কাশফুলের ভালোবাসা গল্পের লিংক || লেখিকাঃঅনন্যা অসমি

কাশফুলের ভালোবাসা পর্ব ১+২
লেখিকাঃঅনন্যা অসমি

” আরে ওই কানিরে কে বন্ধু মনে করে।ওর সাথে আমি থাকতাম তো শুধু মুগ্ধকে নিজের করে পাওয়ার জন্য।এখন নিজের কাজে সফল হতে পেরেছি।এখন ওই চার চোখওয়ালা চশমিশের কি হবে সেটা ভাবতেই আমার মন খুশিতে ভরে যাচ্ছে।খুব তো সে গর্ব করে বলতো ‘ মুগ্ধ আমার,আমাকে সে খুব ভালোবাসে।আমাকে ছাড়া অন্যকারো কথা সে চিন্তাই করতে পারবে না।’ কিন্তু এখন দেখ সব সে গুড়ে বালি।”
নিজের কাছের বান্ধবীর মুখে এসব কথা শুনে চমকে যায় মেহেক।সে কখনো আশাই করতে পারিনি তার দুজন কাছের মানুষ তাকে এভাবে ধোঁকা দিবে।আজ সকাল পর্যন্তও মেহেকের জীবনে সব ঠিক ছিল।কিন্তু ১ ঘন্টা আগেই তার জীবন একটা নরকে পরিণত হয়েছে।

ফ্ল্যাসবেক,
হাতে থাকা বিয়ের কার্ডের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে মেহেক।সে বারবার বরের নাম আর কনের নামটা দেখছে।সেখানে বরের নামের জায়গায় বড় বড় করে লেখা “মুগ্ধ খান” আর কনের জায়গায় লেখা “রিয়া শেখ”।হঠাৎ করেই তার চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।মেহেক বা হাতে চোখের জল মুছে তার সামনে থাকা তার ভালোবাসার মানুষ মুগ্ধের দিকে তাকাই।তার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার আপন দুইজন মানুষ তাকে এভাবে ধোঁকা দিবে।সে বিশ্বাসই বা করবে কিভাবে যেখানে একজন তার ভালোবাসার মানুষ আর আরেকজন তার কাছের বন্ধু।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

” এসব কি মুগ্ধ?তুমি কি আমার সাথে মজা করছো?”
” না মেহেক আমি মজা করছিনা এটাই সত্যি।তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।আমার বিয়ে রিয়ার সাথে ঠিক হয়ে গিয়েছে।”
” তাহলে আমাদের এতোদিনের সম্পর্ক?আমাদের সম্পর্কের কথা তুমি একবারো ভাবলেনা?” মুগ্ধর কলার ধরে বলে মেহেক।মুগ্ধ প্রিসার হাত নিজের কলার থেকে সরিয়ে বলে—
” কোন সম্পর্ক?কিসের সম্পর্ক?”
” কিসের সম্পর্ক মানে?আমাদের ২ বছরের সম্পর্ক তুমি ভুলে গেলে মুগ্ধ?তুমি আমাকে ভালোবাসতে এটা তুমি ভুলে গেলে?”

মুগ্ধ একটা শ্বাস নিয়ে মেহেকের দিকে তাকাই।
” আমাদের মাঝে কোন সম্পর্ক ছিলনা মেহেক।আমি তোমাকে কোনদিনও ভালোবাসিনি।আমি শুধু রিয়ার কাছাকাছি থাকার জন্য তোমার সাথে সম্পর্কে জরিয়েছিলাম।আর আমার মা কখনোই তোমাকে নিজের পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেবেনা।”
মুগ্ধর কথা শুনে মেহেক আরো ভেঙে পড়ে।মুগ্ধ সম্পর্কে মেহেকের আত্নীয় লাগে।তাদের দুই পরিবারের সম্পর্কও অনেকটাই ভালো।তবে কোন এক অগত্যা কারণে মুগ্ধের মা মেহেককে তেমন একটা দেখতে পারেনা।দেখতে না পারার মূল কারণ তো মেহেক জানেনা তবে সে যতটুকু বুঝতে পেরেছে মেহেককে পছন্দ না করার কারণ হচ্ছে তার চশমা।মেহেকের চোখে একটু সমস্যা আছে যার কারণে মুগ্ধের মা সাথে তার যখনই দেখা হতো তাকে মাঝেমধ্যেই ঘুরিয়ে ফিরে কথা শোনাতেন তিনি।

মেহেক মুগ্ধকে আর কোন কথা না বলে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়ে।সে রাস্তা হাঁটছে আর বারবার চোখ মুছছে কিন্তু বেহায়য়া চোখ থেকে পানি ঝড়ে পড়ছে।
মেহেক একটা নদীর পাড়ে এসে বসে।তার হাতে এখনো বিয়ের কার্ডটা আছে।মেহেক একবার বিয়ে কার্ডের দিকে তাকিয়ে রিয়ার বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হয়।এই আশায় যে হয়তো রিয়া কিছু জানেনা বা সে তাকে বুঝবে।কিন্তু রিয়ার বাড়িতে এসে মেহেক রিয়ার সাথে দেখা করার আগেই এসব শুনতে পাই।
ফ্ল্যাসবেক এন্ড……

মেহেক দৌড়ে রিয়ার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।
(মৃদুলা মেহেক সহজ সরল মনের একটা মেয়ে।সে আহামরি সুন্দর দেখতে না তবে তার মুখে একটা মায়া আছে।৫ বছর আগেই একটা দুর্ঘটনায় তার বাবা-মা মারা যায়।পৃথিবীতে তার আপন বলতে শুধু দুজন ব্যক্তি আছে।এক তার বড় বোন আর অনেক তার একমাত্র মামা।মুগ্ধ সম্পর্কে তার মামার বন্ধুর ছেলে।একদিন যখন মেহেক তার মামার বাসায় গিয়েছিল তখনই মুগ্ধ তাকে দেখে।বলে রাখা ভালো সেদিন মেহেকের সাথে রিয়াও ছিল।মুগ্ধ কিছুদিন পরে থেকেই মেহেকে ফলো করতে থাকে।আর একদিন প্রপোজ করে দেয়।মেহেক প্রথমে না করলেও অবশেষে মুগ্ধ কেয়ার দেখে সে রাজি হয়ে যায়।কিন্তু কে জানতো এসব আসলে ছলনা ছিল। বর্তমানে মেহেক আপ্তি নামের একটা মেয়ের সাথে একটা ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে।)

মেহেক রিয়ার বাড়ি থেকে সোজা নিজের ফ্ল্যাটে চলে আসে।আপ্তি এখন বাসায় নেই তা না হলে মেহেক শান্তি মতো কান্নাও করতে পারতোনা।দীর্ঘ একটা শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে মেহেক।কান্না করার ফলে তার চোখ মুখ ফুলে গিয়েছে।নাকটাও হালকা লালচে বর্ণ ধারণ করেছে।মাথা থেকে টাওয়ালটা খুলে মেহেক আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।সে কিছুক্ষণ আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবিব দিকে তাকিয়ে থাকে।তারপর চশমাটা খুলে আবারো আয়নার দিকে তাকাই।তবে এবার মেহেক কিছুই ভালো মতো দেখতে পারছেনা।মেহেক চোখ আবারো ছলছল করে উঠে।সে ধপ করে নিচে বসে পড়ে আর চিৎকার করে কান্না করতে থাকে।

” আজ এই চশমার কারণেই কি তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে মুগ্ধ?কই শুরুতে যখন আমি তোমাকে বলেছিলাম তখন তো তুমি বলেছিলে এই চশমার কারণে তোমাকে আরো সুন্দর লাগে।তাহলে সেসব কি মিথ্যা ছিল?কিভাবে পারলে তোমরা দুজন আমার সাথে এরকম করতে?কিভাবে পারলে?আমি আমার পরিবারের পরে তোমাদের দুজনের উপর বেশি ভরসা করেছিলাম কিন্তু তোমারই আমাকে এভাবে ধোঁকা দিলে?কেন?কেন?”
মেহেক রাগে তার চশমাটা দূরে ছুঁড়ে মারে আর চিৎকার করে কান্না করতে থাকে।
দেখতে দেখতে মুগ্ধ আর রিয়ার বিয়ের দিন চলে এলো।মেহেক নিজেকে শক্ত করে নেয় আর মুগ্ধ আর রিয়ার বিয়েতে আসে।

আজ মেহেক খুব সুন্দর করে সেজেছে।ভারী লেহেঙ্গা,ভারী গয়না সাথে ভারী মেকাপ।আজ মেহেক চশমা পড়েনি,পড়েছে লেন্স।যদিও বা তার লেন্স পড়তে সমস্যা হয় তাও আজ সে পড়েছে।গেটের বাইরে একটা বোর্ডে বড় বড় করে লেখা “মুগ্ধ ওয়ে’ড রিয়া”।এটা দেখে মেহেক একটা দীর্ঘশ্বাস নেই।সে বোর্ডটার থেকে চোখ সরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে।ভিতরে প্রবেশ করতে মেহেকের চোখ আটকে যায় মুগ্ধের দিকে।কি সুন্দর বরবেশ করে আছে সে।হেসে সবার সাথে কথা বলছে আর ছবি তুলছে মুগ্ধ।মেহেক ধীরপাশে মুগ্ধের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।মুগ্ধ তার বন্ধুদের সাথে কথা বলতে এতোটাই ব্যস্ত ছিল যে মেহেককে সে খেয়ালই করেনি।

” নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা মিস্টার মুগ্ধ।”
শান্ত গলায় মুগ্ধকে কথাটা বলে মেহেক।হঠাৎ মেহেকের কন্ঠ শুনে মুগ্ধ ঘাবড়ে যায়।সে চটজলদি পেছনে ফিরে তাকাই।মেহেককে এই রূপে এখানে দেখে ঘাবড়ে যায় মুগ্ধ।
” তুমি এখানে কি করছো?” ভীত গলায় বলে মুগ্ধ।
হালকা হেসে মেহেক উওর দেয়,
” আজ আমার প্রাক্তন আর আমার বান্ধবীর বিয়ে আর সেখানে আমি আসবো না তা কি করে হয় মিস্টার মুগ্ধ সরি সরি হবু দুলাভাই।”

” তুমি কি এখানে সিংগ্রেট করতে এসেছো?”
” আমি আপনাদের মতো এতোটাও নিচ মনের নয় মিস্টার মুগ্ধ।আমি জানি যা আমার নয় তা আমি জোর করে হলেও পাবোনা।আর আমি এটাও বুজে গিয়েছি আপনি আমার নয়।আমি আপনার জন্য নয় বরং আপনি আমার যোগ্য নন।আর আমি আমার লাইফে অযোগ্য কাউকে রাখতে চাইনা।ভালো থাকবেন।আশা করি আপনার মতো বিশ্বাসঘাতকের চেহারা আমাকে আর কোনদিনও দেখতে হবেনা।”

মেহেক কথাগুলো বলে স্টেজ থেকে নেমে পড়ে।এদিকে মেহেকের কথাগুলো মুগ্ধের গায়ে লাগে ভিষণ।সেও কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু সে নিজেকে আটকে নেয়।তা না হলে দেখা যাবে হিতে বিপরীত কিছু হয়ে যাবে।
মেহেক স্টেজ থেকে নেমে সোজা কনের রুমে মানে রিয়াকে সে রুমে রাখা হয়েছে সে রুমে চলে আসে।
মেহেক গিয়ে দরজায় নক করে।মেহেককে দেখকে রিয়া চমকে গেলেও সে সেটা বাইরে প্রকাশ করেনা।রিয়া সবাইকে বাইরে বেরিয়ে যেতে বলে।সবাই বাই চলে গেলে রিয়া এসে মেহেককে জরিয়ে ধরে কিন্তু মেহেক ধরে না,সে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে।

” কিরে মেহেক তুই এতোদিন কোথায় ছিলিরে?জানিস তোকে আমি কতো ফোন করেছি কিন্তু তোর ফোন বারবার সুইচ অফ বলছিল।জানিস আমি তোরই অপেক্ষা করছিলাম।খালি চিন্তা করছিলাম তুই কবে আসবি,কবে আসবি?”
” কেন রে?আমাকে কষ্ট পেতে দেখার জন্য?”
” মানে?” ঘাবড়ানো গলায় বলে রিয়া।

” রিয়া আমি সব জানি,তোকে আর কষ্ট করে এতো নাটক করতে হবেনা।আমি সেদিন তোর সব কথা শুনে নিয়েছিলাম।জানিস তোর কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল কেউ বুঝি আমার মনটাকে ছুড়ি দিয়ে খন্ড বিখন্ড করে দিচ্ছে।তবে আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি।আমি বুঝতে পেরেছি আমি ভুল মানুষকে বিশ্বাস করেছিলাম।আর যার ফল আমি দেখতেই পাচ্ছি।তোরা আমার সাথে এটা না করলেও পারতি রে।আমি কখনোই তোদের মাঝখানে আসতাম না।কিন্তু তোরাই আমাকে মাঝখানে টেনে আমার মনটাকে ভেঙে দিলে।যাইহোক ভালো থাকিস।”

কথাগুলো বলে মেহেক যেখান থেকে চলে আসে।এদিকে মেহেকের কথা শুনে রিয়ার একটুও অনুশোচনা বা কষ্ট হচ্ছে না বরং তার মুখে লেগে আছে একটা ক্রুরুহাসি।
কমিনিউটি সেন্টার থেকে বেরিয়ে এসে মেহেক একটা ব্রিজের কাছে এসে দাঁড়ায়।সে ব্রিজের রেলিঙের উপর বসে আপন মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।চারিদিকে নীরব,মাঝেমধ্যে দু-একটা গাড়ি যাতায়াত করছে।অন্যকোন সময় হলে মেহেক ভয়েও এইদিকে আসতো না কিন্তু আজ মেহেক নিজেকে অনুভূতি মনে করছে,তার ভেতরে কোন ধরনের অনুভূতি কাজ করছেনা।
অন্যদিকে,

রোডিও তে গান শুনতে শুনতে গাড়ি চালিয়ে হোটেলে ফিরছে সৌন্দর্য।একটা শুনশান নীরব রাস্তা এসে সে দেখতে পাই কেউ একজন ব্রিজের রেলিঙের উপর বসে আছে।কি মনে করে যেন সৌন্দর্য গাড়ি থামিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে।সে গাড়ি থেকে নেমে দেখে একটা মেয়ে বসে আছে রেলিঙের উপর।এটা দেখে সৌন্দর্য অবাক হয়।
” এইযে মিস?এতো রাতে এখানে একাএকি কি করছেন?”
আপনমনে আকাশ দেখছিল মেহেক।হঠাৎ কারো আওয়াজে সে তার ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে।মেহেক তাকিয়ে দেখে সুট পড়া একটা ছেলে তার থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে।গাড়ির হেডলাইটের আলোতে হালকা হালকা সে ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছে।

মেহেককে চুপ করে থাকতে দেখে সৌন্দর্য আবারো বলে—
” এইযে মিস?এতো রাতে এভাবে সেজেগুজে এখানে এভাবে বসে আছেন কেন?কারো জন্য অপেক্ষা করছেন বুঝি?নাকি বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছেন?”
মেহেক কিছু না বলে সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে রয়।মেহেকের এই অদ্ভুত ভাবে তাকানো দেখে সৌন্দর্যের ভ্রু-কুচকে উঠে।মেহেক লাফ দিয়ে রেলিঙের থেকে নেমে পড়ে।মেহেক চলে যেতে নিলে সৌন্দর্য তাকে আটকিয়ে বলে উঠে—-

” এইযে মিস আপনি কি কথা বলতে জানেন না নাকি?আর এতো রাতে একা একা বাইরে ঘোরাফেরা করছেন কেন?জানেন না এখন দিনকাল ভালোনা।”
মেহেক পেছনে ফিরে শান্তদৃষ্টিতে সৌন্দর্যের দিকে তাকাই তবে এবারো কিছু বলেনা।মেহেকের চুপ থাকা দেখে সৌন্দর্য একটা দীর্ঘশ্বাস নেই।

” আপনি কি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন?”
মাথা নাড়িয়ে না উওর দেয় মেহেক।কিছুক্ষণ চুপ থেকে সৌন্দর্য মেহেককে বলে—
” তাহলে আসুন আমি আপনাকে আপনার বাসা অবধি ড্রপ করে দিচ্ছি।এভাবে একা থাকা আপনার জন্য সেফ না।”
মেহেকও কিছুক্ষণ ভেবে গাড়ির ভেতরে বসে পড়ে।মেহেকের চুপ থাকা দেখে সৌন্দর্যের প্রচুর বিরক্ত লাগছে কিন্তু তাও সে চুপ করে রয়েছে।

সিটবেল্ট লাগাতে লাগাতে সৌন্দর্য মেহেককে প্রশ্ন করে—
” আপনার বাসার লোকেশনটা বলুন।”
মেহেক কোন কথা না বলে জিপিএস এ লোকেশন সেট করে দেয় এরপর বাইরে দিকে তাকিয়ে থাকে।মেহেকের এই অদ্ভুত বিহেভিয়ার সৌন্দর্যের বিরক্তবোধ আরো বাড়িয়ে তুলছে।তবে ভদ্রতার খাতিরে সে কিছু বলতে পারছেনা।গাড়ি স্টার্ট দেয় সৌন্দর্য।

কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি এসে দাঁড়ায় মেহেকের ফ্ল্যাটের সামনে।মেহেক একবার সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে কিছুনা বলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে।মেহেকের এই অদ্ভুত বিহেবে সৌন্দর্য এবার অবাক হয়।সে নিজের মনে মনেই ভাবতে থাকে,
” কি আজব মেয়েরে বাবা।একটা কথাও বললোনা আর একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিলোনা।ডিসকাস টিং পিপল।”
বিরক্ত নিয়ে হোটেলের উদ্দেশ্য আবারো চলতে শুরু করে সৌন্দর্য।

রাতে কান্না করার ফলে প্রচুর মাথাব্যথা করছে মেহেকের।সে কষ্ট করে শোয়া থেকে উঠে বসলো।মেহেক সব কিছু ঝপসা দেখছে।অনেক কষ্ট করে নিচে থেকে সে তার চশমাটা খুঁজে পড়ে নেয়।একবার আয়নার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওয়াশরুম চলে যায় সে।কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে মেহেক।মেহেক কাপড়গুলো বারান্দায় শুকাতে দিয়ে রান্নাঘরে চলে যায় রান্না করতে।এখন তার এককাপ কফি খাওয়া খুবই জরুরি।তাই প্রথমে সে কফির জন্য চুলায় পানি দেয়।রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে মেহেক রুমে এসে বিছানা গোছাতে থাকে।বিছানা গোছানো শেষে মেহেক চলে যেতে নিলে সে শুনতে পাই তার ফোন বাজছে।মেহেক ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে স্ক্রিনে বড় বড় করে “আপুনি” নামটা ভেসে উঠছে।মেহেকের বোন সৃষ্টি,২ বছর হয়েছে তার বিয়ে হয়েছে।সে তার স্বামীর সাথে ঢাকায় থাকে।মেহেক ফোন রিসিভ করে কানের কাছে নেয়।

” কেমন আছিস মৃদু?”
” এইতো আপুনি আছি।”
” কিরে তোর গলা এরকম শোনাচ্ছে কেন?কিছু হয়েছে নাকি?”
” না আপুনি কিছু হয়নি।”
” তুই ঠিক আছিস তো?আমার কেন যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই।”
” নারে আপুনি আমি ঠিক আছি।তোর এতো চিন্তা করতে হবেনা।” মেহেক মুখে এ কথাগুলো বললেও সে মনে মনে বলছে —- ” আমি যদি তোকে বলতে পারতামরে আপুনি যে আমি কতোটা ভালো আছি।”

” কিরে চুপ করে গেলি কেন?”
” আপুনি আমার একটা কথা রাখবি?”
” এভাবে বলছিস কেন বোন?কি হয়েছে আমাকে বল।”
” আপুনি আমাকে তোর বাসায় কিছুদিনের জন্য থাকতে দিবি?”
” এটা আবার বলতে হয় নাকি?আমি আর তোর দুলাভাই তো তোকে কত বার বলেছিলাম।কিন্তু তুই তো বারবার মানা করে দিলি।কিন্তু মৃদু হঠাৎ তুই রাজি হয়ে গেলি কেন?”
এবার মেহেক আর তার কান্না আঁটকে রাখতে পারেনি।

” আমার এখানে আর ভালো লাগছেনারে আপুনি।এখানে আর ভালো লাগছেনা।আমি এখানে খুব একারে আপুনি।তুই প্লিজ আমাকে এখান থেকে নিয়ে যায়।আমি আর এখানে থাকতে চায়না আপুনি,আর থাকতে চায়না।আমি যে আর পারছিনারে।আমার যে ভিষণ কষ্ট হচ্ছে।” কান্না করতে করতে বলে মেহেক।

মেহেকের কথা শুনে সৃষ্টি কিছুই বুঝতে পারেনা।সে আর কিছু বলবে তার আগেই মেহেক ফোনটা কেটে দেয়।
অনেক্ষণ কান্না কারার পর কান্না বন্ধ করে মেহেক।সে নিজেকে শান্ত করে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়।চুলা কম আঁচে ছিল বিদায় বেশি পানি শুকিয়ে যাইনি।গরম পানি মগে ঢেকে কফি বানিয়ে আবারো রুমে চলে আসে।কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে মগটা সাইডে রেখে কার্বাড খুলে মেহেক।কাপড় নেওয়ার সময় অসাবধানতার কারণে কিছু জিনিস কার্বাড থেকে নিচে পড়ে যায়।জিনিসগুলো দেখেই মেহেক বুঝতে পারে এগুলো কি।মেহেক ছবি আর গিফটগুলো তুলে নেয়।গিফটগুলো বিছানায় রেখে ছবিগুলোর দেখতে থাকে মেহেক।ছবিতে কি সুন্দর মুগ্ধ তার সাথে মজা করছে,তার সাথে হেসেহেসে কথা বলছে কিন্তু কে জানতো এগুলো সব ছলনা,সব মিথ্যা,অভিনয় ছিল সব।মেহেক ছবিগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় তারপর একটানে ছিঁড়ে ফেলে সব ছবি।গিফটগুলোও ভাঙচুর করে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়।

বিকেল বেলা,
আজ অনেকদিনপর মেহেক এসেছে তার মামাবাড়ি।আসলে তার কিছু জিনিসপত্র এই বাড়িতে আছে,তাই নিতে এখানে আসা নাহলে সে কখনই এই বাড়িতে আসতোনা।আসলে মেহেক ঠিক করে নিয়েছে সে আর এই শহরে থাকবেনা।এই শহর তাকে কিছু দেয়নি বরং সবসময় সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।
মেহেক দরজার বেল দিলে তার মামী এসে দরজা খুলে দেয়।মেহেকে দেখে তো তার মামী অবাক সেই সাথে ভিষণ খুশিও হন তিনি।তিনি মেহেকে জরিয়ে ধরেন।
” মেহেক মা তুই এসেছিস।জানিস অনেক মনে পড়ছিলো তোকে।”
মেহেক কিছু না বলে মুচকি হাসে।মেহেকের মামী তাকে ভিতরে নিয়ে যায়।তখন নিচে নামতে নামতে মেহেকের দাদী তার মামীকে বলে,

” কে আইসে বউ মা?কার লগে তুমি কথা কও?”
” আম্মা আপনার নাতনী এসেছে।”
মেহেককে দেখে তার দাদীর মুখ কালো হয়ে যায়।তিনি থমথমে মুখে বলে—
” এই মাইয়া এখানে ক্যান আইসে?ওরে না আমি কইছিলাম এইখানে না আয়তে।”
দাদীর কথা শুনে মেহেকের মন আরো খারাপ হয়ে যায়।সে এখানে আসতো না কিন্তু জিনিস গুলো নেওয়া তার জন্য প্রয়োজন তাই বাধ্য হয়ে এসেছে।মেহেকের যে তার দাদীর কথা শুনে মন খারাপ হয়েছে তা তার মামী বুঝতে পারে।
” আহ…. আম্মা এখন এসব বাদ দিনতো।মেয়েটা কতোদিন পর আমাদের বাড়ি এলো।”

” সেসব কিছু আমি বুঝিনা।এই মেয়েরে কও যে জন্য আয়সে তা তাড়াতাড়ি শেষ করে যেন বিদায় হয়।হকাল হকাল ক্যান যে এই মাইয়াডার মুখ দেখলাম আল্লাহ জানে।”
ততক্ষণে মেহেকের মামাও বাজার থেকে বাড়ি ফিরে এসেছেন।তিনি নিজের ভাগনীকে দেখে বেজার খুশি হন।
” আরো মেহেক মা যে।কবে এলি তুই?আর আসার আগে বলে এলিনা কেন?তাহলে বাজার থেকে তোর পছন্দের খাবার নিয়ে আসতাম।”

ছেলের এই কথা যেন মেহেকের দাদীর পছন্দ হলোনা।
” হ যতসব আদিখ্যেতা।এতো দরদ দেখাইস না তোরা,নয়তো তোদেরই ক্ষতি করবো এই মাইয়াডা।”
” আহ…. মা তুমি তোমার ঘরে যাও তো।”
মেহেকের দাদীর নিজে নিজে কথা বলতে বলতে নিজের রুমে চলে যায়।মেহেকের মামা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—
” মেহেক মা তুই মায়ের কথায় কষ্ট পাসনা,তাই তো জানিস উনি কেমন।”
” না মামা আমি কোন কষ্ট পাইনি।আমার ক্ষেত্রে ওনার ব্যবহার স্বাভাবিক।ওনার জায়গায় অন্য কেউ হলেও একি ব্যবহার করতো।”

” তুমি ওর সাথে পড়ে কথা বলো,মেয়েটাকে এখন একটু বসতে দাও তো দেখি।”
” না মামী আমি বসবোনা।আমি তো শুধু আমার জিনিসপত্রগুলো নিতে এসেছিলাম।”
” জিনিসপত্র কেন নিয়ে যাবি?” বলে মেহেকের মামা।
” আসলে মামা আমি আজই এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি।”
” কি বলছিস তুই মেহেক!” অবাক হয়ে প্রশ্ন করে মেহেকের মামী।
” তা হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন?” মেহেকের মামা তাকে প্রশ্ন করে।
” এমনিতেই।এই শহরে আর ভালোলাগছেনা।”
” তো কোথায় যাবি তুই?” মেহেকের মামী প্রশ্ন করে।

” আমি ঢাকা চলে যাবো,আপুনির কাছে।কিছুদিন ওর বাসায় থাকবো।সেখান থেকেই কোন একটা ব্যবস্হা করে নেবো।”
মেহেকের কথা শুনে তার মামা-মামী একে অপরের দিকে তাকাই।মেহেকের মামা তাকে বলে,
” তুই যা ভালো বুঝিস।তবে নিজের খেয়াল রাখিস আর কোন সমস্যা হলে আমাদের বলিস কিন্তু।”
” হুম।”
মেহেক তার মামার বাসায় সে রুমটাতে থাকতো সেখানে এসে তার জিনিসপত্র সব গুছিয়ে ব্যাগে ভরে নেয়।সে একবার পুরো রুমটাকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
মেহেক যখন সিঁড়ি দিয়ে নামবে তখন কেউ তাকে পেছন থেকে ডাকে।মেহেক পেছনে ফিরে দেখে তার মামাতো ভাই নক্ষত্র দাঁড়িয়ে আছে।নক্ষত্রকে দেখে মেহেক মুচকি হাসে।

” কিরে মেহু কেমন আছিস?”
” এইতো নক্ষত্র ভাইয়া আছি।তুমি কেমন আছো?”
” আমি ভালো আছি।তা এতোদিন পর মনে পড়লো আমাদের কথা?জানিস তোকে কতোটা মিস করছিলাম।”
মেহেক কিছু না বলে মুচকি হাসে।
” আচ্ছা ভাইয়া আমি আসি।ভালো থেকে।”
” তুই এতো বড় ব্যাগ নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?”
” আমার জিনিস গুলো নিতে এসেছিলাম ভাইয়া।”
” কিন্তু কেন?”
” আমি এই শহর ছেড়ে চলি যাচ্ছি ভাইয়া।”
” কিসব বলছিস তুই?কোথায় যাবি তুই?”

” আমি আপুর কাছে চলে যাচ্ছি ভাইয়া।কারণটা জিজ্ঞেস করোনা।সময় হলে বলবো।এখন আমি যাই,আমার বাস মিস হয়ে যাবে নয়তো।ভালো থেকে।”
নক্ষত্রকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মেহেক বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।নক্ষত্রের শুধু দেখে থাকা ছাড়া আর কোনকিছু করার নেই।
বাস বসে আছে মেহেক।বাস ছাড়তে আরো ১৫ মিনিটের মতো সময় আছে।সবাই বাসে নিজের জায়গায় বসে ব্যস্ত।মেহেক জানালা দিয়ে নির্লিপ্ত ভাবে বাইরে তাকিয়ে রয়।
” এইযে মিস চশমিশ,এটা আমার সিট।”

চশমিশ বলাতে মেহেক ভ্রু-কুচকে পাশে ফিরে তাকাই।সে দেখে একটা ছেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে।ছেলেটাকে দেখে মেহেকের কেমন যেন চেনাচেনা লাগছে তবে তার ঠিক মনে পড়ছেনা সে ছেলেটাকে কোথায় দেখেছে।হঠাৎ করেই মেহেকের মনে পড়ে আরে এটাতো সেই ছেলেটা যে কাল তাকে ড্রপ করে দিয়েছিল।মেহেক ভেবেছে সৌন্দর্য তাকে চশমা পড়ার জন্য চিনতে পারেনি।মেহেক গম্ভীরস্বরে বলে—
” আপনার যদি কোন সমস্যা না হয় তাহলে আমি কি জানালার পাশে বসতে পারি?আসলে বাসে ট্রাভেল করতে আমার আবার কিছুটা সমস্যা হয়।”

মেহেকের কথাশুনে সৌন্দর্য হতাশভারা একটা নিশ্বাস নিয়ে মেহেকের সিটে বসে পড়ে।মেহেকও আর কোন কথা না বাড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সব যাত্রী বাসে উঠে পড়ে আর তারপর বাস চলতে শুরু করে।মেহেক শান্তদৃষ্টিতে শেষবারের মতো এই শহরটাকে দেখে নেয়।এরপর সে চোখ বন্ধ করে সিটে মাথা এলিয়ে দেয়।

কাশফুলের ভালোবাসা পর্ব ৩+৪