কিশোরী কন্যা পর্ব ১১
হামিদা আক্তার ইভা
আকাশ সোনালি রঙ ধারণ করেছে তখন।সূর্য ডুবিডুবি ভাব।ময়ূরী চাচার বাড়ি এসেছে শবনমের সাথে দেখা করতে।শবনম তো তাদের বাড়ি যায় না,মূলত তাহসিন আছে বলেই যায় না।চাচার ছোট একটা বাড়ি,ভীষণ সাধারণ।জায়গা জমি যা ছিল সব তো চাচা বিক্রিই করে দিয়েছেন।
ময়ূরী শবনমদের বাড়ির বড় কাঁঠাল গাছের নিচে মাচালে বসে আছে শবনমের সাথে।শবনমের মন খারাপ।সে চুপটি করে বসে আছে ময়ূরীর পাশে।
“কী হলো?মন খারাপ কেন তোর?”
শবনম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“দিন কাল ভালো যাচ্ছে না।আব্বার আচার-আচরণ ভীষণ অদ্ভুত ঠেকছে।”
“চাচার আবার কী হলো?”
“আজ কাল নেশা কম করে করছে,তবে কাজ বাজ বড্ড অদ্ভুত।”
“ধুর এসব বাদ দে।আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।এখন বল,স্কুলের কী খবর?”
“ভালোই,সামনেই তো টেস্ট পরীক্ষা।”
ময়ূরী মাথা নাড়ল।শবনমের সাথে কথা বলে সে বাড়ি ফিরল সন্ধ্যা নাগাদ।তাহসিন আর ওয়াহিদ বাড়িতে নেই।পুতুল ঘুমাচ্ছে বিছানায়।আজ আদনানদের এই বাড়িতে আসার কথা পুতুলের জামা কাপড় নিয়ে।
ময়ূরী ঘরে গিয়ে দেখল ফাহাদ আর পুতুল পাশাপাশি শুয়ে ঘুমাচ্ছে।সে মুচকি হাসল।বিছানার এক কোনায় কিছু জামা কাপড় ছিল,সেগুলো ভাঁজ করে যত্ন করে রেখে দিলো।মধুর আর ময়ূরী এই ঘরে ঘুমাতো আগে।ছোট একটা ঘর।সেখানে একটা খাট,একটা মাঝারি সাইজের আলনা,কাঠের ড্রেসিং টেবিল,পড়ার টেবিল আর একটা শোকেস।মোটামোটি যা প্রয়োজন সব কিছুই আছে।ময়ূরী ঘরটায় চোখ বুলিয়ে দেখল একবার।কত স্মৃতি এই ঘরে।অথচ আজ এই ঘরে থাকতে হলেও তার অন্য এক মানুষের অনুমতি নিতে হয়।
সে বাইরে গিয়ে মায়ের হাতে হাত লাগিয়ে কিছু কাজ করো দিলো।মধু রান্না ঘরে রান্না করছে।আযান দেয়ার আগে ময়ূরী উঠোন ঝাড়ু দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে পুতুল আর ফাহাদকে ডেকে উঠালো।আযানের বেশ আধ ঘণ্টা পর তাহসিন ফিরল ওয়াহিদকে নিয়ে।উঠোনে হাজির হতে না হতেই ওয়াহিদ ময়ূরীকে উচ্চস্বরে ডেকে উঠল।তাহসিন ভ্রু কুঁচকে ওয়াহিদের দিকে তাকায়।
ময়ূরী দৌঁড়ে বের হয় ঘর থেকে।ওয়াহিদ ওকে দেখে বলে,
“ময়ূর,যা গামছাটা নিয়ে আয়।”
তাহসিন ভ্রু টানটান করে ময়ূরীর দিকে তাকায়।ময়ূরী ঘর থেকে দুইটা গামছা এনে একটা ওয়াহিদের হাতে দেয় আরেকটা তাহসিনের দিকে বাড়িয়ে দেয়।তাহসিন মেকি হেসে বলে,
“ময়ূর,তোমাকে তো আমি আদর করে ডেকে গামছা আনতে বলিনি।”
ময়ূরী হতভম্ব হয়ে বলে,
“ওমাহ,বাইরে থেকে এসেছেন হাত মুখ না ধুয়ে ঘরে ঢুকবেন?আর আমার নাম ময়ূরী,ময়ূর নয়।”
“সেটা তো ভালো করেই বুঝতে পারছি।”
ওয়াহিদ কলপাড় থেকে বের হলে তাহসিন ময়ূরীকে টেনে নিয়ে যায় কলপাড়ে।ওয়াহিদ ওদের দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকাতেই তাহসিন মুখের উপর কলপাড়ের টিনের দরজাটা লাগিয়ে দেয়।ময়ূরী ভয়ে বুকে থুথু দিয়ে বলে,
“উফ,কী হচ্ছে?বাইরে আম্মা,আপা আর ভাইয়াও ছিল।তাদের সামনে এভাবে টেনে নিয়ে এলেন কেন?”
তাহসিন সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
“আমার বিয়ে করা হালাল বউ তুমি।তোমাকে কোলে করে নিয়ে আসি কিংবা টেনে তাতে কে কী মনে করল আমার কোনো যায়-আসে না।”
“ভারী নির্লজ্জ লোক তো আপনি।বলি লজ্জা শরম বলতে তো কিছু আছে নাকি?”
“আমার কোনো লজ্জা শরম নেই।এখন আমি ফ্রেশ হব।তুমি কল চেপে দিবে,তারপর নিজের হাতে হাত মুখ মুছিয়েও দিবে।”
ময়ূরী দূরে সরে দাঁড়াল।বলল,
“ইশ,এত ঢঙ আমি করতে পারব না।আমার কাজ আছে,আমি যাচ্ছি।”
ময়ূরী উল্টো ঘুরে দরজা খুলতে গেলে তাহসিন হাত ধরে টেনে কাছে নিয়ে আসে।ময়ূরী হতবাক হয়ে তাকায় তাহসিনের দিকে।লোকটা অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে।ময়ূরী শুকনো ঢোক গিলে মাথা নুইয়ে ফেলে।লাজুক স্বরে গলা নামিয়ে বলে,
“ছাড়ুন।”
তাহসিন ছাড়ে না।বরং তার অবাধ্য হাত গিয়ে থামে কিশোরী বধূর ঠোঁটের কাছে।ওর নিঃশ্বাস গায়ে এসে লাগছে,বুকের ভেতর কেমন যেন ঢেউ খেলে যায় ময়ূরীর।চোখদুটো বন্ধ করে ফেলে সে।লজ্জায়,ভয়ে,না কি অন্য কোনো অচেনা অনুভূতিতে,সে নিজেও জানে না।
তাহসিন নিচু গলায় বলে,
“আমার বড্ড হিংসা হচ্ছে মেয়ে।”
ময়ূরীর গলা কাঁপে হালকা।মেয়েটার শ্বাস ভারী হয়ে আসছে।তার ঠোঁটের কোণ কাঁপছে।তাহসিনের আঙুল তখনও ওর চিবুকে,চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা।ও যেন মুহূর্তের জন্য সব ভুলে যাচ্ছে,চারপাশ,লজ্জা,ভয় কিছুই নেই,শুধু আছে তাহসিনের সেই দৃষ্টি।তাহসিন কিশোরী বধূর লাজ দেখে ঠোঁট এগিয়ে নেয় বউয়ের মুখমণ্ডলের একটু কাছে।স্পর্শ করার আগেই হঠাৎ দরজায় ঠাস ঠাস শব্দ হতেই দুজনে চমকে উঠে।
দরজার ওপাশ থেকে ওয়াহিদের ডাক,
“ময়ূরী! তাড়াতাড়ি বের হো,সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে!”
ময়ূরী এক লাফে সরে দাঁড়ায়,মুখটা আগুনের মতো লাল হয়ে গেছে।তাহসিন বিরক্ত হয়ে চাপা নিঃশ্বাস ফেলে।দাঁত চেপে ময়ূরীর দিকে তাকায়।ময়ূরী হাতের গামছা তাহসিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি কলপাড়ের দরজা খুলে বের হতেই ওয়াহিদকে দেখতে পায়।মেয়েটা লজ্জায় দৌঁড়ে ঘরের দিকে চলে যেতেই ওয়াহিদ আড়ালে ঠোঁট টিপে হাসে।হঠাৎ কলপাড়ের ভেতর থেকে তাহসিন গলা উঁচিয়ে বলে,
“যে শয়তান ছকড়া আমার রোমান্সে বাম হাত ঢুকিয়েছে তার কপালে মাবুদ বউ দিও না।আর যদি বউ দিয়েও থাকো,তাহলে একটা জল্লাদ মহিলা জুটিয়ে দিও।আমিনননন!”
ওয়াহিদ হতভম্ব হয়ে দাঁড়াল তাহসিনের অভিশাপ শুনে।ভাবা যায় কী ডেঞ্জারাস অভিশাপটাই না দিলো।সে তিনবার তওবা করে সেখান থেকে কেটে পড়ল।তাহসিন খানিক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে ঘরে এলো।আজ সে সজিবের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল ময়ূরীর ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে।বাপের বাড়ি যেকদিন আছে সেকদিন নাহয় একটু মা বাবার সাথে সময় কাটাক।
ময়ূরী নামাজ শেষে ঘরের বাইরে বের হয়ে বারান্দায় আসতেই দেখল মধু আপছা অন্ধকারে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে।তার কপালে গভীর ভাঁজ পড়ল।একবার পিছু ফিরে ঘরের দিকে তাকিয়ে মধুর পিছু নিল।
চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে।এই বৃষ্টি বাদলের রাতে আপা যাচ্ছে কোথায়?ময়ূরী পিছু ডাকল না,বরং আপার পিছু নিল নিঃশব্দে।পুকুর ঘাটের বটগাছের সামনে আসতেই দেখতে পেল রাজু এসেছে।শরীর জ্বলে উঠল তার।মধুর হাত দুটো আঁকড়ে ধরেছে ছেলেটা।মধু কিছু বলার চেষ্টা করছে রাজুকে,তবে রাজুর জন্য বলতে পারছে না।
“আগে আমার কথা শোনো,অনেক দরকারি কথা আছে আমার।”
রাজু বলল,
“পরে সব শুনব,কিন্তু এখন নয়।”
“খুব দরকারি।”
ময়ূরী হনহন করে কাছে এগিয়ে যেতেই ঘৃণায় শরীর গুলিয়ে উঠল।রাজু মধুর শরীরে হাত রেখেছে।মধু ওর হাত আঁটকে দিয়ে একটু দূরে সরে দাঁড়াতেই ময়ূরী তেরে গিয়ে রাজুর গাল বরাবর থাপ্পড় মেরে বসল।রাগে তিরতির করে শরীর কাঁপছে তার।
মধু চমকে উঠে হাত দিয়ে মুখ ঢাকতেই ময়ূরী দাঁত চেপে বলল,
“জানো’য়ার,তোর সাহস কত বড় তুই আমার আপার সাথে নোংরামি করছিস?”
রাজু রেগে তাকালো।গালে হাত দিয়ে শক্ত গলায় বলল,
“গলা নামিয়ে কথা বলো ময়ূরী।”
“বলব না,কী করবি তুই?তোর বাপ মেম্বার বলে যা খুশি তাই করবি?”
“গলাটা নিচে নামিয়ে কথা বলো।”
মধু ময়ূরীকে টেনে ধরে বলল,
“ময়ূরী,কী করছিস তুই?থাম!”
ময়ূরী বোনকে সরিয়ে দিয়ে রাজুর বুকে জোরে ধাক্কা মেরে বলল,
“এক বাপের সন্তান হয়ে থাকলে আমার আপার সাথে আর দ্বিতীয় বার দেখা করবি না।”
রাজু দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ।আড়চোখে মধুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার এই শরীর ভরা তেঁজ যদি আমি না ভেঙেছি তাহলে আমার নাম রাজু মণ্ডল নয়।এমন অবস্থা করব,এই মুখ কাউকে দেখানোর আগে শত বার ভাববে তুমি।”
“যা খুশি কর।তোর মতো কুকুরকে এই ময়ূরী ভয় পায় না।”
রাজু ঠোঁটের কোণে নোংরা হাসি টেনে সরে গেলে ময়ূরী পিছু ঘুরে দাঁড়ায়।মধু শুকনো ঢোক গিলে দৃষ্টি সরিয়ে নিলে ময়ূরী মাটিতে থুথু ফেলে ঘৃণিত কণ্ঠে বলে,
“ছিঃ, আব্বা আম্মা এসব জানলে কী হবে ভেবেছিস একবার?তুই আজ আব্বার সম্মান নষ্ট করেছিস আপা।তোর শরীরের সাথে সাথে তোর মনটাও নোংরা,অপবিত্র।তোকে নিজের বোন ভাবতেও ভীষণ লজ্জা লাগছে আমার।”
ময়ূরীর রাগে ঠোঁট কাঁপছে,বুকের ওঠা-নামা অস্বাভাবিক।মধু হঠাৎ ময়ূরীর পা আঁকড়ে ধরলো।ময়ূরী চমকে উঠে পা সরাতে গেলে মধু বলে,
“আমার কসম,আব্বাকে কিছু বলবি না।”
“পা ছাড় আপা।তুই পাপ করেছিস বলে এখন আমাকে পাপী বানাস না।পা ছাড়!”
“তোকে অনেক কিছু বলার আছে আমার।”
আদনান এসেছে হিমিকে নিয়ে।পুতুল হিমির কোলে বসে ফাহাদের নামে নালিশ দিচ্ছে।তার ভাষ্যমতে ফাহাদ তাকে হিংসা করে।আদনান ভ্রু কুঁচকে পুতুলের সব কথা শুনছে।এবার হিমির দিকে একটু চেপে ফিসফিস করে বলল,
“ডার্লিং,চল বিয়েটা করে ফেলি।তাহলে পুতুলের মতো আমাদেরও একটা পুতুল হবে।”
হিমি চোখ রাঙিয়ে বলল,
“আর একটা বাজে কথা বললে তোর গুষ্টির নাম ভুলিয়ে দিব।”
“এমন চুন্নির মতো করিস কেন সব সময়?ভবিষ্যৎ জামাই হই,একটু তো সম্মান দিয়ে কথা বল?”
“এই ফাজিল,আমি একবারও বলেছি তোকে বিয়ে করবো?”
“করবি না?তোকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোর করে হলেও বিয়ে করবো শালী।”
হিমি বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে তাকালো।তারা চলে যাবে একটু পর।তাহসিন তাদের সাথে একান্তে কিছুক্ষণ কথা বলল।বাইরে মেঘ ডাকছে,তাই তারা কিছুক্ষণ পরেই বেরিয়ে পড়ল।ময়ূরী গম্ভীর মুখে বসে আছে বারান্দায়।হাঁটু ভেঙে সেথায় হাত রেখে ঘাড় বাঁকিয়ে পুকুরের দিকে তাকিয়ে আছে।হঠাৎ পাশে কারোর অস্তিত্ব টের পেয়ে পাশে তাকায়।পুতুল বোকা বোকা চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।ময়ূরী সোজা হয়ে বসল।আদুরে হাত বাড়িয়ে দিতেই পুতুল হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের বুকের সাথে চেপে এলো।ময়ূরী মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“মন খারাপ?”
পুতুল বলে,
“তুমি কথা বলো না কেন?বাবা বলে আমার নতুন মা অনেক ভালো।একদম পুতুলের মতো।”
“তোমার বাবা এসব বলে?”
পুতুল মাথা নাড়ায়।ময়ূরী ঠোঁট টিপে হাসে।দরজায় হ্যালান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাহসিন।ঠোঁট কামড়ে বউ আর মেয়ের একান্ত মুহূর্ত দেখছে।ময়ূরী পুতুলের মাথায় চুমু খেল।পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তোমার নতুন মা নিজেই একটা বাচ্চা।তোমার যত্ন নিতে হলে তাকে আগে বড় হতে হবে,বুঝদার হতে হবে।”
পুতুল চুপ করে থাকে।তাহসিন পেছন থেকে হালকা গলা পরিষ্কার করে বলে,
“স্বামীর ভালোবাসা পেতে হলেও আগে মিসেস দিলরুবাকে বড় হতে হবে।”
ময়ূরী ফট করে পেছনে তাকায়।তাহসিনকে দেখে সন্ধ্যার কথা মনে হতেই লজ্জায় দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।তাহসিন এগিয়ে গিয়ে পাশে বসে।আশেপাশে অন্ধকার।আকাশে মেঘ ডাকার শব্দ ভেসে আসছে কানে।পুতুল মায়ের বুকে লেপ্টে থেকেই বাবার দিকে উকি দেয়।মুচকি হেসে বলে,
কিশোরী কন্যা পর্ব ১০
“আমাকেও ভালোবাসবে বাবা।”
তাহসিন মুচকি হাসল।মেয়ের মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
“আপনাকে তো ভালোবাসি আম্মা।কিন্তু আপনার মায়ের ভালোবাসার ধরন আলাদা।”
