কিশোরী কন্যা পর্ব ১৩
হামিদা আক্তার ইভা
আকাশে তখন হালকা কালো মেঘের দাগ, সূর্যের আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে একটু সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। হালকা বাতাসে কদম ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। দূরে কোথাও বৃষ্টির পর জমে থাকা জলে ছেলেপেলেরা কাগজের নৌকা ভাসাচ্ছে।
গাছের পাতাগুলো ধুয়ে একেবারে চকচকে সবুজ, মাঝে মাঝে একটা করে বড়ো ফোঁটা ছিটকে পড়ছে পাতার ডগা থেকে।
চারপাশ জুড়ে ঠান্ডা বাতাস ছেড়েছে।মধু ওয়াহিদের সাথে বাড়ি থেকে বের হয়েছে।বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব থাকলেও আজ পরিবেশটা ভীষণ স্বচ্ছ।বড় মাঠ পেরিয়ে ওরা দক্ষিণ পাড়ার কাছে এসেছে।চারপাশে আকাশমনি গাছ সারি সারি হয়ে সরু রাস্তাটা চলেছে সামনে।খানিকটু দূরে মধুদের ক্ষেত।ওয়াহিদ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে তোর?”
মধু ড্যাবড্যাব করে ঘাড় উঁচিয়ে তাকায়।মাথার কাপড় ঠিক করে বলে,
“আমার আবার কী হবে?”
ওয়াহিদ মধুর চোখের দিকে তাকালো।চোখ উঁচিয়ে বলল,
“রাজু ছেলেটার সাথে কী চলছে?”
মধু মাথা নিচু করে।শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
“আপনি জানলেন কী করে?”
“আমার কাছে সব খবরই থাকে।”
“আমার খবরটা কী করে জানলেন?”
“তোকে কেন বলব?”
“তাহলে আমিও বলব না।”
ওয়াহিদ হাত বাড়িয়ে মধুর মাথায় হালকা চাপড় মেরে বলল,
“এখন কী হয়েছে বলবি নাকি মার খাবি?”
সরু রাস্তায় মানুষজন খুবই কম।যারা আছেন তারা ক্ষেতের কাজ করতে ব্যস্ত।রাস্তার পাশে গাছের নিচে সবুজ ঘাঁসের উপর গিয়ে বসল মধু।মাথার কাপড় পড়ে গেছে অনেক আগেই।মুখের সামনে কিছু আলগা চুল এসে খিলখিল করছে।ওয়াহিদ এসে পাশে বসল তার।হালকা মাথা ঘুরিয়ে মধুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল।মধু সামনে দৃষ্টি রেখে ভেজা গলায় বলল,
“তখন আমার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়েছে।সামনেই এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় পড়াশোনায় একটু মনোযোগী হয়েছি।আপনি তো জানেন,পড়ালেখায় আমার তেমন একটা মনোযোগ নেই।তাই আব্বা একটা প্রাইভেট ঠিক করে দিলেন কলেজের কাছে।মানে মেম্বার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে।প্রাইভেট,কলেজ যেখানেই যেতাম দেখতাম রাজু ভাই দাঁড়িয়ে থাকত আমার জন্য।টেস্ট পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাস খানিক পর উনি একদিন জানায় সে আমাকে ভালোবাসে।লোকটাকে প্রথম প্রথম অদ্ভুত লাগলেও আস্তে আস্তে আমিও কেমন করে যেন ফেঁসে গেলাম।কয়েকমাস হয়েছে তার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক।শুরুতে ভালো থাকলেও আস্তে আস্তে কেমন যেন নোংরা প্রস্তাব দিতে শুরু করল।আমি অনেক মানা করেছি,বারণ করেছি এসব ঠিক নয়।সে শোনেনি,উল্টো রাগারাগি করেছে ভীষণ।”
মধুর গলা ভেঙ্গে এলো।ছলছল চোখে ওয়াহিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু বিশ্বাস করুন,আমি তবুও তার প্রস্তাবে রাজি হয়নি।গতকাল অব্দি সে আমায় জোর করেছে।আমি ফিরিয়ে দিয়েছি।তবে এটা সত্যি,আমি তাকে ভালোবেসেছি।”
গলার স্বর নিচু হয়ে এলো মধুর।চোখ নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“তবে আমার সর্বনাশ বোধহয় তার হাতেই লেখা।”
ওয়াহিদ কপালে ভাঁজ ফেলল।
“সর্বনাশ মানে?”
“উনি দুদিন আগে ভয় দেখিয়ে বলেছেন,যদি আমি শারীরিক সম্পর্কে না যাই তাহলে গ্রামে আমার নামে বাজে কথা রটাবে।এমন অবস্থা করবে আব্বা কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না।গ্রাম থেকে বের করার ব্যবস্থা করবে।”
মধু হুহু করে কেঁদে উঠল।
“গতকাল রাতে যদি ময়ূরী আমার পিছু না নিত তাহলে বোধহয় আমি রাজু ভাইয়ের ফাঁদে পড়ে মৃত্যুকে আপন করে নিতাম।”
ওয়াহিদ গম্ভীর হলো।গমগমে গলায় বলল,
“কাল রাতে তুই বের হয়েছিলি বাড়ি থেকে ওর সাথে দেখা করার জন্য?”
মধু ঘনঘন মাথা নাড়ায়।মেঘ ডাকছে শব্দ করে।আকাশটা প্রায় কালো হয়ে এসেছে।আকাশ ভেঙে বোধহয় বৃষ্টি হবে এখন।তীব্র বাতাসে মধুর ভেজা চুল উঁড়ে এসে ওয়াহিদের চোখে মুখে বারি খাচ্ছে।
“তুই কী চাস এমন একটা চরিত্রহীন ছেলের সাথে জীবন পাড় করতে?”
“সে আমায় বিয়ে করবে না।উনার ব্যপারে আমি গভীর ভাবে কিছু জানতাম না।এলাকার মেম্বরের ছেলে হওয়ায় তার নামে কেও বাজে কথা বলার সাহসও পায় না।ময়ূরী কাল আমাকে সব কিছু বলেছে।আমি কী করব বুঝতে পারছি না কিছু।”
ওয়াহিদ চুপ করে সব কিছু শুনল।ওকে চুপ করে থাকতে দেখে মধু ভেজা চোখে তাকায়।
“আপনি আব্বাকে সব বলে দিবেন নাতো?”
ওয়াহিদ চোখ গরম করে তাকালো।মধু শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“সত্যি বলছি,উনার সাথে আমার কিছু হয়নি।আমি তেমন কোনো সুযোগ দেইনি।শুধু আমার হাত ধরেছিল,আর একবার জড়িয়ে ধরেছিল।”
ওয়াহিদ উঠে দাঁড়াল।বৃষ্টি শুরু হয়েছে।মধু হতবাক হয়ে বসেই রইল।ওয়াহিদ কোনো কথা কেন বলছে না?আব্বাকে কী সত্যিই বলে দিবে?সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।আতঙ্কিত হয়ে বলল,
“সত্যি আমি আর উনার সাথে দেখা করব না।”
সে কানে হাত চেপে বলে,
“এইযে কান ধরেছি,সত্যি আর কথা বলব না উনার সাথে।আপনি আব্বাকে কিছু বলবেন নাতো?”
ওয়াহিদ প্যান্ট এর পকেটে হাত গুঁজে বাড়ির রাস্তায় হাঁটা ধরল।বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়েছে দুজনকেই।ক্ষেতের মানুষ ছুটে যাচ্ছে ঘর-বাড়ির দিকে।মধু দৌঁড়ে এসে ওয়াহিদের সামনে দাঁড়াল।গলা শক্ত করে মাথা উঁচিয়ে বলল,
“আব্বাকে বলে দিলে কিন্তু খুব খারাপ হবে।”
ওয়াহিদ চোখ ছোট ছোট করে হালকা ঝুঁকে এলো।কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“কী করবি তুই?”
“যা করার তাই করব।আপনি বলবেন না,কথা দেন?”
ওয়াহিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে সোজা হয়ে মধুকে পাশ কেটে হাঁটা ধরল।মধু সারাটা রাস্তা বকবক করতে করতে এলো।আর ওয়াহিদ?সে চুপচাপ বাঁচাল মেয়ের বকবক শুনে রাস্তা শেষ করল।
তাহসিনকে নিয়ে ময়ূরী চাচার বাড়ি এসেছে।চাচি তাহসিন আর ওয়াহিদকে আজ দুপুরের দাওয়াত দিয়েছিলেন।জামাই মানুষকে এক বেলা না খাওয়ালে হয়?আর ওয়াহিদও তো এদিকে তেমন আসে না।ওয়াহিদ দুপুরের খাবার খেয়ে চলে গেলেও তাহসিন ভালো মন্দ কথা বলছিলেন।কখন যে বেলা গড়িয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি।পুতুল বাবার কোলে বসে বাবার ফোনে গেম খেলছে।ময়ূরী পাশে বসে চোখ ছোট ছোট করে পুতুলের খেলা দেখছে।দেখতে দেখতে কখন যে তাহসিনের কাঁধে মাথা রেখেছে সে নিজেও জানে না।বাইরে তীব্র বৃষ্টির কারণে তারা বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না।
ময়ূরী তার চাচাতো ভাইয়ের ঘরে।লিটন না থাকায় এই ঘরটা খালিই পড়ে থাকে।দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর ওদের বিশ্রাম নেয়ার জন্য চাচি ঘর পরিষ্কার করে দিয়েছেন।তাহসিন বউ বাচ্চার গেম খেলা দেখে বিরক্ত হলো ভীষণ।বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে সংসার করতে হচ্ছে বুড়ো বয়সে।
পুতুলের ঘুমঘুম চোখ।সে ফোন বন্ধ করে বাবার কোল থেকে নেমে বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।ময়ূরী ঠোঁট উল্টে তাহসিনের তিন ক্যামেরার ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে।সাহস করে ফোনটা ধরতে পারছে না।তাহসিনের কাঁধ থেকে মাথা উঠিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখল বৃষ্টি আরও বেড়েছে।এখন বিরক্ত লাগছে তার।
তাহসিন হঠাৎ ময়ূরীর কোলে মাথা রেখে চোখ তুলে ময়ূরীর বিস্মিত বদন পানে তাকিয়ে বলল,
“মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।”
ময়ূরী আশ্চর্য হয়ে বলল,
“কোলে শুয়ে পড়লেন কেন?”
“বউয়ের কোলে মাথা রাখলে আলাদা এক শান্তি অনুভব হয় মনে।তুমি মেয়ে বড্ড অবাধ্য।”
বলতে বলতে ময়ূরীর ছোট ছোট হাত মাথার চুলের ভাজে রেখে বলল বিলি কেটে দিতে।ময়ূরী পিঠের পেছনে বালিশ রেখে হ্যালান দিয়ে বসল।তাহসিনের মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বেশ কয়েকবার আড়চোখে তার দিকে তাকালো।তাহসিন ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে আছে তখন থেকে।মেয়েটা লজ্জায় চোখ সরিয়ে বলল,
“চোখ দিয়েই গিলে খাচ্ছেন।বেহায়া লোক!”
তাহসিন ঠোঁট টিপে হাসল।বলল,
“তুমি যখন লজ্জায় চোখ সরিয়ে নাও সেই দৃশ্যটা আমার ভীষণ পছন্দ।এত লজ্জায় কোথায় রাখো বউ?”
“আপনি বেশি কথা বলেন।আপনাকে দেখে লজ্জা পাব কেন?আপনি কী নতুন জামাই?”
“নতুন জামাই না?বিয়ে হয়েছে মাত্র কয়েকদিন।লজ্জা তো আমাকে দেখেই পাবে।এই যেমন গতকাল রাতে…”
“ছিঃ, খারাপ লোক।”
তাহসিন ময়ূরীর মুখের সামনে চলে আসা চুল গুলো কানের কাছে গুঁজে দিলো।ফিসফিস করে বলল,
“বড় হও,তারপর খারাপ লোকের কাজ করে দেখাব।”
ময়ূরী তাহসিনের মুখ চেপে ধরল।চেপে ধরে দাঁত চেপে বলল,
“আর একটা কথা বললে মুখ সেলাই করে দিব।বেহায়া লোক একটা!লজ্জা শরম বলতে আপনার মধ্যে কিচ্ছু নেই?”
ঘরের বাতাসে এখন শুধু বৃষ্টির গন্ধ আর নিঃশব্দতার ভার। জানালার পাশে বৃষ্টির ধারাগুলো লম্বা হয়ে ঝরছে,টুপটুপ শব্দে যেন এক অচেনা ছন্দ বাজছে চারপাশে।আলো নেই,তবুও ময়ূরীর মুখে সেই মলিন আলো।মেঘের ফাঁক গলে এসে পড়েছে তার গালে।
তাহসিনের মুখ চেপে ধরা হাতটা ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে এলো।মেয়েটির চোখে এখন মিশে আছে রাগ,লজ্জা,আর কেমন যেন অচেনা এক কাঁপুনি।
তাহসিন নড়ল না,শুধু তাকিয়ে থাকল ওর মুখের দিকে।
বৃষ্টির ফোঁটা জানালা পেরিয়ে এসে ময়ূরীর গাল ছুঁয়ে গেলো।চুল ভিজে গিয়ে গাল বেয়ে পড়ে নামল একটা বিন্দু,যেন অজান্তে বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা নিঃশ্বাসের মতো।
তাহসিনের আঙুল এগিয়ে গেলো,ময়ূরীর গাল ছুঁয়ে সেই ফোঁটা থামিয়ে দিলো।মুহূর্তটা থমকে গেলো তখন।দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের খুব কাছে এসে মিশে গেলো।শব্দহীন,অথচ কেমন এক তীব্র শব্দে ভরে গেল ঘরটা।
বাইরে বজ্রপাত হলো,ঘরটা কেঁপে উঠল হালকা। ময়ূরী চমকে উঠতেই তাহসিনের হাত অজান্তে ওর মাথার পেছনে চলে গেলো।দুজনের দূরত্ব মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো।বৃষ্টির আওয়াজে ডুবে গেলো মেয়েটার দ্রুত চলা নিঃশ্বাস।ফের তাহসিনের অবাধ্য স্পর্শ পেয়ে চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল।দুজনের দুরত্ব বাড়লে ময়ূরী আঁচল টেনে ঠোঁট ঘষতে শুরু করল।তাহসিন চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইল।ময়ূরী নাক ছিঁটকে বলল,
“আপনার তো স্বভাব খারাপ।যখন তখন কাছে আসেন কেন?”
তাহসিন ময়ূরীর একটুখানি বদন চেপে ধরে বলল,
“বউয়ের কাছে না গিয়ে বাইরের মহিলার কাছে যাব?তুমি যদি বলো তাহলে যেতেই পারি।যাব অন্য মহিলাদের কাছে?”
“আপনি আসলেই একটা খারাপ লোক।”
“আমার মতো ছেলে আর দুটো খুঁজে পাবে?”
“চাই না।”
“আমি থাকতে অন্য পুরুষ আসবেও না।”
ময়ূরী মুখ বাঁকিয়ে তাহসিনকে ঠেলে বিছানা থেকে নামতে গেলে ময়ূরীর হাত চেপে ধরে তাহসিন।ময়ূরী কটমট করে তাকায়।তাহসিন কাছে টেনে ময়ূরীর দুই গাল টেনে দিয়ে বলে,
“পিচ্চি একটা মেয়ে হয়ে আমার সাথে রাগ দেখাও?এই মেয়ে,আমাকে ভয় পাও না?”
“আপনাকে ভয় পাব কেন?”
“কেন?”
তাহসিন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে।হঠাৎ,একদম আচমকা বউকে টেনে এনে কোলে বসায়।মেয়েটা হকচকিয়ে যাওয়ার সময়টুকুও পায়নি।শরীরে অদ্ভুত কম্পন শুরু হলো।সে চোখ খিঁচে বন্ধ করে বলল,
“আল্লাহ,ছাড়ুন বেহায়া লোক।”
তাহসিন ঠোঁট টিপে হেসে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
“ভয় পাও না?”
“পাই,খুব ভয় পাই।এবার ছাড়ুন।”
“মনে যেন থাকে।”
সন্ধ্যার আযান শেষ হয়েছে আরও আধঘণ্টা আগে।সওদাগর বাড়ির দুতলার পশ্চিম পাশের ঘরটা এখনো অন্ধকারে তলিয়ে।আফিয়া গভীর ঘুমে স্বামীর বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে।মাহতাব ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরে রেখেছে বউকে।জ্বর হালকা কমেছে ঔষধ খাওয়ার পর।সে আফিয়ার মাথায় হাত রেখে বিলি কাটতে শুরু করল।খানিকক্ষণ পর আফিয়ার ঘুম হালকা হয়ে এলে পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়।মাথা উঁচিয়ে তাকাতেই মাহতাবের সাথে চোখাচোখী হয়।সে সরে যেতে চাইলে মাহতাব শক্ত করে চেপে ধরে।কড়া গলায় বলে,
“কী সমস্যা?আদর করছি ভালো লাগছে না?”
“আপনার আদর আমার দরকার নেই।ছাড়ুন আমাকে।”
মাহতাব আফিয়ার মুখের সামনের চুল কানের কাছে গুঁজে দিয়ে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো।ফের শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল তাকে।
“তোমাকে আদর করব নাতো কাকে করব?আফি,এত শক্ত কবে থেকে হয়ে গেলে?আমার সাথে তো এত শক্ত হওনি কখনো।”
আফিয়ার গলা ভেঙে এলো।তবুও নিজেকে শক্ত করে বলল,
“মাহতাব,ছাড়ুন আমাকে।”
দরজার বাইরে বাতাসের শব্দটা তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।জানালার পর্দা উড়ে এসে কাঁচে ঠকঠক আওয়াজ তুলছে।ঘরের ভেতরে শুধু দুটো নিঃশ্বাসের শব্দ।একটা ভারী,একটায় থরথর কাঁপুনি।
মাহতাব হঠাৎ আফিয়ার চিবুক উঁচিয়ে ধরে।মেয়েটার চোখে স্পষ্ট অভিমান।মাহতাবের দৃষ্টি গভীর,একরোখা,যেন বহুদিনের দমিয়ে রাখা কিছু আজ ফেটে বেরোচ্ছে।
“মাহতাব…”
আফিয়ার গলা শুকিয়ে আসে,বাক্যটা শেষ করার আগেই মাহতাবের ঠোঁট এসে মিশে যায় তার ঠোঁটে।
আফিয়া মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায়।চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায় তার।চোখের কোণে জল জমে ওঠে,বুকের ভেতর ধুকপুক করছে দ্রুততর ছন্দে।কিছুক্ষণের মধ্যে দম আটকে আসা নিঃশ্বাসে হাত দিয়ে ঠেলে দিতে চায়,কিন্তু মাহতাবের শক্ত বাহুতে সে অসহায়।
চুমুর ফাঁকে কাঁপা গলায় আফিয়া ফিসফিস করে বলে,
“ছাড়ুন,প্লিজ…”
মাহতাব থামে না,বরং আরও কাছে টেনে আনে।তার কণ্ঠ গরম আর কর্কশ,
“তোমার উপর অধিকার আমার আছে,আফি আমায় এতটাও অবহেলা করো না যতটা অবহেলায় হৃদয়ে র’ক্তক্ষরণ হয়।”
আফিয়ার শরীর কাঁপছে,কিন্তু মন কেমন করে যেন থেমে গেছে।তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে বিছানায়।ঘরের বাতাস ভারী,অন্ধকারে শুধু নিঃশ্বাসের আওয়াজ মিশে গেছে বৃষ্টির ছন্দে।
অবশেষে আফিয়া ঠোঁট সরিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, গলার নিচ থেকে ভাঙা স্বরে বলে,
“আপনি আমাকে ভালোবাসেন না,আপনি শুধু নিজের ইচ্ছা বোঝেন।মাহতাব,আমাকে মুক্তি দিয়ে দিন।আমি এই সংসার আর চাই না।”
মাহতাব কিছু বলল না।চোখ নামিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।তারপর নিঃশব্দে উঠে জানালার দিকে চলে যায়।বাইরে আকাশের গর্জনে কাঁপছে ঘর।
আফিয়া বিছানার কোণে বসে থাকে নিস্তব্ধ হয়ে।ভেজা চোখে,বুকের ভেতর অদ্ভুত ভার নিয়ে।
মাহতাব ঘুরে দাঁড়ায়।দেয়ালে হ্যালান দিয়ে আফিয়ার দিকে তাকায়।
“আমার স্পর্শ তোমার পছন্দ নয় আফি?এত ঘৃণা কবে হলো বলোতো?”
আফিয়া মাথা নত করে বুকে হাত চেপে ধরল।তীব্র ব্যথায় বুক ফেটে যাচ্ছে যেন।সে পাতলা কাঁথা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
“এই আফির মতো কে আপনাকে ভালোবাসবে বলুন তো মাহতাব?এত ভালোবেসেও আপনাকে ধরে রাখতে পারলাম না,শুধু মাত্র একটা বাচ্চার জন্য?আমার কী দুঃখ হয় না?আমারও তো কষ্ট হয় এটা ভেবে,যে আমি কখনো মা হতে পারব না।”
মাহতাব এগিয়ে এলো।বিছানায় উঠে আফিয়াকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরল।বাচ্চাদের মতো যেন সেও কেঁদে উঠল নিঃশব্দে।
“আমার জীবনের সব চেয়ে বড় ভুল ছিল রাজনীতি করা।আফি,আমাকে এত ঘৃণায় রেখো না।বিশ্বাস করো,বিশ্বাস করো তোমার চোখে নিজের প্রতি ঘৃণা দেখলে মরে যেতে ইচ্ছে করে।দেহের চাহিদা পূরণ করার জন্য আমি তোমার কাছে আসি না। ৭ বছরে তুমি এই চিনলে আমায়?”
আফিয়া হুহু করে কেঁদে উঠল।শক্ত হৃদয়ের মেয়েটাও যেন স্বামীর বুকে এসে বাচ্চা হয়ে গেলো।মাহতাবের টি-শীতের কলার আঁকড়ে ধরে বলল,
“আপনি আমার থেকে একবার অনুমতি নেয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি মাহতাব।আপনার বাচ্চা চাই,আমাকে বলতেন আপনি আরেকটা বিয়ে করবেন।বিশ্বাস করুন,আমি মানা করতাম না।কিন্তু আমি কষ্ট পেয়েছি আপনি আমাকে একটাবার জানানোর প্রয়োজনবোধ করেননি।একবার জিজ্ঞাসা অব্দি করেননি।৭টা বছর যার বুকে মাথা রেখে পাড় করেছি,সেই মানুষটাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আমার সাথে।”
মাহতাব মাথা পেতে নিল সকল অভিযোগ।আফিয়া একপ্রকার ঠেলে তাকে ঘর থেকে বের করে দিতে চাইল।কিন্তু লোকটা একচুল পরিমাণ নড়ল না।আফিয়া ক্লান্ত হয়ে হাল ছাড়ল।ক্লান্ত শরীর খানা বালিশে এলিয়ে দিতেই মাহতাব নিজেও শান্ত হয়ে এলো।আফিয়ার বুকে মাথা রেখে ছোট শরীরটা জড়িয়ে ধরে নিচু গলায় বলল,
“পাপ তো করেছি আফি।পাপের শাস্তি মৃত্যু হওয়া দরকার।তুমিই নাহয় নিজের হাতে এই পাপিষ্ঠ পুরুষকে খু’ন করো।আমি হাসি মুখে সেই মৃত্যু কবুল করে নিব।তবুও এত ঘৃণায় আমাকে রেখো না।”
আফিয়া চুপটি করে শুয়ে রইল।চোখের কোণায় পানি টলমল করছে।
“আমার বাবার কোনো খোঁজ পেয়েছেন?”
মাহতাব শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“না!”
তাহসিন বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখল বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে খুব।না জানি কত মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙেছে এই ঝড়ে।তার খারাপ লাগল ভীষণ।দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুতুলের দিকে তাকিয়ে দেখল মেয়েটা শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।হঠাৎ চোখ গেলো শবনমদের ছোট উঠোনে কোমরে হাত চেপে বসে আছে ময়ূরী।বৃষ্টিতে পুরো ভিজে একাকার।সে বিচলিত হয়ে ছুটে ঘর থেকে বের হলো।দৌঁড়ে গেলো খোলা আকাশের নিচে।ময়ূরী দাঁত চেপে বসে ছিল।তাহসিন কাছে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু ভেঙে বসে বলল,
“এই রাত করে বাইরে এভাবে বসে আছো কেন?ইডিয়ট,জানো না ঠান্ডা লেগে যাবে?”
ময়ূরী হাত বাড়িয়ে তাহসিনের হাতে রাখল।ভাঙা গলায় বলল,
“বারান্দায় এসেছিলাম বাইরের পরিবেশ দেখতে।মাটির ঘর হওয়ায় বৃষ্টিতে ভিজে গেছে আমি খেয়াল করিনি।ঠাস করে নিচে পড়ে গেছি।”
তাহসিন রেগে ধমক দিলো।ওকে পাঁজা কোলে তুলে ঘরে নিয়ে এলো সোজা।ময়ূরীর চাচি চিন্তিত হয়ে লিটনের একটা নতুন লুঙ্গি আর শবনমের একটা কাপড় বের করো দিলেন।তাহসিন ঘরের দরজা আঁটকে দিতেই ময়ূরী চোখ বড় বড় করে বলল,
“আপনি ঘরে থাকলে আমি কাপড় পালটাব কী করে?”
তাহসিন দরজার সামনে গিয়ে কপালে হাত বুলিয়ে হালকা স্বরে বলল,
“আমি তোমার দিকে তাকিয়ে আছি নাকি?চিন্তা করো না,চোখ বন্ধ করে রাখব।”
ময়ূরী দাঁত চেপে বলল,
“আপনি বাইরে যান।”
“বৃষ্টি দেখেছ বাইরে?এই বৃষ্টিতে যাব?তুমি কাপড় পাল্টাও,আমি দরজার দিকে মুখ করে থাকছি।”
“আমার বিশ্বাস নেই আপনার ওপর।”
তাহসিন হালকা হেসে পেছন ঘুরে দাঁড়াল।
“তাহলে আমার সামনেই চেঞ্জ করো।আমিও একটু দেখি।”
ময়ূরী লজ্জায় নাক ফুলালো।তাহসিন ঠোঁট টিপে পিছু ঘুরল।বলল,
“ফাজিল মেয়ে তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করো।”
ময়ূরী কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।বাইরে বৃষ্টির আওয়াজে পুরো ঘরটা যেন টুপটাপ শব্দে ভরে উঠেছে।ধীরে ধীরে কাঁপা হাতে আঁচলটা খুলল সে।ভেজা কাপড় শরীরের সাথে লেগে আছে।চুল ভিজে গিয়ে পিঠে আটকে আছে।তাহসিন একবারও পেছন ফিরে তাকায়নি,কিন্তু তার নিঃশ্বাসের ভার যেন ময়ূরীর সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রতিক্ষণ।
ময়ূরী ফিসফিস করে বলল,
“আপনি তাকাবেন নাতো?”
তাহসিনের গম্ভীর গলায় উত্তর এলো,
“আর একটা কথা বললে সত্যি খারাপ হবে।”
মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দে কাপড় বদলাতে লাগল।চুপচাপ।তবুও বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করছে।নিজেকে শান্ত করতে পারছে না কিছুতেই।কাপড় বদলে যখন আঁচলটা মাথায় তুলল,তখন বলল,
“হয়ে গেছে।”
তাহসিন পেছন ফিরে তাকালো।মেয়েটাকে যেন অন্য এক আলোয় দেখা গেলো তার চোখে।আঁচলটা ভেজা চুলের গায়ে পড়ে আছে,মুখে ফ্যাকাশে ভাব, চোখদুটো লালচে,তবুও কেমন মিষ্টি।
তাহসিনের গলাটা শুকিয়ে এলো।
“ঠান্ডা লাগছে?”
ময়ূরী নিচু গলায় বলল,
“একটু কাঁপুনি দিচ্ছে।”
“চলো,চুল মুছে দেই।”
“না,লাগবে না।”
“বাচ্চা মেয়ে,একগুঁয়ে হয়েছো কবে থেকে?”
তাহসিন হাত বাড়িয়ে তার ভেজা চুলগুলো আলতো করে গামছাতে মুছতে লাগল।
ময়ূরীর চোখ বন্ধ হয়ে এলো অজান্তেই।তাহসিনের আঙুলের ছোঁয়া যেন বুকের ভেতরে কেমন এক দোলা তুলে দিচ্ছে।তাহসিন হঠাৎ একটু ঝুঁকে এলো।মেয়েটার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি কিন্তু ভীষণ সুন্দর বউ।দরজার কাছে একটা ছোট আয়না আছে।আমার অবাধ্য চোখ হালাল নারীর সর্বাঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেছে।”
তাহসিনের কথাটা শুনে ময়ূরী মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।হতভম্ব হয়ে গেলো।
মুখটা থেমে গেলো নিঃশ্বাসের সাথে।শরীরের প্রতিটি স্নায়ু কেমন যেন কেঁপে উঠল।তার ঠোঁট কাঁপছে,চোখ বড় বড় হয়ে আয়নার দিকে নজর দিলো।
আয়নায় দেখা যাচ্ছে ভেজা চুলে ঝুলে থাকা এক কিশোরী মুখ।
তাহসিনের বলা “হালাল নারীর সর্বাঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেছে”—এই কথাটাই যেন বিদ্যুতের মতো শরীরে দোলা তুলল।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে চোখের কোণে জল টলমল করছে।গলাটা শুকিয়ে এসেছে,ঠোঁট কামড়ে ভেতরে ভেতরে কিছু একটা আটকাতে চাইছে।
তারপর হঠাৎই দু’চোখ বেয়ে টুপটাপ নেমে এলো অশ্রু।
তাহসিন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“এই,কাঁদছো কেন?”
ভয়ে নয়,বরং লজ্জায় কেঁদে উঠল মেয়েটা।তাহসিনের বুকে মুখ লুকিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠল।তাহসিনের ভীষণ হাসিও পাচ্ছে আবার একটু খারাপও লাগছে।তারই বা কী করার ছিল?সব দোষ তো এই বেহায়া চোখের।চোখেরই বা কী দোষ?বউ হয়,তাহলে বউকে দেখতে আবার দ্বিধা কীসের?
কিশোরী কন্যা পর্ব ১২
সে সুযোগ বুঝে বউকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।বউটা চ্যাংটাকির মতো,ধরতে গেলেই ফুরুত করে বেরিয়ে যায়।আহারে নিজেকে কেমন ভ্যাবলাকান্তর মতো অসহায় মনে হচ্ছে।কত শখ করে একটা বিয়ে করেছিল,ঠাডা পড়া কপালে বউ জুটলেও বউয়ের আদর জুটল না।এই ফাটা কপাল কাকে দেখাবে সে?
