত বেগম উঠে গেলেন,,, তিনি ভীষণ অসন্তুষ্ট।। কাল রাতে তাদের করা মেহনত কি না বেকার গেলো। যা ভেবেছিল তাহ কিছুই হয়নি।।
ইয়ানার মনে ঝড় উঠলো।। মন মস্তিষ্কের অবস্থা বিধ্বস্ত। একদিকে রিফাতের ভাবনা অপর দিকে ইসরাত দাদীমার কথা,,,সব মিলিয়ে ইয়ানার উচ্ছন্ন মনোভাব।।

অস্থির রিফাত রুমের মাঝে পায়চারি করছে। এখনও ইয়ানা রুমে আসেনি। অশান্ত হয়ে রিফাত গলার আওয়াজ উচু করে ডেকে ওঠে ইয়ানা কে। তার কিছুক্ষন পরেই ইয়ানা গুটি গুটি পায়ে রুমে প্রবেশ করে। রিফাত দ্রুত পায়ে হেঁটে দরজা লক কোরে ইয়ানার সামনে দাঁড়ায়।। মেয়েটা তাকাচ্ছে না তার দিকে। কেমন চুপ চাপ দাড়িয়ে আছে মোমের পুতুলের ন্যায়। রিফাত রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো। মেয়েটার হাত ধরতে নিলে সরে যায় সে।। রিফাত তার অভিমানীর দিকে চেয়ে রয় কিছু পল। অত:পর হেচকা টানে নিজের বুকের উপর ফেলে ইয়ানা কে।। রমনীর ছোট্ট বদন নিজের আয়ত্বে নিলো রিফাত।। এদিকে ইয়ানা সাপের মত মুচড়া মুচড়ি করতে শুরু করলো।। নিজের মিহি হাতে ধাক্কা দেয় রিফাত এর বুকে।। এক পর্যায়ে ফীচলে কন্ঠে বলে,,,

“ছুঁবেন না আমায়।”
রিফাত সামান্য বাঁকা হাসে। ইয়ানার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলে।। চোটফট করা ইয়ানা কে শান্ত করতে নিজের ঠোট বসায় মেয়েটার কানের লতিতে। গভীর স্পর্শে টালমাটাল হয় চিত্ত। কিয়ৎকালের মধ্যেই নমনীয় হয় ইয়ানা।। রিফাত এক হাত ইয়ানার গালের ভাঁজে রাখে।। মিহিয়ে যাওয়ার মেয়েটার পানে চেয়ে রিফাত বললো,,,
“রাগ করেছো?”
নিরুত্তর ইয়ানা। রিফাত আরো একটু ঝুঁকে পড়ে মেয়েটার দিকে।। আবারো বলে,,,
“যাওয়াটা ইম্পর্টেন্ট।”
এবার বুলি আওড়ায় ইয়ানা,,,”তাহলে যান।”
রিফাত হাসে। শব্দহীন হাসি। ঘনিষ্ঠ হয় আরো। বৃদ্ধাঙ্গুল ইয়ানার গালে হালকা স্লাইড করে বলে,,,
“বউ এইভাবে রাগ করলে থাকলে যাবো কি ভাবে?”
“আমি আপনার বউ না।”
অভিমানী কণ্ঠ ইয়ানার। রিফাত এর পেট ফেটে হাসি আসতে চায়। নিজেকে সংযত করে দুষ্টু কন্ঠে বললো,,,
“তুমি আমার বউ কিনা তার প্রমাণ দেবো?”
চমকায় ইয়ানা। সরে যেতে নিলে বিফল হয়। রিফাত দেখে ইয়ানার নার্ভাসনেস।। শান্ত ভাবে সুধায়,,,”ভয় নেই ইয়ানা,,,তোমার সম্মতি ছাড়া কিছুই হবে না।।”

ইয়ানা চায় রিফাতের পানে। মানুষটা এত ভালো কেনো? তাকে এত বোঝে কি ভাবে?,,,এটাই কি ভালোবাসা নয়! কিছু মানুষের ভালোবাসার স্বীকারোক্তির দরকার পড়ে না,,,সেটা উপলব্ধি করা যায়।। হুট করেই ইয়ানার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু,,,যাহ নিজে পড়ার আগেই নিজের আঙ্গুল দ্বারা মুছে ফেলে রিফাত।। বলে,,
“কাদে না ইয়ানা। আমি বলতে চেয়েছিলাম,,,কিন্তু”
“কবে বলতে চেয়েছিলেন,, চলে যাওয়ার পর!”
“কালকেই,, কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনি।”

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩২

ইয়ানা দমে যায়,,,পাল্টা জবাব দিতে চাইছিল সে কিন্তু কালকের কথা সে কোন রকম তুলতে চায় না। শুধু ভুলতে চায়। আর মনে রাখতে চায় শুধু রিফাতের কষ্ট। যে কষ্ট সে ভুলিয়ে দেবে নিজ দায়িত্বে।। কিন্তু আপাতত মস্তিষ্ক অতীতে ডুবে।। হাজার বার উপেক্ষা করতে চেয়েও পারিনি মেয়েটা।। কিন্তু চেষ্টা করছে প্রতি মুহূর্তে।।
ইয়ানার ভাবনার মাঝেই কল আসে রিফাত এর। জানায় তাকে বিশেষ দটকার নার্সিংহোম এ।। যাওয়ার আগে ইয়ানার ললাটে গভীর চুম্বন এঁঠে দেয় রিফাত। শুভ্র গালে হাতের আলতো স্পর্শ করে বলে,,,
“আমাদের স্মৃতিরা বড়ই অদ্ভুত ইয়ানা, জীবনে আসা একটা দুঃখ আমাদেরকে নাজেহাল করে রাখে,, আর হাজার সুখ আমরা মস্তিষ্ক থেকে বালুকণার মত উড়িয়ে দি।। তুমি শুধু সুখ মনে রাখো ইয়ানা, দুঃখগুলোর দায়িত্ব আমার।”

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৪