এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৩
সেঁজুতি আক্তার
~এই মেয়ে, তুমি কে?
“মাইরা দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো, ভ্রু কুঁচকে বলল, আমি মাইরা আপনি কে?”
“লিনা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আমি লিনা। তুমি শেহরান ভাইয়ার রুমে কি করছো?”
-আপনি যার নাম নিলেন, আমি তার আঠারো ঘন্টা আগে বিয়ে করা বউ। তো এবার বলুন, আপনি কে?
-লিনা অবাক হয়ে মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, হোয়াট! বউ মানে? শেহরান ভাই বিয়ে করলো কখন?
-আপনি ঠিক কে আমি জানি না, তবে আপনার কথায় আমার মনে হচ্ছে আপনি হয়তো ওনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে এটা জানেন না।
-লিনা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না, হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
-মাইরা লিনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে, বিড়বিড় করে বলল, আজব মহিলা। মাইরা বিছানায় গিয়ে বসল।
-সায়রা ভাইয়ের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ভাবি, উঠেছো? নিচে চলো, আম্মু তোমায় খেতে ডাকছে।
-মাইরা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, উনি কোথায়?
-সায়রা ভ্রু নাচিয়ে বলল, উনি কে?
-মাইরা হে হে করে হেসে বলল, তোমার ভাই।
-কেন, তুমি জানো না তোমার বর কোথায় থাকতে পারে?
-মাইরা চঞ্চল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, কই উনি তো আমাকে বলে যায়নি। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম।
-ওহ, তোমার বর সেই সকালে পার্টি অফিসে বেরিয়ে গেছে। ফিরবে রাতে।
-ওহ, আচ্ছা আপু তোমার কাছে ব্যথার ক্রিম আছে?
-সায়রা ভ্রু কুঁচকে বলল, ক্রিম তো আছে, কিন্তু কি হবে?
-আসলে আমার কোমরে খুব ব্যথা করছে। ক্রিম দিলে একটু ভালো লাগতো। সায়রার ভ্রু জোড়া সোজা হয়ে গেল। মুচকি হেসে বলল, হুম, চলো নিচে চলো, দিচ্ছি।
-আচ্ছা, চলো!
ফুপি, ফুপি….
একি লিনা মা, কখন আসলি?
-এইতো ফুপি, আসলাম। সেটা ছাড়ো, আগে বলো শেহরান ভাইয়ার বিয়ে হলো কবে?
-শাহানা বেগম মুচকি হেসে বললেন, সব বলবো, আগে বস তো। চেয়ার এগিয়ে দিলেন।
-লিনা চেয়ার টেনে বসল। শাহানা বেগম জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে লিনার সামনে এগিয়ে দিলেন। তোর মা কেমন আছে? ফুপির কথা শুনে লিনা বললো, ভালো আছে। তুমি আগে বলো, শেহরান ভাই কবে বিয়ে করল? শাহানা বেগম লিনার মাথায় হাত বুলিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ভাবি দেখেছিস কেমন? লিনা বিরক্তি নিয়ে বলল, হুম, ভালো। আর বলিস না, তোর শেহরান ভাইকে তো তুই চিনিসই। বিয়ে করবে না বলে একগুঁয়ে হয়ে বসে আছে। ধরে বেঁধে আমার বান্ধবীর মেয়ের সাথে কাল বিকালে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। মেয়ের বয়স কম তাই, কাউকে জানাইনি। বিয়ে যখন অনুষ্ঠান করবো, তখন সবাইকে জানাবো। লিনার চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। চোখ লুকিয়ে বলল, আমাকে তো একবার বলতে পারতে? আর এত তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দেওয়ারই বা কি দরকার? সরি রে মা, এতো তাড়াহুড়ো ভাবে সব হয়েছে। মাথায় ছিল না। থাক মা, মন খারাপ করিস না। তোর শেহরান ভাইকে বলব তোকে ট্রিট দিতে। থাক, তোমাকে আর কিছু বলতে হবে না।
রায়হান মির্জা টেবিলে এসে বসলেন। দাও, খাবার দাও। আজ একটা ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে। শাহানা বেগম হেসে বললেন বাবা, তোমার আবার মিটিংও আছে? রায়হান মির্জা বুঝলেন, বউ এখন তাকে কথা শোনাবে। তাই বলল তুমি বেশি না বকে তাড়াতাড়ি খেতে দাও। হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি তো বেশি বকি। আমি তো ভেবেছিলাম আপনার যে একটা ব্যবসা আছে, আপনি হয়তো ভুলেই গেছেন? রায়হান মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমার স্মৃতিশক্তি এত খারাপ না যে আমি ভুলে যাব। আবার শুরু… শাহানা বেগম বিরক্তি নিয়ে লিনাকে বসতে বলে স্বামীকে খাবার বেড়ে দিলেন।
-আম্মু, ব্যথার মলমটা কোথায়?
-শাহানা বেগম ভ্রু জড়ো করে বললেন, ব্যথার মলম কি হবে?
-ভাবির কোমরে নাকি ব্যথা, তাই ভাবি নিবে।
-শাহানা বেগমের হাতটা থেমে গেল। অবাক চোখে সায়রার পিছে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকা মাইরার দিকে তাকালো। মাইরা শাশুড়ির দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।
-লিনা হাতের চামচটা শক্ত করে চেপে ধরল। এটা কি ভাবে সম্ভব! এটা হতে পারে না। রায়হান মির্জা মেয়ের কথা বেশম খেলেন। মনে মনপ ভাবলেন, বাহ ছেলে! নাকি। এই বিয়ে মানে না, বউ মানে না, আবার প্লেনের থেকেও ফাস্ট। প্রথম বলেই ছক্কা। ভেবেই হাসলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটু টেনশনও লাগছে।
-শাহানা বেগম সায়রার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই খেতে বোস আর লিনার কিছু লাগলে তুলে দে। বলেই মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, মাইরা, তুমি আমার সাথে এসো। শাশুড়ির কথা শুনে মাইরা মাথা নেড়ে শাশুড়ির পিছে পিছে এগিয়ে গেল।
-লিনার গলা দিয়ে আর খাবার নামলো না। সায়রাকে বলে সায়রার রুমের দিকে চলে গেল। এই খানে এক মুহুরর্ত থাকলে সবার সামনেই হয়তো কান্না করে দেবে।
-এসো মা, এখানে বসো। মাইরা ধীর পায়ে গিয়ে বিছানায় বসলো। শাহানা বেগম ওষুধের বাটি থেকে একটা ব্যথার অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম এনে বলল, খুব বেশি ব্যথা? ওষুধ দিব?
-মাইরা মাথা নিচু করে বলল, না আম্মু, বেশি না। অল্প একটু।
-শাহানা বেগম এবার আশপাশে তাকিয়ে একটু অস্বস্তি নিয়ে মাইরার দিকে তাকালেন। পিল খেয়েছো? নাকি দিব?
-পিল কিসের পিল?
-শাহানা বেগম একটু ইতস্তিত হয়ে বললেন জন্মো..
-মাইরা কথাটা বুঝতে পেরেই, ফট করে মাথা তুলে বলল, না না আম্মু, আপনি যেমন ভাবছেন তেমন কিছু না।
-শাহানা বেগম স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে বললেন, তাহলে ব্যথা পেয়েছো কিভাবে? তিনি তো কি না কি ভেবে নিয়েছিলেন।
-মাইরা লজ্জা মাখা হাসি নিয়ে মিনমিনে গলায় বলল, আসলে খাট থেকে পড়ে গেছিলাম সকালে। কোমর একটু ব্যথা পেয়েছি।
-ওহ,খুব বেশি ব্যথা করছে! ডাক্তারের কাছে যাবে?
-না আম্মু বেশি ব্যথা না। মলম দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
-দাঁড়াও ব্যথার ওষুধ দিচ্ছি। বলে শাহানা বেগম ওষুধের বক্স থেকে একটি ব্যথার ওষুধ আর এক গ্লাস পানি এনে মাইরার হাতে দিলেন।
-মাইরা মুচকি হেসে ওষুধটা খেয়ে নিল। তারপরে এন্টিসেপটিক ক্রিমটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
– মাইরা, বলছি থ্রি-পিস কয়টা এনেছো?
-জি আম্মু, দুইটা।
-বিয়ের আগেও কি থ্রি-পিস পরতে নাকি?
-না আম্মু, থ্রি-পিস পরা হতো না। এই দুইটা বানানো ছিল, তাই মামী দিয়ে দিয়েছে।
-ওহ, তো বাসায় কি পরতে?
-জি, টপস আর স্কার্ট।
-কাল থেকে আর থ্রি-পিস পরবে না। বিকালে সায়রার সাথে শপিং এ গিয়ে কিছু টপ, স্কার্ট কিনে নিয়ে আসবে। আমি চাই তুমি আমার বাড়ির মেয়ের মতো করে থাকো। যেটা ভালো লাগবে না, সেটা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেবে। কখনো কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে আগে আমাকে বলবে। আর আমার ছেলে যদি কখনো খারাপ ব্যবহার করে, বা কোনো কিছু বলে, আমাকে এসে বলবে সব। কেমন?
-আচ্ছা আম্মু।
-এবার চলো, খেয়ে নেবে। অনেক বেলা হয়েছে। বলে শাহানা বেগম রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। মাইরা শাশুড়ির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
বিকাল ৫ টা। মাইরা আর সায়রা মিলে কেনাকাটা করছে মাইরার জন্য। চারটা টপস আর স্কার্ট, সাথে ওড়না ম্যাচিং করে কিনলো। রাতে পরার জন্য চারটা প্লাজু আর গেঞ্জি নিলো। আরো কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিলো। সায়রা নিজের জন্য কিছু শপিং করলো।
– হঠাৎ মাইরার চোখ গেল দূরে দাঁড়ানো শেহরানের দিকে। কানে ফোন রেখে কারো সাথে কথা বলছে। পাশে অনেকগুলো বডিগার্ড। এই লোক এখানে কি করছে? সায়রার দিকে তাঁকিয়ে বলল আপু, দেখো ওইটা তোমার ভাই না? সায়রা মাইরার আঙুল বরাবর তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ তো, ভাইয়াই তো। চলো তো। বলে মাইরার হাত ধরে এগিয়ে গেল।
-ভাইয়া, তুমি এখানে।
-আচ্ছা আম্মু, রাখছি। শেহরান কান থেকে ফোন সরিয়ে সায়রার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
-শেহরান মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, হুম, তোদের শেষ?
-হুম শেষ। তুমি এখানে কিভাবে?
-আম্মু ফোন করে বলল তোরা এখানে, তোদের যেন পিক করি তাই আসলাম।
-কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুজনের চোখে চোখ পড়ল। মাইরা তাড়াতাড়ি অন্যদিকে তাকিয়ে নিল, আর শেহরানও যেন কিছু বলতে গিয়েও বলল না। মাইরা মুখ ভেংচালো মনে মনে ভাবল
এই লোকটা সব সময় এমন গম্ভীর কেন!
-শেহরান দেখেও কিছু বলল না। সায়রার দিকে তাকিয়ে বলল, চল তাহলে।
-শেহরানের একজন বডিগার্ড এসে সায়রার হাত থেকে শপিংয়ের ব্যাগগুলো নিয়ে গাড়িতে তুলে দিলো।
-তিনজনেই গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ালো। সায়রা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইয়া, আমার না একটা ইম্পর্টেন্ট কাজ আছে। শ্রেয়ার বাসায় যেতে হবে। তুমি প্লিজ ভাবিকে নিয়ে বাসায় চলে যাও। একটু পরে আসছি। শেহরান সায়রার দিকে তাকিয়ে বলল, গাড়ি নিয়ে যা। না ভাইয়া, তোমরা যাও। আমি চলে যেতে পারবো।
-সিওর?
-হুম।
-মাইরা শেহরানের দিকে একবার তাকিয়ে মুখ বাঁকালো। তারপরে সায়রার দিকে তাকিয়ে বলল, আপু আমিও তোমার সাথে যাই?
-সায়রা মুচকি হেসে বলল সরি ভাবী, আজ তোমাকে নিতে পারছি না। অন্য একদিন নিয়ে যাব। তুমি বরং ভাইয়ের সাথে বাসায় চলে যাও। মাইরা শেহরানের দিকে একবার তাকালো। ধীরে বলল, ঠিক আছে, তুমি তাহলে সাবধানে যেও।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২
-সায়রা মুচকি হাসল।
-শেহরান গাড়িতে উঠে বসল। মাইরা সায়রার দিকে একবার তাকিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। মাইরা উঠে বসতেই ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিল।
-সায়রা গাড়ির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, দেখি ভাইয়া, আর কতদিন মুখ গোমড়া করে থাকো। একদিন ঠিকই ভাবিকে ছাড়া থাকতে পারবে না। তখন বিয়েও মানতে হবে, বউও মানতে হবে। দুষ্টু হাসল।
