কিশোরী কন্যা পর্ব ১০
হামিদা আক্তার ইভা
“যদি কখনো আপনার প্রতি আমার অনুভূতি না জন্মায়?”
“তাহলে ভাববো আমি তোমার যোগ্য নই।”
তাহসিন ময়ূরীর হাতে হাত রাখল।বলল,
“ভয় নেই মেয়ে,আমি জোর করে তোমায় বেঁধে রাখব না।তোমার জীবনের সিদ্ধান্ত তুমি নিজেই নিবে,আমি সব সময় তোমার পাশে আছি।”
“একটা কথা বলব,কিছু মনে করবেন নাতো?”
“বলো!”
“আপনাকে মেনে নিতে আমার কষ্ট হচ্ছে।আমি জানি আপনি ভীষণ ভালো,খুব খুব ভালো।কিন্তু আপনিই বলুন,কোন মেয়ে চায় একজন বাচ্চার বাবাকে বিয়ে করতে?আপনি এর আগেও অন্য এক নারীকে ভালোবেসেছেন,এটা ভাবলেও ভীষণ রাগ হয় নিজের উপর।আমাকে খারাপ ভাবলেও এটাই সত্যি আপনার সাথে সহজ হতে পারছি না।”
তাহসিন ঠোঁট কামড়ে বসে রইল।ময়ূরী নিশ্চুপ।ঘরের ভেতর থেকে বক্কর ডাকছেন তাদের খাবার খাওয়ার জন্য।ময়ূরী নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল।আঁচল গায়ে ঠিক করে জড়িয়ে নরম গলায় বলল,
“তাই বলে ছেড়ে যাব না কখনো।কবুল যখন আপনার নামে পড়েছি তখন শেষ নিঃশ্বাস অব্দি আপনার হয়েই থাকব।”
ময়ূরী ঘরের দিকে চলে যাওয়ার পর তাহসিন দোলনা থেকে নেমে ট্রাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে লম্বা শ্বাস টানল।হঠাৎ চোখ গিয়ে থামল বাড়ির বাইরে কাঁচা রাস্তার দিকে।আপছা আলোয় অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেখানে কেও বা কারা যেন দাঁড়িয়ে আছে।দুজনের হাতে বোধহয় জ্বলন্ত সিগারেট।
তাহসিনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
রাতের এই সময়টায় ওখানে কারা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?
বাড়ির আঙিনার শেষ মাথায় পুরনো বটগাছটার পাশে দুটো ছায়ামূর্তি দুলছে।
ধোঁয়ার রেখা বাতাসে পাক খেয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেন অন্ধকারের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা বার্তা।
সে একবার চেয়ে দেখল ময়ূরী ঘরে ঢুকে গেছে কিনা। তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলো।
মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাতাসের সঙ্গে গন্ধ পেল,যেন কিছু পোড়া পাটের মতো গন্ধ।
একজন ছায়া একটু নড়ল,তারপর অন্যজন ফিসফিস করে বলল,
“চলো ভাই,এই বুঝি ধরে ফেলছে।”
তাহসিন দৌড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“থামো! কে তোমরা?”
ততক্ষণে তাদের একজন গাছের আড়ালে মিলিয়ে গেছে।আরেকজন তাড়াহুড়ো করে সাইকেলে চড়ে রাস্তা ধরে পালিয়ে গেলো।
শুধু পড়ে রইল মাটিতে একটা ভাঙা চশমা আর আধখানা সিগারেটের টুকরো।
তাহসিন নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল।চশমার কাচের ওপর আলো ফেলতেই চোখ স্থির হয়ে গেলো তার।
চেনা এই চশমাটা সে এর আগেও দেখেছে।
তাহসিনের বুকের ভেতর হঠাৎ করেই একরাশ অস্বস্তি জমে গেল।
পকেটে রাখা চশমাটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল।
বাড়ি ফিরতেই ফিরোজা বেগম মেঝেতে পাটি বিছিয়ে দিলেন।পুতুল বাবার পাশে বসেছে।তাহসিন প্লেটে প্রথমে মেয়ের জন্য অল্প ভাত নিয়ে দেশি মুরগির তরকারি নিল।ভাত মাখিয়ে মেয়ের মুখের সামনে ধরে বলল,
“আম্মা,হা করেন।”
পুতুল বড় করে হা করল।তাহসিন মুচকি হেসে ভাত তুলে দিলো মুখে।ফাহাদ নাক ফুলিয়ে ময়ূরীর শাড়ির আঁচল টেনে বলল,
“আপা খাওয়াই দেও।”
পুতুল রেগে তাকালো।গাল ফুলিয়ে বলল,
“আমার মা তোমায় খাইয়ে দিবে কেন?”
ফাহাদ বলল,
“আমার দুলাবাই তুমারে খাওয়াই।”
“মার দিব কিন্তু।ফাজিল ছেলে একটা।”
তাহসিন ধমক দিয়ে বলল,
“কী হচ্ছে পুতুল?সে আপনার মামা হয় না?ঝগড়া করছেন কেন?”
পুতুল ছলছল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে কেঁদে উঠল।ফিরোজা বেগম হতবাক হয়ে ময়ূরীর দিকে তাকালেন।ময়ূরী ভাত খাওয়া রেখে শুকনো ঢোক গিলে পুতুলের পাশে এসে বসল।অন্যপাশে ফাহাদ এসে বসল।বেচারি নিজে না খেয়ে আগে দুজন বাচ্চাকে খাইয়ে দিলো।খাওয়া দাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় ৯টা ছাড়িয়েছে।মধুর ঘরে তাদের ঘুমানোর জন্য ব্যবস্থা করা হলো।পুতুলের ঘুমঘুম ভাব চোখে।ময়ূরী পাশে শুয়ে তার।তাহসিন উঠোনে,শ্বশুরের সাথে আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত।
চেয়ারে বসে আছেন তারা।বক্কর আফসোসের স্বরে বললেন,
“বড় ভাই তো কাজ কাম করে না।ছেলেটাও গ্রাম ছেড়ে বাপ মাকে প্রায় ভুলেই গেছে।শবনমের জন্য যত চিন্তা।গ্রামের অবস্থাও তো তেমন ভালো নয় জানোই।”
তাহসিন বলল,
“এসব নেশায় জড়ালেন কী করে?”
“গ্রামে কী বখাটের অভাব?আল্লাহ ভালো জানেন কিভাবে কী হলো।”
তাহসিন ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ মাথা নত করে রাখল।আড়চোখে ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“শুনেছি বাজারে মুরগির দোকানের পেছনে নাকি অবৈধ কিছু জিনিস পাওয়া গিয়েছিল কয়েক মাস আগে?”
বক্কর মাথা নাড়লেন।
“সে তো অনেক আগের কথা।নেশা জাতীয়ই কিছু পাওয়া গেছিল।”
“কে করেছে এসব আপনি কিছু জানেন?”
“না বাবা,এসব প্রায় হয়ে থাকে এদিকে।তোমার ভাই,চাচারাই যেখানেই কিছু জানতে পারছেন না সেখানে আমি কী করে জানব বলো?”
“তা ঠিক।”
রাত হয়েছে বেশ।তাহসিন ঘরে এসে দেখল পুতুল বিছানার এক কোণায় গুটিয়ে ঘুমাচ্ছে।ময়ূরী মাঝে শুয়ে আছে গায়ে কাঁথা জড়িয়ে।তাহসিন ফিরতেই ময়ূরী পুতুলের দিকে চেপে গেলো।ঘরের লাইট বন্ধ করে তাহসিন বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল ময়ূরীর পাশে।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আসছে।কেরোসিন ল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয় ঘরের দেয়ালে তাদের ছায়া দুলছে।
বিছানাটা ছোট,দুজন মানুষ শোওয়ার মতো জায়গা নেই বললেই চলে।
তাহসিন ধীরে ধীরে কাঁথাটা টেনে নিজের দিকে আনল।ময়ূরী তখনও চুপচাপ,চোখ বন্ধ করে আছে।মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছে,কিন্তু বুকের ওঠানামা আর হাতের হালকা কাঁপুনি বলছে সে জেগেই আছে।
তাহসিন পাশ ফিরে তাকালো।কাঁথার নিচে ময়ূরীর চুলের গন্ধ ভাসছে।বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখতে পারল না সে।
গলাটা নামিয়ে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল,
“ঘুমিয়ে গেছো?”
ময়ূরী চোখ না খুলেই বলল,
“হুঁ।”
তাহসিন হালকা হাসল।
“বিছানাটা বড্ড ছোট মনে হয়,তাই না?”
“ছোট না,আপনিই বিছানার থেকে একটু বেশিই বড়।”
তাহসিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর ধীরে ধীরে শরীরটা একটু সরিয়ে নিল,তবুও তাদের কাঁধ দুটো লেগেই থাকল।
ময়ূরীর কাঁধে হালকা করে হাত রাখল সে,যেন কোনো সাহস চাইছে স্পর্শে।
ময়ূরী চোখ খুলে তাকালো এবার। মৃদু আলোয় তাহসিনের চোখ জ্বলছে,সেখানে কোনো কামনা নেই,আছে কেবল এক অদ্ভুত স্নেহ আর নিশ্চুপ প্রতিশ্রুতি।
তাহসিন তার পিঠে হাত রাখল,তারপর আস্তে করে তাকে নিজের দিকে টেনে আনল।
ময়ূরী চমকে উঠল,শরীরটাও কেঁপে উঠল, কিন্তু প্রতিবাদ করল না।
তাহসিনের ঠোঁট ছুঁয়ে গেলো তার পিঠে
।সাথে সাথে মেয়েটা নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।
মুহূর্তের জন্য ঘরটা থমকে গেল,বাতাস ভারী হয়ে উঠল।ময়ূরীর চোখ বন্ধ।
ঠোঁট কাঁপছে তার, বুকের ভিতর তীব্র কিছু বাজছে—ভয়,আকর্ষণ,নাকি অজানা অনুভূতি সে নিজেও জানে না।
বাইরে হঠাৎ হালকা বাতাস উঠল,জামগাছের পাতা খসখস শব্দ করল।
তাহসিন ময়ূরীর কাঁধে মুখ রেখে স্থির হয়ে গেল।
ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙল কেবল পুতুলের ঘুমন্ত নিঃশ্বাসের মৃদু আওয়াজে।এভাবেই দুজন মানুষ, যারা এখনো পুরোপুরি একে অপরের নয়,এক শয্যায় নিঃশব্দে ভাগ করে নিলো এক রাতের নীরবতা।
পূব আকাশে হালকা গোলাপি আভা,সূর্যের প্রথম কিরণ যেন ধীরে ধীরে সবুজ ধানক্ষেতের উপর ঝরে পড়ছে।দূরে কোথাও কুয়াশার আস্তর এখনও পুরোপুরি কাটেনি।তার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় গরু,ছাগল চরাতে বের হয়েছে রাখাল ভাইয়েরা।
বাঁশঝাড়ের পাতায় শিশিরবিন্দু ঝুলে আছে, বাতাসে সেই শিশিরের ঠান্ডা গন্ধ।
পাখির কিচিরমিচির শব্দে চারদিক মুখর।কখনও শালিক,কখনও দোয়েল,কখনও আবার বুলবুলি।
গ্রামের মেঠোপথে ধুলো উড়ছে না এখনো,মাটির উপর রাতের শিশিরে একটুখানি ভেজাভাব আছে।
গাঁয়ের ঘরে ঘরে তখন ভাতের হাঁড়ি চড়েছে,চুলার ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠছে আকাশে,বাতাসে মিশে আছে পোড়া কাঠের মিষ্টি গন্ধ।
সওদাগর বাড়িতে চলছে রান্নার কাজ।আফিয়া রান্না ঘরে বসে কাজে ব্যস্ত।কুসুম এসে জানাল কনকের শরীর ভালো নয়।রাতে বোধহয় জ্বর এসেছিল খুব।আফিয়া বলল সকালের খাবার খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিতে।
অরুণিমা বেগম নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরে এসে দেখলেন আফিয়া কাজে লেগে গেছে।তিনি রান্না ঘরে ঢুকে বললেন,
“এত সকালে রান্না ঘরে কী করছিস?”
আফিয়া কাজে মন দিয়েই বলল,
“আমি ছাড়া এসব আর কে করবে মেজো মা?”
“আমরা কী মরে গেছি?ভানু কই?সে ওঠেনি এখনো?”
“ছোট মা এত সকালে ওঠে?”
কনকের মা ভানু বেগম বাড়ির একটা কাজও করতে চান না।দেখা যায় বিছানা অব্দি মেয়েদের দিয়ে গুছিয়ে রাখেন।ভোলা ভালা মানুষটা।অবশ্য রজনী বেগম ছাড়া তাকে নিয়ে কারোর কোনো সমস্যা নেই।
সকালের খাবার হতে হতে বেলা গড়াল।শান্তা মাহতাবের ঘরের অন্যপাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে।আফিয়া সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে ডাইনিং টেবিলে খাবার এনে রাখছিল।শান্তা এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“কাল উনি তোমার সাথে ছিল,বড় বউ?”
আফিয়া কাজে হাত রেখে জবাবে বলল,
“জানোই যখন আবার জিজ্ঞেস করছো কেন?”
“তোমার কাছে যেতে বারণ করতে পারো না?”
“সে আমার কাছে আসলে ফিরিয়ে দেয়ার সাধ্য আমার নেই।”
শান্তা যে রেগে আছে ভীষণ সেটা তার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে।তবুও সে কথা ঘুরিয়ে বলল,
“তোমার বুঝি খুব কষ্ট হয় বড় বউ?এত এত কাজ কিভাবে করো?”
“কষ্ট হবে কেন?গত ৭বছর ধরে তো করেই আসছি এসব।”
“যাইহোক,আমার কিছু জামা কাপড় নোংরা হয়েছে,তুমি কী একটু ধুয়ে দিতে পারবে?”
আফিয়া চোখ তুলে তাকালো।শান্তার চোখে তাচ্ছিল্য দেখতে পেয়ে কাজ রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“কী বলো তো শান্তা?আমাকে বাইরে থেকে নরম মনে হলেও আমি কিন্তু তুলো নই।আমার হাতের এই
মাঁচটা আঙুল দেখেছ?এই আঙুল গুলো যখন তোমার ওই ফরসা নরম গালে পড়বে তখন বুঝবে আফিয়া কী।”
শান্তা দাঁত চাপল।
“তুমি কী আমায় অপমান করছো?”
“অপমান করব কেন?আমি তোমার কেনা গোলাম নই যে যা বলবে তাই শুনব।আর একটা বাজে কথা বললে বিশ্বাস করো,তোমার চাপা ভেঙে ফেলতেও দুবার ভাববো না।”
ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মাহতাব সব কিছুই শুনছিল।ঠোঁটের কোণে হাসিটুকু চওড়া হতেই সে ঘরের দরজা লাগিয়ে দিলো।
শান্তা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
তার মুখটা কেমন ফ্যাঁকাসে হয়ে গেল,ঠোঁটের কোণে হালকা কাঁপুনি।
আফিয়া আবার কাজে মন দিলো,যেন কিছুই হয়নি।সে হাঁড়িতে ঢাকনা বসিয়ে বলল,
“তোমার কাপড় নিজেই ধুয়ে নিও।নইলে কাজের মেয়েকে বলো।”
শান্তা ঘুরে চলে গেল।পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রজনী বেগম সব শুনেছেন।
চোখে ঠাণ্ডা হাসি,মুখে বিদ্রূপ।ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
“বড় বউ,ভাষা কিন্তু তোর খুব বাইড়া গেছে আজকাল।”
আফিয়া মাথা না তুলেই বলল,
“ধৈর্য কমে গেছে।”
রজনী বেগম কণ্ঠটা ভারী করে বললেন,
“ধৈর্য কমলে সংসার ভাঙে,বুঝলি?এই রান্নাঘরের আগুনে যেমন হাঁড়ি পুড়ে,তেমনি ঘরও পুইড়া যায়।”
আফিয়া থেমে গেল,একবার চোখ তুলে তাকালো তার দাদি শাশুড়ির দিকে।
চোখে এক ফোঁটা জল ঝিলিক দিলেও ঠোঁটের কোণে কষ্ট ঢেকে রেখে বলল,
“ঘর ভাঙার ভয় আমার নেই।যার ঘরই নেই তার আবার ভয় কীসের?”
“অস্বীকার করলেই তো সংসার ত্যাগ করা যায় না।তুই এহনো মাহতাবের বউ,এই বাড়ির বড় বউ।”
আফিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে মন দিলো।তার কিছুই বলার নেই।শান্তা ঘরে গিয়ে ভেতরের দরজা খুলে মাহতাবের ঘরের ভেতরের দরজায় কড়া নাড়ল।খানিকক্ষণ পর মাহতাব দরজা খুলে দিতেই শান্তা দাঁত চেপে বলল,
“আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন আমিও আপনার বিয়ে করা বউ।বিয়ের পর একবারও তো আপনি আমার কাছে আসলেন না?অথচ দিনের পর দিন ওই অপয়ার সাথে রাত কাটাচ্ছেন।”
মাহতাব দাঁত চেপে বলল,
“গলা নিচে নামিয়ে কথা না বললে কলিজা ছিঁ’ড়ে বের করব তোমার।এই মুখ দিয়ে ওর নাম মুখে আনবে না।”
শান্তা মাহতাবের বুকে স-জোরে ধাক্কা মেরে বলল,
“কার সাথে গলা তুলে কথা বলছেন আপনি?আমি কী করতে পারি তার ধারণা নিশ্চই আপনার আছে?বিয়ে করে আপনি এখনো আমায় স্ত্রীর মর্যাদা দেননি।”
“তুমি এটারই যোগ্য।”
মাহতাব ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।১০টায় একটা মিটিং আছে তার।সে বাইরে বেরিয়ে দেখল চাচা,দাদা সবাই চলে এসেছেন।চেয়ার টেনে বসতেই হঠাৎ খেয়াল করল আফিয়া আজ নীল রঙের শাড়িটা পরেছে।টুকটুকে গায়ে বেশ মানিয়েছে।
ভোর সকালে তাহসিন বাড়ি থেকে বের হয়েছিল।সকাল ৯টার দিকে বাড়ি ফিরে আশ্চর্য বনে গেলো সে।ময়ূরী এই সাতসকালে গোসল করছে পুকুরে।পুতুল আর ফাহাদ ঝগড়া করছে একসাথে বসে।সে এগিয়ে গেলো সেদিকে।বুকে হাত গুঁজে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল কিশোরী বধূর দিকে।ময়ূরী তাহসিনকে দেখেই কাপড় ঠিক করল।
“নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে আছেন কেন?যান এখান থেকে।”
“যা দেখার আমিই তো দেখব,আমি ছাড়া আর কে দেখবে?”
ময়ূরী চোখ কপালে উঠিয়ে শাড়ি দিয়ে মুখ ঢাকল।বিড়বিড় করে যেন তাহসিনের পুরো গুষ্টি উদ্ধার করল।ওকে যেতে না দেখে বলল,
“নোংরা কথা বলবেন না।এখান থেকে যান আপনি।”
তাহসিন ঠোঁট চেপে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তুমি কী উপলক্ষে এই সকাল সকাল পুকুরে নেমেছো?”
“গরম লাগছিল তাই।এত প্রশ্ন করছেন কেন?”
তাহসিন আর লজ্জা দিলো না।হাত মুখ ধুতেই ফিরোজা বেগম খেতে দিলেন।১০টার দিকে ময়ূরী বারান্দায় বসে মা আর বোনের সাথে বসে বসে মাংস পিঠা বানাচ্ছিলো।তাহসিন খেতে চেয়েছে বলেই এই আয়োজন।হঠাৎ বাড়ির বাইরে বাইকের শব্দ শুনে তারা সেদিকে তাকালো।মধু গিয়ে বাড়ির গেট খুলে দিতেই দেখা হলো ওয়াহিদের সাথে।মধু আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আপনি?”
ওয়াহিদ বাইক এক সাইড করে রেখে মধুর কপালে টোকা মেরে বাড়ির ভেতর আসতে আসতে বলল,
“সালাম কালাম নেই?বেয়াদবের মতো কথা বলছিস।”
সে উঠোনে আসতেই অবাক হয়ে ময়ূরীর দিকে তাকালো।গায়ে গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি জড়িয়ে পুরো গিন্নি সেজে বসে আছে।ময়ূরী সালাম দিলো তাকে।ফিরোজা বেগম ভাইয়ের ছেলেকে দেখে ফের ব্যস্ত হলেন।তাকে বসতে দিলেন চৌকিতে।বারান্দার ছোট ফ্যান ছেড়ে দিয়ে দৌঁড়ে গেলেন ঘরে।ওয়াহিদ ময়ূরীকে দেখে বলল,
“ভেবেছিলাম বুড়ো কোনো কাকু দেখে তোকে বিয়ে দিব,কিন্তু তুই তো ছক্কা মেরে দিলি আগেই।”
ময়ূরী গাল ফুলিয়ে বলল,
“তুমি আবার আমার পেছনে লাগতে এসো না।”
“যাকগে,তোর জামাই কই?”
“ঘরেই আছেন,ঘুমাচ্ছেন হয়তো।”
তখনই তাহসিন বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।মূলত বউ কোনো অচেনা পুরুষের সাথে কথা বলছে বলেই ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে এসেছে।দুজনকে এত হাসাহাসি করতে দেখে কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়ল।বজ্জাত বউ একটা।জামাইয়ের সাথে তো একদিনও হেসে হেসে কথা বলল না,অথচ এখন?সে বিরক্ত হয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“কে আপনি?”
ওয়াহিদ দরজার দিকে তাকালো।তাহসিনকে দেখেই চিনতে পেরেছে সে।উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বলল,
“আমি ওয়াহিদ,মধুর মামাতো ভাই।”
তাহসিন হাত মিলিয়ে জোরপূর্বক হাসল।তারা চৌকিতে এসে বসল দুজনেই।ফিরোজা বেগম হালকা খাবার এনে রাখলেন তাদের সামনে।ময়ূরী কাজে মন দিলো।ওয়াহিদ বলল,
“আপনার ব্যপারে শুনেছি অনেক।”
তাহসিন অবাক হয়ে বলল,
“আমাকে চেনেন কী করে?”
“ফুপা বলেছেন।”
“ওহ!ভালো,কী করেন আপনি?”
“এসআই অফিসার ,এই গ্রামে নতুন ট্রান্সফার হয়েছি।”
তাহসিন চোখ টানটান করে ওয়াহিদের দিকে তাকালো।
“ট্রান্সফার কেন হয়েছেন?”
ওয়াহিদ উঠে দাঁড়াল।মাটির সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে নেমে পিছু ফিরে বলল,
“চলুন,হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাক।”
তাহসিন ও ওয়াহিদ বাড়ি থেকে বের হলো তৎক্ষণাৎ।ফিরতে ফিরতে দুপুরে আযান দিয়ে দিয়েছে।ময়ূরী সুন্দর করে ভাই আর পুতুলকে গোসল করিয়ে দিয়ে খাবার গুলো ঘরে নিয়ে যাচ্ছিল।মধু গেছে গোসল করতে,ফিরোজা বেগম রান্নাঘর পরিষ্কার করছেন।ময়ূরী কোমরে আঁচল গুঁজে গিন্নিদের মতো কাজে ব্যস্ত।
তাহসিন গম্ভীর হয়ে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে আছে খানিকক্ষণ ধরে।ওয়াহিদ অন্যঘরে গেছে হাত মুখ ধুয়ে।ময়ূরী কাজের ফাঁকে আড়চোখে তাহসিনের গম্ভীর মুখ দেখে ভ্রু কুঁচকে রেখেছে।রাগ যেন বাড়ল লোকটার।সে খোঁপ করে ময়ূরীর হাত আঁকড়ে ধরলো।ময়ূরী হতভম্ব হয়ে তাকালো,চোখ রাঙিয়ে বলল,
“কী সমস্যা?”
তাহসিন হঠাৎ ময়ূরীর কোমরে হাত রাখতেই মেয়েটা গুটিয়ে এলো তাহসিনের দিকে।কোমর থেকে আঁচল বের করে দাঁত চেপে বলল,
“তোমার ওই ভাইয়ের সাথে এত হাসাহাসি কীসের?আমার সাথে তো একদিনও একটু হেসে কথা বললে না।”
ময়ূরী তাহসিনের চোখে চোখ রাখে।কিছু বুঝতে পেরে বলে,
“আপনি কী হিংসা করছেন তাকে?”
“হিংসা করব কেন?”
“তাহলে আপনার এত জ্বলছে কেন?”
তাহসিন গম্ভীর নিঃশ্বাস ফেলে ওকে ছেড়ে দিয়ে বলে,
“উনার আশেপাশে যাবে না তুমি।”
ময়ূরী মুখ বাঁকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।সবার গোসল শেষ হলে খেতে দেয়া হয় তাদের।ওয়াহিদ কাজের জন্য এই গ্রামে ট্রান্সফার হয়েছে বলে সে ফুপুর বাড়িতে থাকবে বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।বক্কর কিংবা ফিরোজা বেগম কেও অমত করেননি,বরং ভীষণ খুশি হয়েছেন।ময়ূরীকে কয়েকদিন থাকতে বললেন ফিরোজা বেগম।তাহসিনের কাছে আশা নিয়ে প্রস্তাব রাখতেই তাহসিন মানা করতে পারল না।তাই বলে বউ রেখে সে সওদাগর বাড়ি ফিরবে না।
ময়ূরী খাবার এগিয়ে দিচ্ছিল।বক্কর বাজার থেকে হাঁস কিনে এনেছিলেন।ওয়াহিদ খেতে খেতে সবার সাথেই টুকটাক কথা বলছিল।তাহসিন চোখ ছোট ছোট করে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে আছে।মধু হঠাৎ বলল,
“এই ময়ূরী?দুলাভাইকে তরকারি দে,শুধু ভাইয়াকেই দিয়ে যাচ্ছিস দেখি।”
তাহসিন জোরপূর্বক হেসে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“মিসেস তাহসিন বোধহয় জামাইয়ের কথা ভুলে গেছে তাই না?”
ময়ূরী হতবাক।শুকনো ঢোক গিলে তাহসিনকে খাবার দিলো।ফিরোজা বেগম তরকারি নিয়ে শবনমদের বাড়ি গেছেন।সাথে বক্করও আছেন।তাই সব ময়ূরীই করছে।
ওয়াহিদ হেসে ফেলল তাহসিনের কথা শুনে।পুতুল ছোট ছোট হাত বাবার প্লেটে রেখেছে।তাহসিন ফোঁসফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছে।ময়ূরী বুঝল না হঠাৎ লোকটার কী হলো।
ওয়াহিদ খেতে খেতে বলল,
কিশোরী কন্যা পর্ব ৯
“ময়ূরী,কাল আমার সাথে একটু কচি ভাইয়ের বাড়ি যাবি।”
তাহসিন বলল,
“ময়ূরী কেন যাবে?”
“ওকে একটু দরকার আছে।এই ময়ূরী,যাবি না আমার সাথে?”
ময়ূরী আড়চোখে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা।”
তাহসিন কটমট করে তাকালো মেয়েটার দিকে।দাঁত চেপে খাওয়া বাদ দিয়ে বসে রইল সেভাবেই।ওয়াহিদ খাওয়া শেষ করে ঠোঁট টিপে হাসল।যেন তাহসিনকে খেঁপিয়ে বেশ মজা পাচ্ছে সে।
