Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ১৪

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৪

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৪
হামিদা আক্তার ইভা

ময়ূরীদের গ্রামের বড় বাজারটা রাত ১০টার পরেই ফাঁকা হয়ে যায়। বৃষ্টি বাদলের দিনে তো মানুষই খুঁজে পাওয়া যায় না। সন্ধ্যা শেষে রাত ৮টার দিকে বৃষ্টি থেমেছে। গ্রামের চারপাশে মাটি-কাদা দিয়ে মাখামাখি অবস্থা। বাতাসে এখনো কাঁচা মাটির গন্ধ।বাজারের শেষ মাথায় একটা পুরনো রিকশা গ্যারেজ, যেখানে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে কয়েকটা রিকশা সারি করে রাখা আছে। গ্যারেজের ছাউনি থেকে পানি টপটপ করে পড়ছে, আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ চৌকিদার, হাফ প্যান্ট পরে হাতপাখা নাড়ছে অলস ভঙ্গিতে।

হঠাৎ দূর থেকে আসা ইঞ্জিনের গর্জনে রাতের নিস্তব্ধতা ছিন্ন হয়ে গেলো।
বড় ট্রাকের আওয়াজ মনে হয়।চৌকিদার মাথা তুলে তাকালো,কিন্তু কিছু বোঝার আগেই গ্যারেজের সামনের কাদামাটির রাস্তা কাঁপিয়ে ঢুকে পড়ল বিশাল দুইটা ট্রাক।হেডলাইটের আলোতে অন্ধকার ভেদ হয়ে ছিঁটকে পড়ল কাদা আর ধোঁয়া।
ট্রাকের দরজা খুলে নামল কালো রেইনকোট পরা দু’জন লোক। তাদের মুখ ঢাকা, শুধু চোখ জ্বলজ্বল করছে হেডলাইটের আলোয়।চৌকিদার ঠোঁটে আলতো হাসি টেনে বললেন,
“ছোট বাবু ভেতরেই আছে।আপনারা আসেন।”
অন্যদিকে,গ্যারেজ থেকে কিছুটা দূরে,পুরনো বাঁশবাগানের আড়ালে দাঁড়িয়ে দুজন আগন্তক নিঃশব্দে এই দৃশ্যটা দেখছিল।

একজন নিচু গলায় বলল,
“আপনি দেখেছেন তো? ওরা আবার এসেছে।”
অন্যজন ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করে বলল,
“হ্যা,এই রাতেই সব হবে মনে হচ্ছে।”
গ্যারেজটা বেশ বড়।অনায়াসে দুটো ট্রাক ভেতরে ঢুকে গেলো।গাড়িতে যে তেলের ডাম ছিল সেটা দেখেই বুঝা যাচ্ছিল।গ্যারেজের গেট খোলা রাখায় বাইরে থেকে পুরো দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল লাইটের আলোয়।এই গ্যারেজটা বড় বাজারের শেষ মাথায়।লোকজন দিনে বেলাতেই কম থাকে আর এই বৃষ্টির দিনে রাতে একটা শেয়াল কুকুরও পাওয়া যাবে না।

গ্যারেজের ভেতর থেকে ৭-৮জন লোক বেরিয়ে গাড়ির কাছে এলো।গাড়ি থেকে এক এক করে তেলের ডাম নামানো হচ্ছে সাবধানে।বেশ বড় বড় ডাম। চারদিকে শুধু লোহার ঠোকাঠুকির শব্দ, আর সেই সাথে বৃষ্টির পরের সোঁদা গন্ধে ভেসে আছে গোটা বাতাস।
আড়াল থেকে দাঁড়ানো দুজন আগন্তক নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। তাদের মধ্যে যিনি বয়সে বড়,তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“তেলের ডাম না,ভেতরে কিছু একটা আছে।”
অন্যজন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।
“মানে?”

“এই গ্যারেজে তেল রাখা নিষেধ, জানেন না? আগেরবার আগুন লেগেছিল এই কারণেই।তারপর থেকে ওরা অন্য জায়গায় রাখে। তাহলে এখন আবার এখানে তেল কেন?”
দু’জনের চোখ হেডলাইটের আলোয় ঝলমল করে ওঠা সেই ডামগুলোর দিকে আটকে গেলো। একটা ডাম নামানোর সময় হালকা একটা শব্দ হলো,যেন ভেতরে কিছু নড়ে উঠলো।
গ্যারেজের ভেতর থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“সাবধানে ধর, ভেতরে কিছু নষ্ট হলে বিপদ হবে!”
চৌকিদার তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিলো, তবে গেট পুরোপুরি বন্ধ করল না।এক ইঞ্চি ফাঁক রেখেই যেন কেউ বাইরে থেকে দেখতে পারে না, আবার ভেতর থেকে আলোও ফাঁস না হয়।
হঠাৎ গ্যারেজের ভেতরে একটা তীব্র আওয়াজ হলো,যেন কিছু একটা লোহার সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। তারপরই ভেতর থেকে কারও চিৎকার ভেসে এলো।
এক মুহূর্তেই গ্যারেজের বাতি নিভে গেল।
চারদিক নিস্তব্ধ।

২দিন পর সকাল সকাল তাহসিনরা তৈরি হয়ে নিল।আর থাকা সম্ভব নয় এখানে।ফিরোজা বেগম অনুরোধ করলেও তাহসিন রাজী হলো না।শেষে সবার থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হলো বাড়ির পথে।আজ সাথে আছে ফাহাদ সোনা।সে তাহসিনের কোলে উঠে দিব্যি আরাম করে যাচ্ছে।পুতুল হেঁটেই যাচ্ছে মায়ের হাত ধরে।সে গাল ফুলিয়ে বারে বারে বাবার কোলের দিকে তাকাচ্ছে।
ফাহাদ মাথা উঁচিয়ে দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দুলাবাই,পানি কিনা দাও।”
ময়ূরী চোখ পাকিয়ে বলল,
“চলে এসেছি,বাড়ি গিয়ে পানি খাবি।”
ফাহাদ গাল ফুলিয়ে তাহসিনকে বলল,
“ওওও দুলাবাই?”

তাহসিন শালাকে নিয়ে সামনেই একটা মুদির দোকানে গেলো।পুতুল আর ফাহাদের জন্য জুস আর চিপস কিনে আবার হাঁটা ধরল।ফাহাদ এবার গুটি গুটি পায়ে হাঁটছে তাদের সাথে।জুস খেতে গিয়ে শরীর নোংরা বানিয়ে ফেলছে।কিছুক্ষণের মধ্যে তারা বাড়ি এসে পৌঁছাল।ড্রয়িংরুমে মানুষ নেই একটাও।চম্পা বোধহয় কাপড় দিয়ে ফ্লোর মুছছিল।ময়ূরী বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই নজরে এলো এই দৃশ্য।চোয়াল যেন আপনা-আপনি শক্ত হয়ে এলো।মহিলা সব সময় বড় গলার ব্লাউজ পরেন,বুকের আঁচলটা যেন বাধ্য হয়ে গায়ে জড়ান।ময়ূরী হাত বাড়িয়ে তাহসিনের হাত আঁকড়ে ধরল।তাহসিন ঘাড় ঝুঁকিয়ে পাশে ময়ূরীর দিকে তাকায়।ময়ূরী বলে,
“ফাহাদের পায়ে কাদা লেগেছে।আপনি একটু কষ্ট করে বাগানের লাইন থেকে ওর পা ধুইয়ে আনবেন?”
তাহদিন বিচ্ছু ফাহাদের পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল সত্যিই কাদা লেগে আছে।সে মাথা নাড়িয়ে ফাহাদকে নিয়ে বাড়ির বাইরে যেতেই ময়ূরী পুতুলকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।চম্পার কাজ শেষ।সে বালতি নিয়ে পিছু ঘুরতেই ময়ূরীকে দেখে কপালে বিরক্তিকর একটা ভাঁজ ফেলল।পুতুল ভিতু হয়ে ময়ূরীর পেছনে গিয়ে লুকালো।
ময়ূরী শক্ত গলায় বলল,

“আপনাকে আমি কতবার বারণ করেছি এভাবে জামা কাপড় পরবেন না বাড়িতে?”
“আবার শুরু হইল!এই বাড়িতে আমি কী পরমু না পরমু সেইটা কি তুমি ঠিক কইরা দিবা?”
ময়ূরীর চোখ কটমট করছে।সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“হ্যাঁ, ঠিক করব। কারণ এটা আমার শ্বশুরবাড়ি, আর আপনি এখানে কাজ করেন।তাই সীমারেখাটা আপনাকে বুঝতে হবে।”
চম্পা মুখ ভার করে বালতি নামিয়ে রাখল।
“বউ,কাজ করি বইলা কি মানুষ না আমি? আমার শরীরে কাপড় আছে,তাও তোমার সমস্যা?”
ময়ূরী এগিয়ে এলো তার চোখে কঠিন ঝলক।
“সমস্যা তখনই হয় যখন আপনার মতো মানুষরা ইচ্ছা করে সীমা ছাড়িয়ে যায়।অন্যের সামনে শরীর দেখানো অভ্যাস হয়ে গেলে তখন সেটা শুধু কাপড়ের নয়,চরিত্রের ব্যাপারেও প্রশ্ন তোলে।আপনি কাজ করেন,আমি সম্মানও করি।কোনো কাজই ছোট নয় তাই বলে এভাবে চলা-ফেরা করবেন?”
চম্পা এবার কণ্ঠ উঁচু করল,

“তুমি খুব বড় চরিত্রবতী নাকি?”
“যদি বলি তাই?”
“আমার সাথে তর্ক কইরো না,বউ।”
তাহসিন ফাহাদকে কোলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চম্পা তাড়াহুড়ো করে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো।মুখটা তার রাগে লাল হয়ে উঠেছে,বালতি হাতে একটাও কথা না বলে সোজা রান্নাঘরের দিকেই চলে গেল।তাহসিন ভেতরে এসে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ময়ূরীর দিকে।
মেয়েটা যেন একদম বরফের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।চোখ দুটো রাগে ধিকিধিকি করছে,ঠোঁট কামড়ে চুপ করে আছে।

তাহসিন নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে? এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
ময়ূরী ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল,
“আমার মাথা হয়েছে,তাই দাঁড়িয়ে আছি।”
তাহসিন ভ্রু কুঁচকালো,কণ্ঠে অবাক স্বর,
“মানে?”
ময়ূরী আর কিছু বলল না।ঠোঁট কামড়ে পুতুলের হাত ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
তার হাঁটার ভঙ্গিটা এমন,যেন মাটির ওপর পা ফেলছে কিন্তু রাগের আগুনে চারপাশ পুড়িয়ে দিচ্ছে।পুতুল একবার বাবার দিকে তাকালো,তারপর মায়ের টানেই নীরবে উপরে উঠে গেলো।
তাহসিন দাঁড়িয়ে রইল নিচে।
বাইরের জানালা দিয়ে হালকা ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। দূরে উঠোনে গাছের পাতা নড়ছে,আর রান্নাঘরের ভেতর থেকে থালা-বাসনের ঠকঠক শব্দ ভেসে আসছে। চম্পা এখনো ভেতরে কাজ করছে, কিন্তু তার আওয়াজে বিরক্তির স্বর স্পষ্ট।

তাহসিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিঁড়ির দিকে যেতে নিলেই পেছন থেকে আদনান ডেকে উঠল তাকে।বাড়ির বাইরেই গিয়েছিল বোধহয়।এই সকাল সকাল তাহসিনকে দেখে বলল,
“শালা,শ্বশুর বাড়ি গিয়ে বাপের বাড়ির কথা ভুলে গেছিস?”
তাহসিন পিছু ঘুরে দাঁড়ায়।আদনানকে দেখ বলে,
“প্রাইভেসির বড্ড অভাব।”
আদনান ঠোঁট টিপে দুষ্টু হাসল।বিনিময়ে তাহসিনও মাথা নাড়ল।ফাহাদ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল দুজনের দিকে।আদনান বলল ফ্রেশ হয়ে তারপর দেখা করতে।তাহসিন উপরে উঠে ঘরের ভেতরে ঢুকে দেখল পুতুল ঘরের এক কোনায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে।ময়ূরী রাগে ফোঁসফোঁস করে মাথার হিজাব খুলে গায়ের বোরকা খুলল।তাহসিন হতবাক বউয়ের নতুন রূপ দেখে।যেন মনে মনে সে নিজেই একটু ভয় পেল।মহিলা মানুষের কারবার বড়ই অদ্ভুত।বুঝলেও সমস্যা,আবার না বুঝলেও সমস্যা।সে ঠোঁট কামড়ে ফাহাদকে নামিয়ে দিলো।ফাহাদ গুটিগুটি পায়ে পুতুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।তাহসিন হালকা গলা পরিষ্কার করে এগিয়ে গেলো ময়ূরীর নিকটে।পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে মিনমিন করে বলল,

“বেগম সাহেবা,আপনি হঠাৎ এত রেগে গেলেন কেন?”
ময়ূরী চোখ কটমট করে পেছনে তাকালো।তার দৃষ্টিটা এমন ছিল যেন তাকালেই আগুন ঝরে পড়বে।তাহসিন শুকনো ঢোক গিলে মাথা নিচু করল।যেন কারও সামনে দোষী ছাত্র দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষিকার সামনে।
ময়ূরীর মুখের রঙ ক্রমশ বদলে যাচ্ছে রাগে।
সে একটাও কথা না বলে ঘুরে দাঁড়াল।তারপর হনহন করে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলো।দরজা ঠাস করে বন্ধ হওয়ার শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল।
তাহসিন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।সে কী ভুল করল?নাকি ময়ূরীর রাগের কারণ অন্য কিছু।
পেছন থেকে ছোট্ট একটা কণ্ঠ ভেসে এলো তখন,পুতুলের।

“বাবা!”
তাহসিন ঘুরে তাকালো।পুতুল কপাল কুঁচকে, কৌতূহলভরা মুখে দাঁড়িয়ে আছে।তার পাশে ফাহাদও হাঁ করে তাকিয়ে।
পুতুল নিচু গলায় বলল,
“বাবা,মাকে কী ভূতে ধরেছে?”
তাহসিন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“মায়েদের মাঝে মাঝে রাগ নামের এক অদ্ভুত ভূতে ধরে।সেটা দেখা যায় না,কিন্তু সবাই টের পায়।”
ফাহাদ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাইলে কি আপারে মাইর দিবা,দুলাবাই?”
তাহসিন হেসে ফেলল।
“মার নয়, ভালোবাসা দিতে হবে।”
দরজায় কড়া নাড়ল কেও।তাহসিন গিয়ে দরজা খুলে দিতেই অরুণিমা বেগম,রজনী বেগম,হিমি এবং নূপুর ঢুকলেন ঘরে।পুতুল দৌঁড়ে গিয়ে দাদির পা জড়িয়ে ধরল।অরুণিমা বেগম নাতনিকে নিয়ে বিছানায় বসলেন।মাথায় আদুরে হাতও বুলিয়ে দিলেন।

“দাদির কথা মনে পড়ে না আপু?”
পুতুল মুচকি হেসে বলল,
“নানি বাড়ি সবাই ভালো।তুমি জানো?নানি আমাকে কত্ত গল্প শুনিয়েছে।”
তারপর ফাহাদকে দেখিয়ে বলল,
“আর ওইযে ছোট মামা,ওর সাথে আমি অনেক খেলেছি।”
অরুণিমা বেগম দরজার এক কোনায় ফাহাদকে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হেসে ফেললেন।হাতের ইশারায় কাছে আসতে বললে ফাহাদ গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে।তিনি হাত বাড়িয়ে ফাহাদকে বিছানায় উঠিয়ে পুতুলের পাশে বসায়।

“তোমার নাম কী সোনা?”
ফাহাদ পিটপিট করে তাহসিনের দিকে তাকায়।তাহসিন শালার এহেন চাহনি দেখে ঠোঁট টিপে হাসে।
“ওর নাম ফাহাদ,আম্মা।পুতুলের মতোই ভীষণ দুষ্টু।”
ফাহাদ গাল ফুলালো।দুলাভাই তাকে পাজি বলছে?কত বড় সাহস!
নুপুর পাশে এসে ফাহাদের গাল টেনে দিলো।টুপ করে দুই গাল ঠেঁসে চুমুও খেলো।বেচারা নাক কুঁচকে রেখেছে।নুপুর বলে,
“একদম তুলোর মতো নরম আম্মা।আমার বিয়াই আর একটু বড় হলে এর সাথেই বিয়েটা করতে পারতাম।”
ফাহাদ চোখ বড় বড় করে তাকায়।যেন সব চেয়ে আজব কথা সে শুনছে।

“তুমি বিয়া কুরবা?”
নুপুর খিলখিল করে হেসে মাথা নাড়ায়।ফাহাদ বলে,
“আমারে?”
“হ্যা।”
“বিয়া কুরতে ট্যাকা লাগে না?”
“লাগে।”
ফাহাদ তাহসিনের দিকে তাকায় আবার।শুষ্ক ঠোঁট খানা ভিজিয়ে বলে,
“ও দুলাবাই,ট্যাকা দাও আমি বিয়া কুরমু।”
অরুণিমা বেগমের মুখে মায়াময় হাসি।পাশে বসে নূপুর,হিমি আর রজনী বেগমও মুচকি মুচকি হাসছে ফাহাদের কাণ্ড দেখে।
ফাহাদ তখন নাক ফুলিয়ে দুলাভাইয়ের দিকে।
“ও দুলাবাই,আমারে ট্যাকা দাও।আমি বিয়া কুরমু।”
তাহসিন গম্ভীর মুখে বলল,
“কারে বিয়া করবেন আপনি?”
ফাহাদ হাত বাড়িয়ে নূপুরকে দেখিয়ে দিলো।নূপুরের হাসি চেপে রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হলো,সে খিলখিল করে হাসতে লাগল।
অরুণিমা বেগম মজা করে বললেন,

“আচ্ছা,নূপুর! তুই রাজী?”
নূপুর মুখে হাত দিয়ে ভান করল,
“আমি রাজী,আম্মা! এমন জামাই পেলে ভাগ্য খুলে যাবে।”
ওয়াশরুম থেকে ময়ূরী বের হলো মাথায় তোয়ালে মুড়িয়ে।ঘরের মধ্যে সবাইকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে সালাম দিলো।
অরুণিমা বেগম মিষ্টি করে হাসলেন।তিনি প্রথম প্রথম ভেবেছিলেন মেয়েটা বড্ড বেশিই ছোট।স্বামী সংসার কী করে সামলাবে এইটুকু মেয়ে?তবে এখন মনে হচ্ছে তিনি ভুল ভেবেছিলেন।পুতুলকে বেশ যত্নে রাখে মেয়েটা।আর..আর ছেলের সাথেও হয়তো সম্পর্ক সহজ হয়েছে।
“শোনো,অনেকদিন ঘুরেছ।এবার একটু সংসারে মন দাও।”
শাশুড়ির কথায় ময়ূরী মাথা নাড়ায়।রজনী বেগম যেন সব সময় নাতবউদের পেছনে লেগে থাকেন।যখন যেটা মুখে আসে সেটাই সোজাসজি বলে বসেন।

“আমার ভাই বিয়া করার পর দেখি নাতবউ আরও সুন্দর হইয়া গেছে।জামাইয়ের সোহাগ আমার লগেও ভাগ কইরো বউ।”
ময়ূরী হতভম্ব দাদি শাশুড়ির মুখে এমন কথা শুনে।অরুণিমা বেগম নাক কুঁচকালেন শাশুড়ির লাগামছাড়া কথায়।তাহসিন শুকনো ঢোক গিলে ময়ূরীর মাথায় প্যাঁচানো আধ-ভেজা তোয়ালে নিয়েই ওয়াশরুমে দৌঁড়ে গেলো।আশ্চর্য ব্যাপার!বউকে আজ অব্দি “ভালোবাসি” কথাটাই তো বলা হয়নি।আর দাদি তো সোহাগে সোহাগে মঙ্গল গ্রহে চলে গেছেন।
ঘরের ভেতর থেকে অরুণিমা বেগম ফাহাদ আর পুতুলকে নিয়ে গেলেন খাওয়াবেন বলে।সাথে হিমিও গেলো,শুধু থেকে গেলেন রজনী বেগম ও নুপুর।ময়ূরীর ভেজা চুল থেকে পানি ঝরছে টুপটুপ করে।হাতে ভেজা কাপড়।রজনী বেগম ময়ূরীর লাজে রাঙা মুখ দেখে বিছানায় আরাম করে বসলেন।
“শোনো বউ,বাড়ির বউ মানুষ বাড়ির বাইরে যাওয়াডা আমার বেশি পছন্দ না।তোমার দাদাশ্বশুর রাজনীতি করলেও হের ক্ষমতা বাড়ির বাইরে অব্দি’ই।বাড়ির ভেতরে সব আমার কথায় হয়।যা কমু তাই করবা।অনেক ঘুরছো বাপের বাড়ি,এইবার মন দিয়া সংসার করো।”

ময়ূরী সব শুনল মন দিয়ে।রজনী বেগম আরও কিছু কথা বলে বের হলেন।নুপুর বলল,
“ভাবি,দাদির কথায় এত কান দিবা না।আমি যাই,আমার আবার অনেক কাজ পড়ে আছে।”
নুপুর চলে যাওয়ার পর ময়ূরী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।দরজা চাপিয়ে দিয়ে বারান্দায় গেলো কাপড় ছড়াতে।তাহসিন তখন ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে কোনোরকম মাথায় পানি ঢেলে।ভেজা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আড়চোখে ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখল তার বউ নেই ঘরে।বারান্দার দিকে চোখ যেতেই এগিয়ে গেলো সেদিকে।নরম আলোয় কিশোরী বধূর নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে।লাল পাড়ের সবুজ শাড়ি গায়ে জড়িয়ে ভেজা কাপড় গুলো নাড়িয়ে দিচ্ছে রশিতে।ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছে।তাহসিন মুচকি হাসে।ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,
“তোমার পিঠে রোদ নেমেছে,বৃষ্টির আলোয় মিশে,

ভালোবাসার গন্ধ পাই,চুলের ফোঁটায় ভিজে।
ঘোমটার ফাঁক দিয়ে চোয়াল রেখা রাঙা মুখে লাজ,
তুমি আমার প্রথম প্রেম,চিরদিনের সাজ।
চোখে তোমার শিশির ভরা,ঠোঁটে হাসির রেখা,
এই সংসারটা স্বপ্ন লাগে,তোমায় পেলে একা।
মেঘে বৃষ্টি ঝরে যেমন,মনেও তেমন ঢেউ,
কিশোরী বধূ তুমি আমার,ভালোবাসার…”
তাহসিন কথা শেষ করার আগেই ময়ূরী থামিয়ে দিলো তাকে।আশ্চর্য চোখে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে রইল।তাহসিন বিরক্ত হলো ভীষণ মাঝ পথে এভাবে বিরক্ত করায়।রোমান্টিক একটা মুডে ছিল বেচারা।শালার বলদ বউ সেটাও নষ্ট করে দিলো।সে দাঁত চাপল।

“তুমি কী মানুষ হবা না?”
ময়ূরী বিস্মিত হয়ে শুকনো গলা ভিজিয়ে বলল,
“আমি তো মানুষই।”
“তুমি একটা বাঁদর।বেয়াদব বাঁদর চেনো?”
ময়ূরী কটমট করে তাকালো।শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে দুপা এগিয়ে এসে বলল,
“আপনি আমাকে অপমান করছেন?”
“অপমান কই করলাম?তুমি যেটা সেটাই তো বললাম।”
“খুব খারাপ হচ্ছে তাহ…”
কথা থেমে গেলো তার।তাহসিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সিন’টুকুও বলো?”

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৩

ময়ূরী রেগে ওর বুকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকল।লোকটা সীমার বাইরে ফাজিল।তাহসিন মুচকি হেসে হাতের ভেজা তোয়ালে সই করে ময়ূরীর মাথার উপর ছুড়ে মারল।মেয়েটা ভয়ে বুকে থুথু দিয়ে রেগে তাকালো পিছু ঘুরে।একটা মানুষ এত জ্বালায় কী করে?এই কয়েকদিনেই মনে হচ্ছে জীবনটা ঝালাপালা হয়ে গেছে।ময়ূরী বিরক্ত হয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে ঘরের বাইরে রওনা হলো।এখন ঘরে থাকলে নিশ্চিত মারামারি লেগে যাবে।

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৫