Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ৩২

কিশোরী কন্যা পর্ব ৩২

কিশোরী কন্যা পর্ব ৩২
হামিদা আক্তার ইভা

মেঘলা দিনগুলো বড্ড সুন্দর হয়।
আকাশটা সেদিন একরঙা ধূসর চাদরে ঢাকা থাকে, না রোদ, না বৃষ্টি—মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক শান্ত সময়।গ্রামে এমন দিনে বাতাসটাও যেন ধীরে হাঁটে।কোনো তাড়া নেই, কোনো হুড়োহুড়ি নেই।
দূরের খালটার জল কেমন গাঢ় হয়ে আসে।পাড়ের কচুরিপানায় টুপটাপ জলের দাগ পড়ে, বুঝি বৃষ্টি নামবে বলে আকাশ মনস্থির করছে।মাটির রাস্তা ভিজে ভিজে নরম হয়ে যায়, পায়ের নিচে আলাদা একটা গন্ধ ছড়ায় ভেজা মাটির, শ্যাওলার, আর পাতার।
ঘনকালো অন্ধকার তখন।ফরাজী বাড়ি কেমন বিষন্নতায় মুখরিত চারপাশ।ফিরোজা বেগমের শরীরটা বড্ড খারাপ।মধু মায়ের কোলে শুয়ে আছে নীরব হয়ে।বক্কর ফরাজী বাইরে,উঠোনে বসে কথা বলছেন ওয়াহিদের সাথে।ফিরোজা বেগমের কোলের উপর মধুর মাথা।তিনি যত্ন করে বোকা মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

“একটা কথা রাখবি মধু?”
মধু মায়ের ভেজা চোখের দিকে তাকায়।বলে,
“কী বলবে আম্মা?”
“যদি কখনও এমন দিন আসে,যে নিজেকে খুব একা মনে হয়, বুকে যন্ত্রণা হয়,পৃথিবীটা বড্ড স্বার্থপর মনে হয়,তখন আমার কবরের পাশে বসে সকল দুঃখ গুলো প্রকাশ করবি।আম্মা তোর সব দুঃখ শুনবে।হয়তো আম্মা দুঃখ কমাতে পারবে না কিন্তু তোর পাশে থাকবে।”
মধু কম্পিত গলায় বলল,
“তোমার কিছু হবে না আম্মা।”
“আম্মা তোদের খুব ভালোবাসে।ময়ূরীর সাথে আমি অন্যায় করেছি।আমার কবরের মাটি ছুঁয়ে আমাকে ক্ষমা করে দিতে বলবি।ও ক্ষমা না করলে মরেও যে শান্তি পাব না।”
“এমন কথা কেন বলছো আম্মা?তুমি আমাদের ছেড়ে যাবে কোথায়?”
ফিরোজা বেগম আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছলেন।মেয়ের মাথায় আদুরে স্পর্শ রেখে বললেন,
“মায়েরা তো আজীবন থাকে না মা।”

মধু কেঁদে উঠল।মায়ের কোলে মুখ গুঁজে ডুকরে উঠল।দরজায় কড়া নাড়লেন বক্কর।মধু ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বক্কর ফরাজী বসলেন স্ত্রীর পাশে।ফিরোজা বেগমের চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে।শরীরটা শুকিয়ে গেছে আগের তুলনায়।ফিরোজা বেগম স্বামীকে দেখে হাসলেন।হেসেই বললেন,
“এই সংসারে দ্বিতীয় কোনো নারীকে নিয়ে এসো না যেন।আমার সংসারের ভাগ অন্য নারী বসালে দুঃখ পাব আমি।”
বক্কর বললেন,
“পাগল হয়ে গেছো তুমি।ঔষধ খাও ঠিক মতো।”
ফিরোজা বেগম বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলেন।চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল চোখের জল।
মধু বাইরে এসেছে।তীব্র বাতাসের ছন্দে যেন তার খোঁপা করা চুল গুলো খিলখিল করে হাসছিল।পাশে ওয়াহিদ বসে আছে চুপচাপ।মধু বলল,

“আমার একটা কথা রাখবেন?”
ওয়াহিদ উত্তর দিল না।মধু বলল,
“আপনি চলে যান।এই গ্রামের মানুষ গুলো ভালো নয়।”
“তুই চল আমার সাথে।”
“এ হয় না।”
“কেন হয় না?”
“আপনি বুঝতে কেন পারছেন না?”
“বুঝতে চাইছি না।”
মধু চোখ বন্ধ করল।কণ্ঠ কেঁপে এলো মুহূর্তেই।তবু নিজেকে শক্ত রেখে বলল,
“আপনি চলে গেলে আমি শান্তি পাব।”
ওয়াহিদ দূরুত্ব রেখেই মধুর মাথায় হাত রাখল।বলল,
“যাব!তোকে সাথে করে।”

পুরো বাড়ি নিশ্চুপ।মধ্যরাত পেরিয়ে ঘনিয়ে আসছে ভোরের আলো।কেমন গুমোট গুমোট ভাব পুরো বাড়িতে।তাহসিন আর ময়ূরী তখন নামাজে দাঁড়িয়েছে পরিষ্কার হয়ে।নামাজ শেষে তাহসিন বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছে।ময়ূরী ঘরের দরজা খুলে বেরোল বাইরে।শাশুড়ির ঘর থেকে ফাহাদের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।সে জানে ফাহাদ এই সময়ে ময়ূরীকে কাছে না পেলে এভাবে কাঁদে।সে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলো।শাশুড়ির দরজায় শব্দ করতেই ভেতর থেকে অরুণিমা বেগম দরজা খুলে দিলেন।
“অনেক থামানোর চেষ্টা করলাম,থামছেই না।”
ময়ূরী ক্ষমা চেয়ে বলল,
“মাফ করবেন আম্মা।এই রাত করে আপনার ঘুমের ব্যঘাত ঘটল।”
“ক্ষমা চাইছ কেন?ও তো আমার ছেলের মতোই।”
ময়ূরী বিছানার নিকট এগিয়ে যেতেই ফাহাদ হামাগুড়ি দিয়ে বোনের বুকে হামলে পড়ল।ময়ূরী ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“সোনা,কাঁদছিস কেন?”
ফাহাদ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
“আম্মা কুই আপা?”
“আম্মা তো বাড়িতে।মায়ের কথা মনে পড়ছে?”
“উম!”
“কাল নিয়ে যাব।”
তৎক্ষণাৎ বাড়ির সদর দরজায় শব্দ হয়।বাড়ির দারোয়ান ডাকছে বাইরে থেকে।অরুণিমা বেগম অবাক হলেন।এই সময়ে দরকার ছাড়া তো দারোয়ান ডাকে না।বাইরে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে।ড্রয়িংরুমে বাড়ির কিছু মহিলা উপস্থিত হয়েছেন রজনী বেগমের সাথে।বাইরে থেকে রজনী বেগম দরজা খুলে দিতেই দেখতে পেলেন সদর দরজার সামনে দারোয়ান আতঙ্কিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তিনি কপাল কুঁচকে বললেন,
“কী হইছে?এমনে সাতসকালে শব্দ করতাছ কেন?”
দারোয়ান শুকনো ঢোক গিলে বললেন,

“ছোট আম্মাজান কই?”
“কেরা?তাহসিনের বউ?”
“জি,তিনি কই?”
হট্টগোলের শব্দ শুনে ময়ূরী বেরিয়ে আসে ঘর থেকে।গুটি গুটি পায়ে পেছনে ফাহাদও পিছু নেয় বোনের।ময়ূরীর মুখ তখন ভীষণ শুকনো।ক্লান্ত শরীর নিয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“আমাকে কেন খুঁজছেন?”
“আপনার জন্য একটা দুঃসংবাদ আছে।”
“কী হয়েছে?”
দারোয়ান কাঁপা গলায় বললেন,
“ আপনার আম্মা…মধ্যরাতের পর ইন্তেকাল করেছেন।”
ময়ূরীর চোখে মুহূর্তে অন্ধকার নেমে এলো। তার গলায় কণ্ঠ আঁটকে এলো, বুকের ভিতর যেন কোনো আগুন জ্বলে উঠল। হাত জড়িয়ে ধরে ফাহাদকে দেখল, ছোট্ট ভাইয়ের চোখও ভেজা। ময়ূরীর শরীর কেঁপে উঠল।
হঠাৎ চিৎকার করে সে জোরে বলতে লাগল,

“না! না, এটা হতে পারবে না! আম্মা!”
ময়ূরী সদর দরজা ঠেলে বাইরে দৌঁড়ে গেল। বাতাসের সঙ্গে তার চুল উড়ছিল।মাথার আঁচল কখন কাঁধ বেয়ে নেমে গেছে বলতেও পারবে না।হাউমাউ করে ছুটে গেল বাড়ির গেটের দিকে।ভিজে মাটির রাস্তা ধরে ছুটতে লাগল। ফাহাদ তার পেছনে ছুটতে চেষ্টা করল, কিন্তু ছোট হওয়ায় তাকে ঠিক ধরা সম্ভব হলো না।আপাকে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ছিঁটকে পড়ল কাদা মাটিতে।বাড়ির মানুষ হতবাক।অরুণিমা বেগম ছুটে এসে ফাহাদকে কোলে তুলে নিলেন।সে হাউমাউ করে কাঁদছে।কোল থেকে ছুটে নিচে নামতে চাইছে।হাহাকার ভরা সকাল।নিচে হৈচৈ শুনে তাহসিন সহ বাড়ির অনেকেই নেমে এলেন নিচে।নিচে এসে এমন সংবাদ শুনে তাহসিন ছুটল বাড়ির বাইরে।
গ্রামের সকালের হালকা আলো, মেঘলা আকাশ, ভেজা মাটির গন্ধ সবই যেন তার কাঁদো চোখের সঙ্গে মিলেমিশে এক গভীর শূন্যতা এবং বেদনার ছাঁয়া ফেলেছে। ময়ূরী আর থামতে পারল না; তার সব শক্তি, সব আশা, সব মায়ের ভালোবাসা এক মুহূর্তে যেন তার হাতছাড়া হয়ে গেছে।

চিৎকারের আওয়াজ গ্রামের ধ্বনির সঙ্গে মিলেমিশে চারপাশে ভেসে গেল, নিঃশব্দ ঘরের শান্তি ভেঙে, শোকের এক গভীর প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।গ্রামের রাস্তায় তখন পুরুষ মানুষ ছিলেন সব।নামাজ শেষে হয়তো বাড়ির রাস্তা ধরেছিলেন।চেয়ারম্যান বাড়ির ছোট বউকে এমন করে ছুটতে দেখে সকলেই হতবাক।
গ্রামের পুরুষদের হতবাক দৃষ্টির মধ্যে ময়ূরীর চিৎকার ধ্বনিত হলো-“আম্মা! আম্মা!” সেখানে থেকে বাতাসের সঙ্গে মিলেমিশে যেন আকাশেও পৌঁছে গেল। কেউ এগিয়ে এসে কিছু বলতে পারল না, সবাই শুধু স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
বাড়ির আঙ্গিনায় পা রাখতেই শরীর জমে এলো শূন্যনায়।উঠোনে কত মানুষের ভিড় জমেছে।ঘরের ভেতর থেকে মধুর চিৎকারের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ময়ূরী পাগলের মতো ছুটে গেল ঘরে।মায়ের ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই হাঁটু ভেঙে এলো।বিছানায় মায়ের নিথর দেহটা পড়ে আছে।মধু হাউমাউ করে কাঁদছে।চাচি,শবনম তার পাশেই।বক্কর নিশ্চুপ হয়ে ঘরের এক কোনায় বসে আছেন।ময়ূরী হামলে পড়ল মায়ের পায়ের কাছে।মায়ের দুই পা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলল,

“ও আম্মা!আমাকে দেখো একবার?আমার দিকে তাকাও আম্মা।তুমি আমাদের রেখে কিভাবে চলে গেলে?তাকাও না আম্মা।”
চাচি এগিয়ে এসে ময়ূরীকে জড়িয়ে ধরলেন।তার চোখেও পানি চিকচিক করছে।তিনি ময়ূরীর গালে,মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“আম্মা আর নাই।চিৎকার করিস না মা।”
“ও চাচি,আমার আম্মার কী হইছে?আমার মা কথা বলে না।তারে ডাকো,তারে বলো ময়ূরী আসছে।”
ঘরের ভেতর তখন তাহসিন ছুটে এলো।এত এত মানুষের মধ্যে প্রথমে শাশুড়ির নিথর শরীরটা চোখে পড়ল।তারপর চোখ গেল বউয়ের দিকে।সে এগিয়ে গিয়ে বউকে বুকে জড়িয়ে ধরল।ময়ূরী হাউমাউ করে বলল,
“আপনি বলুন না আম্মাকে আমি এসেছি।আমি আর আম্মার সাথে রাগ করব না।আমি..আমি..”

কথা আঁটকে এলো কণ্ঠে।হাহাকারে ভরা পুরো বাড়ি।তাদের সাথে যেন আকাশটাও কাঁদছে।চেয়ারম্যান বাড়ির প্রায় অনেকেই এসেছেন ফরাজী বাড়ি।বেলা হয়েছে বেশ।মহিলারা শেষ গোসল করাচ্ছেন ফিরোজা বেগমকে।মধুকে চাচি জড়িয়ে ধরে রেখেছেন।ছোট্ট ফাহাদ বাবার কোলে মুখ লুকিয়ে ছলছল চোখে সব পর্যবেক্ষণ করছে।বাচ্চাটা জানেই না তার মা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে।জানাজা হলো খানিক্ষণ আগে।কত মানুষ বাড়ি জুড়ে।মায়ের কবর খোড়া হলো ময়ূরীদের বাড়ির পাশে বড় জাম গাছের পাশে।ফিরোজা বেগমের লা শ টা যখন মাটিতে রাখা হলো,তখন বক্কর ফরাজী প্রথম মাটি ফেলার পর ফিসফিস করে বললেন,

“অতি শীঘ্রই তোমার সাথে দেখা হবে ফিরোজা।”
বাড়িটা পুরো শান্ত।উঠোন জুড়ে সব আত্মীয়।তাহসিন আর ওয়াহিদ শ্বশুরের পাশে বসে তখন।বক্কর ফরাজী ওয়াহিদের হাত চেপে ধরে ক্লান্ত গলায় বললেন,
“তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে?আজ তোমাদের কাছে আমার কিছু চাওয়ার আছে।”
তিনি থেমে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমার ছোট মেয়েটাকে তোমার হাতে অনেক ভরসা করে তুলে দিয়েছি তাহসিন।তার পড়াশোনা করার ইচ্ছে আছে অনেক।আমার সন্তান তোমার স্ত্রী।তার ভালো-মন্দ তুমিই ভালো বুঝবে।”
তাহসিন বলল,

“আব্বা,আপনি ওকে নিয়ে চিন্তা করছেন কেন?আমার স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব আমার।”
তিনি শুকনো ঢোক গিলে বললেন,
“জানি এই আবদার রাখা ঠিক নয়।”
থেমে দূরে ময়ূরীর বুকে লেপ্টে থাকা ছোট্ট ফাহাদকে দেখে বললেন,
“আমার ছেলেটা অনেক ছোট।ওর বুঝ-বুদ্ধি এখনও হয়নি।আমার যদি কিছু হয়ে যায়,আমার বাচ্চাটাকে তোমরা দেখে রেখো।”

তাহসিন ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল।কবরের পাশে ময়ূরী,মধু আর ফাহাদ বসে আছে।ময়ূরীর বুকে ছোট্ট ফাহাদ কাঁদছে অবুঝ বাচ্চার মতো।কী নিষ্পাপ চেহারা বাচ্চাটার।মা কী জিনিস বোঝার আগেই মা হারা হলো বাচ্চাটা।
বোনের বিদায়ে তাহসিন আর গেল না।বউকে রেখে যাওয়া অসম্ভব তার পক্ষে।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল।বাড়ি খালি হয়ে এসেছে।সন্ধ্যার পর বাড়িতে এলেন মেম্বার আর তার কিছু লোক।সাথে ছিল রাজু।ময়ূরী তখন চুপচাপ বসে আছে চৌকিতে।পাশে পুতুল চুপটি করে বসে।মেম্বারকে দেখে তাহসিন এগিয়ে এলো।মেম্বার বললেন,
“তোমার শাশুড়ির মৃ’ত্যু সংবাদ শুনে ভীষণ দুঃখ পেয়েছি।”
ময়ূরী উঠে দাঁড়িয়েছে।সে মেম্বারকে সালাম করেনি।মেম্বার ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ময়ূরীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ছোট বয়সে মেয়ে সামলাতে কষ্ট হচ্ছে নাকি বউমা?”
ময়ূরী উত্তর দিল না।তাহসিন গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি ঘরে যাও।”
ময়ূরী ঘরে যেতেই সে বলল,
“বসুন আপনারা।”
তাহসিন তাদের বারান্দায় বসাল।বক্কর বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে।মেম্বার দেখে আস্তে-ধীরে বসলেন।রাজু এদিক-ওদিক তাকিয়ে মধুকে খুঁজছে।
“কী আর করবা বক্কর।মানুষ তো আর আজীবন বাঁচে না।আল্লাহর সৃষ্টি আল্লাহ নিয়ে গেছে।”
বক্কর বললেন,
“আমার স্ত্রীর জন্য দোয়া করবেন।”
“অবশ্যই,অবশ্যই।একটা কথা বলতে আসলাম।জানি এই সময়ে এই কথা বলা ঠিক না,কিন্তু আমার হাতে সময় যে অনেক কম।”

“কী কথা?”
“দেখো,তোমার ছোট মেয়েরে তো বিয়ে দিলাই।এখন বাড়িতে তোমার বউ নাই,আছে শুধু যুবতী একটা মাইয়া।তারে নিয়ে তো আর সব সময় চিন্তায় থাকা যায় না,তাই না?”
বক্কর মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ভাবছি মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিব।”
মেম্বার হাসলেন।বললেন,
“সেইতো!তারে নিয়েই কথা বলতে আসলাম।”
তাহসিন কপাল কুঁচকে রেখেছে।এই মেম্বারকে দিয়ে কোনো বিশ্বাস নেই।তিনি বললেন,
“আমার ছেলে,মানে রাজুর বউ বানিয়ে যদি নিয়ে যাই তাহলে তোমার আপত্তি আছে?”
বক্কর চুপ রইলেন।তিনি এই প্রস্তাবে রাজী নন খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন মেম্বার।অতপর তাহসিন মুখ খুলল,
“মাফ করবেন চাচা।মধুমিতার তো বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
মেম্বার আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“কার সাথে?”

“ওর মামাতো ভাই,ওয়াহিদ।গ্রামে যেই নতুন এসআই এসেছে।”
রাজুর চোয়াল শক্ত হলো।ক্রোধে দাঁত চাপল।মেম্বার খানিক লজ্জায় পড়লেন।তিনি ভাবলেন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অপমানিত হয়েছেন।তিনি তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন।সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে নেমে বললেন,
“প্রস্তাবটা একবার ভেবে দেখো বক্কর।সোনার ডিম্ হাত ছাড়া করলে আবার মেয়ের জীবন নিয়ে না টানা-টানি শুরু হয়।”
মেম্বারের কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল, বিষের মতো। তিনি আর রাজু দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। উঠোনে নেমে গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে রাজু একবার পেছনে তাকাল!চোখে চাপা আগুন, অপমান আর দখলের লোভ একসাথে জমে আছে।
বারান্দায় নীরবতা নেমে এলো। তাহসিন শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। বক্কর ফরাজী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে, কিন্তু চোখে জল নামছে না।আজ যেন সব জল আগেই ফুরিয়ে গেছে।
রাতে চাচি সবার জন্য খাবার দিয়ে গেলেন।কিন্তু একটা মানুষও খাবার মুখে নিল না।ময়ূরী শুয়ে আছে ঘরে।পাশে ফাহাদ আর পুতুল ঘুমাচ্ছে।মধু এলো ঘরে।বোনের পাশে শুয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠল,

“আজ তোর কাছে থাকি?”
ময়ূরী ঠোঁট কামড়ে চোখের পানি মুছে নাক টেনে বলে,
“থাক।”
তিন ভাই-বোন একই বিছানায় শুয়ে আছে।একজন অবুঝ এক শিশু।না সে মায়ের অভাব বুঝতে পারছে আর না বুঝতে পারছে মাকে আর কখনও দেখা হবে না।বাকি দুই বোন দুঃখ চেপে রেখেছে দু’টি ছোট ছোট বুকে।
ঘরটা নিস্তব্ধ।শোকের ভারে যেন বাতাসও ভারী হয়ে আছে। বাইরে মেঘলা আকাশ, মাঝে মাঝে হালকা বাতাস এসে জানালার পর্দা নাড়িয়ে দিচ্ছে—ঠিক যেন কারো অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস।
মধু শুয়ে আছে চিৎ হয়ে। চোখ দু’টো বন্ধ, কিন্তু ঘুম নেই। মায়ের কণ্ঠটা বারবার কানে বাজছে,
“মায়েরা তো আজীবন থাকে না মা।”
আজ বুঝছে কথাটার ওজন কতটা ভয়ানক।

পাশে ফাহাদের নিঃশ্বাস। ছোট্ট বুক ওঠানামা করছে অনিয়মিত ছন্দে। ময়ূরী আলতো করে হাত বাড়িয়ে ভাইয়ের মাথায় হাত রাখল। আঙুলের ছোঁয়ায় যেন বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ল।
এই শিশুটার জীবনে আজ থেকে ‘আম্মা’ শব্দটা শুধু গল্প হয়ে রইল।
মধু পাশ ফিরিয়ে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,
“আম্মা তো বলেছিল কবরের পাশে গেলে সব কথা শুনবে।আম্মা কি সত্যিই শুনবে?”
ময়ূরীর চোখ বেয়ে নিঃশব্দে পানি গড়িয়ে পড়ল।
“শুনবে।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ৩১

মধু আর কথা বলতে পারল না। বালিশে মুখ গুঁজে চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ল। ময়ূরী তাকে বুকে টেনে নিল। ঠিক যেভাবে ফিরোজা বেগম একদিন তাদের জড়িয়ে ধরতেন।
তিনজনের নিঃশ্বাস একসাথে মিলেমিশে গেল।একটা ছোট্ট পরিবারের শেষ আশ্রয় যেন এই একটা বিছানা।ঘরের কোণে রাখা কুপিটা নিভু নিভু করে জ্বলছে। আলো-ছাঁয়ার ফাঁকে ময়ূরীর মনে হলো, মা যেন এখনও ঘরের ভেতরেই আছেন। চৌকির পাশে বসে, আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন, আর বলছেন,
“কাঁদিস না মা,মায়েরা কখনও মরে না।”
“মায়েরা সত্যিই কখনও মরে না।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৩