Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ১৬

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৬

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৬
হামিদা আক্তার ইভা

দুপুর বেলায় বক্কর বাড়ির জামগাছের নিচে কুদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে কিছু গাছ লাগাচ্ছিলেন।মধু বিরক্ত হয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আব্বার পাশে।বাড়িতে কয়েকজন পুলিশ অফিসার এসেছেন ওয়াহিদের সাথে সাক্ষাৎ করতে।ওয়াহিদ বারান্দায় বসেই কথা বলছিল।২জন সিনিয়র অফিসার এবং ২জন জুনিয়র এসেছেন।হঠাৎ ওয়াহিদ খেয়াল করল একজন মধুর দিকে তাকিয়ে আছে অদ্ভুত দৃষ্টিতে।হয়তো দৃষ্টিটা ছিল ভালোলাগার।তাদের সাথে কথা শেষে বাড়ির গেট অব্দি এলেন তারা।মধু ঘরের ভেতরে চলে গেছে তখন।বক্কর অফিসারদের বিদায় দিচ্ছেন।দুপুরে সবাইকে খেয়ে যেতে বললেও কেও রাজী হননি।যে অফিসার মধুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন,তার কাঁধে ওয়াহিদ হাত রাখতেই তিনি বিনিময় হেসে বললেন,

“কাল থেকে তাহলে দেখা হচ্ছে।”
ওয়াহিদ ঠোঁটে দারুণ হাসি টেনে বলল,
“অবশ্যই হবে।তার আগে নজরটা ঠিক রাখবেন।যার তার দিকে আবার নজর দিতে নেই,কেমন?”
অফিসার বিব্রত হয়ে হাসলেন।তারা চলে যাওয়ার পর ওয়াহিদ ঘরে এলো।দেখল মধু চুপচাপ বিছানায় বসে আছে অন্যমনস্ক হয়ে।এগিয়ে গিয়ে পাশে বসতেই মেয়েটা চমকে তাকায়।
“চলে গেছেন উনারা??”
“হ্যা!”
“ওহ,আপনাকে খাবার দিব?”
ওয়াহিদ বিনাবাক্যে নিচে বিছিয়ে রাখা পাটিতে বসে পড়ল।মধু আঁচল টেনে নিচে বসল।আব্বা আম্মা পরে খাবেন কাজ শেষ করে।আম্মা বলেছেন ওয়াহিদকে খাবার দিতে।মধু ব্যস্ত হাতে খাবার পরিবেশন করছিল।হঠাৎ ওয়াহিদ বলে,

“রাজুর সাথে আমার দেখা হয়েছিল।এলাকায় পাওয়ার আছে বলে হুমকিও দিয়েছে।”
মধুর হাত থেমে গেল।চোখ তুলে ওয়াহিদের দিকে ফিরতেই ওয়াহিদ চোখ উঁচিয়ে বলল,
“তোর মাথায় কী আক্কেল নেই মধু?”
“আমি আবার কী করেছি?”
“শেষবার যেই রাতে দেখা করছিস,সেই রাতে ওর সাথে ঝামেলা করেছিস কেন?”
“আমি তো ঝামেলা করিনি।ময়ূরী উনাকে থাপ্পড় মেরেছিল।”
“ময়ূরীকে কী বলেছিল?”
“ওকেও হুমকি দিয়েছিল।”
ওয়াহিদ ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ চুপ রইল।থানা থেকে ফোন আসছে ঘনঘন।বিকেলে একবার যেতে হবে সেখানে।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“বাড়ির বাইরে কয়েকদিন যাওয়ার দরকার নেই।বাড়িতেই থাকবি।”
মধু মাথা নাড়ল।জগ থেকে কাঁচের গ্লাসে পানি ঢেলে বলল,
“যাচ্ছি আর কই?সেদিনের পর থেকে তো বাড়ির বাইরে যাই না আমি।”
“দরকারও নেই।বউ মানুষ ঘরেই সুন্দর।”
মধু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।ওয়াহিদ সেই দৃষ্টি দেখেও না দেখার ভান করে খেতে শুরু করল।দুপুর শেষে যখন আকাশ কমলা রঙে রঙিন হলো,তখন ওয়াহিদ বাড়ি থেকে বের হলো।কালো শার্ট,প্যান্ট গায়ে জড়িয়ে চোখে কালো সানগ্লাস দিয়ে বাইকে চড়ল।থানায় পৌঁছাতে একটু সময় লাগল বটে।থানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন সু-দর্শন লম্বাটে শ্যাম বর্ণের পুরুষ।পাশে আরও একজন অফিসার।ওয়াহিদ ঠোঁট টিপে হাসল।বাইক থেকে নেমে হাত মেলালো তার সাথে।কিছুটা মজা করে বলল,

“বউয়ের কী খবর অফিসার?”
অপরপাশের লোকটা গম্ভীর মুখে থমথমে গলায় বলল,
“স্যাটআপ!কতবার বলেছি আপনি আমার বউয়ের কথা জিজ্ঞেস করবেন না।”
“আহা রেগে যাচ্ছেন কেন?আমি তো সিঙ্গেল মানুষ,আমার দুঃখটা কেন বুঝতে চাইছেন না?”
“বিয়ে করেছি বলে জ্বলে যাচ্ছে?আপনাকে আমি বারণ করেছি বিয়ে করতে?আমার বউয়ের দিকে নজর দিচ্ছেন কেন?”
ওয়াহিদ চোখ বড় বড় করে তওবা তওবা করে বলল,
“ছিঃ অফিসার,আমার এই নিষ্পাপ মনটাকে কলঙ্কিত করবেন না।আপনার বউ মানে আমার অর্ধেক ভাবি।”
পাশের জন আর কথা বাড়ালেন না।থমথমে মুখে থানার ভেতরে ঢুকল।থানায় Additional Inspector General Of Police সিনিয়র অফিসার এসেছেন থানায়।চেয়ারে বসে ছিলেন কিছু ফাইল নিয়ে।তারা ভেতরে ঢুকে প্রথমে দেখা করল অফিসারের সাথে।অফিসার গম্ভীর মুখে তিনজনকে দেখে কিছুটা রুষ্ট কণ্ঠে বললেন,

“নওমান তাহির,তোমার কী খবর?আমি কল করলে কেন তোমাকে খুঁজে পাই না?কাজ করছ নাকি নাক ডেকে ঘুমিয়ে’ই যাচ্ছ?”
নওমান নামের শ্যাম পুরুষ ঘাড় চুলকে বলল,
“এত সুখের পেশায় তো নেই স্যার।ঘুমিয়েও শান্তি নেই।”
“মজা করছি না আমি।কাজের কথায় আসো।এখানে এখনো ৫টা কেস পড়ে আছে,অথচ এখন অব্দি একটা কেসও সল্ভ করতে পারনি তোমরা।”
“এটা তো গ্রাম নয়,আস্ত একটা…”
“থামো!” অফিসার থামিয়ে দিলেন তাকে।তারপর লম্বা শ্বাস টানলেন।নওমানের সাথে কথা বললেই তার মেজাজ গরম হয়ে যায়।লোকটা সিরিয়াস কথা বলার সময়ও তামাশা করতে থাকে।তবু টিমে নওমানের মতো আর একটাও অফিসার নেই।নওমান তাহির,Special Branch এর সিনিয়র SB অফিসার।তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের লোক।ঠান্ডা মাথায় বেশ অনেক গুলো কেস হ্যান্ডেল করেছেন নওমান তাহির।
নওমান খানিক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“স্যার,বয়স হচ্ছে আমি কী বিয়ে করব না?”
“নওমান,কাজ রেখে বিয়ে নিয়ে মাতামাতি করছো কেন?মজা করছ আমার সাথে?আমি ঢাকা থেকে এখানে মজা করার জন্য আসিনি।”

“I’m not joking,sir.I really need to get married.”
“বয়স হোক,বিয়ে করিয়ে দিব।”
“তাহলে আপনার মেয়ের নাম্বারটা দিয়ে যান।”
অফিসার আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“আমার মেয়ের নাম্বার তোমায় দিব কেনো?”
“মন দিয়ে কাজ করব স্যার।যদি আপনি দয়া-মায়া করে বিয়েটা দিয়ে দেন।”
ওয়াহিদ হাসি থামাতে না পেরে হাত দিয়ে মুখ ঢাকলো।পাশে বসা জুনিয়র SB অফিসারও তাই করলেন।নওমান স্যারের রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে কেঁশে উঠল।গলা পরিষ্কার করে বলল,
“সরি স্যার!”
“কাজের কথায় আসবে নাকি তোমায় এই কেস থেকে বাদ দিব আমি?”
নওমান মিনমিন করে বলল,

“আমাকে ছাড়া এই কেস জীবনেও সল্ভ হবে না।এটা জানার পরও আমায় ভয় দেখাচ্ছেন?”
“উফ,তুমি আমায় পাগল বানিয়ে ছাড়বে।আমার হাতে সময় নেই।”
অফিসারের কণ্ঠে রাগের ঝাঁজ এখনো ঝরে পড়ছে, কিন্তু নওমান তাহির যেন সেই ঝাঁজে চা বানিয়ে খাওয়ার মতো মুখভঙ্গি করে বসে আছে।সিনিয়র অফিসার টেবিলের ফাইল একপাশে সরিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন,
“এই কেসটার গুরুত্ব বুঝছো তো,নওমান? এটা কোনো সাধারণ কেস না।”
নওমান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা হয়ে বলল,
“স্যার, আমি যদি একটা কেস হাতে নেই, ওটা ইতিহাস বানিয়ে ছাড়ি।”
ওয়াহিদ তখন হাসি চাপতে গিয়ে গলা দিয়ে “কর্কশ” শব্দ বের করল।সিনিয়র অফিসার সেই দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি হাসছো কেন,ওয়াহিদ?”
ওয়াহিদ হাত জোড় করে বলল,

“স্যার, আমি কাঁদছিলাম, হাসির মতো মনে হয়েছে বোধহয়।”
নওমান পাশে বসা জুনিয়র অফিসারের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এইজন্যই বলে,থানার বাতাসে অক্সিজেন কম। সবাই কনফিউজড।”
অফিসার এবার কপালে হাত দিয়ে বললেন,
“নওমান,তুমি যদি আর একটা ডায়লগ দাও,আমি নিজেই থানার গেটের বাইরে পোস্টিং দিয়ে দিব তোমায়।”
“স্যার, বাইরে দিলে ভালোই হবে, রোদে একটু ভিটামিন ‘ডি’ পাব।”
“নওমান!”
ওয়াহিদ আর জুনিয়র অফিসার এবার একসাথে হাসিতে ফেটে পড়ল।অফিসার একদম ক্ষেপে উঠে বললেন,
“আমি বুঝেছি, তোমাদের থানায় একটা মানসিক চিকিৎসক দরকার।”
নওমান মাথা চুলকে গম্ভীর গলায় বলল,
“স্যার, দরকার হলে আমি নিজেই আনি। তবে মহিলা হলে ভালো হয়।”
“কেন?”
“কারণ রোগী তো আমি, একটু ‘কেয়ার’ পেলে সুস্থ হয়ে যাব।”

আজকাল বৃষ্টিটা যেন একটু বেশিই হচ্ছে।ময়ূরী পুতুল আর ফাহাদের কিছু জামা কাপড় ধুয়ে দিয়েছিল।সেগুলো তাহসিন গিয়ে ছাদে ছড়িয়ে দিয়েছে।বাইরে ঘনকালো মেঘ জমেছে।বাজ পড়ছে থেকে থেকে।তাহসিন ঘরে নেই,কাকে বলবে কাপড় গুলো এনে দিতে?ছাদে গেলে কী রাগ করবে কেউ?বাড়ির নিয়ম গুলো বড্ড অদ্ভুত।স্বামী ছাড়া বাইরে যাওয়া নিষেধ বউদের।ময়ূরী বাধ্য হয়ে ঘর থেকে বের হলো।গাঢ় গোলাপি রঙের শাড়ির আঁচল মাথায় চেপে দৌঁড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল।ছাদের দরজা খুলে দিতেই আকাশ ভেঙে ঝরঝর করে বৃষ্টি নেমে এলো।মেয়েটা তাড়াতাড়ি কাপড় গুলো নামিয়ে নেয়ার আগেই সব ভিজে থুবু থুবু।ভীষণ বিরক্ত হলো সে।রেগে গিয়ে কাপড় গুলো সেভাবেই রেখে দিলো।
হঠাৎ,একদম আচমকা কোমরে কারোর স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই তাহসিন তার বলিষ্ঠ হাত দ্বারা ঝাঁপটে ধরল পেছন থেকে।ময়ূরীর শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী।বৃষ্টির ফোঁটা গুলো গায়ে লেগে পুরো সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিয়েছে দুজনের।মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে ধরল।কম্পিত ঠোঁট খানা নাড়িয়ে বলল,

“ছাড়ুন!”
তাহসিনের নিঃশ্বাস গরম,ময়ূরীর ঘাড়ে গিয়ে ছুঁয়েছে।তার বুকের ভেতর ঢেউ উঠছে বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে।বজ্রপাতের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য দেখা গেল।তাহসিনের চোখে কেমন এক অদ্ভুত ঝড়।ময়ূরী অনুমান করতে পারল তাহসিন কী চাইছে।সে শুষ্ক গলা ভিজিয়ে শরীর গুটিয়ে নিল।তাহসিন ঘাড়ের চুল সরিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“এই লাজে রাঙা মুখখানা আমার ভীষণ প্রিয়,বেগম সাহেবা!”
ময়ূরীকে কোলে তুলে নিল সে।ময়ূরী ভড়কে উঠে চমকে তাকায় তাহসিনের দিকে।সে আতঙ্কিত হয়ে ছাদের দরজার দিকে তাকায়।নিচু স্বরে বলে,
“পাগল হয়েছেন আপনি?কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?নামান আমাকে!”
“বউ আমার,কোলে নিয়েছি আমি,তাহলে মানুষের সমস্যা কী?”
“মাথা খারাপ হয়ে গেছে আপনার।”
“তোমাকে দেখে।”
“বাজে কথা না বলে নামিয়ে দিন।”

ময়ূরী তাহসিনের গলা জড়িয়ে ধরেছিল।মানুষটার থেকে উত্তর না পেয়ে লাজুক চোখ তুলে তাকাল তার দিকে।শ্যাম বর্ণের হালাল পুরুষের চোখে অদ্ভুত মাদকতা মিশে আছে।যেন নেশার মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে।দুরুদুরু বুক নিয়ে চোখ নামিয়ে নিল।তাহসিন নামিয়ে দিল তাকে,তবে বাঁধন থেকে ছাড়ল না।তাহসিন ধীরে ধীরে ময়ূরীর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে।বৃষ্টির জল ঝরে পড়ছে তার কপাল বেয়ে,আর তা ঠোঁটে গিয়ে থেমে যায়।মেয়েটার চোখে কাঁপুনি, তবু অদ্ভুত এক স্থিরতা।যেন সব বারণ গলে গেছে সেই দৃষ্টির উষ্ণতায়।তাহসিন ঠোঁটে অবাধ্য স্পর্শ করল।মেয়েটা লজ্জাবতীর ন্যায় শিটিয়ে নিল নিজেকে। বুকে জড়িয়ে ধরে ছোট বউকে।শক্ত করে আগলে ধরে বলে,
“পিচ্চি একটা মেয়ে,আমায় কালো জাদু করে এমন পাগল বানিয়েছো তাই না?”
ময়ূরী লাজুক স্বরে বলে,

“আমি কেমন করে আপনাকে পাগল বানিয়েছি?”
তাহসিন ঠোঁট টিপে হেসে ছাদের স্টিলের বড় দোলনায় গিয়ে বসে।বউয়ের ভেজা আঁচল খানা মাথায় দিয়ে কাঁধে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে।ময়ূরী ঘাড় উঁচিয়ে একবার তাকিয়ে লাজুক চোখ নামায়।
“শোনো মেয়ে,ভালোবাসা হলো অদ্ভুত একটা জিনিস।কখন কিভাবে কার প্রতি এই অবাধ্য অনুভূতি তৈরি হয়ে যায় আমরা নিজেরাও জানি না।”
তাহসিন বাম হাত দিয়ে কিশোরী বধূর চিবুক উঁচিয়ে নিজের দিকে ফেরায়।লাজে মেয়েটার অবস্থা নাজেহাল।লজ্জায় মুখ খানা লাল টুকটুকে হয়ে এসেছে।দুজনে বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেছে পুরোপুরি।তখনও আকাশ থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছে।তাহসিন হালকা এগিয়ে যায়।বউয়ের নাকে নাক ঘষে ফিসফিস করে বলে,

“এই যেমন এক ষোড়শী কিশোরীর প্রেমে পড়েছে গম্ভীর ‘মিসবাহ তাহসিন সওদাগর’।এর দায় কে নেবে বলো তো?”
ময়ূরী হাত বাড়িয়ে আঁচল টেনে মুখ ঢেকে ফেলল।তাহসিন শব্দ করে হাসল বউয়ের লাজ দেখে।
“লজ্জা পেলে বুঝি?”
“ইশশ,আমার বুঝি লজ্জা লাগে না?”
“বেগম সাহেবার বুঝি লজ্জাও লাগে?”
ময়ূরী তাহসিনের বুকে মুখ লুকায়।এত লাজ সে কোথায় রাখবে?লোকটা এত বেশি কথা বলে!
তাহসিন বউকে বুকে মিশিয়েই স্বর টেনে ধরল,
“দুধে আলতা গায়ের বরণ,
রূপ যেন কাঁচা সোনা!
আঁচল দিয়া ঢায়কা রাইখো চোখ যেন পড়ে না।
আমি প্রথম দেখে পাগল হইলাম,
মন তো আর মানে না…
কাছে আইসো,আইসোরে বন্ধু,প্রেমের কারণে!
ভালোবাইসো,বাইসোরে বন্ধু আমায় যতনে!”
স্বামীর মুখে এমন ধরনের গান শুনে লাজে লাল টুকটুকে হয়ে এসেছে কিশোরী।তাহসিন পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে তিনটা কদমফুল বের করে বউয়ের হাতে দিয়ে বলল,

“তোমার জন্য কষ্ট করে গাছে উঠেছিলাম।আমার ভালোবাসার কোনো দাম’ই নেই তোমার কাছে।”
ময়ূরী ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।দেখেই বুঝা যাচ্ছে খানিকক্ষণ আগেই গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা হয়েছে।হঠাৎ কানের কাছে তাহসিনের হাত এগিয়ে এলো।লাল টুকটুকে একটা র’ক্তজবা ফুল বউয়ের কানের গাছে গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“শাড়ির কোণে জলের ছোঁয়া,
চুলে বাতাস খেলে যায়,
মনটা আমার পাগল হয়ে,
তোর’ই নামে গান গায়।”
ময়ূরী কী আর কথা বাড়াতে পারে?সে দৃষ্টি নত করে ঠোঁট কামড়ে বসে আছে।পাশে তার’ই স্বামী বসে বসে তার লাজ দেখছে।দুজন চড়ুই পাখির সুখ নীড়ের মাঝেও এক অভাগী চোখে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছাদের দরজার আড়ালে।কনক এসেছিল দাদির কাপড় নিতে।আর এসেই এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখী হতে হবে সে ভাবতেও পারেনি।মেয়েটার শ্বাস আঁটকে এলো।বুকে হাত চেপে তাড়াতাড়ি ছাদ থেকে নেমে গেল।ঘরে এসে খট করে দরজা বন্ধ করল।দুচোখ ঝাপসা পানিতে টলমল করছে।যে পুরুষকে ভালোবেসেছিল সেই পুরুষ আজ অন্য নারীতে মত্ত।তার চোখের সামনেই কী সুন্দর করে বউকে ‘ভালোবাসি’ বলছে।এই ব্যথা কী সহ্য করা যায়?কনক হাঁটু ভেঙে দরজা ঘেঁষে নিচে বসে পড়ল।হাত-পা কাঁপছে তার।গায়ের ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরল কান্নার শব্দে।সহ্য করতে না পারলেও মেনে নিতে হবে বাস্তবতা।সে চাইলেও শখের পুরুষকে নিজের করে পাবে না।পাবে না সেই পুরুষকে,যাকে প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছিল।

রাতে বৃষ্টি থামেনি তখনও।বোরহান সওদাগর নিজের ঘরে অবস্থান নিয়েছেন।রুহুল এবং রমজান সওদাগর সেই ঘরেই উপস্থিত।তাদের মধ্যে কিছু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।আফিয়া সেই ঘরের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল শাশুড়ির ঘরে।হঠাৎ দাদা শ্বশুরের ঘর থেকে নিজের আব্বার নাম শুনে পা থেমে গেল দরজার বাইরে।অন্যায় জেনেও কৌতুহল বশত সে দরজা ঘেঁষে দাঁড়াল।ছোট চাচা কিছু একটা বলছেন তার আব্বাকে নিয়ে।সাথে মাহতাবের নামও যুক্ত।কিছু শুনতে পারছে না সে।সিঁড়ির দিক থেকে রজনী বেগমকে আসতে দেখে আফিয়া সরে গেল।শুষ্ক গোল ভিজিয়ে নিচে নেমে এলো।নিচে মাহতাব বসেছিল।হয়তো কোনো দরকারে তার দুজন লোক এসেছে।বাড়ির বাইরে তো মাহতাবের লোকদের জন্য যাওয়াও যায় না।আফিয়া বিরক্ত হয়ে শ্বশুরের ঘরে এলো।রহমান সওদাগর স্ত্রীর সাথে কথা বলছিলেন।আফিয়া আসতেই তাকে বসতে বলা হলো।আফিয়া চেয়ার টেনে খাটের পাশে বসল।

“আব্বা,আজ দুপুরে ডাক্তার আঙ্কেল কল করেছিলেন আপনার ছেলেকে।আগামীকাল হয়তো দেখতে আসবেন আপনাকে।”
রহমান সওদাগর মাথা নাড়িয়ে হেসে ফেললেন।
“ডাক্তার দেখিয়ে আর কী হবে আম্মাজান?আমার এই পা কী আর কখনো ঠিক হবে?”
“এমন করে কেন বলছেন আব্বা?আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব।তা ছাড়া আপনার শরীরটাও তো তেমন ভালো যাচ্ছে না।”
সিতারা বেগম তাল মিলিয়ে বললেন,
“আজ কাল তো তোমার শ্বশুরআব্বা ঔষধও খেতে চায় না।”
রহমান সওদাগর বললেন,
“বাঁচবই আর কতদিন?এসব ঔষধ খেতে খেতে এমনিতেই অর্ধেক জীবন পাড় করে ফেলেছি।”
“আপনি কথা কম বলুন।”

আফিয়া মুচকি হাসল।হঠাৎ দরজায় শব্দ হওয়ায় আফিয়া পিছু ঘুরে দেখল মাহতাব দাঁড়িয়ে আছে সাদা পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে।হাতে কালো রঙের একটা মানিব্যাগ আর ফোন।সে এগিয়ে এসে আব্বার পাশে বসল।রহমান সওদাগর কথা বললেন না ছেলের সাথে।ছেলে দ্বিতীয় বিয়ে করার পর থেকে ভদ্রলোক ছেলের সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছেন।মাহতাব আড়চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর কত রাগ করে থাকবেন আব্বা?”
রহমান সওদাগর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“তোমার মতো বেইমান ছেলেকে জন্ম দিয়ে ভুল করেছি আমি।কেন এসেছ আমার কাছে?”
আফিয়া বলল,

“আব্বা,সবাই তো চায় একটা সন্তানের মুখ দেখতে।”
“তুমি চুপ করো আফিয়া।”
আফিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল।একবার মাহতাবের দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে।মাহতাব আর কথা খুঁজে পেল না।
রহমান সওদাগর ঘরের বাতাসে ভর করে তীব্র দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।বৃদ্ধ মুখের রেখাগুলোয় জমে আছে ক্লান্তি আর অবিশ্বাসের ছাপ।তাঁর বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ, ঘৃণা আর কষ্ট যেন একসাথে ধাক্কা মেরে উঠছে।
মাহতাব কিছুটা ইতস্তত করে নরম গলায় বলল,
“আব্বা,যতই রাগ করেন আমি তবুও ছেলে আপনারই।ভুল করেছি,সেটা স্বীকার করছি।কিন্তু আপনি তো বাবা,ক্ষমা আপনার কাছ থেকেই চাইবার অধিকার রাখি।”
রহমান সওদাগর সোজা হয়ে বসে গম্ভীর গলায় বললেন,
“ক্ষমা আমি করতে পারি,কিন্তু বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারি না।যে ছেলে নিজের প্রথম সংসারের প্রতি এমন অন্যায় করতে পারে,সে আর কিসে ভালো হবে বলো?”

“আব্বা,আমি…”
মাহতাব কথাটা শেষ করতে পারল না।সিতারা বেগম শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“রাগ কমাও রহমান, ছেলেটা ভুল করেছে বটে, কিন্তু অনুতপ্তও তো হয়েছে।”
“তুমি জানো না সিতারা,ওর ভুল শুধু সংসারের না,মানসম্মানেরও।”
মাহতাব মাথা নিচু করে বসে রইল।সিতারা বেগম একবার স্বামীর দিকে,একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“চল,বাইরে যাই মাহতাব।আব্বা এখন কথা বলতে চায় না।”
মাহতাব আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল।ঘর থেকে বেরিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।আকাশ তখনো মেঘে ঢাকা, বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু বাতাসে কাঁদামাটির গন্ধ।দূর থেকে বজ্রপাতের মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে।মাহতাবের চোখে যেন সেই ঝড়েরই প্রতিফলন।
রাত গড়িয়ে গভীর হলো। আকাশে আবারো বৃষ্টি নামল।ঝমঝম শব্দে বাগানে টিনের চালে পানি পড়ছে।অন্ধকারে জোনাকির আলো চিকচিক করছে উঠোনে।বাড়ির সবার আলো নিভে গেছে প্রায়।কেবল একটি ঘরে এখনো আলো জ্বলছে-তাহসিনের ঘর।

পুতুল আজ দাদির ঘরে,দাদির সাথে ঘুমাচ্ছে।শুধু বিচ্ছু ফাহাদ দুলাভাইকে জ্বালাতে আজ বোনের সাথে ঘুমাচ্ছে।ময়ূরীও চায়নি ছোট ভাইকে অন্য কারোর ঘরে রাখতে।এতে অনেকেই বিরক্ত হতে পারে।ময়ূরী স্বাভাবিক থাকলেও তাহসিন মুখ কালো করে বসে আছে বিছানায় এক কোণায়।ময়ূরী ভাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।বাচ্চাটা প্রায় ঘুমিয়ে গেছে।তাহসিনের মেজাজ খারাপ শালার জন্য।ঘুমাবি ঘুমা,মাঝখানে কেন ঘুমাতে হবে?এটাই তার মেজাজ খারাপের কারণ।ময়ূরী শরীরে কাঁথা টেনে বালিশে মাথা রাখল।তাহসিনকে এখনো বসে থাকতে দেখে বলল,
“ঘুমাচ্ছেন না কেন?কাল আমার অনেক কাজ আছে।স্যারও কাল থেকে পড়াতে আসবেন।ঘরের বাতি বন্ধ করুন।”
তাহসিন অতি আশ্চর্য হলো।

“তোমার ভাইকে মাঝখানে রেখেছ কেন?ওকে তোমার ওইপাশে দাও।”
“ও কী করেছে আপনাকে?মাঝখানে থাকলে কী সমস্যা?”
“সমস্যার কথা বলা যাবে না।তুমি ওকে অন্যপাশে রাখো।”
ময়ূরী মুখ বাঁকিয়ে চোখ বন্ধ করল।তাহসিন দাঁত চেপে দেখল সবটা।বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করে মহা বিপদে পড়েছে বেচারা।খুব বড় ভুল হয়ে গেছে।মনের দুঃখ মনে রেখে ঘরের লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়ল সে।
মাঝরাতে মনে হলো পেটের উপর ভারী কিছু রাখা হয়েছে।তাহসিনের ঘুম ভেঙে গেল।বুঝতে পারল শালা পেটের উপর উঠে বসে আছে।দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনের লাইট অন করে বলল,
“কী সমস্যা?পেটে উঠে বসে আছো কেন?”
ফাহাদ ঠোঁট উল্টে কাতর কণ্ঠে বলল,

“দুলাবাই,আপা কুইছে বাতরুমে গেলে তোর দুলাবাইরে ডাকবি।”
“তোমার বোন তো সারাদিনই আমার মাথার চুল ছিঁড়ে খায়,এখন রাতে তুমি শুরু করেছ?”
“বিছনায় হিসি কুইরা দিমু?”
“শ্বশুরের পোলা,একটু কী আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবা না তোমরা দুই ভাই বোন?”
“প্যাত ব্যাতা করেরে।বিছনায় কুইরা দেই?”

তাহসিন নাক ছিঁটকে তাড়াতাড়ি উঠে বসল।ফাহাদের গুলুমুলু শরীরটাকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুমে দৌঁড়ে গেল।এসব তার গত কয়েক বছরের ডিউটি।মেয়েকে বড় করতে গিয়ে তার ট্রেনিং নেয়া হয়ে গেছে।
ফাহাদকে ওয়াশরুম থেকে বের করে নিয়ে এলো সে।বিছানায় নামিয়ে দিতেই বাচ্চাটা হামাগুড়ি দিয়ে বোনের শরীর ঘেঁষে শুয়ে পড়ল গলা জড়িয়ে ধরে।তাহসিন দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।বউ আর শালা,দুটোই ধান্দাবাজ।সে বিছানায় এসে ফাহাদকে টেনে নিজের পাশে এনে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৫

“এখানে ভালো ছেলের মতো ঘুমালে কাল অনেক গুলো চকলেট কিনে দিব।”
ফাহাদ একটা শব্দও করল না।তাহসিন কাঁথা টেনে শালার শরীর ঢেকে দিয়ে বউকে কাছে টেনে নিল।এখন শান্তি লাগছে।চোখ বন্ধ করে মেয়েটার চুলে নাক ঘষে ঠোঁট টিপে হাসল।তারপর বিড়বিড় করে বলল,
“ফাজিল বউ,জামাইয়ের কথা শোনে না।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৭