এক রক্তিম শ্রাবণে গল্পের লিংক || মালিহা খান

এক রক্তিম শ্রাবণে পর্ব ১+২
লেখিকা মালিহা খান

—“তিহান ভাই,আপনি বাইরে জাননা।আমি শাড়ি পড়ছিতো।”শাড়ির আচঁলটা কোনরকম পেঁচিয়ে দুহাতে আঁকড়ে ধরে বললো তোহা।তবে তার কথায় তিহানের কোনরূপ হেলদোল প্রকাশ পেলো না।সে নির্বিকার ভঙ্গিতে দরজার ছিটকিনি উপরের দিকটায় তুলে দিলো।তোহা ড্রেসিং টেবিলের গা ঘেঁষে মূর্তির ন্যায় দাড়িয়ে রয়েছে।হাতের এদিক ওদিক দিয়ে ছুটে যাচ্ছে অগোছালো শাড়ি।
তিহান তার দিকে তাকালো পর্যন্ত না।তার দৃষ্টি সামনের দিকে।সে সোজা গিয়ে তোহার বিছানায় বসে জুতো খুলে পা তুলতে তুলতে বললো,
—“তোহ্?তুই পড়না শাড়ি।আমি বারণ করেছি?”
তোহা চোখজোড়া সংকুচিত করে তাকালো।অনুরোধের স্বরে মিনমিনে কন্ঠে বললো,

—“তিহান ভাই প্লিজ,দেখুন সবাই অনেক আগেই তৈরি হয়ে রয়েছে।শুধু আমিই বাকি।”
তিহান তার কথা তোয়াক্কা করলো না।আয়েশি ভঙ্গিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে পরণের অফ ওয়াইট রংয়ের পান্জাবির উপরের বোতামগুলো খুলতে খুলতে বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,
—“দেখ তিহু,ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।প্রচুর ঘুম পাচ্ছে আমার।অন্য কোন রুম ফাঁকা নেই।বাড়িভর্তি মেয়েলোক দিয়ে ভরা।কেমন গা গিজ গিজ করছে।তার উপর তোর বাবা না জানি কোথাকার মানুষজনকে দাওয়াত দিয়েছে।মেয়েগুলোতো খুবই গায়ে পরা স্বভাবের।সে ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে চাচ্ছিনা,তুই লজ্জা পাবি।মুল কথা হলো,তোর রুমটাই খালি আছে।ঘুমাতে দে।ব্যাস!”
তিহানের এতগুলো কথায় তোহা বোকা বোকা চাহনী নি:ক্ষেপ করে দাড়িয়ে রইলো।তিহান চোখ বন্ধ করে একটা হাত কপালে রেখে শান্তিমত শুয়ে রয়েছে।কেউ যেন আশেপাশে নেই।তোহার উপস্থিতি একেবারেই নগন্য।
তোহা চিন্তিত ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়ে ধরলো।ভাবলো,”তারমানে উনি এখন এ ঘরে ঘুমাবেন?তবে?আমি তৈরি হবো কিকরে?নিজের বোনের মেহেদির অনুষ্ঠানে কি আমার যাওয়াই হবেনা?”
অত:পর কিছুক্ষন এদিক ওদিক তাকিয়ে মাথা খাটিয়ে বললো,

এই লেখিকার আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—“অনুষ্ঠান শুরু হবে একটু পরে।আপনি এখন ঘুমাবেন?”
তিহান তাকালো না।আগের মতোই শুয়ে চোখ বন্ধ অবস্থাতে বললো,
—“সারাদিন অনেক খেটেছি।তোর বাপ-ভাইরাতো আমাকে বিনা বেতনে কর্মচারী রেখে দিয়েছে।ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতেও পারিনা।আর এই মেয়েলোকি মেহেদির অনুষ্ঠানে আমার থেকে কাজ নেই।তুই সেজেগুজে,যাতো।কানের সামনে অহেতুক চ্যান চ্যান করিসনা।”
তোহা কিছুটা সময় নিয়ে ভাবলো,এই “চ্যান চ্যান” কথাটার মানে কি?।উনার ভান্ডারেই যতসব উদ্ভুত কথাবার্তার উৎপত্তি।

বাইরে গানের শব্দ শোনা যাচ্ছে।তারমানে নাচগান শুরু হয়ে গেছে।হঠাৎই কাঁদো কাঁদো হয়ে এলো তোহার চেহারা।তবে পানি বের হলোনা।কারণ তার সচল মস্তিষ্ক জানে যে কাঁদলে সাজ নষ্ট হয়ে যাবে।কাজল লেপ্টে যাবে।অত:পর ঠি ক ভুতের মতো দেখাবে তাকে।তা তো হতে দাওয়া যাবেনা।
কিছু সময় পর ধৈর্যহারা হয়ে এবার সে সরাসরিই বললো,
—“আমি আপনার সামনে শাড়ি পরতে পারবোনা।”তার কন্ঠে স্পষ্ট তীব্র দৃঢ়ভাব।
তিহান কোন কথা বললো না।তবে পরমুহূর্তেই বামকাত হয়ে ফিরে শুলো।নিজেই তোহার কাঁথাটা খুলে গায়ে টেনে নিয়ে তীক্ষ্ণ ভরাট কন্ঠে সাবধানী বাণী সমেত বললো,

—“ঘুরে শুয়েছি।আর একটা কথাও যদি বলিস,একেবারে সব খুলে চোখের সামনে বসিয়ে রাখবো।বলে দিলাম।”
তোহা আৎকে উঠলো।হৃদপিন্ডটা বারকয়েক লাফিয়ে শান্ত হয়ে গেলো।ভাবলো,উনার বিশ্বাস নেই।রাগের মাথায় দেখা যাবে সত্যিই সত্যিই যা বললেন তাই করবেন।কি বিশ্রি একটা কান্ডই না হবে!
আরেকবার তিহানকে সচেতন দৃষ্টিতে দেখে নিলো তোহা।গলাপর্যন্ত কাঁথা টেনে উল্টোদিকে ঘুরে কপালে হাত ঠেকিয়ে ঘুমাচ্ছে তিহান।সুতরাং তার দিকে তাকানোর কোনো উপায় নেই।সে নিশ্চিন্ত মনে ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে কোনরকম গায়ে জড়ানো আঁচলটা সরিয়ে রাখলো।
মনোযোগ দিয়ে কুঁচি করছে তখনই দরজায় খটখট শব্দ হলো।স্বর্ণালি আপুর কন্ঠ শোনা যাচ্ছে,
—“তোহা,আর কতোক্ষন লাগবে রে তোর?তোর বোনের মেহেদি আর তুই ই দরজা আটকে বসে আছিস।”
তোহা দ্রুত কুঁচিটা গুঁজে নিলো।গলা বাড়িয়ে বললো,
—“হয়ে গেছে আপু,আসছি।”
—“আয় জলদি।নিশাকে তো তুই ই মেহেদি পরিয়ে দিবি।ও অপেক্ষা করছে।”
—“হ্যাঁ,আসছি।যাও তুমি।”
আর কোন কথা শোনা গেলোনা স্বর্ণালির।তবে তার খালামনির কন্ঠ শোনা গেলো।তিনি ব্যস্ত কন্ঠে স্বর্ণালিকে বলছে,”এই তিহানটা কই গেলো রে স্বর্না?কই সাথে সাথে থাকবে,নিশ্চয় বাইরে বেরিয়েছে।

আচঁলটা সুন্দরকরে গায়ে জড়িয়ে কানে,গলায়,হাতে ফুলের গহনাগুলো পরে নিলো তোহা।তার আর তার বড়বোন নিশার জন্যই শুধু তাজা ফুলের গহনা আনানো হয়েছে।বাকিদের সবার আর্টিফিসিয়াল ফুল।মূলত শুধু নিশার জন্যই তাজা ফুলের গহনা অর্ডার দেয়া হয়েছিলো।সে যেহেতু বউ তাই ওকেই এটা মানাবে।কিন্তু বিকালের দিকে যখন গহনা আনা হলো তখন একদেখাতেই সেটা প্রচন্ড ভালো লেগে গিয়েছিলো তোহার।তখনই সে বলেছে যে তার তাজা ফুলের গহনাই লাগবে।নিশার মতো অতো বেশি ভারি ফুলের নয় নরমাল হলেই চলবে কিন্তু তবুও তার লাগবে।কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কিভাবে তাকে গহনা এনে দিবে?কারণ তাজা ফুলের গহনা একদিন আগে অর্ডার দিতে হয়।
শেষমেষ তার আবদারের কাছে হেরে গিয়ে সন্ধ্যার দিকে তিহান কোত্থেকে যেন মেনেজ করে এনে দিয়েছে।
সাথে একটা বেলিফুলের গাজরাও এনেছে।সেটার তীব্র সুঘ্রানে রুম ভরে গেছে।সুবাসিত হয়ে গেছে চারিপাশ।

তোহা খোঁপায় বেলিফুলের গাজরাটা পরছে তখনই তিহান সশব্দে উঠে বিছানা থেকে নেমে গেলো।তোহার দিকে এগিয়ে আসতেই সে গাজরাটা ক্লিপ দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করতে করতে বললো,
—“কি হয়েছে?আমি শব্দ করিনিতো,আপনি ঘুমাননা”

তিহান উওর দিলোনা।ড্রেসিং টেবিলে কি যেন একটা খুঁজলো।কাঙ্খিত জিনিসটা খুজে পেতেই সেটা হাতে নিয়ে সামনে একহাঁটু গেড়ে বসে পরলো।তোহা ভ্রু কুচকে তাকালো।তিহানের হাতে একটা সেফটিপিন।অদ্ভুততো!সে কি করতে চাচ্ছে!বাকিটা ভাববার আগেই তিহান তার শাড়ির আচঁল টেনে নিলো।কোমড়ের দিকটা ঢেকে পিন লাগাতে লাগাতে ক্ষীপ্ত উত্তপ্ত কন্ঠে বললো,
—“বেয়াদপ মেয়ে!দিন দিন চরম অসভ্য হচ্ছিস।এমন অভদ্রদের মতো শাড়ি পরেছিস কেনো?”
তিহানের ধমকে আর বিচ্ছিরি কথা বার্তায় মনটা বিষিয়ে এলো তোহার।কাঁদোকাঁদো ভাবে বিষন্ন কন্ঠে সে বললো,
—“ওটা আমিই লাগিয়ে নিতাম তিহান ভাই”।
তিহান তার কথাটা গায়ে নিলো না।মন দিয়ে নিজের কাজ করতে লাগলো।অদ্ভুত হলেও সত্যি তার আঙ্গুলগুলো একবারের জন্য ভুল করে হলেও তোহার কোমড় স্পর্শ করেনি।খুব সন্তর্পনে সাবধানতার সাথে পিনটা আটকে দিয়ে উঠে দাড়ালো সে।
তখনও চুলের ক্লিপটা লাগাতে সফল হয়নি তোহা।তিহান তার পিছে দাড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—“হাত সরা”।

তিহানের রাশভারি কন্ঠের এহেন আদেশে তোহার হাতদুটো অটোমেটিক সরে গেল।
কোনরকম হাতদুটো গুটিয়ে দৃষ্টি নিচের দিকে দিয়ে রয়েছে সে।কারণ তার দৃঢ় বিশ্বাস আয়নায় তাকালেই একজোড়া পলকবিহীন চক্ষুযুগলে নিবদ্ধ হয়ে যাবে তার দৃষ্টি।যে চোখেজোড়ায় একরাশ মুগ্ধতা এসে ভর করেছে।সেই চোখে তাকানোর সাহস নেই তোহার।একদম সাহস নেই!
তিহান তার খোপায় গাজরাটা সুন্দর করে পরিয়ে ক্লিপগুলো লাগিয়ে দিলো।
অত:পর সরে গিয়ে ফের শুয়ে পরতে উদ্যত হলে তোহা একটু সাহস করে বললো,
—“আপনাকে খালামনি খুঁজছিলো।”
—“ভেরি গুড।এখন যা,বের হ তো রুম থেকে”।
তোহা আর ঘাটলো না।তার রুম থেকে তাকেই বের হতে বলছে তাও আবার কি তেজ।হুহ্।চলে যেতে নিয়েও কিছু একটা ভেবে থমকে দাড়ালো সে।একটা জিনিস বুঝে আসতেই হুড়মুড় করে ডেকে উঠলো,
—“তিহান ভাই?”
উওরে তিহান একনজর তাকিয়ে তিক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
—“তিহু রে,আজ শুধু একটা অনুষ্ঠান বলে বেঁচে গেলি।নয়তো বারবার আমার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোর অপরাধে তোর গালদুটো চড়িয়ে লাল করে দিতাম আমি।”

তিহানের কথাগুলো তার কানের থেকে দু’শ মাইল দূর দিয়ে চলে গেল।বুকের ভেতর হাঁতুরি পেটা করছে।লজ্জায় গা শিঁউরে উঠছে।মনে হচ্ছে সে এখনই জ্ঞান হারাবে।কয়েকমূহুর্তের ব্যবধানে তার অচেতন দেহ লুটিয়ে পরবে ফ্লোরে।
সে দ্রুত কয়েককদম এগিয়ে এসে আগের মতোই হন্য ভঙ্গিতে বললো,
—“আপনি না ঘুমিয়ে ছিলেন?তবে দেখলেন কি করে আমার শাড়ি সরে রয়েছে?”
—“তুই আসলেই এত বোকা তিহু?নাকি ভান করিস?….তুই কি ভুলে গেছিস তোর আলমারিতেও একটা বড়সড় আয়না লাগানো আছে।সেটা যেহেতু বিছানার বামদিকে রাখা তো উল্টোদিকের সবকিছু আয়নায় দেখতে পাওয়া কি কোন আধ্যাত্বিক ব্যাপার মনে হচ্ছে তোর কাছে?
নিশার পাশে বসে একমনে তার হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিচ্ছে তোহা।তার চোখে মুখে প্রবল আড়ষ্টভাব।মুখে হাসি নেই।থমথমে চেহারা।তার গুমোট চেহারার দিকে তাকিয়ে নিশা ফিসফিসিয়ে বললো,
—“কি হয়েছে তোর?মুখের এমন অবস্থা বানিয়ে রেখেছিস কেন?”
তোহা শীতল কন্ঠে উওর দিলো,
—“কিছু হয়নি।”
নিশা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।তার মেহেদির অনুষ্ঠান নিয়ে তোহার ই সবচেয়ে বেশি এক্সসাইটমেন্ট ছিলো।কে কোন রংয়ের শাড়ি-পান্জাবি পড়বে সব সে ই ঠি ক করেছে।তবে এখন এতো চুপচাপ কেন?তার তো এখন হইহুল্লোর করার কথা।
নিশা আবারো বললো,
—“কিছু হয়েছে তোহা?শরীর খারাপ লাগছে?”
তোহা এবার শক্ত কন্ঠে বললো,
—“বললাম তো আপু,কিছু হয়নি।আমি ঠি ক আছি।”
নিশা আর কিছু বললোনা।চুপ করে গেলো।মেয়েটার হঠাৎ কি হলো কে জানে!

মিনিটদশেক আগে একপ্রকার দৌড়ে বেরিয়ে এসেছে তোহা।তিহানের মুখ থেকে সে কথাগুলো শোনার পর আর একমূহুর্ত সেখানে দাড়ায়নি।তিহান তাকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু তার আগেই সে চলে এসেছে।তবে এখন মনে হচ্ছে,তার তিহানের কথাটা শোনা উচিত ছিলো।কারণ সে এতটুকু জানে যে তিহান অন্তত এমন মানুষ নয় যে কিনা লুকিয়ে লুকিয়ে তার শাড়ি পরা দেখবে বা তার দিকে বাজে দৃষ্টিতে তাকাবে।তেমনটা তিহান নয়,সে জানে।
তখন হঠাৎ করে তিহানের ওমন কথা আর বলার ভঙ্গি দেখে সেই সময়টায় তার ছোট্ট মস্তিষ্কে আর কিছু আসেনি।
তিহানের কথাটা তার সত্যিই মনে হয়েছিলো।কিন্তু এখন?এখন মনে হচ্ছে তিহান মজা করছিলো।

জোরে সাউন্ডে গান বাজানো হচ্ছে।সামনে নিশা আপুর কয়েকজন মেয়ে বান্ধবী উরাধুরা নাচ করছে।একেকজনের শাড়ি টারির যাচ্ছে তাই অবস্থা।বাড়ির বড়টা এদিকটায় নেই।এখানে সব কাজিনরা।বড়টা থাকলে হয়তো এভাবে নাচার কোন সাহস পেতোনা তারা।
খুব সম্ভবত তিহান তখন এদের কথাই বলছিলো।মেয়েগুলো আসলেই খুব উগ্র টাইপের।
এককোণায় দাড়িয়ে রয়েছে তার ভাইয়েরা।তার আর নিশার বড়ভাই তূর্য।আর তার ছোট খালামনির দুই ছেলে নুহাশ আর সাইফ।তারা আড্ডায় মশগুল।এদিকের অনুষ্ঠান নিয়ে তাদের ধ্যান ধারণা নেই।
তিহান তার বড় খালামনির একমাত্র ছেলে।বড় খালামনিরা তাদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে।আর ছোট খালা থাকে অনেক দুরে।নিশার বিয়ে উপলক্ষে একসপ্তাহের জন্য এখানে এসেছে।তার বাবার কোন ভাইবোন নেই বিধায় তাদের কোন ফুফাতো ভাইবোনও নেই।

চুপচাপ মেহেদি লাগাচ্ছে তোহা।দুহাতে সে একা লাগাতে পারবেনা তাই ওপাশের হাতে স্বর্ণালি মেহেদি লাগিয়ে দিচ্ছে।স্বর্ণালি তার ছোট খালার মেয়ে।নুহাশ আর সাইফের ছোট বোন।কিন্তু বয়সে তার থেকে দেড় বছরের বড়।
নিশার বান্ধবীদের নাচানাচি থেমেছে একটু আগে।ক্লান্ত ভঙ্গিতে তারা সামনের চেয়ারে বসে আছে।
একনাগাড়ে এতক্ষণ বসে থাকতে থাকতে নিশার পা ধরে যাচ্ছে।চোখমুখ কুঁচকে সে বললো,
—“আর কতক্ষণ লাগবে রে তোদের?অসহ্য লাগছে আমার”
তোহা শান্ত চাহনীতে তাকালো।তার বোনটা বরাবরই ধৈর্যহীন।বললো,
—“আরো আধা ঘন্টাতো লাগবেই বা তার বেশিও…”।
পুরা বাক্য শেষ করার আগেই তিহানের ঝাঁঝালো কন্ঠ শোনা গেলো,
—“এই তিহু উঠ তো।সেই কখন থেকে পাশের সিট দখল করে বসেছিস।আমরাতো ছবিই তুলতে পারলামনা নিশার সাথে।উঠ!”
তোহা চমকে তাকালো।তিহানের সাথে নুহাশ আর সাইফও আছে।পরক্ষনেই দৃষ্টি নামিয়ে ভাবলো,তিহান কখন এলো এখানে?সে না ঘুমিয়েছিলো?
তিহান ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে।তোহা উঠছেনা দেখে সে মৃদু ধমকের স্বরে আবারো বললো,

—“উঠ না।বসবো কোথায়?”
দ্রুত উঠে দাড়ালো তোহা।আবারো লজ্জা লাগছে তার।তিহান তার থেকে একটু দুরত্বে দাড়িয়ে আছে। তাড়াহুড়ো করে পা বাড়াতে যেয়ে হাতে থাকা খোলা মেহেদির কোণে জোরে চাপ লেগে প্রায় অনেকটা মেহেদি ছিঁটকে তিহানের পান্জাবিতে পরলো।আৎকে উঠলো তোহা।এখনই এটা হতে হলো?ধ্যাত্।
হন্তদন্ত কন্ঠে সে বললো,
—“সরি,আমি…মুছে দিচ্ছি।”
বলে হাত দিয়ে সেটা মুছতে যেয়ে আরো লেপ্টে ফেললো।ফলস্বরূপ তার হাতেও মেখে গেলো অনেকটা।নিশা বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,
—“কি করলি তোহা?পান্জাবিটাতো পুরো নষ্ট হয়ে গেলো।তুই কি একটা কাজও…”
তিহান তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলো।পকেট থেকে টি স্যু বের করে একপলক তোহার দিকে তাকিয়ে নিজের পান্জাবি মুছতে মুছতে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—“সমস্যা নেই।”
অত:পর সবার সাথে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পরলো।
তোহা চুপ করে এককোণায় যেয়ে দাড়ালো।মুখের ভারি ভাবটা আরো ভারি হয়েছে।তার হাতে এবড়োথেবড়ো ভাবে লাগা মেহেদিতে রং হয়ে যাচ্ছে।আশেপাশে মোছার জন্য কিছু পাচ্ছেও না।তিহানের মতো সেতো আর পকেটে টি স্যু নিয়ে ঘুরেনা।
চোখ জ্বালা করছে।সবকিছু অসহ্য লাগছে।ঘড়ির দিকে তাকালো সে।রাত দশটা বাজে।তার হাতে এখনো মেহেদি লাগানো হয়নি।আহত দৃষ্টিতে মেহেদি রাখা ডালার দিকে তাকালো সে।ডালা সম্পূর্ণ খালি।আপুর বান্ববীরা আর সবাই মিলে সব লাগিয়ে নিয়েছে।আর তার হাতে যেটা আছে সেটা দিয়ে নিশাকে লাগিয়ে দিতে হবে।
সুতরাং সে মেহেদি লাগাতে পারবেনা।আর এতরাতে কে ই বা তাকে নতুন করে কিনে এনে দিবে?”

হঠাৎ হাতে কিছু একটা অনুভব হতেই দ্রুত সেদিকে তাকালো তোহা।তার পাশে দাড়িয়ে আছে তিহান।
মেহেদি লাগা হাতটা আলতো করে ধরে নিজের রুমাল দিয়ে যত্ন করে তা মুছিয়ে দিচ্ছে তিহান।
তার দৃষ্টি তোহার হাতের দিকে।তোহা দ্রুত তার ভাইবোনদের দিকে তাকালো।নাহ্,সবাই ছবি তুলাতুলিকে মশগুল।এদিকে কারো নজর নেই।
তিহান হাতের দিকে তাকিয়েই একেবারে শান্ত কিন্তু অন্তত কঠোর কন্ঠে বললো,
—“তখন কিছুই দেখিনি আমি।আয়নার কথাটা মজা করে বলেছিলাম।আর তুই গাধী কিছু না বুঝেই ভোঁ
দৌড় দিলি।নিজের রুমে যেয়ে দেখিস।তোর ড্রেসিং টেবিলটা বাঁকিয়ে রাখা।বিছানা থেকে শোয়া অবস্থায় আলমারির আয়নায় তোর ড্রেসিং টেবিল না বরং ওয়াশরুম আর বারান্দার দরজা দেখা যায়।পুরা কথা শুনে তারপর রিয়েক্ট করতে হয়।স্বর্ণা তোকে ডাকার আরো অনেকক্ষণ পরে উঠেছি আমি।যখন বুঝেছি তুই সম্পূর্ণ রেডি তখন।শাড়ির সরে রয়েছিলো তাই রাগের মাথায় বকে ফেলেছি আর সেজন্য আমি একদমই সরি না।
কারণ আমি সেটা ঠিক না করলে তুই ওটা ঠিক করার কথা মাথায়ও আনতি না,তা আমার জানা আছে।
আর তখন সত্যই মেহমান দিয়ে রুম ভর্তি ছিলো।আমাদের ফ্ল্যাটের চাবি ছিলো বাবার কাছে আর বাবা বাইরে বেরিয়েছিলো।নিশার রুমে খালা-খালুরা ছিলো।তাদেরকেতো আমি মুখের উপর বের হতে বলতে পারিনা ওপর মাথাটাও খুব ধরেছিলো তাই বাধ্য হয়েই তোর রুমে ঘুমাতে গিয়েছিলাম নয়তো কখনোই যেতাম না।
বলে তোহার হাতটা ছেড়ে দিলো তিহান।রুমালটা পকেটে ঢুকিয়ে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছলো।তার চোখে স্পষ্ট অভিমান।তোহা হতবিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে।আসলেই সে এত বোকা কেনো?তিহানকে সে কিভাবে অবিশ্বাস করতে পারলো?এখনতো নিজের উপরই বিরক্ত লাগছে।অসহ্যকর!

রাত ১২টা…
মুখের মেক-আপ তুলে ক্লান্ত ভঙ্গিতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো তোহা।মেহমানরা সব চলে গিয়েছে।
তার রুমে কেউ নেই।সে কখনো রুম শেয়ার করতে পারেনা।নিশা আপু,স্বর্ণালি আপু এক রুমে ঘুমিয়েছে।
তিহান ভাইদের ফ্ল্যাটে তিহান ভাইয়ের সাথে নুহাশ আর সাইফ ভাইয়া ঘুমিয়েছে।আর ছোটখালু আর তার বাবা তুর্য ভাইয়ার রুমে।তুর্য ভাইয়া ড্রইংরুমের সোফায় ঘুমিয়ে আছে।আর মা-ছোটখালা একরুমে।
শুধু তার রুমটাই খালি।
পরণের শাড়ি পাল্টে তোহার পরণে এখন সাদামাটা থ্রিপিস।চুলগুলো হাতখোঁপা করা।চোখেমুখ বিষন্নতার ছাঁপ।
বাড়ির সবার হাতে মেহেদি থাকলেও তার হাতে নেই।তার হাতটা মলিন,সাদা।কারণ মেহেদি শেষ।এতরাতে দোকান বন্ধ।কই পাবে সে মেহেদি?তাই কাউকে আনতেও বলেনি।
টলমলে পায়ে পড়ার টেবিলের ড্রয়ারটা খুললো তোহা।সেখানে নিজের ফোন বন্ধ করে রেখে গিয়েছিলো সে।তার ধারণা অনুষ্ঠানে ফোন নিয়ে গেলেই ফোনটা কোনোভাবে হারিয়ে ফেলবে সে।এর আগেও দুইবার ফোন হারিয়েছে।এরপর থেকে আর কোনো অনুষ্ঠানে ফোন নিয়ে যায়না সে।

ড্রয়ারটা খুলতেই চোখজোড়া বিস্ময়ে,খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠলো তোহার।মুখের বিষন্নতার ছাপটা চওড়া প্রশস্ত হাসির আড়ালে মিলিয়ে গেলো।ড্রয়ারের সামনেই একটা নতুন মেহেদির প্যাকেট রাখা।
সে দ্রুত সেটা হাতে নিল।
অত:পর ফোনটা অন করতেই মেসেজের টুংটাং শব্দে ঠোঁটের হাসিটা আরো একটু ঝলমলিয়ে উঠলো।
তিহানের নাম্বার থেকে মেসেজের এসেছে।সেখানে বাংলা ফন্টে লেখা ছোট্ট একটা মেসেজ–
“কাল সকালে মেহেদি রাঙা হাত ছাড়া চোখের সামনে আসবিনা।”

এক রক্তিম শ্রাবণে পর্ব ৩+৪