Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৬

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৬

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৬
সেঁজুতি আক্তার

-আআআ
-শেহরান চমকে পিছিয়ে গেল। মাইরা তাড়াহুড়ো করে উঠে বসল।
“এই, আপনি কী করছিলেন?”
-এই স্টুপিড ! কী করছিলাম মানে?
– “আপনি আমার ঘুমের সুযোগ নিচ্ছিলেন! ভাগ্যিস আমি ঘুমাইনি, না হলে কী হয়ে যেত, মাইরা ওড়না দিয়ে শরীর ভালো করে পেঁচিয়ে উঠে বসল।
– শেহরান ভ্রু কুঁচকে মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, “হোয়াট? কীসব আবোল-তাবোল বলছো? আমি তো জাস্ট চাদরটা মেলে দিচ্ছিলাম।”

– মাইরা চোখ ছোট ছোট করে বলল, “সত্যি?”
– “হুম।” শেহরান মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার মতো পিচ্চির প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। বুঝেছো? আর তোমাকে এই রুমে থাকতে দিয়েছি, তোমার ভাগ্য ভালো। কাল থেকে তুমি আর এই রুমে থাকবেনা ওকে। শেহরান হনহন করে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
– মাইরা শেহরানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “একে তো নিজে দোষ করবে, আর কিছু বলতে গেলেই ‘স্টুপিড’! অসভ্য লোক কোথাকার! একে তো আর এমনি-এমনি ‘খাটাশ’ বলি না। ম্যানারলেস কোথাকার! আমাকে নাকি রুম থেকে বের করবে? করাচ্ছি বের! এই রুম থেকে আমি এক চুলও নড়ব না। দেখি কী করে আমাকে বের করে।” হুম…
মাইরা আবার শুয়ে পড়ল। এবার চাদরটা গায়ে ভালোভাবে পেঁচিয়ে শুয়ে রইল।

– শেহরান ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখল মাইরা ঘুমিয়ে গেছে। এবার আর ওইদিকে গেল না। বিছানার এক সাইডে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরেই শেহরানও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
সকাল সাতটা
শেহরান চোখ বুজেই অনুভব করল ওর পেটের ওপরে ভারী কিছু ওকে পেঁচিয়ে রেখেছে। বিরক্তি নিয়ে চোখ মেলে দেখল। মাইরা এক পা আর এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। মাইরার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, গভীর ঘুমে আছে। তাই হাতটা আস্তে করে সরিয়ে দিল। তারপর পা-টা সরাতে গিয়েই আবার মাইরা জড়িয়ে ধরল।
শেহরান অস্বস্তি নিয়ে মাইরার মাথায় হাত দিয়ে ডাকতে লাগল। “এই, এই মাইরা… মাইরা।”
পিটপিট করে তাকিয়ে দেখল, শেহরান ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।

– “কী ব্যাপার? আপনি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? আবার আপনার মতলব কী?”
– “আবার শুরু হয়ে গেছে।” শেহরান বিরক্তি নিয়ে বলল, “পা-টা সরাও মাইরা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। তাড়াহুড়ো করে পা সরিয়ে ফেলল। উঠে বসে বলল, “সরি, সরি।”
– শেহরান বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। কিছু না বলেই ওয়াশরুমে চলে গেল।
– মাইরা ভ্রু কুঁচকে শেহরানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “ব্যাপারটা কী হলো? আজ এমন শান্ত কেন?”
মাইরার ভাবনার মাঝেই খট করে ওয়াশরুমের দরজা খুলে শেহরান বেরিয়ে আসলো। মাইরা বসে বসে শেহরানের কার্যক্রম দেখতে লাগল।
– শেহরান আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলেই হতবাক! সামনেই ঝুলছে মাইরার দুই-তিনটা ইনার।
শেহরান বিছানায় বসা মাইরার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চাইল।
মাইরা গোল গোল চোখে শেহরানের দিকেই তাকিয়ে হঠাৎ আলমারির কথা মনে পড়ল। চোখ বড় বড় করে দাঁত দিয়ে জিভ কাটল। কালকেই তো ওইখানে তিনটা ইনার রেখেছিল। ভাবতেই গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। শেহরানের দিকে তাকিয়ে “হে হে” করে হেসে বিছানা থেকে নেমে গুটিসুটি পায়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।

“এই রুমে আর এক মিনিটও থাকা যাবে না। না হলে লজ্জায় মরে যেতে হবে।”
– শেহরান ভ্রু কুঁচকে মাইরার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। “এই মেয়েটা আস্ত একটা পাগল। এর সাথে থাকলে নিজেও পাগল হয়ে যাবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইনারগুলো এক সাইডে রেখে, নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
মাইরা করিডর দিয়ে দৌড়ে এসে রান্নাঘরে ঢুকল।
“আজ সারাদিন আর ওই খাটাশ লোকের সামনে যাওয়া যাবে না। গেলে হয়তো ওই লোক আমায় চিবিয়ে খাবে। কী করছেন, আম্মু?”
শাহানা বেগম পরোটা ভাজছিলেন। হঠাৎ মাইরার কণ্ঠ শুনে পেছনে তাকালেন “আরে মাইরা, এত সকালে এখানে?”
মাইরা একটু ইতস্তত করে বলল, “কী করতে হবে আমাকে বলুন, আমি করে দিচ্ছি।”
শাহানা বেগম তীক্ষ্ণ চোখে মাইরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাকে কিছু করতে হবে না। সব হয়ে গেছে, এটুকু আমিই করে নিব। তুমি তোমার শ্বশুরকে এই চায়ের কাপটা দিয়ে এসো। দেখো, রুমে আছে।”

মাইরা মুচকি হেসে এগিয়ে গেল। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে দরজা পর্যন্ত পা দিতেই শাহানা বেগম বললেন, “শেহরান উঠেছে?”
মাইরা পেছনে ফিরে বলল, “হুম, আম্মু। একটু আগেই উঠল।”
শাহানা বেগম গ্যাসের আঁচটা একটু কমিয়ে মাইরার নিকটে এগিয়ে আসলেন। মাইরার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, “তোমাদের মধ্যে সবকিছু ঠিক আছে তো? আমার ছেলে কি তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে?”
মাইরা কিছুখন শান্ত থেকে মুচকি হেসে বলল, “না, আম্মু। আমার সাথে কোনো রকম খারাপ ব্যবহার করেন না।”
– শাহানা বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “আচ্ছা, চা-টা দিয়ে এসো তাড়াতাড়ি।”
মাইরা মাথা নাড়িয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শ্বশুরের রুমের সামনে এসে বলল, “আসব, বাবা?”

-রায়হান মির্জা ব্যালকনিতে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। এটা তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। ব্যালকনির সকালের মিষ্টি বাতাস তাঁর নাকি ভালো লাগে। তাই রোজ এখানেই বসে খবরেরকাগজ পড়েন।
মাইরার কণ্ঠ পেয়ে রায়হান মির্জা খবরের কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে বললেন, “আরে মাইরা মা, এসো। ভেতরে এসো।”
মাইরা মুচকি হেসে রুমের ভেতর প্রবেশ করে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গেল।
“বাবা, আপনার চা।”
রায়হান মির্জা মুচকি হেসে মাইরার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে চুমুক দিলেন। মাইরা চলে যেতে নিলেই রায়হান মির্জা তার পাশে বসতে বললেন। মাইরা ইতস্তত নিয়ে পাশে রাখা চেয়ারে বসল।
– “চা কে বানিয়েছে?”
– “কেন, বাবা? ভালো হয়নি? এটা তো আম্মু আমাকে বলল আপনাকে দিয়ে আসতে।”
রায়হান মির্জা “হা হা” করে হেসে উঠলেন। বললেন, “সেই জন্যই তো বললাম, চা কে বানিয়েছে। বুঝলে মাইরা, তোমার শাশুড়ির হাতের চা খুব সুন্দর। হাতের রান্নাটাও বেশ সুস্বাদু হয়। এ বিষয়ে তুমি কী বলো?”

-মাইরা হেসে বলল, “জি, বাবা।”
– “আমার সেই গম্ভীর ছেলে উঠেছে?”
– “জি, বাবা।”
– রায়হান মির্জা শান্ত কন্ঠে বললেন, “জানো মা, আমার ছেলেটা না, এমন ছিল না।”
-শ্বশুরের কথা শুনে মাইরা একটু অবাক হলো। কেমন ছিলো বাবা?
-দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন হঠাৎ কিছু বছর ধরে এমন রাগী, গম্ভীর, বদমেজাজি হয়ে গেছে। কিছু বছর আগেও বেশ প্রাণবন্ত ছিল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন
একদিন এসে বলে, ‘বাবা, আমি রাজনীতি করব।’ সেদিন তো আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম। কারণ আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল বিজনেস করা। কিন্তু হঠাৎ রাজনীতিতে ঢোকা নিয়ে আমার বেশ আপত্তি ছিল। এই নিয়ে আমাদের বাবা-ছেলের মধ্যে অনেক কোলাহল হয়েছে।

-মাইরা অবাক হয়ে বলল তারপরে?
তারপরে আর কি! যখন দেখলাম এর পেছনে ওর পরিশ্রম, তখন আস্তে আস্তে নিজেকে বোঝালাম। ও যেটা চায়, সেটাই করুক।”
কিছুক্ষণ থামলেন রায়হান মির্জা। তারপর আবার বলা শুরু করলেন, “আমরা আমাদের ছেলের এমন আচরণে খুবই টেনশনে আছি। দিন দিন ও যেন নিজের ভেতরেই গুটিয়ে যাচ্ছে। বাবা-মা হয়ে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে বলো?”
-মাইরার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
রায়হান মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন তারপরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বললেন জানো,মা তোমার মধ্যে যে প্রাণচাঞ্চল্য আছে, সেটাই আমাদের ভরসা। ভেবেছিলাম, হয়তো তোমার সঙ্গ পেলে ছেলেটা আবার আগের মতো হবে।
-মাইরা অবাক দৃষ্টিতে শ্বশুরের দিকে তাকালো।

রায়হান মির্জা আস্তে করে মাইরার হাতের ওপর নিজের হাত রাখলেন।” আমার একটা কথা রাখবে মা?
আমার ছেলেকে কখনো একা রেখে কোথাও যেও না। ও এমনি গম্ভীর, রাগী; কিন্তু মনটা ভীষণ নরম। আমি ওর বাবা, আমি বুঝি ওর ভেতরে এমন একটা ক্ষত আছে, যা আমরা চোখে দেখতে পাই না। তুমি চেষ্টা করো মা, ওকে আবার স্বাভাবিক করে তুলতে।”
কথাগুলো শুনে মাইরার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। মনে মনে ভাবল,

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৫

“কী এমন ঘটেছিল, যার জন্য এত প্রাণবন্ত একটা মানুষ এতটা বদলে গেছে। শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“অবশ্যই, বাবা। আমি চেষ্টা করব।”
হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে ভেসে এলো পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ—
“আসব, বাবা?”

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৭