এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৫
সেঁজুতি আক্তার
শেহরান খাবারের প্লেটটা নিয়ে রুমে ঢুকতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। রুমের মধ্যে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মাইরা। মাইরার দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল শেহরানের।
মাইরা শেহরানের একটা শার্ট আর একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে।কিন্তু প্যান্টটা কোমরে নেই, খুলে পায়ের কাছে পড়ে আছে। গায়ে খালি শার্ট। শার্টটা অবশ্য হাঁটু পর্যন্ত। মাইরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছে। এই পোশাকে ওকে কি অদ্ভুতই না লাগছে। বিরক্তি নিয়ে প্যান্টটা পা দিয়ে বের করে ফেলল। এখনো মাইরা খেয়াল করেনি দরজার কাছে শেহরান দাঁড়িয়ে। মাইরা তখন সোফার উপর থেকে একটি শপিং ব্যাগ তুলে নিয়েছিল। ভেবেছিল এই শপিং ব্যাগে ওর গেঞ্জি আর প্লাজু আছে। তাই আর দেখার প্রয়োজন মনে করেনি। শপিং ব্যাগ নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গিয়েছিল।
ভাবল হাতমুখ ধুয়ে তারপরে ড্রেস চেঞ্জ করবে। সেই ভাবনা সেই কাজ। ট্যাপ ছাড়তেই পাশেই ঝর্ণার সুইচ ছিল। সেটাই চাপ লেগে গেল। ঝর্ণা অন হয়ে গেছে। সাথে সাথেই মাইরাকে পুরো ভিজিয়ে দিল। মাইরা কিছুক্ষণ বিরক্তি নিয়ে ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরে শপিং ব্যাগের দিকে তাকিয়ে ভাবলো ও ওর ড্রেস সাথে করে এনেছে। তাই সম্পূর্ণ ড্রেস খুলে ব্যাগ থেকে প্লাজু গেঞ্জি বের করতেই হতবাক, বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। শেহরানের শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। এইটা কে আনলো ভাবতেই মনে পরলো। শেহরান নিজের জন্য এনে রেখেছিল। এখনো ওই ভেজা অবস্থায় তো রুমেও যাওয়া যাবে না। আর খালি অবস্থাতেও তো যাওয়া যাবে না। যখন তখন ওই খাটাশ লোক চলে আসতে পারে। তাই কিছুক্ষণ ভেবে বুদ্ধি আসলো এই ড্রেসটাই পরে রুমে যাওয়া যাক। রুমে গিয়ে না হয় ড্রেস চেঞ্জ করা যাবে। তাই শেহরানের শার্ট-প্যান্টটা পরে নিল। প্যান্টটা অবশ্য কোমরে দাঁড়াচ্ছে না। বারবার খুলে পড়ে যাচ্ছে। হাত দিয়ে চেপে ধরে বাইরে আসলো। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই দেখল নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগল মাইরার কাছে। আয়নার মধ্যে তাকিয়ে নিজেই হাসলো নিজেকে দেখে। হাসতে হাসতে চুল ঠিক করতে গিয়ে কোমর থেকে হাত সরাতেই প্যান্টটা খুলে পড়ে গেল।
সেই মুহূর্তে শেহরান রুমে ঢুকেছে। মাইরা প্যান্ট তুলতে গিয়ে সামনে তাকাতেই চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল। “আ” চিল্লিয়ে উঠলো।
শেহরান দৌড়ে এসে খাবারের প্লেটটা ভ্যানিটির ওপর রেখে মাইরার মুখ চেপে ধরল।
“উহু উহু” মাইরা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। শেহরান মাইরার মুখ ছেড়ে দিলো। অন্যদিকে ঘুরে বলল, “এই স্টুপিড, এভাবে চিল্লাচ্ছো কেন? নিচে সবাই শুনলে কি ভাববে?”
-মাইরার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। গালে হাত দিয়ে বলল, “আপনি আপনি রুমে কখন আসলেন?”
শেহরান চোখ ছোট ছোট করে বলল, “রুমেই যখন চেঞ্জ করবা তো রুমের দরজাটা লাগিয়ে দাওনি কেন? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রং ঢং করতে হলে দরজাটা লাগিয়ে করবে।” মাইরা তাড়াহুড়ো করে বিছানার ওপর থেকে ওড়না তুলে শরীর ভালোভাবে ঢেকে নিল। শেহরানের দিকে তাকিয়ে বলল, “তো আপনি কি একবার নক করে আসতে পারেন না?”
শেহরান ভ্রু কুঁচকে বলল, আমার রুমে আমি আসবো তো নক করতে হবে কেন আমাকে। বলতে বলতেই পিছনে ঘুরলো। তখনই আবার মাইরা “আহা” করে চিৎকার করে উঠলো। স্টপ” শেহরানের ধমকে মাইরা চুপ মেরে গেল। শেহরান গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “আমার ড্রেস তোমার কাছে কেন?” মাইরা মিনমিন করে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। শেহরান শুকনো ঢোক গিলে খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওকে, তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে খাবারটা খেয়ে নাও। আমি বাইরে থাকছি।” বলে ব্যালকনির দিকে চলে গেল। মাইরা লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে সোফার উপর থেকে ওর জন্য আনা ব্যাগ থেকে প্লাজো গেঞ্জি নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
—-শেহরান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালো। এই মেয়ের আশেপাশে থাকা যাবে না, থাকলে বিপদ। ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হঠাৎ ওর ফোনটা কেঁপে উঠল। শেহরান প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল রনি ফোন দিয়েছে। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো রনির কণ্ঠ,
“ভাই ইলহাম সিকদার ভাবির খোঁজ খবর নিচ্ছে। শেহরান ভ্রু কুঁচকে বলল, “ভাবি? ভাবি কে?”
-আরে ভাই, আপনার বউ আমাদের কি হয়? ভাবি হয় তো।”
-শেহরান কণ্ঠটা গভীর আর শান্তভাবে বলল, “ভাবি না, আম্মা বলবি।”
-কিন্তু ভাই, আপনি তো আমাদের ভাই। ভাইয়ের বউ তো ভাবি হয়।
-আজ থেকে আমি তোদের ভাই আর আমার বউ তোদের ভাবি, বুঝলি?
-আচ্ছা ভাই।
“হুম।”
“তো ভাই, যে কথাটা বলার জন্য ফোন দিয়েছিলাম।”
“হুম বল।”
“ওরা তো ভাবি… ও সরি, আম্মার পরিবারের খোঁজ নিচ্ছে।”
-শেহরান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে বলল, “নিতে দে। যত খুশি নিক।”
“ওকে ভাই। রনি ফোন রেখে দিল।
-শেহরান ফোনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আপনি সিগারেট খান?”
-শেহরান মাইরার দিকে না তাকিয়ে বলল, “হুম, তো?”
“তো মানে? আহাজারি করে বলল, এ আমার কি সর্বনাশ হলো।”
শেহরান চোখ ছোট ছোট করে মাইরার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। “তোমার সর্বনাশ হলো মানে? কি সর্বনাশ হলো?”
-মামা আমারে কার সাথে বিয়ে দিল! এই লোক তো দেখি মদখোর, সিগারেটখোর।”
-এক্সকিউজ মি, মদখোর কাকে বলছো?
-আপনাকে বলছি, আপনাকে।” শেহরানের দিকে আঙুল তাক করে কথাগুলো বলল মাইরা।
-একদম বাজে বকবে না। যাও এখান থেকে, গেট লস্ট।” বলে শেহরান বিরক্তি নিয়ে আবার পিছনে ঘুরে দাঁড়ালো।
-মাইরা হনহন করে ব্যালকনি থেকে চলে গেল।
মাইরা চলে যেতেই শেহরান একবার মাইরার দিকে ঘুরে বলল, “ডেঞ্জারাস মেয়ে।”
-আবারো দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো। “এমন এক জায়গায় আটকে গেছে যেখান থেকে বেরোতেও পারছে না, কিছু করতেও পারছে না। বিয়ে নামক জিনিসটাই শেহরানের কাছে বরাবরই বিরক্তিকর ছিল। মেয়ে মানুষ হলো বেইমান। ভালোবেসে ভালোবাসা শিখিয়ে হারিয়ে যায়।” অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলো, “এই মেয়েটাকে তো সে দায়িত্ব থেকে বিয়ে করেছে। তাছাড়া তো সে কখনো মাইরাকে ভালোবাসতে পারবে না। এই বিয়েটাই তো এখনো গ্রহণ করতে পারেনি। সেই দিন যদি রফিক মিয়া ওইভাবে না বলতেন, শেহরান হয়তো রাজি হতো না।
-হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা। শেহরান যখন পার্টি অফিস থেকে বাসায় আসছিল, পথের মধ্যেই এক লোক গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
-শেহরান প্রথমে অবশ্য ভেবেছিল টাকার জন্য হবে দাঁড়িয়েছে। তাই রনিকে দিয়ে কিছু টাকা পাঠিয়েছিল।
-রনি টাকাগুলো নিয়ে যেতে লোকটা নাকি বলে তার সাথে কথা বলবে।
-শেহরান গাড়ি থেকে না নেমেই লোকটাকে নিজের কাছে ডাকে। লোকটা আর কেউ নয়, মাইরার মামা। শেহরান লোকটাকে দেখে প্রথমে অবশ্য চিনতে পারেনি। যখন পরিচয় দিল তখন শেহরান চিনেছে। শেহরান রফিক মিয়াকে নিজের গাড়িতে উঠতে বলল। রফিক মিয়া গাড়িতে উঠতেই রনি গাড়িটি নির্জন এলাকার দিকে নিয়ে আসলো।
-শেহরান রফিক মিয়াকে নিয়ে নেমে পড়ল। একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নীরবতার পরে রফিক মিয়া শেহরানের দিকে তাঁকিয়ে বললেন, বাবা, তুমি আমাকে চেনো না? আমি তোমাকে চিনি এলাকার এমপি হিসেবে। পরে যখন জানতে পারি তুমি শাহানার ছেলে, তখন বেশ অবাক হয়েছি। শাহানা যখন আমার ভাগ্নির সাথে তোমার বিয়ের কথা বলল।
-শেহরানের ভ্রু কুঁচকে গেল। “বিয়ে? কার বিয়ে আর কিসের বিয়ে?” রফিক মিয়া একটু ইতস্তত করে বললেন, “শাহানা কালকে আমার বাসায় গিয়েছিল। আমার ভাগ্নির সাথে তার বড় ছেলের বিয়ের জন্য।”
“হোয়াট? কি বলছেন আপনি এসব?”
“হ্যাঁ বাবা, আমি ঠিকই বলছি।” শেহরান একটু শান্ত হলো। ভাবল ওর মা তো প্রায় প্রায়ই বিয়ে নিয়ে আসে। এইটাও হয়তো সেরকমই। তাই তেমন গুরুত্ব দিলো না। রফিক মিয়া আবার বলা শুরু করলেন, “তুমি আমার ছেলের মতো। বাপ, তুমি আমার একটা কথা রাখবা?”
-শেহরান রফিক মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “জি বলেন আংকেল। রাখার মতো হলে অবশ্যই চেষ্টা করব।”
-রফিক মিয়া শেহরানের হাত চেপে ধরে বললেন, “বাপ, তুমি আমার ভাগ্নিকে বিয়ে করে নাও।”
-কি? অসম্ভব আংকেল। আপনি অন্য কিছু বলেন, কিন্তু এটা বলবেন না। এটা আমি পারবো না।”
-রফিক মিয়া মাথাটা নত করে বললেন, “বাপ, তুমি এটা বলো না। বিপদে আছি আমার ভাগ্নিকে নিয়ে। ওর মামী ওকে বিয়ে দিয়ে দেবে। একটা বয়স্ক লোকের সাথে, যার আগে দুই তিনটা বাচ্চা আছে। এখন আমার বলার মতো কোনো রাস্তা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তোমার মা বলেছে এই বিয়ে হলে ওর মামীকে অনেক টাকা দেবে।”
“ছি আংকেল, কিছু টাকার জন্য নিজের ভাগ্নিকে?”
“বাপ, তুমি আমাকে ভুল বুঝতে পারো। কিন্তু আমার পরিস্থিতি তুমি বুঝবে না। তুমি আমার এই কথাটা রাখো।”
“আংকেল শুনেন, আমি আপনাকে অনেক টাকা দিব। তাও আমি এই বিয়ে করতে পারব না।”
“বাবা, আমার কাছে টাকাটা বড় নয়, আমার ভাগ্নির জীবনটা বড়।”
“আচ্ছা আংকেল, আজ আসি।” শেহরান আর কোনো কথা বলল না। রফিক মিয়া অসহায় দৃষ্টিতে শেহরানের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“শুনুন, আপনি রুমে আসতে পারেন।”
-মাইরার কথা শুনে শেহরানের ধ্যান ভাঙল। পিছনে না ফিরেই বলল হয়ে গেছে?
-হুম। আপনি খাবেন না?
-শেহরান গম্ভীর অথচ শান্ত কন্ঠে বলল না। পিছনে ফিরতেই অবাক হয়ে গেল। মাইরা একটা পিংক কালারের প্লাজো আর গেঞ্জি সেট করেছে। দেখতে একদম বাচ্চা বাচ্চা লাগছে। এতেই যেন শেহরানের বিরক্তি আরো বেড়ে গেল। ভ্রু কুচকে রুমের মধ্যে এগিয়ে গেল।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৪
-মাইরা বিছানার এক কোণে বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ল।কিছুক্ষণের মধ্যে এই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
-শেহরান বিছানার অপর পাশে কিছুক্ষণ বসে রইল। যখনই বুঝলো মাইরা ঘুমিয়ে পড়েছে।
-পিছনে ফিরে দেখল, এলোমেলো ভাবে ঘুমিয়ে। প্লাজু হাটু থেকে একটু উপরে উঠে গেছে। প্লাজোটা হাঁটু থেকে একটু উপরে উঠে গিয়েছে। এক ঝলক দেখেই শেহরান দৃষ্টি সরিয়ে নিল। অস্বস্তিতে গলা খাঁকারি দিয়ে আলমারি থেকে একটা চাদর বের করল। তারপরে ধীরপায়ে মাইরার দিকে এগিয়ে গেল। একটু ঝুঁকে চাদরটা মেলে আস্তে করে মাইরার শরীরটা ঢেকে দিতে গেল
-অমনি মাইরা চোখ মেলে তাকিয়ে চিল্লিয়ে উঠল। আআআআআআআ
