ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৮
বৃষ্টি শেখ
সন্ধ্যে বেলায় পড়তে বসেছে মৃত্তিকা। ইরহাম এই ভর সন্ধ্যায় ঘুমিয়েছে। মেহমেত ভাই গিয়েছে দোকানে আড্ডা দিতে। পড়ার মাঝে বাহির থেকে আগত চিৎকার চেঁচামিচি শুনে ছলকে ওঠে মৃত্তিকার হৃদয়। টেবিল ছেড়ে বই নিয়ে ছুটে যায় বেলকনিতে। তাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরের রাস্তায় গোলমাল হচ্ছে। প্রচুর ভিড় জমেছে সেখানে। আফিমের তীব্র কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে । মৃত্তিকা ফোঁস করে শ্বাস টেনে বেলকনির দটজা লাগিয়ে দেয়। হতাশ হয়ে বলে,
“- এই পাগলকে আবার কে ক্ষেপিয়ে দিল”?
মেহমেত বাড়ি ফিরল রাত করে। ইরহামের সাথে জাহানারাও ঘুমিয়েছে। মেহমেত ফিরলে তার খাবারটা গরম করে দিল মৃত্তিকা। কারেন্ট চলে গেল তখনই। ঘর থেকে হাত পাখা এনে বাতাস করতে লাগল ভাইকে। খেতে খেতেই মেহমেত বলল,
“- কে যেন একটা বাচ্চা ছেলের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। এই বিচার চেয়ে রাস্তায় বসে আছে আফিম আর তার দলবল। আফিমকে চিনিস”?
মৃত্তিকার দিকে চেয়ে কথাটা বলল মেহমেত। মৃত্তিকা বলল,
“- চিনি”।
“- বখাটে ছেলে। কোনো কাজ কাম নেই। সারাদিন মারামারি করবে, আর অন্যদের বিরক্ত করবে। কার না কার ছেলের মাথা ফেটেছে, এই অভিযোগ জানিয়ে রাস্তায় বসে আছে। গাড়ি চলাচল করতে দিচ্ছে না। যে লোক বাচ্চাটাকে মেরেছে সে আবার ধনী লোক বুঝলি? মনে হয় পুলিশের কাছে গিয়ে মামলা ঠুকে দিয়েছে। পুলিশ দেখলাম ওকে আর ওর বন্ধুদের ধরে নিয়ে গেল।”
শেষের কথাটায় আঁতকে ওঠে মৃত্তিকা। জবান বন্ধ হয়ে যায় ওর। আফিমকে পুলিশে ধরেছে। এখন সে জেলখানায় বন্দি? মৃত্তিকা ভাইয়ের থেকে আরো কথা শুনতে চায়। জিজ্ঞেস করে,
“- আফিম মানে ওই ছেলেটা তো অনেক ধনী। বোধহয় ছাড়া পেয়ে যাবে”।
হাসে মেহমেত। গোস্তর হাড্ডি চিবিয়ে গুড়ো করে অন্য প্লেটে ফেলে। বলে,
“- হ ওর বাবা আশরাফ মির্জা ধনী মানুষ। আফিম মানে ওই বখাটে ওর বাপের ধার ধারে না তো। বাপের কথাই শোনে না। বাপ উচ্চবিত্ত, বিখ্যাত মানুষ, তার সুনাম শহর জুড়ে। আর ছেলে, ছেলে হয়েছে কুখ্যাত। আশরাফ মির্জা মনে হয় না পুলিশ স্টেশনে ঢুকবে। মান-সম্মানের একটা ব্যাপার-স্যাপার আছে না? ছেলে বারবার মারামারি করে জেলে ঢুকবে, বারবার ছাড়াতে যাবে? আর আফিম ওর বাপের সাহায্য নেবে না। এক এলাকায় আছি তো, চিনি ছেলেটাকে। যদি আশরাফ মির্জার পরিচয় নিয়ে বিচার চাইতো, ঠিকই পেতো। পুলিশও সম্মান দিতো। বখাটে হয়ে বিচার চেয়েছে, পাবে না”।
মৃত্তিকার না চাইতেও মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটা অতটাও খারাপ না, আবার খারাপও। কোনো এক বাচ্চার জন্যই আফিম কারাগারে বন্দী। কিন্তু কোন বাচ্চা? কেনই বা মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে ছেলেটার? মেহমেত নিজেই সেই প্রশ্নের উত্তর দিল। নিজে থেকেই বলল,
“- একটা ছেলে আছে এলাকায়। নাম মনে হয় সুমন। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল সাইকেল চালিয়ে। এক ধনী লোকের গাড়ি ওর সাইকেলটাকে ধাক্কা দিয়েছে। সেভাবে আঘাত পায়নি তখন। ধাক্কা খেয়ে ইটের উপর পরেছে। মাথা ফেটে দু ভাগ হয়ে গেছে প্রায়। অনেক টাকা লাগবে, এত টাকা পাবে কই? পেলেও ছেলেটা যে কষ্ট পেল, এর দায়ভার ওই গাড়িওয়ালা নেবে? আফিম ঠিকই করেছে। কিন্তু এত বড় লোকের সাথে টক্কর দেয়া ঠিক হয় নাই”।
মৃত্তিকা সবটা বুঝতে পারে। এবারে তার মনটা দ্বিগুণ খারাপ হয়ে যায়। সারা রাত আর ঘুম আসে না মেয়েটার, প্রচণ্ড অস্থির লাগে। বিচার চাইতে গিয়ে আফিম কারাগারে ঢুকল?, কি করছে ছেলেটা? গজগজ করতে করতে পুলিশকে গালি দিচ্ছে নাকি ঠাণ্ডা মাথায় জেলের শিকল গুলোয় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে?
খুব সকালে মৃত্তিকা তৈরি হয়ে নিল। সকালে সে ইলিশ মাছ রেঁধেছিল। কয়েক পিস বেশিই রেঁধেছিল। ওর ইচ্ছে হয়েছে আফিমের সাথে দেখা করার। বেশ কয়েকবার তাকে বাঁচিয়েছে আফিম। ইয়াসিনের হাত থেকে দু বার বাঁচিয়েছে, বিভিন্ন ভাবে সাহায্য-সহযোগীতাও করেছে। মৃত্তিকা তো বেশি কিছুই করবে না। রান্না করা খাবারগুলো নিয়ে কনস্টেবল কে দিয়ে বলবে আফিমদের দিয়ে দিতে। কেউ জানবে না এসব। গোপনে এটুকু দয়া করবে আফিমকে।
খুব লুকিয়ে চুরিয়ে বেরিয়ে পরে মৃত্তিকা। বড় একটা টিফিন বক্সের তিনটি বাটিতে ভরে ভরে ভাত নিয়েছে সে। আর একটায় তরকারি নিয়েছে। প্রথমবার পুলিশ স্টেশনে ঢুকে মৃত্তিকার হাত পা কাঁপছিল থরথর করে। একজন কনস্টেবলকে আফিমের কথা বলতেই সে থানার এস আই কে জানায়। মৃত্তিকা এস আই কে জানায় সে আফিমের বাড়ির লোক। কিছু খাবার দিতে এসেছে। খাবারটা ওকে দিয়ে দিলেই মৃত্তিকা চলে যাবে।
কনস্টেবলের হাতে খাবার ধরিয়ে দেয় মৃত্তিকা। কনস্টেবল খাবার নিয়ে সেলে যায়। আফিমের সাথে তার কি কথা হয় জানে না মৃত্তিকা। সে একটি বেঞ্চে বসে থাকে। কনস্টেবল ফিরে আসে টিফিনবাক্স হাতে নিয়ে। বলে,
“- ওরা খেতে চাইছে না”।
মৃত্তিকা আহত হয়। ছেলেটা এত ঘাড়ত্যাড়া কেন? সারা রাত ধরে জেলে আছে, নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। বড়লোক ঘরের ছেলে, সেলের খাবার কি তার মুখে রুচবে? মৃত্তিকা এস আই কে অনুরোধ করে আফিমের সাথে দেখা করতে দেবার জন্য। এস আই অনুমতি দিলে ধীর পায়ে সে এগিয়ে যায় সেলের দিকে। তিন নম্বর সেলে আফিম বসে আছে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। পরনে গতকালকের সেই কালো পাঞ্জাবি। লোকটাকে বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। রূপক, শান্ত, রায়ান মনমরা হয়ে বসে আছে। মৃত্তিকার অজানা কারণে বুক কেঁপে ওঠে। ধীর কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
“- আফিম”।
চোখ বুজে ছিল ছেলেটা। মৃত্তিকার গলা শুনেও তাকায় না সে। বিড়বিড় করে বলে,
“- ধুরর, এই মেয়েটা মাথা থেকে যাচ্ছেই না। এখন ওর কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি ছ্যাহ্”।
তার কথা শুনতে পায় না মৃত্তিকা। তবে রূপক, রায়ান শান্ত মৃত্তিকাকে দেখে এতটাই চমকে যায় যে একে অপরের দিকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে ইশারায় বোঝায় “ আমি যা দেখি, তোরাও কি তাই দেখিস”? ওদের ভড়কে যাওয়া দেখে বিব্রত হয় মৃত্তিকা। আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়ায়। রায়ান আফিমকে কনুই দিয়ে গুঁতা দেয়। বলে,
“- আফিম, মৃত্তিকা এসেছে”।
সাথে সাথে চোখ মেলে আফিম। মৃত্তিকাকে সেলের ওপ্রান্তে দেখে বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে রয়। উঠে এসে সেলের শিকল চেপে ধরে বলে,
“- তুমি এখানে কি করছো মৃত্ত”?
আবারও সেই ডাক। চোটপাট করতে গিয়েও থামে মৃত্তিকা। বলে,
“- আপনার জন্য খাবার পাঠিয়েছিলাম, আপনি ফিরিয়ে দিয়েছেন কেন”?
শিশুসুলভ ভঙ্গি মৃত্তিকার। আফিম বলে,
“- আমি ভেবেছি আশরাফ মির্জা কাউকে দিয়ে খাবার পাঠিয়েছে”।
“- সে পাঠালে খাবেন না? আপনি আপনার বাবাকে জানাচ্ছেন না কেন? জানালেই তো সে আপনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়”।
আফিম ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। বলে,
“- ওরা আমাকে এমনিতেই ছেড়ে দেবে। কতক্ষণ আটকে রাখতে পারে আমিও দেখবো। বাবা যদি আসে, আর ওরা আমাকে ছেড়ে দেয় তবে আমার নিজস্বতা রইল কই? আমি ক্ষমতার দাপট দেখাতে আসিনি, বিচার চাইতে এসেছি। ওই ছোট বাচ্চার বাবা-মার চোখের পানির হিসেব নিতে এসেছি”।
“- আপনার বাবা আসেননি দেখা করতে”?
“- না, আমি যতক্ষণ না বলবো ততক্ষণ আসবে না। বাবা জানে তার দয়া আমার প্রয়োজন হয় না”।
একটি মহিলা গার্ড খাবারটা ঢুকিয়ে ফের তালা দেয় সেলে। আফিম দুর্বল চোখে তাকায় মৃত্তিকার দিকে। মেয়েটাকে এখানে দেখে বড্ড ভালো লাগছে আফিমের। সুখকর অনুভূতি জাপটে ধরেছে। নত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মৃত্তিকা। বলার মতো কিছুই পেল না। আফিম কিছুটা শান্ত কণ্ঠে বলল,
“- আমার একটা কথা রাখবে মৃত্ত”?
মৃত্তিকার গা শিউড়ে ওঠে। আফিমকে তো এতটা দুর্বল মনে হয়নি। তার কথার ঝংকারটা কোথায়? মৃত্তিকা সম্মতি জানালে আফিম বলে,
“- সুমন হাসপাতালে ভর্তি। ওর অবস্থা কেমন, জানতে ইচ্ছে করছে। তুমি একটু হাসপাতালে গিয়ে দেখে আসবে ওকে? অপারেশন ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা, জানা দরকার”।
এক মুহুর্তের জন্য আফিমকে একটা আবেগি মানুষ মনে হলো মৃত্তিকার। তার হৃদয় বুঝি ওই ছোট ছেলেটার জন্য কাঁদছে? এখানে বন্দী অবস্থায় থাকার পরও ছেলেটার হেলদোল নেই, নিজেকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করবার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন নেই, তার মনে চিন্তা ওই বাচ্চাটার জন্য। মৃত্তিকার চোখ ছলছল করে ওঠে। আফিমের এই রূপ তার অজানা। এক আফিম বহু রুপে, বহু ভাবে মৃত্তিকার সামনে এসেছে। মৃত্তিকা মলিন হেসে বলে,
“- আপনারা খাবারটা খান। আমি হাসপাতালে যাবো এখনই।”
শান্ত আর বাকিরা খেতে শুরু করেছে। মৃত্তিকা ওদের দিকে চেয়ে খুব আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে ওঠে,
“- আপনাদের মুক্ত করবো। আমাকে একটু সময় দিন”।
দাঁড়াল না মৃত্তিকা। চলে এলো দ্রুত। মৃত্তিকার একটি ক্লাসমেট আছে। তার ভাই একজন সাংবাদিক। শহরের আশি শতাংশ মানুষ জানে না ঠিক কি কারণে আফিম রাস্তায় অবরোধ করে বসেছিল, কেন রাস্তা আটকে পথচারীদের কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল। কারণটা যদি সামনে আসে, নিশ্চয়ই সবাই আফিমকে ভালো ছেলে বলেই সংজ্ঞায়িত করবে। আফিমকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় বাকিরাও রুখে দাঁড়াবে।
মৃত্তিকা তার বন্ধু জামিলের থেকে তার ভাই জিহাদের নম্বর নেয়। টুকটাক কথা বলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। সুমন নামের ছেলেটার অপারেশন শেষ। তাকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে ছেলেটা। অপারেশনের ঝুঁকি ছিল, এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তাররা বলেছে অ্যাক্সিডেন্টটা সুমনের ব্রেইনে ইফেক্ট ফেলতে পারে।
করিডোরে সুমনের বাবা-মায়ের সাথে দেখা হয় মৃত্তিকার। মৃত্তিকা যখন জানায় সে আফিমের লোক, তখন ওরা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। জড়িয়ে ধরে মৃত্তিকাকে। ক্রন্দনরত কণ্ঠে সুমনের মা বলে ওঠে,
“- পোলাডা আমার সুমনের জন্য বিচার চাইছে দেইখা পুলিশ হ্যারে ধইরা নিয়া গেছে। এহন কেরা আমার পোলার জন্যে আওয়াজ তুলবো। ভালো মানুষরে কেউ ভালো থাকতে দেয় না”।
মৃত্তিকা মহিলাকে শান্ত করে বলে,
“- ঠিক কিভাবে কি হয়েছিল, আফিম আপনাদের জন্য কতটা কি করেছিল সবটা আমাদের বলবেন। ক্যামেরায় রেকর্ড করে টিভিতে প্রচার করা হবে। তবেই আফিম মির্জাকে মুক্ত করতে পারবো আমরা”।
কথামতো কাজ হলো। কান্নাকাটি করে সুমনের বাবা-মা জবানবন্দি দিল। ক্যামেরায় সবকিছু রেকর্ড করে নিল জিহাদ। প্রথমে স্যোশাল সাইটে গুলোতে ভিডিওটি ছেড়ে দেয়া হয়। পরপর টিভিতেও কাস্ট করা হয়। সবটা এত সহজে হবে ভাবতে পারেনি মৃত্তিকা। তবে এসবে সবচে বড় ভূমিকা রাখল আফিমের বন্ধুরা, যাদের পুলিশ অ্যারেস্ট করেনি।
আফিমের বন্ধুরা লোক জড়ো করে ফেলে। শহরের যেসব মানুষ আফিমকে সহ্য করতে পারতো না, তারাও এগিয়ে আসে মিছিলে। দলবদ্ধ হয়ে অনেকেই ছুটে যায় থানার দিকে। টিভি, নেট দুনিয়ায় এই বিস্ময়কর ঘটনা ছড়িয়ে গেল মুহুর্তেই। আশরাফ মির্জার ছেলে বলে সকলে যেন এ তথ্যটা আরো ভালো ভাবে গ্রহণ করে নিল। শহরের সব ছেলে আফিমের জন্য এগিয়ে বসে। সারা দুপুর থানার সামনে বসে থাকে ওরা। সাংবাদিকদের দেখে মৃত্তিকা লুকায় নিজেকে। বাড়ি চলে আসে। বাড়ির কেউ যদি জানে মৃত্তিকা এসব করেছে, নির্ঘাত মারবে ওকে। এসবে জড়িয়ে যেতে চায়নি মৃত্তিকা। তবে আফিমকে বিনা দোষে হাজতে দেখে মনও মানেনি।
ধনী লোকটির নাম জমরুল হোসেন। ক্ষমতা খাটিয়ে পুলিশকে নিজ হাতে রেখে আফিমকে অ্যারেস্ট করার জন্য অনেক টাকা দিয়েছে পুলিশকে। তাই তো রিস্ক থাকা সত্বেও আফিমকে ধরেছিল পুলিশ। সারা দিন থানার সামনে শত শত লোক বসে ছিল। টিভিতে প্রচার হওয়ায় উপর মহলেও পৌঁছে গেছে খবরটি। জমরুলকে অ্যারেস্ট করে আফিম ও তার বন্ধুদের ছেড়ে দেয়ার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে। মৃত্তিকা দুপুরে বাড়ি ফিরে আর যায়নি ওদিকে। সে মেয়ে মানুষ, রাত অবধি বাহিরে থাকা একদমই মানায় না। ঘরে বসেই টিভি চালিয়ে সবটা দেখছে সে। মৃত্তিকার বাবা-মা, মেহমেত সবাই পুরো সময়টা টিভিতে নজর রেখেছে। আফিমকে ছেড়ে দেওয়ায় শহরে হই হুল্লোড় পরে গেছে। বাহিরে বাজি ফুটছে, বক্স বাজছে। আফিমের ছেলেপেলেদের আনন্দের শেষ নেই।
রাত বেড়ে যাওয়ায় ঘরে ফেরে মৃত্তিকা। ধুলোবালিতে মুখ আর চুল নষ্ট হয়ে গেছে বলে এই রাতেও গোসল করে মৃত্তিকা। গামছা দিয়ে চুল ঝাড়া দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই টেবিলের উপর থেকে তার ফোনটা বেজে ওঠে। নাম্বারটা পরিচিত মনে হয় মৃত্তিকার। কল ধরে ওপাশের মানুষটিকে সালাম জানায় মৃত্তিকা। সালামের উত্তর দিয়ে আফিম বলে ওঠে,
“- বাইরে বের হও তো”।
মৃত্তিকা তব্দা খেয়ে বলে,
“- আপনি কোথায়”?
“- তোমাদের ফ্ল্যাটের সামনে”।
“- এখানে কি করছেন? বাড়ি যান, রেস্ট নিন”।
“- তোমাকে দেখতে এসেছি মৃত্ত। একটুখানি দেখা দাও, চোখ দুটোকে প্রশান্তি দাও”।
মৃত্তিকার দেহ কেঁপে ওঠে। লোমকূপ খাড়া হয়ে ওঠে। আফিম এসব কি বলছে? কেনই বা বলছে?, কঠোর হয়ে মৃত্তিকা জবাব দেয়,
“- আমি কোথাও যাবো না। আপনি বাড়ি ফিরে যান”।
“- তোমাকে না দেখে আমি যাবো না মৃত্ত। এখানেই সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকবো। আমি জানি আমি কষ্ট পেলে তুমি সুখ পাও না”।
“- এসব কি ধরণের কথা বলছেন? ধন্যবাদ জানাতে এসেছেন তো? অন্য একদিন দেখা হবে। দয়া করে বাড়ির সামনে থেকে সরে যান। কেউ দেখে ফেললে খারাপ ভাববে”।
“- ধন্যবাদ দিতে আসিনি মৃত্ত, ভালোবাসা দিতে এসেছি। গ্রহণ করবে”?
এক লহমায় উত্তপ্ত দেহ শীতল হয়ে আসে মৃত্তিকার। অজানা আতঙ্কে বুকে রক্তক্ষরণ হয়। রেগে গিয়ে মৃত্তিকা বলে,
“- আপনার সাথে আমি কোনো কথা বলতে চাই না। দয়া করে আমার থেকে দূরে থাকুন। আল্লাহর দোহাই লাগে, এসব কথা মুখে আনবেন না”।
“- তোমাকে ছাড়া আমার পাগল পাগল লাগছে মৃত্ত। যতক্ষণ না দেখছি, ততক্ষণ প্রান জুড়াবে না। একটুখানি দেখা দাও”।
মৃত্তিকা খট করে কলটা কেটে দিল। গা এখনও কাঁপছে ওর। বেলকনির পর্দা ঠেলে সে তাকায় রাস্তার দিকে। আফিম দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দিচ্ছে এদিকে। ভয়ানক বিপদে পরে গেল মৃত্তিকা। আফিম তার বন্ধুদের ছেড়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে, মানুস কি বলবে? কেউ বিষয়টা আচ করতে পারলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। মেহমেহ ভাই এসব টের পেলে মৃত্তিকাকে হয়তো বা বাড়ি থেকেই বের করে দেবে। কিন্তু আফিমও তো নাছোরবান্দা, ঘাড়ত্যাড়া। এক ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, সরে যাওয়ার নামগন্ধ নেই। মৃত্তিকা আড়াল থেকে ছেলেটাকে দেখে। এত দূর থেকেও আফিম মৃত্তিকার ছটফটে স্বভাব টের পায়। বেলকনিতে মানবীর ছায়া দেখে টেক্সট করে মৃত্তিকার ফোনে। লিখে,
“- আমি জানি তুমি ঘুমাওনি। এখনই আসবে? নাকি আমি আসবো?”
মৃত্তিকা টেক্সটটা দেখে ভয় পায় খুব। আফিমকে সাহায্য করে সে নিজেই বিপদে পরে গেছে। এই লোক কবে তার পিছু ছাড়বে, কবে মুক্তি মিলবে মৃত্তিকার?, কেউ যদি দেখে ফেলে? আবার না গেলে আফিমও চলে আসবে। ওর উপর একদমই বিশ্বাস নেই মৃত্তিকার।
ভাবতে ভাবতে মাথা ধরে মৃত্তিকার। আফিমকে মেসেজ দিয়ে বলে,
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭
“- আজ না, কাল দেখা করবো। প্লিজ আজ চলে যান”।
আফিম মেসেজ পেয়ে গা দুলিয়ে হাসে। ফিরতি মেসেজ পাঠিয়ে বলে,
“- কথার খেলাপ করবে না মৃত্ত। চলে যাচ্ছি ঠিকই৷ একেবারের জন্য যাচ্ছি না। তুমি আজ যা করেছে, তার প্রতিদান না দিয়ে আমি ছাড়ছি না তোমাকে”।
