এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৪
সেঁজুতি আক্তার
গাড়ি চলছে মির্জা বাড়ির উদ্দেশ্যে। গাড়ির মধ্যে পিনপতন নীরবতা। মাইরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে।
-শেহরান ভ্রু কুঁচকে একবার মাইরার দিকে তাকালো। এই মেয়েটা জানালা দিয়ে কি দেখছে। নিজেও কৌতুহল বসত দেখার জন্য, মাইরার মাথার কাছে মুখ নিয়ে দেখার চেষ্টা করল। এত মনোযোগ দিয়ে কি দেখছে।
-মাইরা চমকে উঠল। ফট করে পিছনে ফিরতেই শেহরানের কপালের সাথে বাড়ি খেল। “আহ…” শেহরান কপাল ডলতে ডলতে মাইরার দিকে রাগী চোখে তাকালো। “স্টুপিড মেয়ে, সব সময় এত ঝাঁপাঝাঁপি করো কেন?”
-মাইরা নিজের কপাল ঘষতে ঘষতে শেহরানের দিকে তাকিয়ে বলল, ছোট ছোট করে বলল,আপনি তো আচ্ছা মানুষ দেখছি। একে তো নিজে দোষ করবেন, আবার আমাকে দোষ দিচ্ছেন। “আপনি কি করার চেষ্টা করছিলেন, বলুন তো?”
-শেহরান একটু পিছিয়ে বসল। ভ্রু জোড়া কুঁচকে অবাক হয়ে বলল, “কি করতে চাচ্ছিলাম মানে? কিসের চেষ্টা?”
-“আপনি কিছু বোঝেন না, ছোট বাচ্চা?”
-“এই মেয়ে, এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে! আর আমি কি বুঝবো। তোমার বয়স কত? ছোট একটা পিচ্চি মেয়ে হয়ে তুমি আমাকে এসব কথা বলার সাহস পাও কোথা থেকে?”
-মাইরা চোখ জোড়া বড় করে, আঙুল তাক করে বলল, “দেখুন, প্রথমত আমার নাম মাইরা আর দ্বিতীয়ত আমাকে একদম পিচ্চি বলবেন না। আমি বাচ্চা না।”
-শেহরান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে শান্ত কন্ঠে বলল, “ওহ, রিয়েলি? তুমি বড় হয়ে গেছো? তাহলে তো একটা পরীক্ষা নেওয়া যায়, কি বলো? দেখি কতটা সাহস আছে?
-“কিসের পরীক্ষা? কিসের সাহস?”
-শেহরান মাইরার দিকে ঝুঁকে আসল। মাইরা মাথাটা একটু পিছিয়ে গেল। শেহরান আর একটু এগিয়ে গেল। মাইরা শুকনো ঢোক গিলে বলল, “দেখুন, আপনি কি করছেন। আমি কিন্তু…” মাইরার বাকি কথা শেষ হলো না। হঠাৎ গাড়িতে জোরে ব্রেক কষতেই ভারসাম্য হারিয়ে শেহরান সামনের দিকে হেলে পড়ল। দুজনের মুখের দূরত্ব কয়েক ইঞ্চিতে নেমে আসল। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল। মাইরা চকিতে চোখ বন্ধ করে ফেলল। শেহরান মাইরার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। তবে পরমুহূর্তেই মুখটা গম্ভীর করে সোজা হয়ে বসল।
-মাইরার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। মনে হচ্ছে হৃদস্পন্দনের শব্দ যেন গাড়ির ভেতরেও শোনা যাচ্ছে।
-“এই পাকা মেয়ে, চোখ খোলো।”
-শেহরানের কথা শুনে মাইরা পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো। লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে গেছে। ও তো আরেকটু হলেই হার্ট অ্যাটাক করত।
-শেহরান ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে হুংকার ছেড়ে বলল, এই ইডিয়েট, গাড়ি চালাও কিভাবে? “সো সরি স্যার, সামনে আপনার বিপরীত পক্ষের মিস্টার ইলহাম শিকদার দাঁড়িয়ে আছে। শেহরানের মুখটা কঠিন হয়ে উঠলো।
-“রনি।”
-“জি ভাই।”
-“গিয়ে দেখ তো কি বলছে?”
-রনি ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ইলহাম শিকদারের দিকে এগিয়ে গেল।
-এই চামচা, তোর ভাই আসেনি? তোর ভাইকে বল নামতে।”
-দেখুন, বড় ভাই, এখানে খামোখা প্যাঁচাল পাড়ার কোনো মানে হয় না। সরেন, ভাই ভাবিকে নিয়ে এখন বাসায় যাবে। আপনার সাথে পার্টি অফিসে দেখা করবে।”
-“কিরে রনি, ব্যাপার কি? তোর শেহরান ভাই বিয়া করছে? কই, আমাদের তো মিষ্টি খাওয়াইলো না।”
-রনি একবার পিছনে ফিরে গাড়ির দিকে তাকালো। সামনে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, “মিষ্টি খাওয়ার সময় হলে ঠিক খাইতে পারবেন। এখন রাস্তা ছাড়েন। ভাইয়ের দেরি হয়ে যাচ্ছে। জানেনই তো ভাই রেগে গেলে আবার আমার খবর আছে।”
-ইলহাম শিকদারের মুখের অভিব্যক্তি বোঝা গেল না। রনির শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে বলল, “কিরে রনি, একটু বেশি কথা শিখে গেছিস যেন।”
“হু, বড় ভাই, সবই আপনাদের দোয়ায়।”
ইলহাম মুচকি হেসে বলল, “যা রে ছোট, যা। তোর ভাইরে বল এখানে আসতে।”
“ভাই, দেখেন, মিয়া ভাই এখন ব্যস্ত। আপনি পরে দেখা করেন। তার আবার স্ট্যাটাস হাই লেভেলের। রাস্তায় যার তার সাথে সে কথা বলে না।”
-ইলহাম রনির শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল।
– রনি ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে ইলহামের চোখের দিকেই তাকিয়েই রইল, এক চুলও নড়লো না।
-ইলহামের লোকেরা ইলহামের পাশে এসে দাঁড়ালো। ইলহাম রাগে কাঁপতে কাঁপতে রনির কলার ছেড়ে দিল, ওর লোকজনকে ইশারা করলো গাড়ি সাইডে নিতে।
– রনি ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গাত্মক হাসি নিয়ে বলল, “এত প্রেসার নিলে তো কিছুদিন পরেই আপনি পটল, আলু, কচু, বেগুন সব তুলবেন, ভাই।” একটু ঝুঁকে ইলহামের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “রাগটা সামলে রাখেন, বড় ভাই। সামনে আরও অনেক হিসাব বাকি।”
-ইলহাম কিছুই বলল না, কঠিন মুখ করে রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ালো।
*রনি গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিল।
– ইলহামের পাশ দিয়ে গাড়ি বেরিয়ে গেল। ইলহাম পাশে দাঁড়ানো মন্টুকে বলল,
-“খোঁজ বের কর। শেহরান মির্জা কাকে বিয়ে করেছে।” “কেন ভাই, আপনি কি ঘটক তালি করবেন?” পাশে দাড়ানো ছেলে গুলে সবাই হেসে উঠল। ইলহাম গাড়ির দিকে দৃষ্টি রেখে বলল, “না রে বল্টু, শেহরান যা নিজের বলে আগলে রাখে, সেটা দেখার আগ্রহ আমার সবসময়ই থাকে।”
রাত নয়টা। খাওয়ার টেবিলে রায়হান মির্জা বসে খাবার খাচ্ছেন। পাশে সায়রাআর লিনা বসে খাচ্ছে। মাইরা সবাইকে খাবার সার্ভ করতে চাইলে শাহানা বেগম দিলেন না। মাইরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি গিয়ে শেহরানকে ডেকে আনো। তারপরে একসাথে খেতে বসো।
-লিনা ফুপির দিকে তাকিয়ে বলল, “ফুপি, আমি যাই।” না, তুই বস। মাইরা, তুমি যাও।
-মাইরা মাথা নাড়িয়ে সিঁড়িতে উঠল। মনে মনে ভাবল, আবার ওই ম্যানার্সলেস লোকটাকে ডাকতে হবে।
-সেই সন্ধ্যায় এসে শেহরান রুমে ঢুকেছে আর বেরোয়নি। মাইরা সেই সন্ধ্যায় রুম থেকে বেরিয়েছে আর রুমে যায়নি। শাশুড়ির সাথে রান্নাঘরে রান্নায় সাহায্য করছিলো। শাহানা বেগম অবশ্য কিছু করতে দেননি, তাও শাশুড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। শাহানা বেগম কোনোদিন কোনো মেইড দিয়ে রান্না করান না। তার নাকি নিজের হাতে রান্না করতে বেশ ভালো লাগে। তাই নিজেই রান্না করেন।
-মাইরা রুমের সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে দোয়া দরুদ পাঠ করল। কারণ এই মুহূর্তে একটি ম্যানার্সলেস রাক্ষস লোকের রুমে যেতে হচ্ছে। বলা তো যায় না, যখন তখন চিবিয়ে খেতে পারে।
-মাইরা দরজা একটু আলগা করে উকি মারতেই দরজাটা একাই খুলে গেল। মাইরা ধপাস করে রুমের মধ্যে ফ্লোরে পড়ল। শেহরান ট্রাউজারের পকেটে হাত দিয়ে মাইরার সামনে এসে দাঁড়ালো। মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, “কি ব্যাপার? আমার ঘরে কি চুরি করার প্ল্যান আছে নাকি চোরের মতো উকি মারছো?”
-মাইরার হাতে প্রচন্ড লেগেছে। হাত ডলতে ডলতে শেহরানের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল, “আপনার মতো অসভ্য লোক আমি দুইটা দেখিনি। আপনি আমাকে এভাবে ফেলে দিলেন। দেখুন, আপনার জন্য আমার হাতে লাগলো।”
-শেহরান এক হাত বাড়িয়ে দিলো মাইরার দিকে। মাইরা মুখ ঘুরিয়ে নিজেই উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু পারল না, আবার ধপ করে বসে পড়ল। শেহরান মুচকি হেসে বলল, “জেদ না দেখিয়ে উঠে পড়ো, না হলে উঠতেও পারবে না।” মাইরা ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। রাগে গজগজ করতে করতে, শেহরানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে উঠে দাঁড়ালো। শেহরান মাইরার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দিলো।
-মাইরা নিজের হাতটা দেখছে, অনেকখানি ছিলে গেছে। শেহরান ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে আসল। মাইরার হাতটা নিজের হাতে নিলো। মাইরা হাত টেনে নিতে গেল, কিন্তু শেহরান রাগী চোখে তাকাতেই মাইরা হাত ছেড়ে দিলো। শেহরান ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে কেটে যাওয়া জায়গায় একটু ক্রিম লাগিয়ে দিল।
-মাইরা মুখ ভেংচিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “নিজেই ব্যথা দিয়ে এখন যত্ন নেওয়া হচ্ছে।”
-শেহরান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে বলল, “মুখ এমন পেঁচার মতো করলে মুখটাও এবার বাঁকা হয়ে যাবে।”
-“থাক, আপনাকে সেটা না ভাবলেও চলবে।”
-শেহরান একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “তুমি কি করতে এসেছো?”
-মাইরা মুখ ঘুরিয়ে গলায় একটু ঝাঁঝ ঢেলে বলল, “আম্মু আপনাকে খেতে ডাকছে। নিচে যান।”
-“আমি খাবো না। তোমার আম্মুকে বলে দিয়ে এসো।”
-“আমি পারবো না। আপনি গিয়ে বলুন। আমি আর নিচে যাবো না। আমার ঘুম আসছে, ঘুমাবো।”
-শেহরান চোখ ছোট ছোট করে বলল, “তুমি খেয়েছো?”
-“না।”
-শেহরান এবার একটু কড়া গলায় বলল, “এই বেয়াদব মেয়ে, জানে না রাতে না খেয়ে ঘুমাতে হয় না। চলো নিচে, খেয়ে নেবে।”
-মাইরা শেহরানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি যে আমাকে জ্ঞান দিচ্ছেন। একটু আগে তো আপনিও বললেন আপনি খাবেন না। এভাবেই বুঝি আপনি ভাষণ দেন?”
-শেহরান অবাক হয়ে বলল, “তুমি এত কথা কোথা থেকে শিখেছো? এতোটুকু মেয়ে, কিন্তু তোমার কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তুমি একটা ঝগড়াটে মহিলা।”
-শেহরানের কথা শুনে মাইরার রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। আঙুল তাক করে বলতে নিল, “আমি মহিলা।” আর বলতে পারল না। শেহরান মাইরার আঙুল ধরে বলল, “এখানে বসো, আমি খাবার নিয়ে আসি।” বলেই বাইরে বেরিয়ে গেল।
-মাইরা অবাক হয়ে শেহরানের যাওয়ার দিকে তাকালো। এই লোকটার কাজ কাম মাইরার মাথায় ঢুকে না। এই দেখবা খাটাশের মত ব্যবহার করছে। আবার এই ভালো মানুষি দেখাবে। বিড়বিড় করে বলল কি আর করবি রে মাইরু। তোর কপালে এমন খাটাশ জুটেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবল, এই থ্রি-পিস পরে খুব বিরক্তি লাগছে। কখনো থ্রি-পিস পরা হয় না, তাই সোফার দিকে এগিয়ে গেল। বিকালে কিনে আনা প্লাজু আর গেঞ্জির সেটের ব্যাগগুলো সোফার উপরে রাখা। একটা ব্যাগ তুলে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল, চেঞ্জ করতে হবে আগে।
-শেহরান ডাইনিং টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে একটা প্লেট হাতে তুলে নিল।
-শাহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “কি নিবি, বাবা? আমাকে বল, আমি দিচ্ছি।”
-“থাক, আম্মু, তুমি খাও। আমি নিচ্ছি।” বলে শেহরান ভাত-তরকারি তুলে নিল প্লেটে।
-“কি হলো, এখানে বসে খাও।” শেহরান বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার জন্য না, মাইরার জন্য।” রায়হান মির্জা খাবার খাচ্ছিলেন, হঠাৎ ছেলের কথা শুনে গলায় বিষম লাগলো। সায়রা বাবার দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। রায়হান মির্জা ঢকঢক করে পানি খেয়ে ছেলের দিকে ভ্রু কুঁচকে বলল, “ব্যাপার কি? এতো ভক্তি?” স্বামীর কথা শুনে শাহানা বেগম বিরক্তি নিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আহ, এতো বকো কেন তুমি? খাও।”
-শেহরান বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “কোনো জনমে হয়তো তুমি আমার শত্রু ছিলে, তাই না বাবা? না হলে আমার পিছনে পড়ো কেনো?” রায়হান মির্জা ছেলের কথা শুনে মুখ ভোঁতা করে খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন। “ছেলেটার মুখে কিচ্ছু আটকায় না। হাড়ে বজ্জাত।” লিনা অবাক চোখে শেহরানের দিকে তাকালো। তার শেহরান ভাই তো এমন ছিল না।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৩
-“মাইরার কি শরীর খারাপ?”
-“না, আম্মু। শরীর খারাপ না। পা ব্যথা করছে, তাই।” “আমি ভাবলাম আমি নিয়ে যাই খাবারটা।” “ওহ, আচ্ছা। বেশি সমস্যা হলে আমাকে ডেকো।”
-“আচ্ছা।” শেহরান খাবারের প্লেটটা নিয়ে রুমের দিকে চলে গেল।
-রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় নক না করেই রুমে ঢুকতেই। শেহরানের পা জোড়া থমকে গেল। সামনের দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।
