কিশোরী কন্যা পর্ব ২৩
হামিদা আক্তার ইভা
ঘরে তখন থমথমে নীরবতা।দু’জনের একজনের মুখেও একটা কথা নেই।ফিরোজা বেগম যাওয়ার আগে দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে গেছেন।বাইরে থেকে ফাহাদ আর পুতুলের ঝগড়ার কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে।তাহসিন হালকা গলা কেঁশে বলল,
“শুনছ?”
ময়ূরী উত্তর দিল না।তাহসিন শুষ্ক ঠোঁট ভেজাল।লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“এখনো রেগে আছো?”
এবার ময়ূরী মাথা তুলে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।বাইরে রোদ উঠেছে,স্বচ্ছ আকাশ আজ।মেয়েটা বলল,
“রাগ হবে কী নিয়ে?”
“আমাকে কী মাফ করা যায় না?”
“জানেন?কথা কখনো সামান্য হয় না।কথায় যেমন একটা সংসার বাঁধে,ঠিক তেমন একটা সংসার ধ্বংসও হয়ে যায়।”
তাহসিন আজ একদম নিশ্চুপ।আজ ময়ূরীর কথার পিঠে সে কোনো বাক্য খুঁজে পাচ্ছে না।ময়ূরী মৃদু হাসল।দৃষ্টি নত করে বলল,
“যেই সংসার আমি এতদিন নিজের ভেবে এসেছি,সেই সংসার তো আমার নয়।আমি যাকে নিজের সন্তান মনে করেছি,সেই সন্তানও তো আমার নয়।তাকে তো আমি পেটে ধরিনি।আর..আর যাকে নিজের স্বামী বলে মেনেছি,সেই লোক তো!”
তাহসিন মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে ধরল।কী করবে সে?কীই বা করার ছিল তার?তাহসিন বলল,
“তুমি কী ফিরবে না আমার সাথে?”
“যেখান থেকে নিজ ইচ্ছায় বেরিয়ে এসেছি সেখানে ফিরে যাই কী করে?”
তাহসিন হাত বাড়িয়ে ময়ূরীর হাত ধরতে গেলে ময়ূরী হাত সরিয়ে শক্ত গলায় বলে,
“বের হন ঘর থেকে।আপনাকে আমার সহ্য হচ্ছে না।”
“আমায় তোমার সহ্য হচ্ছে না?”
“নাহ!”
“ময়ূরী!”
ময়ূরী কান্না চেপে ঠোঁট কামড়ে ধরল।মাথার কাপড় টেনে নিয়ে বলল,
“আপনি বের না হলে আমি বেরিয়ে যাব এখন।”
তাহসিন ময়ূরীর সাথে খুলে কথা বলতে চাইল,ময়ূরী শুনল না।কিশোরীর মন তখন অভিমানে ভরে উঠেছে।কত বড় সাংঘাতিক একটা কাজ করেছে তাহসিন তার সাথে ভাবলেও কেমন মরে যেতে ইচ্ছে করে।তখন রাত ছিল ঘনকালো।সেই রাতে তাহসিন কী করে পারল নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে?ময়ূরী তো শুধু সত্যিটা জানতে চেয়েছিল।শান্ত থেকে জিজ্ঞেস করেছিল “পুতুল তো আপনার সন্তান নয়।তাহলে কেন এতদিন আমায় এই অন্ধকারে রেখেছিলেন?” তাহসিন তার উত্তর না দিয়ে উল্টো ওভার রিঅ্যাক্ট করেছিল।কিশোরীর ছোট্ট মনে গভীর ক্ষত এঁকে দিয়েছিল।সব ভুলের তো ক্ষমা হয় না।কিছু ভুল গুলো হৃদয়ে এমন ভাবে আঘাত করে,যা মরণের মতো যন্ত্রণা দেয়।
মেয়েটা পিছন ঘুরেই বসে রইল।তার কাঁধ দু’টো ক্ষীণভাবে কাঁপছে।বুকের ভেতরটা ব্যথায় মোচড়াচ্ছে।যে মানুষটার জন্য সব ছেড়ে নিজের সংসার গড়েছিল,সেই মানুষই এক রাতে তাকে যেন পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
তাহসিন ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।তার আঙুল দরজার হাতলে যায়,তবে খুলতে পারল না।আরেকবার ফিরে তাকাল ময়ূরীর দিকে।তার চোখে অসহায়তা,লজ্জা,অনুতাপ—সব মিশেমিশে একাকার।তাহসিনের গলা ভেঙে এলো,তবু নরম গলায় বলল,
“একবার তাকাবে আমার দিকে?”
“তাকালে কী হবে?আপনার প্রতি যে বিশ্বাস ছিল, সেটাই তো ভেঙে গেছে।বিশ্বাস ভাঙলে মানুষ কি আগের মতো হতে পারে?”
তাহসিন শুষ্ক মুখে হালকা হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।তাহসিন বেরিয়ে যেতেই মেয়েটার চোখ বেয়ে অঝরে জড়িয়ে পড়ল চোখের জল।হুহু করে ডুকরে উঠল মেয়েটা।তাহসিন বাইরে এসে দেখল সবাই কথায় ব্যস্ত।অরুণিমা বেগম ছেলের শুকনো মুখ দেখে ঘটনা যেন বুঝতে পারলেন।স্বামী-স্ত্রীর ঝামেলায় জড়ানো ঠিক নয় জেনেও অরুণিমা বেগম ভাবলেন ময়ূরীর সাথে তিনি কথা বলবেন।বাড়ির বউ এভাবে বাড়ির বাইরে থাকলে কেমন দেখায়?বক্কর তখন গম্ভীর মুখে বসে আছেন চেয়ারম্যান বাড়ির সদস্যদের সামনে।তাহসিনকে দেখে খানিক রাগ হলো তার।বোরহান সওদাগর আজ নীরব দর্শক।নাতির কর্ম-কান্ডে ভীষণ লজ্জিত হয়েছেন তিনি।ময়ূরীকে এক প্রকার জোর করে চেয়ারম্যান বাড়ির বউ বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।তিনি বক্করকে কথা দিয়েছিলেন মেয়েকে সুখে রাখবে।অথচ আজ তাহসিনের একটা ভুলের জন্য এভাবে লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে থাকতে হচ্ছে।
অরুণিমা বেগম ময়ূরীর সাথে কথা বলতে চাইলে ফিরোজা বেগম বলেন দুপুরের খাবার খাওয়ার পর তারপর ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করা যাবে।এখন আগে হাত-মুখ ধুইয়ে নিতে।ময়ূরী নিজেকে শান্ত করে মাথায় কাপড় দিয়ে ঘর থেকে বের হলো।বেরিয়ে আসতেই সে হেসে সালাম করল তাদের।আফিয়া ময়ূরীর শুকনো মুখ দেখে দৃষ্টি নামিয়ে নিল।কী অবস্থা মেয়েটার।কাল অব্দি যে মেয়েটা গাল ভরে হেসেছে,সেই মেয়ের মুখের দিকে আজ তাকানো যাচ্ছে না।অরুণিমা কাছে ডাকলেন ময়ূরীকে।ময়ূরী কাছে এগিয়ে গিয়ে শাশুড়িকে বলল,
“দুপুর তো হয়ে গেছে আম্মা।আপনারা হাত-মুখ ধুইয়ে আসুন।”
অরুণিমা বেগম বললেন,
“প্রথমবার বিয়াই বাড়ি এসেছি।না খেয়ে যাব ভেবেছ?”
ময়ূরী হাসল।দাদির পাশে পুতুল গাল ফুলিয়ে বসে আছে ফাহাদের সাথে।ফাহাদের হাতে সেই পুতুলটা।সে একা একা বকবক করছে নিজের মতো।ফিরোজা বেগম রান্নার ব্যবস্থা করছেন।ময়ূরী ফাহাদ আর পুতুলকে নিয়ে ঘর থেকে বের হলো বাইরে।ওয়াহিদ থানায় গেছে কিছু কাজের জন্য।সে এসে পড়বে খানিকক্ষণের মধ্যেই।মধু ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়ন করতে।ফাহাদ আর পুতুল ময়ূরীর শরীর ঘেঁষে বসে আছে বারান্দার চৌকিতে।পুতুল মায়ের গলা জড়িয়ে ধরেছে।অন্যদিকে ফাহাদ গাল ফুলিয়ে রাগে ফুঁসছে।বক্কর ফরাজীর সাথে বোরহান সওদাগর ঘরের মধ্যে কথা বলছেন বলে ময়ূরী বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে এসেছে।সে চোখ ঘুরিয়ে পুকুরের পাশে চোখ রাখতেই মনে হলো বাড়ির বাইরে জাম গাছের কাছে কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল।রাজুর মতো কেউ।রাজু এসেছিল কী?ময়ূরী কপালে ভাঁজ ফেলে রান্না ঘরের সামনে মধুর দিকে তাকাল।মধু তো বলেছিল রাজুর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই,তাহলে সে এখানে কী করছে?তাহসিন তাকে বেশ কয়েকদিন আগে বলেছিল,রাজু রাত্রি বেলা এই বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করে।একদিন সে নিজে দেখেছে একটা ছেলেকে নিয়ে এসেছিল।রাজুর চোখের চশমা ভেঙে মাটিতে পড়ে ছিল।
রান্না প্রায় হয়ে এসেছে।এরই মধ্যে তাহসিন ফিরেছে বাইরে থেকে ওয়াহিদের সাথে।সাথে এসেছে আদনান।আদনান উঠোনে ময়ূরীকে দেখে সালাম দিয়ে বলল,
“ভাবি,ভালো আছেন?”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আল্লাহ ভালো রেখেছে।আপনি ভালো আছেন?”
“জি ভাবি।খালা কোথায়?”
“ঘরেই আছেন।ভেতরে যান।”
আদনান মাথা নাড়িয়ে ঘরের ভেতরে গেল সবার সাথে।খাওয়ার ঘরে আজ মেহমান দিয়ে ভরা।খাবার পরিবেশন করছে ময়ূরী।ছোট্ট পুতুল আজ নিজের হাত দিয়ে খাবার খাচ্ছে।শুধু যে নিজে খাচ্ছে তা নয়,বরং ছোট ছোট হাতের মুঠোয় ভাত মাখিয়ে ফাহাদের মুখেও তুলে দিচ্ছে।শেষ মুঠোয় ফাহাদের মুখে ভাত দিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল,
“এই মামা,দুষ্টুমি করলে একটা চটকানা দিব।”
ফাহাদ মুখে ভাত নিয়ে ড্যাবড্যাব করে পুতুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ইয়ডা আবার কী?”
পুতুল বাম হাত উঠিয়ে ফাহাদের গালে আস্তে করে হাত ছুঁইয়ে বলল,
“এটা।”
ময়ূরী পুতুলকে দেখে অবাক হলো ভীষণ।দুঃখে চোখ ভিজে এলো আবার।
সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হওয়ার পর বিশ্রাম নিলেন সবাই।অরুণিমা বেগম আর আফিয়া ময়ূরির সাথে বসে আছেন মধুর ঘরে।ময়ূরীর বুকে পুতুল মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে।বাচ্চাটা আজ একটুও জ্বালায়নি তাকে।অরুণিমা বেগম খানিকক্ষণ পর পর দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।আফিয়া ময়ূরীর পাশেই বসে আছে।
“দেখো মা,আমি জানি না কার কাছে কী শুনেছ।কিন্তু বাড়ি ছেড়ে চলে আসাটা কী ঠিক হয়েছে?”
ময়ূরী পুতুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“নিজেদের কথা বাড়ির মানুষ জেনেছে,এতে আমার ভীষণ লজ্জা করছে আম্মা।কিন্তু আমার কিছু করার নেই।আপনার ছেলে অন্যায় করেছে এটা কেন মানতে পারছেন না?”
“আমি তো একবারও বলিনি তাহসিন অন্যায় করেনি।সে অন্যায় নয়,পাপ করেছে।”
“শুধু কী আপনার ছেলে দায়ী?আপনারা কেউ দায়ী নন?”
মুখের উপর এমন একটা কথা বলে ময়ূরী নিজেই হতভম্ব।সে ঠোঁট কামড়ে ধরল।তবু মনে হলো ভুল তো কিছু বলেনি সে!দোষ শুধু তাহসিনকে দিলেই হবে না,সাথে তো পুরো পরিবারও ছিল।অরুণিমা বেগম খানিক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“তা তো আর অস্বীকার করতে পারি না।অন্যায় তো করেছি।দেখো মা,ভুলটা শুধু তাহসিনের না।আমাদেরও।আমরা কোন দুঃসাহসে তোমাকে এত বড় সত্যি না বলে রেখেছি ভাবলে আমার নিজেরই লজ্জা করে।তুমি পুতুলের বিষয়ে জানলে কী করে?”
ময়ূরী শুষ্ক গলা ভিজিয়ে বলল,
“আপনি আর দাদি সেইদিন রান্না-ঘরে পুতুলকে নিয়ে কথা বলছিলেন।পুতুল যে আপনার ছেলের সন্তান নয় সেটা আমি ওইদিনই জেনেছিলাম।বড় ভাবিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সত্যিটা বলতে,কিন্তু ভাবিও আমায় পুরো সত্যি কথাটা বলেনি।”
দরজার সামনে তখন মধু এসে দাঁড়িয়েছে।সন্ধ্যা নেমেছে আরও অনেকক্ষণ আগে।মধু তাহসিনের আম্মাকে ঘরের বাইরে ডাকল একটু।আফিয়া তখন ময়ূরীর হাত মুঠোয় নিয়ে কাতর গলায় বলল,
“তুমি বাড়ি ফিরে চলো,ময়ূরী।”
ময়ূরী মাথা নাড়ল।চোখের পাতায় জল জমে উঠলেও সে কান্না আঁটকে রাখল।বাচ্চাটা ঘুমাচ্ছে,তার বুকের ওপর শ্বাস পড়ছে হালকা হালকা।এমন মায়ার সন্তান,অথচ সে নিজের পেটের সন্তান নয়।
আফিয়া বলল,
“তুমি ফিরে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে,দেখবে।”
ময়ূরী মাথা নিচু করে পুতুলের চুলে আঙুল চালাল,
“সব ঠিক হয়?কীভাবে?বিশ্বাস ভেঙে গেলে কি আবার গড়া যায়?”
“আমি মানছি তাহসিন দোষ করেছে,তাই বলে সংসার ছেড়ে দিবে?”
“ছাড়তে তো চাইনি।ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে।”
“এটা ভুল,ময়ূরী।”
ময়ূরী উত্তর দিল না।আসলেই কী ভুল?ময়ূরী লম্বা নিঃশ্বাস টানল।কী করবে সে?এইটুকু বয়সে এমন একটা পরিস্থিতির মুখো-মুখী হতে হবে কখনো ভবেনি।খানিকক্ষণ পর ফিরোজা বেগম এলেন মেয়ের কাছে।তিনি বসলেন মেয়ের পাশে।পুতুল তখনও মায়ের কোলে শুয়ে।ফিরোজা বেগম আড়চোখে নাতনির মুখ দেখে বললেন,
“তারা নিতে এসেছেন তোকে।কেন রাজী হচ্ছিস না?আজ বাদে কাল নূপুরের বিয়ে।বাড়ির বউ বাড়িতে না থাকলে কেমন দেখা যায়?”
ময়ূরী আশ্চর্য হয়ে বলল,
“এখন মানুষকে দেখানোর জন্য সেখানে যেতে হবে আমাকে?”
“যাবি না কেন?বিয়ে হয়েছে শ্বশুরবাড়ি যাবি না?সংসার কে দেখবে?সংসার করতে হলে এমন ছোট-কাটো ঝামেলা হয়েই থাকে।তাই বলে সংসার ছেড়ে দিবি কেমন কথা?”
“আমি থাকলে কী তোমার খুব বেশি অসুবিধা হবে,আম্মা?”
ফিরোজা বেগম হঠাৎ সাংঘাতিক এক বাক্য আওড়ালেন।তিনি রেগে গিয়ে বললেন,
“এখন কী তাই তোকে আজীবন খাওয়াব আমরা?তাই যদি হতো তাহলে তোকে বিয়ে দিয়েছি কেন?”
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে ময়ূরী চোখ তুলে তাকাল।একদম মায়ের মুখ-পানে।মায়ের রাগান্বিত বদন পানে।শ্বাস আঁটকে এলো মেয়েটার।শ্বাস আঁটকে মায়ের কথা হজম করার চেষ্টা করল।সব কথা কী হজম হয়?হয় না!তারও হলো না।মেয়েটা শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“আম্মা,বাপের বাড়ির এক মুঠো ভাতের দাম যে এতটা জ্বালা ধরাবে,কোনোদিন ভাবিনি।
যে ঘরে বড় হয়েছি,আজ সেই ঘরেই নিজের জন্য লজ্জা লাগছে।তোমাদের বাড়িতে যে ভাত আমি ছোটবেলায় হাত ছুঁয়ে খেতাম,আজ সেই ভাত যেন আমার জন্য বোঝা হয়ে গেছে!তাই না আম্মা?
মেয়ে হয়ে জন্মানোটা সত্যিই বড় দোষ,বড় অপরাধ!”
ময়ূরীর কথা শেষ হতেই ফিরোজা বেগম স্তব্ধ হয়ে গেলেন নিজের বলা কথায়।এত বড় একটা কথা তিনি বলতে পারলেন মেয়েকে?এত ভারী একটা কথা?এতদিনের নির্ভরতা,বিশ্বাস,ভালোবাসা সব কেমন এক মুহূর্তে তার কথার আঘাতে ভেঙে খানখান হয়ে গেল।আফিয়া নিঃশব্দে মুখ ফিরিয়ে নিল।সেও যেন লজ্জা পেল ময়ূরীর সামনে।মেয়েটা আর কিছু বলল না।শুধু দু’চোখের পাতা ভিজে উঠল,কিন্তু কান্না নামতে দিল না।যেন চোখের জলের প্রতিটা ফোঁটা এখন তার আত্মসম্মানের পাহারা দিচ্ছে।ফিরোজা বেগম এবার একটু শান্ত হয়ে বললেন,
“আমি…আমি রাগের মাথায় বলে ফেলেছি।এমন কথা মানুষ বলে?”
ময়ূরী ঠোঁট কামড়ে ধীরে বলল,
“যে বাড়িতে মেয়ে বড় হয়,সেই বাড়িতেই মেয়ের থাকার জায়গা থাকে না।তাহলে আর কী বলব,আম্মা?”
ফিরোজা বেগম মুখে আঁচল চেপে দৌঁড়ে বের হলেন ঘর থেকে।আফিয়া নিঃশব্দে প্রস্থান করল।ময়ূরী দরজার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।মায়ের বলা কথা খানা যেন বুকে খুব লেগেছে।মনে হচ্ছে কেউ বুকের ভেতর ছু’রি দিয়ে লাগাতার আঘাত করছে।
ময়ূরী দরজার ফাঁক দিয়ে মায়ের দৌঁড়ে চলে যাওয়া দেখল।ঘরটা হঠাৎ অদ্ভুত নীরব হয়ে গেল।শুধু পুতুলের ছোট ছোট শ্বাস ওঠা-নামা,এটাই যেন একমাত্র জীবন্ত শব্দ।মেয়েটা নিজের বুকের ভেতর হাত রেখে দেখল,সেখানে ব্যথা হচ্ছে সত্যি। সে সেই ব্যথাটাও চেপে রাখল।যেন কাঁদলে লাঞ্ছনা আরও বাড়বে।রাত নামল।পুরো গ্রাম তখন শান্ত।সওদাগর বাড়ির মানুষ-জন চলে গেছেন।তাহসিন মেয়েকে নিয়ে থেকে গেছে।ময়ূরীর ঘরে শুয়ে আছে তিন’জনেই।পুতুল মায়ের শরীর জড়িয়ে ধরে আরাম করে ঘুমাচ্ছে।ময়ূরী কিংবা তাহসীনের চোখে ঘুম নেই।বিয়ের এতদিনে কখনো ময়ূরী সংসার জীবনে এত বিষণ্ণতার আঁচ পায়নি।তবে আজ কেমন যেন বিষের মতো লাগছে এই সংসার,জীবন,বাস্তবতা।
ময়ূরী চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল।হঠাৎ তাহসিনের কণ্ঠস্বর পেয়ে অন্ধকারে চোখ খুলে তাকাল।
“এই অন্যায় কেমন করে যেন করে ফেলেছি।গত কয়েক বছর ধরে পুতুলকেই নিজের জীবন বলে ভেবে এসেছি।পুতুল যেন আমার মস্তিষ্কে আঠার মতো লেগে থাকে সব সময়।ও আমার বড় ভাইয়ের মেয়ে।ওর মা-বাবা মারা যাওয়ার আগে পুতুলের দায়িত্ব আমায় দিয়ে গিয়েছিল।ভাবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিল,-“মিশু,আমার মেয়ে আজ থেকে তোমার।কোনোদিনও তাকে মা-বাবার অভাব বুঝতে দিও না।”
আমি কখনো বিয়েই করতে চাইনি জানো?সব সময় ভেবেছি বিয়ে করলে বোধহয় আমার মেয়েটাকে অবহেলায় বড় হতে হবে।ভেবেছি পুতুলকে আমি ভালো রাখতে পারব না।”
তাহসিন থেমে গেল একটু।অন্ধকারে তার কণ্ঠ যেন আরও ভারী শোনাল।ময়ূরী নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে।পুতুলের মাথা তার বুক থেকে গড়িয়ে বিছানায় পড়েছে,মেয়েটা গভীর ঘুমে।তাহসিন আবার বলল,
“তোমার মতন কাউকে পেয়েই আমি সাহস করেছিলাম সংসার করতে।ভেবেছিলাম তুমি যেহেতু কোমল,যত্নশীল,তুমি পুতুলকে নিজের সন্তানের মতোই দেখবে।তাই…তাই সত্যিটা বলতে পারিনি।সব সময় একটা ভয় আমাকে খেয়ে ফেলত।যদি তুমি দূরে সরে যাও?যদি ভাবো তোমার স্বামী একজন পরের বাচ্চাকে নিয়ে পড়ে আছে।আমার সেই ভয়ই আমাকে অন্ধ করে দিল।আমি ভেবেছিলাম সত্যিটা জানলে হয়তো ওর প্রতি তোমার মায়া কমে যাবে।”
ময়ূরী শুষ্ক গলায় বলল,
“কিন্তু সত্যিটা লুকিয়ে রেখে কী পেলেন?”
তাহসিন চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“হারালাম তোমাকে।”
মেয়েটা চুপ।তার বুকের ভেতর হাহাকার উঠল,তবু চোখের জল নামতে দিল না।তাহসিন কাঁধ সোজা করে বসে বলল,
“ময়ূরী,সেদিন রাতে আমি রেগে গিয়েছিলাম।তুমি প্রশ্ন করেছিলে,আর আমি নিজের অপরাধে লজ্জা পেয়ে,ভয়ে,রাগে তোমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছি।তোমার কণ্ঠে সত্যিটা শুনতে পারিনি বলে তোমাকে আঘাত করেছি।আমি জানি,সেদিনের আচরণের কারণে আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না তুমি।কিন্তু বিশ্বাস করো,ওটা রাগ নয়,ওটা ছিল আমার ভয়ের চূড়ান্ত রূপ।”
“ভয় কীসের?আমি তো আপনারই ছিলাম।আপনার স্ত্রী,আপনার সংসার।আপনার সন্তানকেও নিজের সন্তানের মতোই ভালোবেসেছি।তাহলে আমাকে কেন ভয় পেলেন?”
“কারণ তুমি আমাকে যতটা বড় করে দেখেছ,আমি ততটা বড় মানুষ নই।আমি খুব সাধারণ,খুব ভীতু।”
ময়ূরী চোখ ঘুরিয়ে পুতুলের মুখে তাকাল।শিশুটার শান্ত নিঃশ্বাস কেমন যেন হৃদয়ে ধাক্কা দিচ্ছিল।সে ধীরে বলল,
“আমার প্রতি বিশ্বাস ছিল না আপনার।”
ঘরটা আবার নীরব।কেবল দূরের খোলা রাস্তায় কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছিল।তাহসিন আরেকটু কাছে এসে খুব ধীরে বলল,
“তুমি সদ্য কিশোরী,তবু তুমি এই সংসারকে আমার চেয়ে বেশি সামলেছ।কিন্তু আমি…আমি তোমাকে ভেঙে দিয়েছি।যদি পারো একটুখানি সুযোগ দিও,ময়ূরী।”
ময়ূরী চোখ বন্ধ করল।তার বুকের ভেতর যেন ঝড় বইছে।ভালোবাসা আছে—আছে অভিমানও।আর আছে এমন এক ক্ষত যা সহজে সারবে না।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
“সত্যিটা লুকিয়ে ভুল করেছেন।কিন্তু তার চেয়েও বড় ভুল করেছেন সেদিন রাতে আমাকে বের করে দিয়ে।একজন মেয়ের নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া আরেকটা মৃত্যুর মতো।আমি ভেবেছিলাম এই বুঝি পুতুলের বাবা পিছু ফিরে আমায় জড়িয়ে ধরবে।বুকে জড়িয়ে ধরে বলবে,-“আমায় ছেড়ে যেও না।”
কিন্তু আফসোস,আপনি আপনার অর্ধাঙ্গিনীকে চিনতে পারেননি।এত দুঃখ বোধহয় এইটুকু জীবনে কখনো পাইনি।যার কাছে নিজের দুঃখ বলব,সে নিজেই আমার দুঃখ হয়ে সামনে হাজির হলো।”
কিশোরী কন্যা পর্ব ২২
তাহসিনের বুকটা থমকে গেছে যন্ত্রণায়।অন্ধকারে তার নিঃশ্বাস যেন আঁটকে যাচ্ছে।মেয়েটার প্রতিটা শব্দ তার বুক ভেদ করে ঢুকছে তীক্ষ্ণ ছু’রির মতো।সে হাত বাড়িয়ে ময়ূরীর মাথার কাছে রাখতে গিয়েও থেমে গেল।ময়ূরী সরলো না,আবার এগিয়েও এলো না।দুজনের মাঝখানে কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব,অথচ সেই দূরত্বটাই আজ বিশাল এক দেয়াল।
দু’জনেই তখন চুপ।পুতুল হালকা নড়েচরে উঠেছে।বাচ্চাটা ঘুমের ঘোরে বারে বারে “মা” বলে ডাকছে।মিষ্টি কণ্ঠে “মা” ডাকটা শুনে ময়ূরীর চোখ ভিজে উঠল।সে তো মা নয়,তবুও এই বাচ্চাটার মুখে মা ডাকটা শুনলে ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে যায়।মেয়েটার গলা ভেঙে এলো।পুতুলের মাথায় কম্পিত ঠোঁট রেখে বিড়বিড় করে বলল,
“পেটে না ধরলেও পুতুল তো আমারই মেয়ে।”
