Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ২৪

কিশোরী কন্যা পর্ব ২৪

কিশোরী কন্যা পর্ব ২৪
হামিদা আক্তার ইভা

নীলচে-সাদা জোছনার আলোয় গ্রামটা অন্য এক পৃথিবী।রাত অনেক,কিন্তু চারপাশে শান্তি। আকাশজোড়া পূর্ণিমার চাঁদ নরম আলো ঢেলে দিয়েছে মাটির উঠোনজুড়ে।সেই আলোয় নারকেল গাছগুলোর ডালের ছাঁয়া লম্বা দোল খাচ্ছে,যেন হাওয়া ছুঁয়ে দিলে তারা গল্প বলবে ফিসফিস করে।
উঠোনের এককোনায় পুরনো কুয়োর পাশে একটা কলস রাখা,তার গায়েও জোছনার আলো নরম হয়ে লেগে আছে।

কোথাও একটা কুঁড়েঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে কুপি জ্বলার হলুদ আলো চিকচিক করছে।দু’চারটা পোকা সেই আলোয় উড়ে বেড়াচ্ছে।
গাধুলির পর থেকেই উঠোনটা ঠান্ডা।এখন তো আরও। মাটির উপর হাত বুলালে শীতল অনুভূতি। উঠোনের ধারে বসে থাকা কেউ যদি আকাশের দিকে তাকায়, চাঁদটাকে দেখে মনে হবে—এ জ্যোৎস্না যেন পুরো গ্রামটাকে গায়ে মেখে দিচ্ছে।দূরে কোথাও রাতজাগা পাখির এক-আধটা ডাক, মাঝে মাঝে কুকুরের ঘেউ-ঘেউ,আর সব মিলিয়ে এক নিখুঁত,শান্ত,জোছনা-ভেজা গ্রামের রাত।
‘মধুমিতা’ বক্কর ফরাজীর বড় কন্যা।ময়ূরী এবং মধু দু’জনেই চুপচাপ স্বভাবের।ময়ূরী যা একটু চঞ্চল,মধু মোটে নয়।সে পাখির মতো উঁড়ে বেড়াবে,তাও কারোর সঙ্গ ছাড়া।তার ভাষ্যমতে সঙ্গী থাকার চেয়ে একা থাকা ঢের ভালো।এইচএসসি দেয়ার পর থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে বিভিন্ন জায়গা থেকে,কিন্তু তার আব্বা বারণ করেছেন প্রত্যেকবার।তবে এখন বক্কর ফরাজী বড় কন্যার বিবাহ নিয়ে ভাবছেন।তার ধারণা মেয়েকে দিয়ে আর পড়াশোনা হবে না।তিনি সব সময় চেয়েছেন মেয়েদের শিক্ষিত বানাবেন।দুই মেয়ে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।মধুকে নিয়ে আশা ভাঙলেও ছোট মেয়েকে নিয়ে তার এখনো অনেক আশা।তিনি জানেন ময়ূরী একদিন অনেক শিক্ষিত হবে।পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।যখন মেয়ের ভালো জায়গায় চাকরি হবে,তখন বক্কর ফরাজী মেয়ের সামনে গর্বে বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে মুখে দারুণ হাসি টেনে বলবেন,

“আমি জানতাম আমার ছোট আম্মা একদিন এই পর্যায় আসবে।আব্বার স্বপ্ন পূরণ করবে।আজ মনে হচ্ছে এই পুরো পৃথিবীর মধ্যে বক্কর ফরাজী সব চেয়ে সুখী মানুষ।”
কবে আসবে সেইদিন?মেয়েকে যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন তিনি।তাহসিনের পরিবার নিয়ে বর্তমানে মেয়েটার উপর ঝড় বইছে।সংসার জীবনে ঢুকে পড়াশোনা যেন ভুলেই গেছে মেয়েটা।স্বামী,সন্তান,সংসার নিয়ে ভাবনা-চিন্তার শেষ নেই তার।ময়ূরী সদ্য ষোড়শী কিশোরী হলেও মেয়েটার দায়িত্ব আকাশ সমান।ষোলো বছর বয়সী এক কন্যার পক্ষে চার বছরের সন্তান সামলানো চার’টে খানি কথা নয়।

বক্কর ফরাজী উঠোনের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।চাঁদের আলোয় তাঁর বয়সের রেখাগুলো আরও স্পষ্ট দেখাচ্ছে।মেয়ের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন শুকনো দীর্ঘশ্বাস জমে উঠল।ময়ূরী এখন যে অবস্থায় আছে-তা সে নিজে চেয়েছিল,নাকি সময় তাকে ঠেলে দিয়েছে,এই প্রশ্নের উত্তর তিনি কখনো জানবেন না।দু’চোখ বন্ধ করলে বক্কর যেন দেখতে পান—স্কুলের বোরকা পরা সরু গড়নের মেয়েটা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দৌঁড়ে বাড়ি ফিরছে।হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে,
“আব্বা দেখো,আজ বিজ্ঞানে ৮২ পেলাম!”
সেই চোখের ঝিলিক,সেই উত্তেজনার হাসি সবই যেন হারিয়ে গেছে সংসারের জটিল ঘূর্ণিপাকে।
এখন ময়ূরীর মুখে হাসি কমে গেছে আগের তুলনায়।বেশি কথা বলে না সে।প্রতিদিনই একরকম ক্লান্ত,নিস্তেজ।শিশুটাকে বুকে নিয়ে ঘুম পাড়ায়,রান্নাঘরে ঢোকে,বাসন মাজে।এসবের মাঝেই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে।

তাহসিনকে নিয়ে সংসার করার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু মাঝে মাঝে তার চোখে এক ধরনের অদৃশ্য ভাঙাচোরা ক্লান্তি দেখা যায়,যা ষোলো বছরের কারো চক্ষে থাকা উচিৎ না।ষোড়শী কন্যা চায়নি বিয়ে করতে,বরং চেয়েছিল পড়াশোনা করতে।চেয়ারম্যান সাহেব সেটা হতে দিলেন না।নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে এক প্রকার জোর করে সওদাগর বাড়ির বউ বানিয়ে নিয়ে গেলেন ময়ূরীকে।আজ যখন তিনি মেয়ের বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন,মনে হয়েছিল মেয়েটা ভেতরে চিৎকার করে কাঁদছে।মনে হয়েছিল এই বুঝি বাবার বুকে হামলে পড়ে ডুকরে উঠে অভিযোগ করে বলবে, “আব্বা,আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করলে কেন?আমি কী তোমার সংসারের বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম?তুমি কেন চেয়ারম্যান দাদাকে বারণ করলে না?কেন বললে না আমার মেয়েকে আমি এখনই বিয়ে দিব না?কেন বললে না আব্বা?”
ময়ূরী ঘরের ভেতরে বিছানায় বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল আব্বার দিকে।জোছনার আলো মিলে তার মুখে ছায়া–আলো খেলছিল।

বুকে ছোট্ট মেয়ে ‘পুতুল’ আরাম করে ঘুমিয়ে আছে।নরম নিঃশ্বাস,নরম দেহ,যেন জানেই না তার মাকে জীবন কতটা ধাক্কা দিয়েছে এতো তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যেতে।ময়ূরীর চোখ দুটো স্থির হয়ে ছিল বাইরে উঠোনে দাঁড়ানো বক্কর ফরাজীর দিকে।
চাঁদের আলো পড়ে মানুষের শরীরটা যেন আরও ছোট,আরও ভাঙা দেখাচ্ছে।মেয়েটার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন খচখচে ব্যথা উঠল।ভাবল,আব্বা কী কাঁদছিলেন?এত দূর থেকেও তার চোখের ভিজে ওঠা পানি কী সত্যিই ধরা পড়ে যায় সন্তানের মনে?
দীর্ঘক্ষণ সে চুপচাপ তাকিয়ে রইল।তারপর ঠোঁট দু’টো শক্ত করে চেপে ধরল।মনে হলো বুকের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ,কষ্ট,আফসোস সবই যেন একসাথে গলা আঁটকে দিচ্ছে।
চুপচাপ ঘুমন্ত পুতুলের কপালে চুমু এঁকে দিল সে।

শিশুটার ছোট্ট মাথার গরম ভাবটা তার আঙুলে লাগছে।সে আপছা আলোয় পাশ ফিরে তাকায়।ময়ূরীর শাড়ির আঁচল হাতে প্যাঁচিয়ে শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে তাহসিন।বাবা-মেয়ে শান্তিতে চোখ বন্ধ করে রেখেছে।তবে আজ কিশোরীর চোখে ঘুম নেই,শান্তি নেই।আছে শুধু এক বুক হাহাকার,যন্ত্রণা,দুঃখ।মানুষ কিছু কিছু ভুল করে,যেগুলোর কখনো ক্ষমা হয়না কিংবা ক্ষমা করতে ইচ্ছে করে না।আজ ময়ূরী শক্ত একটা পুরুষকে কাঁদতে দেখেছে।খানিকক্ষণ আগেও সে তাহসিনের বুকে ছিল।তাহসিন ছোট্ট বউকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেমন বাচ্চাদের মতো কাঁদছিল।ফিসফিস করে হাজারটা কথা বলছিল।মেয়েটা চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টানল।পুতুলকে বাবার পাশে ধীরে শুইয়ে দিয়ে দু’জনের গায়ে কাঁথা টেনে গায়ের শাড়ি ঠিক করে ঘরের বাইরে বের হলো।
বাড়ির বাইরে গিয়ে খোলা উঠোনে আব্বার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে।বক্কর চমকে উঠলেন মেয়েকে এত রাতে বাইরে দেখে।তিনি বললেন,

“এত রাতে বাইরে কী করছিস?”
ময়ূরী মাথার কাপড় ঠিক করে নিভু গলায় বলল,
“তুমি এত রাতে বাইরে কেন?”
“এমনি এসেছিলাম।”
ময়ূরী এগিয়ে গিয়ে পুকুর পাড়ের দোলনায় গিয়ে বসল।বক্কর অবাক হয়ে মেয়ের কাণ্ড দেখলেন।জোছনা রাত হওয়ায় চারপাশ আলোয় আলোকিত।তিনি মেয়ের নিকটে এগিয়ে গিয়ে নিচে সিঁড়িতে বসলেন।ঠিক যেমনটা সেইদিন ফিরোজা বেগম বসেছিলেন।ময়ূরী হঠাৎ ডেকে উঠল আব্বাকে,
“আব্বা!”
“বল।”
“তুমি কাঁদছিলে কেন?”
“কাঁদছিলাম কই?”
“আমি তো দেখেছি।কী নিয়ে চিন্তা করছো?”

বক্কর চুপ রইলেন।কী বলবেন মেয়েকে?মেয়ের সাথে কথা বলতে লজ্জা হয় তার।লজ্জায় মেয়ের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন না।ময়ূরী আব্বাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল,
“জানি তুমি কী ভাবছ।কী নিয়ে দুঃখ করছো আব্বা?আম্মাই তো বলল,স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন ঝামেলা লেগেই থাকে।”
“আম্মার কথায় কষ্ট পেয়েছিস?”
“কষ্ট কেন পাব?আম্মা তো ভুল কিছু বলেনি।বিয়ে যখন হয়েছে তখন মাটি কামড়ে হলেও শ্বশুর বাড়ি থাকতে হবে।বাবার বাড়ির মেহমান আমি।দুইয়েক দিন থাকব,ঘুরব,খাব তারপর আবার শ্বশুর বাড়ি ফিরে যাব।শোনো আব্বা,আমি তোমার বাড়ি আজীবনের জন্য আসিনি।দেখলে না,আমার স্বামী এসেছে আমায় নিয়ে যেতে?তার বাড়ি’ই আবার ফিরে যাব।তোমার বাড়ি আজীবনের জন্য কখনো আসব না।”
বক্কর ফরাজীর চোখ লাল টকটকে।হয়তো দুঃখে,অপমানে।মেয়ের চোখে আজ নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হচ্ছে।তিনি আজ কোনো কথাই বলতে পারলেন না।ময়ূরীর কণ্ঠে কাঁপন ধরেছিল।মেয়েটা চুপ থেকে নিজেকে শক্ত করে স্বাভাবিক হলো।নরম গলায় মিষ্টি স্বরে বলল,

“আমার পরীক্ষা সামনে।আর তো আসব না এই বাড়িতে।যাওয়ার আগে একটু দোয়া করে দিয়ো তো আব্বা।”
“আসবি না মানে?” চমকে উঠলেন তিনি।
ময়ূরী খিলখিল করে হেসে উঠল।বলল,
“ভয় পাচ্ছ কেন?আমার ননদের বিয়ে রেখে আসি কী করে?আমি তো এখন অন্যের ঘরের বউ।ভুলে গেছো?তোমার মেয়ের এখন কত দায়িত্ব।তার সন্তান আছে,বড় একটা সংসার আছে।তোমার বাড়ি এসে পড়ে থাকলে ওসব দেখবে কে?”
ময়ূরীর প্রত্যেকটা কথা ছু’রির মতো ধারালো।প্রত্যেকটা কথার এত ওজন,যে বক্কর অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।মনে হলো মেয়েটা খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেছে।বাস্তবতা মেনে নিতে শিখেছে।যে মেয়েটা অন্যায় সইতে পারে না,আজ সেই ষোড়শী অন্যায়কেও মেনে নিয়েছে।
“এত ভারী ভারী কথা কিভাবে বলছিস?”
মেয়েটা ফের হাসল।দোলনা দুলিয়ে বলল,
“ভারী ভারী কথা আবার কী,আব্বা?জীবন বড় হলে মানুষও বড় হয়ে যায়।আমার জীবনটা বড় হয়ে গেছে,শুধু বয়সটাই ছোট রয়ে গেছে।”

ময়ূরীর আব্বার মুখের এমন বেহাল অবস্থা দেখে চিন্তা মুক্ত করতে বলল,
“আমার শ্বশুর বাড়ির সবাই ভীষণ ভালো।পুতুলের বাবার সাথে পুতুলকে নিয়ে ঝামেলা হলেও কখনো অন্য বিষয় নিয়ে আমাদের ঝগড়া হয়নি।উনি যেমন দায়িত্ববান একজন বাবা,ঠিক তেমন যত্নবান স্বামী।উনিও তোমার মতো করেই আমার যত্ন নেয় আব্বা।লোকটা তোমার মতো করেই আগলে রাখে।আমাকে নিয়ে চিন্তা করছো কেন?মাঝে-মধ্যে এমন ঝগড়া হয়েই থাকে।”
শুকনো ঢোক গিলল মেয়েটা।দোলনা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“আমায় নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।তোমার মেয়ে সুখে আছে।এত সুখ সবার কপালে হয় না।অনেক রাত হয়েছে আব্বা,ঘুমিয়ে পড়ো।রাত জেগো না যেন!”

রাতের আঁধার সবে সরে গেছে,আকাশের পূর্বদিকে হালকা কমলা-গোলাপি আভা ফুটতে শুরু করেছে। বাতাসে একটা কাঁচা,ভেজা গন্ধ,যেন রাতভর মাটি ঘুমিয়ে উঠে এখন ধীরে শ্বাস নিচ্ছে।ঘাসে টলটল করে জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো প্রথম রোদে ঝিলমিল করে।
পাখিরা তখন একে একে ডেকে ওঠে। প্রথমে কোয়েলের ডাক,তারপর শালিক,দাঁড়কাক,টিয়া আরও কত কী!সব মিলিয়ে আকাশজুড়ে প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে যায়।
মধু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই কোমরে আঁচল গুঁজে উঠোন ঝাঁড়ু দিতে শুরু করেছে।আর ওয়াহিদ বারান্দায় বসে বসে বিরক্ত করছে তাকে।আজ পবিত্র জুম্মার দিন।বাড়িতে বোন,বোনের জামাই,ভাগ্নি এসেছে বলে তার ব্যস্ততার শেষ নেই।ফাহাদ গুটি গুটি পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।বারান্দার চৌকিতে ওয়াহিদকে বসে থাকতে দেখে বলল,
“কিরে কিরে,ইনে কী?তুমি কী কুরো?”
ওয়াহিদ মাথা নিচু করে পাশে তাকায়।ছোট্ট ফাহাদকে দেখে দুই হাত দিয়ে উপরে উঠিয়ে কোলের উপর বসায়।মধু ঝাঁড়ু দিতে দিতে গলা উঁচিয়ে বলে,
“ফাহাদ,ভাই আব্বাকে ডেকে দে।বল বাজারে যেতে হবে।”
ফাহাদ ওয়াহিদের শার্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলে,
“আব্বা তু নাই।আব্বা বাড়ি নাই।”
ওয়াহিদ বলল খালু আব্বা বাজারে গেছে আরও ঘণ্টা খানিক আগে।মধু জানত না।সে কাজে মনোযোগী হতেই ফাহাদ মুখ কালো করে বলে,

“তুমি অনেক গুরিব।আমার দুলাবাইয়ের কাচে অনেক ট্যাকা।তুমার ট্যাকা নাই।”
ওয়াহিদ আশ্চর্য হয়ে বলে,
“তুই বড়লোকও চিনিস?”
“চিনমু না ক্যা?”
“শালা তো ডেঞ্জারাস।”
“তুমার শালা ক্যারা?”
“তুই।”
ফাহাদ চোখ গোল গোল করে তাকায়।পিটপিট করে তাকিয়ে বলে,
“ওহ!তাইলে ট্যাকা দেও।”
“ট্যাকা দিয়ে কী করবি?”
“বিয়া করুম।”
“কারে?”
“দুলাবাইয়ের বুইন।”
“তোর দুলাভাইয়ের বোন কত বড় জানিস?”
“জানি।”
“বিয়ে করে বউকে কী খাওয়াবি?”

ফাহাদ উত্তর দিল না।এখন তার বিয়ে নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।সে পুতুলের কাছে যাবে।পুতুল বোধহয় এখনো ঘুমাচ্ছে।বাচ্চাটা ওয়াহিদের কোল থেকে নেমে ঘরের ভেতরে গেল।ফিরোজা বেগম শবনমদের বাড়িতে গেছেন কিছু দরকারে।মধু উঠোন ঝাঁড়ু দিয়ে রান্নাঘরে ভাত বসিয়েছে।ওয়াহিদ তার দিকে তাকিয়ে আছে।আঁচল কোমরে গুঁজে মাথায় খোঁপা করে গিন্নিদের মতো রান্না বসিয়েছে।মুখের কাছে কিছু চুল এসে খিলখিল করছে।ওয়াহিদ গলা পরিষ্কার করল।শব্দ করে বলল,
“শুনছো,মধুমিতা?”
মধু চোখ তুলে তাকায়।ওয়াহিদ আজ-কাল তাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে ভীষণ লজ্জায় ফেলে দেয়।অদ্ভুত লোকটা।সে দৃষ্টি সরিয়ে চুলায় লাকড়ি দিয়ে বলল,
“এত মধুর ডাক আমার পছন্দ হচ্ছে না।হলো কী আজ?এত মিষ্টি করে ডাকা হচ্ছে কেন,শুনি?”
“তোর সাথে ভালো ব্যবহার করলে হজম করতে পারিস না কেন?”
“সে আমি বলতে পারব না।কী হয়েছে সেটা বলুন।”

“ঐ একটু একটা ঘরে আমার থাকতে ভীষণ অসুবিধা হয়।”
“কেন?সেখানে আবার কী সমস্যা?”
“বিছানাটা বড্ড ছোট।”
“আব্বাকে বলে ব্যবস্থা করা যাবে।”
“বুঝতে পারছিস না?”
“কী বুঝব?”
ওয়াহিদ বারান্দা থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরের সামনে গিয়ে ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে বলল,
“তোর ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দে।”
মধু পিটপিট করে তাকাল।লম্বা চওড়া ছেলেটার মুখের দিকে ঘাড় উঁচিয়ে বলল,
“আমার ঘরের থেকে তো আপনাকে যে ঘর দেয়া হয়েছে সেটা অনেক ভালো।”
“কে বলেছে?তোর ঘরটা সুন্দর।”
“কিন্তু সেখানে তো আমি থাকি।”
“আমিও নাহয় থাকব।হালাল উপায়ে!”
মধু আশ্চর্য হয়ে বলল,
“হালাল উপায়ে?মানে?”

ওয়াহিদের মন চাইল মধুর দুই গাল টেনে ধরে চোয়ালে দু’ঘা বসিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলতে, “গণ্ডার,তুই কী কোনোদিন মানুষ হবি না?আজীবন মাথায় গোবর নিয়ে ঘুরবি?ইডিয়ট একটা।”
বেচারা মনের দুঃখ মনে রেখে ঠোঁটে জোরপূর্বক হাসি টেনে বলল,
“আমি শিওর,বিয়ের পর তুই তিন বেলা জামাইয়ের হাতে মার খাবি।”
মধু গাল ফুলিয়ে বলল,
“বলেছে আপনাকে?আমি কেন মার খাব শুনি?”
“তোর মাথায় যে গোবর।এই গোবর নিয়ে সংসার করবি কিভাবে?”
মধু ভাতের হাড়িতে ঢাকনা চাপ দিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
“সেটা নাহয় আমি দেখে নিব।আমাকে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না।আপনার বাড়ি যাচ্ছেন কবে?সেই তো এলেন,যাওয়ার নাম নেই।”

“তুই কী আমাকে তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছিস?”
মধু মিনমিনে গলায় বলল,
“পাশের বাড়ির দাদি কী বলেছে জানেন?তিনি মনে করেছেন আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে।তাই আপনি ঘরজামাই হয়ে এই বাড়িতে থাকেন।এসব কথা গ্রামে রটাচ্ছে।আব্বা জানার পর হেসেছে অনেক।আব্বার তো গায়েই লাগল না,তাই আপনাকে বললাম।”
ওয়াহিদ নাক ছিঁটকে বলল,
“নেহাত আমার ট্রান্সফারটা শুধু এই গ্রামে হয়েছে,নাহলে তোকে নিয়ে আমার বাড়িতেই থাকতাম।”
“ওমাহ,আপনার বাড়িতে আমি যাব কেন?”
“বউ তো সব সময় জামাইয়ের সাথেই থাকে।বলদ!”
ওয়াহিদ হাঁটা ধরল বাড়ির বাইরের দিকে।মধু হতভম্ব হয়ে ওয়াহিদের কথা শুনে গেল।বউ?ওয়াহিদের বউ?মেয়েটা চোখ কপালে তুলে ওয়াহিদের চলে যাওয়া দেখল।কিসব বাজে কথা বলে গেল লোকটা।মেয়েটার কানের কাছে সেই শব্দগুলো ঘণ্টার মতো বাজল।
তার গাল দুটো গরম হয়ে উঠল লজ্জায়,রাগে,অবিশ্বাসে,কীসে যেন মধু নিজেও বুঝল না।ঠিক তখন পেছনে কর্কশ গলায় ফিরোজা বেগম ডাকলেন,

“মধু! ভাত বসিয়েছিস? কই রে তোর মন? সকালে এত দেরি কেন?”
মধু চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
“হ-হ্যা,বসানো আছে।”
ফিরোজা বেগম ভেতরে ঢুকে পানির কলসি তুলতে তুলতে বললেন,
“ওয়াহিদ কোথায় গেল রে?”
মধু শুকনো গলায় বলল,
“জানি না।এখনই বের হলো।”
সে বসে থাকল কিছুক্ষণ।তার কানে এখনো ওয়াহিদের কথা গুলো ভাসছে।
“হালাল উপায়ে!”
মধুর মনে হলো,মাথায় যেন সত্যিই গোবর ভরা!
বুঝতেই পারে না লোকটা আসলে কী বলতে চেয়েছে।

ফাহাদ ঘুমন্ত পুতুলের শরীর ঘেঁষে শুয়েছে।পিটপিট করে তিনজনের ঘুমন্ত মুখ দেখে একা একাই বিড়বিড় করছে।বিছানার এক কোনায় ময়ূরী গুটিয়ে শুয়েছে তাহসিনের বুকে।এদিকে পুতুল মুখের ভেতর ময়ূরীর আঁচল কামড়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।ফাহাদ বুঝল না পুতুলের কাণ্ড।সে ছোট মাথা চুলকে উঠে বসল।হামাগুড়ি দিয়ে বিছানার অন্যপাশে তাহসিনের নিকটে এগিয়ে এলো।বিচ্ছুটা তাহসিনের পেটের উপর বসতেই তাহসিন পিটপিট করে চোখ খুলল।সকাল সকাল শালাকে পেটের উপর বসে থাকতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।বাচ্চাটা ভীষণ দুষ্টু।সে ফাহাদকে নামিয়ে দিয়ে উঠে বসল।বাচ্চাটার গুলুমুলু গাল টেনে দিয়ে ভারী গলায় বলল,
“কী চাই?”
“আপা উটে না।”
তাহসিন ঘাড় ঘুরিয়ে ময়ূরীর ঘুমন্ত মুখ দেখল।বলল,
“আপা এখন ঘুমায়।”
“ডাক দেও।”
“না।”
“ক্যা!”

তাহসিন চোখ পাকিয়ে তাকাতেই ফাহাদ ময়ূরীকে জোরে জোরে ডাকতে শুরু করল।তাহসিন ওকে থামানোর আগেই ময়ূরীর ঘুম ভেঙে গেছে।সে চোখ খুলে ভাইকে এই ঘরে দেখে ভাবল কাল রাতে সে দরজা আঁটকায়নি।ময়ূরী উঠতেই সে তাহসিনের থেকে সরে ময়ূরীর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল।বলল,
“আদুর দেও আপা।”
ময়ূরী হাত রাখল ভাইয়ের শরীরে।ছোট ছোট চুলের ভাজে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি চলে গেলে আদর করবে কে?”
ফাহাদ কুটুর কুটুর করে তাকায়।ঠোঁট উল্টে বলে,
“তুমি কুই যাইবা?”
“চলে যাব।”
“আমারে নিয়া যাইবা না?”
ময়ূরীর মায়া হলো ভাইয়ের কথা শুনে।সে যাবে সওদাগর বাড়ি,এই বাড়িতে থাকার চেয়ে নাহয় সেখানে থাকাই ভালো হবে।কিন্তু ফাহাদকে নিয়ে যাবে নাকি বুঝতে পারছে না।আজ মায়ের বাড়ির কথা খানা যদি শ্বশুর বাড়ি গিয়ে শুনতে হয়?যদি কেউ ভাইকে নিয়ে খোঁটা দেয় তাহলে সে সহ্য করতে পারবে না।গলা ভেঙে চোখের কোণা ভেঙে জল গড়িয়ে পড়ল মেয়েটার।ভাইকে জড়িয়ে ধরে কম্পিত গলায় বলল,

“আব্বা-আম্মার কাছে থাক।আমার তো শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে।”
“তুমার লগে আমি যাই?আমারে নিয়া যাও।”
“আপাকে ছাড়া থাকতে শিখতে হবে।”
তাহসিন ময়ূরীর চোখে পানি দেখে হয়তো কিছু বুঝতে পারল।ফাহাদ ময়ূরীর কথা শুনে কেঁদে উঠল।ময়ূরী ঠোঁট কামড়ে উঠে বসল।চোখের পানি মুছে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল হনহন করে।ফাহাদকে মায়ের থেকে বেশি সে রেখেছে।স্কুল থেকে ফিরে পুরোটা সময় ছোট ভাইকে নিয়ে থেকেছে।বিয়ের পর সব কিছু বদলে গেছে।মেয়েটা ভেবেছিল ছোট ভাইকে সাথে রাখবে।শ্বশুর বাড়ি গেলে ছোট ভাইকে নিয়ে রাখতে কোনো সমস্যা হবে না।এতদিনও হয়নি,কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মানুষ সুযোগ পেলে মাটির নিচ থেকে টেনে হিচড়ে বের করে।গলা টি’পে ধরতে দু’বার ভাবে না।কাল যখন শ্বশুর বাড়ি তাকে নিয়ে কেউ কটু কথা বলবে তখন সে কী করে সইবে?নিজে মাটি কামড়ে থাকতে পারলেও ভাইকে নিয়ে বাজে কথা সে শুনতে পারবে না।
ফাহাদকে টেনে কোলে তুলে নিল তাহসিন।বাচ্চাটার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল,

“কাঁদছ কেন?”
ফাহাদ বলল,
“আপা আমারে রাইখা যাইবুগা।”
“তুমি যাবে সাথে?”
“হু।”
“নিয়ে যাব।”
“সুত্যি?”
তাহসিন হেসে মাথা মাথা নাড়ায়।সকালে ফিরোজা বেগম মাংস রান্না করলেন।সকালে খেয়েই তাহসিনরা ফিরে যাবে।তাদের খেতে দেয়া হলো।ময়ূরী খেলো না।মুখ ধুয়ে এক গ্লাস পানিও খেলো না।ফিরোজা বেগম মেয়ের অভিমান বুঝলেন।মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলেন না।ময়ূরীর জেদ সম্পর্কে তার ধারণা আছে।কাল যদি মেয়েকে ওই কথা তিনি না বলতেন তাহলে ময়ূরী হয়তো ফিরে যেত এত সহজে।

খাওয়া দাওয়া শেষে তৈরি হলো তারা।তাহসিন শ্বশুরের ঘরে এসেছে।বক্কর বসতে বললেন তাকে।তাহসিন গিয়ে বসল বিছানায়।সে লজ্জা পাচ্ছে শ্বশুরের সাথে কথা বলতে।বক্কর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“তোমার কাছে এটা আশা করিনি বাবা।যাক,যা হয়েছে আর দ্বিতীয়বার করার সাহস করো না।তোমার দাদা জোর করে বিয়ে করিয়েছিলেন বলে মেয়েকে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম।তোমাদের ক্ষমতার ধারের কাছেও হয়তো যেতে পারব না,কিন্তু মেয়েকে নিজের কাছে রেখে দেয়ার মতো সাধ্য আমার আছে।”
তাহসিন মাথা নিচু করে বলল,
“আমাকে ক্ষমা করবেন আব্বা।দ্বিতীয়বার এমন কিছু করার দুঃসাহস হবে না আমার।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ২৩

“আমার মেয়ের জেদ অনেক বেশি।কিছু করার আগে অন্তত দশবার ভাববে।আমার মেয়েকে বিয়ে করেছ মানে সে তোমার অর্ধাঙ্গিনী।সুখে,দুঃখে সেই থাকবে তোমার পাশে।ও ছোট হলেও দায়িত্ব জিনিসটা খুব ভালো করেই বোঝে।পুতুলকে নিয়ে আর চিন্তা করো না।”
তাহসিন মাথা নাড়ল।কথা বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না।ফাহাদকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবদার করলে বক্কর মানা করেন।ছেলেকে এভাবে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি রেখে দেয়া যায় না।ফাহাদ কান্না-কাটি করে বলে তিনি এর আগেরবার পাঠিয়েছিলেন।তবে তাহসিন বার বার অনুরোধ করায় তিনি মানা করতে পারলেন না।মেয়েটার মন-মানসিকতার চিন্তা করে রাজী হলেন।যাওয়ার আগে ময়ূরী নিতে চাইল না ভাইকে।ফাহাদ চিৎকার করে কান্না জুড়ে দেয়ায় বাধ্য হয়ে সে ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। ‘বাবার বাড়ি’ থেকে।

কিশোরী কন্যা পর্ব ২৫