Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২
সেঁজুতি আক্তার

শেহরান বাথরুম থেকে একটি টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে বের হলো। রুমের মধ্যে অন্ধকার দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল, “এই মেয়ে, রুমের মধ্যে এরকম অন্ধকার কেন?”
মাইরা শেহরানের উপস্থিতি টের পেয়ে তাড়াতাড়ি নিজের শাড়ি আবার শরীরে জড়াতে লাগলো। শেহরান মাইরার সাড়া শব্দ না পেয়ে এক কদম এগিয়ে আসলো। শেহরানের পা মাইরার শাড়ির আঁচলের ওপর পড়েছে। মাইরা খেয়াল করেনি। শাড়ির আঁচল ধরে টান দিতেই শেহরান ধড়াম করে ফ্লোরে পড়ে গেল। “ও মাগো” বলে চিৎকার করে উঠলো। মাইরা দুই হাতের আঙুল কানে চেপে বলল, “এইভাবে ষাঁড়ের মতো চিল্লাচ্ছেন কেন? স্টুপিড!” “আমাকে তোলো।” মাইরা ভ্রু কুঁচকে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে লাইট জ্বালিয়ে দিল। সামনে তাকাতেই মাইরার চক্ষু চড়কগাছ। শেহরান ফ্লোরের ওপর পড়ে আছে। “এই স্টুপিড, ওইভাবে হা করে দাঁড়িয়ে না থেকে আমাকে তোলো।”

মাইরা শেহরানের দিকে তাকিয়ে নাক সিটকে বলল, “এ বাবা দেখো কেমন। একে তো নিজে পড়ে গেছে, আবার আমাকে বলছে তুলতে। আমি পারবো না।”
“এই বেয়াদব মেয়ে, এখনো বলছি আমাকে ধরো। আমি পায়ে ব্যথা পেয়েছি।” মাইরা মুখটা অবলা বাচ্চার মতো করে বলল, “আপনার মতো অত বড় মানুষকে কি আমার দ্বারা তোলা সম্ভব?” শেহরান মাইরার কথাগুলো দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে নিল। তারপরে দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “আমাকে কোলে করে তুলতে বলেনি। বলেছি আমার হাতটা একটু ধরো, আমাকে একটু সাপোর্ট দাও।”
“ও আগে বলবেন তো, আমি ভাবছি…”
“থাক, তোমাকে আর কিছু ভাবতে হবে না। এবার ধরো, প্লিজ হাতটা।” মাইরা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল শেহরানের দিকে। দুষ্টুমি ভরা চোখে শেহরানের দিকে তাকিয়ে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। শেহরান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে মাইরার হাতটা ধরল, হ্যাঁচকা টান দিয়ে মাইরাকে নিচে ফেলে নিজে উঠে দাঁড়ালো।

“ওমাগো, মেরে ফেলেছে। কোমরের হাড়টা বোধহয় ভেঙে গেছে।” কোমরে হাত বোলাতে বোলাতে মাইরা আহাজারি করতে লাগলো।
শেহরান শয়তানি হাসি দিয়ে বলল, “এবার কেমন লাগে বোঝো, পাকনা মেয়ে একটা।” বলেই বিছানায় গিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল।
মাইরা শেহরানের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালো। “কোমরটা বোধহয় ভেঙে গেছে।”
শেহরান বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে আছে।
মাইরা শেহরানের দিকে তাকিয়ে গলায় একটু ঝাঁঝ ঢেলে বলল, “বলছি, আমি কোথায় ঘুমাবো?”
শেহরান চোখ বুজেই বলল, “আমি কি জানি।”

মাইরা মিনমিনে গলায় সোফার দিকে আঙুল তাক করে বলল, “দেখুন, আপনি ওই সোফায় গিয়ে ঘুমান।” শেহরান চোখ মেলে মাইরার দিকে ভ্রু কুচকে তাঁকাল,”এখানে কোনো নাটক-সিনেমা চলছে না, যে আমি সোফায় ঘুমাবো আর তুমি বিছানায় ঘুমাবে। ঘুমাতে হলে বিছানায় ঘুমাও, না হলে নাই। রুম থেকে বেরিয়ে যাও। আর লাইটটা অফ করো, আমার ডিস্টার্ব হচ্ছে। শেহরান উল্টো দিকে ঘুরে ঘুমিয়ে পড়ল।
মাইরা লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “এই লোকটা আসলেই একটা খাটাশ।” শাড়িটাও আর বদলানো হলো না। মাইরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবল, “এই অচেনা একটা মানুষের সাথে এক রুমে থাকা। মনে মনে ভাবলো, যদি উল্টাপাল্টা কিছু করতে চায়। কিন্তু এতক্ষণে লোকটাকে দেখে তেমন কিছু করবে বলেও মনে হলো না। তবু সাবধান থাকাই ভালো। তাই মাইরা শাড়ির কুচি ধরে নিচে গিট্টু মেরে রাখলো, যাতে শাড়ি উঠে না যায়। এমনিতেই মাইরার ঘুমানো ভালো না, তার ওপর শাড়ি। আল্লাহ মালুম, শাড়ি অর্ধেক রাতে খুলে গেলে হয়। শেহরানের দিকে তাকিয়ে মনে বেশ কয়েকটা গালি দিয়ে ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। শেষে আর কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে বিছানার অপর পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল।

শেহরান চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো মাইরা জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শেহরান বিছানা থেকে উঠে পড়ল। বেলকনিতে গিয়ে একটি সিগারেট ধরালো। অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “জীবনটা যেন কেমন হয়ে গেছে। এক তো জীবনে প্যারার অভাব ছিল না, এখন আবার এই মেয়ে এসে জুটেছে। আল্লাহই জানে কপালে কি আছে।” শেহরানের সিগারেট শেষ হতেই রুমে আসলো। মাইরা হাত-পা মেলে ঘুমিয়ে আছে। শেহরান অল্প একটু জায়গা নিয়ে শুয়ে পড়লো। এভাবেই কেটে গেল একই বিছানায় দুইটি অচেনা মানুষের রাত্রিযাপন।
সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দার ফাঁক গলিয়ে মাইরার চোখে এসে লাগছে। মাইরা ঘুমের ঘোরে শেহরানের বালিশটা টেনে নিয়ে নিজের মুখের ওপর দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। শেহরান বিরক্তি নিয়ে চোখ মেলে তাকালো। দেখলো ওর বালিশটা মাইরা টেনে নিয়ে নিজের মুখের ওপরে দিয়েছে। শেহরান একটু মাইরার দিকে ঝুঁকে নিজের বালিশটা নিতে গেলেই বাঁধলো বিপত্তি। মাইরা ঘুমের ঘোরে পা দিয়ে শেহরানের পেটে জোরে একটা লাথি মারল,শেহরান কুঁকড়ে বসে পড়ল। অথচ মাইরা বালিশ নিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে আরও আরাম করে ঘুমিয়ে পড়ল।

শেহরান রাগী চোখে মাইরার দিকে তাকিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। পার্টি অফিসে কিছু কাজ আছে, তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। শেহরান ওয়াশরুমে চলে গেল। ১০ মিনিট পরে ফ্রেশ হয়ে এসে একটা পাউডার ব্লু কালারের শার্ট আর একটা অফ হোয়াইট কালারের প্যান্ট পরলো। শার্টের হাতাটা ফোল্ড করে নিলো। ভ্যানিটির সামনে দাঁড়িয়ে পারফিউম মেরে হাতে একটি রোলেক্সের ঘড়ি পরলো। মাইরার দিকে একবার তাকালো,মেয়েটা বিছানায় এলোমেলোভাবে ঘুমিয়ে আছে। শেহরান বিরক্তি ভরা চোখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
নিচে নামতেই দেখলো ড্রয়িং রুমের সোফায় রায়হান মির্জা বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। রান্নাঘরে শাহানা বেগম রান্না করছেন। কাজের বুয়া শেফালী খালা খাবার নিয়ে টেবিলে রাখছে।
“শেফালী খালা, এক কাপ কফি দাও তো। মাথাটা খুব ধরেছে।” বলে শেহরান সোফায় বসে পড়ল। রায়হান মির্জা ছেলের দিকে একবার তাকালেন। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “কি ব্যাপার, কোথাও বেরোচ্ছো নাকি?”
-শেহরান ফোনের দিকে দৃষ্টি রেখে রাশভারী কণ্ঠে বললো, “হুম। পার্টি অফিসে একটু কাজ আছে।”
-“ওহ!”

শেফালী খালা এসে টেবিলের ওপরে কফির কাপটা রাখতেই শেহরান কাপটা তুলে নিল হাতে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে বাবার উদ্দেশ্যে বলল, “তোমরা এটা ঠিক করলে না, বাবা।” এই বিয়েটা আমি কিছুতেই মানতে পারছি না। আমার জীবনটা এমন ছিল না, বাবা। আমি কখনো এইভাবে বিয়ে করতে চাইনি।
কিভাবে কি, ও একটা বাচ্চা মেয়ে। আমার সাথে ও মানিয়ে নিতে পারবে?
-রায়হান মির্জা ছেলের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে বললেন, “আমি আবার কি করলাম? সব তো তোর মা-ই করল।”
-শেহরান আর কিছু বলল না। কফিটা শেষ করে উঠে পড়ল। শাহানা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “কিরে বাবা, খাবি না?”
শেহরান গমগমে কণ্ঠে বলল, “লেট হয়ে যাচ্ছে।” বলেই গাড়ির চাবিটা হাতে তুলে নিয়ে একবার সিঁড়ির দিকে তাকালো। তারপর আর পেছনে না ফিরে বেরিয়ে গেল। শাহানা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তার ছেলের কখন যে কি হয় বোঝা বড় দায়। এই বিয়েটা যে কি মনে এক কথায় করে নিল, উনি এখনো বুঝতে পারেন নি। ছেলে যা জিনিস, যা বলে তাই।”

-“বুঝলে তো মিসেস মির্জা? এবার বুঝবে তুমি, কত ধানে কত চাল। শান্ত ষাঁড়কে ক্ষেপিয়ে দিয়েছো।”
-শাহানা বেগম স্বামীর দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝ নিয়ে বললেন, “তোমাকে অত না ভাবলেও চলবে। তুমি মন দিয়ে চা খাও।” বলেই তিনি হনহন করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
-রায়হান মির্জা স্ত্রীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যাহ বাবা, আমি আবার কি করলাম। যত দোষ নন্দ ঘোষ।”

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১

মাইরা ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরতেই বিছানা থেকে ধপ করে পড়ে গেল। সাথে সাথেই ঘুমটা ভেঙে গেল। তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কোথায় আছে। যখন বুঝলো নিচে পড়ে গেছে, তখন শাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “যত নষ্টের গোড়া এই শাড়ি। চল তোকে ভাঁজি।” বলেই উঠে দাঁড়ালো। বাথরুমে গিয়ে আগে ফ্রেশ হয়ে শাড়ি চেঞ্জ করল। একটা থ্রি-পিস পরে বাইরে আসলো। কাল রাত হওয়ায় রুমটা ভালোভাবে দেখতে পারেনি মাইরা। এখন চারপাশটা অনেক সুন্দর লাগছে। পুরো রুমটা খুব সৌখিনতার সাথে গোছানো। মাইরা দেওয়ালে টাঙানো শেহরানের ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, “খাটাশ লোকটা মনে হয় অনেক পরিপাটি গোছালো। তাই তো রুমটা এতো পরিষ্কার।”
“এই মেয়ে কে তুমি? ”

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৩